কিলিমানজারোর তুষার
মূলঃ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
রূপান্তরঃ খসরু চৌধুরী
মূলঃ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
রূপান্তরঃ খসরু চৌধুরী
[কিলিমানজারো হলো তুষারে মোড়া ১৯৭১০ ফুট উঁচু একটা পাহাড় আর এটাই নাকি আফ্রিকার সর্বোচ্চ পাহাড়। মাসাই ভাষায় এটার পশ্চিম চূড়াকে বলা হয় ‘এনগাজে এনগাই’ ঈশ্বরের বাড়ি। পশ্চিম চূড়ার কাছে পড়ে আছে একটা চিতাবাঘের শুকনো আর জমাটবাঁধা মৃতদেহ। কেউ ব্যাখ্যা করেনি অত উঁচুতে চিতাবাঘটা কী খুঁজতে উঠেছিল।]
‘আশ্চর্য ব্যাপার হলো এখানে কোনও ব্যথাই নেই,’ বলল সে। ‘শুরুতে সেরকমই মনে হয়।’
‘সত্যি?’
‘একদম সত্যি। দুর্গন্ধটা নিয়ে অবশ্য আমি দুঃখিত। ওটা নিশ্চয় তোমার খারাপ লাগবে।’
‘না! প্লিজ এ-কথা ভেবো না।’
‘ওই দেখো,’ বলল সে। ‘ওরা কি চোখে দেখে এখানে এসেছে নাকি দুর্গন্ধ পেয়ে?’
একটা মিমোসা গাছের বিস্তৃত ছায়ায় পাতা খাটিয়ায় শুয়ে আছে মানুষটা আর তার দৃষ্টি ছায়া পেরিয়ে গিয়ে পড়েছে ঝকঝকে রোদে ভরা সমভূমির ওপর যেখানে অশ্লীল ভঙ্গিতে উবু হয়ে বসে আছে বড় বড় তিনটে পাখি, আকাশে উড়ছে আরও গোটা বারো, মাটিতে দ্রুত-চলমান ছায়া ফেলে ফেলে।
‘ট্রাকটা ভেঙে পড়ার দিন থেকেই ওরা ওখানে আছে,’ বলল সে। ‘তবে আজই প্রথম মাটিতে নামল। যদি কোনও গল্পে লিখার ইচ্ছে হয় ভেবে প্রথমে আমি ওদের ওড়াটা লক্ষ করেছি তীক্ষ্ণ চোখে। এখন মনে হচ্ছে সে-প্রয়োজন আর হবে না।’
‘আমিও চাই প্রয়োজন যেন তোমার না হয়,’ বলল মহিলা।
‘বললাম একটা কথার কথা,’ বলল সে। ‘কথা বললে সময় কাটানোটা অনেক সহজ হয়। কিন্তু তোমাকে আর বিরক্ত করতে চাই না।’
‘তুমি জানো এতে আমি বিরক্ত হই না,’ বলল মহিলা। ‘আসলে কিছুই করতে না পেরে একটু ঘাবড়ে গেছি। মনে হয় প্লেন আসার আগ পর্যন্ত যথাসম্ভব হালকাভাবে আমাদের কাটাতে হবে সময়টা।’
‘কিংবা প্লেন না আসার আগ পর্যন্ত।’
প্লিজ বলো আমি কি করতে পারি। আমার করার মত কিছু কাজ নিশ্চয় আছে।’
‘তুমি পা-টা খুলে নিতে পারো আর তাতে ব্যথার যন্ত্রণাটা থামতেও পারে, যদিও এতে আমার সন্দেহ হয়। কিংবা গুলি করতে পারো আমাকে। এখন তো তোমার নিশানা বেশ ভাল। আমি তাহলে গুলি করাটা তোমাকে ভালই শিখিয়েছি, তাই না?’
‘প্লিজ ওভাবে কথা বলো না। তোমাকে কিছু পড়ে শোনাব?’
‘কী পড়বে?’
‘বইয়ের ব্যাগটাতে আর যা পড়ার বাকি আছে।’
‘আমি শুনতে পারব না,’ বলল সে। ‘কথা বলাই সবচেয়ে সোজা। আমরা ঝগড়া করতে পারি আর তাতেও সময়টা বেশ কেটে যাবে।’
‘আমি ঝগড়া করি না। কখনওই ঝগড়া করতে চাইনি আমি। আর আমরা ঝগড়া করব না। যত ঘাবড়েই আমরা যাই না কেন। তারা হয়ত আজই ফিরে আসবে আরেকটা ট্রাক নিয়ে। হয়ত প্লেনই চলে আসবে।’
‘আমি নড়তে চাই না,’ বলল মানুষটা। ‘তোমার কিছু সুবিধে করে দেয়ার প্রয়োজনে ছাড়া এখন নড়াচড়া করার আর কোনও মানে হয় না।’
‘এটা কাপুরুষের মত কথা।’
‘গালি না দিয়ে একজন মানুষকে কি শান্তিতে মরতেও দেবে না? আমার মত মানুষকে গালি দিয়ে লাভই বা কী?
‘তুমি মরবে না।’
‘বোকার মত কথা বলো না তো। আমি এখন মারা যাচ্ছি। হারামজাদাগুলোকে জিজ্ঞেস করে দেখো।’ তাকাল সে বসে থাকা বড় বড়, নোংরা পাখিগুলোর দিকে, ওদের ন্যাড়া মাথা পালকে গোঁজা। প্লেনের মত এসে নামল চতুর্থ আরেকটা, দ্রুত পায়ে খানিকটা দৌড়ে, হেলেদুলে এগোতে লাগল অন্যগুলোর দিকে।
‘ওরা প্রত্যেকটা তাঁবুর আশেপাশে থাকে। তুমি কখনও লক্ষ করোনি এই যা। ভেঙে না পড়লে তুমি কিছুতেই মরবে না।’
‘কোথায় পড়েছ ওসব কথা? তুমি একটা আস্ত বোকা।’
‘তুমি অন্য কারও কথা ভাবো।’
‘যিশুর দোহাই,’ বলল সে, ‘সেটা আমার ব্যাপার।’
আবার শুয়ে পড়ল সে আর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল সমভূমির তাপপ্রবাহের ভেতর দিয়ে ঝোপঝাড়ের দিকে। চরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা টমি, হলুদের উল্টোপাশে শাদা শাদা লাগছে তাদের আর, অনেকটা দূরে, চরে বেড়াচ্ছে একপাল জেব্রা, জঙ্গলের সবুজের উল্টোপাশে তাদেরও মনে হচ্ছে শাদা। পাহাড়ের পাদদেশে বড় বড় গাছের ছায়ায় তাদের তাঁবুটা হয়েছে চমৎকার, এখানে রয়েছে সুস্বাদু পানি, আর পাশেই, প্রায় শুকিয়ে আসা একটা অগভীর জলা যেখানে সকালবেলায় নামে বুনো হাঁসের ঝাঁক।
‘তুমি কি চাও না আমি কিছু পড়ে শোনাই?’ জানতে চাইল মহিলা। খাটিয়ার পাশে বসে আছে সে ক্যানভাসের একটা চেয়ারে। ‘বাতাস আসছে।’
‘না, ধন্যবাদ।’
‘ট্রাকটা হয়ত এসে যাবে।’
‘তাতে আমার কোনও যায় আসে না।’
‘আমার যায় আসে।’
‘আমার যায় আসে না এমন অনেক কিছুতেই তোমার যায় আসে।’
‘অনেক কিছু নয়, হ্যারি।’
‘একটা ড্রিঙ্ক করলে কেমন হয়?’
‘ড্রিঙ্ক করাটা তোমার জন্যে খারাপ। ব্ল্যাকের বইতে সব ধরনের অ্যালকোহল বাদ দিতে বলা হয়েছে। তোমার ড্রিঙ্ক করা উচিত নয়।’
‘মোলো!’ চেঁচিয়ে ডাকল সে।
‘যাচ্ছি, বাওয়ানো।’
‘হুইস্কি-সোডা আনো।’
‘নিয়ে যাচ্ছি, বাওয়ানা।’
‘না, ড্রিঙ্ক করো না তুমি। হাবভাবেই মনে হচ্ছে তুমি হাল ছেড়ে দিয়েছ। বইয়ে লিখেছে ড্রিঙ্ক করা তোমার জন্যে খারাপ। আমি জানি ড্রিঙ্ক তোমার জন্যে খারাপ।’
‘না,’ বলল সে। ‘ড্রিঙ্ক আমার জন্যে ভাল।’
এই তাহলে সবকিছুর শেষ, ভাবল সে। কাজটা শেষ করার সুযোগ তার আর হবে না। এভাবেই তাহলে শেষ হলো এটা ড্রিঙ্ক নিয়ে তুচ্ছ এক ঝগড়াঝাঁটির মাধ্যমে। ডান পায়ে গ্যাংগ্রিন শুরু হবার পর থেকে তার আর কোনও ব্যথা নেই আর ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে গেছে আতঙ্ক আর এভাবেই সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে এখন রয়ে গেছে কেবল ভীষণ এক ক্লান্তি আর ক্রোধ। মুহূর্তটা ঘনিয়ে আসছে, প্রতিক্ষণেই এগিয়ে আসছে গুটি গুটি পায়ে, কিন্তু সেজন্যে তার কৌতূহল নেই বললেই চলে। বছরের পর বছর ব্যাপারটা তাকে ঘোরের মাঝে রেখেছিল; এখন তার কাছে ওটার আর কোনও গুরুত্বই নেই। ভাবলে অবাক হতে হয় ভীষণ ক্লান্তি কত সহজে এই নির্লিপ্ততাকে সম্ভব করতে পেরেছে।
যথেষ্ট ভালভাবে না জেনে যে-বিষয়গুলো সে লিখবে না ভেবেছিল এতদিন তা সে আর কোনওদিনই লিখবে না। তাকে আর ব্যর্থতার শিকারও হতে হবে না সেগুলো লিখতে গিয়ে। হয়ত সেগুলো কোনওদিনই লিখা যেত না আর তাই লিখাটা শুরু না করে সে ওটাকে দেরি করিয়ে দিয়েছে বারবার। যাই হোক, ব্যাপারটা স্পষ্ট করে তার পক্ষে আর জানা সম্ভব নয়, এখন।
‘আমাদের এখানে না এলেই ভাল হত,’ বলল মহিলা। তার হাতের গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল সে। ‘প্যারিসে থাকলে এমনটা কখনওই হত না। তুমি সবসময় বলেছ প্যারিস তোমার খুব ভাল লাগে। আমরা প্যারিসে থাকতে পারতাম কিংবা চলে যেতে পারতাম অন্য যে-কোনও জায়গায়। যেতে পারতাম আমি অন্য আর কোথাও। তোমাকে তো বলেইছিলাম তুমি যেখানে যেতে চাইবে সেখানেই আমি যাব। তুমি শিকার করতে চাইলে আমরা হাঙ্গেরি যেতে পারতাম আর থাকতেও পারতাম আনন্দের সঙ্গে।’
‘তোমার ওই হারামজাদা টাকা,’ বলল সে।
‘এভাবে বলা কিন্তু উচিত নয়,’ বলল মহিলা। ‘টাকাটা শুধু আমার নয়, তোমারও। সব ছেড়ে আমি চলে এসেছি তোমার সঙ্গে আর তুমি যেখানে যেতে চেয়েছ গিয়েছি আর তুমি যা করতে বলেছ তা-ই করেছি। কিন্তু এখানে না এলেই আমাদের ভাল হত।’
‘তুমি বলেছিলে জায়গাটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে।’
‘বলেছিলাম যখন তুমি সুস্থ ছিলে। কিন্তু এখন জায়গাটাকে আমি ঘৃণা করি। আমি বুঝতে পারি না কেন তোমার পায়ের এই অবস্থা হলো। আমরা কী এমন করেছি যে এরকম একটা দুর্ঘটনায় পড়তে হলো আমাদের?’
‘প্রথমে ওখানে চুলকাবার পর আয়োডিন লাগাইনি আমি। কখনওই আমার ইনফেকশন হয়নি বলে আঘাতটাকে গুরুত্বও দিইনি। তারপর, ওটা যখন খারাপ আকার ধারণ করল, এমনটা হলো সম্ভবত অন্য অ্যান্টিসেপটিকগুলো ফুরিয়ে যাবার পর কার্বলিকের দুর্বল সল্যুশনটা ব্যবহার করার ফলে, অসাড় হয়ে গেল ছোট ছোট রক্তনালিগুলো আর শুরু হলো গ্যাংগ্রিন।’ তাকাল সে মহিলার দিকে, ‘এছাড়া আর কী?’
