July 24, 2008

গোলাম আব্বাসের গল্প

গোলাম আব্বাসের গল্প
রাশেদ উন নবী

উর্দু গল্পকার গোলাম আব্বাস [১৯০৯-১৯৮২] জন্মগ্রহণ করেছেন অবিভক্ত পাঞ্জাবের অমৃতসরে, লেখাপড়া করেছে লাহোরে। তবু সে পাঞ্জাবী লেখক না হয়ে সমাদৃত হয়েছে উর্দু সাহিত্যের একজন প্রধান লেখক হিসাবে। তার ছোট গল্পগ্রšেথর সংখ্যা মাত্র তিনটা, তবে সাহিত্য পেশায় তার বিচরণ বৈচিত্রপূর্ণ। বহু দক্ষিণ এশীয় মানুষের মত তার জীবনের প্রথম ভাগ শুরু হয়েছিল বঞ্চনা দিয়ে। পিতার মৃত্যুর পর তাকে পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে কাজ নিতে হয় রেলওয়েতেঃ কাজ ছিল মালামালের গায়ে শনাক্তকরণ সংখ্যা লেখা, বেতন ছিল মাসে ৩০ রুপি। আর সব প্রতিভাবান মানুষের মত গোলাম আব্বাসের একদিন মনে হয় যে এই সামান্য কাজ করার জন্য তার জন্ম হয় নি। তার ধারণা হয় যে সে লিখে এর চেয়ে বেশি আয় করতে পারে। রেলওয়ের সামান্য কাজ ছেড়ে দিয়ে সে নিয়মিত মৌলিক ও অনুবাদ লেখা লিখতে শুরু করে বিভিন্ন পত্রিকায়। তৎকালীন লাহোরের বিখ্যাত উর্দু সাহিত্য সাময়িকী, নৈরাগ-ই- খেয়াল এর ১৯২৯ সালের বার্ষিক সংখ্যায় লেখা ছাপা হওয়ার জন্য তাকে দেয় ২০ রুপি। এরকম আয়ের হিসাব থেকে গোলাম আব্বাস নিশ্চয়ই অনুমান করেছিল যে সাহিত্যকে পেশা হিসাবে নেয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল হয় নি।
ইতিমধ্যেই অবশ্য সাহিত্যিক হিসাবে না হলেও সম্পাদক হিসাবে তার ¯থায়ী কাজ জুটে যায়। লাহোরের বিখ্যাত প্রকাশনা সং¯থা ‘দার-উল-আব্বাস’ এ কাজ করার সময় সে সম্পাদনা করে জনপ্রিয় শিশু পত্রিকা, “ফুল” ও মেয়েদের পত্রিকা “তেহজাব-ই-নিসওযান”। দশ বছর প্রকাশনা সং¯থাটার সাথে কাজ করার পর সে যোগ দেয় অল ইন্ডিয়া রেডিওতে। সেখানে সে উর্দু আসর “আওয়াজ” ও হিন্দি আসার “সারঙ” পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। দেশ বিভাগের পর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের পর, সে পাকিস্তানে বসবাস করতে শুরু করে এবং রেডিও পাকিস্তানে কাজ করতে শুরু করে। পরে, ১৯৫৪ সালে সে যোগ দেয় বিবিসি রেডিওতে।
পেশাজীবনের বৈচিত্র নিশ্চয় তার সাহিত্যজীবনকে প্রভাবিত করেছে। তার গল্প যদিও সমাজের বৈসাদৃশ্য উন্মোচন করে, কিন্তু কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়ার চেষ্টা করে না। তার বর্ণনার পুঙ্খানুপুঙ্খতা থেকে এটা সহজেই অনুমান করা যায় যে সমাজের সদস্যদের আচরণ ও অব¯থান পর্যবেক্ষণ করবার ক্ষমতা তার ছিল অপরিসীম। তবে তার আগ্রহ ছিল এই আচরণ ও অব¯থান বর্ণনার মাধ্যমে সমাজের শঠতার কাছে ব্যক্তির অসহায়ত্ব তুলে ধরা। এই অসহায়ত্ব থেকে পরিত্রাণের পথ ইঙ্গিত করাটা হয়ত বা লেখকের দায়িত্ব। গোলাম আব্বাসের গল্প পড়লে মনে হয় সে এরকম দায়িত্ব পালনে আগ্রহী ছিল না। তার গল্প পড়লে বরং এই অনুভূতি হয় যে তার গল্পের বিষয় ও চরিত্র যে সমাজকে চিত্রিত করে, সেই সমাজ তার সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালন করলে এরকম বৈসাদৃশ থাকত না।
