July 24, 2008

ফুঁড়কুটি ডাঙা

ফুঁড়কুটি ডাঙা
ম আ ব সিদ্দিকী

প্রথম মঞ্চায়ন
মহান মে দিবস-১৯০৮, ১৮ বৈশাখ-১৪১৫
স্থান: কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, নওগাঁ

প্রযোজনা ,ব্যবস্থাপনা ও নির্দেশনা: চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র-নওগাঁ
মঞ্চে প্রবেশের ক্রমানুসারে :
আজমত - জয়নাল আবেদীন মুকুল
নির্মল - মতিউর রহমান মিঠু
ওরেফা -
আব্বাস - শমসের মোল্লা
মালিক সমিতির লোক - মাহাবুদুর রহমান বাবু
কর্মকর্তা - হবিবর রহমান চৌধুরী
মিশুক - মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু
ছাত্র - মতিউর রহমান মিঠু
পাটকল শ্রমিকের ছেলে - জয়নাল আবেদীন মুকুল
বৃদ্ধ তাঁতি - ম আ ব সিদ্দিকী
আলকাপের নানা - ম আ ব সিদ্দিকী
নাতি - শমসের মোল্লা
ঝামু [মুচি]-
রামু [মুচি] -
বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী - হবিবর রহমান চৌধুরী
কবি - জাহিদ আনোয়ার
রঞ্জন পাগলা - নিখিলচন্দ্র মজুমদার
আদিবাসী সোবিন মুণ্ডা - --------
সূর্য সেন - জয়নাল আবেদীন মুকুল
মিঠু - মতিউর রহমান মিঠু
কনস্টেবল - মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু
বাস যাত্রী - জয়নাল আবেদীন মুকুল
কিশোর-১ প্রতীক
কিশোর -২ রাতুল
পোস্টার শিল্পী - আনোয়ার হোসেন মিঠু
প্রমটর - কাপুর চাঁদ
সহযোগিতা - বিষ্ণুপদ সরকার, কালিপদ সরকার

নাটক- ‘ফুঁড়কুটিডাঙা’

১ম সর্গ

মঞ্চে ব্যাক স্ক্রিনে লেখা থাকবে
‘কেজি প্রতি ৩৫ টাকা দরে চাল বিক্রি হয়
জনপ্রতি ২ কেজি করে চাল পাবে।’
সময় ; সকাল ১০টা হতে দুপুর ১২টা পর্যন্ত
ব্যবস্থাপনায় : ফুঁড়কুটি ডাঙা আড়তদার সমিতি।

এক অংশে চাল বিক্রির আয়োজন। আরেক অংশে চাল ক্রেতা মানুষ। লাইন দিয়ে দাঁড়ানো। হাতে বাজারের ব্যাগ। লাইন থেকে দু’জন বেরিয়ে আসে।

আজমত : এত ধান! কত কষ্ট কর‌্যা ফলাই। সার ঠিকমত পাওয়া যায় না। ওটিও লাইন। ১৩০০ টাকার বস্তা ২০০০ টাকা। তাও পাওয়া যায় না।
নির্মল : তাও ধান ওঠানোর পর দেনা শোধ কর‌্যা শেষ। বউ বাচ্চা লিয়া কি খামু!
আজমত : স্কুলের মাস্টারনীরা কয় বাচ্চাক স্কুলে পাঠান। হামরাতো পড়াবার চাই। প্যাটত ভাত না থাকলে স্কুলে যাইয়া কি করবে?
আব্বাস : থো তোর স্কুল। লাইন ধর।
আজমত : ঘিন্না ধর‌্যা গেল। সব জায়গাত লাইন। ভ্যান চালামু ওটি লাইন। চাল লিবা আচি এটিও লাইন।
নির্মল : কি করবু বাড়িত চাল লিয়া গেলে গা খাবার।
আব্বাস : দুই কেজি চালে কি হয়? লাইনত দাঁড়ামু না কাম করমু?
নির্মল : কাম কোন্টে! কামতো নাই। ঋণ লিয়া চাল কিনবা আচি।
আজমত : হামার একটা হাঁসা আচল। সেটা কালকা বিক্রি করচি। হাঁসিটা আজকা বিক্রি কর‌্যা এটি আচি।
ওরেফা: হামার গ্রাম এটি থ্যাকা সাত মাইল দূরত। ওটি থ্যাকা কোলের এই বাচ্চা কোনাক লিয়া এটি আচ্চি। লাইনত একটা ইট থুয়া বাড়িত গেছি কালকা রাতোত। সকাল হলে আবার আচ্চি। দুধের এই বাচ্চা কোনাক লিয়া দাঁড়া আচি। খাওয়া নাই , হাগা নাই, মোতা নাই। বিকাল চারটাত চাল পানু, তাও দুই কেজি।
আব্বাস : কথা থামা। লাইনে আয়। ওই দ্যাখ্ চাল দিবার শুরু করিচে।
সমিতির একজন লোক : ঠিকমত লাইনে দাঁড়ান।
[লাইন সোজা হয়]
[চাল দিতে দিতে চাল শেষ হয়ে যায়। আব্বাস, আজমত, নির্মল চাল পায় না]
[মঞ্চ খালি হতে থাকবে। কিন্তু আজমত, নির্মল, আব্বাস হতবাক হয়ে থাকবে। ধীরে ধীরে তারা নেমে আসবে]

দ্বিতীয় সর্গ

সেমিনার চলছে। ব্যাক স্ক্রিনে ব্যানার থাকবে।
‘দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় আমাদের করণীয়’
আয়োজনে মানব উন্নয়ন সংস্থাÑআকাশ দীপ’

[একজন কর্মকর্তা কথা বলছেন। গ্রাম থেকে আসা কিছু নারী পুরুষ যারা এই সংস্থার ঋণ গ্রহীতা বসে কথা শুনছে]

