July 24, 2008

সহানুভূতির জায়গা

সহানুভূতির জায়গা
রাশেদুল ইসলাম বাবু

১.
মনার বাক্যালাপগুলো তখন থেকে মাথার ভিতর ঘূর্ণিপাক খাচ্ছে। সে যে এরকম মিডলক্লাশ টাইপের কথা বলতে পারে ভাবতেই পারছি না। মুখেতো অনেক প্রগতিবাদের কথা মারে! মনে হয় যেন সে এক প্রগতিশীল নারীর কণ্ঠস্বর। অথচ...। “নাহ্! এসব ভাবতে আর ভালো লাগছে না।” ঘুমও আসছে না। একটু পরেই ভোর হবে। টেবিলল্যাম্পটার আলো বাড়িয়ে- চৌকির উপর বসলাম- খামোখা। দক্ষিণদিকের দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা ফিদেল কাস্ট্রো’র চুরুটটানা পোস্টারের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হল। “ওহ্! এই মুহূর্তে আরও একটা সিগ্রেট টানতে ইচ্ছে হচ্ছে।” কিন্তু প্যাকেটের সর্বশেষ সিগ্রেটটা শেষ করেছি মিনিট পনের আগে। পাশে টেবিলের উপর রাখা এ্যাস-ট্রে হিসেবে ব্যবহৃত কলেজের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী পূণর্মিলনী’র দাওয়াত কার্ডের উপর সিগ্রেটের ছাই দিয়ে পূর্ণ হয়ে গেছে। বালিশের পাশে মিখাইল গরবাচেভের ‘পেরেস্ত্রোইকা ও নতুন ভাবনা’ বইটার দিকে নজর পড়ল। সোনিয়ার প্যানপ্যানানি শুনতে শুনতে বইটা কিনতে বাধ্য হয়েছি। সবসময় বলত,“দাদা! গরবাচেভের নতুন ভাবনা বইটা কিনে পড়বেন; দেখবেন আপনার দৃষ্টিভঙ্গির অনেক পরিবর্তন ঘটবে।” “দাদা! বইটা কিনেছেন তো?” “দাদা! বইটা পড়া হলে আমাকে জানাবেন।”-এসব ডায়লগ শুনে শুনে বাধ্য হয়ে বইটা কিনেছি এবং পড়েছি। অথচ আমার দৃষ্টিভঙ্গির কিছুই পরিবর্তন ঘটেনি -উপরন্তু সোনিয়ার উপর আমার রাগ হয়। এতো সুন্দর কবিতা আবৃত্তি করতে পারে মেয়েটাÑ অথচ প্রগ্রেসিভ কোনো প্রোগ্রামে ওকে কোনদিন আবৃত্তি করতে দেখিনি। সবসময় আলোক ঝলমল রঙিন মঞ্চ নিয়ে ব্যস্ত -সব টাকার ধান্দায়। এই বয়সে টাকার ধান্দা! ওর ভবিষ্যৎ যে কী? Ñকে জানে। শুনেছি রাজধানীর কোন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মেরুদণ্ডহীন এক ছাত্রের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। আবার এই ছাত্র নাকি মাঝে-মধ্যে সোনিয়াকে ড্যাস দেখিয়ে অন্য এক ইয়াবা সুন্দরীর বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হয়। যাকগে সে কথা। এখন আমার ঘুম দরকার। ঘুম আসবেই বা কী করে? মনা আজ যে কথা শুনিয়েছে! কিছুই ভালো লাগছে না। জানালাটা খুলে চাঁদটার দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছে, চাঁদ আজ বিশ্ববেহায়ার মতো আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। সূর্যের কাছ থেকে আলো ধার নিয়ে এতো গর্ব করার কি আছে? “এই চাঁদও একটা সাচ্চা মিডলক্লাস।”
মসজিদ থেকে ফজর আযানের ধ্বনি ভেসে এলো। বিশেষ করে এই ধ্বনি আমার কানে কঠিনভাবে গীত হলো- “আস-সালাতু খায়রুন মিনার নাওম”। অর্থ- ঘুম থেকে নামাজ উত্তম। অথচ আমার রুমমেট, ব্যাটা একটা সাচ্চা মুসলমানের বাচ্চা, টান-টান করে উবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। ওকে এক্ষুণি ডেকে তোলা দরকার। না, নামাজ পরার জন্য নয়। প্রাইম ক্লিনিকের ৩০৪ নম্বরের এক পেশেন্টের ও পজেটিভ ব্লাড ম্যানেজ করা দরকার- ভোর ৬ টার মধ্যে। আমি ওর কাছে গিয়ে পিঠে হাত দিয়ে বলি, “মোকছেদ! মোকছেদ! তোমাকে উঠতে হবে।” আলতোভাবে ঘুরে সে আমার দিকে তাকিয়ে বলে,
“একটা সমস্যা হয়ে গেছে।”
“কী সমস্যা?”
