July 24, 2008

বিভ্রান্তিকর

বিভ্রান্তিকর
প্রণব চক্রবর্তী

ম্যানচেস্টারের যে এলাকায় প্যাট -এর বাড়ি তাকে শহরতলী বলা চলে । কিন্তু শহুরে কোন সুবিধারই ঘাটতি নেই এখানে। তিনতলা বাড়িতে কমপক্ষে বারোটি রুম আর তিনটি টয়লেট । বাসিন্দা দু’জন । প্যাট আর তার স্বামী পিটার। দু’টো বেড়ালও অবশ্য আছে।
পিটার -এর আগের ঘরের ষোড়শী মেয়ে হস্টেলে থাকে । লেখাপড়া করছে মিউজিক-এর উপর । পিটার ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং -এ ডিগ্রি নিলেও পরে ক্যারিয়ার এগিয়েছেন সাইকোলজী পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাইকোলজী পড়ান এখন। প্যাট-এর তিন ছেলে মেয়ে। সবাই ম্যানচেস্টারেই থাকে ।
প্যাট হেসে বললো, পিটার হচ্ছে আমার চতুর্থ স্বামী । বাজিয়ে নিয়েছি। বয়সের ডিফারেন্সও বেশি না । আমার চেয়ে মাত্র বারো বছরের ছোট ও। তবে বেশি মদ গিলে ‘উইক্ এন্ড -এ’ কাজ ফাঁকি দেয়ার দলে সে নয় । আমি আগেই বোঝাপড়া করে নিয়েছি । বাব্বা ! বুঝতে পারছো তো তিন তলা বাড়ি আমাদের দু’জনকেই সামলাতে হয় ।
অবশ্য আগে সুবিধা ছিল। ঐ যে বেড়াল স্যাবাস্টিন -কে দেখছো- ও আমার দ্বিতীয় মেয়ের দ্বিতীয় বরের বেড়াল । ঐ ছেলেটা ভাল ছিল বেশ। বাসায় আসলে বলতেই হতোনা, নিজেই ফোর ক্লিন করে দিয়ে যেতো । ওর পেশাইতো ক্লিনিং। অতএব,এক্রাপার্ট সে এসব কাজে ।
কিন্তু ঐ যে, বাজে স্বভাবের কথা বলছিলাম। রাজ্যের যত বদ্ মেয়ের ফোন নাম্বার ওর মুখস্থ। রেগুলার সব পাউন্ড যদি ‘পাব’ এ গিয়ে ঐ হারামজাদীদের পেছনে ঢালো তাহলে কোন্্ মেয়ে সহ্য করবে ? তাইতো মেয়ে তাকে ডিভোর্স দিয়ে এখন রুমানিয়ার এক ছেলের সঙ্গে লিভ্ টুগেদার করছে। ভালো আছে সে। বাড়ি কিনেছে ‘পশ্ ’এলাকায় । ঝামেলা কিন্তু বাচ্চা দু’টোকে নিয়ে । আস্ত বাঁদর । ওরটা তবু রয়ে সয়ে থাকে । কিন্তু ওর বয়ফ্রেন্ড ‘জন’-এর ছেলের কথা আর বলো না।
অবশ্য বলবো কী ? যেমন মা, তেমন ছেলে । জন-এর আগের বউ ছিল ফ্রেঞ্চ । নাক উচুঁ মহিলা বাচ্চা ফেলে ফিয়াঁসে-র হাত ধরে ফ্রান্সে চলে গেছে।
বংশলতিকার এমন জটিল সম্পর্ক মনে রাখার মত ধীশক্তি আমার নেই।
একটু উদাস ভাবে প্যাট -এর দিকে তাকাতেই প্যাট বললো, শোনো আমি একাধারে শিক্ষিকা-অন্যদিকে এনজিও কর্মী। মানুষের নার্ভ আমি বুঝি। তুমি কি ইন্টারেস্ট্ হারিয়েছো ? রিফিল করো । রেড ওয়াইন -এ চুমুক দাও। তাহলে কন্সেন্ট্রেট করতে পারবে। শোনো ব্রিটিশরা কোন নন-ইউরোপিয়ান -এর সাথে সহজে ‘বক্ বক্ ’করে না । কারণ তাদের ধারণা নন্ ইউরোপিয়ান-রা কালচার-এর ঐ পর্যায়ে এখনও পৌঁছেনি যে, তাদের সঙ্গে “ সেক্স থেকে পলিটিক্স ” যে কোন বিষয়ে আলাপ করা যায় ।
পকেটের পাউন্ড খরচ করে মদ কেনার সাহস আমার নেই। দু’একবার শস্তা বিয়ার কিনেছি। কিন্তু মুফতে পেলে রেড ,হোয়াইট বা হুইস্কি গিলেছি দেদার। আজকেও একটু বেশিই নিয়েছি। মাথা টলোটলো করছে মনে হলো ।
বললাম, তা এশিয়ানদের কী ভাবো ?
প্যাট একগাল হেসে বললো, মনে রেখো আমি কিন্তু সংস্কারমুক্ত লোক। আমরা তোমাদের এক সময় রুল্ করতাম -ওসব এখন ইতিহাস। তবে এটাতো ঠিক - মানসিকতার দিক দিয়ে তোমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছো।মে›ট্টাল ফ্যাকাল্টি সমমানের না হলে আলাপ জমেনা । কী বলো?
আমি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই চিবোতে চিবোতে বললাম, ‘যেমন ? যেমন ?
‘ জাস্ট এ মিনিট ’ বলে প্যাট হুইস্কি দিয়ে গলা ভেজালো।ধরো স্ট্র্যাটিফিকেশন । তোমরা কর্মী মানুষকে মূল্যায়ন করোনা। সমাজের উচুঁস্তরে তোমাদের দেশে থাকে শারীরিক পরিশ্রম বর্জিত লোক । আর কর্মী মানুষ রাস্তার মানুষ। ওরা তোমাদের কাছে অষ্পৃশ্য । তুমি দেবে তোমার মেয়েকে ক্লিনার -এর সঙ্গে বিয়ে ? তোমার অফিসের যে মেসেঞ্জার সে তোমার সঙ্গে বসে ড্রিংক করতে পারে ?