কর্মকর্তা : দেশে দুর্ভিক্ষ চলছে। আপনারা জানেন। এর প্রধান কারণ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। সেই তুলনাই খাদ্য নাই। সরকার দাতা সংস্থার কাছে ঋণ নিয়ে বাহির থেকে চাল গম এনে আপনাদের খাওয়ায়। আজ যদি বিদেশ থেকে চাল, গম, সোয়াবিন না আসত, আমাদের কি হত? হ্যাঁ কি হত? না খেয়ে মারা যেতাম। হাজার হাজার লোক সোমালিয়া, নাইজেরিয়ায় না খেয়ে মারা যায়। আমরা উন্নত বিশ্বের সাথে পাল্লা দিয়ে উঠতে গেলে সবাই খেতে হলেÑখাদ্যাভাস পরিবর্তন করতে হবে। চাল খেতেই হবে, এমন কোন কথা নেই। আগে গমের রুটি আমরা খেতাম না। প্রথম প্রথম অসুবিধা হচ্ছিল। এখন গমের রুটি খাওয়া বিরাট ব্যাপার। গমের দাম চালের চেয়ে বেশি। তাই চালের উপর বেশি চাপ পড়েছে। এখন রাস্তা ঘাট, দোকান পাট, বাড়িঘর বৃদ্ধির ফলে, জনসংখ্যার চাপে ফসলি জমি কমে যাচ্ছে। তাই এখন চালের উপর আর নির্ভর নয়। আলু ভুট্টা খান। দেখবেন অভ্যাস হয়ে যাবে। দুর্ভিক্ষ থাকবে না। পেটের চিন্তা নাই। শুধু জিহ্বাটার স্বাদের পরিবর্তন। বুঝা গেল । হ্যাঁ।
জনৈক শ্রোতা : স্যার, আপনাদের ঋণে যে হাঁস মুরগী কিনিচি, বার্ডফ্লুতে সব মরা গেছে। ঋণের কিস্তি কিভাবে দিমু?
দ্বিতীয় শ্রোতা : ঋণের কিস্তি শোধ করতে করতে এই দশ বছরে সব হারায়ে এখন বোল্ডার বাঁধ’ত উঠিছি। আমারত একই কথা বার্ডফ্লুতে সব মরা গেল। কি করমু?
তৃতীয় শ্রোতা : আপনাদের শ্লোগান ‘ঋণ পাওয়া অধিকার’। তবে ঋণ নিয়ে আমরা গরীব হচ্ছি। আত্মহত্যা করল আমাদের গ্রামের সবের, মতির মা, আরতীবালা। তাহলে এটা অধিকার না ফাঁসি? ঋণ নিয়ে ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে ঝুলে থাকা।
[মঞ্চ খালি হবে। ঘুড়ি উড্ডয়নের আয়োজন চলছে। জেলা প্রশাসক উদ্বোধন করবেন। জেলা প্রশাসক ঘুড়ি উড়িয়ে উদ্বোধন করে চলে যাবেন। মিশুকের প্রবেশ]
মিশুক: এই যে দেখলেন, সব প্রতারণা। মানুষের মুক্তির আকাঙ্খা। খরস্রোতা নদীর মত পাথর ঠেলে ঠেলে বহমান থাকতে চায়।
আর এরা তাদের বাধা দেয়। ষড়যন্ত্র, ভণ্ডামি, জোচ্চুরি এসব করে ধোঁকা দেয়।
সমাজের নিজস্ব গতি আছে। মানুষের বিকাশের নানা কালপর্ব আছে। ৩০-৩৫ লক্ষ বছর আগে আজকের মানুষের পূর্বপুরুষের দেখা পাওয়া গেছে। গুহায় এদের বসবাস। তারপর সমতলভূমিতে নেমে আসে। বনাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো। শিকারী মানুষ। বিভিন্ন ছোটখাটো গোত্রে তারা বাস করে। গোত্রের প্রবীণ মানুষের কথামত তারা চলে। কারও কোন ব্যক্তি সম্পত্তি নাই। নদী, সমুদ্রতীর বেয়ে মানুষেরা চলতে থাকে। একসময় নদীরতীর গুলিতে যেখানে পশু চারণভূমি সেখানে বসতি গড়ে। পশুপালন যুগ। এখানে পশুপালন গোষ্ঠী। স্থিরভাবে একটি জায়গায় আসে। পাথর আর লাঠির বদলে বর্শা ও তীরের ব্যবহার শেখে। আগুন আবিষ্কার, মৃৎশিল্প। মেয়েরা ঘরে থাকত। ঘরের বাইরে শস্যের বীজ বোনা। কৃষি কাজ শুরু। গোত্রের মানুষের সাথে গোত্রের যুদ্ধ। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উদ্ভব। প্রথমে পরাজিত গোত্রের মানুষকে মেরে ফেলত। পরে পরাজিতদের দাস বানিয়ে কৃষি, কুটির শিল্পে নিয়োগ....... দেখা দিল দাস শ্রমের ভিত্তিতে দাসসমাজ। ভূমিদাসের শ্রমের ভিত্তিতে সামন্ত সমাজ। তখন উৎপাদন হত নিজস্ব ভোগের জন্য। বিক্রির জন্য নয়। স্থানীয় লোকেরা উৎপাদন করত নিজস্ব ভোগের প্রয়োজনে। সামন্ততন্ত্রের গর্ভে পুঁজিবাদ এলো। পুঁজিবাদ উৎপাদনের দু’টি বৈশিষ্ট্য।
পুঁজিবাদী উৎপাদনে পণ্য বিক্রির প্রাধান্য। বিক্রির জন্য উৎপাদন। মুনাফার জন্য উৎপাদন। মনুষ্য শ্রমজাত উৎপন্ন দ্রব্যই কেবল নয় বরং খোদ শ্রমশক্তিই পণ্যে পরিণত হয়। পুঁজিবাদের আগেও পণ্য উৎপাদন ছিল। কিন্তু পুঁজিবাদেই পণ্য উৎপাদন সর্বজনীন হয়ে ওঠে। মালিক শ্রেণী পণ্য উৎপাদন করে বাজারে বিক্রির জন্য। তাদের উদ্দেশ্য মুনাফা। নিজের ব্যবহারের জন্য নয়, বিক্রির জন্য। শ্রমজাত সকল উৎপন্ন দ্রব্যই পণ্য। স্বাভাবিক অর্থনীতি দাস, সামন্ত সমাজেও ছিল। মধ্য যুগে সরল পণ্য উৎপাদন দেখা দেয়। শ্রমই মূল্য সৃষ্টি করে। ব্যবহারিক মূল্য সৃষ্টি করে মূর্ত শ্রম। যে পর্যন্ত তা মূল্য সৃষ্টি করে তা বিমূর্ত শ্রম।
যেখানে শ্রমশক্তি পণ্যে রূপান্তরিত। লেনিন দেখালেন ‘পুঁজি কোন জড় পদার্থ নয়। তা হল একটি সামাজিক সম্পর্ক। আমরা যে সব জিনিশ দেখি কাগজ, যন্ত্রপাতি সব কিছু পুঁজি নয়। যখন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই শোষণের যন্ত্রে পরিণত তখন তাই পুঁজি’।
মুনাফার উদ্দেশ্যে হাজির হচ্ছে তখনই সেটা পুঁজি। পুঁজি তাই সামাজিক সম্পর্ক। পুঁজিবাদ থাকলে পুঁজি থাকবে। লুণ্ঠন বৈষম্য থাকবে। ক্ষুধা দারিদ্র থাকবে। দুর্ভিক্ষ থাকবে। মানুষ মনুষ্যত্বহীন হবে। এই পুঁজিবাদে দুটি শ্রেণী বুর্জোয়া শ্রেণী ও শ্রমিক শ্রেণী ঐতিহাসিকভাবে আবির্ভূত হয়েছে। এদের অবস্থান কারও ইচ্ছাধীন নয়। ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবে অবস্থান করে। শ্রমিক শ্রেণী সম্পদ সৃষ্টি করে। বুর্জোয়া শ্রেণী সম্পদ লুণ্ঠন করে। একদিকে সম্পদের প্রাচুর্য পাহাড় অন্যদিকে দারিদ্র, অশিক্ষা, অভুক্ত মানুষের মহামিছিল। আমাদের দেশও পুঁজিবাদী দেশ। যেদিকে তাকাবেন বৈপরিত্য দেখতে পাবেন।
রাস্তায় কেউ গাড়িতে চড়ে। কেউ ভিক্ষার থালা হাতে হাত পাতে। একদিকে উচ্চ উচ্চ বিশাল বাড়িঘর। অন্যদিকে বস্তিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ। একদিকে গোলাপ ফুলের প্রদর্শনী অন্যদিকে ক্ষুধিত মানুষ রাস্তায় গোঙাচ্ছে। না খেয়ে মানুষ কতদিন থাকবে। তাই সঠিক পার্টির নেতৃত্বে একই উদ্দেশ্যে সুখী উন্নত বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শের ভিত্তিতে পুঁজিবাদ বিরোধী সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এটাই আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। অসংগঠিত, স্বত:স্ফূর্ত জনতার বিস্ফোরণ বিপ্লব নয়। আদর্শের ভিত্তিতে সঠিক পার্টির নেতৃত্বে সংগঠিত জনগণের অভ্যূত্থানই বিপ্লব।
একজন ছাত্র : [প্রবেশ করবে]
আমি ম্যানেজমেন্টে এম. এ পাশ। আমি বেকার।
একজন দরিদ্র যুবক : [প্রবেশ করবে]
আমার বাবা পাট কলে চাকরি করত। যেদিন পাটকল বন্ধ হয়ে গেল ঠিক সেদিন আমাদের ঘরের মেয়েরা পতিতালয়ে নাম লিখাল। আর ছেলেদের উদ্দেশ্যহীন জীবন শুরু হল। জীবনের সব সবুজ হারিয়ে ফেলল।
[এক দরিদ্র বৃদ্ধের প্রবেশ। দুই যুবকের কাছে এসে বলবে]
বৃদ্ধ : বাবা, তোমরা আমার ছেলে মেয়েকে দেখেছো? আমার মেয়েকে কয়েকদিন খুঁজে পাচ্ছি না। আমি একজন তাঁতি বাবা। তাঁত বন্ধ হবার পর অভাব অনটন। ছেলে বহুদিন থেকেই নেই। মেয়েটাকে খুঁজে পাচ্ছি না। স্ত্রী ঘরে পড়ে আছে প্যারালাইসিস হয়ে। চোখে ছানি। দেখতেও পায় না। বলতো। বলতো আমি কি করব! রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। মরলেই বাঁচি। কিন্তু মরতে পারছি কই। মরতে পারছি না।
মিশুক : দেখুন। এদের দেখুন। দু’মুঠো ভাত জোটে না এদের। ভাত আজ আকাশের চাঁদ। জুঁই ফুঁলের মতো শাদা ভাত। সুগন্ধ ভাত ছোঁয়া যায় না। দুঃস্বপ্ন আজ বাস্তব। বাস্তব আজ ভয়াবহ। মহামিছিল। অগণিত মানুষ। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফুঁসছে। বৈশাখি ঝড়ের মতো দুর্বার হয়ে উঠছে। তাদের কাছে সবুজ মাঠ, আকন্দ, তুলশি, কাঁঠালের পাতা ধূসর বিবর্ণ। মৃত্যুর দিন গোনা, না হয় অজানা উদ্দেশ্যে ঢাকা শহর গিয়ে বস্তিতে বস্তিতে একদিন দুই দিন তিন দিন পরপর কাজ না পেলে না খেয়ে থাকা। এভাবে আমরা কিভাবে বাঁচবো?
কর্মকর্তা : এক মন্ত্রী কি বলেছিলেন জানেন না আপনেরা?
সমস্বরে : কি বলেছিল? কি বলেছিল?
কর্মকর্তা : বলেছিল-বাঁচা মরা আল্লার হাত। জন্ম-মৃত্যুতে মানুষের কোন হাত নেই। না খেয়ে কেউ মরে না। ডায়ারিয়া, জন্ডিস যেগুলো মানুষের অশিক্ষা থেকে এসেছে। ঠিক আছে আলু খান। ভুট্টা খান। খাওয়ার অভ্যাস পরিবতর্ন করলে কেউ না খেয়ে মারা যাবে না। হানড্রেড পারসেন্ট কথা, না খেয়ে মারা যাবেনা। কেউ কাউকে না খাইয়ে মারতে পারে না। বুঝছেন আলু খান, ভুট্টা খান। না খেয়ে কেউ মারা যাবে না।

