July 24, 2008

ছায়া শরীর

ছায়া শরীর
শ্যামল ভট্টাচার্য্য



তিনটে অস্পষ্ট ছায়া অন্ধকারের সঙ্গে মিশে আছে। আসছে না যাচ্ছে বোঝা যাচ্ছে না। ওদের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাবে নাকি পিছু পিছু অনুসরণ করবে? কারা ওরা? ওদের উদ্দেশ্যই বা কি? উদ্দেশ্য না বুঝে পিছু পিছু যাওয়া কি ঠিক হবে? ওরা কেউ কথা বলছে না। অমাবস্যার এই ঘুটঘুট্টি অন্ধকারে সজোরে চোখ চালিয়েও বোঝা যাচ্ছে না ওরা ঠিক কত দূরে আছে। সরকারী পাকা রাস্তা হয়েছে এখন। সে রাস্তায় না গিয়ে আলপথ ধরেছে কেন ওরা? এই পথ তো ওদের গ্রামে ঢুকেছে। অবশ্য ডানে কেটে গেলে ছোট জাল্লাদপুরে ঢোকা যায়। ওরা ঠিক কোন গ্রামে যেতে চাচ্ছে সেটা একটু বুঝে নেয়া দরকার।
অন্য একটা ভাবনাও মোঃ খাদেম আলী সাকিদারের মাথায় ঢুকে পড়ল এ সময়। লোকের কাছে বলার সময় পুরো নামটাই বলে সে। কেবল খাদেম আলী বললে অনেকে আবার ভেবে বসে চাষাভূষা মানুষের ছেলে। পুরো নামটাও অবশ্য ততটা যুৎসই হয় না। বলতেই হয় নিরুপায় হয়ে। দাদাজান কি ভেবে যে এই পুরোনো ঢংয়ের নামটা পছন্দ করেছিলেন। কত সুন্দর সুন্দর আধুনিক নাম থাকে আজকাল। আহমেদ জুলফিকার হায়দার, মারুফ হাসান, মীর্জা আল মনসুর, সোহেল ইকবাল, জাহিদ আনোয়ার আরও কত। একজন কবির নাম তো রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ। শুনতে ভালই লাগে। বেশ একটা খানদানী ঝঙ্কার আছে এসব শব্দে। তা নয়, একটা বস্তাপচা সেকেলে নাম জুটেছে তার কপালে। এ নিয়ে খাদেম খুব মনোকষ্টে আছে। ক্লাস নাইনে নাম রেজিস্ট্রেশনের সময় নামটা বদলে নেওয়ার একটা সুযোগ ছিল কিন্তু একটা ফ্যাকরা দাঁড়িয়ে গেল। ক্লাস এইটের মাধ্যমিক বৃত্তির টাকা আসে খাদেম আলী নামে। বৃত্তি ক্লাস টেনের পুরো বছর পাবে। তাই নাম বদলানো যায় নি। এস.এস.সি. পরীক্ষাতেও একটা বৃত্তি পেয়ে গেছে খাদেম। ফলে নামটা বদলে ফেলার সুযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ওর ঘাড় থেকে অপছন্দের নামটাকে আর নামানো যায় নি।
সে যাই হোক, যে ভাবনাটা খাদেম আলীর মাথায় ঘুরছিল সেটা ভাবার চেষ্টা করে খাদেম। এখন কি একটু থামা উচিত? ওদের মাঝখানের দূরত্বটা বাড়লে না হয় আস্তে আস্তে এগোতে চেষ্টা করা যাবে। ওরা কারা হতে পারে সেটা ভেবে দেখার চেষ্টা করল। ডাকাতের দল না সন্ত্রাসী? আজকাল তো কাগজে কত রকম খবর দেখা যায়। অস্ত্র, ড্রাগ, নারী-শিশু পাচারকারী, গোপন রাজনীতির দল সারা দেশ ছেয়ে ফেলেছে। খাদেমের একটু ভয় ভয়ই করতে শুরু করল। সাবধান হওয়া ভাল। ওদের খপ্পরে পড়া চলবে না। ওদের উদ্দেশ্য সুবিধের নয় বলেই মনে হচ্ছে। না হলে এই অন্ধকারে মাঠের পথ ধরেছে কেন?
খাদেম মনে মনে হাসে। সে নিজেও তো একই কাজ করছে। ওদের তাহলে দোষ দিচ্ছে কেন? আর একটু আগে শহর থেকে রওনা হতে না পারার জন্যে ওর এখন আফশোস হচ্ছে। ওর নিজের কোন দোষ নেই এতে। ট্যুইশনি বাড়ির ভদ্রমহিলা বেড়াতে গিয়েছিলেন। অনেক দেরিতে ফিরে মাসের টাকাটা দিলেন। তাই বাচ্চাটাকে পড়াতে হলো দু’ঘণ্টার জায়গায় চার ঘণ্টা।
দু-এক ঘণ্টার জন্যে অবশ্য ওর বিশেষ আপত্তি ছিল না। আসলে আরও অন্তত ঘণ্টাখানেক আগে বেরিয়ে পরা উচিত ছিল। এতক্ষণ বাড়ি পৌঁছে যেত। শহর থেকে মধুপুরের গঞ্জ পর্যন্ত বাসেই আসতে পারত।
কয়টা টাকা বাঁচাতে ষোল কিলোমিটার পথ হেঁটেই এসেছে। বাঁকি পাঁচ কিলোমিটার ভটভটি কিংবা ভ্যানগাড়িতে না এসে সর্টকাট করার জন্যে জমিতে নেমে আলপথ ধরেছে। বেশ রাত হয়ে গেল। বাপজান হয়ত চিন্তা করছে।
এ সময় বাড়িতে টাকার খুব দরকার। বাপজানকে খবর পাঠিয়েছে আগামীকাল জমি চাষ হবে। না হলে বীজ বুনতে দেরি হয়ে যাবে। বিঘা তিনেক জমি খাদেম নিজেই চাষ করে পাওয়ার টিলার চালিয়ে। যন্ত্রের ভাড়া আর পানির খরচের জন্যে ট্যুইশনির টাকাগুলো তাই আজই উঠিয়ে এনেছে। ওদের হাল-গরু নেই। এ টাকাটা ঐ কাজে খরচ করতে হয়। ইস্কুলে যখন পড়তো, পাশের গ্রামের সহপাঠী সানুর বাপের জমিতে যন্ত্রটা নিয়ে ঠেলাঠেলি করতে করতে একসময় দু’জনেই যন্ত্রটা চালাতে শিখে ফেলে। হাল চাষের জন্যে কামলা নিলে বেশ কিছু টাকা খরচ হয়। নিজে যখন চাষতে পারে, নিজেদের জমিতে নিজ হাতে চাষ করলে ক্ষতি কি?
