July 24, 2008

প্রসঙ্গঃ নওগাঁ

প্রসঙ্গঃ নওগাঁ
নির্মল মৈত্র

জন্ম থেকে শৈশবের মাত্র কয়েকটা বছর কেটেছিল নওগাঁয়। ইতিমধ্যে পঞ্চাশ বছরের বেশি অতিক্রান্ত। কিন্তু সেই শৈশবের ফেলে আসা দিনের স্মৃতি অমলিনÑ‘স্মৃতি সততই সুখের’।
শহর নওগাঁ তখন নিতান্তই ছোট কিন্তু একটা সুন্দর পরিবেশ সবুজ সজীবতা মনকে উৎফুল্ল করতো এখনো অনুভব করি। শহরের মধ্যে দিয়ে ‘ছোট নদী [যমুনা] চলেছে এঁকেবেঁকে ।’ যথেষ্ট নৌকা চলাচল ছিল যাত্রী নিয়ে বা পরিবহনে। অনেক বাড়ির নিজস্ব নৌকা ছিল আশেপাশে যাতায়াতের জন্য। আমাদের দুটো ছিলোÑকাশিমপুরে যাতায়াতের জন্যে একটার ছিল কাঠের ছই। নদীপথ উল্লেখযোগ্য ব্যবসার পরিবহন ছিলো। তাছাড়া ছিলো যথেষ্ট টমটম, গরুর গাড়ি। কিন্তু প্রধান রাস্তাগুলি খোয়া বাঁধানো। অবশ্য কিছু চমৎকার সুড়কি রাস্তাও ছিলো যেমন ডাকবাংলোর সামনে। আশেপাশে কিছু জায়গার সঙ্গে অথবা সান্তাহার রেলস্টেশনের সঙ্গে সড়ক পথে কিছু বাস যোগাযোগ ছিল। মনে আছে প্রধান সড়কগুলোর ধারে ধারে বেশ বড় বড় গাছের সারি ছিলÑবট, কৃষ্ণচূড়া ইত্যাদির। রোদ ও বৃষ্টির থেকে পথ চারীর সামান্য আশ্রয়। আমাদের বাড়ি তখনকার শহরের প্রায় মধ্যস্থলে। তাই কে. ডি স্কুল, করোনেশন স্কুল, ডাকবাংলো, লাইব্রেরি, জেলখানা, মুন্সেফের বাড়ি বা মহকুমা শাসকের বাংলো, কালিবাড়ি, পার্ক ইত্যাদি ছিল সত্যিকার ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। শহরের বৈশিষ্ট ছিলো অসংখ্য মাঠের। এত মাঠ কোনো শহরের আর দেখিনি ‘এটিম মাঠ, ‘বিটিম মাঠ, করোনেশন স্কুলের, মুসলিম ও হিন্দু হোস্টেলের মাঠ, মাদ্রাসার মাঠ ইত্যাদি। আর একটি ছোট মাঠের উল্লেখ না করলে অসম্পূর্ণ হবেÑকাঁঠালতলার মাঠ আমাদের পাড়ার।
এই মাঠেও ফুটবল খেলা হত। আবার এখানে তপনদা, কানুদা, খোকনদা, রবিদা, সরস্বতী পুজোর আয়োজন করতো। নিজেরাই চালা বাঁধা থেকে বিসর্জন সবই করতো।
আমাদের বাড়ি ছিল নদীর ধারে ট্রেজারি ও মহকুমা শাসকের বাংলো থেকে সোজা পশ্চিম দিকে। বিরাট কমপাউন্ড, একদিকে হেমন্তদাদুর বাড়ি আর একদিকে হাদেশ মিঞার বাড়ি। আমাদের ঠাকুর্দা শ্রী দ্বারকানাথ মৈত্র ভদ্রাসনÑকাশিমপুর থেকে উনবিংশ শতাব্দির শেষদিকে নওগাঁতে বসতি স্থাপন করেন এই বাড়িতে। নওগাঁ মহকুমা আদালতে ওকালতি শুরু করেন। পরে আমার বাবা [ডাঃ প্রফুল্ল কুমার মৈত্র] ডাক্তারিতে পশারের সঙ্গে সঙ্গে বিরাট একটি লাল দোতলা ইমারত যোগ করেন।