“সমস্যা একটা আছে। বলা যাবে না। আপনি আলোটা কমিয়ে দিন, আমি উঠছি।”
“তোমার ওঠার সাথে আলোর সম্পর্ক কী?”
“বললামতো, বলা যাবে না।”
আমি টেবিলল্যাম্পটার আলো কমাতেই মোকছেদ চৌকি থেকে তড়িৎ গতিতে নেমে সোজা বাথরুমে চলে যায়। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না। সম্ভবত ওর স্বপ্নদোষ হয়েছে। লুঙ্গিটা হালকা ভিজে গেছে বলে বতি জ্বালানো থাকলে আমি যদি দেখে ফেলি, তাহলে ও লজ্জা পাবে। যা ভেবেছি তাই। মোকছেদ লুঙ্গি চেঞ্জ করে আমার সামনে এসে দাঁড়ালো। আমি ওকে বুঝিয়ে শুনিয়ে প্রাইম ক্লিনিকে পাঠিয়ে দিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। সময় তখন ভোর ৫ টা ৪৫। অথচ সকাল ১১ টার মধ্যে মাসিনপুরের বালুয়া গ্রামে যেতে হবে। সেখানে বসবাসরত আদিবাসীদের (সাঁওতাল) সাথে কথা বলতে হবে- তাদের সংগঠিত করার জন্য। সুতরাং আমাকে ঘুমাতেই হবে।

২.
ঘুম দেখে উঠতে দেরি হয়েছে বলে মাসিনপুর পৌঁছতে বেলা ১ টা বেজে গেল। আমার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। ভ্যানওয়ালার সাথে চুক্তি করি- বালুয়া গ্রামে যাওয়ার জন্য। সেখানে সাঁওতালদের বাস। ২৫ টাকায় ভ্যানওয়ালা যেতে রাজি হল।
আঁকা-বাঁকা পথ আর পথের দুই ধারে শুধু বিস্তৃত ধানক্ষেত। এই পথে ভ্যান চলছে। আর বহুদূরে গাছপালা ও বাড়ি-ঘর। “এই সুন্দর দৃশ্য কী মনার ভালো লাগে?” কখনও জিজ্ঞেস করিনি। এমন অনবদ্য দৃশ্য কতদিন পরে দেখছি- জানি না। ভ্যানচালক পিছন ফিরে আমাকে প্রশ্ন করল, “আপনি কি এনজিও’র লোক?” এই কথা শুনে আমার প্রফুল্লতা ম্লান হয়ে যায়। আমি এসিেছ আদিবাসী ইউনিয়ন গঠন করতে, আর আমাকে বলে কিনা এনজিও’র লোক! কিছুক্ষণ পর সে আবার বলে, “আপনি কি সাঁতাল পাড়াত যাউছেন? সেদিন কয়জন এনজিও’র লোকক মোর ভ্যানোত নিয়্যা গেছিনু। সাঁতালগের ম্যালা করি ট্যাকা দিউছিল। মোক দেয় নাই, মুইওতো গরীব মানুষ আউছি।” একটু পর সে আবার বলে, “আপনার ব্যাগোত কী ট্যাকা?” একথা শুনে আমার মেজাজটা আরও চটে গেল। একটু রুক্ষতার স্বরে বলি,
“না, এখানে কিছু কাগজপত্র আছে।”
“ও বুঝছি! আউজকা লিস্ট করবেন? পরে ট্যাকা দিবেন হয়? মোকও লিস্টত নাম দিয়েন হয়! মুইও গরীব মানুষ আউছি। মোর নাম ইউসুফ। নবীর নামে নাম। মাছের প্যাট থাইক্যা এই নবী জিন্দা বারায় আউছিল।”
একটু পরে সে আবার বলে, “ভ্যান চালায় সংসার মোর চালাউছি, কষ্ট হয়। দুইট্যা বউ মোর। ইসলাম মতে এক পুরুষ চারট্যা বউ রাখবার পায়। বড় বউটার মোর খাসলত ভাল আউছিল না। আল্লার কি কাম আরেকটা বউ মিলায় দিউছে।”