তৃতীয় সর্গ

[আলকাপের সুরে গান বাঁধা হবে]

উত্তরেতে হিমালয় দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর
সাগরের তুফান তুলে
পাহাড়ের নি:শ্বাস ভরে
আমরা জনগণ
ইতিহাসের পথ চেয়ে
ঐক্য গড়ি রাজপথে
মজুর চাষী এক পায়ে
আমরা জনগণ
ঘৃণায় ধিক্কারে
প্রতিবাদে প্রতিরোধে
থাকব মোরা একসাথে
আমরা জনগণ।
যতই থাকি না খেয়ে
যতই মরি পদে পদে
বিজয় মোদের হবেই
আমরা জনগণ
[নাতি বলবে নানা আগের কতা মনে পড়িচ্চে। নানা- ঠিকই তো, আবার গা লে। তুইও ধর।]
০২ নদীর পাড়ে গ্রাম ছিল
তাল তমালের গাছ ছিল
ছায়ায় ঘেরা পুকুর ছিল
নানা হে।
দুপুরে পাখির ডাক ছিল
মাচায় ভরা লাউ ছিল
মাঠে মাঠে ধান ছিল
নানা হে।
আতার ডালে টিয়া ছিল
মহুয়া শাখায় ফুল ছিল
বাঁশ বাগানে চাঁদ ছিল
নানা হে।
আলোর পথে গান ছিল
খালে বিলে মাছ ছিল
ডালিম পাতায় রোদ ছিল
নানা হে।
ছাতিম ডালে কোকিল ছিল
ঘরে ঘরে ভাত ছিল
মনে কুহুর রব ছিল
নানা হে।
বার’শ নদীর দেশ ছিল
মুখে মাঝির গান ছিল
নদীর তীরে তীরে পাট ছিল
পাটের ফুলের স্বপ্ন ছিল
নানা হে।
[এমন সময় মাইকে মেলার ঘোষণা আসবে। ফুঁড়কুটি ডাঙা দীঘি পাড় মাঠে মেলা! মেলা! মেলা!]
নাতি : মেলার কথা শুনলো।
নানা : হয় শুন্নো।
[গান শুরু হবে]
সূূর্যের মতো উঠ জাগি
ফুলের মতো উঠ হাসি
চরের মতো উঠ ভাসি
হাওয়ার মতো দুলে দুলে মোরাহে
চলো মেলায় হে
চলো মেলায় হে।
নাতি : বলত নানা নানীকে লিয়া মেলায় গেছু।
নানা : দূর পাগলা। তখন তো বিয়াই করিনি। হামার যে নানা তার সাথে মেলায় গেছি।
নাতি : মেলায় যাইয়া কি খামু নানা। তক্তা বিস্কুট খাছু।
নানা : জিলাপি খাছি। আর ভুট্টার খৈ।
নাতি : তাহলে তুমিতো অনেক কিছুই খাছিন।
নানা : হুঁ, খাছিইতো।
নাতি : আচ্ছা নানা কিভাবে জন্মাইলে?
নানা : ক্যান, মানুষ যেভাবে জন্মায়। ধর ধানের বীজ বুনলে ধান হয়। সরষা হয় না।
নাতি : হয়Ñহয়Ñঠিকইতো।
নানা : মানুষও নিয়মের মধ্যে জন্মায়। ধর, কি করে তোকে বুুুঝাই। চোখ খুললে যা দেখিস তাই সত্য। এর বাইরে কিছু নাই। চোখ মুদলে কি। খালি অন্ধকার। অন্ধকার মানে অজ্ঞান। অজ্ঞান থাকা অনেক আজগুবি ভাবনা আসে। সোজা কথা চোখে যা দেখবি তাই সত্য। চোখের বাইরে ভাবার দরকার নেই।
নাতি : মলে তা হলে কি হবে নানা?
নানা : দেখিস না। গরু মলে কি হয়। মানুষের তাই হয়। মাটির সাথে সব মিশা যায়। তোর হামারও তাই হবে। এর বেশি ভাবার তোর দরকার নাই। মাটিতে সব শেষ। প্রকৃতি। প্রকৃতি বুঝিছু। এটিই জন্ম এটিই বিলয়। এটিই জন্ম এটিই মৃত্যু। থাক থাক এসব থাক। আবার গান ধর।
কামার কুমার জেলে মাঝি
চাষী মজুর ঘোষ তাঁতি
হিন্দু মুসলমান আদিবাসী
ছাত্র যুবা দাদা দাদী
সবাই মিলেমিশে চলো মেলায়
নানা হে।
[ওরা মেলায় চলে আসে। বিভিন্ন জিনিশ চেয়ে চেয়ে দেখে]
নাতি : নানা ওটা কি?
নানা : মোয়া।
নাতি : মোয়া খামু। ওটা কি?
নানা : বায়স্কোপ।
নাতি : বায়স্কোপ খামু।
নানা : আরে ওটা দেখার জিনিশ
নাতি : দেখার জিনিশ তাহলে নানির জন্য নিয়া যামু। ওটা কি?
নানা : হিজরা।
নাতি : ওটাক নিয়া বাড়ি যামু ,নানা হে
[মেলায় বেড়াতে দেখা হয়ে যাবে পরিচিত দু’জনের ]
হবিবর চৌধুরী : আ-রে জাহিদ ভাই যে। বহুদিন পর দেখা হয়ে গেল। আপনিতো কবি মানুষ। আর তো কোথাও যান না।
জাহিদ : না ভাই কোথাও যেতে ভাল লাগে না। পালিয়ে বেড়াই। এই আর কি। পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে এখানে আসা।
হবিবর চৌধুরী : পালিয়ে বেড়ানো তাই। ঠিক তাই। ঠিক তাই। এইতো পাশেই ভারত। পৈত্রিক বাড়ি। পৈত্রিক ভিটেই তো দেশ, তাই না। জন্মস্থান। কত মায়া। পুকুর পাড়। দীঘির গাছ। ফসলের মাঠ। নদীর কলতান। জমিজমা স্মৃতি সব ছেড়ে চলে এলাম। ভারতে আমরা মুসলমানরা সংখ্যালঘু। আবার যখন আমরা এখানে এলাম তখন রিফুজি। এখানে আবার হিন্দুরা সংখ্যালঘু। ভারতে গেলে সংখ্যাগুরু বলুন তো এই ইতিহাসে মনুষ্যত্ব নিয়ে একজন দাঁড়াতে পারে। সংখ্যাগুরু, সংখ্যালঘু এটা কি মানুষের পরিচয়? দেশ ভাগ হলো। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ আর ভারতীয় হিন্দু মুসলিম বুর্জোয়া শ্রেণীর শোষণ লুণ্ঠনের স্বার্থে। মানুষের স্বার্থে নয়। আবার বাংলাদেশ হল। আবার দেখুন, সেই সাম্প্রদায়িকতা। ধর্মীয় জঙ্গিবাদ অথচ এক্সচেঞ্জ করে ওখানে যা ফেলে এসেছি সেই তুলনায় কিছুই পাইনি। যাওবা পেলাম অন্যরা দখল করে জাল দলিল করে ভোগ করছে। বিয়ে শাদি করলাম চলে যাচ্ছিল। পেটেতো খাবার নাই। সুস্থ চিন্তা করব। স্বাধীনভাবে ভাববো। মানুষের সাথে সুখে দুঃখে মিলেমিশে কাটাব সেই উপায় ও নেই। দুর্বৃত্তায়ণ। অবক্ষয়। হিংস্রতা সব কিছু গ্রাস করেছে।
জাহিদ : আমারও স্বাধীনতা যুদ্ধে বাবা শহীদ হলেন। বাবা নেই এটা আজও ভাবতে পারি না। আমার দাদি মারা যাবার আগ পর্যন্ত মনে করত তার ছেলে ফিরে আসবে। স্বাধীনতার পর এক শ্রেণীর লোভী ভূমি দস্যূরা জমাজমি দখল করে নিল। সে এক দু:সহ কষ্টের দিন। রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা স্বাধীন। কিন্তু প্রকৃত কি আমরা একটি স্বাধীন দেশ? রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা কোথায়! আর খোঁজার ইচ্ছের যে ব্যাপারটি, সেটাই যেন তলিয়ে গেছে। আর কি বলব। কত আন্দোলন। কত কবিতা, কত গান। কত নাটক। কত আত্মদান। মনে হয় সবই বুঝি ছাই চাপা পড়ে গেল। অবশ্য ব্যাপারটা এরকমই। তবু আমি দারুণ আশাবাদী একসময় শ্লোগান দিতামÑশহীদের রক্ত পেছনে গড়ায় না। মানুষের জয় হবেই। মনুষত্বের জয় হবেই।