অনুভূতিটা গভীর এবং অস্বস্তিকরভাবে স্থায়ী হয় তার ”ওভারকোট” বা “আনন্দী” পড়লে। ওভারকোট নামটা শুনলেই প্রথমেই মনে আসে নিকোলাই গোগলের কথা। গোগলের ওভারকোট পশ্চিমা ও অ-পশ্চিমা উভয় দুনিয়াতেই একটা বহুল পঠিত গল্প। অনেকেই মনে করে, গোলাম আব্বাস রুশ সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত ছিল এবং গোগল, চেখভ ও তলস্তয়ের প্রভাব তার গল্পে স্পষ্ট। গোগলের ওভারকোট গল্পের সাথে গোলাম আব্বাসের ওভারকোট গল্পটা তুলনা করলে সমালোচকদের ওই পর্যবেক্ষণ অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে না। তবে সবাই জানে যে রুশ সমাজের [নির্দিষ্ট করে বললে পিটার্সবুর্গের] বৈসাদৃশ্যের প্রতি চেখভের কটাক্ষ ছিল ব্যাঙ্গাত্মক কিন্তু তীক্ষè। বিবেকবান পাঠক যখন গোগলের গল্প পড়ে তখন গল্পের চরিত্রের যে অসহায়ত্ব ও বঞ্চনা তার জন্য বেদনাবোধ না করলেও সহানুভূতি বোধ না করে পারে না। ওভারকোট গল্পের আকাকির জন্য দুঃখবোধ করে না এরকম মানুষ পাওয়া কঠিন। কিন্তু গোলাম আব্বাসের ওভারকোট পড়ে পাঠকের ঠিক কি অনুভূতি হবে তা বলা মুশকিল। গোলাম আব্বাস একজন দূরবর্তী পর্যবেক্ষক, যদিও কোনো নিকটবর্তী পর্যবেক্ষক তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনায় তার চেয়ে বেশি নির্ভরশীল হতে পারবে না। তার গল্প পড়া শেষ করে চরিত্রের সাথে নৈকট্য অনুভূব করা সহজ নয়।
প্রথমত, তার ওভারকোট গল্পের চরিত্র নামহীন। সে যে মার্জিতভাব নিয়ে আবির্ভূত হয় এবং গল্পের শেষের দিক পর্যন্ত বিচরণ করে, তাতে তার নাম জানবার কোনো প্রয়োজনই হয় না। যখন প্রয়োজন হয় তখন আর জানবার সুযোগ থাকে না, কারণ সম্ভবত সে মারা যায়। গোগলের আকাকিও গল্পের শেষের দিকে মারা যায়, তবে সে ভূত হয়ে পুনরাবির্ভূত হয় এবং প্রতিশোধ নিয়ে আবার উধাও হয়ে যায়। আকাকি একজন অভিলাষহীন কেরানি যার কাছে একটা নতুন ওভারকোট কেনার স্বপ্ন বড় কোনো সম্পদ অর্জনের সমান। গোলাম আব্বাসের গল্পের চরিত্রের উপস্থিতিতে করুণা উদ্রেক করবার মত কোনো বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় না। গোলাম আব্বাসের স্ত্রী সি জে আব্বাস গল্পটার যে ইংরেজি অনুবাদ করেছে তার অংশবিশেষের বাংলা রুপান্তর থেকে দেখা যাক সে উপস্থিতির বৈশিষ্ট্য।
জানুয়ারির এক সকালে, অত্যন্ত পরিপাটি এক যুবক ডেভিস রোড ধরে হেঁটে বিপণিবিতানে পৌঁছায়, তারপরে চেয়ারিঙ ক্রসের দিকে ঘোরে। তার চুল মসৃণ ও ঝকঝকে এবং তার জুলফি আছে। তার পাতলা গোঁফ দেখে মনে হয় তা পেন্সিল দিয়ে আঁকা। সে একটা বাদামী ওভারকোট পড়ে আছে, কোটের বোতামে একটা সাদাটে রঙের অর্ধউন্মুলিত গোলাপ গোঁজা, মাথায় একট সবুজ রঙের পশমী হ্যাট একদিকে কাত হয়ে আছে। গলায় একটা সাদা সিল্কের স্কার্ফ বাঁধা। তার এক হাত পকেটে, আরেক হাতে পালিশ করা একটা বেতের লাঠি। একটু পর পর সে লঘুচিত্তে লাঠিটায় এদিক ওদিক ঘোরায়।
...