‘আমি সে-কথা বলতে চাইনি।’
‘আমরা যদি গাধা ওই কিকুয়ু ড্রাইভারটাকে না নিয়ে ভাল কোনও মেকানিক সঙ্গে নিতাম, তাহলে সে হয়ত তেল পরীক্ষা করে দেখত আর ট্রাকের বিয়ারিংটাও পুড়ত না।’
‘আমি সে-কথা বলতে চাইনি।’
‘আমার জন্যে তোমার লোকজনদের যদি ছেড়ে না আসতে তুমি, ছেড়ে না আসতে তোমার জঘন্য ওই ওল্ড ওয়েস্টবারি, সারাটোগা, পাম বিচের লোকজন ’
‘এভাবে বলা তোমার উচিত নয়। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি। চিরদিন ভালোবাসব। তুমি আমাকে ভালোবাস না?’
‘না,’ বলল মানুষটা। ‘আমার সেরকম মনে হয় না। আমি কখনও তোমাকে ভালোবাসিনি।’
‘হ্যারি, কী বলছ তুমি এসব? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’
‘না। আমার মাথা থাকলে তো খারাপ হবে।’
‘ওটা খেয়ো না,’ বলল মহিলা। ‘ডার্লিং, প্লিজ খেয়ো না ওটা। যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে আমাদের।’
‘চেষ্টাটা তাহলে তুমিই করো,’ বলল সে। ‘আমি ক্লান্ত।’
[এবার মনের চোখে সে দেখতে পেল কারাগাচের একটা রেলস্টেশন আর মালপত্র নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, অন্ধকার চিরে এগিয়ে এল সিম্পলন - ওরিয়েন্টের হেডলাইট আর পশ্চাদপসরণের পর সে থ্রেস ছেড়ে চলে যাচ্ছে। লিখার জন্যে তুলে রাখা বিষয়গুলোর মাঝে এটা অন্যতম, আর, সকালে নাস্তা করতে বসে জানালা দিয়ে দেখছে সে বুলগেরিয়ার পাহাড়গুলোর তুষাররাশি আর ন্যানসেনের সেক্রেটারি বুড়ো লোকটার কাছে জানতে চাইছে সত্যিই ওগুলো তুষার না অন্যকিছু আর সেদিকে তাকিয়ে বুড়ো বলছে, না, ওগুলো তুষার নয়। তুষারপাতের সময় আসেনি এখনও। আর সেক্রেটারি সেই একই কথা অন্য মেয়েদের বলছে, না, দেখতেই পাচ্ছ। ওগুলো তুষার নয় আর তারপর সব মেয়ে বলাবলি করছে, ওগুলো তুষার নয়, আমরা ভুল ভেবেছি। কিন্তু ওগুলো আসলে তুষারই ছিল আর মানুষ বিনিময়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সে তাদের পাঠিয়ে দিল তুষারের ওপর। এবং এগিয়ে চলল তারা তুষার মাড়িয়ে যতক্ষণ না সেই শীতে মারা গেল তাদের সবাই।
সেই বছর ক্রিসমাসের পুরো সপ্তাহ জুড়ে তুষারপাত হলো গাউর্তালে, সেই বছর রইল তারা কাঠুরের বাড়িতে যেখানে ঘরের অর্ধেক জুড়ে ছিল পোর্সেলিনের একটা চৌকো স্টোভ, আর ঘুমাল তারা বিচপাতায় ভরা তোষকে, আর তখন তুষারে রক্তাক্ত পা নিয়ে উপস্থিত হলো যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষটা। সে বলল যে গন্ধ শুঁকে শুঁকে তার পিছু পিছু এসেছে পুলিশ আর তারা তাকে পরতে দিল পশমি মোজা আর নানারকম আলাপের মাধ্যমে ঠেকিয়ে রাখল মিলিটারি পুলিশগুলোকে যতক্ষণ না তুষারের ওপর থেকে মুঝে গেল তার পদচিহ্ন।
শ্র“নজে, ক্রিসমাসের দিনে, তুষার ছিল এতই উজ্জ্বল যে ওয়েন্স্টিউব থেকে বাইরে তাকালে ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল চোখ আর দেখা যাচ্ছিল গির্জা থেকে বাড়ির ফিরতি পথ-ধরা সবাইকে। পাইনে ভরা দুর্গম খাড়া পাহাড়গুলো আর নদীর পাশ দিয়ে গেছে যে-রাস্তাটা, স্লেজ চলাচলে মসৃণ আর প্রস্রাবে হলুদ সেই রাস্তা ধরে এগিয়েছিল তারা ভারি স্কী কাঁধে, আর তারপর কী দৌড়টাই না দিয়েছিল ম্যাডলেনার-হসের ওপরের হিমবাহে, তুষার ছিল কেক ফ্রস্টিংয়ের মত মসৃণ আর পাউডারের মত হালকা আর নিঃশব্দে তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে পাখির মত ঝুপ ঝুপ করে তারা পড়ে যাচ্ছিল নিচের তুষারে।
সেবার তুষারঝড় শুরু হবার ফলে একটা সপ্তাহ তারা আটকা পড়ে রইল ম্যাডলেনার-হসে আর তাস খেলল লণ্ঠনের ঝাপসা আলোয় আর যতই হারল হের লেন্ট ততই বাড়ল জুয়ার স্টেক। শেষমেষ সব হারল সে। সব, স্কীশুল মানি, পুরো মরসুমের লাভ, এমনকি মূলধন। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার লম্বা নাকটা, তাস তুলছে আর খেলছে। সবসময় ধরে চলছে কেবল জুয়া আর জুয়া। তুষারপাত থেমে গেলেও জুয়া আর ভীষণ তুষারপাত শুরু হলেও জুয়া। সারা জীবনে যত জুয়া খেলেছে সবই তার মনে পড়ল একের পর এক।
কিন্তু এ-বিষয়ে কখনও একটা লাইনও লিখেনি সে, লিখেনি ঠাণ্ডা, উজ্জ্বল সেই ক্রিসমাসের দিন নিয়েও, যখন সমভূমির ওপারে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের সারি আর তার ওপর দিয়ে বার্কার উড়ে গিয়েছিল অস্ট্রিয়ান অফিসারদের লীভ ট্রেনে বোমা ফেলতে, আর ছত্রভঙ্গ হয়ে তারা যখন ছুটছিল দিশেহারা হয়ে তাদের ওপর সে বর্ষণ করেছিল মেশিনগানের গুলি। তার মনে পড়ল বার্কার পরে মেসে ফিরে শুরু করেছিল সেই বর্ণনা। আর শুনতে শুনতে কেমন নীরব হয়ে গিয়েছিল সবাই আর তারপর কে যেন বলে উঠেছিল, ‘তুই একটা খুনে হারামজাদা।’
তখন যাদের খতম করেছিল তারা সেই অস্ট্রিয়ানদের সঙ্গেই পরে স্কী খেলেছে সে। অবশ্য সেই অস্ট্রিয়ান আর আগেরগুলো এক মানুষ ছিল না। বছর জুড়ে সে স্কী করেছিল যার সঙ্গে, সেই হ্যান্স তখন ছিল কাইজার-জাগার্সে আর তারা যখন একসঙ্গে খরগোশ শিকারে গেছে স-মিলের ওপরের ছোট্ট উপত্যকাটাতে তখন অনেক আলাপ তারা করেছে পাসুবিওর যুদ্ধ আর পার্টিকারা ও আসালোন আক্রমণ সম্বন্ধে আর সেসব নিয়ে একটা শব্দও সে কখনওই লিখেনি। মন্টি করোনা নিয়েও নয়, নয় সেটি কম্যুনি, কিংবা আর্সিয়েরো নিয়েও।
কতগুলো শীত কাটিয়েছে সে ভরার্লবার্গ আর আর্লবার্গে? চারটে, আর উপহার কিনতে তারা যখন গেল ব্লুডেনজে, একটা লোক এসেছিল শিয়াল বিক্রি করতে, আর ভাল কার্শের মত স্বাদঅলা সেই চেরির বিচি, শক্ত ভূমি মুড়ে থাকা গুঁড়ো-তুষারের ওপর দিয়ে তীরবেগে ছুটে চলা, ‘হাই! হো! সেইড রলি’ গানটা গাইতে গাইতে খাড়া জায়গাটার শেষ চক্করে ঝপ করে নেমে যাওয়া, তারপর সোজা পথে তিন চক্করে ফলের বাগানটাকে বেড় দিয়ে আর ডোবাটা পেরিয়ে উঠে যাওয়া সরাইখানার পেছনের বরফমোড়া রাস্তাটায়। তারপর বাঁধনগুলো ঢিলে করে, পা ছুঁড়ে স্কি খুলে সেগুলোকে হেলান দিয়ে রাখা সরাইখানার কাঠের দেয়ালে, আর তারও পরে যখন জানালা দিয়ে ভেসে আসে বাতির আলো, তখন ভেতরে, নতুন ওয়াইনগন্ধী ধোঁয়াটে উষ্ণতায় তারা অ্যাকর্ডিয়ন বাজানোয় মশগুল।]
‘প্যারিসে আমরা কোথায় ছিলাম?’ এখন, আফ্রিকায়, জানতে চাইল সে তার পাশে ক্যানভাসের চেয়ারে বসা মহিলাটির কাছে।
‘ক্রিলোনে। তুমি তো সেটা জানই।’
‘আমি সেটা জানব কেন?’
‘আমরা যে সবসময় ওখানেই থেকেছি।’
‘না। সবসময় নয়।’
‘ওখানে আর সেন্ট জারমেঁইর প্যাভিলিয়ঁ আঁরি-কোয়ার্ত্রেতে। তুমি বলেছিলে ওখানে থাকতে তুমি ভালোবাস।’
‘ভালোবাসা হলো একটা গোবর-গাদা,’ বলল হ্যারি। ‘আর আমি গলা ছেড়ে ডাকার জন্যে সেই গাদার ওপরে ওঠা এক মোরগ।’
‘তোমার যদি যেতেই হয়,’ বলল মহিলা, ‘তাহলে কি পেছনের সবকিছু ধ্বংস করেই যেতে হবে? বলতে চাইছি সবকিছু কি সঙ্গে নিয়েই যেতে হবে তোমার? খতম করতে হবে তোমার ঘোড়া, আর স্ত্রী আর পুড়িয়ে ছাই করতে হবে তোমার জিন আর বর্ম?’
‘হ্যাঁ,’ বলল সে। তোমার ওই হারামজাদা টাকা ছিল আমার বর্ম। আমার ঘোড়া আর বর্ম।’
‘আর বলো না।’
‘বেশ। বলব না আর। তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।’
‘দিলে তো এতক্ষণ।’
‘তাহলে বেশ। আমি তোমাকে কষ্ট দিতেই থাকব। এই কাজটায় আরও বেশি আনন্দ পাওয়া যায়। তোমার সঙ্গে একমাত্র যে-কাজটা করতে ভাল লাগত আমার তা এখন আর করতে পারব না।’
‘না, কথাটা সত্য নয়। অনেক কাজ করতেই ভাল লাগত তোমার আর তুমি যা যা করতে চেয়েছ সেগুলোর কোনওটাতেই আমি বাধা দিইনি।’
‘আহ্, যিশুর দোহাই, তোমার ওই বড় বড় গল্পের প্যানপ্যানানি একটু থামাবে?’
