February 21, 2008

খণ্ডিত গল্পচিত্র

রাশেদুল ইসলাম বাবু

১.
‘আমি সকাল বেলার পাখি হব, সবার আগে সবাইকে ঘুম ভাঙাবো’- কবি নজরুলের খোকার স্বাদ কবিতার এই মর্মকথা ভাবতে ভাবতে ঘুম ভাঙলো আকস্মিকভাবেই। এক অপ্রতিম আকাক্সক্ষা নিয়ে জানালাটা খুলেই দেখি একটা কালো কাক কা-কা করছে। তারপরও অবিষাদের আবেদন নিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারণ, আকাশটা কালো মেঘে ঢাকা। একটু পরেই বৃষ্টি নামবে হয়তো। আর বৃষ্টি যদি হয়, তাহলে পল্টুকে ভিজতে হবে। কেননা, আমার কাছে যে চিঠিগুলো আছে সেগুলো সকালেই ওকে নিয়ে যেতে হবে। “ওহ! চিঠিতে কী লিখা আছে তাতো পড়া হয় নি!” পড়েই বা কী লাভ। আমিতো জানিই ওতে কী লিখা আছে। কমরেড ফরহাদের বিশতম মৃত্যুবার্ষিকীর শোক সভা’র চিঠি ওগুলো। বলতে বলতে বৃষ্টি শুরু হলো। “কিন্তু পল্টু আসবে তো?” আসবে না মানে! আজকের মধ্যেই চিঠিগুলো বিলি করতে হবে ওকে। আর এজন্য ও একশ টাকা বকশিশ পাবে। ওর টাকার বেশ দরকার। বেচরা পল্টু! তুই কেন যে কমিউনিস্টদের সাথে জড়াতে এলি! তারচেয়ে বরং কোন রেস্টুরেন্টে ওয়েটারগিরি করলেও পারতিস। রোজগার খারাপ হতো না। “আহ! আমি এসব কী ভাবছি? যতসব মিডিল ক্লাস ভাবনা।”
কে যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। “ঠক ঠক ঠক।” বললাম “কে?” কোনো উত্তর নেই বরং আবারও সেই শব্দ, “ঠক ঠক ঠক!” অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা ছেড়ে দরজা খুললাম।
“আরে পল্টু তুই! তোর কথাই ভাবছিলাম। এই বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে এলি?”
“ছাতা আনছি। কই চিঠিগুল্যা দেন।”
“এতো তারাহুরা করছিস কেন? একটু বস।”
“না। আমার সময় নাই!” ব্যস্ততার ভঙ্গিতে পল্টু বলল। তারপর টেবিলের উপর রাখা চিঠিগুলো আর সাথে একশ টাকা নিয়ে পল্টু চলে গেল। আমাকে আর কিছুই বলল না। আমি আবার বিছানায় ঢুলে পরলাম। এবার হযতো মনা নামের সেই নারীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা সম্ভব হবে। বৃষ্টির স্পিড আরও বাড়লো। না, এতো শব্দে স্বপ্ন দেখা যায় না। মনে হচ্ছে বৃষ্টি টিনের চালে পরে কাঁদছে। অক্টোবরের বৃষ্টিতো, বিদায় বেলা না হয় একটু কাঁদালো। কী অবাক কাণ্ড! বৃষ্টিও কাঁদে। কিন্তু পল্টু কাঁদে না। যেদিন ওর বাপটা মারা গেল ও একটুও কাঁদেনি। কী দোষ ছিলো ওর বাপের? না হয় পেটের দায়ে গোপনে গাঁজার ব্যবসা করতো। তাই বলে যৌথ বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরে ফেলবে? যদিও পুলিশ রিপোর্টে দেখানো হয়েছে হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু পল্টু মানতে চায় না। তাই সেদিন ও অভিমান করেই বলে ফেলল, “খানকির বাচ্চারা আমার বাপক মারি ফ্যালায় এখুন কয় হাট অ্যাটাক! এট্যা বড়লোকের অসুখ, ঘুষখোরের অসুখ, হিরোইন দালালের অসুখ, গাঁজায় দালালের এগ্লা অসুখ হয় না।” যাকগে সে কথা। ওর বাপটা যেভাবেই মরুক, বেচারা মরে গিয়ে বেঁচেই গেছে। কিন্তু পল্টু তার বাপের মৃত্যুর শোকে এতটুকুও কাঁদেনি। গত সোমবার যখন ওর মাটাও মারা গেল সেদিনও ওর চোখে জল ছিলো না। কী যে হয়েছিলো ওর মায়ের, জানি না। হঠাৎ ও এসে আমার কাছ থেকে তিনশ টাকা নিয়েছিলো-লাশটা হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য। যখন বললাম, “কী হয়েছিলো তোর মায়ের?”
“কিছুনা, একটু অসুখ।” তারপর আর কিছুই বলেনি। টাকাটা হাতে পেয়েই চলে গিয়েছিলো। হায়রে পল্টু! এখুন তোর বাপও নাই, মাও নাই। তোর কেউ নাই। যার কেউ নাই তার পাশে আল্লাহ্ আছে। তোরতো কোন চিন্তা করার কথা না। তারপরও এত চিন্তা করিস কেন? সারাদিন টাকা টাকা করিস। সেদিন না হয় আমার কাছে থেকে তিনশ টাকা নিলি-লাশটা আনার জন্য, কাফনের কাপড়ের জন্য বাসুদেবের কাছ থেকে নিলি দেড়শ টাকা, আফসারের কাছ থেকে নিলি দুইশ টাকা-কবর খোরার জন্য। তাই বলে কোরআন খতোমের জন্যও টাকা! তাও আবার চুক্তি করেছিস হাউজপাড়া জামে মসজিদের বিশাল দাড়িওয়ালা ইমাম সাহেবের সাথে। ও বেটাতো রাক্ষস। একটা ছোট-খাটো মিলাদ-মাহ্ফলের জন্য নেয় একশ টাকা। গত মাসে কমরেড হোসেন আলীর মৃত্যুবার্ষিকীতে মিলাদ-মহ্ফিলের জন্য তার কাছে গিয়েছিলাম-আমি আর বাসু। ব্যাটা বলেছিল, “কমরেড হোসেন আলী নাস্তিক মানুষ ছিলো। নাস্তিক মানুষেরর জন্য মিলাদ পড়ানো পাপ। আমি এসবের মধ্যে নাই।” কিন্তু বাসুদেব যখন দুইটা একশটাকার নোট তার পাঞ্জাবীর পকেটে গুজে দিলো তখন সে দাড়ির ফাঁক দিয়ে একটা সুন্দর হাসি উপহার দিয়েছিলো আমাদের। কে জানে আজকের পল্টুর একশ টাকা হয়তো এই ইমাম সাহেবের পকেটেই যাবে।