ভ্যানচালকের এসব বাক্যালাপ শুনতে শুনতে বালুয়া গ্রামে পৌঁছে গেলাম। প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগল। আমি রফিক মাস্টারের বাড়িতে উঠলাম। কাজী রফিক একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি আমার পূর্ব পরিচিত। গ্রামের মানুষরা তাঁকে রফিক মাস্টার নামে ডাকে। প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক আন্দোলনের তিনি একজন অন্যতম নেতা। দুপুরে তাঁর বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া করে- আদিবাসীদের এলাকায় যাই।
মেঠো পথ ধরে চলছি। দু’পাশে ধানক্ষেত আর মাঝে-মধ্যে রাস্তার পাশে বড় বড় গাছ। হঠাৎ একটা গাছের নিচে এক মেয়েকে বসে থাকতে দেখি। পথ চলার সময় কারও দিকে লক্ষ্য না করে চলা আমার অভ্যাস। কিন্তু গাছতলায় এই মেয়েটার মধ্যে যেন অদ্ভুত কি রয়েছে! প্রথমে অনিচ্ছায়, তারপর কিঞ্চিৎ উৎসাহী মনে এবং তারপরে নিবিষ্টভাব তার দিকেই আকর্ষিত করে। এই মেয়েটার মধ্যে অদ্ভুত যে কি সেটা দেখার জন্য মনটা হঠাৎ বিপ্লবী থেকে রোমান্টিক হয়ে গেল। মেয়েটার বয়স খুব বেশি না, ২৫/২৬ হয়তো হবে, খুব বেশি হলে ২৭। এত গরমেও মেয়েটাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে না। অনবদ্য ভঙ্গিমায় গাছের নিচে বসে শিশুদের বর্ণশিক্ষার বইয়ের পাতা একটা একটা করে উল্টাচ্ছে। পরনে তার কমলা রঙের সেলোয়ার-কামিজ। আমি আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। চোখে তার চশমা। ঠোঁটের নিচে একটা তিল। মেয়েটি একপলক আমায় দৃষ্টিপাত করে আবার বর্ণশিক্ষা বইটার দিকে মুখ করে মনে মনে কি যেন বলে। সম্ভবত সে আমাকে গালি দিচ্ছে। “এক নম্বর বেহায়া ছেলে-আমার দিকে তাকিয়ে কী করছে?” সম্ভবত এ কথাই বলছে। আমি একটু সাহস নিয়ে বলি, “আপনার নাম?”- কোন উত্তর নেই বরং আমার দিকে রাঙানো চোখে তাকায়। তারপর মাথা নামিয়ে আবার বিরবির করে কি যেন বলে। এবার নিশ্চয়ই সে আমাকে, “শয়তান, বদমাস, হারামী, ছোটলোক, কুত্তা, বিড়াল, শেয়াল, জংলী, জানোয়ার, পাজী, কেরমান...” ইত্যাদি নামে গালি দিচ্ছে। নাহ্! এখানে আর থাকা যাবে না। আমি চলে যাই।
সোজা উত্তর দিকে চলছি-দিশাইল আকন্দ নামের একজন বিদ্রোহী সাঁওতালের বাড়িতে। সেখানে প্রায়ই ৩০/৪০ জন আদিবাসী (সাঁওতাল) আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল। তাদের নিয়ে আমি একটা ইউনিয়ন গঠন করি এবং তাদের উদ্দেশ্যে টানা একটা বক্তব্য দেই। বক্তব্যের একাংশ হলো এরকম-
“... আর, আপনারা যদি অধিকার সচেতন হন এবং আপনরা যদি নিজেদের এদেশের নাগরিক মনে করেন তাহলে আপনাদেরও সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু সরকার আপনাদের মধ্যে যে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে রেখেছে এবং যার মাধ্যমে সমাজের বিত্তবানদের হাতে যেভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন-তা কখনও মেনে নেওয়া যায় না। মনে রাখবেন, আপনারা যদি সংগঠিত থাকেন তাহলে সকল কৃত্রিম বাঁধাকে অতিক্রম করতে সক্ষম হবেন...”