কিন্তু খাদেমের বাপজান বলেনঃ তুমি কলেজে পড়, ক্ষেতে পানি আর কাদার মধ্যে টিলার চালালে লোকে কি বলে বাপজান? তুমি এসব করো না।
খাদেম মনে মনে হাসে। বাপজানকে অনেক বুঝিয়েছে কিন্তু তিনি সেই আগের দিনের ধারণা আঁকড়ে বসে আছেন। গ্রামের বয়স্কদের সকলেরই একই মনোভাব লক্ষ্য করেছে খাদেম। মুখ ফুটে কেউ কিছু বলে না বটে, খাদেম শুনেছে ওর মায়ের কাছ থেকে। বাপজানকে নাকি দু’একজন মাতব্বর শ্রেণীর মানুষ বলেছে, ছেলেকে দিয়ে জমিতে হাল দাও, ছেলের বিয়াসাদী দিতে হবে না? তখন বউ খুঁজে পাবা না।
মা ওকে আদর করে বলেনঃ গেরামের মানুষ যখন নানা কথা কয় তুই এসব আর করিস না বাপজান।
খাদেম মাকে খুব বুঝাতে চেষ্টা করে এসব কোন খারাপ কাজ না। কোন কাজই নিচু হয় না। মা একেবারে বেবুঝ। অনেকদিন ধরে মাকে ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছে, আমরা তো চাষী পরিবার। আমার বাবা-দাদা সকলেই চাষী। আগে ক্ষেতমজুর ছিল, এখন না হয় সামান্য জমি হয়েছে। আজকাল চাষ করাকে কেউ ছোট কাজ বলে ভাবে না। কোন কাজ ছোট নয়। যারা ভাবে ভাবুক গে। ওসবে কান দিয়ে বসে থাকলে যাদের চলে চলুক, আমাদের চলবে না। নিজের জমিতে খেটে খাই সেটা তো আমার বুক ফুলিয়ে জানিয়ে দেওয়া উচিৎ। এরপর সত্যিমিথ্যা মিলিয়ে উদাহরণ দিয়েছে কোন্ দেশের প্রেসিডেন্ট মুচির ছেলে, কোন্ দেশের প্রধানমন্ত্রী লেখাপড়াই জানে না ইত্যাদি।
মা বলেনঃ আমি এতকিছু জানি না বাবা। যে দেশের যে রীতি। গাঁয়ের মানুষদের এসব কথা বললে বুঝবে?
খাদেম হাসে, উত্তর দেয় না। জানে, রক্তের ভেতরের যে সংস্কার যুগযুগান্ত ধরে বাসা বেঁধে আছে মনের ঝোপেঝাড়ে, তাকে অল্প কথায় মন থেকে হটানো সোজা না। যখন ছোট ছিল, ওদের দুঃখ-দুর্দশার দিকে কেউ ফিরে তাকায় নি। বাপজান পরের জমিতে জন খেটে সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন যখন, তখন,কেউ গার্জেনি করতে আসে নি। ইদানীং অনেকেই গায়ে পড়ে উপদেশ দেয়। খাদেমের বুঝতে অসুবিধা হয় না এসবের উদ্দেশ্য কি। একেবারে অজ পাড়াগাঁ থেকে বোর্ডে প্রথম কুড়িজনের মধ্যে নিজের জায়গা করে নিয়ে কলেজে পড়তে গিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকেও প্রায় একই রেজাল্ট করে বৃত্তিটিত্তি পেয়ে ইংরেজিতে অনার্স পড়তে পারার যোগ্যতা সাধারণ মেধার ছাত্রের পক্ষে যে সম্ভব নয়, গ্রামের প্রায় নিরক্ষর মানুষগুলোও আজকাল খানিকটা বোঝে।
অনার্সের পড়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আর বছর দেড়েক চালাতে পারলে এম.এ. হয়ে যাবে। ওর মনে বিশ্বাস এসেছে এখন পর্যন্ত যে ধারাবাহিক স্টেডি রেজাল্ট ও করতে পেরেছে, তাতে ফার্স্ট ক্লাস না পেলেও আপার সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে যাবেই। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারলে ফল আরও ভাল করা যেত সে বিষয়ে ওর কোন সন্দেহ ছিল না। শুধু টাকার অভাবে হল না। কি আর করা যাবে, এ দেশে যোগ্যতা থাকলেই সবার সবকিছু হয় না, ভাগ্যবান আর সুবিধাভোগীদের হয়।
বাপজান সেদিন অল্প বিদ্যাবুদ্ধি নিয়েও বলেছিলেনঃ তুমি ওখানেই পড়তে যাও বাপজান। অল্পস্বল্প জমিজমা যা আছে বেছে টাকা দিব। মনের মধ্যে দুঃখ নিয়ে ভাল পড়াশোনা হয় না বাপজান।
এই অল্পশিক্ষিত, উদোম-গা, নিরীহ, শীর্ণ, গ্রাম্য মানুষটার কণ্ঠস্বরে এমন কুণ্ঠাহীন ব্যগ্রতা ছিল যে খাদেমের মুখের কথা কিছুক্ষণের জন্যে হারিয়ে গেল। খাদেম বাস্তববাদী মানুষ। তবুও ওর গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে ওকে দারুণভাবে আবেগতাড়িত করে ফেললো। কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, আপনাদের খাওয়া পরা চলবে কেমন করে বাপজান?
‘সে একরকম করে চলবে। তুমি চিন্তা করো না। ফকির সাহেব চালায় নিবেন।’
এই ফকির সাহেবের বিষয়টা খাদেম জানে। ওর বাস্তববাদী মন মুখে কথা জুটিয়ে দিল, না বাপজান, রোশনার পড়াশোনার খরচ আছে, সংসার খরচ আছে, আপনাদের খাওয়া পরার খরচ আছে। সব জমি বিক্রি করে দিলে চলবে কিভাবে?
