July 24, 2008

বাঙালি রবীন্দ্রনাথের সীমানা ভাঙার লড়াই এবং প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনা

বাঙালি রবীন্দ্রনাথের সীমানা ভাঙার লড়াই এবং প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনা
তপন রুদ্র

একজন রবীন্দ্রনাথ পাওয়া মোটেও কোন সাধারণ বিষয় নয়। বাঙালিরা যে ইতিহাস নিয়ে গর্ব করতে পারে এবং ইতিহাস নামে যে বিশাল আকাশটার দিকে চোখ মেলে তাকিয়ে আমরা বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে একটা সার্বিক ভাব ব্যক্ত করতে পারি, রবীন্দ্রনাথ সে আকাশের এক কোণে জ্বলজ্বলে শুধু একটা তারাই নন বরং তার বিস্তৃতি গোটা আকাশ জুড়ে। তারকাপুঞ্জ, ছায়াপথ কিংবা অনন্ত নীহারিকাপুঞ্জের মত এক অন্তহীন উজ্জ্বলতাই হতে পারে তার প্রকৃষ্ট তুলনা। সে কারণেই তাঁকে নিয়ে আমাদের বিস্তর অসুবিধাও রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে সীমানা প্রীতি এবং একটা নির্দিষ্ট গণ্ডীর প্রতি প্রচণ্ড আসক্তি নিয়ে আমরা চলতে ভালোবাসি। ঘরের বাইরে ছোট উঠানের কোণে পুঁতে রাখা একটা ঢ্যাঁড়স গাছের দিকে তাকিয়ে থাকার অবকাশ উপভোগ করি। আবার সুফলা মাটিতে খুব সহজে আমলকি, পেয়ারা, লেবু ইত্যাদি ফলে বলে ওগুলোকে পরে পঁচতে দেখলেও খুব যেন কষ্ট পাইনা। এমনই আমাদের ঔদাসীন্য, এমনই আমাদের নির্লিপ্ত জীবনাচরণ। দূরকে অনুভব ও ব্যবচ্ছেদ করে দেখার প্রতি তাই আমাদের এত অনীহা।
অতএব, রবীন্দ্রনাথকে ভক্তি নিবেদনের পাশাপাশি সীমানাজয়ী অদ্বিতীয় বাঙালি বলে তাঁকে আরো অনেকগুণ বেশি গুরুত্ব দিয়ে নিত্যকার জীবনচর্চা ও বিশ্লেষণের বিষয় হিশেবে গণ্য করতে আজও আমরা অনেকখানি ব্যর্থ। কারণ হয়ত এই, যুগের চেয়ে তিনি ছিলেন বহুগুণে বেশি অগ্রসর।
আমরা অনেকেই একটা গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়ত রাখি না। ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড কিংবা ইতালির মত অগ্রসর বহুদেশে রবীন্দ্রচর্চা অনেক আগে থেকে চলে আসছে। এসব দেশে রবীন্দ্রচর্চার বিষয়টি আদৌ কোন শৌখিন ব্যাপার নয়। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের নানা শাখায় যুগান্তকারী অবদান রাখার মত মনীষীরা জন্মেছেন বারবার, তদুপরি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশ ও প্রয়োগের ক্ষেত্রেও এদেশগুলোতে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে ধারাবাহিক প্রাধান্য বজায় রাখতে পেরেছে। আবার তাদের সাম্রাজ্যবাদী আচরণ আগ্রাসনের ইতিহাসও অনেক দিনের পুরানো। স্বাভাবিকভাবেই তারা অহংকারী, দাম্ভিক এবং শ্রেষ্ঠত্বের বড়াই করতে তারা খুব ভালোবাসে। কিন্তু খবর নিলে অবশ্যই জানতে পারব যে, ঐসব জাতি রবীন্দ্রনাথকে কতটা গভীরভাবে শ্রদ্ধা করে ও গুরুত্ব দেয়। ফরাসি, জার্মানি, ইতালিয় এবং অবশ্যই ইংরেজি ভাষায় বিশ্ব কবির সকল রচনাই অনুবাদ করে একাধিক নামি-দামি প্রকাশক শোভন আকারে প্রকাশ করেছে। শুধু ইউরোপে কেন, দক্ষিণ আমেরিকার বহুদেশেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে আসছে।
সারা বিশ্বে রবীন্দ্রচর্চা হয়। কিন্তু কেন? শিল্প উৎপাদনে, সাধনায় যারা আমাদের তুলনায় অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে জানে এবং কষ্ট স্বীকার করে শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে জানে তারা কেন রবীন্দ্রনাথকে শিক্ষা-সংস্কৃতির সর্বোচ্চ কেন্দ্রগুলোতে পাকাপোক্ত স্থান করে দিয়েছেন? জার্মানিরা কিংবা ফরাসিরাতো বাংলা ভাষায় কথা বলেন না। বরং আধুনিক ধারায় তাদের ভাষার গঠন এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ সৃষ্টি হয়েছে অনেক আগে যখন আমাদের মাতৃভাষা বাংলা তার বিকাশের শৈশব যাত্রাই শেষ করতে পারেনি।
রবীন্দ্রনাথের জন্মের বহু বছর আগে ইংরেজদের ঘরে জন্মেছিলেন চসার, শেক্সপিয়ার, স্পেন্সার ও মিল্টনের মত কালজয়ী অনেক কবি-লেখক এবং বিজ্ঞানী। জার্মানীতে শুধু যুদ্ধবাজ হিটলার জন্মগ্রহণ করেন নি। তাদের আছে গেটে (কালজয়ী কবি ও বিজ্ঞানী) দার্শনিক হেগেল ও কার্ল মার্কস এবং আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলে খ্যাত আলবার্ট আইনস্টাইন যিনি স্বয়ং বন্ধু ছিলেন রবীন্দ্রনাথের। বিশ্ব সভ্যতার কুয়াশাঘন প্রাতেই জন্মেছিলেন মহাকবি দান্তে। সবচেয়ে বড় কথা প্রাচীন শিক্ষা-সংস্কৃতি নিয়ে অহংকার করার মত কি নেই, তার ইতালির? বোদলেয়ার, জ্যাঁ-পল সাত্র, মপাসাঁ ও আরো কত দৃষ্টান্তস্বরূপ লেখক কবি ফরাসিদের অহংকারের সীমানাকে একেবারে আকাশ ছুঁই ছুঁই পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেন। এছাড়া বিশ্ববাসী জানেন রুশো, ভলতেয়ার ও মন্টেস্কুর কথা। যাঁদের বাণীমন্ত্র ও রাজনৈতিক দর্শনের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হওয়ার ফলে দুনিয়া কাঁপানোর ইহজাগতিক ঘটনা সেই ফরাসী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল (১৭৮৯)।
অতএব, মহা এক বিস্ময় এবং মহা এক জিজ্ঞাসা নিয়ে আমরা কি ভাবতে ও বুঝতে চাইতে পারি না, কেন ঐ উন্নত দেশগুলোতে কবিগুরুর এই অসামান্য স্বীকৃতি?