রাতে রফিক মাস্টারের বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা হলো। যে ঘরটাতে আমি আছি সেই ঘরের পশ্চিমদিকে পাশাপাশি অতীশ দীপংকর আর স্বামী বিবেকানন্দ’র ছবি ঝোলানো। পূর্বদিকে একটা জানালা আর জানালা ঘেঁষানো পুরোনো আমলের খাট। রাত তখন প্রায় ১০ টা। সমস্ত গ্রাম নিস্ত-ব্ধ। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক আর মাঝে-মধ্যে শেয়ালের হাক। বহুকাল পরে এরকম একটা পরিবেশে রাত্রিযাপনের সুযোগ হলেও-মনটা কি যেন ভাবছে। তাহলে কি আমি সেই মেয়েটার কথাই ভাবছি? আমিতো এমন না। একটা মেয়েকে দেখে উন্মাদ হবার মতো মানুষ আমি না। অথচ কী আছে তার মধ্যে? রাঙানো চোখ, সেই চোখে চশমা; লিপস্টিকবিহীন ঠোঁট, সেই ঠোঁটের নিচে একটা তিল-ব্যস এইটুকুই। নাকি তার মধ্যে অন্যকিছু আছে যা আমাকে বারবার তরান্বিত করছে। কি নাম হতে পারে তার? (এসব ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়ি)

৩.
সকাল ১০ টার দিকে রফিক মাস্টারের সাথে বালুয়া বাজারে যাই। সেখানে কৃষক সমিতি ও ক্ষেত মজুর সমিতি’র নেতা-কর্মীদের সাথে কথা বলি। তারপর রফিক মাস্টার তার স্কুলে নিয়ে এলেন। শিক্ষক কমনরুমে বসে আছে সেই মেয়েটি- যাকে আমি গাছ তলায় দেখেছিলাম। আমি হতভম্ব হব নাকি উল্লসিত হব ভেবে পাচ্ছি না। মেয়েটি আমার দিকে তাকালো-সেই রাঙানো চোখে। রফিক মাস্টার আমার দিকে দৃষ্টিপাতকরে মেয়েটির সাথে পরিচয় করে দেন, “ইনি হলেন একটি প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের নেতা। শহর থেকে এসেছে। আদিবাসীদের সংগঠিত করার জন্য।” মেয়েটি রফিক মাস্টারের সাথে এবং শেষ পর্যায়ে আমার সাথে সংগঠন, ট্রেড-ইউনিয়ন, সমিতি প্রভৃতি বিষয়ে কথা বলল। তবে সে আদিবাসীদের নিয়ে ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে আমাকে কোন উৎসাহ দেখালো না। বরং আমার কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যুক্তি দাঁড় করল। তার সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে নেওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার নাম?”