বাপজান তৎক্ষণাৎ বললেন, চলবে চলবে। এই ভিটা আছে, এখানে পড়ে থাকব। জমিতে কামলা খেটে আমাদের দিন কোনরকমে চলে যাবে। দিন পড়ে থাকে না বাপজান। এক রকম করে চলেই য়ায়। রোশনার আর পড়াশোনা করে কাজ নাই। গ্রামদেশে মেয়ে মানুষের এর বেশি দরকার হয় না। ওর বিয়াসাদী দিব, তুমি কি কও? ... সমর্থনের জন্যে খাদেমের মায়ের মুখের দিকে তাকান।
মা হ্যাঁ-ও বলেন না, না-ও বলেন না।
খাদেমের বাপজান ভেতরে ভেতরে একটু দমে যান। অসহায় ভাবে এদিক-ওদিক তাকাতে থাকেন।
খাদেম বলে ওঠে, বলেন কি বাপজান? রোশনা পড়াশোনায় এত ভাল, প্রত্যেক বছর প্রথম হয় ক্লাসে। ফাইবে বৃত্তি পেয়েছে, এইটেও পাবে। ওর পড়া বন্ধ হয়ে যাবে? না বাপজান, ওকে অনেক পড়তে হবে। তাছাড়া ওর বিয়ের বয়সই তো হয় নি। বাইশ-চব্বিশের আগে লেখাপড়া জানা মেয়েরা আজকাল বিয়েসাদী করে না। ডাক্তারাও নিষেধ করে। স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়। আরও অনেক কিছু হয়। পথের ধারে সরকারি বোর্ডে লেখা থাকে দেখেন নি?
বাপজান বলেন, সবই তো বুঝি বাপজান, কিন্তু সংসারের বিপদের সময় চুপ করে তো বসে থাকা চলে না। তুমি আমার একটাই ছেলে। তোমার জন্যে আমার বুকের ভিতরে একটা নিয়ত আছে। আবার একটা দায়িত্ব আছে। তুমি ভাল লেখাপড়া শিখে মানুষ হলে আমার দিলের মধ্যে খুব শান্তি হয়। আমি লেখাপড়া ছাড়া মানুষ, লেখাপড়া জানা লোকেরা কত বড় বড় মানুষ হয়, বংশের মুখ রোশনাই করে। আমার বংশে ---- এ পর্যন্ত বলে তিনি ঢোক গিললেন।
কিছুক্ষণ পরে আবার বলতে শুরু করলেন, দেখ বাপজান, রোশনার বিয়াসাদীর ব্যাপারে তুমি নারাজ আছ। ওর তো একটা রাস্তা খোলাই আছে। বিয়াসাদী হলে নিজের সংসারে করে-কর্মে খাবে, ছেলেপিলে দেখাশোনা করবে, তাদেক মানুষ করবে, সংসার প্রতিপালন করবে। মেয়েমানুষের তো এই সবই কাজ। ওকেও পড়ালেখার মধ্যে দিলে এত খরচের তো আমি যোগাড় দিতে পারব না। তোমার পড়ালেখাও ভাল মত হবে না।
খাদেম ভেবে নিল এখন একটু অ্যাগ্রেসিভ হতে হবে। বাপজানকে সে ভাল ভাবে চেনে। এই মনোভাবকে থিতু হতে দিলে তিনি হয়তো সেটাই করে বসবেন। পরে আফশোস করতে বসবেন। তাই নিজের আপত্তিটা এখনই জানানো দরকার।
খাদেম বলে, রোশনাও তো আপনার একটাই মেয়ে বাপজান। সে তো পড়ালেখায় কম ভাল নয়। ওর জন্যে তো আপনাকে খুব বেশি খরচা করতে হয় না। স্কুলের বেতন দিতে হয় না। বৃত্তির টাকা পায়, উপবৃত্তির টাকাও পায়! বই-পুস্তকের এখন দাম বেশি করা হয়েছে সেটা আমি জানি! ওকে বইপুস্তক তো মাস্টার সাহেবরাই দেন। ভাল ছাত্রী বলে অনেক সংগঠন খাতাপত্র আরও অনেক কিছু দিয়ে সাহায্য করে। বলতে গেলে ওর পড়াশোনার খরচ অনেক কম। বিয়ে দিয়ে দিলে ওর জীবনটাই নষ্ট হয়ে যাবে বাপজান। আমার জন্যে চিন্তা করবেন না। মেসে থেকে ট্যুইশনি করে এতদিন যেভাবে পড়াশোনা করলাম, বাকি পড়াটাও সেভাবে কলেজ থেকেই করে ফেলব। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার মত অনেকেই যেতে পারে না। সেজন্যে দুঃখ করে লাভ নেই। মাসে মাসে যে বিশ কেজি চাল দিতে হয়, তা আপনাকে আর দিতে হবে না। আমি বাজার থেকে কিনে দেব। আপনার দোয়ায় এখন ট্যুশনিতে আমার কিছু নাম হয়েছে। দু’একটা ট্যুইশনি বেশি করব। তাদিয়েই নিজের খরচ চালিয়ে নিতে পারব। আমাদের সামান্য জমিটুকু বিক্রি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাব, আর আপনার পাঁচ বছর ধরে না খেয়ে কষ্ট করবেন, রোশনার পড়াশোনা বন্ধ হবে, অকালে বিয়ে হয়ে যাবে। এতখানি স্বার্থপর আমি হতে পারব না বাপজান। আমি কলেজেই অনার্স পড়ব।
বাপজান তারপরেও শেষ চেষ্টা হিশেবে অনেক কিছু বলেছিলেন। কিন্তু খাদেমের যুক্তির উত্তরে কথা খুঁজে পান নি। থেমে গিয়েছিলেন তখনকার মত। কিন্তু মনের মধ্যে খুঁতখুঁতি ভাবটা থেকেই গিয়েছিল। তাঁর মনে একটা ধারণা কেমন করে যেন গড়ে উঠেছে যে কলেজে পড়া পাশের দাম কম। তার ভাল ছেলেটা পয়সার অভাবে কম দামের পড়াশোনা করবে তা মেনে নিতে পারছিলেন না তিনি। তাঁর মত একজন সাধারণ গ্রাম্য মানুষ পড়াশোনাকে এত গুরুত্ব দেন তা যে শুধুমাত্র স্নেহকাতরতা নয়, খাদেম আলী বোঝে। তাঁর নিজের জীবনের অনেক উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে তিনি চিনেছেন জীবনের বাস্তবতাকে। প্রথম জীবনে ছিলেন পাটের ব্যবসার ফরিয়া। উপার্জন মন্দ ছিল না। যদিও বুঝতেন এটা কৃষককে ঠকানো পয়সা। এক সময়ে সেই সোনালী আঁশের চাষ লোপাট হয়ে গেল দেশ থেকে। তিনি হয়ে পড়লেন ক্ষেতমজুর। প্রযুক্তি আর লগ্নিপুঁজির কোন চক্রে পড়ে সারা দেশে কৃষকরা হাবুডুবু খেতে লাগলো তার তত্ত্বগত দিক না বুঝলেও দেশ ও সমাজের অনেকগুলো বড় বড় পরিবর্তনের তিনি সাক্ষী। হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন জমি-নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত টিকবে না, লেখাপড়া শিখতেই হবে। কিন্তু মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান আগের জায়গাতেই আটকে আছে। রোশনার পড়াশোনা বন্ধ করার কথা বলতে তাঁকে দু’বার ভাবতে হয় নি। বাপজানের এই রকম কিছু কিছু ধারণার জায়গায় খাদেম হোঁচট খায়। অবশ্য অনেক বিষয়েই বাপজান তাঁর মত অন্য অনেকের চাইতে কিছুটা এগিয়েই চিন্তা করতে পারেন। আবার অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর ধারণা এখনো খুব পেছনমুখী। বাপজানকে এ অবস্থা থেকে টেনে তুলতে খাদেম প্রাণপণ চেষ্টা করে চলেছে।