কিন্তু ঠাকুর্দার ওকালতির পরম্পরা রক্ষা করেছিলেন জ্যাঠামশাই শ্রীশশীকুমার মৈত্র ও তারপরে জাড়তুতো দাদা শ্রীবিনয় মৈত্র ১৯৭১ পর্যন্ত অর্থাৎ খান সেনাদের চূড়ান্ত অত্যাচার আরম্ভ হওয়া পর্যন্ত। কাকা শচীন্দ্রকুমার মৈত্রের ছিলÑসাংবাদপত্র ও অন্যান্য ব্যবসা। মনে পড়ে আমাদের প্রতিবেশীদের কথা, সকলে আত্মীয় বা আত্মীয়সম ছিলেন যেমনÑহেমন্তদাদু [ভয়ে ভয়ে কানকাটা দাদু বলা হত] নারায়ণ কাকা ক্ষিতীশমামা, হাদেশ মিঞা, যোগেশ জ্যাঠা, ভূপেনদা, পুলিন কাকা প্রমুখ রবিদা হেনাদা, রেজাদা, ভলি, জয়দেব, দিলীপ প্রদীপ, শঙ্কর, ছবি, ভানু, টুলুদি, কুলো প্রমুখের কথা মনে আছে। এদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ ছিন্ন। মাত্র কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। আর ছিল একই বাড়িতে খুড়তুতো, মাসতুতো ভাই বোনেরা। বিশাল জয়েন্ট ফ্যামিলি।
বাড়ির কাছেই কালিবাড়ি পাশে বিশাল মাঠ নিয়ে কে ডি স্কুল, একদিন আমরা ভর্তি হয়ে গেলাম। বাড়ির সব ছেলে সেখানেই পড়তো। বাবারাও পড়েছেন। বাবা ম্যানেজিং কমিটির মেম্বার ছিলেনÑতাই ভর্তি হওয়াটা কোন ব্যাপার ছিল না। স্কুলের মাঠে ব্যবস্থা ছিল খেলাধুলার ও জিমন্যাস্টিকের। যেমন প্যারালাল বার, রোমান রিং, হরাইজন্টাল বার আরো কতকি? অনেকের নাম জানি না বা পরে শিখেছি। ফুটবল খেলার কথা বলাই বাহুল্য, সেই বয়েসে আমরা বাড়ির মাঠেই খেলতাম ফুটবল ও শীতকালে ব্যাডমিন্টন। কোন কোনদিন ব্যাডমিন্টনে বাবাও অংশ নিয়েছেন।
আমাদের স্কুলে ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় আশেপাশের স্কুলের ছেলেদের সেন্টার হোত। আমাদের একতলার ঘরে সেই সময় পরীক্ষার্থীরা থাকতো ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার জন্য।
স্কুল শিক্ষার অভাব না থাকলেও ম্যাট্রিকের পর সবাই যেত প্রধানত কোলকাতায়, কিন্তু বাবাদের সময় অনেকে রাজশাহী কলেজে যেত। তখন মহকুমা শহর হওয়ার কারণে যথেষ্ট উকিল দেখা যেত। ছিল বেশ নামি নামি শিক্ষকÑযদিও এটা বোঝার মত বয়স আমার ছিল না। কিন্তু অগ্রজদের মুখে মুখে জেনেছিÑআর আমার স্বল্পস্থায়ী স্কুল জীবনে জেনেছি। যেমন মহেশবাবু, কুমুদবাবু, পটলবাবু, সরবুল্লা স্যার বা আমাদের হেডমাস্টার শশধরবাবু।
