July 24, 2008

শেষ নাহি যে...

শেষ নাহি যে...
শুক্লা মৈত্র



শেষকথা কে বলবে’ - সত্যিই, কোথায় শেষ, কোনটা শেষ একথা কেউ জানে না, কেউই বলতে পারে না। আমাদের চলার পথের দুটি দিক জীবন বা জন্ম ও মৃত্যু। আজ ‘যা’ আছে কাল ‘তা’ নেই। কিন্তু তবুও থেমে নেই কিছু। সুখ-দুঃখের আবর্তে আমরা চলেছি সামনের দিকে - মাঝে মাঝে থমকে থেমে যাই, পিছন ফিরে তাকাই, ফেলে আসা দিন, হারিয়ে যাওয়া জনের কথা ভাবি, কিন্তু আবার সামনে তাকাতে হয়। সাধারণ মানুষ আমরা, প্রিয়জনের বিয়োগে ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যাই, মনে হয় আমার চারদিক স্তব্ধ, শূন্য সবই নিরর্থক কিন্তু এই থেমে যাওয়া ক্ষণিকের রাত পোহালেই দেখা হয় সূর্যদেবের সঙ্গে আবার আকাশের আলো ফোটে, পাখি ডাকে -সংসারে প্রাণের সাড়া জাগে-কাজের ডাক আসে-সেই ডাকে সাড়া দিতে আমরা বাধ্য হই, শূন্যতাকে বুকে চেপে ধরে। মাঝে মাঝে মনে হয় কী যেন নেই-কী যেন অস্বস্তি।
-এই তো জীবন জগৎ সংসারের নিয়ম। জন্ম-মৃত্যু বিধাতা নির্দিষ্ট, সেই নিদিষ্ট পথেই আমাদের এগিয়ে চলা - তাকে অস্বীকার করি কী করে।
জন্ম-মৃত্যু দিয়ে এই জীবনের চলার ছন্দকে খুব কাছ থেকে অন্তরে অনুভব করেছিলেন, সর্বাপেক্ষা বেশি মনে হয় সেই সব শ্রেষ্ঠ মননশীল মানুষটি যিনি ‘পৃথিবীর কবি’ - আমাদের পথের দিশারি, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ।
একান্ত আপনজনের বিয়োগ-ব্যথায়, চিন্তায় মন যখনই কাতর হয়, ভারাক্রান্ত হয়, তখনই মনে হয় ওই বিশ্বপথিকের কথা, রবীন্দ্রনাথের কথা, যিনি তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আশ্বাস দিয়েছেন মানুষকে-নিজের জীবনে মৃত্যুর আঘাতকে পরম ধৈর্যের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন, গানে কবিতায় বারবার পরিচয় পাই-চলে যায় না কিছুই-বিচ্ছেদের আড়ালেই মিলনের বীজ আছে। ‘যে ফুল না ফুটে’ ঝরে গেল-‘যে নদী মরুতে পথ হারালো ’তারও অস্তিত্ব আছে- কিছুই হারায়নি - শেষ হয়ে যায়নি।
মৃত্যু নিয়ে রবীন্দ্রনাথের গানে, কবিতায় কেবল একটি সুর দেখি, দুঃখের আঘাতকে তিনি সেই ‘পরম পিতার প্রেম’ বলে জেনেছেন। তাঁর মতে মৃত্যু আঘাতে যখন বন্ধন ছিন্ন করে তখন যেন এই অনুভূতিই হয় - ‘তোমার পরশ আসে, পথে চলে যেতে যেতে’।
কবির জীবনে ঝড় এসেছে কতবার-‘ভেঙেছে দুয়ার’-সব কালো হয়ে, ‘দীপের আলো’ নিভে গিয়েছেÑআবার যখন প্রভাত হল, ঘরভরা শূন্যতার মধ্যে কবির অনুভূতি-দাঁড়িয়ে আছ তুমি একা! এমন গান, এমন বাণী আমাদের জীবনে আশ্বাস বয়ে আনে। তবু বলব, সাধারণ মানুষ আমরা এত সহজে কি এ আশ্বাস গ্রহণ করতে পারি?
এক এক করে এই মহাপথিকের জীবনে মৃত্যু-আঘাত এসেছে। জ্যেষ্ঠ সন্তান কন্যা বেলা বা মাধুরীলতা, দ্বিতীয়া কন্যা রেণুকা বা রানি, স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রনাথ [মাত্র ১১বছর বয়সে] দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথ কবিকে ছেড়ে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে লোকান্তরিত হয়েছেন অকালে।