মুখ তুলে তাকাতে সে দেখল মহিলা কাঁদছে।
‘শোন,’ বলল সে। ‘তোমার কি ধারণা এসব করতে মজা পাচ্ছি আমি? জানি না কেন আমি এমন করছি। এটা বোধ হয় নিজের জীবন বাঁচাতে অন্যের জীবন শেষ করার মত কিছু। আমরা যখন কথা শুরু করি তখন আমি ভালই ছিলাম। আমি এটা শুরু করতে চাইনি, আর এখন আমার মাথা বিগড়ে গেছে জলমুরগির মত আর তাই চরম নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছি তোমার সঙ্গে। আমার কথায় তুমি কোনও কান দিয়ো না, ডার্লিং। আমি তোমাকে ভালোবাসি, সত্যিই। তুমি জান আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার মত করে আমি আর কখনওই কাউকে ভালোবাসিনি।’
জীবিকার কারণে সচরাচর যে-মিথ্যে বলতে হয় তাকে তাতেই আবার ফিরে গেছে সে।
‘তুমি আমার মন ভোলাতে চাইছ।’
‘তুই হলি কুত্তি,’ বলল সে। ‘ধনী কুত্তি। আর এইমাত্র যা বললাম তা হলো কবিতা। আমার ভেতরটা এখন কবিতায় ছেয়ে গেছে। পচন আর কবিতা। পচে যাওয়া কবিতা।’
‘থামো, হ্যারি, থামো, একটা শয়তানে রূপান্তরিত না হলে কি তোমার আর এখন ভাল লাগছে না?’
‘আমি কিছুই ছেড়ে চলে যেতে চাই না,’ বলল মানুষটা। ‘কিছুই পেছনে ফেলে যেতে চাই না আমি।’
এখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে সন্ধে আর সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সূর্য ঢলে পড়েছে পেছনে আর সমভূমি জুড়ে নেমেছে লম্বা একটা ছায়া আর ছোট ছোট প্রাণী খেয়ে বেড়াচ্ছে তাঁবুর পাশেপাশে; দ্রুত মাথা নামাচ্ছে আর লেজ নাড়াচ্ছে তারা, ঝোপ ছেড়ে চলে এসেছে অনেকটা বাইরে। একটা পাখিও আর মাটির ওপরে নেই। সবগুলো উড়ে গিয়ে বসে পড়েছে গাছের ডালে। অনেকগুলো পাখি। তার ব্যক্তিগত ফাইফরমাশ খাটা ছেলেটা বসে আছে বিছানার পাশে।
‘মেমসাহেব শিকারে গেছেন,’ বলল ছেলেটা। ‘বাওয়ানার কিছু লাগবে?’
‘কিচ্ছু না।’
শিকারে বেরিয়েছে মহিলা মাংস জোগাড়ের উদ্দেশ্যে, জানে শিকার দেখতে কতটা আনন্দ পায় হ্যারি, আর তাই সরে গেছে সে বেশ খানিকটা দূরে, যেন সমভূমির ছোট্ট যে-অংশটুকু রয়েছে তার দৃষ্টিসীমার মাঝে তা কিছুতেই বাধাপ্রাপ্ত না হয়। সে তো আবার খুব বিবেচক, ভাবল হ্যারি। যা কিছু সে জানে, বা কোথাও পড়েছে, কিংবা কখনও কারও কাছে শুনেছে, সব নিয়েই তার ভাবনা।
মহিলার কাছে যাবার আগেই যে তার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে সেজন্যে মহিলাকে দোষী করা চলে না। কোনও মহিলা কীভাবে জানবে যে সে কেবলই বলে চলেছে অর্থহীন কথা; তার পক্ষে কীভাবে বোঝা সম্ভব যে সে কথা বলছে স্রেফ পুরনো অভ্যেসের বশে আর আরাম পাবার মতলবে? যখন থেকে সে ভাবতে লাগল এক কথা আর মুখে বলতে লাগল আরেক, ততই তার মিথ্যে তাকে সফল করে তুলল মেয়েদের মাঝে, সত্য কথা তাকে এতটা সফলতা এনে দিতে পারেনি।
অবশ্য এমনও নয় যে সে এত মিথ্যে বলেছে যে সত্য সম্বন্ধে বলার মত কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সে যাপন করে ফেলেছে তার জীবন আর তারপর আবার শুরু হয়েছে নতুন জীবনের পালা যেখানে রয়েছে নতুন নতুন মানুষ আর টাকার ছড়াছড়ি, এই জীবন সে যাপন করতে শুরু করেছে সেই একই সুন্দর সুন্দর জায়গা আর সেগুলোর পাশাপাশি নতুন কয়েকটাতেও।
ভাবনা-চিন্তা-বিবেচনা থেকে এসেছে সে আর কী চমৎকারই না হয়ে উঠেছে জীবনটা। ভেতরটা ভরে গেছে এমন ফলে-ফুলে যেন কখনওই তার আর ছিন্নভিন্ন হতে না হয়, যেভাবে হয়েছে বেশির ভাগ মানুষ, আর সে ধরেছে এমন এক ভড়ং যেন আগের অভ্যস্ত কাজগুলোর কোনওটা নিয়েই তার আর মাথাব্যথা নেই, তারপর এখন সেগুলো সে আর করেই না। কিন্তু, ফিসফিস করে সে বলে নিজেরই কানে কানে যে এই মানুষদের নিয়ে সে লিখবে; মাত্রাতিরিক্ত এই ধনীদের নিয়ে; যদিও সে তাদের কেউ নয় বরং তাদের দেশে এসেছে গুপ্তচরের মত; এই দেশ ত্যাগ করার পর সে লিখবে এটা নিয়ে আর পৃথিবীতে অন্তত একবার এটা লিখিত হবে এমন কারও হাতে যে পরিষ্কারভাবে জানে কী সে লিখছে। কিন্তু এই লিখাটা আর কখনওই হবে না, কারণ, লিখাহীন প্রতিটা দিন, আরাম, যা সে ঘৃণা করে তা-ই হয়ে থাকতে থাকতে ক্ষয়ে গেছে তার সামর্থ্য আর ক্রমে ক্রমে এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে তার কাজ করার ইচ্ছে যে, শেষমেষ, সে এখন আর কোনও কাজই করে না। এখন যে-মানুষদের মাঝে সে আছে তাকে কাজ করতে না দেখলেই তারা সবাই শান্তি পায় আরও বেশি। জীবনের ভাল সময়ে সে সবচেয়ে সুখ পেয়েছিল আফ্রিকায়, তাই নতুন জীবন শুরু করার তাগিদে সে ফিরে এসেছে এখানে। তাদের এই সাফারিতে রয়েছে আরামের ন্যূনতম ব্যবস্থা। কষ্ট এখানে নেই; কিন্তু নেই বিলাসও আর সে ভেবেছিল এভাবেই তার পক্ষে সম্ভব হবে অনুশীলনে ফিরে যাওয়া। কোনও উপায়ে সে ঝরিয়ে ফেলতে পারবে তার আত্মার চর্বি ঠিক যেভাবে কোনও যোদ্ধা তার শরীরে জমা চর্বি ঝরিয়ে ফেলতে অনুশীলন করতে যায় পাহাড়ে।
মহিলারও এই উপায় পছন্দ হয়েছিল। বলেছিল এটাকে সে ভালোবাসে। ভালোবাসে সে যাবতীয় রোমাঞ্চ, নতুন নতুন পরিবেশ, যেখানে রয়েছে নতুন নতুন সব মানুষ আর হাসি-আনন্দে ভরা জীবন। আর অনুভব করেছে সে কাজে ফেরার ইচ্ছেশক্তির মরীচিকা। এখন এভাবেই যদি হয়ে যায় সবকিছুর শেষ, আর সে জানে তা-ই হতে চলেছে, তাহলে অন্তত মেরুদণ্ড-ভাঙা সাপের মত ঘুরে কিছুতেই তার নিজেকে ছোবল মারা চলবে না। এটা ওই মহিলার দোষ নয়। সে না থাকলে তার জায়গায় থাকতে পারত অন্য কোনও মহিলা। সে যদি মিথ্যের সাহায্যে বেঁচে থাকে তাহলে ওটার হাত ধরে মরার চেষ্টা করতেই বা অসুবিধে কোথায়! পাহাড়ের ওপাশ থেকে তার কানে ভেসে এল একটা গুলির শব্দ।
শিকার বেশ ভাল করতে পারে এই ভাল মহিলা, ধনী এই কুত্তি, তার প্রতিভার দয়াময়ী তত্ত্বাবধানকারিণী এবং ধ্বংসকারিণী। বাজে কথা। তার প্রতিভা সে নিজেই ধ্বংস করেছে। তাকে আরামে রেখেছিল বলে কেন সে দোষারোপ করবে এই মহিলাকে? তার প্রতিভা সে নিজহাতে ধ্বংস করেছে সেটাকে ব্যবহার না করে করে, নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে আর তার বিশ্বাস, অতিরিক্ত মদ্যপানে তার উপলব্ধির ধার ভোঁতা করে ফেলে, আলসেমিতে, ঢিলেমিতে, দরিদ্র স্বজনকে অবহেলা করে ধনীদের পা চাটাতে, গর্ব আর সংস্কারে, ছলে বা কৌশলে। এটা কী? পুরনো বইয়ের কোনও তালিকা? কী-ই বা এমন প্রতিভা ছিল তার? অবশ্য প্রতিভা তার ছিল কিন্তু সেটাকে ভালভাবে ব্যবহার না করে সে করেছে ব্যবসা। কী করেছে নয়, কী সে করতে পারত, সবসময় তা-ই ছিল তার প্রতিভার মূল কথা। আর জীবিকার জন্যে হাতে কলম বা পেন্সিলও তুলে নেয়নি সে, নিয়েছে অন্য কিছু। বড়ই অদ্ভুত ছিল এই ব্যাপারটাও, যে, যখনই সে অন্য মহিলার প্রেমে পড়েছে, সেই মহিলা ছিল তার সর্বশেষ প্রেমিকার চেয়ে বেশি ধনী। অদ্ভুত নয়? কিন্তু যখন থেকে সে আর প্রেমে পড়েনি, কেবল মিথ্যেই বলে গেছে, যেমন বলছে এই মহিলার সঙ্গে, এখন, যার টাকা আগের সব মহিলার চেয়ে বেশি, যার টাকার কোনও শেষ নেই, যার ছিল একটা স্বামী আর সন্তান, যার ছিল কয়েকজন প্রেমিক যাদের কেউই তাকে সুখী করতে পারেনি, আর যে তাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছে একজন লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, সঙ্গী হিসেবে আর গর্ব করার উপযুক্ত এক সম্পত্তি হিসেবে; এটাও কম অদ্ভুত নয় যে যখন সে তাকে সত্যিই ভালোবাসত তার চেয়ে এখন তাকে মোটেই ভালো না বেসে আর মিথ্যে বলে মহিলার টাকা উসুল করে দিতে পারছে আরও বেশি।
আমাদের সবাইকে অবশ্যই চেনা উচিত আমাদের কাজের ভেতর দিয়ে, ভাবল সে। যাই হোক, মানুষকে তার জীবিকার সন্ধান করা উচিত নিজ নিজ প্রতিভার রাজ্যে। সারা জীবন ধরে, কোনও না কোনওভাবে, সে বিক্রি করেছে তার প্রাণশক্তি আর যখন আবেগ আর তেমন সবল থাকে না তখনই আরও বেশি উসুল করে দেয়া যায় টাকা। কথাটা সে বুঝতে পেরেছে এতদিনে কিন্তু এটা নিয়েও সে লিখবে না কখনওই, এমনকি এখনও নয়। না, এটা নিয়ে সে লিখবে না, যদিও লিখার পক্ষে এটা বেশ উপযুক্ত।