২.
“শালারা কয়টা গাড়ি ভাঙছিস! কয়টা বাড়ি পুড়াইছিস। কয়টা রাস্তা অবরোধ করছিস! হামার নেত্রীক এমন করি ধরি নিয়া গেল্-কোন শালা প্রতিবাদ করে নাই। শালারা চুন্নি-বিড়ালের মতো ঘরের ভীত্রে পালে ছিল্। বালছিড়ারা ফাসকামী করার জাগা পায়না।”- উচ্চ কন্ঠে গালী দিতে দিতে করম শেখ ক্যাশ থেকে টাকা তুলে গুনতে থাকে। তারপর টাকাগুলো আবার ক্যাশবাক্সে রেখে দেয়। আমি দ্বিধাগ্রস্থ হলাম। একটু অস্বস্তিভাব নিয়েই তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম, “চাচা! ভালো আছেন।” “ভাল।”- চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে উত্তর দেয় কমর শেখ। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কীযেন ভাবে আর বলে, “তোমরা ফীর কোন ধান্দা ধরি আসচেন?”
“না মানে চাচা, একটু আগে কাদের যেন বকা দিচ্ছিলেন।”
“তোমাক দেই নাই বাহে! একনা আগে কিছু ছাত্র-যুবক আসচিল চান্দা নিতে। জোর করি পাঁচশ টাকা ধরি গেইল। শালারা নাকী বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগার করবার চাই।”
“ভালো কথা! খুবই ভাল কথা।”
“আরে রাকেন তোমর ভাল কথা। সব শালা মুর্খ। যখন জীজ্ঞাস কননু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কী? একটা শালাও উত্তর দিবার পাই নাই। আর তাতে ফীর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগার করবার চাই। বালছিড়ারা ফাসকামী করার জাগা পাইনা। ধান্দামী!”
“ওকে! ওকে! বুঝছি। তা চাচা, আমি কোন ধান্দায় আসছি তা কী বলতে হবে?”
“জানি জানি! তোমার হাতত বইগুল্যা দেখ্যা বুঝবার পাইছি। তোমরাতো আরেক বাটপার।”
আমি একটু বিব্রত হলাম। সবকিছু অস্বাভাবিক লাগছে। কিছুক্ষণ দুজনই চুপ। করম শেখের দোকানের কর্মচারিটা গ্যাসের সিলিন্ডারগুলো সাজাচ্ছে। টেবিলের উপর দেখতে পেলাম কমরেড ফরহাদের বিশতম মৃত্যুবার্ষিকীর শোক সভা’র চিঠি। সম্ভবত পল্টু আজ সকালেই দিয়ে গেছে। পল্টু ইদানিং ভালই কাজ করছে। সময়ের কাজ সময়েই করে ফেলে। করম শেখ আবারও ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে গুণতে থাকে। তারপর রেখে দেয়। আমি একটা বই তার টেবিলের উপর রেখে বললাম, “চাচা! এটা কবিতার বই। আমাদের ছাত্রছাত্রীরাই লিখেছে এতে।”
“ও তাই! খুব ভাল।” হাত দিয়ে বইটা নাড়তে থাকে, তারপর এপাশা-ওপাশ উল্টিয়ে বইটা টেবিলের উপর রেখে বলে, “এসব করি তোমার সময় নষ্ট হয় না?”
“কী যে বলেন! সময় নষ্ট হবে কেন? এসব ভাল কাজ।”
“ভল কাজ? বাটপারি কাজ! তোমার মতো স্টুডেন্ট লাইফে আমি এগ্লা করি বেড়াইছি। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টও ছিলাম। এগুল্যা করাইতো সব গ্যাছে! এখুন রড-সিমেন্ট আর গ্যাসের সিলিন্ডার সাপ্লাই দিতেই জীবন শ্যাষ।”
“সে জন্যই তো আপনার কাছে এসছি। যতই দিন যাচ্ছে ততই গ্যাসের দাম বাড়ছে, সেই সাথে রড-সিমেন্টের দাম। এই ব্যবসায় লস নাই।”
“হে! হে! হে! তা ঠিক, লস নাই। তা তোমারা যে এতো কষ্ট করি ত্যাল-গ্যাস, জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্যে লং-মার্চ করলেন, তাতে কী লাভ হইল? আমেরিকা এই সরকারক যে কায়দাত ফ্যালইছে তাতে এদ্যাশের ত্যাল-গ্যাস পাচার হতে দেরী নাই।”
“তখন না হয় আরেকটা প্রগ্রাম থ্রো করা যাবে। এশিয়া এনার্জি কী ফুলবাড়ি কয়লা খনি নিতে পারছে?”
“তা পারে নাই কিন্তু আমেরিকা যেটা কয় সেটা হয়। শালার কিলিন্টন ছিলো মিনমিনা শয়তান আর বুশ হলো যুদ্ধবাজ শয়তান।”
“হা! হা! হা!” আমি একটু হাসলাম।