“আমি আসফিয়া।”
রফিক মাস্টার একটু বাড়িয়ে বললেন, “আসফিয়া আজিজ মণ্ডল, বাড়ি গাইবান্ধা, এখানে আদিবাসী শিশুদের বিনা খরচে প্রাইমারি শিক্ষা দেন। পড়াশুনা যদিও প্রাণিবিদ্যায়, তথাপি স্যোসালওয়ার্কের উপর গবেষণার জন্য এসেছেন- এ গ্রামে।”
আমি আসফিয়াকে সন্তুষ্টির জন্য তার কাজের প্রশংসা করি। তবে সে কতটুকু সন্তোষ হলো জানিনা। তাঁর সঙ্গে কতাবার্তায় জানতে পারি যে, গ্রামের মাতুব্বর টাইপের মানুষ তার গবেষণার কাজকে বাঁকা চোখে দেখছে। কিন্তু কে তাকে বাঁকা চোখে দেখলো, তা-সে তোয়াক্কা করেনা। ঠিক যেমন আমার ভালোলাগার বিষয়টিতেও তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
বিকেলে অন্য এক পাড়ায় আদিবাসীদের সাথে বৈঠক দিতে আসি। সেখানে আসফিয়া আগে থেকেই তার স্যোসালওয়ার্কে ব্যস্ত ছিল। এখানে এসে আসফিয়ার সাথে তৃতীয়বারের মতো দেখা হবে-সেজন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তবে আমি আমি আসাতে সে একটু অস্বস্তি বোধ করল। তার কাজের ব্যাঘাত ঘটবে বলে সে আমাকে আদিবাসীদের সাথে কথা বলতে দিলো না। একটা পর্যায়ে সে আমাকে চলে যেতে বাধ্য করল এবং বলল,
“আপনারা বামপন্থিরা আর কতদিন ভণ্ডামি করবেন। এসব সংগঠন, ইউনিয়ন করে কতজন মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন? আর আমি যেহেতু এখানে আছি আপনার কথা কেউ শুনবে না। কারণ, সবাই আমার ভক্ত।”
আমি বিষয়টা চরমভাবে উপলদ্ধি করলাম যে, একপ্রকার কৃত্রিম ভালবাসা দিয়ে সে এসব মানুষের মন জয় করে নিয়েছে- হয়তো তার গবেষণার স্বার্থেই। আমি ফিরে যেতে বাধ্য হই। তারপর সন্ধ্যার দিকে শহরের উদ্দেশ্য রওনা হই।
শহরে পৌঁছতে রাত হয়ে গেল। রেলগেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছিÑটুটুলের অপেক্ষায়। ভাবছি ওর সাথে দেখা করেই রুমে ঢুকবো। কলেজ রোডের উপর দিয়ে প্রচুর মানুষ যাওয়া-আসা করছে। উত্তরবঙ্গের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী পূণর্মিলনী অনুষ্ঠান। সবাই উৎসুকভাব নিয়ে সেজেগুজে যাচ্ছে কলেজ প্রাঙ্গণে, আবার কেউ ফিরে আসছে। কারও মনে খুশির বন্যা- কারও হৃদয়ে আনন্দের ঢেউ, কেউ কেউ আবার গোমড়া মুখ করেও ফিরে আসছে। রাত প্রায় ৮টা। ডা. নিমাই ভট্টাচার্য্যরে সাথে হঠাৎ দেখা। আমি তাকে নিমাইদা বলে ডাকি। রবীন্দ্রনাথের উপরে পিএইচডি নিয়েছেন তিনি। তিনিও এই কলেজের প্রাক্তন ছাত্র। আমার সাথে দেখা হয়ে তিনি এমন ভাব করলেন যেন আমার মতো কাউকে খুঁজছিলেন। তিনি আমাকে চায়ের অফার দিলেন। পাশে মামার ক্যান্টিনে দু’জনেই প্রবেশ করি। চা খেতে খেতে দু’জনাই কথাবার্তা চাালিয়ে যাই। প্রথমবার চায়ে চুমুক দিয়ে নিমাইদা আমাকে বললেন,
“জানো! আমি এই পূণর্মিলনী অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী পর্বের উপস্থাপক ছিলাম। প্রোগ্রাম আশানুরূপ হয়নি।”
“কি যে বলেন! আপনি হলেন পূণর্মিলনী কমিটির ইক্সিউকেটিভ মেম্বার, আর আপনি বলছেন...”