এবার মহিলা এসে গেল তার দৃষ্টিসীমার ভেতরে, খোলা জায়গাটা পেরিয়ে এগোতে লাগল তাঁবুর দিকে। পরনে তার আঁটো পাজামা আর হাতে রাইফেল। একটা টমি কাঁধে ঝুলিয়ে দুই ছেলে আসছে তার পেছনে পেছনে। এখনও মহিলা বেশ দেখতে, ভাবল সে, আর শরীরটাও চমৎকার। বিছানার ব্যাপারটাতে তার রয়েছে বিশাল এক প্রতিভা আর উপলব্ধি, সুন্দরী সে নয়, কিন্তু চেহারাটা তার পছন্দ, প্রচুর পড়াশোনা করে মহিলা, পছন্দ করে ঘোড়ায় চড়তে আর শিকার করতে আর, অবশ্যই সে মদ্যপান করে মাত্রাতিরিক্ত। একরকম যুবতী থাকতেই মারা যায় তার স্বামী আর কিছুদিনের জন্যে নিজেকে সে নিবেদিত করে তার সদ্য-বেড়ে-ওঠা দুই সন্তানের দেখাশোনায়, সন্তানদের অবশ্য তখন তাকে আর প্রয়োজন ছিল না বরং মায়ের উপস্থিতিতে তারা বিব্রতই বোধ করত, ফলে নিবেদন গেল এবার ঘোড়ার আস্তাবলে, বইয়ে, আর বোতলে। সন্ধের পর ডিনারের আগ পর্যন্ত পড়তে পছন্দ করত সে আর পড়তে পড়তে পান করত স্কচ আর সোডা। ডিনারের সময় আসতে আসতে মোটামুটি মাতাল হয়ে পড়ত মহিলা আর ডিনারে এক বোতল ওয়াইন সাবাড় করার পর সচরাচর ঘুমিয়ে যেত নেশার ঘোরেই।
এটা তার জীবনে প্রেমিক আসার আগের গল্প। প্রেমিকেরা আসার পর মদ্যপান কমিয়ে দিল সে, কারণ, ঘুমাবার জন্যে তখন তাকে আর মাতাল হতে হত না। কিন্তু প্রেমিকেরা তাকে বিরক্ত করে তুলল। বিয়ে করল সে এমন এক মানুষকে যে কখনওই তাকে বিরক্ত করেনি, কিন্তু প্রেমিকেরা তাকে ঠিক তাই-ই করত, পৌঁছে দিত বিরক্তির চূড়ায়।
তারপর এক প্লেন ক্র্যাশে মারা গেল তার দুই সন্তানের একজন এবং এই দুর্ঘটনার পর সে আর কোনও প্রেমিক চায়নি, আর মদও যেহেতু অনুভূতিনাশক নয়, বেরতে হলো তাকে নতুন এক জীবনের সন্ধানে। হঠাৎ সে ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ল একাকিত্বের ভাবনায়। কিন্তু এবার সে চাইল এমন কাউকে যাকে সে শ্রদ্ধা করে।
ঘটনাটা শুরু হয়েছিল খুবই সাধারণভাবে। হ্যারির লিখার ভক্ত ছিল সে আর সবসময়েই তার জীবনযাত্রাকে দেখত ঈর্ষার চোখে। সে ভাবত মন যা যা করতে চায় ঠিক তা-ই করে হ্যারি। যেমন ধাপে ধাপে তাকে পেয়েছে সে একটু একটু করে আর যেভাবে তার প্রেমে পড়েছে শেষমেষ, সেগুলোর সবই ছিল নিজের জন্যে এক নতুন জীবন নির্মাণের পথে ক্রমশ উত্থান আর ওদিকে হ্যারি তার পুরনো জীবনের অবশিষ্ট টুকরোগুলো নিয়ে ফেঁদে বসেছিল দারুণ এক ব্যবসা।
এই ব্যবসা ফেঁদেছিল সে তার নিরাপত্তার জন্যে, আরামের জন্যেও বটে, এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, এছাড়া আর কোন্ কারণে? সে জানে না। সে যে-জিনিস চাইবে সেটাই তাকে কিনে দেবে মহিলা। এটা সে জানত। মহিলা ছিলও তখন বেশ চমৎকার। আগের মহিলাদের মত তার সঙ্গেও শিগগিরই বিছানায় গিয়েছিল সে; বরং তার সঙ্গেই বেশি, কারণ, এই মহিলা ছিল ধনী, যথেষ্ট আনন্দদায়ক, প্রশংসা করতে প্রস্তুত আর কখনওই নাটক করত না। আর এই যে-নতুন জীবন নির্মাণ করেছিল মহিলা সেটাও এখন ধসে পড়ার মুখে, কারণ, দুই সপ্তাহ আগে হাঁটুতে একটা কাঁটার খোঁচা খেয়েও হ্যারি তাতে আয়োডিন লাগায়নি; তখন সন্তর্পণে এগোচ্ছিল তারা একপাল ওয়াটারবাকের ফোটো তুলতে, কান খাড়া করে দাঁড়িয়েছিল প্রাণীগুলো, প্রথম শব্দ শুনতে পাওয়ামাত্র ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়বে জঙ্গলে। তা-ই গিয়েছিল ওয়াটারবাকের পাল, ফোটো তোলার অনেক আগেই।
এসে পড়ল মহিলা।
খাটিয়ার ওপর থেকে তার দিকে ফিরল হ্যারি। ‘হ্যালো,’ বলল সে।
‘একটা মদ্দা টমি শিকার করেছি,’ বলল মহিলা তাকে। ‘ওটা দিয়ে ভাল শুরুয়া তৈরি করে দেব তোমাকে, সঙ্গে ক্লিমসহ আলু ভর্তা। এখন কেমন লাগছে?’
‘অনেকটা ভাল।’
‘টমিটা সুন্দর না? আমি জানতাম তুমি পছন্দ করবে। যখন শিকারে যাই তুমি তখন ঘুমাচ্ছিলে।’
‘ভাল একটা ঘুম হয়েছে আমার। অনেক দূরে গিয়েছিলে?’
‘না। পাহাড়টার ঠিক ওপাশে। বেশ ভালভাবেই গুলি করেছি টমিটাকে।’
‘তোমার শিকারের হাত চমৎকার।’
‘শিকার করতে আমি ভালোবাসি। আফ্রিকাকেও ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি যদি সুস্থ থাকতে কী মজাই না হত, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মজা। তুমি সঙ্গে থাকলে শিকারে যে আরও কত আনন্দ পেতাম ভাবতেও পারবে না। দেশটাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি।’
‘আফ্রিকাকে আমিও ভালোবাসি।’
‘ডার্লি, তুমি বুঝবে না তোমার ভাল লাগছে দেখে আমার যে কতটা ভাল লাগছে। তোমার ওরকম হয়ে যাওয়াটা আমার ভাল লাগে না। ওভাবে আমার সঙ্গে কখনওই আর কথা বলবে না, বলো?’
‘না,’ বলল সে। ‘কী বলেছি আমার মনে নেই।’
‘আমাকে ধ্বংস করার কোনও প্রয়োজন নেই তোমার, তাই না? আমি এক মাঝবয়েসী মহিলা, তোমাকে ভালোবাসি আর তুমি যা চাও তা-ই করতে চাই। ইতিমধ্যেই দু’তিন বার ধ্বংস হয়েছি আমি। তুমিও আমাকে আর ধ্বংস করতে চাইবে না, বলো?’
‘বিছানায় আমি তোমাকে কয়েক বার ধ্বংস করতে চাই,’ বলল সে।
‘হ্যাঁ। এই ধ্বংস আনন্দের। আমাদের তৈরিই করা হয়েছে এভাবে ধ্বংস হবার জন্যে। আগামীকাল প্লেন এসে যাবে।’
‘তুমি কীভাবে জানলে?’
‘আমি নিশ্চিত। প্লেন আসবেই। ছেলেরা ঘাস আর কাঠ জোগাড় করে ফেলেছে আগুন জ্বেলে চিহ্ন দেয়ার জন্যে। আমি আজও গিয়ে দেখে এসেছি। প্লেন ল্যান্ড করার মত প্রচুর জায়গা আছে এখানে আর চিহ্ন দেয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও জড়ো করা হয়েছে দুই প্রান্তেই।’
‘কিন্তু আগামীকালই যে আসবে বুঝলে কীভাবে?’
‘আমি নিশ্চিত ওটা আসবেই। আরও আগেই আসা উচিত ছিল। তারপর, শহরে গিয়ে, সারিয়ে তুলব তোমার পা আর তারপর দু’জনে শুরু করব আনন্দময় কিছু ধ্বংস। ওই জাতের ভয়ঙ্কর কথাবার্তা কিন্তু আর নয়।’
‘একটা ড্রিঙ্ক চলবে? সূর্য তো ঢলে পড়েছে।’
‘তুমি নিতে চাও?’
‘আমি তো ইতিমধ্যেই নিয়েছি।’
‘আমরা দু’জনে একসঙ্গে নিই। মোলো, দু’টো হুইস্কি-সোডা আনো!’ হাঁকল মহিলা।
‘তোমার বোধ হয় মসকুইটো বুট পরে নেয়া উচিত,’ বলল সে মহিলাকে।
‘না, আগে গোসল সেরে নিই ....’
পান করতে লাগল তারা আর চারপাশে ধীরে ধীরে নামতে লাগল অন্ধকার আর অন্ধকার পুরো গাঢ় হবার ঠিক আগে যখন লক্ষভেদ করার মত আলোটুকুও মুছে গেল, সামনের খোলা জায়গাটা পেরিয়ে পাহাড়ের দিকে এগোতে লাগল একটা হায়েনা।
‘হারামজাদাটা প্রত্যেক রাতে এদিক দিয়ে যায়,’ বলল মানুষটা। ‘প্রত্যেক রাতে যেতে দেখেছি দুই সপ্তাহ ধরে।’
‘এটাই রাতের বেলা ডাকে। তা ডাকুক। যদিও নোংরা একটা জানোয়ার এই হায়েনা।’
দু’জনে পান করে চলল একত্রে, অনেকক্ষণ একইভাবে শুয়ে থাকার অস্বস্তিটুকু ছাড়া ব্যথার কোনও বোধ আর নেই তার, আলো জ্বালছে ছেলেরা, আর তাদের ছায়া লাফিয়ে বেড়াচ্ছে তাঁবুর ওপর, বশ্যতার এই জীবন তার ঢলে পড়তে চাইছে অসহায় এক আত্মসমর্পণে। তার সঙ্গে খুবই ভাল আচরণ করেছে মহিলা। অথচ আজ বিকেলে সে-ই তার সঙ্গে করেছে নিষ্ঠুর আর অনুচিত আচরণ। মানুষ হিসেবে মহিলা চমৎকার, সত্যি বলতে কি অপূর্ব। আর তারপরেই হঠাৎ তার মনে হলো যে সে মরতে যাচ্ছে, মৃত্যুর তার আর দেরি নেই।
অনুভূতিটা হঠাৎ যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর; পানির তোড় কিংবা দমকা হাওয়ার মত নয়; অতর্কিত অশুভ-গন্ধী এক শূন্যতার মত আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অশুভ সেই দুর্গন্ধের প্রান্ত ছুঁয়েই যেন আবার ভেসে ভেসে চলে গেল হায়েনাটা।
‘কী ব্যাপার, হ্যারি?’ জানতে চাইল মহিলা।
‘কিছু না,’ বলল সে। ‘তুমি বরং ওপাশে সরে বসো। বাতাসের দিকে।’
‘মোলো ব্যান্ডেজ পাল্টে দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ। এখন তো কেবল বোরিক লাগাচ্ছি।’
‘কেমন লাগছে?’