“হাসেন না বাহে! হাসেন না! ইরাকক যেমন করি দখল করি নেল্, সাদ্দামক যেমন
করি ফাঁসি দেল্- গোটা বিশ্ব চায়া চায়া দেখিল্। আর জাতিসংঘ ঘাস কাটিল্।”
“আল্লার কাছে দোয়া করেন যেন বাংলাদেশের অবস্থা ইরাকের মতো না হয়।”
“দূর বাহে! কোনো লাভ নাই। ইরাকত যখন হামলা হইল্ তখন গোটা বিশ্বের যত হুজুর-মওলানা এমনকি শিশু আছে সবাই আল্লার কাছত দোয়া করছে যেন ইরাকের কোন ক্ষতি না হয়, সাদ্দামের যেন কিছু না হয়। তারপরও আল্লা এই কোটি কোটি মুসলমানের মধ্যে একজনেরও দোয়া কবুল করে নাই। একটা শিশুর হাতক নিষ্পাপ ধরি কবুল করলেও তো হইল্ হয়?”
“হা হা হা!” না হেসে পারলাম না। তারপর প্রসঙ্গ চেঞ্জ করে করম শেখকে আবারও বইটির কথা বললাম-
“চাচা, বইটা রাখেন। কবিতার বই।”
করম শেখ আবারও বইটা হাতে নিয়ে এপাশ-ওপাশ উল্টালো। তারপর ক্যাশ থেকে দুইটি একশ টাকার নোট তুলে এনে আমার সামনে ধরে। আমি টাকাটা হাতে নিয়েই পকেটে রাখি এবং বলি, “ধন্যবাদ চাচা!”
“ধন্যবাদের দরকার নাই! বইটা আমি পড়বইনা।”
“কেন?” অবাক হয়ে বললাম। করম শেখ হেসে হেসে উত্তর দেয়,
“তো কবিতা পড়তে ভাল লাগেনা। বাংলাদেশে এতো কবি! কাকের চেয়েও কবির সংখ্যা বেশি। হে! হে! হে!”

