July 24, 2008

সেলিম আল দীনঃ তাঁর নাটকের পথ ধরে

সেলিম আল দীনঃ তাঁর নাটকের পথ ধরে
ম আ ব সিদ্দিকী

হিমালয় থেকে যে নদীগুলো বয়ে আসে, তার গন্তব্য বঙ্গোপসাগর। স্বাধীনতার পর আমাদেরও গন্তব্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ। জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী এসব পরস্পর নির্ভরশীল সমম্বিত মতাদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ। ইতিহাসের এই বিষয়টি মৌলিক। আর সব আবর্জনা। অথচ আমরা নিরন্তর আবর্জনা ঘেঁটে চলেছি। এবং সাংস্কৃতিক বর্জ্যে হাত পা ছোঁড়ার নাম দিয়েছি সংস্কৃতি চর্চা। সেলিম আল দীন বাংলাদেশ-বাংলাদেশের জনগণ। এই দেশের ইতিহাস খুঁজেছেন নাটকে। নতুন নাট্যধারা গড়ে তোলা। মঞ্চের নানা ধরনের নিরীক্ষা করে বাংলাদেশের নাটককে উন্নত করতে চেয়েছেন। সেই সংগে মানুষদেরও। চেষ্টা করেছেন দেশীয় নাট্যমঞ্চ নির্মাণের। রবীন্দ্রনাথই উপনিবেশিক মঞ্চের বাইরে দেশীয় নাট্যমঞ্চ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। শম্ভূ মিত্র রবীন্দ্রনাথের রক্ত করবী, মুক্তধারা এবং নিজের লেখা চাঁদ বণিকের পালা মঞ্চায়ন করে দেশীয় আঙ্গিকে নাট্যমঞ্চ নির্মাণের চেষ্টা করেন। সেলিম আল দীনও লেবডেফ থেকে নাটকের শুরু তা মানেন নি। নাট্যচেতনায় উপনিবেশিক প্রাধান্য অস্বীকার করতে চেয়েছেন। এবং দেশের মাটিতে নাটককে প্রথিত করে ইতিহাসের মধ্য দিয়ে পল্লবিত করতে চেয়েছেন। তিনি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী সাহিত্য দর্শনে বিশ্বাসী। প্রাচীন গ্রীসে ডায়ানোসিয় রিচুয়াল থেকে নাটকের যাত্রা। উদ্দেশ্য ছিল দেবতার তুষ্টি এবং পার্থিব জীবনে শস্যের বৃদ্ধি। ভারতে নাটককে বলা হয়েছে পঞ্চম বেদ। বেদ মানে জ্ঞান। অর্থাৎ নাটক হল জ্ঞান। নীহারঞ্জন রায় দেখিয়েছেন প্রাচীন বাংলায় সপ্তম শতকে নাটক ছিল। তিনি বৌদ্ধ নাটকের কথা উল্লেখ করেছেন। দীনেশচন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গের গীতিকা সংগ্রহ করে লোক মানসের সৃষ্টিকে সাহিত্যের মর্যাদায় তুলে এনেছেন। এসবও নাটকের বিষয় হয়েছে। আমাদের নাট্য সাহিত্যেরও বিশিষ্টতা হচ্ছে যা একই সঙ্গে সংগীত, নৃত্য এবং নাটক। আবহমান কাল থেকে যা চলে এসেছে। প্রাচীন শাস্ত্রকাররা মনে করতেন নাটক হল দৃশ্যকাব্য। আধুনিক যুগে নাটক গণঅধিকার-গণমুক্তির ভাবাদর্শগত জমিন তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ইউরোপে ডিউক অফ সাক্সেমাইনেনজিন থেকে ধরা হয় ডিরেক্টর’স থিয়েটারের উদ্ভব। আদ্রেঁ আতোয়া, এমিল জোলা, মায়ারহল্ড, স্তানি¯া­াভস্কি তা এগিয়ে নিয়ে যায়। এ দেশে মাইকেল থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ আই, পি, টি, এ হয়ে গণনাট্যের একটি ধারা তৈরি হয়। বাংলানাটকের তাই আছে সুপ্রশস্ত ঐশ্বর্যময়ী ধারা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাই বলেছেন, ‘বাংলা নাট্যসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকারদের মধ্যে একজন সেলিম’। সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন, ‘বিশ্বনাট্য মঞ্চের এক নক্ষত্র’। আতিকুল হক চৌধুরী বলেছেন,‘তাঁর নাটক বিশ্বনাট্য সাহিত্যে স্থান পাবে’। সাহিত্য শিল্পের উদ্দেশ্যই হল মানুষের মুক্তির পথকে এগিয়ে নেয়া নিকোলাই অস্ত্রোভস্কি বলেছেন, ‘আমার সারা জীবন আমার সমস্ত শক্তি আমি এ বিশ্বের সব চাইতে সুন্দর উদ্দেশ্যের জন্য কাজ করেছি-মানব জাতির মুক্তি সংগ্রাম।’ সেলিম আল দীনের নাট্য চরিত্র এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। এবং একটি দর্শন তুলে ধরে যেমন ‘কেরামতমঙ্গল’। গ্যেটের আগমঁত এবং জন মিলটনের স্যামসন আগনস্টিন, রবীন্দ্রনাথের সুদর্শনা, গোর্কির সাতিন, যেমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়ে একটি সত্যতে পৌঁছায়। নাটক সামাজিক সংগ্রাম এবং শ্রম বিভাজনের ফল। এদেশের নাটক, এদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সেক্যুলার সংগ্রামের ফসল। বলা যায় সেক্যুলার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং নাটকের সংগ্রাম, একইসূত্রে গাঁথা। সেলিম আল দীনের নাটক এবং সর্বতোভাবে নাটকের জন্য এমনকি শিক্ষা সংস্কৃতির জন্য উপযুক্ত পরিবেশের পূর্ব শর্ত হল সেক্যুলার মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ।
রবীন্দ্রনাথের নন্দিনী মনুষ্যত্বের পক্ষে গণমুক্তির কথা গণঅধিকার গণশাসনের কথা বলেছে। সেলিমের করিম বাওয়ালী বলে,‘কে ? মহাজন? কি চাও-সব চাও?- ক্যান? তোমার দরকার আমার দরকার নাই? আমি খামু না? আমি বাঁচুম না? স্বাধীনতার পর এই না খাওয়া মানুষ। কারণ,একাত্তরে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্তভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী ক্ষমতায় গেছে কিন্তু গণঅধিকার পদদলিত করে সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে শোষণ লুণ্ঠন চাপিয়ে দিয়েছে জনগণের বুকে। তাই করিম বাওয়ালী না খেয়ে থাকে। ‘কিত্তনখোলা’র সংলাপÑছায়াÑবনমালী, বনমালী তুমি আমাকে ভালবাস। বনমালী হাঁ, রবিদাকে, হাঁ তাকেও ভালবাসি।’ সহজ সরল যাত্রাভিনেত্রীদের তিনি এনেছেন। যারা নিষ্পেষিত। তাঁর নাটক মহাকাব্যিক। মহাকাব্যে দোষগুণ নিয়ে মানুষ। হেক্টরকে বধ করল আকিলিস। হত্যা করে রথে চুল বেঁধে ট্রয় ঘোরান হল। আবার হেক্টরের পিতা প্রায়াম যখন ছেলের লাশ চায়, তখন শ্রদ্ধাবনত হয়ে তাকে দিয়ে দেন আকিলিস। আবার আকিলিস যখন সবকিছু ধ্বংস করছে, তখন আফ্রোদিতি রূপালি তীর ছুঁড়ে মারে প্যারিস এবং নিহত হয়। অর্থ্যাৎ একটি দর্শন। সবকিছুর সীমা আছে। মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি। ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ মুনতাসির উপরিস্তরের মানুষ গোয়ের্নিকা থেকে সাবান এমনকি ব্রেসিয়ার পর্যন্ত খেতে চায়। আবার আছে উপকুলবর্তী মানুষ, রূপোপজীবী চুক্কীনী। পুঁজিবাদ শুধু মানুষের ভাত কেড়ে নেয়, তা নয় মুনষত্বও কেড়ে নেয়। তাই সমাজতন্ত্র প্রয়োজন। নাটক তাই মনুষ্যত্বের, অধিকারের ভাষা তুলে ধরে। নাটক মানুষের সাহসের কণ্ঠ। সেলিম আল দীনের নাটকে এ সব আছে। সেলিম আল দীনের প্রকৃত নাম মঈনুদ্দীন। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগষ্ট ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশুনা নিজ গ্রামের স্কুলে শুরু করেন। খাদ্য কর্মকর্তা বাবার চাকরির কারণে কুড়িগ্রামে আসেন। কুড়িগ্রামের উলিপুর মহারানী স্বর্ণময়ী স্কুলে আবার ভর্তি হন। তারপর ফেনী কলেজে। ১৯৬৭ সালে বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন। পড়ায় আকস্মিক ছেদ করোটিয়া সাদাত কলেজ থেকে স্নাতক হন। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। এম, এ পাশের পর বিটপিতে [বিজ্ঞাপনি সংস্থা] কপি রাইটার পদে চাকুরি নেন। ১৯৭৪ সালে মুস্তাফা নূরউল ইসলামের হাত ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮৭ সালে নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগ নিজ চেষ্টায় খোলেন এবং বিভাগের দায়িত্ব নেন। নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বলেছেন, সেলিম এই বাংলায় জন্ম নেয়া এক বিশ্বপ্রতিভা। এক’শ বছরে একজন সেলিম আসে’। সেলিম প্রথমে শুরু করেন কবিতা। কবি রফিক আজাদের পরামর্শে শুরু করেন নাটক লেখা। ডাকসু’র নাট্য বিভাগ নাটক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ১৯৭২ সালে। এই প্রতিযোগিতার জন্য সেলিম আল দীন লেখেন ‘এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা’। তাঁর দ্বিতীয় নাটক করিম বাওয়ালীর শত্র“ অথবা মূল মুখ দেখা। তারপর জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন।’ ১৯৭৩ সালের ২৯ জুলাই ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। যাত্রা শুরু হয় সেলিম আল দীনের নাটক ‘সংবাদ কার্টুন’ এর মধ্য দিয়ে। নির্দেশনা নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। এসব নাটকের নামে ও বিষয়ে অ্যাবসার্ড নাটকের প্রভাব পড়েছিল। সহজে অনেকেই এসব গ্রহণ করেনি। বলেছেন নাট্যাঙ্গনে ইয়ার্কি ফাজলামী। কালো হাতের কারসাজি। কিন্তু সেলিম থামেননি তিনি মনে করতেন আমাদের নাটকের দর্শক আমাদের সৃষ্টি করতে হবে। সংবাদ কার্টুন নাটকে দেখা যায় সিগারেটের দাম বাড়ছে। বাজার মূল্যের অনিশ্চয়তা। মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ অবক্ষয় সেলিম অনেক পরে সাধারণ মানুষের কুসংস্কার সাপ কাটলে ওঝা দিয়ে বিষনাশের ধারণা বাতিল করে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আনার চেষ্টা করেছেন ‘প্রাচ্য’নাটকে। ‘শকুন্তলা’ নাটকে ধ্র“পদী