‘একটু অস্থির অস্থির।’
‘গোসল করতে ভেতরে যাচ্ছি,’ বলল মহিলা। ‘যাব আর আসব। তোমার সঙ্গে খাবার পর খাটিয়া নিয়ে যাব ভেতরে।’
তাহলে, বলল হ্যারি মনে মনে, ঝগড়া থামিয়ে ভালই করেছি আমরা। অবশ্য এই মহিলার সঙ্গে বেশি ঝগড়া সে কখনওই করেনি, বরং অন্যান্য প্রেমিকাদের সঙ্গে সে এত ঝগড়া করেছে যে তারা সবাই, শেষমেষ, ঝগড়ার তিক্ততা গায়ে মেখে দু’জনের যাবতীয় প্রেম লণ্ডভণ্ড করে চলে গেছে। সে ভালোবেসেছে যেমন খুব বেশি, তেমনি ভালোবাসা দাবিও করেছে খুব বেশি, আর শেষমেষ শেষ করে ফেলেছে সবকিছু।
[এবার তার মনে পড়ল ঝগড়া করে প্যারিস থেকে কনস্টান্টিনোপল চলে যাওয়া আর সেখানকার একাকিত্বের কথা। দিনের পর দিন কাটাল সে এক বেশ্যাপাড়া থেকে আরেক বেশ্যাপাড়ায়, কিন্তু তাতেও তার একাকিত্ব না কেটে যখন প্রকট হলো আরও, সে চিঠি লিখল তাকে, প্রথম সেই মেয়েটিকে, যে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, লিখল যে অনেক চেষ্টা করার পরেও সে তার একাকিত্ব দূর করতে পারেনি .... লিখল কীভাবে তার একবার মনে হয়েছিল যে মেয়েটিকে সে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে রিজেন্সের বাইরে আর দেখামাত্র মাথা ঘুরে মোচড় দিয়ে উঠেছে তার ভেতরটা, চেহারায় মিল থাকা সেই মেয়েটিকে অনুসরণ করেছে সে বুলভারের পাশ দিয়ে, অবশেষে একসময় টের পেয়েছে এই মেয়ে সেই মেয়ে নয় আর তখন তাকে নিশ্চল করে দিয়ে বিদায় নিয়েছে অপূর্ব এক অনুভব। লিখেছে তাকে ভোলার জন্যে কীভাবে শুয়েছে সে একের পর এক মেয়ের সঙ্গে কিন্তু সেই স্মৃতি তাকে ছেড়ে তো যায়ইনি বরং আরও মেতে উঠেছে বেদনাময় নৃত্যে। লিখেছে তার সঙ্গে যেটাই করুক সেই মেয়ে তাতে এখন তার আর কোনও আসে যায় না, ভালোবাসার যে-অসুখ সে বরণ করেছে স্বেচ্ছায় তা থেকে নিজেকে সারিয়ে তোলা এখন তার পক্ষে অসম্ভব। চিঠিটা লিখল সে ক্লাবে বসে, ধীর-স্থির-ঠাণ্ডা মাথায়, তারপর পোস্ট করল তা নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে আর মেয়েটিকে অনুরোধ করল সে যেন জবাব দেয় তার অফিসের ঠিকানায়। এটাই তার কাছে মনে হলো নিরাপদ। রাত নামার পর মেয়েটির স্মৃতি তার ভেতরটা ভরিয়ে তুলল এমন এক শূন্যতায় যে অসহ্য যন্ত্রণায় সে নেমে এল পথে আর উদ্দেশ্যহীন ঘুরতে ঘুরতে একসময় পেরিয়ে গেল ট্যাক্সিম, তারপর একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে পা বাড়াল রাতের খাবার খেতে। খাবার পর মেয়েটিকে সে নিয়ে গেল এক নাচের জায়গায়, জঘন্য নাচল মেয়ে, আর তখন তাকে ছেড়ে তুলে নিল সে উত্তেজক এক আর্মেনিয়ান ছুকরিকে যে নাচের তালে তালে এত জোরে তার পেটে পেট ঘষতে লাগল যে প্রায় ছ্যাঁকা লাগার জোগাড়। মেয়েটিকে তুলে নেয়ার সময় হাতাহাতিও হয়ে গেল ব্রিটিশ এক গানার সাবালটার্নের সঙ্গে। গানার তাকে যেতে বলল বাইরে আর তারপর অন্ধকারে লড়ল তারা রাস্তার খোয়ার ওপরে। দু’বার চোয়ালের পাশে শক্ত ঘুসি খাবার পরেও লুটিয়ে না পড়ায় সে বুঝতে পারল যে গানার লড়তেই এসেছে। তার শরীরে ঘুসি চালাল গানার, তারপর চোখের পাশে। এবার সে ঝাড়ল একটা জোর লেফট হুক আর রেগে আগুন-হয়ে-যাওয়া গানার ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরে একটানে ছিঁড়ে ফেলল তার কোটের হাতা আর সে তখন দু’বার ঘুসি মারল তার কানের পেছনে আর তারপর ডানহাতি প্রচণ্ড এক ঘুসি চালিয়ে ধাক্কা মেরে তাকে সরিয়ে দিল পেছনে। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল গানার আর সে কেটে পড়ল মেয়েটিকে নিয়ে, কারণ, ততক্ষণে ছুটে আসতে শুরু করেছে মিলিটারি পুলিশ। ঝটপট তারা উঠে পড়ল এক ট্যাক্সিতে আর বসফরাসের পাশ দিয়ে এসে পৌঁছুল রিমিলি হিসায়, আর একটা চক্কর দিয়ে, ফিরে এল রাতের ঠাণ্ডা কোলে আর তারপর বিছানায় গিয়ে দেখল যে বাইরে থেকে ছুকরি মনে হলেও মেয়ে পেকে গেছে অনেক আগেই তবে ঠোঁট তার যেন গোলাপের পাপড়ি, সিরাপের মত মিষ্টি, মসৃণ তলপেট, বড় বড় দুই স্তন আর পাছার নিচে বালিশ দেয়ার কোনও দরকারই হলো না আর দিনের প্রথম আলো ফুটতেই জাগার অপেক্ষায় না থেকে সে ত্যাগ করল মেয়েটিকে আর পেরা প্যালেসে এসে পৌঁছুল কালশিটে পড়া এক চোখ নিয়ে, কোটটাকে কাঁধেই ফেলে রাখতে হলো একটা হাতা ছিঁড়ে যাওয়ায়।
সেই রাতেই বেরিয়ে পড়ল সে আনাতোলিয়ার উদ্দেশে আর তার মনে পড়ল, যাত্রার শেষের দিকে, সারাদিন এগিয়ে চলল আফিমের জন্যে লাগানো পপি খেতের মাঝ দিয়ে আর তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন ঘোর লেগে যায়, শেষমেষ, গোলমাল হয়ে যায় দূরত্বের হিসেব, আর যেখানটায় তারা আক্রমণ করেছিল নতুন আসা কনস্টানটাইন অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে, যাদের কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না, সেনাদের মাঝে কামানের গোলাবর্ষণ করছিল আর্টিলারি আর ব্রিটিশ পর্যবেক্ষক কাঁদতে শুরু করেছিল ঠিক একজন শিশুর মত।
সেদিনই সে প্রথম দেখতে পেল এমন সব মৃত মানুষ যাদের পরনে শাদা ব্যালে স্কার্ট আর পায়ে পশমের ফুলতোলা নাগরা। অটল তুর্কিরা এগিয়ে এল দলে দলে আর পালাতে লাগল স্কার্ট পরা মানুষেরা আর অফিসারেরা গুলি চালাল তাদের ওপর আর তারপর পালাতে লাগল নিজেরাই, পালাল সে আর ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকও আর ছুটতে ছুটতে ফুসফুস ফাটার জোগাড় হলো আর মুখ ভরে গেল পেনির বিস্বাদে আর থামল তারা বড় বড় কয়েকটা পাথরের আড়ালে আর তখনও ঠিক আগের মতই অটল তুর্কিরা এগিয়ে আসছে দলে দলে। তারপর সে দেখেছে এমন সব দৃশ্য যেগুলোর কথা জীবনে সে কখনও কল্পনাও করেনি আর তারপরে সে দেখেছে সেগুলোর চেয়েও ভয়াবহ দৃশ্য। তাই প্যারিসে ফিরে ওই বিষয়ে মুখ খোলেনি সে, এমনকি সেসবের উল্লেখও তার সহ্য হত না। আর কাফেটার সামনে দিয়ে আসতে চোখে পড়ল তার আমেরিকান সেই কবি যে সামনে পিরিচের একটা স্তূপ নিয়ে বসে আর আলুর মত গোল মুখটায় বোকা বোকা চেহারা নিয়ে দাদা আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করছে রুমানিয়ার এক লোকের সঙ্গে যার নাম সে বলল ত্রিস্তান জারা, সবসময় যে পরে থাকে একটা মনোকল আর সবসময় ভোগে মাথাব্যথায় আর, ফিরেছিল সে অ্যাপার্টমেন্টে তার স্ত্রীর কাছে যাকে সে ভালোবাসতে শুরু করেছে আবার, ঝগড়াঝাঁটি শেষ, উন্মাদনা শেষ, বাড়ি ফিরেই এখন খুশি, আর অফিসে আসা চিঠিটা এখন চলে এসেছে তার অ্যাপার্টমেন্টে। এই চিঠি তার লিখা সেই চিঠিটার জবাব আর এক সকালে এল ওটা বড় একটা থালায় শুয়ে আর খামের ওপরের হাতের লিখাটা দেখামাত্র ঠাণ্ডা হয়ে গেল তার পুরো শরীর আর চিঠিটাকে সে লুকাতে গেল আরেক চিঠির তলায়। কিন্তু তার স্ত্রী জানতে চাইল, ‘চিঠিটা কার, ডিয়ার?’ আর ওটাই ছিল সেই সম্পর্ক শুরু হবার শেষ।
তাদের সবার সঙ্গে কাটানো সুসময়গুলোর কথা মনে পড়ল তার, আর ঝগড়াগুলোও। কেন যেন সবসময় সুন্দর জায়গাগুলোকেই তারা বেছে নিত ঝগড়া করার জন্যে। আর যখন সে সবচেয়ে ভাল বোধ করত সবসময় তখনই কেন বা ঝগড়া লাগত তারা? সে কখনওই সেই ঝগড়াগুলোর কোনও একটা নিয়ে লিখেনি, কারণ, প্রথমত, সে কখনওই কারও মনে আঘাত দিতে চায়নি আর এটাও মনে হয়েছে যে লিখার জন্যে ওটা ছাড়াও রয়েছে আরও অনেক বিষয়। কিন্তু সে সবসময় ভেবেছে যে ওসব নিয়ে লিখবে একদিন শেষমেষ। কত কী যে লিখার আছে চারপাশে ছড়িয়ে। সে দেখেছে পৃথিবীর পরিবর্তন; কেবল ঘটনাবলীর নয়; যদিও দেখেছে সে অনেক ঘটনার পরিবর্তন আর পর্যবেক্ষণ করেছে মানুষকেও, দেখেছে সে সূক্ষ্মতর পরিবর্তন আর মনে রেখেছে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ধরনের মানুষের কথা, সময়ভেদে তাদের পরিবর্তনের কথা। সে ছিল এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ারই অন্তর্গত আর পরিবর্তন সে পর্যবেক্ষণ করেছে আর পরিবর্তন নিয়ে লিখাটা ছিল তার কর্তব্য; কিন্তু ওটা নিয়ে সে আর কখনওই লিখবে না।]
‘কেমন লাগছে এখন?’ বলল মহিলা। গোসল সেরে সে বেরিয়ে এসেছে তাঁবু থেকে।
‘ভাল।’
‘এখন খাবে?’ মহিলার পেছনে ফোল্ডিং টেবিল হাতে সে দেখতে পেল মোলোকে আর খাবার-দাবার নিয়ে এসেছে আরেকটা ছেলে।
‘আমি লিখতে চাই,’ বলল সে।
‘শক্তি বাড়াবার জন্যে তোমার খানিকটা শুরুয়া খাওয়া উচিত।’
‘আমি আজরাতেই মারা যাচ্ছি,’ বলল সে। ‘শক্তি বাড়াবার আর প্রয়োজন হবে না।’
‘হ্যারি, প্লিজ, নাটক করো না,’ বলল মহিলা।
‘শুঁকে বুঝতে পারছ না? উরু পর্যন্ত আমার অর্ধেক শরীর পচে গেছে। তোমার ওই শুরুয়া আমার কোন্ কাজে লাগবে? মোলো, হুইস্কি-সোডা আনো।’
‘প্লিজ শুরুয়াটা নাও,’ বলল মহিলা নরম সুরে।
‘বেশ।’
শুরুয়াটা খুবই গরম। যথেষ্ট ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত ধরে রইল সে কাপটা আর তারপর পুরোটা খেয়ে ফেলল একবারে।
‘তুমি সত্যিই খুব ভাল মেয়ে,’ বলল সে। ‘আমার ওপর একদম নজর রেখো না।’
স্পার আর টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি পত্রিকায় বহু বার ছাপানো সুপরিচিত, সুপ্রিয় মুখ নিয়ে তাকাল মহিলা তার দিকে, কেবল মদ্যপানের ফলে কিছুটা ম্লান, কেবল বিছানায় যাবার পক্ষে কিছুটা বেমানান, কিন্তু টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি কখনওই ছাপেনি ওই সুন্দর দু’টো বুক আর ওই কার্যকর দু’টো উরু আর ওই হালকাভাবে পিঠে-আদর-বুলানো দু’টো হাত, আর তাকিয়ে তাকিয়ে তার সুপরিচিত মধুর হাসি দেখতে দেখতেই আবার সে অনুভব করল মৃত্যুর ক্রমঅগ্রসরমান পদধ্বনি। এবার যেন ওটা আর ঝাঁপিয়ে এল না। এল মৃদু এক বাতাস হয়ে যা মোমবাতির শিখাকে সামান্য কাঁপালেও দীর্ঘতরই করে তোলে।
‘তারা আরও খানিকটা পরে আমার মশারিটা এনে টানিয়ে দিক গাছের সঙ্গে আর জ্বালিয়ে দিক আগুনটা। আজরাতে আর তাঁবুতে যাব না। নড়াচড়া করা ঠিক হবে না। পরিষ্কার রাত আজ। বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা নেই।’
তাহলে এভাবেই মারা যাবে সে, তলিয়ে যাবে এক নীরব ফিসফিসানিতে। আর ঝগড়া নয়। এ-বিষয়ে সে এবার কথা দিতে পারে। যে-অভিজ্ঞতাটা তার কখনওই হয়নি তা থেকে নিজেকে সে বঞ্চিত করতে চায় না। তবু সম্ভবত করবে। সবকিছুই তো নষ্ট করে দিয়েছে সে। কিন্তু এটা বোধ হয় আর করবে না।
‘তুমি তো ডিকটেশন নিতে পারো না, তাই না?’