শহরের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক চিকিৎসা শুরু হয়। চিকিৎসার জন্য একটি ছোট সরকারি হসপিটাল ছিল। আমাদের ডিসপেনসারির কাছেই নদীর ধারে। আর কয়েকজন ডাক্তার ছিলেন সকলেই লব্ধ প্রতিষ্ঠিত আমাদের বাবা ডাঃ প্রফুল্ল কুমার মৈত্র, ডাঃ সতীশ সেন ও ডাঃ অন্নদা চক্রবর্তী। নদীর ধারে ছিল আমাদের বিরাট ফার্মেসী। তখনকার দিনে উত্তর বাংলার অনেক জায়গা থেকে ক্রেতা আসতো। আর একটা আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল-আমাদের ডিসপেনসারি বাড়ির মত আর অনেক বাড়ি ছিল যার বহিরাংশ লাল রং এর এবং ইটের উপর পয়েন্টিং করা যেমন আমাদের বাড়ির নতুন অংশটা, স্কুল বিল্ডিং, গাঁজা সোসাইটির ক্লাব ও হোস্টেল বাড়িগুলো এবং আরো অনেক বাড়ি সান্তাহার স্টেশন ইত্যাদি। যদিও ডিসপেনসারিটা ছিল ভাড়া বাড়িতে।
কিছু বড় হয়ে, নওগাঁ বাড়ি হওয়ায় অনেক সময় বিদ্রুপ শুনতে হতো। গাঁজা চাষের জন্য। কিন্তু পরে জেনে গর্বিত ছিলাম যে নওগাঁ গাঁজা সোসাইটি ছিল পৃথিবী বিখ্যাত সংঘবদ্ধ গাঁজা চাষের এবং তার পরিচালনের সুনামের জন্য। গাঁজা চাষীরা হত বেশ অবস্থাপন্ন, নওগাঁ মহকুমার উন্নতির প্রধান কারণ সোসাইটির পেশাদারিত্ব ও চাষীদের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তি। এই শিল্পের বন্ধের ফলে জমির ও চাষীদের কি রকম পরিবর্তন হয় তা জানতে ইচ্ছে করে। একটা অদ্ভুত যোগাযোগ হল ১৯১৭ সালে গাঁজা সোসাাইটির স্থাপনা অর্থাৎ ইউ.এস.এস.আর এর জন্মের সঙ্গে এবং বন্ধ হোল ইউ.এস,এস.আর এর পতনের সঙ্গে সঙ্গে। নওগাঁর স্মৃতি মনে পড়ে-মাঝে মাঝে বাড়ির পাশেও লাইব্রেরির পাশের মাঠে ব্যান্ড বাজিয়ে গান হোত ‘জাগে নব ভারতের জনতা এক জাতি এক প্রাণ একটা’ কারা এসব পরিচালনা করতো তা বোঝার বয়স তখন ছিল না।
ইতিমধ্যে স্বাধীনতা হয়। ১৪ই আগস্ট চিলেকোঠার উপরে সবুজ পতাকা উড়ানো হল। এই রকম সময়ে মহাত্মা গান্ধী একদিন সান্তাহারে আসেন। দাদারা দল বেঁধে তাঁকে দেখতে যায়। আমাদের যাওয়ার অনুমতি ছিল না। এরপর আস্তে আস্তে অনেকে কোলকাতা বা হিন্দুস্তান যাওয়া শুরু করেন অথবা তোড়জোড় আরম্ভ হয়।