অনুসন্ধানের আকুলতা যদি থেকেই থাকে তাহলে প্রথমত তাঁর গান দিয়েই শুরু করা যেতে পারে। রবীন্দ্রসংগীতের বাণী ও সুরের ব্যাপ্তি বিশ্ব স্বীকৃত। তাঁর বাণীর আবেদনে ও অবয়বে প্রতিভাত হয় সার্বিক বাংলার রূপ। কিন্তু সেখানে ক্ষণস্থায়ী আবেগ নেই, নেই কোন কূপমণ্ডুকতা; আর নেই সংকীর্ণ জাত্যাভিমান। স্বদেশ প্রীতির পাশাপাশি গোটা মর্ত্যভূমি এবং মহাবিশ্বের অনন্ত সত্য ও রহস্যের এক শিল্পিত ক্যানভাস তাঁর রচিত বহু গানের ছত্রগুলোকে অলংকৃত করেছে। তাঁর বহু গানই বিশ্ব সংগীতের অভিধায় বিশিষ্ট হয়ে আমাদের পরম সম্পদ বলে গণ্য হয়েছে। ব্যক্তি সীমানায়, ক্ষুদ্র পরিসরে অসীম রহস্য যদি যথার্থ অর্থে ধরা পড়েই যায় তাহলে সেই ব্যক্তিত্ব কতটা অসাধারণ তা তলিয়ে দেখার প্রস্তুতি নেয়াতে অবশ্যই একটা দায়বদ্ধতার ছবি দৃষ্ট হতে পারে।
অতএব, সেই প্রস্তুতিটুকু নিয়ে বিশ্নেষণ করতে পারি রবীন্দ্রনাথের গানকে। এ প্রসঙ্গে তাঁর অতি পরিচিত একটি গানের কথা উদ্ধৃত করা যায়-

“আকাশ ভরা সূর্য্য-তারা
বিশ্বভরা প্রাণ
তাহারই মাঝখানে
আমি পেয়েছি, পেয়েছি তার প্রাণ
বিস্ময়ে তাই জাগে জাগে আমার প্রাণ।”

যেখানে এই একবিংশ শতকে জ্ঞান বিকাশের কালে আমরা ব্যক্তির সাথে তার পরিবারের বা প্রতিবেশী কিংবা বড় জোর ব্যক্তির সাথে দেশের সম্পর্কের শিল্পিত রূপায়নের কাজে হিমশিম খেয়ে চলছি, সেখানে ব্যক্তি ও অসীম বিশ্বের মধ্যে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বয়ে যাওয়া নিগুঢ় সম্পর্কের বহমান ধারাকে রবীন্দ্রনাথ কিভাবে সুর ও বাণীর মিলন অশ্র“র ধারায় প্রতিবিম্বিত করতে পেরেছিলেন। এটা বিস্ময়কর বটে। তবে বিষয়টি আবিস্কার কর্মের অসাধ্য বা পুরোপুরি একটি অসম্ভব কাজও নয়। সীমা ও অসীমের মধ্যে দূরপনেয় নৈকট্য অবশ্যই এক মহাজাগতিক ব্যাপার। এমন দার্শনিক উপলব্ধি একজনের গানে গানে এক অসাধারণ সার্থকতায় অসংখ্যবার কিভাবে প্রতিধ্বনিত হয়! এমন এক বিস্ময়, এমন এক প্রশ্নবোধকে রবীন্দ্রনাথ জয় করেছেন বার বার। তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। তেমনি একটি উদাহরণ আরও একবার দেয়া হল-

“তুমি কি কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা
ওই যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভিড়
আকাশের নীড়।
ওই যারা দিন রাত্রী
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী
গ্রহ তারা রবি
তুমি কি তাদের মত সত্য নও?
হায় ছবি তুমি শুধু ছবি?”

এছাড়া রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর এক আন্তর্জাতিক তানে এবং এক মানবীয় ঐতিহ্যের আলোকে চরমভাবে দীপ্ত, মণ্ডিত এবং বিস্তৃত। সুর শক্তির কোন সীমানা নেই, সে পর্বত, সমুদ্র, মরুভূমি সহজেই অতিক্রম করে। তাই সুরই হতে পারে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সীমানাজয়ী শক্তি। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট সুর যেন সীমানা জয়ের উপাস্য শক্তির এক অতুলনীয় নমুনা। সেই সুরের আন্তমহাদেশীয় আবেদন কেউ অস্বীকার করতে পারে না। তাদের কথা আলাদা যারা উগ্র ঈর্ষার কারণে রবীন্দ্র বিরোধীতায় পরম উৎসাহ বোধ করে আসছেন।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর বৈচিত্র্য্য অজস্র শাখা প্রশাখায় আন্দোলিত। যেন একটা বিশাল মহীরূহও এর সাথে তুলনীয় নয়। আমাদের প্রাণের জাতীয় সঙ্গীত “আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালবাসি”- রবীন্দ্রনাথেরই রচনা। এর সুর একেবারেই বঙ্গজ। এখানে মরমী বাউল সঙ্গীতের সুরের আচ্ছাদনটিই মূখ্য। এছাড়াও রয়েছে কীর্তনী, ভাটিয়ালী ও বাংলা ধ্র“পদী ধারার এক অনিন্দ্য মিশ্রণ। সর্বোপরি এই গানটিতে এমন একটি সুর স্পর্শ রয়েছে যার কারণে এখানে সহজেই কবি রবীন্দ্রনাথকেও উপলদ্ধি করা যায়। পাশাপাশি যদি ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের বাণী ও সুর মরমে অনুভব করতে চাই তাহলে আবিস্কার করতে পারব হিমালয় তুল্য এক সুরকার রবীন্দ্রনাথকেই। তাঁর সেই “জনগনমন অধিনায়ক জয় হে, ভারতভাগ্য বিধাতা” গানটি বাণী ও সুরের এক বিশাল ব্যাপ্তির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একদিকে বাণীতে সন্নিবেশিত হয়েছে গোটা উপ-মহাদেশের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের আবেদনশীল উচ্চারণ আর অন্যদিকে রয়েছে সেই বাণীকে যথার্থ অর্থে বহন করবার মত এক বিস্তৃত সুরজাল। এই গানটির সুর বিন্যাসে রয়েছে প্রাচীন ভারতের বৈদিকমন্ত্র উচ্চারণের অনুভব সেই সাথে অনুভবে আসে দরবারী রাগ ও ধ্র“পদী লয়ের রাজসিক ধ্বনি সম্মিলন; আর যা আছে তা’হল পাশ্চাত্যধারক পরাক্রমী ও প্রভাব সঞ্চারকারী গায়কী শৈলী যার কারণেই ঐ গানের সুর এক শক্তিমত্ত বিটপীর ন্যায় এতটাই কর্তৃত্বশীল। রবীন্দ্রনাথের বহুল প্রচারিত গানগুলোর মধ্যে “তোমার হল শুরু/ আমার হল সারা।” বিখ্যাত গায়ক দেবব্রত বিশ্বাস যখন ঐ গানটিই ইংরেজি উচ্চারণে গাইলেন তখন অনেকেই বিস্ময়ের সাথে অনুভব করেছিলেন যে কতটা সার্থকতার সাথে কবিগুরু ইউরোপিয় তথা পাশ্চাত্যের সুরসুষমাকে ধারণ ও প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ইংরেজি উচ্চারণে গাওয়া ঐ গানটি যেন যথার্থই একটি উন্নতমানের পাশ্চত্য সঙ্গীত। অনুরূপভাবে আরও অনেক রবীন্দ্র সঙ্গীতকে পাশ্চাত্য সুর বৈশিষ্ট্যের যথার্থ অধিকারী বলে বলে মনে হবে। তাঁর “ফুলে-ফুলে ঢলে-ঢলে” গানটিতেও এক অপূর্ব সুর সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। এমনকি বাংলা উচ্চারণে গাইলেই শোনা যায় সেখানে রয়েছে ইউরোপিয় ধারার বিশালত্ব ও সাগর মোহনার তরঙ্গায়িত বায়ু প্রবাহের তেজস্বী ভাইব্রেশান। তাই বাণীর ব্যঞ্জনটাও বিস্তৃত হয়েছে ব্যাপক কলেবরে। এটা দারুনভাবে প্রমাণিত হয়েছে কোলকাতার এক অনুষ্ঠানে সেই “ফুলে-ফুলে ঢলে-ঢলে” গানটি যখন অত্যন্ত খোলা গলায় পরিবেশন করেছিলেন এক আমেরিকান মহিলা শিল্পী। যতদূর মনে পরে ঐ মহিলা ছিলেন কোলকাতায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতের স্ত্রী। কিন্তু সেই একই দম্পতি যখন দ্বৈত কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের “আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে” গানটি পরিবেশন করেছিলেন তখন মনে হয়নি যে গানটিতে পাশ্চাত্য সুরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে।