‘কখনও শিখিনি,’ বলল মহিলা তাকে।
‘ঠিক আছে।’
সেই সময়ও আর নেই, অবশ্যই, যদিও তার মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা সে দেখতে পাচ্ছে দূরবীনে আর ঠিকঠাক লিখতে পারলে সবটাই সে লিখে ফেলতে পারবে একটামাত্র প্যারায়।
[লেকের ওপরের পাহাড়ে কাঠের গুঁড়ির একটা বাড়ি, চুন-সুরকিতে শাদা। খাবার সময় সবাইকে ডাকার জন্যে দরজার কাছের এক খুঁটিতে ঝুলছে একটা ঘণ্টা। বাড়ির পেছনে মাঠ আর মাঠের পেছনে বন। লম্বারডি পপলারের একটা সারি চলে গেছে বাড়ি থেকে ডক পর্যন্ত। অন্যান্য জাতের পপলারও ছড়িয়ে আছে আশেপাশে। বনের প্রান্ত বরাবর একটা রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ে আর এই রাস্তাতেই সে কুড়ায় কালো জাম। একদিন পুড়ে গেল কাঠের গুঁড়ির বাড়িটা আর তার সঙ্গে পুড়ে গেল খোলা ফায়ারপ্লেসের ওপরের হরিণের পাঅলা র্যাকে রাখা সবগুলো বন্দুক আর তারপর পুড়ল সেগুলোর নল, গলে গেল ম্যাগাজিনের সীসে, বাটগুলো ছাই হয়ে পড়ে রইল ছাইয়ের ওপর আর সেই ছাই ব্যবহৃত হলো সাবান তৈরির বিরাট কেতলিতে, পোড়া জিনিসগুলো নিয়ে কেউ যদি খেলার অনুমতি চায় দাদার কাছে, তাহলে বুড়ো বলবে, না। বুঝতেই পারছেন বন্দুকগুলো এখনও তার এবং সে আর নতুন কোনও বন্দুক কিনেনি। শিকারও আর করেনি সে। একই জায়গায় আবার উঠল নতুন বাড়ি আর তাতে দেয়া হলো শাদা রঙ আর সেই বাড়িটার গাড়িবারান্দা থেকে দেখা যায় পপলার গাছ আর তার ওপারের লেক; কিন্তু নতুন সেই বাড়িতে নতুন কোনও বন্দুক আর এল না। বন্দুকের পোড়া নলগুলো তেমনই পড়ে রইল ছাইয়ের ওপর, সেগুলোকে আর স্পর্শও করল না কেউ।
ব্ল্যাক ফরেস্টে, যুদ্ধের পর, ট্রাউটের একটা স্রোতস্বিনী ইজারা নিয়েছিলাম আমরা আর দু’টো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া যেত সেখানে। একটা ছিল ট্রাইবার্গ থেকে উপত্যকা ধরে নেমে আর আর উপত্যকা বেড় দিয়ে গাছের ছায়ায় প্রান্ত ঘেরা শাদা রাস্তা যেটা আরেকটা পাহাড়ে উঠে ছোট ছোট কয়েকটা খামার আর শোয়ার্জবাল্ডদের বড় বড় বাড়িগুলোর পাশ কাটিয়ে, শেষমেষ স্রোতস্বিনী পেরিয়ে। ওখানেই আমাদের মৎস্য শিকারের শুরু।
আরেকটা রাস্তা খাড়া উঠে গেছে বনের প্রান্তে, তারপর পাইনবনের ভেতর দিয়ে পাহাড়ের চূড়া বরাবর এগিয়ে চলে গেছে একটা তৃণভূমির প্রান্তে আর তারপর তৃণভূমি পেরিয়ে নেমে এসেছে সেতুর কাছে। স্রোতস্বিনীর পাশে বার্চগাছের সারি; স্রোতস্বিনীটা সরু তবে পানি স্বচ্ছ আর খরস্রোতা যা কোথাও কোথাও বার্চের তলার মাটি সরিয়ে সেখানে সৃষ্টি করেছে ছোট ছোট ডোবা। ট্রাইবার্গের হোটেল-মালিক কাটাল বেশ ভাল একটা মরশুম। সময়টা ছিল চমৎকার আর আমাদের সবার মাঝে বেশ একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কিন্তু পরবর্তী বছরে এল মুদ্রাস্ফীতি, ফলে গত বছরের আয় দিয়ে হোটেল চালাতে পারল না সে আর শেষমেষ আত্মহত্যা করল গলায় দড়ি দিয়ে।
এটা অবশ্য ডিকটেশন দিয়ে লিখানো সম্ভব, কিন্তু ডিকটেশনের মাধ্যমে প্লেস কন্ট্রেসকার্পের পুরো চিত্র প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেখানে ফুলঅলারা ফুলে রঙ মাখায় রাস্তায় বসে বসে আর সেই রঙ গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যায় অটোবাস ছাড়ার জায়গায় আর ওয়াইন ও রদ্দি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যায় বুড়ো-বুড়িরা; ঠাণ্ডায় সর্দি ঝরে বাচ্চাদের নাক বেয়ে; নোংরা ঘাম, দারিদ্র আর মাতলামির দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায় কাফে দ্য অ্যামেচারে আর বল মুসেতের ওপরতলায় বাস করে বেশ্যার দল। রিপাবলিকান গার্ডের অশ্বারোহীটাকে নিজের বাড়িতে আমোদ-প্রমোদ করতে দেয় যে-দ্বাররক্ষিণী, তার চেয়ারে পড়ে থাকে অশ্বারোহীর অশ্বকেশরের ঝুঁটিঅলা হেলমেট। আর সেই সকালবেলা লোকেতেয়ারের আনন্দ আর ধরে না, কারণ, ক্রিমেরিতে ‘লাউতো’ পত্রিকা খুলতেই তার চোখে পড়েছে যে তার বাইসাইকেল রেসার স্বামী জীবনের সর্বপ্রথম বড় রেস প্যারিস-ট্যুরসেই তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল তার আর হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলে হলুদ খেলার পত্রিকাটা হাতেই সে চলে গেল ওপরতলায়। বল মুসেত চালাত যে-মহিলা তার স্বামী ছিল একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার আর যখনই ভোরের কোনও প্লেন ধরতে হত হ্যারিকে, ট্যাক্সি নিয়ে এসে তাকে জাগাত সে দরজায় টোকা মেরে আর রওনা দেয়ার আগে বারের জিঙ্কে দু’জনে পান করত একগ্লাস করে হোয়াইট ওয়াইন। সেখানকার প্রত্যেক প্রতিবেশীকেই চিনত সে তখন, কারণ, তাদের প্রত্যেকেই ছিল গরিব।
প্লেস ঘিরে ছিল দুই ধরনের মানুষ; মাতাল আর আমুদে খেলোয়াড়। মাতালেরা মদ খেয়েই ভুলে থাকত তাদের দারিদ্র; খেলোয়াড়েরা সেই দারিদ্রকে ব্যবহার করত নিজেদের স্বার্থে। তারা ছিল কম্যুনার্ডদের বংশধর আর নিজেদের রাজনীতির খোঁজখবর বেশ ভালই রাখত। তারা জানত কমিউনের পর ভার্সেই ট্রুপ এসে শহর দখল করলে কারা হত্যা করেছে তাদের বাবা, আত্মীয়স্বজন, ভাই, আর বন্ধুকে, এবং হাতের চামড়ায় কড়া পরা, টুপি মাথার কিংবা শ্রমিক শ্রেণীর চিহ্ন বহনকারী কাউকে দেখলেই তারা সঙ্গে সঙ্গে তাকে খতম করে দিয়ে নিয়েছে হত্যার প্রতিশোধ। আর ওই দারিদ্রের মাঝেই, একটা ওয়াইনের কো-অপারেটিভ আর বুচেরি শেভালিনের ওপাশের এক অঞ্চলে বসে সে সর্বপ্রথম লিখেছিল কীসব কাজ তার করতে হবে। প্যারিসের আর কোনও অঞ্চলকেই সে ওটার মত ভালোবাসেনি, সেই ডালপালা ছড়ানো গাছ, নিচের দিকে বাদামি-রঙ-করা শাদা পলস্তারার পুরনো পুরনো বাড়ি, গোল চত্বরে অটোবাসের দীর্ঘ সবুজ, বাঁধানো রাস্তার ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্তলাল ফুলের রঙ, রু কার্ডিনাল লেমোয়াঁ পাহাড় থেকে হঠাৎ সোজা নদীতে নেমে আসা, আরেক পাশে রু মুখেতারের জনাকীর্ণ সঙ্কীর্ণ জগত। প্যাঁথিয়ঁর দিকে চলে যাওয়া নানা রাস্তা আর বড় সেই রাজপথ যেটা ধরে সাইকেল চালাত সে, ওই অঞ্চলের একমাত্র বাঁধানো পথ, সাইকেল লাফাত না টায়ারের তলার মসৃণতার ফলে, পথটার দু’পাশে সরু সরু বাড়ি আর লম্বা সেই সস্তা হোটেল যেখানে মারা গিয়েছিল পল ভার্লেন। যে-অ্যাপার্টমেন্টে তারা থাকত সেখানে ছিল দু’টো মাত্র রুম আর হোটেলটার সর্বোচ্চ তলায় একটা রুম ভাড়া নিয়েছিল সে মাসিক ষাট ফ্রাঁয় যেখানে বসে সে করত লিখালিখির কাজ আর সেখান থেকে দেখতে পেত বাড়িঘরের ছাদ আর চিমনির নল আর প্যারিসের সবগুলো পাহাড়।
অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দেখা যেত কেবল খড়ি আর কয়লাঅলার ঘরটা। ওয়াইনও বিক্রি করত লোকটা, বাজে ওয়াইন। বুচেরি শেভালিনের বাইরে সোনালি ঘোড়ার মাথা আর খোলা জানালায় ঝুলত সোনা-রঙা হলুদ আর লাল ঘোড়ার মৃতদেহ, আর সবুজ-রঙ-করা কো-অপারেটিভে তারা যেত ওয়াইন কিনতে; ভাল ওয়াইন আর সস্তা। বাদবাকিটা জুড়ে পলস্তারার দেয়াল আর প্রতিবেশীদের জানালা। সেই প্রতিবেশীরা যারা, রাতে, রাস্তায় যখন পড়ে থাকত কেউ মাতাল হয়ে, গোঙাত আর বিলাপ করত টিপিক্যাল ফরাসি ইভরেসে প্রচারণার ফলে যে-ইভরেসের কোনও অস্তিত্ব নেই বলেই সবার বিশ্বাস তখন জানালা খুলত ধীরে ধীরে আর তারপর শুরু করত নানারকম ফিসফিসানি।
‘পুলিশ কোথায়? যখন কোনও প্রয়োজন নেই তখন ঠিক এসে হাজির হবে বাগারের দল। হয়ত ঘুমাচ্ছে কোনও বেশ্যার সঙ্গে। এজেন্টের খোঁজ নাও।’ যখন জানালা দিয়ে এক বালতি পানি ঢেলে দিত কেউ ততক্ষণে থামত গোঙানি। ‘কী ওগুলো? পানি। এই তো বুদ্ধিমানের মত কাজ।’ একে একে তারপর বন্ধ হয়ে যেত জানালা। তার স্ত্রী, মেরি, দিনে আট ঘণ্টা কাজের প্রতিবাদ জানিয়ে বলছিল, ‘যদি কোনও স্বামী ছ’টা পর্যন্ত কাজ করে তাহলে বাড়ি ফেরার পথে সামান্য মাতাল হয় আর টাকা-পয়সা তেমন ওড়ায় না। কিন্তু সে যদি কাজ করে মাত্র পাঁচটা পর্যন্ত তাহলে প্রত্যেক রাতে হয় পাঁড় মাতাল আর বাড়িতে ফেরে পকেট খালি করে। কাজের সময় কমিয়ে দিলে ভোগে কেবল শ্রমিকের বৌ।’]
‘আরেকটু শুরুয়া নাও না,’ তাকে অনুরোধ করল মহিলা।
‘না, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। শুরুয়াটা খুবই ভাল হয়েছে।’
‘একটু অন্তত নাও তাহলে।’
‘হুইস্কি-সোডা পেলে নিতাম।’
‘তোমার জন্যে এটা ভাল নয়।’
‘না। আমার জন্যে এটা খারাপ। কোল পোর্টারের কথা ও সুর। এই জ্ঞানলাভ করা যে আমার জন্যে তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ।’
‘তুমি তো জান তোমাকে ড্রিঙ্ক করতে দেখলে ভালই লাগে আমার।’
‘ও হ্যাঁ। কেবল আমার জন্যে এটা খারাপ।’
সে যখন চলে যাবে, ভাবল সে। আমার যা যা খুশি সব আমি নেব। যা যা খুশি কেবল তা-ই নয় যা যা আছে সব। হ্যাঁ, সে ক্লান্ত। ভীষণ ক্লান্ত। এবার একটু ঘুমাবে। স্থির হয়ে শুয়ে রইল সে কিন্তু মৃত্যু এল না। এখন নিশ্চয় ওটা গেছে অন্য কোনও রাস্তায়। গেছে ওটা একজোড় হয়ে, বাইসাইকেলে চড়ে, আর পাকা রাস্তায় ঘুরছে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে।
[না, প্যারিসকে নিয়ে সে কখনওই লিখেনি। তার ভালোবাসার প্যারিসকে নিয়ে নয়। কিন্তু আরও অনেককিছু নিয়েও যে সে কখনওই লিখেনি সে-বিষয়ে কী বলা যায়?
