কোলরিজের কবিতা
মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন
মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন
ভূমিকা:
স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ [১৭৭২-১৮৩৪] ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার এবং সাহিত্য সমালোচক। যদিও তাঁর মানসমৃদ্ধ রচনার সংখ্যা খুব বেশি নয়, ইংরেজি সাহিত্যে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোমান্টিক কবি হিসেবে সমাদৃত এবং সেই সাথে বিশ্ব-সাহিত্যেও আজ অবধি অত্যন্ত সুপরিচিত। তাঁর সম্পর্কে জনৈক সমালোচক ঝঃড়ঢ়ভড়ৎফ ইৎড়ড়শব যথার্থই বলেছেন, “.. . . all that he did excellently might be bound up in twenty pages, but it should be bound up in pure gold.” নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অধিকাংশ সুবিখ্যাত কবি-লেখকের ক্ষেত্রেই এতোটা তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য খাটে না।
বাংলাদেশে ইংরেজি-শিক্ষিত সাহিত্যরসিকদের কাছে কোলরিজ প্রধানত The Rime of the Ancient Mariner, Christabel I Kubla Khan bvgK KweZvÎq Ges Biographia Literaria নামক সমালোচনামূলক গ্রন্থের জন্য বিখ্যাত। বর্তমান পর্যায়ে বাঙালি পাঠকের কাছে তাঁর অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত চারখানি রচনা থেকে অনুবাদ পেশ করা হলো। অনুবাদগুলোর মধ্যে আবার একটি পূর্ণাঙ্গ এবং বাকি তিনটি আংশিক। [১] শান্তি, [২] আকাল, অগ্নি, ঘাতিনী, [৩] স্বাধীনতা ও [৪] প্রেম শিরোনামে অনুবাদগুলো মূলত কবিতাগুলোর রচনা ও প্রকাশকালের অনুক্রমে সাজানো হয়েছে। আশা করি, অনুবাদিত অংশে পাঠক তাঁর বাঙালি রুচিতেও তৃপ্তিদায়ক হতে পারে কোলরিজের এমন কিছু রচনার সাক্ষাৎ পাবেন।
এক
‘শান্তি’ শিরোনামে অনুবাদিত কবিতাটি কোলরিজ রচিত The Fall of Robespierre নামক নাটকের প্রথমাংশ থেকে গৃহীত। নাটকটি ১৭৭৪ সনে রচিত ও প্রকাশিত। বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ যেমন ‘শান্তির নীড়’ বলতে ‘ছায়াসুনিবিড় ... ছোটো ছোটো গ্রামগুলি'কে বুঝেছিলেন, কোলরিজও তেমনি অনাড়ম্বর 'cottage'd vale এ শান্তির হদিস খুঁজে পেয়েছিলেন।
শান্তি
বলো আমায় সত্যি করে
ঘুচাও মনের ভ্রান্তি,
কোন পবিত্র দেশে পাবো
পারিবারিক শান্তি।
শান্তি সে তো খুবই ভালো
দূর নীলিমার কন্যা,
রাজপ্রাসাদের জাঁকজমকে
মোটেই তিনি র’ন না।
কোথাও যদি মুমূর্ষু হয়
ঘৃণা-ক্রোধের সুপ্তি,
পাখনা মেলে শান্তি ফুড়–ত-
কোন সুদূরে লুপ্তি!
পাতায় ঘেরা পর্ণকুটির
জুড়ায় তোমার মনটা?