সুর সৃষ্টি ও সুর বিন্যাস উভয় বিচারে রবীন্দ্রনাথ অসাধারণ। এখানে তাঁর গান প্রথমত বাংলার, দ্বিতীয়ত উপমহাদেশের এবং তৃতীয়ত তথা সর্বোপরি তাঁর গান সারা বিশ্বের মানুষের সম্পদ।
সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, “বাঙালিরা একটি আত্মবিস্মৃত জাতি”-মন্তব্যটির সাথে অনেকেই একমত। অবশ্যই এর মধ্যে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। আরও প্রকটিত হয়েছে কঠিন আত্মসমালোচনার ভাব। তবে সুধী সমাবেশে, চিন্তায়, আড্ডায় অথবা যে কোন প্রকার আখ্যান, প্রেক্ষাপট ইত্যাদির বর্ণনায় হয়ত আরও একটি পরিচয় দিয়ে ফেলি আমরা খুব সহজেই। সেটা হল প্রচণ্ড রকমের আত্মনিমগ্নতা। হতাশা, সীমাবদ্ধ চিন্তাশক্তি ও অক্ষমতার চোরা গলিতে নিজেকে নিবিষ্ট করে আত্মসন্তুটির বীজ ছড়াতে ভালোবাসি। এটা কেউ অস্বীকার করবেন না যে মাত্রা ছাড়া আত্মতুষ্টি মানুষকে নির্বিকার, অপদার্থ, কূপমণ্ডূক এবং অহংকারী করতে পারে।
ভাবছি “ধান ভানতে শীবের গীত” হয়ে যাচ্ছে নাতো? কথাটা এসে গেল একারণে যে রবীন্দ্রনাথই প্রথম বাঙালি যিনি চিরাচরিত আত্মনিমগ্নতা ও কূপমণ্ডূকতা থেকে এক বিস্ময়কর ব্যাপকতায় নিজেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন। বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় এবং তাঁদের সমকক্ষতার বিচারে গৌণ এমন অনেক বাঙালি যে মুক্তির লড়াইটা শুরু করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তা ব্যাপক আকারে অর্জন করেছিলেন। তাঁর এই অর্জন বিশাল ব্যঞ্জনায় ঝংকৃত ও পরিষ্ফুট তাঁর সারা জীবনের কর্মযজ্ঞের বিশ্বতূল্য ক্যানভাসে। নানা দেশিক প্রাচীন সভ্যতা থেকে শুরু করে মধ্যযুগের যত ধূসর পাণ্ডুলিপি তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং আত্মনিমগ্নতার বদলে বিশ্ব ইতিহাস ও ইতিবৃত্তের প্রতি গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট করেছে- তাঁর বহুল উদ্ধৃত পঙক্তি “আমি যদি জন্ম নিতাম কালিদাসের কালে” নিশ্চিতরূপেই এক আত্মদ্রোহী ইতিহাস সংশ্লিষ্টতারই মুগ্ধকর প্রতীক।
ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও ফরাসি বিপ্লবের আলোকরশ্মি বাংলাকে ছুঁয়েছিল উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের ভিত গড়ে ওঠার কিছুকাল পর থেকেই। শিক্ষানুরাগী ও উদারচেতা ডিরোজিও সাহেবের মত কিছু ইংরেজ সজ্জ্বন বাঙালিদের মধ্যে (কোলকাতা কেন্দ্রিক) উদার মানবতাবাদ ও আধুনিক ধারার চিন্তা চেতানার প্রতি আকর্ষণ ও অনুরাগ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়েছিলেন। ফলশ্র“তিতে ইউরোপীয় ইতিহাস এবং সামগ্রিকভাবে বিশ্ব ইতিহাসসমূহের সম্যক একটা ধারণা কোলকাতা কেন্দ্রিক শিক্ষিত বাঙালিদের মধ্যে পাকাপোক্ত অবস্থান পেতে শুরু করেছিল। আবার একই সাথে রক্ষণশীল হিন্দু পণ্ডিত ও সমাজপতিরা ইউরোপীয় ধারার উদার মানসিক শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়গুলোকে ঘৃণ্য ও অপবিত্র বলে সেগুলোকে বর্জন করার বিপক্ষে কঠিন অভিমত ব্যক্ত করে চলছিল। ইংরেজদের হাত ধরে ইউরোপীয় ধারার শিক্ষা ও গবেষণার বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রটি আবির্ভূত হয়েছিল তাতে বাংলা তথা বাঙালিরা একদিকে অনুপ্রাণিত হয়েছিল। অন্যদিকে চরম দ্বিধা ও সংকোচের জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। সনাতন ধর্মবিশ্বাস, প্রচলিত প্রথার প্রতি শর্তহীন আনুগত্য, উন্নত ও বিস্তৃত জীবনদর্শনের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়ার অপারগতা এবং সর্বোপরি জাত্যাভিমানী অহংকারবোধ বাংলায় অভিজাত সম্প্রদায়কে বহির্বিশ্ব সম্পর্কে উদাসীন ও অজ্ঞ থাকতে বাধ্য করত। অতএব বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় বা মাইকেল মধুসূদন দত্ত সকলকেই একটা কঠিন সীমানা অতিক্রম করার অদম্য সাহস সঞ্চয় করতে হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের কেবল একজন অনুসারী নন, বলতে গেলে তিনিই সেই প্রবাদপ্রতিম প্রথম বাঙালি যিনি সীমিত চিন্তাধারার সকল অভিশাপ সম্পর্কে পূর্ণমাত্রায় সচেতন ছিলেন এবং সর্বগ্রাসী এক কূপমণ্ডুক আত্মাভিমানকে জয় করার নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামে অবিচল ছিলেন। অতি অল্প বয়সে লেখা “ভানুসিংহের পদাবলী” থেকে শুরু করে তাঁর পরিণত বয়সে লেখা “শেষের কবিতা” পর্যন্ত এবং তারপরেও দেখা যাবে বন্ধ্যা যত কুসংস্কার, যত সংকীর্ণ দোলাচল এবং যুক্তিহীন বিশ্বাসের যত পুরোনো চৌহদ্দি, সবকিছুকে জয় করে ইতিহাস সংশ্লিষ্টতাকে স্বীকার করে নিয়ে সমকালের প্রেক্ষাপটকে অন্তরে ধারণ করে ভবিষ্যতের গন্তব্যে ক্লান্তিহীন যাত্রাকে এক কুণ্ঠাহীন উৎসাহে গতিশীল করতে চেয়েছেন। একজন আত্মবিশ্বাসী যদি যথার্থভাবে অটল এবং উদ্বেগহীন হয় তা হলেই একজন কর্মী মানুষ এতটা অবদান রেখে যেতে পারেন। কবিগুরুর অনুসরণীয় আত্মবিশ্বাসের জ্বলন্ত উদাহারণ হল তাঁর “১৪০০ সাল” নামের কবিতা। এই কবিতাটিতে বিধৃত হয়েছে এমন এক আত্মবিশ্বাসী কবির ভাবমূর্তি যিনি ভেবে নিয়েছিলেন যে শতবর্ষ পরেও তাঁর সৃষ্ট সকল পঙক্তি রহস্য ও সত্যের সমন্বিত প্রতিফলনরূপে বিবেচিত ও বহুলভাবে পঠিত হবে। বস্তুতঃপক্ষে যে কোন রবীন্দ্রভক্ত কতবার যে সেই লাইনটি পড়েছেন এবং উদ্ধৃত করেই চলেছেন- “আজি হতে শত বর্ষ পরে। কে তুমি, আমার কবিতাখানি পড়িছ কৌতূহল ভরে/ আজি হতে শত বর্ষ পরে।”