বাপজান খাদেমের কথাগুলো মন দিয়েই শুনে থাকেন কিন্তু চোখেমুখে কেমন যেন একটা অসহায় ভাব ফুটে ওঠে। খাদেম আগে বুঝতো না বাপজানের এই ইতস্তত ভাবটা কেন হয়। যে কোন আধুনিক অগ্রসর বিষয়কে চট করে মেনে নিতে তাঁকে অনেক ভাবতে দেখেছে। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্তে আসতে পারেন না। পুরোনো ধারণাতেই আটকে থাকতে চান। শহরে লেখাপড়া করতে গিয়ে খাদেমের মনের দিগন্ত অনেক প্রসারিত হয়েছে সেটা ও নিজেই বুঝতে পারে। অনেক অগ্রসর মানুষের সঙ্গে জানাশোনা হয়েছে। তাঁদের জ্ঞান, বিদ্যাবত্তা, চিন্তা করার দিগন্তপ্রসারী ক্ষমতা তাকে অনেক সময় বিহ্বল করে তোলে। সে নিজেও বইপত্র পড়েছে অনেক। জ্ঞানের বিশাল আর উজ্জ্বল রঙিন দুয়ার সবসময় তাকে হাতছানি দেয়। যুগ যুগ ধরে জ্ঞানের বিবর্তন যে সভ্যতার জন্ম দিয়েছে তার বহমান ধারাটা সে অনুসরণ করতে পারে এখন। ভবিষ্যৎ বিশ্বসমাজ কেমন হওয়া উচিৎ তার পরিষ্কার চিত্রটাও মনের মধ্যে আঁকা হয়ে গেছে এখন। বাজার অর্থনীতি, ইউনিপোলার ওয়ার্ল্ড, ওয়ান কান্ট্রি ওয়ান ইকোনমি ওয়ান গভর্নমেন্ট, ওয়র অন টেরর, পুঁজিবাদের ডেমোক্রেসির তত্ত্ব, সিন্ডিক্যালিজম, মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম এসবের চাকচিক্যের নিচে ঘাপটি মেরে কি অপেক্ষা করে আছে তা খাদেমের কাছে এখন স্পষ্ট। তাই বাপজানের চিন্তার স্বাধীনতা কোথায় আটকে যায়, কেন তিনি দ্বিধান্বিত হন তাও খাদেমের বুঝতে অসুবিধে হয় না এখন।
বাপজানের ধ্যানজ্ঞানের খানিকটা অগ্রসরমানতা সত্ত্বেও, অনেক কিছু বুঝতে পারা সত্ত্বেও, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও তিনি অনেক কিছু করতে গিয়ে থমকে যান। দ্বিধা তাঁকে কেমন যেন আড়ষ্ট করে ফেলে। গ্রামের মুরুব্বি-মাতব্বর যা অনুমোদন করে না, পারতপক্ষে তা করতে দ্বিধাগ্রস্ত হন। খাদেম এজন্যে তাঁকে দোষ দেয় না, কাউকেই দোষ দেয় না। এরা তো এসব কথা জানে না। এদের এসমস্ত শেখানো হল কবে? কেবলমাত্র লেখাপড়া শিখে ডিগ্রি নিতে পারলেই সব জানা হয়ে যায়, একথা স্বীকার করে না খাদেম। যাদের সঙ্গে পড়াশোনা করছে, তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর চেতনার স্তর সম্পর্কে তার সবকিছু জানা হয়ে গেছে। নিরক্ষর মানুষের মতই তারা বংশ পরম্পরায় রক্তের মধ্যে বহন করছে সব বাতিল ধারণা। ঝেড়ে ফেল বললেই ফেলা যাবে না। তাই বাপজানের মত গ্রামের সকলকেই একটু প্রসারিত চিন্তার ক্ষেত্রে টেনে আনতে খাদেম প্রাণপণে চেষ্টা করে। সফল যে হয় না এমন নয়। বিফলতাও অজস্র। তবু চেষ্টা চালিয়েই যায়।
বাপজান যে ঐ বিষয়ে হাল ছেড়ে দেন নি, খাদেম পরদিনই বুঝে গেল। ওঁর চিন্তিতমুখে ঘোরাঘুরি আর ইতস্তত ভাব দেখে খাদেম কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, তিনিই শুরু করলেন, তোমারে একটা কথা বলতে চাই----
ভেবে-চিন্তে গুছিয়ে কথা বলার সময় বাপজান এ ধরনের বাক্য প্রয়োগ করেন। খাদেম মুখ তুলে তাকাতেই তিনি ক্লান্তভাবে চোখ নামিয়ে নিয়ে বললেন, তুমি ভাল ফলাফল করছ। ভাল জায়গায় লেখাপড়া করানো আমার উচিৎ। মেয়ের বিয়েসাদী করানো আমার উচিৎ। কোনটাই আমি পারি না। সেটা আমার দোষ। গরীব মানুষের অনেক দোষ। কিন্তু আমি বলি, তোমার বড় জায়গায় পড়ালেখা করা দরকার। তোমার ভবিষ্যতের জন্য এটা আমার দেখা দরকার। কবে আছি কবে নাই তা কে বলতে পারে? তোমার একটা ভাল ব্যবস্থা না হলে আমি মনে শান্তি পাই না আর মানুষও আমাকে দোষ দিবে।
‘কেন দোষ দেবে কেন? আমার পড়াশোনা তো বন্ধ করে দেন নি’ খাদেমের গলা আপনা থেকেই এক পর্দা চড়ে যায়।
‘মানুষে বলাবলি করে, সুযোগ থাকতে ছেলের পড়ালেখা নষ্ট কর কেন? আমার দায়িত্ব তো কম না বাপজান।
লোকজনের উপযাচক হয়ে উপদেশ দেওয়া খাদেমের পছন্দ হয় না। তার পড়াশোনা নিয়ে গ্রামের লোক অনবরত উপদেশ দিয়ে যাচ্ছে যেন বিষয়টা তাদের আওতাধীন। তাকেও একের পর এক কত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতে হয়। বিরক্তির একশেষ। কাউকে চড়া কথা বলা যাবে না। মন রাখা কথা আর কত বলা যায়? বাপজানের কথাটা একটু বিস্তারিত শুনতে চায় সে, ‘কেউ আপনাকে কিছু বলেছে?’