তাকে এমন সৌখিন দেখায় যে এমনকি দূর থেকেও টাঙ্গাওয়ালারা তার দিকে আকৃষ্ট না হয়ে পারে না। ঘোড়া হাঁকিয়ে তারা তার কাছে যাবার জন্য ছোটে। সে তার লাঠি নাড়িয়ে ফিরিয়ে দেয়। একটা ট্যাক্সিও তার কাছে আসে এবং ট্যাক্সি ড্রাইভার তার দিকে জিজ্ঞাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। যুবক ট্যাক্সি ড্রাইভারকেও ফিরিয়ে দেয়। তবে লাঠি নাড়ার বদলে সে এবারে বলে, “নো থ্যাঙ্ক ইউ।”
...
যুবকটার ওভারকোটটা পুরানা কিন্তু খুব ভাল মানের কাপড় দিয়ে চমৎকারভাবে বানানো। সামনের দিকের কলার খাড়া আর হাতাগুলো চমৎকারভাবে ভাঁজ করা। বোতামগুলো বড় বড় ও চকচকে। যুবকটাকে দেখে মনে হয় সে ওভারকোটটা দিয়ে নিজেকে ঢাকতে পেরে খুবই খুশি।

একটা পান-সিগারেট বিক্রেতা বালক তার জিনিসপত্র ঝুলিয়ে যুবকটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।

“পানওয়ালা।”
“জি স্যার।”
তোমার কাছে দশ টাকা খুচরা হবে।
“না স্যার, তবে খুচরা করে এনে দিতে পারি।”
“আর যদি ফিরে না আসো?”
আমাকে বিশ্বাস না করলে আমার সাথে আসতে পারেন। যাকগে, কি কিনবেন?
“বাদ দাও ... এই যে এক আনা পাওয়া গেছে। এখন আমাকে একটা ভাল সিগারেট দিয়ে কেটে পড়।”
তার সিগারেট খাওয়া দেখে মনে হয় সে প্রত্যেক টানই উপভোগ করছে।

এ পর্যন্ত পড়ার পর কোনো পাঠকই এই যুবককে আকাকির মত কেরানির সাথে তুলনা করবে না। বরং যুবকটা যতই একটু একটু করে বিপণিবিতান প্রদক্ষিণ করে তত তার উপস্থিতি আরো কেতাদুরস্ত হয়ে ওঠে। সে একে একে সিনেমা, বিলাতি গানের দোকান, বইয়ের দোকান, কার্পেটের দোকান পরিদর্শন করে হাইকোর্ট পার হয়। কিন্তু কোনো মানুষের প্রতিই আকৃষ্ট হয় না। হঠাৎ সে এক প্রেমিক যুগলের গর্ভধারণ ও গর্ভপাতের গোপন পরিকল্পনার কথোপকথনে আকৃষ্ট হয়ে তাদেরকে অনুসরণ করতে শুরু করে। তারপরেই তার পরিচয় নির্ধারণী ঘটনাটা ঘটে। একটা ট্রাক তাকে ধাক্কা মেরে চলে যায়।
হাসপাতালে অপারেটিং কক্ষে, মুখোশের পিছন থেকে সহকারি সার্জন ও দুইজন নার্স একে একে তার পরিচয় উন্মোচন করে। ওভারকোটের নিচে কোনো জামা নাই, আছে একটা ছেঁড়া গেঞ্জি। বেল্টের বদলে প্যান্ট বাঁধা আছে পুরানা কাপড় দিয়ে। এমনকি জুতা পালিশ করা হলেও কোনো মোজা নাই। আর ওভারকোটের পকেটে পাওয়া যায় ছয় আনা ও কিছু খুচরা পয়সা।
এর বেশি যুবকটা সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। সে বেঁচে যায় না মারা যায় তাও জানা যায় না। এরকম রহস্যজনক পরিচয় উন্মোচনের পর পাঠকের মনে একাধিক প্রশ্নের উদয় হওয়া স্বাভাবিক। প্রথম প্রশ্ন হল, এরকম একজন কপর্দকশূন্য ব্যক্তি উপস্থিতি ও আচরণে এত আভিজাত্য অর্জন করে কি ভাবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হল, এরকম নামহীন-পরিচয়হীন ব্যক্তির কি এমন সামাজিক মর্যাদা আছে যে তা রক্ষা করবার জন্য নিজেকে এরকম আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে? জীবনযাপনের খুঁটিনাটি বিষয়ে সচেতন পাঠক আরো অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে।