পাশ্চাত্য ধারার রেনেসাঁর প্রভাব তৎকালীন অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর সমাজ ও লোকাচারে গতি সঞ্চারিত করেছিল ঠিকই কিন্তু তারপরেও দ্বিধান্বিত বাঙালি সমাজ সাম্প্রদায়িকতা ও নানা অমানবিক অনুশাসনকে বিসর্জন দিতে সাহস পাচ্ছিল না। পূর্বপুরুষদের দেয়া এক শীতল সীমানা বিবেকবোধকে প্রসারিত করার বিপক্ষে কাজ করে যাচ্ছিল কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কত গভীর আত্মবিশ্বাস নিয়ে সেই সীমানা ভাঙার লড়াই জারি করেছিলেন তা খুব বেশি ভেবে দেখা হয়নি আজও। তার লেখা প্রবন্ধ “হিন্দু-মুসলমান” আর তার লেখা উপন্যাস “গোরা” সীমানাজয়ী রবীন্দ্রনাথের আর একটি প্রতিমূর্তি উদ্ভাসিত করতেই পারে। “হিন্দু-মুসলমান” প্রবন্ধে জমিদার বংশজাত বাঙালি রবীন্দ্রনাথ কিছু জীবনঘনিষ্ঠ চিত্র তুলে ধরেছিলেন, যেখানে দেখানো হয়েছে কিভাবে হিন্দু জমিদার ও তাদের আমলা শ্রেণী মুসলমান প্রজাদের প্রতি অমানবিক আচরণ করেছেন। এখানে মনে রাখতে হবে একটি উপন্যাস কিংবা গল্পে সাম্প্রদায়িক অনুভূতি প্রতিফলিত করা লেখকের পক্ষে যতটা সহজ বা দায়িত্ব বর্জিত কাজ প্রবন্ধে তা পুরোপুরি উল্টো। কারণ প্রবন্ধকারকে পুরো ঝুঁকিটা বা দায়িত্বটা নিতে হয় নিজের ঘাড়ে। গল্পকারের মত তার সৃষ্ট চরিত্র বা ঘটনার উপর দায়িত্ব চাপিয়ে প্রবন্ধকার নি®কৃতি পেতে পারেন না। এমন দায়ভার অস্বীকার করতে চাননি বলেই রবীন্দ্রনাথ যেমন শিল্পের মহিমায় “গোরা”র মত প্রতিবাদী উপন্যাস লিখেছিলেন তেমনিই সমাজ চেতানার এক নির্ভীক ও প্রত্যক্ষ দলিল রূপে গণ্য “হিন্দু-মুসলমান” প্রবন্ধটি রচনা করেছিলেন আন্তরিক দায়বদ্ধতা থেকে। পক্ষান্তরে তাঁর সমসাময়িক কোন কোন কীর্তিমান লেখক হিন্দু-মুসলমান সংকট নিয়ে শৈল্পিক ঢঙে কাহিনী সৃষ্টি করেছেন যেখানে কঠিন দায়ভার এড়িয়ে যাবার বিলাসীভাবনা একটি সংকীর্ণ সীমানাই বটে। একবিংশ শতকের সূচনা পর্বেও অনেক বাঙালি লেখক ও নেতা-নেত্রী সেই সীমানা ভাঙার সাহস করছেন না।
অত্যন্ত এক প্রাচীন সংস্কৃতির ধারক এই উপমহাদেশ এবং এই বাংলার চিরন্তন বিশ্বভাবনা যার কলমের যাদু স্পর্শে সাগর মহাসাগরের অনিশ্বেয় সীমানা ডিঙিয়ে প্রথমবারের মত ধনশক্তির অহংকারে মত্ত ইউরোপ আমেরিকার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোকে অবিশ্বাস্যরকমে প্রভাবপিষ্ট করেছিল তিনিইতো সেই বাংলাভাষী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ইংরেজি ১৯১৩ সালে তাঁর নোবেল পুরস্কার জয়ের প্রেক্ষিত বিচার করলে আমরা দারুণভাবে মোহিত এবং প্রত্যয়বান হতে পারি।
যে বিশেষ কাব্য গ্রন্থটির উপর ভিত্তি করে রবীন্দ্রনাথের নাম নোবেল কমিটিতে প্রস্তাবিত হয়েছিল তার নাম সকলেই জানি। সেটি ছিল “গীতাঞ্জলি”। ঐ কাব্য গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা গীতিধর্মী এবং সেখানে ছত্রে ছত্রে রয়েছে ভারতীয় উপনিষদের নিরাকার অধ্যাত্মচিন্তার শৈল্পিক প্রতিফলন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অরূপ রহস্য, মহাজাগতিক বিশালতা এবং অদ্বিতীয় শক্তি সেই মহাস্রষ্টার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধায় লোকাতীত নৈবেদ্য নিবেদন- ইন্দ্রিয়বাদী মানবশক্তির ক্ষুদ্রতা এবং সংকীর্ণ অহংকারের জন্ম দিতেই পারে অথচ সে অহংকার মূল্যহীন এবং তা এক ভয়ঙ্কর আত্মবিশ্বাসীরূপে। এ থেকে মুক্তি লাভের কামনা অবশ্যই কোন তুচ্ছ সাধনার অর্জন নয়। মহাজাগতিকজ্ঞান, উপলব্ধি এবং অন্তর জগতের লালিত এক গতিসন্ধানী অনুভব হয়ত সকল প্রকার সংকীর্ণ অহংকার জয়ে একজন মানুষকে প্রবলভাবে সামর্থ্যবান করতে পারে। চিরন্তন এই দর্শন ভারতীয় উপনিষদের প্রধান বিষয় যা ভৌগলিক, ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক বিভিন্নতা নির্বিশেষে সকল দেশ ও জাতির কাছে সমান মাত্রার নির্দেশক রূপে গন্য হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ সেইসব বাণী-চিরন্তনীর সমস্ত নির্যাস এক অসাধারণ ও প্রতিভাশীল ক্ষমতায় শূষে নিতে পেরেছিলেন। এ যেন পুরাণে বর্ণিত জহ্নুমুনির ক্ষুদ্র কমুণ্ডলের গোটা, বেগবতি অসীম গঙ্গাকে মহাগৌরবের তেজে সম্পূর্ণরূপে ধারণ করারই মত। তাঁর ধারণকৃত উপনিষদ বাণীর নির্যাস থেকে জন্ম নিয়েছিল “গীতাঞ্জলি”র কাব্যের প্রতিটি গান। অনেকে বিশ্বাস করে বলেন, “গীতাঞ্জলি” রবি ঠাকুরের শ্রেষ্ঠ কাব্য নয়। সেটা হতেই পারে। তারপরেও কথা থাকে যে সেই 'ঙাবৎ-ৎধঃবফ' গীতাঞ্জলির সুর ও মর্মবাণীর খবর যখন ডাব্লু বি ইয়েটসের মত প্রথিতযশা পাশ্চাত্যের কবি জ্ঞাত হয়েছিলেন, তখন তিনি অনুভব করেছিলেন যে রবীন্দ্রনাথ তার স্বপ্নলোকের এক কবি। ইয়েটস্ অনুভব করেছিলেন গীতাঞ্জলির প্রতিটি পঙক্তি যেন তার বড় চেনা। অন্তরের গহীন আয়তনে সেই পঙক্তিগুলো যেন লেখাই ছিল কিন্তু বেরিয়ে আসতে পারেনি-দূরদেশ ভারতবর্ষের বাঙালি কবি তার না বলা কথা ও আর্তী অমন সুর সমর্থিত আঙ্গিকে, ব্যাপক কাব্য বৈভবে মেলে ধরতে পারলেন। এমন অমিত বিস্ময় ও অপার আনন্দই বোধ করি আইরিশ কবি (নোবেল জয়ী) উইলিয়াম বাটলার ইয়েটসকে উদ্ধুদ্ধ করেছিল সহস্র যোজন সমুদ্র পথের বিশাল দূরত্বে বাস করা ইংরেজ শাসিত পরাধীন বাংলার এক কবির প্রতি আসক্ত হতে।
ইতিহাসে উল্লিখিত এমন একটি ঘটনা: মোহিনী চ্যাটার্জি নামে এক বিজ্ঞ বাঙালি পণ্ডিত ১৯১০ কিংবা তার কাছাকাছি সময় আয়ারল্যান্ডে অধ্যাপনা করতেন। সংস্কৃত ভাষা সাহিত্য এবং পুরাণ-উপনিষদে তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। রাজধানী ডাবলিনে তাঁর সাথে তখনকার সেই সেরা কবি ব্যক্তিত্ব ডাব্লু বি ইয়েটসের নিবিড় সখ্য গড়ে উঠেছিল। তিনি ইয়েটস সাহেবকে গীতাঞ্জলির কিছু লাইন ইংরেজি করে শুনিয়েছিলেন। তখনই যেন প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সীমানা ও বিস্তর ব্যবধান যেন নিমেষেই ঘুচে গিয়েছিল ইয়েটসের কাছে। রবীন্দ্রনাথের সীমানা অতিক্রমের অতুলনীয় সামর্থ্যরে অসম প্রকৃষ্ট উদাহরণ আর কি হতে পারে? একথা অনেকের জানা থাকা স্বাভাবিক যে আয়ারল্যান্ডের সেই বিশ্ববরেণ্য কবি ইংরেজ শাসকদের চোখে একজন ‘নেটিভ’ রবীন্দ্রনাথকে তাঁর দেশে পরম সম্মানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং তাঁর উদ্যোগেই নোবেল কমিটিতে ইংরেজিতে অনুদিত “গীতাঞ্জলি” মনোনয়নের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন।