সেটা ১৯৫০ সাল, একদিন আমরা স্কুলে, টিফিনের সময় স্কুল হঠাৎ ছুটি হয়ে যায়। আমাদের মত নিচু ক্লাসের ছেলেদের দল বেঁধে বয়স্ক কাউকে সাথে করে বাড়ি পাঠালেন হেড মাস্টার মশায়। আমাদের তিনি চিনতেনÑকাছেই বাড়ি তাই সবশেষে পাঠালেন। এর কিছুদিন পরেই আমরা নওগাঁ ছেড়ে যাই। এর আগেই অবশ্য দুই দাদা উত্তরপাড়া কলেজে পড়তে চলে যায়। তখন কোলকাতা যাওয়ার উত্তেজনায় ছিলাম, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই মনে চিরদিনের জন্যে দারুণ বিষাদে ভরে যায়Ñনওগাঁ খোলা মাঠ প্রতিবেশী এবং একান্নবর্তী পরিবারের বিচ্ছেদ। পরে জেনেছিলাম স্কুলের তাড়াতাড়ি ছুটির কারণটা ছিল সান্তাহারে ট্রেনে দাঙ্গা। এর এক চূড়ান্ত নিদর্শন রেখে যায় বীরুকাকার ছেলে কান্তিদার আহত হওয়া ও মৃত্যুতে। এটাও একটা শিশুমনের উপর রেখে ছিল দারুণ বিষাদ।
এই সঙ্গে পঞ্চাশ বছর আগের কয়েকটি মজার ঘটনা ও ব্যক্তিত্ব স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। যেমন একবার নষ্টচন্দ্রের পরের দিন দেখা গেল আমাদের টম্টম্ গাড়িটা ও তার ঘোড়াটা ছাদের নিচে নাই। কোচোয়ান রহিম দুপুরবেলায় অনেক দূর থেকে দুটোকেই ফেরৎ এনেছিল। নষ্টচন্দ্রের পরের সকালে ফল ফুল কারো বাগানে থাকতো না। জ্যাঠামশাইয়ের কাছারিতে থাকতো একটা লম্বা নল লাগানো হুঁকো। বাড়ির ছেলেরা সুযোগ পেলেই দু-একটা টান দিতো, আবার ধরা পড়ে বকাবকি খেত।
একই সঙ্গে বাড়িতে থাকতেন বিশু কাকা [রবীন্দ্রনাথ মৈত্র] হিজলী জেলে ছিলেন কয়েক বছর স্বদেশী কারণে। বিখ্যাত গুলি চালানো হত্যা থেকে বেঁচে গেলেন [ব্রিটিশ পুলিসের গুলি থেকে] একটা বিরাট উনানের মধ্যে ঢুকতে পেরে।
তারপরে তিনি ব্যাংকে কাজ করতে এবং দেশবিভাগের পরে আলিপুরদুয়ারের কাছে ‘চা বাগানে’ কাজ করতে যান। তাঁর একটা বিরল যন্ত্র ছিলÑএস্রাজ। পাড়ায় ছোটছোট মেয়েরা নববর্ষ বা রবীন্দ্রজয়ন্তী করতো দিদিদের তত্ত্বাবধানে বারান্দায় চাদর টাঙিয়ে। কোর্টের সামনে ছিল লাইন দিয়ে নানারকম দোকান একটা ছিল রসিকদার। সেখানে লজেন্স, বল, সাটল কক্ কিনতে যেতাম। আমাদের সীমানা এদিকে এই পর্যন্তই। অন্যদিকে মাদ্রাসা বা পার্ক পর্যন্ত।
যাই হোক, এই স্মৃতি মুছে যাওয়ার নয়। তাই সুযোগ করে পঁয়তাল্লিশ বছর পরে আবার নওগাঁ পৌঁছলাম। বাড়ি রাস্তা, স্কুল, হোস্টেল অনেক কিছু চিনতে পারলাম। পরিবর্তন হয়েছে স্বাভাবিক কারণে। রাস্তা ভালো হয়েছে, অটো রিক্সা হয়েছে টম্টম্ হারিয়ে গিয়েছে। বিজলীর আলো এসেছে গাঁজা সোসাইটি বন্ধ-বন্ধ চাষ গাঁজার। প্রবীণ বয়েসের চোখে দেখা সে অন্য অভিজ্ঞতা।

0 comments:

Post a Comment