৩.
“সররে ভাই আফজাল! রাত পুয়ালেই কিস্তি” জ্যামে আটকে পরা রিকশাআলা চিৎকার করে বলছে। ভাবটা এমনযে ওর বউটা একাই ঋণ নিতে পারে। যাবতীয় ঋণে বোঝা এই রিকশাআলাকেই বইতে হয়। রিক্সাআলার কাণ্ড দেখে পল্টু পিক করে হেসে ওঠে। তারপরে বলে, “বালছিড়াটা! নেয়ার সময়তো নিছিস, এখুন পাছার ঘাম পরলেও শোধ হবার নয়, এট্যা গ্যারামিন ব্যাংক।” এরই মধ্যে জ্যাম ভেদ করে রিক্সাআলা পল্টুকে নিয়ে এগিয়ে যায় সোজা মমতা সিনিমা হলের পিছনে বস্তিগুলোর দিকে। সরকারের অবৈধ উচ্ছেদ লিস্টে নেই বলে বস্তিগুলো এখানো টিকে আছে সম্মানের সাথে। বস্তিগুলোর তৃতীয় সারির পূর্ব দিক থেকে আট নম্বর ঘরটিতেই পল্টুরা থাকে। আস্তে করে দরজা খুলে পল্টু ঘরে ঢুকতেই দেখে একটা বুড়ি উবু হয়ে শুয়ে আছে খালি চকির উপর। পল্টুকে দেখেই বুড়িটা চিৎকার করে বলে, “মাগীর বাচ্চা! গেছিলু কটায়? তখন থেকি না খাইয়্যা আচং! মোক মারি ফ্যালা। তোর বাটাক মারছিস, মাওটাকও মারছিস! মোকও মারি ফ্যালা। ভোগ লাগছে।” “নানী, বেশি চিল্লাস না!” পল্টু বলে, তারপর ও প্যান্টের পকেট থেকে পলিথিন মোড়ানো একটা পাউরুটি বেরকরে বুড়িটার সামনে ছুড়ে মারে। বুড়িটা পাউরুটি তুলে নিয়ে নাড়তে থাকে। তারপর কেঁদে ফেলে আর চিৎকার করে বলে, “মুই ভাত খাইম। তুই চাল আনি দে। মুই ভাত রান্না করি খাইম। তোকও রান্দি দেম। মুই ভাত খাইম।” পল্টু কিছুই বলল না। ও ঘর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালো ছোট আঙ্গিনায়। তারপর আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ নীল মেঘ নেই। হঠাৎ দুইটি কাক আকাশ থেকে উড়ে এসে পড়ল পল্টুর সামনে। কোত্থেকে যেন একটুকরা রুটি এনে কাক দুটি ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। পল্টুর দৃষ্টি এখুন কাক দুটির দিকে। ও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করল। ওর ভাবনাগুলো হল এরকম-
‘কাকেরা যদি ঋণ নিতে পারত তাহলে ভালই হতো। সুদখোর ইউনুস হওয়া যেত। তখন ও রোজ নানীর জন্য রুটি না এনে কাকদের জন্য রুটি আনতো। কাক সেই রুটি ঋণ হিসেবে গ্রহণ করত এবং পরে সুদে-আসলে শোধ করত। এভাবে পল্টু ধীরে ধীরে তৃতীয় মাত্রার ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করত। ময়না, টিয়া, শালিক, দোয়েল- এরা সবাই এই ব্যাংকে চাকরি করত। তারপর ধীরে ধীরে পাখিতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার চিন্তা-ভাবনা করত। এসব কমিউনিস্টদের সাথে থেকে কোনো লাভ আছে? কবে যে সাম্যবাদ আসবে, সেই আশায় জীবন মাটি।’ কিন্তু পল্টুর এই ভাবনাগুলো মনের মধ্যে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলো না। একটা বিশ্রি চিৎকার ওর সব ভাবনাগুলো ভেঙ্গে চুরমার করে দিল-
“কটাইগেলু হারামজাদা! মোক চাউল আনি দে! মুই ভাত খাইম।”