হবিবর চৌধুরী : হ্যাঁ, এটা আমারও বিশ্বাস। আমি মারা যাবার পর আমার হাড়ও বিদ্রোহ করুক। বলুকÑএই মাটি আমার মা। এবার থাক। আপনি একটি কবিতা পড়–ন শুনি। আপনার স্বরচিত কবিতা স্বকণ্ঠে শুনি।
জাহিদ : স্বকণ্ঠেই পড়ব। তবে স্বরচিত নয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দুই বিঘা’ কবিতাটি পাঠ করছি।
[কবিতা পড়া শেষ হলে মাইকে ঘোষণা আসবে যাত্রা! যাত্রা! আজকের যাত্রা কুষ্টিয়ার বাসন্তী অপেরার ‘সূর্যসেন’। আর কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হচ্ছে। ঐতিহাসিক যাত্রানুষ্ঠান ‘সূর্যসেন’। আপনারা টিকিট সংগ্রহ করে আসন নিন।]
হবিবর চৌ : জাহিদ ভাই চলুন যাত্রা দেখা যাক।
জাহিদ : চলুন [ মেলায় পাঁচালী, পুঁথিপাঠ, বাউলদের আসর, ফোক নৃত্য, আদিবাসী নৃত্য, ধ্রুপদী নৃত্য আনা যেতে পারে।]
যাত্রার স্প্যান্ডেল
[পাগলের প্রবেশ।]
রঞ্জন পাগল : সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চাল উৎপন্ন হয় চীনে, তারপর ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও চতুর্থ স্থানে বাংলাদেশ। ভিয়েতনামে, থাইল্যান্ডে ও বার্মায় তারপর। কিন্তু সারা পৃথিবীতে মাত্র ৭ % চাল আমদানি রপ্তানি হয়। অর্থাৎ আমদানির চাল দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানোর কথা যারা বলে, তারা মিথ্যা বলে। দেশীয় চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র ১১জন ব্যবসায়ী। আর মাত্র ৫ জন ব্যবসায়ী সমস্ত নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য আমদানি করে। তারাই আমাদের অভুক্ত রাখে। রাষ্ট্র ও সরকার এসব ব্যবসায়ীদের পাহারা দেয়। না খেয়ে থাকা মানুষের দায়িত্ব কেউ নেয় না। আমরা কি রকম। ১ কোটি মানুষ প্রতিদিন খায় না। ২ কোটি মানুষ একবেলা খায়। আমরা কি করমু। পেটে খিদের জ্বালা। মাথায় ঋণের বোঝা। আমরা কি করমু। [বুক পেটাতে থাকে। মঞ্চ ছেড়ে চলে যায়]
[একজন আদিবাসীর প্রবেশ]
সোবিন মুন্ডা : হামানিকের আদিবাসী সমাজ। জোলামান আবদিন হাই হামানিকে আলাদা করে দেখা থি। হামান খেতে খামারে কাজ করিলা হার গারুলেকে। আমি তো মানুষ আছি। খেতে খামারে আমাদের সাথে হিন্দু মুসলমান কাজ করে? গৃহস্থ যদি মুসলমান হয় তা হলে মুসলমান কাজের লোকরে বেশি টাকা দেয়। গৃহস্থ যদি হিন্দু হয় তাহলে মেদি হিন্দু কাজের লোককে বেশি টাকা দেয়। ধানের খেতেতো ঘাস হয়। ধানের ফলন বাড়াতে হলে ঘাস তুলে ফেলতে হয়। ধানের সাথে ঘাসের এই ক্ষেত্রে শত্র“তার সম্পর্ক। সমাজে ধনী একটি শ্রেণী। গরীব একটি শ্রেণী। এখানে গরীব আদিবাসী, হিন্দু, মুসলমানÑআমরা বন্ধু। আমাদের সাধারণ শত্র“ বড়লোক শ্রেণী। আমাদের বিভেদ, হানাহানি শত্র“র পক্ষে শোষণ নিপীড়ণ সহজ করে। আমরা ঐক্যবদ্ধ হলে শত্র“রা ভয় পায়। আমাদের স্বাতন্ত্র কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। আমাদের ছেলে মেয়েরা স্কুলে যাবার সুযোগ অল্প। সরকারি যতটুকু সাহায্য আসে তা আমরা পাই না। আমাদের জমি জিরাত সুযোগ পেলেই অন্যরা দখলের চেষ্টা করে। আমাদের নারীদের ধর্ষণ করবার ফন্দি আঁটা হয়। থানা পুলিশ কোট বড়লোকদের পক্ষেই থাকে। গরীব মানুষের জাগরণের ইতিহাসে আমরা যুক্ত। সেই পাল আমলে দ্বিতীয় মহিপালকে হত্যা করে দিব্যকভীমÑরুদক এর অভ্যূূত্থানের মধ্য দিয়ে কৈবর্তদের ক্ষমতা দখল। সিধু, কাসু, চাঁদ ভৈরবের নেতৃত্বে জমিদারÑইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছি। জিতু সরেনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ; তেভাগা আন্দোলন। গরীব হিন্দু মুসলিম চাষীদের সাথে আমরা লড়েছি। মুক্তিযুদ্ধে আমরা অংশগ্রহণ করেছি। এই স্বাধীন দেশে আমরাও নাগরিক। কিন্তু সাংবিধানিক স্বীকৃতি হয়নি। আমরা নম্র, সরল, সহজ মানুষ। এর সুযোগ নিয়ে আমাদের ঠকানো হয়। আমাদেরকে ব্যক্তিগত, সম্প্রদায়, ধর্ম, জাতিগত বিরোধ, সংঘর্ষে ঠেলে দিয়ে শাসক শোষকরা ফায়দা লোটে। সমাজে মূল শত্র“ শোষক শ্রেণী। আমাদের সব গরীব মানুষদের এক হতে হবে। এক হওয়াদ লাগি।
[মঞ্চ ত্যাগ করবে]
[সূর্য সেনের প্রবেশ]
সূর্য সেন : আমি সূর্য সেন। অবাক হচ্ছেন তো। আমি আবার এখানে কেন। হ্যাঁ আমিই এখন আপনাদের সামনে। যুগ যুগ ধরে আসব। যতদিন এই বাংলায় অত্যাচার থাকবে। শোষণ ও নিপীড়ণের বিরুদ্ধে আমি আসব। আমারই অন্য নাম স্পার্টাকাস। আমারই অন্য নাম ভগত সিং। আমারই অন্য নাম ক্ষুদিরাম। হ্যাঁ, ক্ষুদিরাম থেকেই শুরু করি। ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য অভিযান চালিয়েছিল। মজফফরপুরে। কিন্তু লক্ষ্য ভ্রষ্ট হয়। প্রফুল্ল চাকী আত্মাহুতি দেন মোকাম ঘাট রেল ইস্টিশনে পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে ২’রা মে ১৯০৮ সালে। আর ক্ষুদিরামকে ভারতের ৩০২ দণ্ডবিধি অনুযায়ী প্রাণদণ্ড দেয়া হয় মজফফরপুর জেলে ১১ আগস্ট ১৯০৮ সালে। তারপর কানাইলাল দত্ত, সত্যেন বসু। কত বিপ্লবী! এদের আত্মদানে ব্রিটিশ রাজত্ব কেঁপে ওঠে। ভারতে বাংলার জনগণ জানতে চায় এঁরা কারা-বীরের মতোন মরে। জনগণ ঘুম থেকে জেগে উঠতে থাকে। এদের ধারাবাহিকতায় ভগত সিং আসে। ১৯৩১ সালের ২৩ মার্চ ভগত সিংকে লাহোর জেলে ফাঁসি দেয়া হয়। তারপর সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বিপ্লবী আন্দোলনের ঝড়। ইনকিলাব জিন্দাবাদ দিয়ে আত্মাহুতির জোয়ার। ব্রিটিশরা প্রমাণ করতে চাইত তাদের শাদা চামড়া, তারা আলাদা। আর তোমরা ভারতীয়রা কালো চামড়ার লোক। তোমাদের জাত ভিন্ন। সেই সময়ে রেস্তোরাঁয় নোটিশ ঝুলানো থাকত। ‘কালো চামড়ার লোক এবং কুকুরের প্রবেশ নিষেধ।’ ইংরেজদের অন্যায় অত্যাচারের প্রতিবাদে বাংলার দামাল ছেলে-মেয়েরা তাই দিতে শুরু করেছিল আত্মাহুতি। তাই আমরা ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি গঠন করি। আমরা প্রথমে চট্টগ্রামের পুলিশ ঘাঁটি দখল করে আকাশ কাঁপিয়ে ধ্বনি তুলি বন্দেমাতরম, ইনকিলাব জিন্দাবাদ। ১৮ এপ্রিল, ১৯৩০-এ পাহাড়ের উপর অস্ত্রাগার দখল এবং জাতীয় পতাকা উত্তোলন। ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে সশস্ত্র সম্মুখ যুদ্ধ। চোদ্দ থেকে উনিশ বছর বয়সের তরুণ যোদ্ধা। একজন গুণ গুণ করে গেয়ে উঠল। ওর নাম জিতেন দাশগুপ্ত। ‘নতুন সূর্য-জাগোরে জাগো’। ইংরেজ সৈন্যদের ট্রেন এসে থামল এমন এক জায়গায় যেখানে ঘন গাছপালা। আমি দায়িত্ব নিলাম। ইংরেজ সৈন্য ডবল মার্চ করে আসছে। ইংরেজ সৈন্যের বিরুদ্ধে আমাদের সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হল। স্লোগান উঠল ইনকিলাব জিন্দাবাদ। আমাদের অনেক বিপ্লবী সাথী শহীদ হলেন। আমরা তাদের শেষ শ্রদ্ধা ও অভিবাদন জানিয়ে চল্লিশজন আবার শত্র“র বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য অবস্থান নিলাম কর্ণফুলি নদীর শ্রীপুর গ্রামে। জালালাবাদ পাহাড় যুদ্ধে আমরা জয়ী হই। কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে আরো আক্রমণ চালানোর প্রস্তুতি হিশেবে নতুন কৌশল নিই। জুলধা গ্রাম, চন্দন নগরে আমাদের ছেলেরা লড়াই করে শহীদ হয়েছে। চট্টগ্রামের একটি গ্রাম ধলঘাট। এ গ্রামের এক গরীব পরিবার সাবিত্রী চক্রবর্ত্তীর পরিবারে আশ্রয় নেই। এখানে থাকতেন আমার সাথে নির্মল সেন, অপূর্ব সেন। এখানে আবার আসে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। ১৩ জুন, ১৯৩২ ক্যাপ্টেন কামেরনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্য ঘিরে ফেলে আমাদের আস্তানা। আমি আর প্রীতিলতা খেতে বসেছি। নির্মল আর অপূর্ব গুলি চালাতে থাকে। নির্মলের বুকে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ নির্মল আমাকে বলে আপনি প্রীতিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। আমি প্রীতিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। আমি গেলাম জ্যৈষ্ঠপুর গ্রামে। ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩২ প্রীতিলতা আমার নির্দেশে পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাবে আক্রমণ করে। ১৬ ফেব্র“য়ারি’ ১৯৩৩ সাল। আমি আশ্রয় নেই পটিয়া থানার গৈরলা গ্রামে। এক গুপ্তচর টের পেয়ে যায় আমার অবস্থান। আমি বেরিয়ে পড়ি কিন্তু ব্রিটিশ সৈন্য আমাকে ঘিরে ধরে ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন ওয়াম্সলে আমাকে শনাক্ত করে। তারপর জেলে। ১১ জানুয়ারি’ ১৯৩৪। সারা চট্টগ্রাম শহরে কারফিউ। বন্দীরা ‘বন্দে মাতরম’ আওয়াজ তুলে জেলখানা কাঁপিয়ে দিল। ১২ জানুয়ারি ভোরে আমাকে ফাঁসি দেয়া হল। তারেকেশ্বর দস্তিদারকে বন্দেমাতরম বলার অপরাধে হত্যা করা হয়। আজও হত্যা করা হচ্ছে। বশরায়, আফগানিস্তান, কান্দাহারে, ইসলামাবাদে, কারবালায়, ওয়াজিরিস্তান, কলম্বিয়া, ইরাক, লেবানন। কঙ্গো, সিঁঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, ফুলবাড়ি, নারায়ণগঞ্জ গার্মেন্টস শ্রমিক, খালিশপুরের পাটকল শ্রমিক, এখানে সংগ্রামী যোদ্ধাদের সাথে আমি আছি। আমি বরকত, জব্বারের মধ্যে ছিলাম। এখনও যেখানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে, পুঁজিবাদÑসাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম সেখানে আমি আছি। আপনারা আমার অভিভাষণ গ্রহণ করুন।
[মেলা ভেঙে যাচ্ছে। তখন ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই, সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই’ সংবলিত পোস্টার তিন কিশোরের গলায় ঝুলে থাকবে। নিচে লেখা থাকবে শিশু কিশোর মেলা। তিনজন মানুষ যারা চাল পায়নি তারা মেলা থেকে ফিরবার পথে তিন ছায়ামূর্তির সাথে দেখা। শাদা পোশাকে ছায়ামূর্তি দেখা যাবে।
প্রথম ছায়ামূতি : তোমরা চাল পাওনি। আমরা দুঃখ পাই। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা শান্তিতে নাই। কারণ, আমরা ঘুমাতে পারি না।
দ্বিতীয় ছায়ামূতি : তোমাদের মত অভুক্ত মানুষ আমাদের সময় আমরা দেখেছিলাম। আমরা চেয়েছিলাম, এই সোনার বাংলায় কেউ অভুক্ত থাকবে না। আমরা শান্তিতে নাই। কারণ আমরা ঘুমুতে পারি না।
তৃতীয় ছায়ামূর্তি : এ দেশে প্রচুর পাট হত। আখ হত। ধান হত। নদী নালা খাল বিলে প্রচুর মাছ। আমরা যুদ্ধ করেছিলাম। সবাই সুখে সমৃদ্ধিতে শিক্ষায় দীক্ষায় মনুষ্যত্ব নিয়ে বাস করব। নদীর কলতান, পাখির ডাক, বৃষ্টির শব্দের অনুপম দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। কিন্তু তোমরা অভুক্ত।
তিন ছায়ামূর্তি একসঙ্গে বলেÑতোমরা বিদ্রোহ কর। তোমাদের মুক্তি না হলে আমরা শান্তি পাব না। আমরা ঘুমুতে পারি না। তোমরা বিদ্রোহ কর।
[ছায়ামূর্তি মিশে যাবে। মেলার এক অংশে দু’জন মুচি বসে থাকবে। মেলা ভাঙছে। ওরা বসেই আছে। একজনের নাম ঝামু আর একজনের নাম রামু]
ঝামু : [একটা স্যান্ডেল দেখায় রামুকে]
দেকিচু। দাম জানিস। এর দাম একুচশ। তুই দিনে কয় টাকা পাস?
রামু : চল্লিচ টাকার বেচিতো হয় না।
ঝামু : বাচপু কি করা। সরকার তো আলু খাবার কচ্চে।
রামু : মোটা চাল ৩৬ টাকা কেজি। গম ৪০ টাকা কেজি। কি খাবু।
ঝামু : আলু খাবু।
রামু : সোয়াবিন ১২০ টাকা।
ঝামু : তালে আলু খালি চিবা খাবু। মানুষ সব মরা ভূত হয়া যাবে।
রামু : ভূত তো হয়া গেচি। আর কি হবু ।
[মেলায় আর কেউ নাই। ঝামু আর রামু উঠে যায়]