“এদের নিয়ে কী অনুষ্ঠান ভাল করা যায়। সব টাকা খাওয়ার ধান্দা, বুঝলে-সব টাকা খাওয়ার ধান্দা। তোমাদের সংগঠনের ছেলে মেয়েরা এই অনুষ্ঠানকে আগে থেকে বর্জন করেছে-এজন্য তোমাদের ধন্যবাদ।”
“ধন্যবাদটা অনেক আগে দিলেই পারতেন! অনুষ্ঠানের বিপক্ষে আমরা আগেই বিবৃতি দিতে পারতাম। কিন্তু
আপনাদের মতো কিছু শিক্ষক আছে বলেই ...”
ড. নিমাই ভট্টাচার্য্য একটু হেসে চায়র কাপে মনোযোগ দেন। তারপর বললেন,
“ আমি হলাম উদ্ধোধনী পর্বের উপস্থাপক। অথচ লীগের বাকের শাহ্ আর বিএনপি’র বাটুল মিয়া তা মেনে নিতে
পারেনি। তাদের বক্তব্য যে, তাদের মধ্যে একজনকে উপস্থাপনা দিতে হবে। আর ঐ যে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চারা, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটা গোণ্ডগোল পাকাতে চেয়েছিল। আমি কোনভাবেই মাউথপিচ হাতছাড়া করিনি। শেষ পর্যন্ত আমি উপস্থাপনা করেছি।”
আমি একটু হেসে বললাম, “তারপর?”
“তারপর আর কি! অনুষ্ঠান শুরু হলো। কিন্তু শালা ঐ স্বৈরাচারের বাচ্চা সাবেক রাষ্ট্রপতিকে সম্মান দেখাতে হয়েছিল, এজন্য খারাপ লাগছে। ছাত্রজীবনে ঐ শালার ছবি পুড়িয়েছি, ওর বিরুদ্ধে মিছিল করেছি। আজ কিনা ঐ শালাই আমার উপস্থাপনায় বক্তব্য দিল। আর ছাগলে চার নম্বর বাচ্চারা, মানে দর্শকরা ঐ শালার ব্যক্তব্য শুনে হাততালি দিল।”
আমি আরও আগ্রহ নিয়ে বললাম, “তারপর?”
“তারপর, একটা বেহায়া চামচিকার মতো মানুষ আমার কাছে এসে তার ভিজিটিং কার্ড দিয়ে বলল আমার নাম আবু-আল জুবায়ের। বর্তমানে আমেরিকায় থাকি, আমি একটু বক্তব্য দিব, কার্ডটা দেখে আমার নামটা ঘোষণা করুন। এতে আমার মেজাজটা আরও চটে যায়- বুঝলে।”
এসব কথা বলতে বলতে তিনি চায়ের শেষ চুমুকটা এমনভাবে দিলেন যেন তার সব মেজাজ চায়ের উপর দিয়েই গেল। আর কিছু বললেন না। কিছুক্ষণ পর তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যান। তারপর মামার ক্যান্টিন থেকে বাহির হবার পথে একটা সিগ্রেট ধরালাম। রেলগেটের কাছে যেতেই কে যেন পেছন থেকে এসে আমার পিঠে হাতদিয়ে বলে, “কিরে দোস্ত! পলিটিক্স কেমন চলছে?” পিছন ফিরে দেখি একটা বাদামী রঙের পাঞ্জাবি পরে উস্খুস মনে হাসছে আল-কাওসার। আমি অবশ্য ওকে ‘সূরা আল-কাওসার’ বলে ডাকি। একটু উৎসাহীভাবে ওকে বললাম,
“আরে সূরা আল কাওসার ! তুইও কী প্রোগ্রাম দেখে আসলি?”