অস্বীকার করার উপায় নাই যে গল্পটাতে অতিআত্রায় নাটকীয়তা আরোপ করা হয়েছে। যেভাবে গল্পটা বিকশিত হয়, যেভাবে এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে মসৃণ উত্তরণ ঘটে, এবং যেভাবে পরিণতি লাভ করে তাতে এটা ধারণা করা যেতে পারে যে এই নাটকীয়তা পরিকল্পিত। যে সমাজের কাঠামো পিরামিডের আকৃতি, অর্থাৎ যে সমাজে কিছুসংখ্যক লোক অধিকাংশ সম্পদের অধিকারী এবং যেখানে অধিকাংশ লোক সম্পদহীন, সেখানে ক্ষুদ্র মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবসময় বিলাসের ছদ্মবেশ ধারণ করতে বাধ্য হয়। সাধ্য না থাকলেও তার সামাজিক উপ¯িথতিকে মার্জিত করবার জন্য তাকে সবসময় সংগ্রাম করতে হয়। এর কারণ, এরকম সমাজে জীবনযাত্রার সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মান নির্ধারক কতিপয় উচ্চবিত্ত শ্রেণি; মধ্যবিত্ত শ্রেণি সেই মান অনুসরণ করে ভদ্রলোক হবার চেষ্টা করে। যদিও ওভারকোট গল্পের যুবক মধ্যবিত্ত শ্রেণির সদস্য নয় বলেই প্রতীয়মান হয়, তবুও এটা অনুমান করা যেতে পারে গোলাম আব্বাস এই চরিত্রের সৃষ্টি করেছে উপনিবেশোত্তর লাহোর সমাজের অনুকরণের ভণিতাকে তুলে ধরবার জন্য। সম্ভবত এই পর্যবেক্ষণ থেকেই একজন আলোচক ওভারকোটকে বর্ণনা করেছে “ভ্রান্তিজনক উপস্থিতির গল্প” হিসাবে।
“আনন্দী” গল্পে এই মধ্যবিত্ত সমাজের [সম্ভবত লাহোরের] ভণিতা উপ¯থাপন করা হয়েছে আরো উলঙ্গভাবে। গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯৪৮ সালে “আনন্দী” নামক গ্রন্থে। এই গল্প আবর্তিত হয় এক পতিতালয়ের উচ্ছেদ, ¯থানান্তর ও পুনর্বিকাশকে কেন্দ্র করে। কোনো সামাজিক বিজ্ঞানী গল্পটা পাঠ করে এরকম উপসংহার টানতে পারেন যে পাকিস্তানে নগর বিকাশের সাথে পতিতালয়ের বিকাশের একটা সহসম্পর্ক আছে। কৌতুকপ্রদ হলেও সেটা গোড়া ধার্মিকদের উস্কে দিবে। এটা আশ্চর্য হবার মত যে অর্ধশতক আগে গোলাম আব্বাস এরকম গল্প লিখতে পারত এবং ছাপতে পারত। এখনকার সময়ে হলে তাকে নিশ্চয় হুমকির সম্মুখীন হতে হত।
গল্পটার একটা অনবদ্য বৈশিষ্ট্য হল যে তা কোনো চরিত্রকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয় না। শ্যাম বেনেগাল এই গল্প থেকে “মান্ডি” নামে যে চলচ্চিত্র তৈরি করেছে, সেখানে অবশ্য মূর্ত চরিত্রের উপস্থিতি রয়েছে যে চরিত্রগুলি রূপায়ন করেছে শাবানা আজমি, স্মিতা পাতিল ও নাসিরউদ্দিন শাহ’র মত বিখ্যাত অভিনয় ব্যক্তিত্ব। গল্পটার সূচনা হয় এক পৌরসভার মিলনায়তনে যেখানে শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও নগরপাল একমতে উপনীত হয় যে শহরটার কেন্দ্র¯থলে অবস্থিত পতিতালয় শহরটার সামাজিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাচ্ছে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে পতিতালয়টা উচ্ছেদ করা হবে। কিন্তু কয়েকজন ধনাঢ্য পতিতা শহরের প্রভাবশালীদের অত্যন্ত অন্তরঙ্গ এবং সে কারণে কিছু সুবিধা আদায় করতে সক্ষম। এই প্রভাব বলয়ের কারণে পৌরসভা সিদ্ধান্ত নেয় যে ধনাঢ্য পতিতাদের জন্য শহরের উপকন্ঠে বাড়ি তৈরি করে দেয়া হবে। শহরের উপকন্ঠে নতুন পতিতালয় প্রতিষ্ঠিত হবার সাথে সাথে শুধু শহরের মানুষজনই তাতে আকৃষ্ট হয় না, শহরটাও বিকশিত হয়ে যুক্ত হয় সেই পতিতালয় পল্লীর সাথে। সুতরাং নগরপালকে আবার নতুন সিদ্ধান্ত নিতে হয়ে সেই পতিতালয় ¯থানান্তরের।
ওভারকোট গল্পের তুলনায় এই গল্পের প্রেক্ষাপট বৃহৎ হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের সব অঞ্চলেই এই গল্পের সাথে বাস্তবের তুলনা করবার মত ঘটনার সন্ধান মিলবে। আনন্দী মানে আনন্দনগর। বাবুরা এরকম আনন্দনগর পরিদর্শন করতে ভালবাসে, কিন্তু তার উপস্থিতি অনুমোদন করতে পারে না। প্রজন্ম প্রজন্ম ধরে এটাই সামাজিকভাবে অনুমোদিত আচরণ--নৈতিকতার আবরণে নৈতিকতাহীনতা। যদি পতিতালয় একটা শহরে সামাজিক অসুখ হিসাবে গণ্য হয়, তাহলে সেই শহরের কর্তৃপক্ষের যৌক্তিক পদক্ষেপ হবে শুধু সেই অসুখ সারানোই নয়, সেই অসুখ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তার বদলে শহর কর্তৃপক্ষ সেই অসুখ এক স্থান থেকে আরেক স্থানে স্থানান্তর করে।
যেহেতু গল্পে কোনো চরিত্র নাই সেহেতু এখানে কোনো আবেগ বা মনস্তাত্তিক বিশ্লেষণ নাই। গল্পটা পড়তে শুরু করলে মনে হয় কোনো না কোনো চরিত্র এখনই মূর্ত হতে যাচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয় না। চরিত্রের অনুপস্থিতির কারণে পাঠক প্রশ্ন করতে পারে যে এটা আদৌ গল্প না কোনো সামাজিক ইতিহাসের ব্যক্তিগত বর্ণনা। সন্দেহ নাই গোলাম আব্বাস এটাকে তার অন্যতম গল্প হিসাবে বিবেচনা করেছিল এবং সে কারণেই তার গ্রন্থের নামকরণ করেছিল এই গল্পের নামে।
উর্দু ছোট গল্পে গোলাম আব্বাস একটা স্বকীয় ও প্রভাবশালী ধরন তৈরি করেছে। শুধুমাত্র ওভারকোট ও আনন্দী দিয়ে তার এই স্বকীয়তা আঁচ করার চেষ্টা করাটা যুক্তিযুক্ত হবে না। তবে তার রচনায় এই দুই গল্পের বিশেষ স্থান রয়েছে। এই দুই গল্পে যে বাস্তবতা উপস্থাপন করা হয়েছে তা যে কোনো যুক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষে উপেক্ষা করা কঠিন। তবে পাকিস্তানের সমাজ গত পঞ্চাশ বছরে নেতিবাচক উপাদান যেভাবে শিকড় গেড়েছে তাতে গোলাম আব্বাসের গল্প কতখানি গ্রহণযোগ্য রয়েছে তা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

0 comments:

Post a Comment