‘সবসময় তো বলে। কতজনের কথা হেলা করা যায়।’
‘কি বলে লোকে?’
‘ছেলের বিয়াসাদী দিলেই তো ছেলের পড়ালেখা করার সমস্যা নাই। আমিও ভাবি, মাঝরাস্তায় তোমার পড়ালেখা নষ্ট হয় না তাহলে....’
এতক্ষণে খাদেম বুঝতে পারে ব্যাপারটা। মনে মনেই হাসে। গ্রামে একটু সম্পন্ন মানুষ যাদের ঘরে মেয়েরা তের-চোদ্দ বছরের হয়েছে, তারা সকলেই তাকে হবু জামাই ভেবে রেখেছে। তাদের কাছে তার খাতির একটু হিশেব ছাড়া। সকলেই ডেকে কথা বলতে চায়, আদর করে বাড়িতে ডেকে নিয়ে যেতে চায়। এরা বোধহয় কোমরে লুঙির খুঁতিতে টাকা গুঁজে রেখেছে। অপেক্ষা করছে খাদেমের বাপজান কিংবা খাদেম নিজেই কখন পাতা ফাঁদে পা দেয়। ওদের দোষ দেয় না খাদেম। এদেশের মেয়েরা বাপমায়ের সমূহ গলগ্রহ। এরা বিদেয় হলেই বোঝা নেমে যায়। তারা হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। মেয়েদের পড়াশোনা শিখিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড় করিয়ে দেবার কথা কেউ দরদ দিয়ে ভাবেও না। আজকাল অনেক কিছু সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মেয়েদের পড়াশোনার কথা ভাবে না কোন্ বাপ-মা? কোনরকমে একটু পড়াশোনা শিখলেই হল। সঙ্গে সঙ্গে বিয়ের জন্যে ক্ষেপে ওঠে তারা। অথচ মেয়েরা পড়াশোনায় কত ভাল করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিভাগে মেয়েদের রেজাল্ট সবচেয়ে ভাল। পাশটাশ করে তারা সংসারের ঘানিতে কোথায় হারিয়ে যায়, আর খোঁজ পাওয়া যায় না। মেয়েদের বিয়ে হওয়া অর্থ পুরুষতন্ত্রের যূপকাষ্ঠে বলি হয়ে যাওয়া। নিজের সমস্ত সত্ব্ াবিসর্জন দিয়ে কারও অধিকারে চলে যাওয়া নিঃশর্তভাবে ক্রীতদাসীর মত। খাদেম জানে লেখাপড়া শিখলেও এর খুব একটা ইতরবিশেষ হয় না।
খাদেম ভাবে, কোথায় গেলেন সেইসব মহীয়সী নারীরা যাঁদের সামনে শ্রদ্ধায় ভক্তিতে ভালবাসায় আনত হতে হয়? সারা পৃথিবীর এমন অসংখ্য মহীয়সী নারীদের কথা সে পড়েছে। আমাদের দেশেও তাঁরা ছিলেন। তাঁরা আর নেই কেন? তাঁরা কি আর জন্মগ্রহণ করেন না? খাদেমের খুব হতাশ বোধ হয়। আবার এই সমাজ ব্যবস্থায় এর চাইতে উন্নততর কিছু সে ভাবতেও তো পারে না। তার সহপাঠীদের মধ্যে অনেকেই বিয়ে করে শ্বশুরের পয়সায় পড়ছে। সেই পয়সায় শহরে ফুটানি করে বেড়াচ্ছে। অনেকে আবার াারো চালাক। মাঝে মাঝেই শ্বশুরকে চাপ দিয়ে টাকাপয়সা এনে ফুর্তি মারছে। পড়াশোনার নাম নেই। দেদার টাকা ওড়াচ্ছে। কেউ আবার শ্বশুরকে চাপ দিচ্ছে ব্যবসার টাকা দেওয়ার জন্যে। অনেকের তো ইতিমধ্যে একাধিক বিয়ে করা হয়ে গেছে। খাদেম লক্ষ্য করেছে এদের মনে সামান্য অপরাধবোধও কাজ করে না। গ্রামের এইসব অসহায় মেয়েদের অবুঝ বাপমায়েদের কথাও ভেবেছে খাদেম। তারা যদি তাড়াহুড়া না করে মেয়েদের বিয়ে না দিয়ে পড়াশোনা করতে দিত এই দুশ্চিন্তার হাত থেকে অন্তত বাঁচতো। মেয়েরা আত্মনির্ভরশীল হলে নিজেদের সংসারেও প্রয়োজনীয় অঙ্গ হয়ে উঠতে পারতো। সংসারে তাদের কথার দামও থাকতো।
সে অবস্থাটা আসতে যে একটা গুণগত পরিবর্তন দরকার হবে সেটা কোন্ বাস্তব অবস্থ্য় আসবে ভেবে বের করতে পারে নি খাদেম। ভাবনাটা ঘুরেফিরেই আসে। গ্রামে গেলেই ভাবনাটা উদয় হয়। বিশেষ করে ওর হবু শ্বশুরেদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে মাথার মধ্যে চিন্তাটা খোঁচা মারা শুরু করে। কিন্তু সুরাহা খুঁজে পাওয়া যায় না। খাদেমের অসহায়ত্ব কেবলই বাড়ে। ওর সবচেয়ে ঘনিষ্ট বিশ্বস্ত বন্ধু কেয়াকে জিজ্ঞেস করেছিল। কেয়া মুখ টিপে হেসে নিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে উত্তর দিয়েছিল, ‘আমি মেয়ে বলে জিজ্ঞেস করছিস?’
‘মোটেই না অ্যাডাল্ট সচেতন মানুষ হিসেবে বলছি।’
‘তুই জানিস না?’
‘জানলে তোকে জিজ্ঞেস করছি কেন?’
‘জানিস সা কেন? এটা তো তোর মাথায় আগে আসা উচিৎ ছিল।’
‘এমন ভাব করছিস যেন তোকে জিজ্ঞেস করেই ভুল করেছি।’
‘তুই কি মনে করিস বিষয়টা একদিনের বা এক যুগের ব্যাপার?’