ঐ খানেতে শান্তি বসে
শোনে কাঁসর ঘন্টা।
গেঁয়ো যদিও - তারে ঘিরে
কি অপরূপ দৃশ্য,
মহিমাময় সম্মান যে তার
বাধ্যগত শিষ্য;
আরও আছে ভালোবাসা
স্বাদুভয়ের পিতা,
অশ্র“তে তার হাসিমুখে
দুঃখ সাজায় চিতা;
চক্ষুমেলে ঘিরে আছে
অতীত দিনের স্মৃতি,
বুকভরা সব কোকিল কুহু
আনন্দময় গীতি।
দুই
‘আকাল, অগ্নি, ঘাতিনী’ শীর্ষক সংলাপ-ছড়াটি কোলরিজের ঋরৎব, ঋধসরহব, অহফ ঝষধঁমযঃবৎ নামক কবিতাটির অনুবাদ। কবিতাটির রচনাকাল ১৭৯৫-১৭৯৮ সন। প্রথম প্রকাশ গড়ৎহরহম চড়ংঃ-এ জানুয়ারি ০৮, ১৭৯৮ তারিখে। কোলরিজ একে একটি ডধৎ ঊপষড়মঁব বা যুদ্ধ-ভিত্তিক গ্রাম্য সংলাপ কবিতা বলে অভিহিত করেছেন।
এই কবিতার মধ্য দিয়ে কোলরিজ মূলত ‘উইলিয়াম পিট’কে আক্রমণ করেছেন তাঁর যুদ্ধ-নীতি এবং বিশেষ করে ফ্রান্সের লা-ভেন্দের (খধ ঠবহফল্কব) প্রতি-বিপ্লবীদের প্রতি তাঁর সমর্থনের জন্য। এখানে শেকসপিয়ারের ম্যাকবেথের অনুকরণেই ‘ডাকিনি’ চরিত্রগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে।
‘চার বর্ণে নাম লেখে’ - কথাটি দিয়ে স্বয়ং উইলিয়াম পিট (চরঃঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে।
‘এসেছি গো জ্বালিয়ে আইরিশ দেশটা’ - অগ্নির এই উক্তিটি ১৭৯৭ সনের মার্চ মাসে জেনারেল লেইক ও তাঁর সেনাবাহিনী কর্তৃক আলস্টারে ব্যাপক অগ্নি-সংযোগ ও ধ্বংসলীলার ইতিহাস বিবৃত করছে।
মূল রচনায় প্রতিটি চরিত্রই ডাকিনি অর্থাৎ স্ত্রীবাচক। অনুবাদে অগ্নি ও আকাল ডাক তথা পুরুষরূপ লাভ করেছে। মূল রচনাটি কবিতা হলেও অনুবাদে ছড়ার আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে।
বিদেশের পটভূমিতে রচিত হলেও আমাদের দেশ-কালের প্রেক্ষাপটেও রচনাটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষকরে বিভিন্ন স্বৈর-শাসকের যাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশ স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর উভয় কালেই একই রকম অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছে। কাকতালীয়ভাবে এটিও সত্য যে, বাংলার বিভীষিকা তিন স্বৈরশাসক আইয়ুব, ইয়াহিয়া, এরশাদ - এদের যে কারো নাম লিখতে চারটি করেই বাংলা বর্ণের দরকার পড়ে।
আকাল, অগ্নি, ঘাতিনী
(দৃশ্য: লা ভেন্দের নির্জন পথ। আকালকে ভূমিতে শায়িত দেখা যাচ্ছে। অগ্নি ও ঘাতিনীর প্রবেশ।)
আকাল : ওরে ভাই-ভগ্নী
ঘাতিনী আর অগ্নি
কে বলেছে আসতে?
ঘাতিনী : (অগ্নিকে) কানে কানে ফিশ ফিশ
বলে দেই আস্তে?
অগ্নি : না, না, মোটে না,
মুখ যেন ফোটে না!
ডাক আর ডাকিনি
শুনে ফেলে ততটা,
এক ডাক ফস করে
বলে ফেলে যতটা।
তারপর গুলজার
করে ফেলে নরকে,
বন্দ্ ডাকে, সভা করে
রাজপথ সড়কে।
না, না, মোটে না,
মুখ যেন ফোটে না!
একবার চুপচাপ
বলেছি কি নামটা,
হয়ে গেল কামটা!
পাপী-তাপী আত্মার
সে কি ভাই কাণ্ড,
হেসে যায়, নেচে যায়
ছুড়ে ফেলে ভাণ্ড!
তালে তালে করতালি
এলাহি কারবার,
দেয় নাকো পাত্তা
হুটোপাটি বারবার।
না, না মোটে না,
মুখ যেন ফোটে না! . . .
আকাল : বলে ফেলো ফিশফিশ
সন্ধ্যা-ভাষাতে,
কান পেতে পড়ে আছি
শুনবার আশাতে।
ঘাতিনী : চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের এইজন।
কে পাঠালে তোমাদের?
উভয়ে : সেইজন! সেইজন!
ঘাতিনী : চুপচাপ এসে তিনি
খুললেন বন্ধন,
আর নয় ক্রন্দন!
মুক্ত! মুক্ত!
আমি তাঁর ভক্ত
আজ তক খেয়েছি
দশ লাখ মানুষের রক্ত!
উভয়ে : কে তোমায় বললে
এমনটি করতে?
ঘাতিনী : সেইজন! সেইজন!
চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের যেইজন।
ছেড়ে দিয়ে মর্তে
বললেন, ‘কি রে!’
সবগুণ তাঁরই শুধু,
তাজ শোভে আজ তাঁর
উন্নত শিরে।
আকাল : সাব্বাস! সাব্বাস!
শোন ভাই ভগ্নী
যারা দিল রক্ত,
বউ বাচ্চা সব তাদের
আরও কমবখ্ত।
পেটে তাদের দানা নেই
কি যে খাবে জানা নেই
হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছে
বাঁচাটাই শক্ত!
যুদ্ধের ক্ষেত্রে
অপলক নেত্রে
দেখলাম স্রোতে বয়
রক্তের খাজনা,
কাকপাখি তাড়াতে
শিয়ালেরে হারাতে
হাড় দিয়ে বাজালাম
করোটির বাজনা।
তবু ভাই শব ছেড়ে
কেউ তারা গেল না,
একদম গেল না!
দেখ এই দৃশ্য ছেড়ে ঐ বিশ্ব
মেতেছি আর এক খেয়ালে,
করো দেখি অনুমান ওটা কার শব্দ
বাধা পেল দেয়ালে?
উভয়ে : বলে দাও কানে কানে
ও কিসের শব্দ,
কারে তুমি ঐখানে
করেছ গো জব্দ?
আকাল : শোন ভাই ভগ্নী
হোথা শিশু পান্না,
মৃত মার মাই চুষে
জুড়েছে যে কান্না।
এই হলো কারবার
বলে যাই আরবার
একজনা মেরেছি
দানা-পানি-অন্নে,
আরজনা মরছে
শুধু তার জন্যে!
উভয়ে : কে তোমায় বললে
এমনটি করতে?
আকাল : সেইজন! সেইজন!
চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের যেইজন।
ছেড়ে দিয়ে মর্তে
বললেন, ‘কি রে!’
সব গুণ তাঁরই শুধু,
তাজ শোভে আজ তাঁর
উন্নত শিরে।
অগ্নি : শোন ভাই ভগ্নী
আমি এই অগ্নি
এসেছি গো জ্বালিয়ে
আইরিশ দেশটা,
ঝোপ-ঝাড় শস্য
সব আজ ভষ্ম,
নেই হোথা কোনখানে
সবুজের রেশটা।
পা ফেলে লম্বা
(আমি কিসে কম বা!)
ধেয়ে গেছি যথাতথা
আগে পিছে ডাইনে,
বাম দিকে তাও গেছি
তুড়ি মারি আইনে!
আহা কি যে কৌতুক,
ঘর পোড়া গরু-ঘোড়া
ঘাম দিলো যৌতুক!
রাতদিন ধেই ধেই
ছুটে চলে
লকলকে জিভটা,
কেঁপে কেঁপে থত্থর
কেঁদে ওঠে
হতভাগা দ্বীপটা।
জ্বলে ওঠে চড়চড়
খাট আর চৌকি,
পুড়ে মরে দ্রোহী যত -
ঘাতিনী : মরে তার বউ কি?
অগ্নি : বউ মরে পুত মরে
মরে তার কন্যা,
ঘরে ঘরে ছুটে যাই
আগুনের বন্যা।
উভয়ে : কে তোমায় বললে
এমনটি করতে?
অগ্নি : সেইজন! সেইজন!
চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের যেইজন।
ছেড়ে দিয়ে মর্তে
বললেন, ‘কি রে!’
সব গুণ তাঁরই শুধু,
তাজ শোভে আজ তাঁর
উন্নত শিরে।
সকলে : হৈ, হৈ, হৈরে,
তাঁরই কথা কইরে,
ছেড়ে দিয়ে আমাদের
বললেন, ‘কি রে!’
এতো বড় দান তাঁর
কি দে’ রাখি মান তাঁর
কি যে’ দেবো ভেট তাঁর
কর-পদ-শিরে!
আকাল : ভাঁড়ারটা হয় যদি
এতোটুকু শূন্য,
মাথাগুলো লাভ করে
বুদ্ধির পুণ্য।
কুরে খাই আমি আজ
লাখ-কোটি জনতা,
ক্রোধ যেই পেকে হবে
প্রজাদের বনতা-
তক্ষুণি তারা তাঁর
টুঁটি চেপে ধরবে,
ঘাতিনী : দেহখানা ছিন্ন-
ভিন্ন করবে!
