July 24, 2008

পরাজিত বাংলাদেশ

পরাজিত বাংলাদেশ
সনৎকুমার সাহা


একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল এক অবাক করা ঘটনা। ‘জ্বলেপুড়ে ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়,’এই কথাটি গণজাগরণের বিপুল বিস্ফোরণে এক সফল পরিণতি পায়। দেশের মানুষ জমাট বাঁধা অভ্রংলিহ ঐক্য গড়ে তোলে। লক্ষ্য তাদের মানুষের মুক্তি। লক্ষ্য স্বাধীনতা অসম লড়াই ছিল তাদের সামনে। অস্ত্রে বর্মে সুসজ্জিত-সুদক্ষ পাকিস্তানের আগ্রাসী সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রক্ষমতার ধারক ও রক্ষক তারা। তাই শাসন ব্যবস্থায় তারাই সর্বেসর্বা। আর সবার থেকে আলাদা। সব চেয়ে যতেœর। সব চেয়ে গর্বের। সুগঠিত, সুসংহত। তাদের বীরত্ব-কথা অবাধ্য প্রজার হৃৎকম্প জাগায়। স্বভাবে-প্রশিক্ষণে তারা হিংস্র ও নির্মম। যে কোন বিরোধিতা গুঁড়িয়ে দিতে সদাই প্রস্তুত এবং তাদের সতর্ক দৃষ্টি জালে বাঁধা থাকে দেশের নিরস্ত্র-সব মানুষ। সেনাবাহিনীই পাকিস্তানের ক্ষমতার কেন্দ্রে। তাদের দাপট গোটা রাষ্ট্রে শান্তি-শৃংখলার ভিত্তি।
সামরিক একনায়কতন্ত্রের প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্ন শাসনে দীর্ঘদিন সহযোগিতা করেছেন স্বার্থান্বেষী, সুবিধাবাদী, সম্পন্ন-ভদ্রজনদের অনেকেই। সাধারণ মানুষকেই ধোকা দেবার জন্যে সহজ উপাই ছিল ধর্মান্ধতার জিগির ও সাম্প্রদায়িকতায় উস্কানী অধিকাংশ মানুষ যেখানে বুদ্ধির বিচারে অনভ্যস্ত, এবং ধর্মীয় আবেগের কাণ্ডজ্ঞানহীন মর্যাদা যেখানে প্রশ্নাতীত, সেখানে সরল বিশ্বাসে ফাঁদে তাদের আটকে রেখে সেপাই রাজত্বের শাসন-শোষণ নির্বিবাদ করা সহজ হয়। প্রাচীন বিধিনিষেধের আবর্জনা পথ রোধ করে দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু সেইটিই মূল্য পায় চৈতন্যবিকারে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি হিশাবে। জাতীয় ঐক্য মানে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য: উন্নয়ন ও মুক্তির আকাঙ্খায় নয়, কল্পিত স্বর্গরাজ্যে পারলৌকিক সুখ স্বপ্নের আশায়। ইহজাগতিক দুঃখ-পীড়িত মানুষকে যদি তাতে ভুলিয়ে রাখা যায়, তবে ধর্ম-বিধানে মেকি ঐক্যের জিগিরে তারা সাড়া দেয়, শান্ত থেকে সেনা শাসনের অন্যায় দাপট মেনে চলে।
এ-ও সত্য, পাকিস্তান নামের উদ্ভট রাষ্ট্রটির পরস্পর বিচ্ছিন্ন দুই অংশকে এক প্রশাসনের কর্তৃত্বাধীন রাখা অন্য কোনভাবে সহজ ছিল না। প্রাকৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিবেশে তাদের ভিতর মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেও বিভিন্নতা প্রকট। ভাষার ব্যবধানে তারা পরস্পর পরস্পরের কাছে বিদেশি। সহজ ও সহজাত ঐক্য-চেতনা গড়ে তোলা ছিল সুদূরপরাহত। গায়ের জোরই, অতএব, ছিল মূল অবলম্বন। এবং সেই গায়ের জোরকে আড়াল করার জন্যে প্রয়োজন ছিল ধর্মবিশ্বাস নির্ভর ছলচাতুরির। মানুষের মনের বিকাশ প্রতিরোধে এর চেয়ে সর্বনাশা যোগ-সাজস কল্পনা করা যায় না।