৪.
“...এলকায় লাইন থেকে পাঁচটি বগি ছিটকে পরে ঘটনাস্থালে পাঁচ জন নিহত হয় এবং ...” এফ এম রেডিও’র দুপুরের সংবাদ থেকে পাওয়া এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা প্রতিদিনই আসছে। কিন্তু পল্টুর বাবার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা কোনো মিডিয়ায় আসেনি। এইতো সেদিন একটা কুকুরের বাচ্চাকে অস্বাভাবিকভাবে মরে যেতে দেখলাম। বস্তির ল্যাংটা ছেলেগুলো বড় বড় ইটের ঢিল দিয়ে কুকুর-বাচ্চাটার মাথাটা থেতিয়ে ফেললো। হয়তো এমনিভাবেই পল্টুর বাবাকে মারা হয়েছে। অথচ কেউ কোনো প্রতিবাদ করে নি। কিন্তু কুকুরের বাচ্চাকে মারার সময় এক ঝাঁক কাক কা-কা করে প্রতিবাদ করেছিলো। হয়তো অনেকে বলতে পারে কাকের স্বভাব কা-কা করা। কেউ না বলুক, মনা একথা বলবেই। ও অবশ্য মাঝে মাঝে কাককে কাউয়া বলে ডাকে। শুনতে ভালই লাগে। ঠিক এই মুহূর্তে কাউয়া শব্দটা আবারও শোনা গেল। তবে মনার কণ্ঠে না-
“শালার কাউয়ার বাচ্চারা!” বলতে বলতে বাসুদেব ঘরে প্রবেশ করল। তারপর আবারও কলল, “কাউয়াগুলো ওখানে কা-কা করছে। এক ঝাঁক কাউয়া।”
“কেন কী হয়েছে?” আমি বললাম। তারপর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই কাকগুলো একটা নির্দিষ্ট স্থানে উড়ছে আর কা-কা করছে।
“ঐ রাস্তার ধারে একটা মরা কাকের বাচ্চা পড়ে আছে। বস্তির শয়তান ছেলেরা ওটাকে পেয়ে খেলতে খেলতে মেরে ফেলেছে। তাই কাউয়াগুলো কা-কা করছে।” বাসু বলল।
“ কাকেরা কী সংগঠিত! একটা কাকের বাচ্চাকে মারা হয়েছে আর তাতেই কাকগুলো সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করছে?”
“শুধু তাই না! ঐ রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে তাকে কাকগুলো...”
“সাংঘাতিক ব্যাপার। তুই আসলি কীভাবে?” “অনেক কষ্টে। মাথার উপর বুদ্ধদেব বাসুর এই কবিতার বইটা রেখে দৌড়ে দিয়ে...”
“খুব ভালো। দেখতো কাক সংক্রান্ত কোনো কবিতা আছে কীনা বইটাতে?”
“কাক সংক্রান্ত! কবির আর কাজ নাই?” এই বলে বাসুদেব বইটা রেখে চলে গেলো। আমি আবারও জানালা দিয়ে তাকালাম। ততক্ষণে কাকগুলো শান্ত হয়ে বৈদ্যুতিক তারের উপর বসে আছে। ‘নীল আকাশ আর বৈদ্যুতিক তারের উপর এক ঝাঁক কাক’- এই দৃশ্য হয়তো অন্যরকম হতে পারতো যদি কোন শিল্পী তাঁর গানের ভাষায় বলত। কিন্তু কাকগুলো ওখানে কতক্ষণ বসে থাকবে, কে জানে। হয়তো তারা সেখানে শোকসভা করছে, নয়তো মৃত কাকের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করছে। আমি বইটার পাতা উল্টাতে থাকি তারপর আবারও তাকাই বৈদ্যুতিক তারের দিকে। দেখি কাকগুলো হঠাৎ করেই উড়ে চলে যাচ্ছে। একটু আগে যেখানে এক ঝাঁক কাক ছিলো এখুন সেগুলো উড়ে যাচ্ছে যে যার কাজে। মনা সেদিন কবিতার যে দুটি লাইন শুনিয়েছিল তাই মনে পড়ছে খুব,
“এক ঝাক কাক
উড়ে যায় যাক।”

0 comments:

Post a Comment