অগ্নি : হায় নিমকহারামি,
এতোকাল তাঁর বরে
ছিলি কত আরামি!
নব্বুই মাস তিনি
সবিশেষ যতেœ,
খাওয়ালেন, পরালেন,
সাজালেন রতেœ।
আজ তার প্রতিদান
বলে দিলি পষ্ট!
হায়, অষ্ট বছরের কষ্ট!
ঠিক আছে আজ থেকে
একা আমি রবো তাঁর শিষ্য,
থেকে যাবো অনুগত
যতোদিন টিকে যাই
আমি আর বিশ্ব!
যতোদিন টিকে যাই
আমি আর বিশ্ব!!
তিন
‘স্বাধীনতা’ শিরোনামে অনুবাদিত কবিতাটি কোলরিজ রচিত ঋৎধহপব: অহ ঙফব নামক কবিতার প্রথম স্তবকের অনুবাদ। কবিতাটি ১৭৯৮ সনে রচিত ও প্রকাশিত। উল্লেখ্য, একদা কোলরিজ, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, সাদে প্রমুখ অনেক ইংরেজ কবিই ফরাসি-বিপ্লব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফ্রান্স সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে কোলরিজের মোহভঙ্গ হয়। অতঃপর তিনি এই কবিতা লিখে ফ্রান্সের প্রতি তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করেন এবং সুইজারল্যান্ডের জনসাধারণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আজীবন ঝঢ়রৎরঃ ড়ভ ফরারহবংঃ ষরনবৎঃু-তে বিশ্বাসী কবি কোলরিজ এই কবিতার শেষ স্তবকে কেবল প্রকৃতির বুকেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত আছে বলে সিদ্ধান্তে উপনীত হন। কবিতাটির প্রথম স্তবকে কবি স্বাধীনতার প্রতি তাঁর প্রগাঢ় আগ্রহ ও অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। স্মরণ করা যেতে পারে, মাত্র অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে বাঙালি কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ও (১৮২৭-১৮৮৭) চিৎকার করে বলেছিলেন-
স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায়।
স্বাধীনতা
ঊর্ধ্বাকাশে মেঘের ভেলা
ভেসে ভেসে দিচ্ছো পাড়ি,
সাধ্য কি বা মানুষজনের
তোমার সাথে ধরবে আড়ি।
শোন তুমি সাগর দোলা,
ইচ্ছে মতো যাচ্ছো ভেসে,
চলার পথে চিরন্তেরই
আদেশ শুধু মানছো হেসে।
বন বনানী, শ্যামল শোভায়
কি অপরূপ দুলছো দেখি,
গভীর রাতেও পাখির গানে
হৃদয়টারে ভরছো এ কি!
কোথাও আবার মৃদু বাতাস
আপন মনে নাড়ছো ডাল,
মর্মরিয়ে তারই সাথে
উঠছে গানের মধুর তাল।
এমন বনেও দেখছি আবার
এলোমেলো পথের বাঁক,
কোথাও সমান, কোথাও উঁচু
কোথাও ঢালু, কোথাও পাঁক।
তবু আমি আঁধার রাতেও
এমন পথে চলছি হেঁটে,
যে পথেতে বনবাসীও
ভুলেও কভু যায়নি মোটে।
চলছি হেঁটে স্বাধীন ভাবে
আসছে ভেসে ফুলের ঘ্রাণ,
স্পর্শে তার বুক ভরেছে
জাগছে হৃদয় হাসছে প্রাণ।
শোন এবার সাগর দোলা
শোন উঁচু বনভূমি,
আকাশ সূর্য, সব শুনে যাও
মেঘের ভেলা, শোন তুমি।
তোমরা যারা বিশ্ব মাঝে
টিকে আছ স্বাধীন প্রাণ,
স্মরণ রেখো সাক্ষীরূপে
কতটুকু আমার দান।
কেমন ভালোবাসি আমি
পূজি কেমন স্বাধীনতা,
কেমন করে যাচি তারই
স্বর্গদীপ্ত অমরতা।
চার
‘প্রেম’ শিরোনামে অনুবাদিত কবিতাটি কোলরিজের কবিতা খড়াব এর আংশিক অনুবাদ। কবিতাটি ১৭৯৯ সনে রচিত ও প্রকাশিত। মোট ২৪টি স্তবকে রচিত এই কবিতার প্রথম ছয় স্তবক এবং শেষের দিক থেকে শুধু ২০তম স্তবক এখানে অনুবাদ করা হয়েছে।