চতুর্থ সর্গ

[ আবার লাইন। চালের জন্য লাইন দেখা যাবে। এবার লাইনের লোকগুলো বেশ বিক্ষুদ্ধ। এক পুলিশ কর্মকর্তার সাথে এক কনস্টেবল। আড়তদার সমিতির নেতৃবৃন্দের সাথে কথোপকথন। একদিকে এই দৃশ্য। অন্যদিকে বুভুক্ষ মানুষের বিরাট লম্বা লাইন। ওই তিনজন। তারাও আসবে লাইনের কাছে। ক্রমে তারা সোচ্চার কণ্ঠ নিয়ে লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের বলবে। বামপন্থি কর্মী মিঠু ও ফেস্টুন ধরা কয়েকজন কর্মী গিয়ে ঢুকবে]

জনৈক ১: ২ কেজি চাল দিয়া কি হয়। ২ দিন না খায়া। ৫ কেজি করা চাল প্রতিদিন সবাইকে দিতে হবে। আড়তে গুদামে হাজার হাজার মণ চাল।
জনৈক ২ : ঠিকইতো বড় চাল ব্যবসায়ী ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা নিয়া চাল স্টক করা দাম বাড়ায়ে দিয়া ব্যবসা করছে। লাভ ব্যবসায়ীর। ব্যাংক মালিকের।
জনৈক ৩ : আমাদের ব্যাংগুলোতে বিশ্বব্যাংকের টাকা খাটে। পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী দেশের রাষ্ট্রের পুঁজিপতিরা বিশ্ব ব্যাংকের মাধ্যমে আমাদের দেশে টাকা খাটায়। সব ওদের কারসাজি। আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির জালে আমাদের কৃষি বন্দী।
জনৈক ১ : ঠিকই তো। চালের যোগানের উপর চালের দাম নির্ধারিত হয় না। পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী চক্র দাম বেঁধে দেয়। জনগণের ক্রয় ক্ষমতা নাই। আট কোটি মানুষ অর্ধাহারে, অনাহারে থাকে। ৩ কোটি দুই দিন পরে খায়।
জনৈক ২ : ব্যবসায়ীর স্বার্থে, ব্যাংক মালিকদের স্বার্থে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। আই এম এফ, ডব্লিউটিও’র পলিসির বাস্তবায়ন। তাই আজ সব মানুষ কর্মহীন। বেকারদের সংখ্যা বাড়ছে। শহরে তাদের ভিড়। কাজ নাই। ক্রয় ক্ষমতা নাই। সাম্রাজ্যবাদের সাথে এদেশের পুঁজিবাদের যে গাঁটছড়া বাধা। ওরা সরকার, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, মিডিয়া। ওরা সব এক চক্র। রাষ্ট্রযন্ত্র ওই চক্রের দাস। এই চক্রই এদেশের মানুষকে হতদরিদ্রের এই জায়গায় এনেছে। মনুষ্যত্ব কেড়ে নিয়েছে। মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়েছে।
পুলিশ কর্মকর্তা : আপনারা বলছেন ৫ কেজি চাল চাই। আপনারা বলছেন সব হাতে কাজ চাই। সব মুখে ভাত চাই। প্রতি গরিব মানুষের জন্য গ্রামে শহরে রেশনিং ব্যবস্থা চালু কর। এত মানুষকে সরকার কিভাবে খাওয়াবে। আর রেশনিং এর দুর্নীতি দেখেননি?
জনৈক ১ : রাখুন, রাখুন। আপনারা দালাল।
কনেস্টবল : আমরা কার দালাল, অ্যাঁ?
জনৈক ২ : বুঝেন না কার দালাল। ব্যবসায়ীর। ব্যবসায়ীর।
কনেস্টবল : এই বেয়াদপ চুপ!
জনৈক : চুপ কি? চুপ কি? [ধস্তাধস্তি চলতে থাকে]
[এসময় ব্যানার নিয়ে ধস্তাধস্তি হতে থাকে। মিঠু আঘাত পায়। তাকে কনস্টেবল আঘাত করে। মিঠু শান্তভাবে কনস্টেবল ও পুলিশ কর্মকর্তার সাথে আলাপ করে। আবার লোকজন লাইনে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ায়। উত্তেজনা কমে আসে। দুই পুলিশ চলে যায়] [চাল দেয়া শুরু হয়]
মিঠু : [দশর্কদের দিকে তাকিয়ে]
ধাপ্পাবাজি বুঝলেন। প্লেন ধাপ্পাবাজি। ৩ কোটি মানুষ একদিন পর দুইদিন পর খায়। আর দুই তিন লাখ মানুষকে ২ কেজি চাল দিয়ে সরকার দেখাচ্ছে বিরাট কিছু করছে। প্লেন ধাপ্পাবাজি। যারা বিরাট বিরাট বাড়ি,গাড়ি হাঁকিয়ে চলে তারা জোচ্চোর। অধিকাংশ মানুষকে অভুক্ত রেখে, অর্ধাহারে, অনাহারে রেখে ওরা গরিবের মাথার উপর বসে থাকে। আমাদের এই যে মানবসমাজ তার ইতিহহাস আছে। মানব সমাজের চালিকা শক্তি শ্রেণী সংগ্রাম। ১২ হাজার বছর ধরে এই মানবসমাজ। উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন শক্তির দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই সমাজের বিকাশ।। এখানে মানুষের অবস্থান ইচ্ছা নিরপেক্ষ এবং শর্র্ত সাপেক্ষ। বিমূর্ত মানুষ নয়। যে কোন মানুষ ঐতিহাসিকভাবে সুনির্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষ। শ্রেণী স্বার্থ, শ্রেণী দর্শন তাই সবার মধ্যে প্রতিফলিত। ৬ হাজার বছর ধরে আদিম সমাজ। যা ছিল শ্রেণীহীন। সাড়ে চার হাজার বছর ধরে দাস সমাজ। দাস সমাজ থেকে শ্রেণী সমাজের শুরু। শ্রমই সম্পদ সৃষ্টি করে। দাস শ্রমের ভিত্তিতে দাস সমাজ। শ্রেণী সংগ্রাম এখান থেকেই শুরু। তারপর ভূমি দাস শ্রমের ভিত্তিতে যাত্রা শুরু সামন্ত সমাজের। আড়াই হাজার বছর ধরে চলে সামন্ত সমাজ। প্রায় সাতশত বছর ধরে চলেছে পূঁজিবাদী সমাজ। বৃহৎ পুঁজিবাদী কয়েকটি দেশ সাম্রাজ্যবাদের স্তরে পৌঁছেছে। এরা গোটা পৃথিবীকে ভাগবাঁটোয়ারা করে বর্তমানে ডব্লিউ, টি, ও’র বেড়াজালে বন্দী করে ফেলেছে। এই দেখছেন অভুক্ত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে। এ সবই সাম্রাজ্যবাদের সাথে এদেশের পুঁজিবাদের গাটছড়া বাঁধার ফল। পুঁজি প্রথম আত্মপ্রকাশ করে সঞ্চিত মুদ্রা হিশেবে। উদ্বৃত্ত মুদ্রা থেকে উদ্বৃত্ত পুঁজি। পুঁজি যতই বাড়ে মানুষ তত কাজ হারায়। সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের এই গাটছাড়ার কারণে কর্পোরেট পুঁজিবাদ এলো। এদিকে মানুষ অভুক্ত। অন্যদিকে কর্পোরেট সংস্কৃতির কারণে এল মনুষ্যত্ব হননের খেলা। যাতে অভুক্ত মানুষ বিদ্রোহ করতে না পারে। সেনাবাহিনীতো আছেই বিদ্রোহ দমনে। তারপরও মানুষ দাঁড়াচ্ছে। গর্ভবতী মেয়েদের বাচ্চা মাঝেমধ্যে নড়ে। সমাজের গর্ভে বিপ্লবের সম্ভাব্য সন্তানও বিস্ফোরণ বিদ্রোহ করে, তার আগমন বার্তা ঘোষণা করে। সমাজের আদর্শিক কাঠামো আছে। তা দাসত্ব শেখায়। বলে যা হচ্ছে মেনে নাও। তুমি না খেয়ে আছ মেনে নাও। লাইনে দাঁড়িয়ে যদি চাল না পাও মেনে নাও। এসবে না বলতে হবে। এটা শিক্ষা। বিপ্লবী শিক্ষা। বিপ্লবী আদর্শের ভিত্তিতে সঠিক পার্টির নেতৃত্বে গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এই যে কত শিশু কিশোর এখানে লাইনে, ওদের এখন স্কুলে থাকার কথা। পেট অভুক্ত রেখে তাজমহল গড়া যায় না। বিশ্ব ব্যাংকের কর্ম কৌশল হল এখানে ভুট্টার আবাদ করা। হাজার হাজার একর জমি ‘ব্র্যাক লিজ নিচ্ছে’ এবং ভুট্টার চাষ করছে। এদের সাথে মান্টাসান্টো যুক্ত। তাহলে বুঝুন আমাদের কৃষির উপর, জীবনের উপর সিডর আর সিডর।