“প্রোগ্রাম আর কোথায় দেখা হলো। সুন্দরীদের দেখবো-না-প্রোগ্রাম দেখবো?”
“মেয়েরা কী আজ সুন্দরভাবে সেজে এসেছিল?”
“আরে সে কথা বলিস না! এরশাদ মামুর তিন নম্বর বউ হওয়ার আশায় সব মেয়েরা আজ বিউটি পার্লার থেকে কেউ সেজেগুজে আবার কেউ ফ্রেশওয়াশ হয়ে এসেছিল, হা হা হা।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস না করে ওকে এড়িয়ে একটু এগিয়ে গেলাম। কারণ ওর সাথে থাকলে মেয়েদের ব্যাপারে আরও অশ্লীল কথা শুনতে হবে। রেলগেট পার হয়ে একটু সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি অ্যাডভোকেট সামসুজ্জামান গোমড়া মুখ করে ঢুলতে ঢুলতে হেটে আসছে। ব্যাটার বয়স ৭০ পার হয়ে গেছে কয়েক বছর আগে। তারপরও শখ কম না। বেশ ফিটফাট হয়েই এসেছিল গ্রোমাম দেখতে। আমি তাকে দৃষ্টি আকর্র্ষণ করার জন্য তার সামনে এসে বলি, ‘আপনি বুঝি প্রোগ্রাম দেখে এলেন?”
“আরে আমি সেই ৬২ সালে এই কলেজ থেকে ডিগ্রি পাশ করেছি। আমার নাতি-পুতিরাও এই কলেজ থেকে পাশ করে এখন সন্তানের বাবা-মা হয়ে গেছে। অথচ ...”
“অথচ কী?”
“অথচ, আমাকে একটু বক্তব্যের সুযোগ দিল না! আমি হলাম একজন নামজাদা অ্যাডভোকেট। তাছাড়া পর পর তিন বার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ছিলাম। আমাকে হিশেবই করল না!”
আমি তাকে হালকাভাবে বলি, “বক্তব্য দিতে পারেন নি, কিন্তু সাবেক বন্ধুদের সাথে সাক্ষাত ঘটেছে নিশ্চয়ই।”
“ছাই ঘটেছে! এভাবে কি হয়? ঐ যে, গ্রামের মধ্যে যাত্রা লাগলে, সারাদিন মাইকিং করে বলে যে, ‘সুন্দরী কমলার নাচ দেখতে চাইলে চলে আসুন আমাদের আলোক ঝলমল যাত্রা প্যান্ডেলে- এই হচ্ছে এই প্রোগ্রামের দশা।” এমনি সময় একজন রিক্সাওয়ালাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, “এই খালি যাবে?” রিক্সাওয়ালা উত্তরে বলে, “যাবো না”। তখন তিনি তাঁর সমস্ত রাগ-অভিমান ঝেড়ে দেয় রিক্সাচালকের উপর, “শালারা যাবেনা তো, যাবে কোথায়?”
৪.
অবশেষে টুটুলের সাথে দেখা হলো রাত ৯টার দিকে। পুণর্মিলনী অনুষ্ঠানের রিপোর্ট লিখে আনতে বলেছিলাম। “নির্লজ্জ বেহায়াদের পুণর্মিলনীতে এশিয়া এনার্র্র্জির বিজ্ঞাপন” শিরোনামে সে রিপোর্টটা সুন্দর লিখেছে। ওকে দ্রুত ই-মেইল করতে বলে আমি রুমে চলে এলাম। ফ্রেশ হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ি। সমস্ত ক্লান্তি থেকে বোধহয় রক্ষা পেলাম। আসফিয়ার কথা মনে পড়ছে। বিশেষ করে তার ভাষ্যগুলো বেশি করে মনে পড়ছে। আর সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। সত্যি কী আমার কর্মকাণ্ডে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না? মানুষের অধিকার আদায়ের তত্ত্বগুলো কী আজ অকেজো? সোনিয়ার অনুরোধে কেনা মিখাইল গরবাচেভের তত্ত্ব্ই কী ঠিক? আসফিয়া কী মিখাইলের বইটা পড়েছে? নাকি সে তার অভিজ্ঞতার আলোকে আমার কাজে বাঁধা দিয়েছে-কে জানে! কিন্তু আমিতো মার্কসীয় তত্ত্বে বিশ্বাসী। যুগেযুগে কালেকালে এই তত্ত্বই সবার কাছে সমাদৃত। একজন সৎ ও আদর্শবান মানুষ এই তত্ত্বকে অস্বীকার করতে চায় না। তাহলে কী আমি অসৎ হতে যাচ্ছি?