ধারা এনেছেন। বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘ভীরুতা পাপ’। তিনি এ-ও বলেছেন ভালত্বের শক্তির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখার কথা। বড় কাজে লাগে সাহস এবং দৃঢ়তা। ১৯৮১তে লেখেন ‘কিত্তনখোলা’। তাঁর নাটক মাটিতে হাত রাখে। পীরের মাজারকে কেন্দ্র করে মেলা। মঞ্চে এই মেলাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এই নাটক। তিনি চার হাজার পৃষ্ঠা লিখেছিলেন। পরে তা কাটছাঁট করে তিনশত পৃষ্ঠায় দাঁড়ায়। এই নাটকে নানা চরিত্র। যাত্রা দল আসে। যাত্রার অভিনেতা, অভিনেত্রী। বনমালী, রবি, ছায়া। তাদের ভালবাসা, আত্মহনন। এক মহাকাব্য। তিনি সেক্যুলার একটি দৃষ্টিভঙ্গী এই নাটকে এনেছেন। মাজারকে মেলায় রূপান্তর একটি সেক্যুলার পদক্ষেপ। পাশাপাশি মঞ্চের নতুন মাত্রা। ‘শকুন্তলা’ নাটকে বনের মধ্যে শকুন্তলার রক্তস্রাব হচ্ছে, তার শরীর থেকে বের হচ্ছে কাঁঠালীচাপার গন্ধ। এভাবে প্রকৃতি ও মানবীর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। সেলিম আল দীনের গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো হল-কীত্তনখোলা, হাতহদাই, চাকা, কেরামতমঙ্গল, হরগজ, যৈবতী কন্যার মন, বনপাংশুল, প্রাচ্য- সর্বশেষ নিমজ্জন। উল্লেখযোগ্য টি,ভি নাটক, আতিকুল হক চৌধুরী প্রযোজিত ঘুম নেই, অশ্র“ত গান্ধার, হলুদ পাতার গান, মশারি তেহাত্তর ,শ্যামলছায়া, নীল নীল যন্ত্রণা। ‘রক্তের আঙ্গুর লতা’ টিভি নাটকটি মাইলস্টোন।
সেলিম তাঁর মঞ্চ নাটকে বাংলাদেশকে ধরতে চেয়েছেন। বাংলার খাল, বিল, ঝিল, পুকুর, মাছ, বটের গাছ, মাঝি, পোকামাকড়, নৌকা, পীর, মুরিদ, কৃষক, নদী, পাখি সবকিছু। নাটককে কলা হিশেবে দেখেছেন। তাই তাঁর নাটকে কবিতা, ভাস্কর্য, সঙ্গীত, মেলা, গল্প সব কিছুর সংমিশ্রণ। ‘চাকা’ নাটকে দেখা যায় একটি লাশ গরুর গাড়িতে ঘুরছে। গ্রামের পর গ্রাম। কিন্তু কেউই শনাক্ত করতে পারছে না। অর্থাৎ নৈব্যর্ক্তিক লাশ। যে কেঊ হতে পারে। মানবিক আবেদনময় নাটক। পুঁজিবাদী সমাজে যে নৈরাজ্য থাকে। সন্ত্রাস, হত্যা, খুন, উন্মাদনা, অজ্ঞতা, পাশবিকতাÑএসব বিশিষ্টতা নিয়ে অবস্থান করে মানুষকে আতঙ্কিত করে রাখে, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা স্থায়ী করে রাখে যা তিনি দৃশ্যমান করেছেন, তাঁর নাটকে। ‘প্রাচ্য’ নাটকে সাপকে এনেছেন, সাপে বিষ আছে, ছোবল হানে কিন্তু তিনি সাপকে ক্ষমা করার এক মহান দৃষ্টিভঙ্গী এনেছেন এই নাটকে। ভলতেয়ারের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছেন ‘যাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন তাদের যেন সহ্য করি।’ ক্ষমাশীলতা মানবিকতারই অংশ। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীতে এই নাটকটি রচিত। ‘বনপাংশুল’ মান্দাইদের নিয়ে রচিত। ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা এই মান্দাই সংস্কৃতির বিশিষ্টতা এখানে এসেছে। সেলিমের উল্লেখযোগ্য একটি নাটক ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’। এই নাটকে, মুনতাসির আসলে একজন বুর্জোয়া মানসিকতার প্রতিনিধি। সে সবকিছু কুক্ষিগত করতে ইচ্ছুক। পুঁজিবাদি সমাজে ব্যক্তি সম্পত্তির প্রকাশ হিশেবে লোভ লালসা, সব কিছুকে গ্রাস করবার লোভ কোন্ মাত্রায় হতে পারে তাই তিনি তুলে এনেছেন। এর মধ্যে দিয়ে ব্যক্ত করেছেন এসব লোভী মানুষদের। রামনারায়ণের ‘কুলীন কুল সর্বস্ব’ থেকে যে আধুনিক নাটকের যাত্রা ধরা হয়। তারপর মাইকেল, দীনবন্ধু মিত্র। মাইকেলের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ। দীনবন্ধুর ‘সধবার একাদশী’, নীল দর্পণ। এসব নাটক সমকালীন সমাজের উচ্চ শ্রেণীর গণবিরোধী মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ তুলসি লাহিড়ীর ‘ছেড়াঁ তার’। সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের জীবন এবং সমস্যার স্বরূপ তুলে ধরেছে। বাদল সরকারের ‘ভোমা’, উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’-এ এসব মানুষের কথা আছে। সেলিম আল দীন এর ‘হরগজ’ নাটকে টর্নেডো আক্রান্ত একটি গ্রামের জীবন ছবি তুলে ধরা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, জীবনের যা অভাব তাই পূরণ করে সাহিত্য।’ তিনি এ-ও বলেছেন, ‘ভুল করবার অধিকার যার নাই। সত্য আবিষ্কারের অধিকার সে পায় নাই।’ সেলিম আল দীন বলতেন, ‘শিল্পীর হাজার চোখ।’ মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি। কপোতাক্ষ পারের মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের পথিকৃৎ। মনে করতেন ‘মহাভারত’ ‘রামায়ণ’ ট্রাজেডি। যথার্থই, কারণ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবরা জিতলেও রাজ্য শাসন তারা করতে পারেনি। রামায়ণের শেষে সীতা মাটি বিদীর্ণ হলে নিচে চলে যান। পরে স্বর্ণরথে তিনি উপরে উঠে যান। প্রাচীন গ্রীক নাটকের প্রতি টান ছিল তাঁর।
সোফোক্লিস ‘ওডিপাস’-এ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তাঁর আত্মদহন অনুশোচনা। তাঁর ‘আন্টিগোনি’ নাটকে আন্টিগোনি ভাইয়ের সৎকার করতে চায়। ক্রিয়ন তাকে ভয় দেখায় কিন্তু তাঁর আদর্শ থেকে সরে আসে না। ন্যায়ের পক্ষে আন্টিগোনি। ঈসকাইলাসের প্রমিথিউস, অরেস্টিস ও সত্যের পক্ষে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, শত ভীতি, নিযার্তন সহ্য করেও। প্রাচীন ধ্রুপদী নাটক আবার বাংলার লোকমানস সব কিছুই বিমুগ্ধভাবে জেনেছেন। তাই তিনি নাটককে মহাকাব্যিকভাবে ভাবতে পেরেছেন। শম্ভু মিত্রের ‘চাঁদ বণিকের পালা, ‘উলুখাগড়া’ কিংবা উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’‘কল্লোল’ ‘দিল্লী চলো’। এসব নাটকে নির্যাতিত মানুষের কাহিনী রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে উপস্থিত। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতিফলন আছে। বাদল সরকারের ‘ভোমা’ নাটকে দেখা যায় ভোমার খিদে পায়। শাদা ভাত তার কাছে জুঁই ফুলের মত মনে হয়। সেলিম আল দীন তাঁর ‘বাসন’ নাটকে রাজনৈতিক বিষয় এনেছেন। রুশো বলেছেন, ‘প্রকৃতির ভূমিতে রাজা এবং ভিখারী সমান’। আসলে গণতন্ত্রের মূল কথা সাম্য। সকল মানুষের সমান অধিকার। আবার মানুষ সার্বভৌম। পৃথিবীর সবকিছুই মানুষের প্রয়োজনে, মনুষ্যত্বের স্বার্থে নিয়োজিত থাকবে অর্থাৎ সেক্যুলার। গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম পরস্পর নির্ভরশীল মতাদর্শ। অথচ আমাদের রাষ্ট্র নির্বিকার গণবিরোধী এবং মনুষ্যত্ববিরোধী। সেলিম আল দীনের নামটির সাথে নাসিরউদ্দীন ইউসুফের নামটি যুক্ত। যেমন আধুনিক বিশ্বনাট্য ইতিহাসে ব্রেশটের সাথে পিসকাটরের নাম যুক্ত। তাঁদের সর্বোচ্চ সমঝোতার ভিত্তিতে ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় নাট্য ফসলের মোহনা সৃষ্টি হয়েছে। সেলিম আল দিনের নাটক যৌথ সৃষ্টি। সর্বোচ্চ সত্যের ভিত্তিতে ক্রিয়া এবং পুঁজিবাদী বাস্তবতার মধ্যে অদৃশ্যভাবে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা আছে। এটা আমাদের উপলব্ধির সময় এসেছে। সেলিমের আরেকটি নাটকের নাম ‘হরগজ’। হরগজ একটি গ্রাম, টর্নেডো বিধ্বস্ত। একজন আধা পাগল মানুষ, সংগে আধা ভরা বস্তা। এই লোকটি গরু মহিষের হাড় কুড়ায়। দুই জন ত্রাণকর্মী তার দিকে ছুটে আসে চোর ধরার আনন্দে উত্তেজিত। লোকটি দীর্ঘ শাদা একটি হাড় উপড়ে তুলে ধরে। ত্রাণকর্মীরা তার হাত ধরে। কিন্তু লোকটি তাদের উদ্দেশ্যে লুঙ্গি তুলে শিশ্ন দেখায়। এবং সে বলে ‘শালার পুতরা এইটা লইয়া যা’। তাঁর ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকের সংলাপ কেরামত-কিয়ের পাপ। এই জামা হিঁড়লাম। এই লুঙ্গি খুলি, বাতাসে উড়াই-আমার লিঙ্গ দেখুক মানষের-পাপ নাই। বায়েজিদ বোস্তামী হুজুর হাজার মানুষের সামনে নাংটা অয় নাই?
আজমত- চুপ কর কেরামত
কেরামত- পাপ মানি না আমি লুঙ্গি খুলুম।

এর সাথে তিনি যিশুকে অত্যাচার করে যে তার কাপড় খুলে নেয়া হয়ে ছিল, তার প্রসঙ্গে আনেন নাটকে। তিনি অ্যাবসার্ড নাটক দিয়ে শুরু করেছিলেন, সেখানে সীমাবদ্ধ থাকলে, তিনি হয়ত হারিয়ে যেতেন কিন্তু তিনি গণমানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গণতান্ত্রিক-সেক্যুলার-দেশাত্মবোধের আদর্শে। তিনি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হান, আহম্দ শরীফ, হাসান হাফিজুর রহমান,আলমগির কবীর- এর উত্তরসূরি। এঁরা সবাই এদেশের গণসংগ্রামের ফল। তাঁর ‘বাসন’ নাটকে একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যা ঐতিহাসিক। হাজি শরিয়তুল্লাহর এক দরিদ্র বর্র্গাচাষী উত্তরাধিকারের বাড়িতে একটি বাসন ছিল। এই বাসন সংগ্রামের অহংকারের এমনকি মর্যাদারও প্রতিক। দরিদ্র পরিবারটি তা রক্ষার চেষ্টা