[চাল দেওয়া বন্ধ হবার দরুণ লাইন ভেঙে গেছে। পুলিশ, আড়তদার একপক্ষে অন্যপক্ষে লাইনে দাঁড়ানো মানুষ। ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। একজনের ব্যাগে চাল ছিল। কনস্টেবলের ধাক্কায় তা পড়ে যায়। মিঠু গুলিবিদ্ধ হয়। এবং ঝঢ়ড়ঃ ফবধফ. কর্মকর্তাসহ আরো অনেক পুলিশ। পরিস্থিতি পুলিশ নিয়ন্ত্রণে রাখে।
মঞ্চ পরিকল্পনা অনুযায়ী চরিত্রগুলোর সংলাপ সাজানো হবে। ]
মঞ্জু : [তার পুলিশের পোশাক খুলে ফেলে। বুট পেটাতে থাকে এবং বলতে থাকে]
মানুষ হত্যার অর্ডার আমি কেন ফলো করলাম? কেন? কেন? আমার মা, বাবা, ভাই, বোন এদেরই মতো লাইনে দাঁড়িয়ে চাল নিচ্ছে নিজ এলাকায়। আমি তাদের বিরুদ্ধে গুলি চালালাম। আমি কি শুধুই পুলিশ! আমি বর্গাচাষীর সন্তান। আমি আমার ভাই বোনদের গুলি করলাম। মা বাবা এদের হত্যা করলাম। আমার বেঁচে থাকার কি মানে! [ভাবলেশহীন হয়ে পড়ে আবার বলতে থাকে] ছেলে বেলার কথা মনে পড়ে যায়। গ্রামের পাশ দিয়ে নদী। নদীর বুকে পাল তোলা নাও। মাঝির গান। মাঝরাতে পাখির গানে ঘুম ভেঙে যেত। মা। আমার মা, তুমি পাথার থেকে দুপুর গড়িয়ে গেলে ছাগলগুলো নিয়ে আসতে সন্ধ্যার আগে আগে। দুই দিকে চালাঘর। মাঝখানে উঠোনে চোকা। তুমি কখনও প্যারাজোট, কখনও বা শালমুকুট ধানের মুড়ি ভাজতে। গরম ভাজা মুড়ি খেজুরের লালি দিয়ে মেখে খেতে খেতে ঘুম এসে যেত। উঠানেই ঘুমিয়ে পড়তাম। কখন যে সকাল হত টেরই পেতাম না। না Ñ না --
[তারপর সে বেয়োনেট পেটে ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করে। পুলিশের দল চলে যায়]
পুলিশ কর্মকর্তা : [বুট দিয়ে লাশে গুঁতো দিতে থাকে]
[হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে বলে]
এই শালাÑপুলিশ ডিপার্টমেন্টের কলঙ্ক।
এই শালা-তোর বউ বাচ্চাদের কে খাওয়াবে হে।
[অন্যান্য পুলিশদের তাকিয়ে বলে]
এই লাশ গুম করে দে। উপরের অর্ডার।
এমন জায়গায় ফেলবি কেউ যেন টের না পায়।
উপরের অর্ডার।
[পুলিশের দল লাশ টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়]
[‘মিঠু হত্যার বিচার চাই’ ‘সব মুখে ভাত চাই’ ‘সেনাবাহিনীর দরে প্রতি গ্রামে প্রতি ঘরে রেশন চাই’ ‘কৃষি বাঁচাও, সার, ডিজেল বিদ্যুতের দাম কমাও’ ‘কৃষি নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের খবরদারী বন্ধ কর’ ‘বিশ্ব ব্যাংক, আই এম এফকে বহিষ্কার কর’ ‘সকল মানুষের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, কাজ এর স্থায়ী নিশ্চয়তা দাও’ এ সব দাবি সংবলিত ফেস্টুন, ব্যানার নিয়ে জঙ্গি মিছিল মঞ্চে আসবে। মিশুক, আজমত, নির্মল, নানা, নাতিসহ পূর্বের চরিত্রগুলো মঞ্চে আসবে। এরা নেতৃত্বের সামনে থাকবে]
[শ্লোগান হতে তাকে - ‘এক মিঠুর রক্ত থেকে লক্ষ মিঠুর জন্ম হবে’ ‘সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক’ ‘বিশ্ব ব্যাংক হাত উঠাও’ ‘আই এম এফ হাত উঠাও’ ‘বিশ্ব ব্যাংক আই এম এফকে বহিষ্কার কর’]
মিশুক : আমরা যখন চাল চাই, ওরা তখন গুলি করে।
আজমত : কাজ চাই কাজ।
নির্মল : আমরা কাজ চাই।
জনৈক : আমরা গুলির বদলা চাই।
জনৈক : আমরা গুলির বদলা চাই।
জনৈক : আমরা গুলির বদলা চাই।
নানা : আমরা সরল সিদা মানুষ। চাল দিবার পারে না। আবার গুলি করে। কেমন কথা।
নাতি : নানা, সবাই বদলার কথা কচ্চে।
নানা : হামরাও বদলা চাই।
মিশুক : বদলা চাই। আমরা সবাই বদলা চাই।
[পুলিশ আসে]
পুলিশ কর্মকর্তা : আমরা এখানে কাউকে থাকতে দেবনা। উপরের অর্ডার।
আজমত : আমরা এখান থ্যাকা যামু না। আমরা যামু না।
নির্মল : ঠিক কথা। আমরা যামু না। আমরা যামু না।
নানা : হামরা যামু ক্যান?
নাতি : হামরা এখান থ্যাকা যামু না।
[কর্মকর্তা ঘুষি মারে। পুলিশ জনতা সংঘর্ষ বেধে যায়। মঞ্চের এই অবস্থা সংলাপ, সঙ্গীত, বর্ণনায় বিন্যস্ত হবে]
[মঞ্চের একটি অংশে দেখান হবে ফুঁড়কুটি ডাঙার দীঘির পাড় থেকে কিছু দূরে হাট। এখানে বাস থামে চলে যায়। যেসব
ক্ষেতমজুর কামলা খাটতে উত্তরে গিয়েছিল তারা ফিরছে। গ্রাম থেকে যারা উত্তরে কামলা খাটতে যাচ্ছে তারা সবাই জড়ো হয়। গণহত্যার ঘটনায় মেঘের মত গম্ভীর এবং ঝোড়ো।
খেত মজুরÑলাদু : পেট ভরানোর জন্য খাবার লাইনে গুলি। লাশ হয়া গেল সব। কাউকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ভ্যান চালক : তাইতো দেকিচ্চি। না মানা যায় না।
[তাদের দেখে হাটের ঝাড়–দার মোমেনা এগিয়ে আসে]
মোমেনা : ক জন যে মরিচে আর কে যে মরিচে কিচু আন্দাজ করা যাচ্ছে না [ মাথায় হাত দেয়। আর বুক চাপড়ায়]
ছুতার মিস্ত্রী গোকুল : হামরা আগে চেয়ার, টুল, টেবিল বানায়া খাচ্চুনু। ঢাকাত থাকা বড় বড় ফার্নিচার আসা হামাকে খাওয়া শ্যাষ। তার মধ্যে পেটে ভাত নাই। চালের লাইনোত দাঁড়ালে গুলি।
বাসের লাইনম্যান গোল্লা : যা ঘটনা ঘটল। এরপর আর কতা নাই। হামকোক একজোট হবার লাগবে।
[এক যাত্রী উসকো খুসতো চুল একটি খবরের কাগজ হাতে। দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে বলে]
যাত্রী : সারা পৃথিবীতে খাদ্য সংকট। মিশর, উজবেকিস্তান, ইয়েমেন, মেক্সিকো, ভারত, পাকিস্তান সবর্ত্র খাদ্যের জন্য মানুষ আন্দোলন করছে। এর কারণ হলো মান্টাসান্টো, কারগিল, ইউরেকার ব্যবসা এবং জৈব জ্বালানি উৎপাদন। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এজন্য দায়ী। সমাজতন্ত্র চাই বুঝলেন সমাজতন্ত্র চাই।
[মিছিল আসতে দেখা যায়]
মোমেনা : ওই যে মিছিল আসিচ্চে। চলো আমরা ঢুকা পড়ি।
[মোমেনা, গোল্লা, লাদু, গোকুল, খবরের কাগজ পাঠকসহ উপস্থিত সবাই মিছিলে যোগ দেয়।]