এরপরে প্রশ্ন জাগে, কবির মনে, সংসারে যা কিছু বাস্তব, এত সব হারিয়েও কি তারা তেমনি সত্য থাকবে?এ কথা স্বীকার করতে তাঁর কষ্ট হয়েছে, তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিতেই যেন বলেছেন অস্তগামী সূর্য তো হারায় না, পরদিন প্রাতে সে ফিরে আসে নতুনভাবে নতুন রূপে।
‘বলাকা’য় বলেছেন রবীন্দ্রনাথ’ ‘এমন একান্ত কার চাওয়া/ এও সত্য যত/ এমন একান্ত ছেড়ে যাওয়া/ সেও সেই মতো।’
এই থাকা ও চলে যাওয়ার মধ্যে কবি মিল খুঁজে পেয়েছেন তাই বলেছেনÑ‘নহিলে নিখিল/এতবড় নিদারুণ প্রবঞ্চনা হাসি মুখে এতকাল কিছুতে বহিতে পারিত না।’
রবীন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠা কন্যা ‘বেলা’ ছোট বোন ‘রেণুকা’র মৃত্যুর পর লেখেন, যাতে পিতার মতনই অনুভূতির পরিচয় পাই-‘মহৎ দুঃখ একটা মহৎ-শিক্ষা, দুঃখ না পেলে মন পরিপূর্ণতা লাভ করে না, হৃদয় সরস হয় না, ‘পর দুঃখে দ্রব হয় না।’
এমন অনুভূতির কথা শরৎচন্দ্রের লেখাতেও দেখি। ‘পণ্ডিত মশাই’ গল্পে দেখি, বৃন্দাবন তার ‘বালকপুত্র’ চরণকে হারিয়ে, গ্রামের অন্যান্য ছেলেদের মধ্যে তার হারিয়ে যাওয়া চরণকে যেন খুঁজে পায় - শূন্য বুকে জড়িয়ে ধরে ছেলের খেলার সাথীদের, শত চরণকে যেন খুঁজে পায়।
-এই তো মনের বিস্তৃতি ছোট পরিসর থেকে বৃহত্তরতে উত্তরণ।
আমরা সাধারণ মানুষও কি এভাবে নিতে পারি? হয়তো পারা যায়, সম্ভব হয়, পথ দেখিয়েছেন তো ওঁরাই।
মৃত্যুতে জীবনের শেষ হয় না, আগামী দিনের সূচনা থাকে তাতে। ‘এক যায় আর আসে’। সমস্ত কিছুর মধ্যে একটা মিল, একটা সামঞ্জস্য খুঁজে পেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। জন্ম-মৃত্যুর মাঝেও তাই সামঞ্জস্য অনুভব করেছেন। ব্যক্তি জীবনের ছন্দ, সুষমা আনন্দ একদিকে যেমন আছে-এর বিপরীত মেরুতে তেমনি আছে অনিশ্চিত সম্ভাব্যতা, ছন্দহীন, এলোমেলো, জটিল অজানা অস্তিত্ব। তাই কাছ থেকে বারবার মৃত্যু দেখে ওই অজানা অস্তিত্বকেও জীবনে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছিলেন তিনি। অজানাকে ভয় পাননি। বরণ করে নিয়েছেন, ভবিতব্যরূপে - তাই বলতে পেরেছেন -
‘মরণরে-
তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান’
অনিশ্চিতকে গ্রহণ করার জন্য মানুষকে কিছুটা আত্মমগ্নতা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। একটা সময় রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘এই মাটিতে রইল তাহার বিস্মিত প্রণাম।’ এখানে আশীর্বাদ নয়, মানবপ্রীতি নয়, হঠাৎ যেন নিজের সমস্ত ‘অহংবোধ’ বিসর্জন দিয়ে, নিজেকে অকিঞ্চিৎকর মনে করে, এক বিশালের মুখোমুখি হয়ে আত্মসমর্পণ করেনÑ ‘বড়ো বিস্ময় লাগে... ’।
‘শেষ সপ্তক’-এর ১৮ নং কবিতায় ‘শোকের অভিমান’ , ‘শোকের অহংকার’ শব্দগুলির ব্যবহার দেখা যায়। পরে তা বিস্ময়বোধে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে দেখি, ‘জীবন’ বা মৃত্যু’র মানে খোঁজেননি আর। তিনি উপলব্ধি করেন সবই আকস্মিক। তাই মৃত্যুকেও দেখেন এক জ্যোতি রূপে’-