করে আসছে। শত দারিদ্রের মধ্যেও তা নষ্ট করেনি। হঠাৎ একদিন এক ক্ষমতাধর ধন লিপ্সু গণপ্রতিনিধি এই বাসনের কথা জানতে পারে। এবং তা হস্তগত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। গ্রামবাসী দরিদ্র পরিবারটির পক্ষে দাঁড়ায়। একটি গণ সংগ্রামের ছবি আছে এই নাটকে। তাঁর সর্বশেষ নাটক ‘নিমজ্জন’। যখন এই নাটক চলছিল তখন তিনি প্রয়াত[১৪ জানুয়ারি ২০০৮] হন। এই নাটকের মূলকথা হল গণহত্যা। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তাদের স্বার্থে যে গণহত্যা চালিয়ে সভ্যতা ধ্বংস করে। তাই এসেছে এই নাটকে। সেলিমের প্রয়াণ কি একটি হত্যা নয়! পুঁজিবাদের অদৃশ্য হাতের হত্যা। হাজার হাজার বছর ধরে যে গণহত্যা চলছে তার বিবরণ এই নাটকে তুলে এনেছেন। এখনও যে বসনিয়া, কান্দাহার, আহমেদাবাদ,যে গণহত্যা মানুষ হত্যা, মানুষ হত্যা, এ সব বিষয়ই এই ‘নিমজ্জন’ নাটকের বিষয়। এই হত্যার বিরুদ্ধে মানবিকতা ও শান্তির বাণী তুলে ধরেছেন। তাঁর নাটকে দেশাত্মবোধ, মানবিকতা, সেক্যুলার মতাদর্শের জয়গান গেয়েছেন। এক মানবিক পৃথিবীর প্রতিশ্র“তি, মনুষ্যত্বের অঙ্গীকার আছে তাঁর নাটকে। চার্লি চ্যাপলিনের ‘সিটি লাইটস’ এ দেখা যায় এক অন্ধ মেয়ে ফুল বিক্রি করে তাকে এক যুবক ভালবেসে ফেলে। মেয়েটিকে চিকিৎসা করে দৃষ্টি দান করে। কিন্তু মেয়েটিতো ছেলেটিকে চেনে না। ছেলেটি মেয়েটিকে চেনে কিন্তু পরিচয় দেয় না। কারণ, ছেলেটি প্রতারিত হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে অন্য জায়গায় চলে গিয়ে ছিল। একদিন ছেলেটি নিজ শহরে ফিরে আসে এবং মেয়েটিকে নিজের পরিচয় দেয়। দুইজনই প্রতিশ্র“তিবদ্ধ হয়, যে শহর মানুষকে প্রতারিত করে অসম্মান করে সেখানে তারা থাকবে না।
অবশেষে এরা দুইজন প্রতিশ্র“ত মানবিক পৃথিবীর দিকে পা বাড়ায়। পুঁজিবাদ যে পৃথিবীকে কলুষিত করেছে সেখানে নয়। যে পৃথিবীতে মানুষ মনুষ্যত্বের পরিচয়ে বাঁচে। সেলিম আল দীনের নাটকে এই প্রতিশ্র“তি আছে। বর্তমান যে সমাজ তা যথার্থ অর্থেই মানুষের বাসযোগ্য নয়।
পুঁজিবাদ বাজার মুনাফা নির্ভর। মানুষের স্থান কোথায়? এক মানবিক সমাজের শোষণ মুক্ত, সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক সমাজের আহ্বান আছে তাঁর নাটকে। এর জন্য আমাদের প্রয়োজন হবে শিক্ষা সংস্কৃতি নাটকে, দীর্ঘ গণসংগ্রাম, প্রয়োজন হবে রেনেশাঁর। তারপর হয়ত আমরা প্রেমেন্দ্র মিত্রের মত বলতে পারব-

কত বৃষ্টি হয়ে গেছে
কত ঝড়-অন্ধকার, মেঘ
আকাশ কি তা মনে রাখে!
আমারও হৃদয় তাই
সবকিছু ভুলে গিয়ে
হ’ল আজ সুনীল উৎসব।

সেলিম আল দীনের নাটক চর্চার মাধ্যমে, তাঁর নাটকের ধারাবাহিকতায়, আমরা যেতে পারি, আমাদের গন্তব্যে। শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশে, যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মৌল দর্শন ছিল।

0 comments:

Post a Comment