‘না তা মনে করছি না। হাজার বছর ধরে চলে আসছে।’
‘হাজার বছর ধরে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় এটাই হওয়ার কথা। একটা সংস্কার যেটা রক্তের মধ্যে এমন ভাবে মিশে গেছে যে তাকে চেনাই যায় না এখন। পুরুষতন্ত্র এটাই জোর করে শেখাতে চেয়েছে। মেয়েরা ওই হাজার বছর ধরেই তাই শিখে এসেছে। এর থেকে তৈরি হয়েচে এক ধরনের হীনম্মন্যতাবোধ যার দুঃখজনক পরিণতি হচ্ছে এক ভাগ্য বলে মেনে নেওয়া। একেই ভাল ব্যবস্থা ভাবা। আরও বেশি করে পুরুষ-নির্ভর হয়ে গিয়ে তাদের প্রাধান্য মেনে নেওয়া। পুরুষের সব অত্যাচার, নিষ্ঠুরতা, অবহেলা, বঞ্চনাকে প্রাপ্য বলে ভাবতে ভাবতে প্রতিবাদ করার শক্তিটা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেছে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মেয়েরা।’
‘যাক, তুই তাহলে বিষয়টা নিয়ে ভাবিস।’ খাদেম খানিকটা নিশ্চিত বোধ করে।’
‘তুই যেমন ভাবছিস আমিও তেমনি ভাবি বৈকি। কিন্তু দেখ, আমাদের ভাবার মধ্যেও লিমিটেশনস্ আছে।’
‘কি রকম?’
‘তুই ভাবছিস পুরুষের সীমাবব্ধতা নিয়ে, আমি ভাবছি মেয়েদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে। দুটোই ঠিক নয়। আমরা নিজেরা কি এই ব্যবন্থাটার বাইরে আসতে পেরেছি?
‘পারি নি, কিন্তু সচেতনভাবে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি অন্ততঃ।’
‘আসলে শুধু একটা বিষয়কে আলাদা করে নিয়ে সমস্যা মেটাতে পারবি না খাদেম। গোটা ব্যবস্থাটাকে নিয়েই ভাবতে হবে। গোটা ব্যবস্থার একটা গুণগত বদল দরকার। তাহলে খুচরো সমস্যাগুলো মেটাতে সময় লাগবে না। তোর ওপর সমস্যা চেপে বসেছে বলে ভাবিস না ওটার আলাদা কোন সমাধান আছে।’
‘জানি। আর সে জন্যেই ভাবি অনেক রোগের যেমন টোটকা চিকিৎসা হয়, তোর কথামত এই খুচরো সমস্যার কোন মেক-সিফট সমাধান থাকতে পারে কি না।’
কেয়া খিলখিল করে হাসে। খুব খানিকটা হেসে নিয়ে বলে, ‘তুই এখনও নাবালক আছিস খাদেম। তোর নামটা ‘আদ্যিকালের বদ্যি বুড়ো’ হয়ে তোর মাথায় চেপে বসে আছে। তেমনি কিছু অ্যান্টিডেটেড স্বপ্নও তোর মাথায় ঘোরাঘুরি করে। ওগুলো স্বপ্নই। ঝেড়ে ফেল্ তাড়াতাড়ি, মারা পড়বি। আচ্ছা, তুই তো বাপের জন্মেও মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া পরিবারের মানুষ ছিলি না। ক্ষেতমজুরের ব্যাটা। তোর মাথায় ঐসব সেন্টিমেন্টালিটি ঢোকে কি করে রে অ্যাঁ?
খাদেম একটু লজ্জাই পায়। কেয়া ঐ রকমই মেয়ে। একটু লাইন ছাড়া কথা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেলে আর রক্ষা নাই। খপ করে ধরে বসবে। সোজাসুজি দোষ স্বীকার করাই ভাল। বললো, ‘জানিস তো চুম্বকের কাছে লোহা রাখলে কি হয়?
‘জানি , চুম্বক হয়।’
‘আমারও বোধহয় তাই হয়েছে। গ্রামে থাকতে হয়, সেখানকার মানুষগুলোর বাস্তব কালচারাল ফেইজের কথা তো তুই জানিস। আমার বাপজানও তাদেরই একজন। বাপজানের সমস্যাগুলো শেয়ার করতে গিয়ে সর্টকাট খোঁজার বাতিকে পেয়েছে। আসলে এই বদলানোর ব্যাপারটার তো কোন সর্টকাট হয় না।’ ঠিক এই সময় খাদেমের চিন্তার রশিটায় হ্যাঁচকা টান পড়লো। সামনের মাঠের ওপারে আকাশটা লালে লাল। দিগন্তের গাছগুলোর মাথার ওপরে আলো। নিশ্চয়ই কোন গ্রামে আগুন লেগেছে। কোন্ গাঁ-টা হতে পারে বুঝতে চেষ্টা করলো খাদেম। ওদিকে আট-দশ কিলোমিটারের আগে কোন গ্রাম নেই। যে বড়সর গ্রামটা আছে, তার নাম গাজীর গাঁ। লোকে বলে ফকির মজনু শাহের আস্তানা ছিল ঐ গাঁয়ে। খাদেম চিন্তিত হলো। এই শুকনো খটখটে সময়ে মানুষ আগুন নেভানোর পানি পাবে না। সব জলাশয় এখন শুকিয়ে কাঠ। ঐ ঘর ঘেঁসাঘেঁসি গাঁয়ে একটা বাড়িও বাঁচবে না। খাদেম নিজের ভেতরে এক ধরনের বেপরোয়া উত্তেজনা বোধ করতে লাগলো। ওর মনে হলো যত দূরেই হোক, ওর এখন ঐদিকে দৌড় লাগানো উচিৎ। একটা মানুষেরও সাহায্যে লাগতে পারলে খুব তৃপ্তি বোধ করবে। সিদ্ধান্ত নিতে মুহূর্ত সময় লাগলো না খাদেমের। গ্রামের কাছেই এসে পড়েছে। বড় শিমুল গাছটার তলাতেই তো দাঁড়িয়ে আছে। সামনের লোকগুলো যারাই হোক, দৌড়ে ওদের পাশ কাটিয়ে গ্রামে ঢুকে যাবে। ঝোলা আর জুতোজোড়া বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে টর্চটা নিয়েই আবার দৌড় লাগাবে। দেরি যা হবার তা তো হয়েই গিয়েছে।