‘আলোকে তার দেখা দিল / অখণ্ড
জীবন যাহে জন্মমৃত্যু এক হয়ে আছে।’
[জন্মদিনের ৮নং কবিতা]
রবীন্দ্রকাব্যে জীবনের সম্পর্কে যত কথা বলা আছে, মৃত্যু সম্পর্কেও ততই বলেছেন তিনি। কারণ তাঁর মতে, জীবন ও মৃত্যুর কথা প্রকৃতপক্ষে একই কথা দুই রূপ এক সঙ্গে মিলেমিশে জীবনের কথা হয়ে দাঁড়ায়। মৃত্যুকে জীবনের ব্যতিক্রম বলে মনে করেননি তিনি। জীবনের যাত্রা পথেরই একটি ধাপÑএ যেন ‘রুদ্রের দক্ষিণ রূপ’। কবির কথায়,‘জন্মান্তের নব প্রভাত’। মৃত্যু আমাদের মানব জীবনের অনেক অপূর্ণতার পরিপূরক। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কবি বলেছেন -‘আমি মৃত্যু চেয়ে বড়ো, এই শেষ কথা বলে যাব, আমি চলে।’
মৃত্যুকে নির্ভয়ে, নির্ভার হৃদয়ে গ্রহণ করতে হয় কীভাবে, তা রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন। জীবনের যাত্রাপথে কত দুঃসহ মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করেও তিনি সেই বিচ্ছেদকে, নির্মম সত্যকে আত্মস্থ করে ‘মিলনের গান’-রূপান্তরিত করেছেন। এখানেই বোধ করি তার সৃষ্টির সার্থকতা। নির্ভীক হৃদয়ে বারবার ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবনে মৃত্যুকে আর ভালবাসাকে অনুভব করেছেন - একীভূত করেছেন।
শোক, দুঃখ ছিল কবির জীবনের নিত্য সহচর। তাই দুঃখ, মৃত্যু, বিরহ, বিচ্ছেদ সব কিছুর মধ্যেও ‘প্রাণের গতিময়তাকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। তাঁর মতে, ‘সত্তার সত্য হল প্রাণ, কখনওই মৃত্যু নয়।’ উপনিষদ থেকে এই উপলব্ধি তিনি লাভ করেছিলেন। বৃক্ষের মধ্যে ওই জীবনের পর্ব, পর্বান্তরের রূপটিও উপনিষদে আছে। রবীন্দ্রনাথও একে বড় করে তুলে ধরেছেন। তাই রবীন্দ্র-প্রয়াণ ও বৃক্ষরোপণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
রবীন্দ্রনাথের মতে, শ্রাবণ মাস অর্থাৎ বর্ষা ঋতু জীবনের ঋতু। আমার মনে হয়, গুরুদেবের সমগ্র জীবন ও সাহিত্যসৃষ্টি-সে তো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের জাগরণের সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্দীপক। তাই যে কোনও আলোচনায়, ব্যাখ্যায় তাঁর কথা, তাঁর দৃষ্টান্তই মনে পড়ে লেখনীতে উঠে আসে।