আমি মাথা দুলিয়ে বললাম , ‘তাহলে দু‘শো বছর ধরে এসব বাজে জিনিস আমাদের শিখিয়েছো কেন ? ইচ্ছে করেই........?
প্যাট্ আমার গ্লাসে টোকা মেরে বললো,‘ এখানেই ডেভেলপমেন্ট ! ডেভেলপ্ড্ হতে চাইলে নিজেকে নিজের মত করে গড়তে হয় । অন্যের শেখানো মতে নয়। বুঝলে হে ?
এ সময় বাইরে থেকে পিটার আসলো। আমাকে ‘হ্যালো’ বলে পাশের রুমে চলে গেল।
আমি প্যাট্-এর দিকে চোখ তুলে বললাম, ‘ পিটার কি অ্যাভয়েড নন্ ইউরোপিয়ান সিন্ড্রোম’-এ ভুগে ?
প্যাট্ কথাটার কোন জবাব না দিয়ে বলে চললো, ‘শোন, আমার কিছু এশিয়ান স্টাফ আছে । ‘ ডিভোর্স ’ নিয়ে তাদের যে ভীতি সেটা রীতিমত হাস্যকর । এক ইন্ডিয়ান আমাকে বলেই ফেললো যে এদেশে থাকলে সংসার টিকবে না। সমাজে যদি মান সম্মান নাই থাকে তবে টাকা কামিয়ে লাভ কী ? তারচে ‘ইন্ডিয়া ঢের ভালো।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডিভোর্স কি খুব সুখকর ?’
প্যাট একটু ক্ষেপেই গেল, ‘বলো কি ? লাইফটা কত বড় ? যার সঙ্গে বনেনা মেকানিক্যালি তার সঙ্গে জীবনযাপন করা আর হাতে ধরে লাইফটা ‘হেল্’ করা সমান। তার চেয়ে‘ আলগ্ ’ চলাই ভালো ।
টি শার্ট আর ট্রাউজার পরে পিটার আমাদের সঙ্গে যোগ দিল ।
ড্রিংকস্ নেয়ার আগেই আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তোমার ধৈর্য আছে তো ? প্যাট্ কিন্তু সমানে বক্তে পারে ।’
প্যাট্ রান্না ঘরের দিকে যেতে যেতে বললো,‘দু’টো বোবা হলেতো আর সংসার হবেনা। বৃদ্ধাশ্রম হতে পারে ।’
প্যাট্ চলে যেতেই আমি পিটার-কে নিচুস্বরে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি চালিয়ে নাও কীভাবে ?’
‘ওটা তোমাদের মতই। পত্রিকা উল্টাতে থাকি। নইলে মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখি।
আমি হাসতে হাসতে বললাম ,‘তাহলে পার্থক্য কোথায় ?’‘কিছু মনে করবে নাতো ? তোমার চেয়ে বয়সে বড় এই বুড়ি মহিলাকে বিয়ে করতে গেলে কেন ?’
অমনি পিটার উঠে দাঁড়িয়ে আমার হাতে টিপ্ দিয়ে বললো, গ্লাসটা ভরে নিয়ে চলো লন্-এ যাই। এসব কথা বলার জন্য সেখানটাই ভালো।’ পিটার রান্নাঘরের দরজায় শিস্ দিয়ে বললো, ‘গেস্ট্কে তোমার ‘লন্’ দেখাতে নিয়ে গেলাম। ভেতর থেকে প্যাট্ চিৎকার করে বললো, ‘আফ্রিকান অর্কিড’ টা দেখিও।’
পিটার বললো ,‘কথা শুরু করার আগে শর্ত দিয়ে নিই। আমার কথাবার্তা ঘূণাক্ষরেও প্যাট্-কে বলা যাবেনা । তাহলে তুমি কিন্তু নরকে যাবে । তোমরাতো আবার ধর্ম মানো।’
আমি কৌতূহলের আতিশয্যে বলে ফেললাম ,‘প্রমিজ’।
আমার প্রথম বউ রান্নাঘরেই যেতে চাইতোনা । হয় প্রিপেয়ার্ড ফুড কিনে আনো নয়তো রেস্টুরেন্টে চলো। বন্ধুবান্ধবরা ঠাট্টা করতো আমার বাসা-কে ‘প্রাইভেট হোটেল ’বলে । পার্টি দিয়েও লজ্জায় পড়তাম। কোন ‘হোম মেড্ ডিশ ’ নেই। তাই ডিভোর্স দিয়ে দিলাম। যা শাল্ল¬া !
আমি একটু অবাক সুরে বললাম, ‘ শুধু রান্না করেনা বলে , ডিভোর্স?’
পিটার মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,‘ হ্যাঁ, শুধু তাইনা , প্যাট-এর সঙ্গে বিয়ের পর আমাদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনায় তাকে ইনভাইট করেছিলাম। এসেছিল ?’
এসেছিল তো বটেই । প্যাটের রান্না করা সুইট ডিশও বাছাধনকে খাইয়ে ছেড়েছি।
‘ তো, শুধু রান্না জানার কারণেই প্যাটকে বিয়ে করেছো ?’