ওহ্! এখন কেউ যদি আমাকে সহানুভূতি দেখাতো! প্রত্যেক মানুষের অন্তত একটা জায়গা থাকা দরকার যেখানে সে সহানুভুতি পাবে। কিন্তু আমার তো সে জায়গা নেই। আমি কী অসহায়? জানি না। আমার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এলো। চারিদিক অন্ধকার। কালো রঙের অন্ধকার। সবকিছু অন্ধকার। খানিক পরেই সেই অন্ধকারের ওপাশ থেকে নীল আকাশ ভেসে এলো, সাথে হালকা সাদা সাদা মেঘ। সেই মেঘের ভিতর থেকে এক অপরূপা ভেসে এলো। “একি! এতো মনার মত দেখতে, নাহ্! মনার মতো না-ঠিক আসফিয়ার মতো! তাও না-এ অন্য কিছু। দু’হাত উপরে তুলে আমাকে উদ্দেশ্য করেই বলতে লাগল,
“আমি অপরূপা কিনা জানি না। তবে আমি কিছুদিন আগে রান্নাঘরে ঢুকে কেরোসিন দিয়ে স্নান করেছিলাম। তারপর একটা দিয়াশলাইয়ের জ্বলন্ত কাঠি দিয়ে নিজেকে পুড়িয়েছিলাম। কেউ জানেনি। তবে সমাজ জেনেছে আমার নীরব প্রতিবাদের ভাষা। পুরষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে আমি নীরব প্রতিবাদ জানিয়েছি। কারণ আমি অসহায় ছিলাম। সহানুভূতির জায়গা আমার ছিলোনা। আজ তুমিও অসহায়। তোমারও সহানুভূতির জায়গা নেই। তাহলে তুমি মৃত্যুবরণ কর-যদি তুমি কাপুরুষ হও। আর যদি বীরপুরুষ হও তাহলে তোমার সামনে অনেক পথ। মনার কথায় মন খারাপ করার দরকার কী? তোমারতো মেরুদণ্ড আছে। আর আসফিয়ার কথায়-তুমি হতাশ কেন? তোমার তো মার্কস আছে, লেনিন আছে, আছে গোর্কির মা আর বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসের নায়কের গল্প। একটু ভেবে দেখ, তুমি হেরে যাওনি। আসফিয়াতো তার স্বার্থ হাসিলের জন্য তোমার মহৎ কাজে বাঁধা দিয়েছে। কারণ তুমি যদি এসব মানুষের অধিকার সচেতন করে তোলো- তাহলেতো আর কেউ তাদের ব্যবহার করতে পারবে না, এনজিওরা ব্যবসা করতে পারবে না। আসফিয়া তার গবেষণার স্বার্থেই ঐ মানুষগুলোর সন্তানদের বর্ণশিক্ষা দেয়, তার গবেষণা শেষ হলেই সে চলে যাবে। তারপর ঐ শিশুরা যেমন ছিল তেমনই থেকে যাবে। আর তুমি যে কাজে গিয়েছিলে তাতে তাদের সারাজীবনের ভাগ্য পরিবর্তনের আশা ছিল। আসলে তুমিই সত্য। এটাই তোমার সহানুভূতির জায়গা। তুমি জয়ী হও! বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক।”

0 comments:

Post a Comment