৫ম সর্গ

[মঞ্চে সারি সারি লাশ পড়ে আছে। সেনাবাহিনী নামানো হবে, সেনাবাহিনী লাশ উঠিয়ে নিয়ে যাবে। যে মানুষগুলো মৃতপ্রায় কিন্তু এখনও মরেনি সেগুলোও নিয়ে যাওয়া হবে। পরে বধ্যভূমিতে এই লাশগুলো আবি®কৃত হবে। মঞ্চে দেখানো হবে স্বর্ণরথে লাশগুলো উপরে উঠে গেল।]
সূত্রধর : নতুনভাবে নতুন নেতৃত্বে উন্নত নীতি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের আদর্শের
আধারে সঠিক বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বে আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে হবে।

[একটি মিছিল বের হতে থাকে। মিছিলটি মঞ্চে আসে। জঙ্গি রূপ নেয়। প্রজ্ঞা আসছে। আসছে প্রজ্ঞা পারমিতা। ছোট একটা সুন্দর সাজে সজ্জিতা মাথায় তার বেলুনের মুকুট। তাদের আদর করে টেনে তুলে ধরা হয়। প্রজ্ঞার হাতে মেলে ধরা থাকবে একটি প্লাকার্ডÑলেখা ‘গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করুন’।

ইতি সর্গ

সূত্রধর : সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করুন।

[দশর্করা উঠে দাঁড়িয়ে একাত্ম হবে। সর্বহারা আন্তর্জাতিক সংগীত বেজে উঠবে।]


-:যবনিকা:-

0 comments:

Post a Comment