বিশেষ একটি ঝোঁক, বিশেষ একটি স্টাইল, বিশেষ একটি ফর্ম এমনকি বিশেষ কোন ঐতিহ্যের প্রতি দুর্বলতা, পক্ষপাত ইত্যাদি লেখক বা শিল্পীর জন্য একটি সীমানা বা গণ্ডি রচনা করতে পারে। আবার দার্শনিক, বিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক নেতারা (ঝঃধঃবংসধহ) যদি বিশ্ব বা মহাবিশ্বের অপার বৈচিত্র্যের প্রতি আসক্ত না হতে পেরে সচেতন কিংবা অবচেতন মনে কোন ক্ষুদ্র পরিসরে সকল সাধনা ও সংগ্রাম আবদ্ধ করে রাখেন তাহলে সীমানা ভাঙার বদলে যেন অন্য কোন ধরণের সীমানাই গড়ে তোলেন তাঁর চারপাশ ঘিরে। কারণ গতানুগতিক ধারাবদ্ধতার প্রতি প্রেম পরিণতিতে একটা কঠিন আসক্তির রূপ নিয়েই থাকে। এতেই যেন স্বাচ্ছন্দ্য। এর বাইরে পা ফেলতে গেলে সমূহ বিপদ; নিজের সামর্থ্যরে ঘাটতি ধরা পরার সম্ভাবনা প্রবলভাবে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। কেবল গভীর এক আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিশ্র“তিবোধ অমন হীনমন্যতাকে জয় করতে শক্তি যোগাতে পারে। প্রমাণ সাপেক্ষে যে কেউ একজন বলতে পারেন রবীন্দ্রনাথ সেই (প্রায়) অসম্ভব শক্তিটুকু নিতান্ত অবহেলায় অর্জন করে নিয়েছিলেন। তাঁর কর্মের সুবিস্তৃত ভাণ্ডার যেন মহাজাগতিক বৈচিত্র্যের সন্ধান দিয়ে যায়। সাহিত্যের বিচিত্র শাখা-প্রশাখা, বিষয়ের অজস্র ক্ষেত্র, উৎস ও সূত্রের সংখ্যাতীত অবতারণা, সম্প্রদায়, ধর্ম, দেশ ও কাল সবকিছুর প্রতি পক্ষপাতহীন আগ্রহ মানুষ ও বিশ্বের প্রতি অবিচল আকর্ষণ ও আস্থা কবিকে দারুণভাবে মোহহীন করে ফেলেছিল। তাই তাঁর উদারতা ও নিঃস্বার্থ চেতনার সাবলীল গতিকে অনুমান করা সাধারণের পক্ষে বলতে গেলে একটা অসাধ্য কর্ম, একটা নিস্ফল শ্রম!
ভিক্টোরীয় যুগের অন্যতম পথিকৃত ইংরেজ কবি আলফ্রেড টেনিসনের পৌত্র প্রখ্যাত লেখক হ্যালাম টেনিসন বিশ শতকের মাঝামাঝি এক সময়ে লিখেছিলেন- "ঞধমড়ৎব ধিং ভড়ৎ ধযবধফ ড়ভ যরং ঃরসব" অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ তাঁর সমকালের চেতানার চেয়ে অনেক বেশি এগিয়েছিলেন। অন্য কথায় বলা যায় যে হ্যালাম টেনিসন লক্ষ্য করেছিলেন যে কবিগুরুর নিকট উত্তরসুরীরা তাঁকে দেখার যোগ্যতাটুকুই অর্জন করতে পারেন নি।
হ্যালাম টেনিসনের সেই সংশয় এখন আর কার্যকর নয়, একথা বলতে পারলে আমরা অবশ্যই খুশি হতে পারতাম। কারণ রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন যত বেশি নির্ভীক, যত বেশি নির্ভেজাল এবং যত বেশি আধুনিক হতে পারবে, অন্ততঃপক্ষে আমাদের সমাজে অগ্রসর চিন্তা চৈতন্যের একটা নির্ভরশীল মাপকাঠি তাতেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
একটা সময় অবশ্যই এসে গেছে যেখান থেকে নবজাগরণের আরও একটা অধ্যায় রচনা করতে হবে। মানবতাবোধের তাড়নায় শিক্ষা, আন্দোলন, ভ্রাতৃত্বস্থাপন ও দেশাত্মবোধক বহুমুখী চর্চা ও সৃজন, বিজ্ঞানভিত্তিক মহাজাগতিক ধারণার বোধন এবং ইতিহাস ও ঐতিহাসিকতার মূল্য বিচার সাপেক্ষে সংস্কৃতি ধারণ ও লালন, আর সর্বোপরি কল্যাণময় ও শোষণ নিগড় থেকে পুরোপুরি মুক্ত এক উৎপাদনী ব্যবস্থার আলোকোজ্জ্বল বিস্তার ও ব্যাপ্তির জন্য বড় বেশি প্রয়োজন সেই নবজাগরণের। নবজাগরণের সেই পর্যায়ে উন্নতিটা যদি ঘটেই যায় তখন মূল্যহীন শ্লোগান, হঠকারী সিদ্ধান্ত পোষণের স্থূল মানসিকতা এবং একপেশে আবেগ সঞ্চারের মাধ্যমে নিজেকে ক্ষুদ্র ও পশ্চাৎমুখী ভাবনাচক্রে শৃঙ্খলিত করবার মূর্খতার অবশেষটুকুও আর টিকে থাকতে পারবে না।
কিন্তু সত্যের নির্মমতা এমন যে পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে স্বার্থ উদ্ধারের সময়োপযোগী সবধরণের ফন্দিফিকির আবিষ্কার করে সেগুলোকে প্রয়োগ করতে যেন আমরা আন্তরিকভাবে অভ্যস্ত। তাই সুদূরপ্রসারী ও যুগান্তকারী কর্মের ঐতিহাসিক সূচনাগুলোকে সজ্ঞানে বুঝতে আমরা এগিয়ে আসতে পারছি না।
রবীন্দ্রনাথের সারা জীবন একটা ঘটনামাত্র নয়। তিনি অবশ্যই একটা ঘটনার নায়ক হয়ে ওঠেননি। গভীরভাবে মানবিকভাবে, বিস্তৃতভাবে নৈসর্গিক এবং সর্বোপরি এক মহাজাগতিক চেতনা তাঁর সমস্ত রচনার অবিনশ্বর আত্মা। তাই যা তিনি ভেঙেছেন তার তুলনায় তার পূণর্গঠনের আকৃতি অপরিমেয়রূপে বিশাল।
বিশেষ একটি কালের পরিসরে জীবন তথা সমাজ বিকাশের বেশ কিছু প্রবণতা, অভ্যাস ও আদর্শ মোটামুটি একটা পরিমাপযোগ্য স্থায়ীত্ব লাভ করতে পারে। ভাষা ও সাহিত্যের বেলাতেও দেখা দিয়েছে যে, অনেকবৈশিষ্ট্য্য, রূপগত বিভিন্ন প্রকারভেদ ও প্রথাগত নানা ধারা শতাব্দীকাল কিংবা তারও চেয়ে অনেক বেশি কাল ধরে অবিকৃত বা অপরিবর্তিত অবস্থায় বিশেষকরে কোন দেশে বা অঞ্চলে গৌরবের সাথে মানুষের মাঝে পৌঁছে গেছে। এমনকি ঐসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন বা সংস্কার সাধনের চিন্তা করাটাও একটা রীতিবিরুদ্ধ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তারপরে সত্যি যখন কোন কোন ব্যতিক্রমধর্মী ব্যক্তিত্ব বা পরিবর্তনমুখী কোন গোষ্ঠী ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে সংস্কার আনতে চান বা একটা বিপ্লব আনতে চান, তখন অবশ্যই তাকে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে এগুতে হয়। এই চ্যালেঞ্জ নিজের ভেতর থেকেও আসতে পারে। কারণ পুরোনো সংস্কারবোধ প্রায় সকলকে গভীরভাবে সংক্রমিত করে থাকে। মধ্যযুগীয় ভাব, আবেগ, উচ্ছাস, থেকে ব্যাপক উত্তরণ ঘটিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য কেন্দ্রিক নগর সভ্যতার দ্রুত তালের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ভাষা, ভাব ও শিল্প চেতনাবোধ সঞ্চারের মাধ্যমে নিজেকে আধুনিক ধারার একজন সফল স্রষ্টার কৃতিত্বকে দান করেছেন, তা বিচার করবার দায়িত্ব এখন সকলের।