শ্রাবণ যদিও জীবনের ঋতু, তবুও বারবার শান্তিনিকেতনে শ্রাবণেই মৃত্যুর ছায়া পড়েছে। হয়তো বা এ-ও ইঙ্গিতবহ, জানি না। গুরুদেবের মহাপ্রয়াণ ২২শে শ্রাবণ, আবার ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের আর এক ২২শে শ্রাবণের মুখোমুখি হয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, কবির কনিষ্ঠা কন্যা মীরাদেবীর এক মাত্র পুত্র নীতীন্দ্রনাথ, সেই দিনটিতে অকাল প্রয়াত হন।
এই শ্রাবণে আমরা মৃত্যুকে, জীবনকে নতুন করে বুঝবার চেষ্টা করি। গুরুদেবের চলে যাওয়ার দিনটিতে স্মৃতিতর্পণ করে বারবার তাঁকে স্মরণ করি। শান্তিনিকেতনে সে দিন একটি নতুন প্রাণকে অর্থাৎ শিশু গাছকে রোপণ করা হয়। এইখানেই ২২শে শ্রাবণের তাৎপর্য। মৃত্যু ও জীবনকে সেদিন উৎসবের মাঝে একই সঙ্গে সম্মান জানানো। এই বৃক্ষরোপণ রবীন্দ্রনাথেরই শিক্ষা।
বৃক্ষ শেখায় পুনরুজ্জীবনের মন্ত্র। তাই বলা যায়, বৃক্ষরোপণ উৎসবে প্রাণের আহ্বানে জীবন ভরে ওঠে, মৃত্যুর শোক যায় ঝরে, বাকি সব হয়ে ওঠে জীবনের পাথেয়। তাঁর এই শিক্ষাই আমাদের শোকবিহ্বল মনকে হয়তো বারবার সান্ত্বনা দিয়েছে। শক্তি জুগিয়েছে সব মানব জীবনেই তাঁর জীবনশিক্ষার ‘অমৃতধারা’ বর্ষিত হোক, আজকের দিনে এই প্রার্থনাই করি।
যাঁর ‘ভ্রুকুটি ভঙ্গে’ আমাদের বুক কেঁপে ওঠে, যাঁকে প্রথমে কবিও মনে করেছিলেন দূর থেকে দেখে ‘দুর্জয়, নিষ্ঠুর’ তাঁকেই কাছে থেকে দেখে উপলব্ধি করেছিলেন,
‘যতো বড়ো হও
তুমি তো মৃত্যুর চেয়ে বড়ো নও।
আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়ো,
এই শেষ কথা বলে, যাব আমি চলে।’

সত্যিই তাই, আমরা কি তাঁকে ভুলেছি? তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে আজও তিনি বিরাজমান, অমলিন। আমাদের কাছে, বিশ্বজগতের মাঝে।
আমাদের প্রিয়জনেরাও তেমনি যে শিক্ষা, যে প্রাণ দিয়ে গিয়েছেন, তার মধ্যে দিয়েই তাঁরা বেঁচে আছেন আমাদের মধ্যে-তাঁদের সত্তার প্রকাশ আমাদের মাঝে-এই প্রবাহমানতার মাঝেই বেঁচে থাকি আমরা, টিকে থাকে জগৎ ও জীবন। তাই কবির সঙ্গেই এই সত্য উপলব্ধি করে আশ্বস্ত হই

-শেষ নাহি যে -

0 comments:

Post a Comment