হাতের ঝোলাটা মাটিতে নামিয়ে রেখে জুতো খোলার জন্যে নিচু হতেই গাঁয়ে ঢোকার আলপথ নজরে পড়লো ওর। আকাশের আগুনে ঘুটঘুটে অন্ধকার সামান্য ফিকে হয়েছে বুঝি। আর ঠিক সেই সময় গ্রামের পথ ধরে একজন ছায়া মানুষকে এদিকেই আসতে দেখলো। বিশালদেহী প্রশান্ত সুদৃঢ় কাঁধ, উন্নত দৃঢ় বুক, আলখাল্লা গায়ে একজন মানুষ। সারা মুখ দাঁড়িগোঁফে ঢাকা, মাথায় পাগড়ি। হাতে লম্বা লাঠির ডগায় একটা তেকোনা ঝাণ্ডা। ছন্দে ছন্দে উঠছে নামছে। মনে হলো কোন কিছুর ওপর দৃঢ়ভাবে বসে আছে সটান শরীরে। সামনের ছায়া তিনটি দাঁড়িয়ে পড়েছে। ছায়াশরীর ওদের সামনে এসে দাঁড়ালো। আকাশের আগুনের আবছা আলোয় খাদেম দেখলো আগন্তুক এক তেজী সাদা আরবী ঘোড়ায় চড়ে আছে। কোমরবন্ধে কোষবদ্ধ তলোয়ার, কাঁধে গাদা বন্দুক ঝোলানো। এঁকে খাদেম চেনে। ফকির সাহেব। মজনু শাহ ফকির। কিন্তু সে তো ছবিতে। হাতে আঁকা ছবি। বাপজানের কাছে হাতে লেখা একটা পুঁথি আছে। বাপজানের একটাই বই। বাপজান ঐ বইটাই ঘুরেফিরে পড়েন সুর করে। কখনো গুনগুন করে। পুঁথিতে হাতে আঁকা ফকির সাহেবের একটা ছবি আছে। পয়ারে লেখা পদ্যের বই। লেখকের নাম নেই। তুলোট কাগজে কাল কালিতে ঝকঝকে খাড়া অক্ষরে সুন্দর হস্তাক্ষরে সোজা লাইনে সাজানো কুড়ি পৃষ্ঠার পুঁথি। প্রতি লাইনে পদ্যের চারটি পংক্তি পর এক দাঁড়ি, দ্বিতীয় পংক্তি পর দুই দাঁড়ি। বইটি বাপজান খুব যতেœ রাখেন। তাকেও পড়তে দিয়েছেন অনেক বার। পদ্যের অনেক লাইন এখনও খাদেমের মুখস্ত আছেঃ
জুটিল মজনুর সাথে হাজার ফকির।
দেখতে দেখতে হইল ফকিরের ভীড়।।
সন্নাসী নাগা সাথে গাঁও আদমী জন।
কাছারীতে হানা দেয় খাদ্যের কারণ।।
কোম্পানীর কত কুঠি লুট হইয়া গেল।
রাজার সিপাই বহু গায়েব হইল।।
তরাসে ফেরঙ্গগণ চুন করে মুখ।
রায়ত্ হিম্মৎ পায় ভাবে যাবে দুখ।।
বড় হয়ে খাদেম খুঁজে পেয়েছে এই অখ্যাত গ্রাম্য কবির নাম। জমির উদ্দিন দফাদার। পুঁথির নামও পেয়েছে। মজনু শাহের হকিকত। এক সময় ফকির মজনু শাহ খাদেমকে পেয়ে বসেছিল। বারবার পড়তো পুঁথিটা।
মুখস্ত করে ফেলেছিল। খাদেম বড় হবার পর বাপজান একদিন বলেছিলেন, ‘আমরা মজনু শাহের এক সাগরেদের বংশধর। মজনু শাহ ছিলেন আমাদের বংশের পীর সাহেব। ঐ সাগরেদ পীর সাহেবের সঙ্গে উত্তর দেশ থেকে এদেশে এসেছিলেন। পীর সাহেবের সঙ্গে এই শীলবিরীষ পরগনায় ইংরেজদের অনেক যুদ্ধ হয়। সেই যুদ্ধে সাগরেদ শহীদ হয়েছিলেন। তাঁর কবর আছে এই গাঁয়ে। তোমাকে দেখাবো একদিন।’
হ্যাঁ, নিয়ে গিয়েছিলেন একদিন। সেই দিনটি ছিল সাগরেদ সাহেবের শাহাদতের দিন। দু’জনে গিয়েছিল গ্রাম থেকে কিছু দূরের পরিত্যক্ত জঙ্গলটায়। এখানে প্রাকৃতিক কর্ম ছাড়া অন্য কাজে কেউ আসে না। জঙ্গলের গভীর অভ্যন্তরে পাশাপাশি দুটি মাটির কবর। বাপজান আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলেন। ‘এইটা আমাদের পূর্বপুরুষ মাদারীয়া ফকিরের। নাম জানি না। কেউ কয়া যায় নাই। বাপজান কয়া গেছিল ফকিরের শাহাদতের দিন ছিল শাবান মাসের ঊনিশ তারিখ। আইজ সেই দিন। ফকির মাদারীয়া ইংরেজের হাতে শহীদ আর এইটা পাকিস্তানের হাতে শহীদ। আব্দুল মজিদ নাম। বাপের নাম কফিল উদ্দিন সেখ। যুদ্ধের সময় পাঁজরে গুলি খায়া আমাদের বাড়িতে লুকায় ছিল। তোমার মায়ে খুব সেবা দিছে। রাজাকারের ভয়ে খুব ভোরে জঙ্গলে থুয়্যা যাইতাম আবার অনেক রাতে বাড়িতে নিতাম। এখানে বেড়ার ঘর বানায় দিছিলাম। শ্রাবণের দশ তারিখে ছেলেটা মারা গেল। ফকিরের পাশে কবর দিলাম। দুই জামানার দুই শহীদ এখানে একসাথে ঘুমায়, তাই না বাপজান?