কেন লিখেনি সেই র্যান্শ্ আর সেজ ঝোপের রূপালি-ধূসর, সেচের নালার দ্রুতগামী, স্বচ্ছ পানি, আর আলফালফার গাঢ় সবুজ নিয়ে? সরু পথটা উঠতে উঠতে চলে গেছে পাহাড়ে আর গ্রীষ্মে গবাদিপশু হয়ে যেত হরিণের মত লাজুক। হেমন্তে নিচে নিয়ে আসার সময় ডাকত তারা গলা ছেড়ে আর ধীরে ধীরে এগোবার সময় পালটার পায়ের নিচে উড়ত ধুলোর মেঘ। আর পাহাড়শ্রেণীর পেছনে, সন্ধের আলোয় স্পষ্ট ফুটে উঠত চূড়াগুলো আর, চাঁদের আলোয় সরু সেই পথ ধরে ঘোড়ার পিঠে নেমে আসা আলো-ঝলমল উপত্যকায়। মনে পড়ল তার অন্ধকারে কিছুই দেখতে না পেয়ে বনপথে ঘোড়ার লেজ ধরে নেমে আসা আর লিখার জন্যে ভেবে রাখা কত শত গল্পের কথা।
ফাইফরমাশ খাটা হাবা গোছের সেই ছেলেটার কথা যাকে সেবার রেখে আসা হলো র্যান্শে আর বলা হলো কাউকেই যেন সে কোনও খড় নিতে না দেয়, আর ফর্কসের সেই বুড়ো হারামজাদার কথা যার অধীনে কাজ করার সময় তার হাতে ভীষণ মার খেয়েছিল ছেলেটা, গরুর খাবার নিয়ে চলে যাবার সময় তাকে বাধা দেয়ার জন্যে। প্রতিবাদ করছিল ছেলেটা আর বুড়ো বলছিল সে তাকে আবার মারবে। তখন রান্নাঘর থেকে রাইফেল নিয়ে এসেছিল ছেলেটা আর গোলাবাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করতেই গুলি করেছিল বুড়োকে আর তারা র্যান্শে ফিরতে দেখল একসপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ায় খোঁয়াড়ে জমে পাথর হয়ে গেছে বুড়োর লাশ, আর কুকুরেরা খেয়ে ফেলেছে তার শরীরের বেশ কিছু অংশ। কিন্তু যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেটুকুই একটা কম্বলে মুড়ে আর দড়ি দিয়ে বেঁধে চাপানো হলো একটা স্লেজে আর ছেলেটাকে সঙ্গে নেয়া হলো স্লেজ টানায় সহায়তা করার জন্যে, আর দু’জনে মিলে লাশটাকে নিয়ে গেল স্কী খেলার রাস্তায়, আর ষাট মাইল পেরিয়ে শহরে গিয়ে তুলে দিল তাকে শেরিফের হাতে। বেচারি ভাবতেই পারেনি যে তাকে গ্রেফতার করা হবে। ভেবেছে সে তার কর্তব্যপালন করেছে আর সেজন্যে পুরস্কৃত করা হবে তাকে। বুড়োটাকে টেনে আনার ব্যাপারে সহায়তা করেছে সে যেন সবাই জানতে পারে কতটা খারাপ ছিল বুড়ো আর কীভাবে গরুর খাবার চুরি করতে গিয়েছিল অন্যের গোলাবাড়িতে, আর তাই শেরিফ যখন হাতকড়া পরাল তার হাতে ব্যাপারটা যেন সে বিশ্বাসই করতে পারল না। তারপর কাঁদতে লাগল ছেলেটা। এই একটা গল্প সে লিখবে বলে ভেবেছিল। সেখানকার অন্তত বিশটা ভাল গল্প তার জানা আছে অথচ একটা গল্পও সে কখনওই লিখেনি। কেন?]
‘তুমি বলো কেন,’ বলল সে।
‘কী কেন, ডিয়ার?’
‘কেন কিছুই নয়।’
মহিলা আর অত পান করে না, এখন, তাকে পাবার পর থেকে। কিন্তু সে যদি বেঁচেও যায় মহিলাকে নিয়ে লিখবে না কখনওই, কথাটা জানে সে এখন। তাদের কাউকে নিয়েও নয়। ধনীরা একেবারেই নীরস আর তারা ভীষণ মদ খায়, কিংবা অতিরিক্ত ব্যাকগ্যামন খেলে। তারা নীরস আর একঘেয়ে। মনে আছে তার বেচারি জুলিয়েন আর ধনীদের প্রতি তার রোমান্টিক শ্রদ্ধার কথা আর কেমন করে একদিন সে একটা গল্প লিখতে শুরু করেছিল এভাবে, ‘অত্যন্ত ধনীরা তোমার আমার থেকে আলাদা।’ আর কে যেন জুলিয়েনকে বলেছিল, হ্যাঁ, তাদের টাকা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু জুলিয়েনের কাছে কথাটা তত মজার ছিল না। সে ভাবত তারা একটা বিশেষ গ্ল্যামারাস জাত আর যখন সে দেখল যে আসলে তারা সেরকম নয় তখন সে খুবই ভেঙে পড়ল ঠিক যেমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় সে ভেঙে পড়েছে আগেও।
যাদের কারণে এভাবে ভেঙে পড়তে হয় তাদের সে ঘৃণা করত। বিষয় বুঝলেই যে সেটাকে পছন্দ করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। সবকিছুকেই সে পরাজিত করতে পারবে, ভাবল সে, কারণ, গুরুত্ব না দিলে কিছুই তাকে কষ্ট দিতে পারবে না।
বেশ। তাহলে এখন মৃত্যুকেও আর গুরুত্ব দেবে না সে। একটা জিনিসকে সে বরাবরই ভয় পেয়েছে ব্যথার যন্ত্রণা। যে-কোনও মানুষের মতই তার রয়েছে যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা, যদি না সেটা অতি দীর্ঘায়িত হয়, আর কুরে কুরে খেয়ে ফেলে, কিন্তু এখন একটা জিনিস তাকে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা আর ঠিক যখন তার মনে হলো যে এটা সে আর সহ্য করতে পারবে না, তখনই হঠাৎ থেমে গেল ব্যথাটা।
[অনেক দিন আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল তার যখন বম্বিং অফিসার উইলিয়ামসন একরাতে কাঁটাতারের বেড়া পেরোতে গিয়ে জার্মান টহলদার সেনার ছুঁড়ে দেয়া স্টিক বোমায় আহত হলো মারাত্মকভাবে আর, সারা রাত ধরে চেঁচাল, সবার হাতে-পায়ে ধরতে লাগল যেন তাকে মেরে ফেলা হয়। মানুষটা মোটাসোটা, অত্যন্ত সাহসী, আর ভাল একজন অফিসার, যদিও উদ্ভট সব কর্মকাণ্ড দেখানোর নেশা ছিল তার। কিন্তু সেই রাতে সে আটকে গেল কাঁটাতারে, ফ্লেয়ারের আলোয় ধরা পড়ে গেল তার উপস্থিতি আর তার নাড়িভুঁড়ি জড়িয়ে গেল কাঁটাতারের সঙ্গে, তাই যখন তাকে নিয়ে এল তারা, জীবিত, ছাড়াতে হলো কাটাকুটি করে। আমাকে গুলি করো, হ্যারি। যিশুর দোহাই, গুলি করো আমাকে। তাদের মাঝে তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে গেল যে প্রভু মানুষের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেন না যা বহন করার সাধ্য তার নেই এবং কে যেন এমন একটা তত্ত্ব দিল যার অর্থ হলো, একসময় যন্ত্রণার প্রকোপ তাকে আপনাআপনি অজ্ঞান করে ফেলবে। কিন্তু সেই রাতের উইলিয়ামসনের কথা তার স্পষ্ট মনে আছে আজও। কিছুতেই অজ্ঞান হয়নি উইলিয়ামসন যতক্ষণ না সে নিজের ব্যবহারের জন্যে তুলে রাখা সমস্ত মরফিন ট্যাবলেট খেতে দিয়েছিল তাকে আর তারপরেও সেই ট্যাবলেট তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করতে পারেনি।]
এখন পর্যন্ত তেমন যন্ত্রণা হয়নি তার; যদি আরও খারাপ কিছু না হয়ে এরকমই চলে তাহলে দুঃশ্চিন্তার কিছুই নেই। যদি পাশে কেবল পাওয়া যেত ভাল একজন সঙ্গী।
কেমন ধরনের সঙ্গী পেলে ভাল লাগত তা নিয়েও খানিকটা ভাবল সে।
না, ভাবল সে, কিছু যখন তুমি করবে, আর তা শুরু করবে অনেক দেরিতে, আর শেষ করতেও নেবে সুদীর্ঘ সময়, তখন পাশে কাউকে পাবার আশা তুমি করতে পারো না। অনুষ্ঠান ততক্ষণে শেষ আর সবাই বিদায় নেয়ার পর তোমার পাশে রয়েছে কেবল নিমন্ত্রণকর্ত্রী।
আর সবকিছুর মত বিরক্ত হয়ে পড়ছি আমি মৃত্যুর ব্যাপারেও, ভাবল সে।
‘বিরক্তিকর,’ বলল সে গলা চড়িয়ে।
‘কি বিরক্তিকর, ডিয়ার?’
‘যে-কোনও কাজ করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় নেয়া।’
তাকাল সে আগুনের ওপাশে বসা মহিলার মুখের দিকে। বসে আছে সে চেয়ারে হেলান দিয়ে, আগুনের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে সুশ্রী একটি মুখ আর চোখে তার ঘুমজড়ানো ভাব। আগুনের সীমানার ঠিক বাইরে হায়েনাটার করা একটা শব্দ পেল হ্যারি।
‘আমি লিখছিলাম,’ বলল সে। ‘কিন্তু ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
‘ঘুমাতে পারবে মনে হচ্ছে?’
‘একদম নিশ্চিত। তুমি চলে যাচ্ছ না কেন?’