মধ্যযুগের চেতনালব্ধ সৃষ্টি “ভানুসিংহের পদাবলী” সেখানে যেন কবিগুরু ছন্দের প্রতি, তন্ময়তার প্রতি এবং গোধূলি সদৃশ অস্পষ্টতার প্রতি দারুণভাবে নিবেদিত। তন্দ্রালুতার প্রতি রবীন্দ্রনাথের আনুগত্য এক অসাধারণ শিল্প সৌন্দর্যে প্রকটিত হয়েছে। তাঁর ব্যবহৃত গৌড়ীয় বাংলায় ও ছন্দে যা প্রচলিত ছিল এই বাংলায় কবির জন্মের বহুযুগ আগে বাংলার আদি কবিদের অন্যতম বিদ্যাপতি রচিত প্রাচীন কাব্য সাহিত্য বৈষ্ণব পদাবলীতে যে অঞ্চলের বাংলা ব্যবহৃত হয়েছিল তা ছিল হিন্দি, সংস্কৃত ও তার সাথে কিছু প্রাকৃত বাংলা শব্দের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এক প্রকার কাব্য ভাষা। “ভানুসিংহের পদাবলীর” আখ্যান ও মূল চেতনাও বলা যায় বৈষ্ণব পদাবলীরই অনুরূপ। এক কথায় রবীন্দ্রনাথ তার অসীম কল্পনা শক্তি ও সৃষ্টিশীলতায় শত শত বছর পূর্বের ভাব প্রবণতা ও প্রেক্ষাপটকে সম্পূর্ণরূপে স্বীয় সত্ত্বায় ধারণ করে তা হৃদয়গ্রাহী ঢঙে ব্যক্ত করতে পেরেছিলেন। এযেন এক আত্মিক সংশ্লিষ্টতা যা তাঁকে অতীতের দিকেই মুখ ফেরাতে বাধ্য করেছিল তাতে এতটুকু বাধ সাধবার অবকাশ নেই। কারণ সেটা প্রমাণ করতে গেলে স্বয়ং কবিকেই দরকার যা এখন আদৌ সম্ভব নয়। সে যাই হোক কথা হচ্ছে নিজের সাথে যুদ্ধ করে চিন্তা অর্জনের ক্ষেত্রে একটা দায়বদ্ধ উত্তরণ ঘটিয়ে ফেরা খুব সহজ ব্যাপার নয়। কিন্তু কবি সেই উত্তরণ খুঁজে পেয়েছিলেন আপন শক্তির বলে। তাঁর পরিণত বয়সে লেখা কাব্য “পুনশ্চ” কিংবা “শ্যামলী” এবং তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস “শেষের কবিতায়” যে রবীন্দ্রনাথকে প্রত্যক্ষ করি তাতে নগর সভ্যতার একজন সজাগ পর্যবেক্ষক এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভাব ও ভাষ্যে অমিত ক্ষমতাবান এক বিদগ্ধ শিল্পীর মনজগতের পরিমার্জিত রূপকে ব্যাপক ক্যানভাসে মূর্তিময় দেখতে পাই। “পুনশ্চ” কাব্যের একটি অতি জনপ্রিয় কবিতা “সাধারণ মেয়ে”। তাতে নগর বাস্তবতা নিষ্ঠুরতা, প্রতারণাসহ, নারীর স্বভাবে গজিয়ে ওঠা এক ধরনের বিদ্রোহী অভিমান আবিস্কার করেছেন এবং সেই সাথে শুধু জনপ্রিয়তা লাভের জন্য আপোষকামী প্রবণতা ও সস্তা সেন্টিমেন্টাল উপাদান তথা মুখরোচক ঘটনা বিন্যাসের সকল চেষ্টাকে রবীন্দ্রনাথ বিদ্রƒপ করেছেন। একটা কঠিন প্রতিবাদী চরিত্র কবিগুরুর সত্ত্বায় ভ্রুণের মতই সঞ্জীবিত ছিল বলেই তিনি পুরোপুরি কনভেনশনার হওয়ার ইচ্ছাটাকে তীব্র ঘৃণায় পরিত্যাগ করতে পেরেছিলেন। “সাধারণ মেয়ে” কবিতায় নায়ক নরেশ একান্তই একটি প্রথাগত চরিত্র, আবার নায়িকা এলোকেশী বা মালতির জীবনে প্রতারণার অভিশাপ সমাজ বাস্তবতায় কোন অলীক অথবা দু®প্রাপ্য মনলোভা কাহিনী নয়। সৃষ্টির লক্ষ্যে মালতির মত নায়িকাদের শুধুমাত্র কলমের খোঁচায় বিশাল প্রতিষ্ঠা লাভ ও প্রতিশোধ গ্রহণের চিত্র অনেকেই আঁকেন, রবীন্দ্রনাথ তখন সেই অলীক কল্পনাপ্রেমকে স্থূল রসালাপের সমকক্ষ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবেই যেন পরিস্ফুট হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সত্য প্রীতি এবং কঠিন সত্যের প্রতি তাঁর গৌরবময় আনুগত্যের দৃষ্টান্ত।
যদি কোন যুদ্ধ ফলাফলের নিরিখে সুদূর-প্রসারী হয় এবং গোটা জাতির সাম্প্রতিক মনন ও চিন্তা প্রেমকে ভবিষ্যৎদর্শী করে তুলতে সক্ষম হয় তখন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তার প্রভাব কাটিয়ে বেড়িয়ে যাবার আন্তরিক প্রয়োজন অনুভব করতে পারে। তাই শুধু সুফল ভোগের আশায় কোন জাতি কোন এক পর্যায়ে থেকে যাবার উদাসী বাতুলতায় ভুগতে পারে। এ বাতুলতা বা ভাবালুতা রবীন্দ্রনাথকে স্থবির করতে পারে নি। তাঁর বর্ষার গান ও বর্ষার কবিতার সংখ্যা বিরাট। তাঁর অনেক বিখ্যাত গল্পে বর্ষার নানা ছবি বর্ণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে অনেকে বলতে দ্বিধাহীন যে রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন কবি কালিদাস এবং মধ্যযুগের বৈষ্ণব সাহিত্য দ্বারা প্রভাবিত এবং পরিচালিত। কিন্তু তাঁর ব্যতিক্রমের উল্লেখযোগ্য দিকটা অনেকে এড়িয়ে যান অথবা খুঁজে পাবার সামর্থ্যরে ঘাটতিতে ভোগেন। কবিগুরুর জীবন চেতনা, বিশ্বভাবনা ও প্রকৃতির রহস্য সন্ধানে এক অনিঃশেষ সংগ্রাম-বাংলার কৃষি, বাংলার মানুষের জীবিকা এবং বৈচিত্র্য্য ও প্রাচুর্যভরা প্রেক্ষিতসহ শাশ্বত মানব প্রকৃতির ব্যস্ত আকৃতির এক বিশ্বস্ত রূপ দেয়ার তাগিদে বর্ষা নিয়ে এত বেশি লিখেছিলেন বলেই মনে হয়। যে বাস্তবতা ও জীবন সচেতনতা রবীন্দ্রপূর্ব কিংবা তাঁর সমকালের ইউরোপীয় কবি-সাহিত্যিকদের এপ্রিল ও মে (বসন্তকাল) বন্দনায় অনুপ্রাণিত করতঃ তাঁর তুলনায় অনেক গভীর এক জীবন দর্শন রবীন্দ্রনাথকে আষাঢ় ও শ্রাবণের রিম-ঝিম বর্ষণের সাধনায় এক কঠোর ব্রত পালনের প্রতি আসক্ত করে তুলেছিল। এই সাধনায় তিনি যেন এক যোগী কিংবা মহাযোগী। একদিকে ধারামগ্ন রহস্যপ্রেমী রোমান্টিকতায় দোলায়িত তেমনি অন্যদিকে বর্ষানির্ভর কৃষি অর্থনীতির নিয়তি চিন্তা তাঁকে কাব্য সৃষ্টির মহাযজ্ঞে নিবেদিত করেছিল। তাঁর বিখ্যাত “বর্ষা মঙ্গল” কবিতার শেষ পঙক্তি দুটির সুর ও বাণী যেন সেই নিবেদনের কিনারা ছাপিয়ে প্রবাহশীল হয়েছে ভাগীরথীর গঙ্গোত্রীরূপে। অসাধারণ সেই পঙক্তিদ্বয় এমন-


“এসেছে বরষা
এসেছে নবীনা বরষা
গগন জুড়িয়া এসেছে ভুবন ভরসা।”