কবিতাটিতে কথক একজন প্রেমিক। তিনি প্রাচীন ধ্বংসলীলার মাঝে দাঁড়িয়ে এক নাইটের শিভালরিক প্রেমের করুণ গাঁথা শুনিয়ে তাঁর প্রেমিকা জেনেভিভের মন জয় করতে সমর্থ হয়েছেন। কবিতাটির ৭ম থেকে ১৯তম স্তবক পর্যন্ত এই শিভালরিক প্রেমকাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ২০তম স্তবকে জেনেভিভের মনের উপর এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। বর্তমান অনুবাদখানিতে এই নাইটের প্রেমকাহিনীর বিশদ বর্ণনা বাদ রেখে শুধু তাঁর ইংগিত ও অভিঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে।
কুয়াশার দেশ ইংল্যান্ডে চাঁদনী রাতের বিশেষ কোন জৌলুস নেই। তবু ‘প্রেম’ কবিতায় কবি জ্যোৎস্নার কথা বলেছেন। জ্যোৎস্না, করুণ সংগীত, লাজরাঙা মুখ, নির্জনে প্রণয় - একযোগে এতোগুলো বিষয়ের উল্লেখ কতটুকু ইউরোপীয়, আর কতটুকু বাংলাদেশীয় তথা ভারতীয়, তা ভেবে দেখবার মতো।
প্রেম
ভাবনা আবেগ আনন্দেরা
দোলায় সকল মানব দেহ,
ভালবাসার কর্মী ওরা
জ্বালায় পূত অগ্নি-স্নেহ।
প্রায়ই দিবাস্বপ্নে আমি
জাবর কাটি সুখের দিন,
দেখি যেন গিরিপথে
প্রাচীন ধ্বংসলীলার চিন।
চাঁদের আলো চুপিসারে
পড়ছে যেন সাঁঝের গায়,
পাশেই প্রিয়া জেনেভিভে
আনন্দে মন উছলায়!
দেহখানা এলিয়ে দিয়ে
যোদ্ধা বীরের মূর্তিতে,
শুনছে আমার গীতি-গাঁথা
সন্ধ্যালোকের ফুর্তিতে।
দুঃখ কিছু হয়তো আছে
কোথাও বা তার হৃদয়তলে,
বাসছে ভাল তাই সে আমায়
ভাসছে যখন চোখের জলে।
গাইছি আমি ইমন রাগে
পুরাকালের করুণ কথা,
ভগ্নস্তূপের মাঝে সে সব
ভাঙছে খানিক নীরবতা।
গানের কথায় কাঁদছে প্রিয়া
করুণা আর তৃপ্তিতে,
লাজরাঙা তার মুখ উজালা
ভালবাসার দীপ্তিতে!
উপসংহার:
নিঃসন্দেহে কোলরিজ একজন সফল শিল্পী ও অত্যুজ্জ্বল কবি। বর্তমান পরিসরে তাঁর কবিকৃতি বা শিল্পীসত্তাকে তুলে ধরার প্রয়াস নেয়া হয়নি। তাঁর কাব্যদর্শন, রোমান্টিকতার স্বরূপ কিংবা তাঁর প্রিয় অতিপ্রাকৃত ভুবনে অনায়াস বিচরণ কোনটিই বর্তমান অনুবাদ ও আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। কোলরিজের শ্রেষ্ঠ রচনাসমূহকেও এ পর্যায়ে অনুবাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। কোলরিজ নিজেও বিশ্বাস করতেন খাঁটি কবিতার কখনো অনুবাদ হয় না। তাই সে চেষ্টাও এখানে করা হয়নি। এখানে শুধু সেই বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, যেখানে কোলরিজের ভাবনার সাথে আমাদের স্বদেশবাসীর ভাবনা সমান্তরালে প্রবহমান। অর্থাৎ এ পর্যায়ে আমরা বিদেশী কোলরিজের কবিতার ভেতর দিয়ে আমাদের স্বদেশী আবেগ ও অভিঘাতকে স্পর্শ করতে পেরেছি; তাঁর কবিতায় আমাদের সুখ-শান্তি, প্রেম-প্রীতি, স্বদেশ-স্বাধীনতা-সংগ্রাম ইত্যাদি বোধ ও বিবেচনার এক বাঙ্ময়চিত্র প্রত্যক্ষ করেছি। তাই, এই বিশেষ অর্থে, কোলরিজ আমাদেরও কবি।


0 comments:
Post a Comment