‘তোমার সঙ্গে বসে থাকতেই ভাল লাগছে।’
‘অদ্ভুত কিছু কি মনে হচ্ছে তোমার?’ জানতে চাইল সে মহিলার কাছে।
‘না। কেবল একটু ঘুম-ঘুম লাগছে।’
‘আমার মনে হচ্ছে,’ বলল সে।
এইমাত্র আবার সে টের পেয়েছে মৃত্যুর উপস্থিতি।
‘একটামাত্র জিনিস আমি কখনওই হারাইনি আর তা হলো কৌতূহল,’ বলল সে মহিলাকে।
‘তুমি কখনওই কিছু হারাওনি। তুমিই আমার দেখা সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানুষ।’
‘হায় যিশু,’ বলল সে। ‘মেয়েরা যে কত কম জানে! কীভাবে বুঝলে? ইনটুইশন?’
ঠিক তখনই, মৃত্যু এসে মাথা রাখল খাটিয়ার পায়ায় আর সে টের পেল ওটার শ্বাস নেয়ার শব্দ।
‘কখনওই বিশ্বাস করো না ওসব কাস্তে আর খুলির গল্পে,’ বলল সে মহিলাকে। ‘ওটা সহজেই বাইসাইকেলে চড়া দুই পুলিশও হতে পারে, বা হতে পারে একটা পাখি। কিংবা ওটার পক্ষে হায়েনার মত চ্যাপটা নাকঅলা কিছু হওয়াও বিচিত্র নয়।’
এবার ওটা চেপে বসেছে তার ওপরে, কিন্তু এখন আর ওটার কোনও আকার নেই। ওটা স্রেফ খানিকটা জায়গা দখল করে রেখেছে।
‘ওটাকে চলে যেতে বলো।’
চলে তো গেলই না বরং ওটা চেপে বসল আরও।
‘কী দুর্গন্ধ তোমার শ্বাসের,’ বলল সে ওটাকে। ‘একেবারে জঘন্য।’
ওটা আরও চেপে বসল তার ওপর আর এখন সে আর ওটার সঙ্গে কথা বলতে পারল না, আর যখন ওটা দেখল সে কথা বলতে পারছে না তখন চেপে বসল আরও, আর তখন সে চেষ্টা করল কথা না বলেই ওটাকে দূরে সরিয়ে দিতে, কিন্তু আরও চেপে বসায় এবার ওটার পুরো ভার পড়ল তার বুকের ওপর, আর ওটা যখন গুটিসুটি মেরে বসে রইল বুকে আর সে নড়াচড়া করতে পারল না, কিংবা কথা বলতে পারল না, তখন শুনতে পেল মহিলা বলছে, ‘বাওয়ানা ঘুমিয়ে পড়েছে। আস্তে করে খাটিয়াটা তুলে তাঁবুর ভেতরে নিয়ে যাও।’
বুকের ওপর চেপে বসা জিনিসটাকে তাড়িয়ে দেয়ার কথা বলতে চাইল সে মহিলাকে কিন্তু পারল না আর ওটা গুটিসুটি মেরে এমনভাবে বসেছে এখন যেন সে শ্বাস নিতে না পারে। আর তারপর, তারা যখন তুলে নিল খাটিয়াটা, হঠাৎই ঠিক হয়ে গেল সবকিছু আর বুকের ওপর থেকে যেন নেমে গেল অসহনীয় ভারটা।
এখন সকাল আর সকাল হয়েছে অনেক আগেই আর শুনতে পেল সে প্লেনের শব্দ। প্রথমে খুদে আকারে দেখা দিয়ে বড় একটা চক্কর দিল প্লেনটা আর ছেলেরা ছুটে গিয়ে, কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালল স্তূপ-করা-ঘাসে আর সমতল জায়গাটার দু’প্রান্তেই সৃষ্ট হলো বড় বড় দু’টো আগুনের চিহ্ন, সকালের বাতাস কেবলই সেই আগুনকে ধেয়ে আনতে চাইল তাঁবুর দিকে আর প্লেনটা চক্কর দিল আরও দু’বার, এবার বেশ নিচু দিয়ে, আর তারপর আরও নিচু হয়ে ল্যান্ড করল নিখুঁতভাবে, আর স্ল্যাকস আর টুইডের জ্যাকেট পরা আর বাদামি ফেল্ট হ্যাট মাথায় দেয়া বুড়ো কম্পটন এগিয়ে এল তার দিকে।
‘কী ব্যাপার, বুড়ো ভাম?’ বলল কম্পটন।
‘পা-টা গেছে,’ বলল সে তাকে। ‘নাস্তা খাবে?’
‘ধন্যবাদ। শুধু চা দিলেই চলবে। দেখতেই পাচ্ছ, পুশ মথটা নিয়ে এসেছি। মেমসাহেবকে নিতে পারব না। মাত্র একজনের জায়গা আছে। তোমার লরিও রওনা হয়ে গেছে।’
হেলেন কম্পটনকে একপাশে নিয়ে গিয়ে কী যেন বলল। কম্পটন ফিরে এল ভীষণ উৎফুল্ল এক চেহারা নিয়ে।
‘তোমাকে নিয়ে রওনা দেব এক্ষুনি,’ বলল সে। ‘ফিরে এসে মেমসাহেবকে নিয়ে যাব। আবার তেল নিতে আরুশায় নামতে হবে মনে হচ্ছে। আমাদের আর দেরি না করাই ভাল।’
‘চা খাবে না?’
‘ওটা আমার জন্যে মোটেই জরুরী নয়।’
ছেলেরা খাটিয়াটা তুলে নিয়ে আর সবুজ তাঁবুটাকে বেড় দিয়ে পাথুরে জায়গাটা বরাবর এগিয়ে তাকে নিয়ে এল সমভূমিতে আর তারপর পাশ কাটাল এখনও দাউদাউ করে জ্বলা আগুনের চিহ্নটাকে, ঘাস সব পুড়ে গেছে, আর বাতাসের ঝাপটায় আগুন এগিয়ে আসতে চাইছে ছ্ট্টো প্লেনটার কাছে। তাকে ভেতরে ঢোকাতে বেশ ঝামেলা হলো, কিন্তু ঢোকানোর পর বসে পড়ল সে চামড়ার সিটে হেলান দিয়ে, আর তার পা-টা সোজা বেরিয়ে পড়ে রইল কম্পটনের সিটের একপাশে। এঞ্জিন চালু করে ভেতরে ঢুকল কম্পটন। হাত নাড়ল সে হেলেন আর ছেলেদের উদ্দেশে আর, গুঞ্জনটা সেই পরিচিত গর্জনে রূপান্তরিত হতেই, একপাক ঘুরে এগোতে লাগল তারা বুনো শুয়োরের গর্তগুলো এড়িয়ে, আগুন দু’টোর মাঝ বরাবর সবেগে ছুটে, শেষ একটা লাফ দিয়ে গা ভাসাল শূন্যে আর সবাইকে সে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল নিচে, হাত নাড়ছে, আর পাহাড়ের পাশের তাঁবুটা, চ্যাপটা হয়ে যাচ্ছে এখন, আর প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে সমভূমি, গাছের ঝাড়, চ্যাপটা হয়ে যাচ্ছে ঝোপ, আর জীবজানোয়ার চলাচলের পথগুলো চলে গেছে শুকনো ডোবাগুলোর কাছে, আর সম্পূর্ণ অজানা এক জলাশয়ের সন্ধান পেল সে। জেব্রা, পিঠগুলো ছোট্ট আর গোল মনে হচ্ছে এখন, আর মাথামোটা বিন্দুর মত ন্যুর পাল যেন ওপরদিকে উঠতে চাইছে লম্বা একটা আঙুলের রূপ নিয়ে, আবার প্লেনের ছায়া তাদের দিকে ছুটে আসতে দেখে ছড়িয়ে পড়ছে সমভূমি জুড়ে, একেবারেই খুদে এখন তারা, আর সমভূমিটার যতখানি চোখে পড়ছে তার পুরোটাই এখন ধূসর-হলুদ আর চোখের সামনে কম্পির টুইডে ঢাকা পিঠ আর বাদামি ফেল্ট হ্যাট। তারপর উঠে এল তারা প্রথম পাহাড়গুলোর ওপরে আর ন্যুগুলো যেন ওপরদিকে উঠে আসতে চাইছে তাদের অনুসরণ করে, আর তারপর পাহাড় পেরিয়ে যেতে দেখা গেল গভীর সবুজ বন আর বাঁশে ছাওয়া ঢাল, আর তারপর আবার গভীর বন, বনের ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ের চূড়া আর খাদগুলো যেন এক ভাস্কর্য, আর পাহাড় নেমে এসেছে আরেক সমভূমিতে, গরম, আর রক্ত-বাদামি, তাপপ্রবাহে এবড়োখেবড়ো, তার অবস্থা দেখার জন্যে পেছন ফিরল কম্পি। তারপর সামনে আরেক গাঢ় পাহাড়শ্রেণী।
আরুশা যাবার পরিবর্তে তাদের প্লেন বাঁক নিল বামে, কম্পি নিশ্চয় দেখে নিয়েছে যে পর্যাপ্ত গ্যাস আছে এখনও, আর নিচে তাকাতে সে দেখল ভেসে চলেছে গোলাপি এক মেঘ, আর তুষারঝড়ের প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়া তুষারের মত সেই মেঘ তাকে বুঝিয়ে দিল, দক্ষিণ থেকে আসছে পঙ্গপালের ঝাঁক। তারপর উঠতে লাগল তারা ওপরে আর মনে হলো এবার তারা পুবে যাচ্ছে, আর তারপরেই অন্ধকার হয়ে এল চারপাশ আর তারা পড়ে গেল একটা ঝড়ের ভেতরে, বৃষ্টি পড়তে লাগল এত ঘন হয়ে যেন উড়ে চলেছে তারা একটা জলপ্রপাতের মাঝ দিয়ে, আর তারপরেই বেরিয়ে এল তারা জলপ্রপাতের বাইরে আর মাথা পেছনে ঘুরিয়ে, হেসে কম্পি হাত তুলে দেখাল সামনে, আর ঠিক তার সামনেই, যতটা দেখতে পেল সে, পুরো পৃথিবীর মত বিস্তৃত, বিশাল, সমুচ্চ, আর সূর্যালোকে অবিশ্বাস্য ধরনের শাদা, কিলিমানজারোর চৌকো চূড়া। এবং তখন সে বুঝতে পারল যে ওটাই তার গন্তব্য আর তাই ওখানেই সে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই রাতের গাঢ় অন্ধকারে গোঙানি থামিয়ে অদ্ভুত, প্রায় মানুষের মত এক কান্না শুরু করল হায়েনাটা। শুনতে পেয়ে নড়ে উঠল মহিলা অস্বস্তিতে। তবে জাগল না। স্বপ্নে সে তখন তার মেয়ের আত্মপ্রকাশের আগের রাতে লং আইল্যান্ডের আপন বাড়িতে। কীভাবে যেন সেরাতে তার বাবাও এসে উপস্থিত হয়েছে ভীষণ এক বদমেজাজ নিয়ে। তারপর হায়েনাটা এত জোরে চেঁচাতে লাগল যে তার ঘুম গেল ভেঙে আর একমুহূর্তের জন্যে কোথায় আছে বুঝতে না পেরে ভয় পেল সে। তারপর টর্চলাইট নিয়ে সে আলো ফেলল পাশের খাটিয়ায় যেটা তারা তাঁবুর ভেতরে নিয়ে এসেছিল হ্যারি ঘুমিয়ে যাবার পর। মশারির নিচে হ্যারির দেহটাকে দেখতে পেল সে কিন্তু কীভাবে যেন তার পা-টা বাইরে বেরিয়ে এসে খাটিয়ার পাশে ঝুলছে। ব্যান্ডেজের পুরোটাই খুলে নেমে এসেছে নিচে আর সেদিকে সে আর তাকিয়ে থাকতে পারল না।
‘মোলো,’ ডাকল সে, ‘মোলো! মোলো!’
তারপর ডাকল সে, ‘হ্যারি, হ্যারি!’ তারপর আরও চড়ে গেল তার স্বর, ‘হ্যারি! প্লিজ, এই হ্যারি!’
কোনও জবাব নেই আর তার শ্বাস নেয়ারও কোনও শব্দ পেল না সে।
তাঁবুর বাইরে হায়েনাটা আবার চেঁচাল সেই অদ্ভুতভাবে যা শুনে ভেঙে গিয়েছিল তার ঘুম। কিন্তু এখন এত জোরে হাতুড়ি পিটছে তার হৃৎপিণ্ড যে হায়েনার চেঁচানিটা সে শুনতেই পেল না।


0 comments:
Post a Comment