অতিক্রমণের পালা এখানে শেষ নয়। আধুনিক বাংলা গদ্য নির্মাণেও তাকে একটা সাবলীল রূপ দিয়ে নগরায়িত অবয়বে গৌরবদীপ্ত করায় তার যে কাজ, তাতে সীমানা অতিক্রমের আরও একটি বিরল দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন তিনি। যদিও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় বাংলা গদ্যকে যথাক্রমে ব্যাকরণসিদ্ধ ও সাহিত্যিকগুণে চরমভাবে সমৃদ্ধ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথেরও আগে, তারপরও বলতে অসুবিধা নেই যে তিনি বাংলা গদ্যকে তথাকথিত “একাডেমিক র্ফম ও নরম” এর বজ্র আটুনি থেকে মুক্ত করে তাকে নগর সংস্কৃতির বিকাশের স্বার্থে আপেক্ষিক অর্থে, সর্বজনগ্রাহ্য একটি গণমুখী ভাষারীতি, অথচ যা কোনভাবেই একটা স্টান্ডার্ড থেকে বহুদূরে সরে যায় নি। বরং একটা শিল্প চেতনা ও পরিমিতি বোধসহ তাকে অতিদ্রুত তিনি আধুনিকভাবে নির্মাণ করেছেন। ভাষা নির্মাতা হিশেবে তাঁর স্বার্থকতার বড় লক্ষণ হল যে তাঁর সৃষ্ট নগরায়িত বাংলা ভাষা সাধারণের মুখের ভাষার সমতূল্য হলেও সেখানে স্থূল বা অনিয়ন্ত্রিত রীতি অনুসরণ করা হয়নি। এক্ষেত্রেও তিনি অসাধারণ।
সর্বসাধারণের কাছে সহজবোধ্য করতে গিয়ে ভাষা সংস্কারের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির বহু নজির ইতিহাস সংরক্ষণ করছে। এতে প্রমাণিত হয় সংস্কারের নামে ভাষার রাজ্যে যখনই হটকারী কিংবা অদূরদর্শী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তখনই জাতি পিছিয়ে পরেছে। এইসব হটকারী গোষ্ঠী রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরি হতে পারেন না।
বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী অবদানের জ্বলজ্বলে স্বাক্ষর হয়ে আরও বহুদিন চরম গৌরবে যা টিকে থাকবে তা হল তাঁর অসংখ্য ছোট গল্প, বিচিত্র বিষয়ে রচিত অজস্র প্রবন্ধ এবং তাঁর পরিণত বয়সে লেখা মুক্ত ছন্দের অসাধারণ সব কবিতা। যে কোন দেশের আজ পর্যন্ত যারা তাঁর মত সংস্কারের মাধ্যমে ভাষাকে নাগরিক স্তরে সহজবোধ্য করে কালজয়ী সাহিত্য রচনায় অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন তারা সকলেই লড়াকু কর্মী। ঐতিহ্যগত প্রথা, সংস্কারবোধ এবং নিজের ভেতরের ধারাবাহিকতার সাথে আপোষ করে চলার দূর্বার আসক্তির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড সংগ্রাম করতে হয়েছে তাদের ঠিক সে কারণেও। রবীন্দ্র প্রতিভার যে অমৃত আমাদের পরম সম্পদ প্রকৃত অর্থে তা গোটা বিশ্ব মানবতার সম্পদ রূপেই বার বার স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। ইংরেজি ২০০৪ সালেও যদি কৌতূহলী কোন বাঙালি রাশিয়ায় যান এবং সেই বিশাল ভূ-খন্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলের পাবলিক লাইব্রেরী ও বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ খবর নেন তাহলে অবশ্যই দেখবেন যে, রবীন্দ্রনাথ সেখানে কত বেশি সম্মানিত, আরও দেখবেন যে, আমাদের কবিগুরুকে তারাও তাদের অমূল্য সম্পদ রূপে গণ্য করেন। দেশের একজন বহুল আলোচিত সাংবাদিক শাহরিয়ার কবির অতি সাম্প্রতিককালে রাশিয়ার চেচনিয়া, তাতারস্থানসহ বহু, ঐতিহ্যবাহী জনপদে রবীন্দ্র বন্দনার নানা নমুনা লক্ষ্য করে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন।
নিবন্ধের প্রথম দিকে লক্ষ্য করা হয়েছে রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন উন্নত দেশে ব্যাপকভাবে এখনও অবাধ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত আছেন। এর মুল কারণ বাংলার বুদ্ধিজীবী সমাজ ও সচেতন মহলকে অনুধাবন করা একান্ত জরুরী। এই মহান সাহিত্যিক ও দার্শনিকের কোন পঙক্তি, কোন সংলাপ, কোন বাণী কিংবা কোন বর্ণনা বা বিশেষ কোন বিবরণ পড়ে অন্ততঃপক্ষে এটা বুঝে নেয়া অসম্ভব যে তিনি কোন বিশেষ ধর্মের, জাতির কিংবা কোন একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। আসলে তিনি অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ মানুষের কবি; বিশ্বের কবি এবং গোটা ব্রহ্মাণ্ডের কবি। ‘পরিচয়’ বলতে যা বুঝি তা কোন না কোন সীমানায় বন্দী হতে বাধ্য। আর যদি এটা বিশ্বের অপরিবর্তনীয় একটা রীতি হয়ে থাকে তবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের কোন প্রকার পরিচয়ই থাকা চলেনা। কারণ সীমানার দাসত্ব করতে অন্ততঃপক্ষে তিনি জন্মেননি। অসীমের প্রতি আগ্রহ তাঁর জন্য নেহায়েত কোন সুপ্ত ভালোবাসা নয়, নয় কোন প্রকার রোমান্টিক বিলাসিতা, অসীমের প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং তার জন্য তপস্যা রবীন্দ্রনাথের জীবন-দর্শনেরই নামান্তর। তাঁর সেই অকৃত্রিম সাধনা বা তপস্যার জোর এতই বিস্তৃত, যার কারণেই তিনি সবচেয়ে বেশি ব্যতিক্রমী এক বাঙালি ব্যক্তিত্ব। বাঙালি স্বভাবের কামনা, বাঙালি স্বভাবের জাত্যাভিমান, বাঙালি স্বভাবে খেয়ালী হটকারীতা ইত্যাদি কোন প্রকার অগভীর প্রেরণা তাঁকে ছুঁয়ে যেতে পারে নি।
পদার্থ বিদ্যায় সুপণ্ডিত অধ্যাপকেরা বলতেই পারেন যে, আধুনিক বিজ্ঞানের জনক বলে সম্মানিত বিজ্ঞানি প্রফেসর আলবার্ট আইনআইনের সবচেয়ে কৃতিত্ব এই যে তিনি উচ্চতর বিজ্ঞানচর্চাকে জনপ্রিয় করতে পেরেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথেরও অন্যতম বড় কীর্তি এই যে ব্রহ্মজ্ঞানচর্চাকে আশ্রম বা গবেষণাগার থেকে মুক্ত করে সাধারণ শিক্ষিত সমাজে জনপ্রিয় করে রেখে যেতে পেরেছিলেন। তিনি কবিতাকে বলেছেন বিশ্বজ্ঞানে প্রতিমারূপে যা সাধারণের কাছেও উপভোগ্য।
ব্যক্তিগত ক্যারিশমা আমাদের অর্থাৎ, সাধারণ বাঙালিদের কাছে অত্যন্ত বিবেচ্য একটি বিষয়। বেহারার বৈশিষ্ট্যে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়ার ক্ষমতায়, ইস্যু সৃষ্টি অথবা ইস্যু ব্যবহারের আকর্ষণীয় ক্ষমতার বিবেচনায় আমরা বাঙালিরা যুগে যুগে ব্যক্তিত্ব সন্ধান করেছি এবং তাঁদেরকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধায় পূজা পর্যন্ত করেছি। এটা যেন আমাদের স্বভাবের একটা বড় দিক। কিন্তু কেন রবীন্দ্রনাথকে তাঁর প্রতিভা ও কর্মশক্তির সর্বোচ্চ সীমানায় আলোকে মূল্যায়ন করতে দ্বিধাগ্রস্ত হব?