’ কারণ অনেকগুলো আছে। সব তোমাকে বলতে চাইনা । তবে প্যাটের বয়স এখন ষাট । আগে তিনবার বিয়ে করেছে। বিয়ের খায়েশ ওর মিটে গেছে । অতএব, ডিভোর্স চাইবার আশংকা কম । তারপর ধরো টাকা পয়সাও বেশ জমিয়েছে। বাজে খরচে তেমন আগ্রহ নেই । সবচে ’ বড় কথা হলো, সে এসেছে লোয়ার ফ্যামিলি থেকে । ওর ফাদার ছিল লো লেভেল এমপ্ন¬য়ী । সোসাইটিতে তাদের অবস্থান বলার মতো না । এজন্য আমাকে একটু সমীহ করে । ওর একটা মেয়ের বিয়ে হয়েছে ক্লিনার-এর সঙ্গে । ক্যান ইউ ইমাজিন?’
‘আর আমার ফ্যামিলি ? লর্ড পরিবারের সাথে আমাদের আÍীয়তা আছে। এলাকায় বনেদী পরিবার হিশেবে পরিচিতি আছে। আমার মা-বাবা তাদের নিজস্ব বাড়িতে থাকে।’
আমার কানের কাছে মুখ এনে পিটার বললো, ‘জানো প্যাট -এর মা সিটি কাউন্সিল -এর দেয়া বাড়িতে থাকে। বুঝতেই পারছো ! অতএব, আমাকে পাওয়া মানে বুড়ি আকাশের চাঁদ পেয়েছে ।’
আমি বললাম, ‘জাতে উঠেছে আর কী ? ’
পিটার বললো, ‘ কারেক্ট ........।’

‘ কিন্তু তোমরা যে সবাইকে সমান ভাবো --এমন বলে বেড়াও.....।’
পিটার চাপা গলায় বললো, ছোট লোকরা জাতে উঠতেই এসব বলে । শোনো লর্ডরা হচ্ছে, ‘ নেক্স্ট্ টু গড ’-- বলেই হা হা করে তৃপ্তির হাসি হাসলো পিটার । তাহলে তোমরা এগুলে কোথায়? জাত -পাত এসবতো তোমাদের মাথা ভর করে রেখেছে ! মাথা ঝাঁকিয়ে পিটার বললো, ‘সেটাই স্বাভাবিক নয়কি? তোমার গর্ব করার বিষয় আছে, তুমি সুপিরিয়র-এটা চেপে যাবারতো কারণ নেই ! ভেন্টিলেট ইট ! তোমার থাকলে তুমিও করো । তোমাকেতো কেউ আর ‘না ’ করছে না !’
হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে পিটার স¥রণ করলো, ‘ইয়েস ,তোমার ‘ ই- মেল’ পাবার পর আমার এক ফ্রেন্ড বল্লো ,আমি নাকি ‘ লাকী ’? কারণ প্রাচ্যের ‘ প্রিস্ট ’ বংশের লোক তুমি ! তুমি লর্ডদের গেস্ট হওয়া ডিজার্ভ করো । আই এ্যাম হ্যাপী ।
তোমার ‘কাস্ট ’-এর কোন অনুষ্ঠানে তোমরা লোয়ার ক্লাসদের এন্টারটেইন-ই করোনা । ইয়েস্ , আই সাপোর্ট ইট মাই ফ্রেন্ড !’
মনিব আর চাকরের রক্ত মেশেনা । তাই এসব বিষয়ে আজগুবি চিন্তা না করে প্র্যাগম্যাটিক ডিসিশান নেয়া উচিৎ । জাত-পাত তুলে দিয়ে আমরা কৌলীন্য হারিয়েছি । রয়্যাল ব্লাড শ্যুড বি ভার্জিন !
আমার মুচকি হাসি দেখে পিটার বললো, ‘আশা করি আমাকে আর‘ বিভ্রান্তিকর ’মনে হচ্ছে না, মাই ফ্রেন্ড !’

0 comments:

Post a Comment