সেদিন বহুক্ষণ পর্যন্ত খাদেমের মুখে কথা সরে নি। বাপজানকে সেদিন যেন নতুন করে আবিষ্কার করলো খাদেম। প্রতি বছর এই দুই দিনে বাপজান জঙ্গলে আসেন। কবর দুটো সাফসুতরো করেন। চারধারে আল কেটে নিপুণভাবে মাটি লেপে সুন্দর করেন। তারপর দুই কবরের সিথানে দুটো মোমবাতি জ্বালিয়ে দেন।
এ দিনের পর থেকে ফকির মজনু শাহের সন্ধানে নেমেছে খাদেম। যেখানে যত তথ্য পেয়েছে সব যতœ করে রেখেছে। কোনদিন হয়তো একটা বই লিখে ফেলবে। খাদেম অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে সিপাহী বিদ্রোহ নয়, ফকির মজনুই ইংরেজের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহী। পলাশীর যুদ্ধের মাত্র তিন বছর পর ১৭৬০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চল্লিশ বছর ধরে ইংরেজ দখলদারদের তটস্থ করে রেখেছিলেন এই ফকির। প্রায় দেশ ছাড়া করেছিলেন তাদের। ইংরেজ আর তাদের চাটুকার এদেশীয় ঐতিহাসিকরা তাঁকে ডাকাত, চোর, হত্যাকারী, ধর্ষক, প্রজাপীড়ক, লুণ্ঠক ইত্যাদি যত রকমে সম্ভব দুর্নাম রটনা করেছে। কেউ কবিতা লিখে ইংরেজের বাহবা নিয়েছে। তাদের লেখা থেকেই আসল সত্যিটা বের করে আনা কঠিন না।
প্রজাদের কাছ থেকে লুট করে আনা ইংরেজের খাজনার টাকা মজনু কেড়ে নিয়ে গরীব প্রজাদের বিতরণ করে দিয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া ধান ইংরেজের গোলা থেকে লুট করে এনে মজনু বিলিয়ে দিয়েছে। এইজন্যে মজনু শাহ ডাকাত। প্রজাদের কাছ থেকে জোর করে আনা টাকা, ফসল, সোনাদানা সবকিছু মজনু সুযোগ পেলেই লুট করেছে। কখনও গরীব প্রজার ওপর অত্যাচার করে নি, ইতিহাস সাক্ষী। ইংরেজের সৃষ্টি করা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর থেকে ফকির মজনু শাহ প্রজাদের বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। ডাকাতরা এসব পারে? দেশপ্রেমিক মানবপ্রেমিকরা পারে। মজনু ছিলেন তাই। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে কত অশ্রাব্য কথাই না বলা হয়েছে। তাঁর চরিত্রহননের প্রাণপণ চেষ্টা করা হয়েছিল। ইংরেজ সরকারের রিপোর্টগুলো থেকে এ কথা জানা কঠিন নয়। সেই জঞ্জালের নিচ থেকে মজনু এখন স্বমহিমায় প্রত্যাবর্তন করেছেন। পঞ্চানন দাসের কবিতা মনে পড়ে খাদেমের। মজনুর নিন্দা করতে গিয়ে প্রশংসাই করে ফেলেছেন কবিঃ
শুভ সভে একভাবে নৌতুন রচনা।
বাঙ্গালা নাশের হেতু মজনু বারনা।।
কালান্তক যমবেটাক্ কে বলে ফকির।
যার ভয়ে রাজা কাঁপে প্রজা নহে স্থির।।
সাহেব সুভার মত চলন সুঠাম।
আগে চলে ঝাণ্ডাবান ঝাউল নিশান
মজনু তো ফকির নয়, তার রাজকীয় বলিষ্ঠ পৌরুষদীপ্ত সুঠাম চেহারা। ‘বাঙ্গালা নাশের হেতু’ তো তিনি ইংরেজের চোখে। মানুষের চোখে তিনি মহাবিদ্রোহের একচ্ছত্র নায়ক।
বুড়া পীর কহিলেন সব আতহাল।
শুনিয়া কাঁদিল পীর হইয়া বেহাল।।
কহিলেন দল বাঁধ নাগাদের সাথে।
তলওয়ার লহ বেটা জনে জনে হাতে।
হানা দাও গঞ্জে গঞ্জে আনো চাল ধান।
ভুখাদের খেদমতে সপে দাও প্রাণ।।
ফেরঙ্গ আংরেজ ভাগাইতে হইবে।
ইহা ছাড়া পথ নাই দেখ বেটা ভেবে।।
ছিয়াত্তরের মন্বন্তর মজনু এভাবে হয়তো ঠেকাতে পারে নি, কিন্তু তাঁর চেষ্টা কতটা ছিল কবি তাই বলতে চেয়েছেন।
চাবুকের শব্দে খাদেমের সম্বিত ফেরে। ঘোড়াকে পেছন ফিরিয়ে ফকির সাহেব তাদের গ্রামেই ঢুকছেন। পিছু পিছু চলতে থাকে খাদেম। অন্ধকারে আকাশ দেখা যায় না। কিন্তু মাঠের পরের আকাশ এখন আরও লাল। বায়ু স্থির। সামনের দলটি এগিয়ে চলেছে, পেছনে খাদেম। চেনা পথ। অন্ধকারে অসুবিধে হয় না। ঐ তো বাড়ি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু দলটা কি ওদিকেই যাচ্ছে? ঠিকই তো, ওদের বাড়ির রাস্তাতেই নামলো দলটা। খাদেম এখন প্রায় বিধ্বস্ত। বাড়ির দরজা হাট করে খোলা। ওরা ঢুকে গেল বাড়ির গর্ভের ভেতরে।
খাদেম বাইরে অপেক্ষা করলো কিছুক্ষণ। তারপর ঢুকে পড়লো। কোথাও কেউ নেই। বাপজান দাওয়ার চৌকিটার ওপর হারিকেন জ্বালিয়ে পুঁথি পড়ছেন। বাপজানের গলাটা একটু উঁচু পর্দায়। খাদেম শুনছেঃ
সেখানে রাজত্ব করে আসাদ্-জামান্।
দরবেশ হামিদের মাজার তথায়।।
খানকার খাদিম ছিল এক বুড়া পীর।
তেনারে সালাম দিল মজনু ফকির।।
খাদিম কহিলেন..........
কাহাতে দুর্ভিক্ষে মরিতেছে রাখো ইনছান্।
বাঁচাতে কর চেষ্টা তাহাদের জান্।।
বহু গাঁও হইয়াছে বেবাক বিরান।
ঘর ফেলিয়া পলাতক মজনুর কিষাণ্।।
এই হালে কোম্পানীর পাইক পেয়াদা।
জুলুম চালায় খাজনা পাইতে জায়দা।।
খাদেম দাঁড়িয়ে ছিল উঠানে। পুঁথির পাতা ওল্টানোর ফাঁকে চোখটা একটু তুলতেই বাপজান খাদেমকে দেখতে পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালেন। আর্তকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘গাজীর গাঁয়ে পীর সাহেবের আস্তানায় আগুন লেগেছে বাপজান। সব বুঝি পুড়ে গেল।’
খাদেম আর দাঁড়াল না। ছুটে বেরিয়ে গেল বাইরে। টর্চের কথা তার মনে পড়ল না।

0 comments:

Post a Comment