আমার এক পরম গুরু আছেন। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক ডক্টর রমেন্দ্রনাথ ঘোষ। তার শেখানো মূল্যাবান একটা উপমার অবতারণা না করে পারছি না। আমরা জানি সব গুটিপোকা প্রজাপতি হতে পারে না। এও সত্য যে, সব গুটিপোকাই শক্ত খোলসে বন্দী থাকে। যে পোকাটি নিজ ক্ষমতায় এবং বেরিয়ে আসবার প্রবল তাড়নায় গুটি কেটে বেড়িয়ে এসে বর্ণীল পাখা মেলে, আপন মহিমা ছড়িয়ে এবং মুক্তির অমৃত সুধা পান করবার আকাক্সক্ষায় উড়তে সক্ষম সে হয়ে যায় প্রজাপতি। সামান্য গুটিপোকা আর প্রজাপতির মধ্যে যে বিস্তর পার্থক্য তা বুঝিয়ে বলার কি কোন দরকার আছে? অনুরূপভাবে জন্মসূত্রে ভোগবাদী প্রতিটি মানুষ প্রথমত বাস করে একটা শক্ত বলয়ের মধ্যে। এ বলয়ের নির্দিষ্ট কোন রূপ চেনা যায় না। প্রচলিত প্রথা ব্যবস্থা, বিশ্বাস, অনুশাসন, মোহ, আনুগত্য, ঈর্ষা, জৈবিক প্রবৃত্তি এবং সর্বোপরি কোন না কোন ‘ইজম’ ও আত্মপ্রতিষ্ঠার দুর্নিবার লোভ সব মিলিয়ে প্রতিটি ব্যক্তির একটা স্বতন্ত্র বৃত্ত প্রাকৃতিকভাবেই রচিত হয়ে যায়। তাই মানুষ মাত্রই আপন সত্ত্বা, স্বার্থ ও অহংকারের হাতে বন্দী। এই বন্দীদশা এতই সুপ্ত যে তার নিপীড়ন আমরা বুঝতে পারিনা বরং অবচেতন মনে সেই বন্দীত্বকে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলি এবং সীমানার কাছে আত্মসমর্পণ করে অসীম সুখের সন্ধান করি। মনোজাগতিক দিক থেকে মানুষের এই যে অসহায় অবস্থা সেটা যে মহাপ্রাণ মানুষটি আবিস্কার করতে পারেন এবং আত্মসমর্পণের পথে না গিয়ে বিচিত্ররূপে অভিনব স্বাদে জীবন ও জগৎকে আশ্চর্য রকমের অসংখ্য পরিবর্তন দান করতে পারঙ্গম তিনিই কেবল হতে পারেন একজন রবীন্দ্রনাথ। বাঙালিদের ঠিক সেই রকম একজন রবীন্দ্রনাথ আছে।
গুটিপোকার জাল কেটে অনেক সাধারণ পোকা প্রজাপতি হয়ে উড়তে পারে। প্রাণিজগতে সেটা কোন দুর্লক্ষ্য ব্যাপার নয়। কিন্তু মানুষরূপী কোটি কোটি গুটিপোকার মধ্যে কজন সত্যিকারের প্রজাপতি অর্থাৎ যথার্থরূপে কালজয়ী মহামানব হতে পারে? এর উত্তর ইতিহাস সচেতন জ্ঞানী মানুষ বলে যারা সম্মানিত অন্ততঃ তাঁদের জানা থাকা জরুরী। রবীন্দ্রনাথ কোন পর্যায়ের কবি, তিনি কোন মাত্রার বাঙালি আর মানুষ হিশেবে রবীন্দ্রনাথ কত বড় একটা জগত, তা নিরূপণ করে আগামী দিনের প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়া হবে একটি সঠিক গন্তব্য।
রবীন্দ্রনাথের কর্মে ও সাধনায় যে গন্তব্য আলোকিত হয়েছে বারবার তার স্বরূপ দর্শন যদি একান্তই আমাদের কাম্য হয়ে থাকে, তবে একটু কষ্ট স্বীকার করলে তার কিছুটা নমুনা বাস্তবেই দেখতে পারি। তার প্রেরণার ও পরিকল্পনায় কবির জীবদ্দশাতেই পশ্চিমবঙ্গের বোলপুরে শান্তিনিকেতন নামে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি গড়ে উঠেছিল তা আজও স্বমহিমায় বর্তমান। রবীন্দ্রনাথের অন্যতম গুণী সন্তান যেন সেই ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি। তার অবকাঠামো ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতা ভিত্তিক পাঠ পরিকল্পনা ও তার সার্বিক ব্যবস্থাপনার যত আয়োজন তা দেখে অবশ্যই ধারণা করা যায় যে এযাবৎ কালের বিশ্বের তাবৎ যত শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ, তাদের পটভূমি, তাদের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবমুখী পরিকল্পনা প্রণয়নে তাদের গতানুগতিক মানসিকতা বিষয়ে বাঙালি রবীন্দ্রনাথ কত বেশি উদগ্রীব ছিলেন। তাঁর সমকালে যদিও ইতালীয় রেনেসাঁর বিস্তর প্রভাব পাশ্চাত্যে অনুভূত হত কিন্তু তারপরেও ইউরোপ-আমেরিকায় প্রায় সকল নেত্রস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে হয় ক্যাথলিক ঐতিহ্য না হয় প্রটেস্ট্যান্ট আদর্শ মহাদাপটে কার্যকর ছিল। একটা নির্ভেজাল অসাম্প্রদায়িক চেতনা সেখানে ছিল না। সত্যিকারের ‘লিবারেল’, ‘ইউনিভারসাল’ বা ‘সেক্যুলার’ শিক্ষা যা সাধারণ মানুষকে ধর্ম, ভাষা কিবংবা ইতিহাস ও ভূগোল সূত্রে প্রাপ্ত সকল মান-অভিমান, অহংকার, বর্ণবাদী হিংসা তথা সকল সংকীর্ণ সীমাবদ্ধতা জয় করতে যে নিখাদ মনুষ্যত্ব বোধ দরকার তার দুঃখজনক অভাব হয়ত তিনি হৃদয়ে অনুভব করেছিলেন। তাই সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও অভূতপূর্ব এক সার্বজনীন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে এক যথার্থ মহামানবের দায়িত্ব পালন করে আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন পরম পূজ্য বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কেউ কেউ হয়ত বলতে চাইবেন যে, বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু সনাতনী ধারা চালু আছে। তবে সেগুলোর জাগতিক মূল্যবোধ বর্জিত নয়।
এ আলোচনার কোন উপসংহার হয় কি? বোধ হয় তার কোন দরকার নেই। কেননা রবীন্দ্র আলোচনার যবনিকা টানবার উপযুক্তকাল কত দূরে তা একমাত্র সুদূর আগামীই বলে দিতে পারবে। আপাতত এইটুকু বলে থামা যায় যে, আমরা কি কেবল নোবেল জয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উত্তরসুরী না সকল সীমানা নস্যাৎকারী কালজয়ী অদ্বিতীয় যে বাঙালি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আমরা তার উত্তরসুরী? আমরা কি শুধু আমাদের গর্বের জাতীয় সঙ্গীত, “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” এর রচয়িতা রবীন্দ্রনাথের উত্তরসুরী, না জোড়া সাঁকো ঠাকুর পরিবারের যে বাঙালি সন্তান রুশো, ভলতেয়ার, টলস্টয়, লেলিন, রাসেল কিংবা সেক্সপিয়ারের মত বিশ্ব ব্যক্তিত্বকে ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে মহামানবের আসনে পরম পূজ্য রবীন্দ্রনাথ আমরা তাঁর উত্তরসুরী? এ আত্মজিজ্ঞাসা আরও গভীর হলেই ভালো। তিনি একটি সীমানার গণ্ডির মধ্যে আত্মপ্রসাদ পাওয়ার চিরাচরিত বঙ্গজ-বিলাসিতা থেকে মুক্তি পাবার নির্দেশ দিয়ে গেছেন বলেও রবীন্দ্রনাথ আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

0 comments:

Post a Comment