পরিণাম কিন্তু মঙ্গলের চেয়ে অমঙ্গলই বয়ে এনেছে বেশি। রাজনৈতিক ক্ষমতা মৌরসি পাট্টায় দখলে রাখতে চাওয়ার সঙ্গে যোগ হয় আর্থসামাজিক ক্ষমতা কব্জা করার লোভ। তার জন্যে প্রয়োজন দেশের সব সম্পদের ওপর কর্তৃত্বের অধিকার। তার অর্থ দাঁড়ায়, জায়গা-জমি-প্রাকৃতিক সম্পদ সব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা; সেই সঙ্গে বিনিয়োগে ও নতুন সম্পদ সৃষ্টিতেও ওই নিয়ন্ত্রণ প্রসারিত করা। ফল দাঁড়াই এই, সমাজে উদ্বৃত্ত যা সৃষ্টি হয়, তার সিংহভাগ চলে যায় এই ক্ষমতাচক্রের আগ্রাসী মুখ-গহ্বরে। ক্ষমতা চক্রও কিছুটা বিস্তৃত হয়। তার ক্রিয়াকর্মের জটাজাল সবদিকে ছড়ায়। এই সব মিলিয়ে কায়েমিস্বার্থের প্রতাপশালী চক্র আরো শক্ত পোক্ত হয়ে ওঠে। কেন্দ্রে তার দখলে থাকে অস্ত্রধারী সেনাপতিদের, পার্শ্বচর জোটে ভূম্যধিকারীরা, নব্যধনী লুটেরা কারবারিরা, আর ক্ষমতার প্রসাদভিক্ষু উগ্র আমলারা । সবার লক্ষ্য উদ্বৃত্ত শোষণ। গণ-মানুষের সহায়-সম্বল বাড়ানো নয়, তাদের চিরস্থায়ী দাসত্বে বেঁধে রাখা। মগজে গাঁথা থাকে মধ্যযুগীয় ভোগদখলের নীল-নকশা। আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোয় তারই কার্যকর রূপায়ণ ঘটে চলে অবিরাম। সাধারণ মানুষের আপনা থেকে তার সঙ্গে একাত্ম হবার কোন কারণ ঘটে না। কাল্পনিক শত্র“ খাড়া করে সাম্প্রদায়িকতার জিগির তুলে জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে তাদের তীব্র উত্তেজনায় মাতিয়ে রাখা যায় মাত্র। তাতে তাদের উপকার এক কণাও হয় না। আখেরে সর্বনাশই থাকে ললাট লিখন। অন্তত ইতিহাসের উদাহরণ এই রকমই।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটি যেভাবে আত্মপ্রকাশ করে তাতে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এছাড়া বোধহয় অন্য কোন উপাই ছিল না। শুধু কল্পনায় স্বপ্ন দেখে কোন আধুনিক রাষ্ট্র চালানো যায় না। তার জন্য চাই মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। তা শুধু প্রশাসনিক ব্যাপারে নয়, নাগরিক সমাজের বহুবিধ কর্মকাণ্ডেও। যেমন শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, ব্যবসা-বাণিজ্যে, সাংস্কৃতিক উদ্যোগে, ইত্যাদি। এ সবের কোনটিরই গোড়া মজবুত ছিল না। অথচ দৈনন্দিন জীবনে তাদের প্রত্যেকটি প্রতি নিয়ত কিছু করার দাবি করে আসছিল। এমন কি দলীয় রাজনীতির কাঠামোও ছিল দুর্বল। শুধুই আপ্তবাক্য উচ্চারণে দল চলে না। এবং রাজনৈতিক উচ্চাশা যার যেমনই থাক, নৈর্ব্যক্তিক লক্ষ্য ও নিয়মের ভেতর দিয়ে না এগোলে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের পছন্দ-অপছন্দ একাকার হয়ে যাবার আশংকা জাগে। তার চূড়ান্ত পরিণাম কখনো ভাল হয় না। ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ রাষ্ট্রে ও সমাজে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ফুটে ওঠে। একনায়কের পূজাবিধি রচিত হয়ে চলে। তলায় ভয়াবহ শূন্যতাকেই তা নিশ্চিত চিনিয়ে দেয়।
কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র ত নিষ্ক্রিয় থাকেনা। থাকা সম্ভব নয়। এই করার জায়গাটা দখল করে সুযোগসন্ধানী সুবিধাবাদী মহল। তাতে যার যত গায়ের জোর, তার তত দাপট। ‘জোর যার মুল্লুক তার’Ñ এই আদিকল্পের অনুসরণের উপযোগী থাকে বাস্তব পরিবেশ। অথবা সেই পরিবেশে দেশকে ঠেলে দেবার চক্রান্ত উত্রে যায় প্রায় বিনা বাধায়। কারণ কায়েমিস্বার্থের প্রভাব বলয় প্রশ্রয় দিয়ে চলে ওই চক্রান্তকে। জনগণের নাভিশ্বাস উঠলেও তাতেই তার ষোলকলা পূর্ণ হবার আশা। দেশ হয়ত রসাতলে যেতে বসে। কিন্তু সেইটিই তার আরো জাঁকিয়ে বসায় সহায় হয়। এই অশুভ তৎপরতা ঠেকাতে পারে, এমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি গড়ে ওঠে না। আসলে গড়ে উঠতে দেওয়া হয় না। শূন্যতার ওজর তুলে, এবং শূন্যতাকেই পুঁজি করে সেনাপতি-আমলা-ব্যবসায়ী-ভূস্বামী-চক্র নির্বিবাদে রাজত্ব করার সবরকম ব্যবস্থা নেয়। রাষ্ট্র বা সমাজ এগোয় না। বরং বহু শতাব্দী পিছু হটে।
পাকিস্তানের ওই ক্ষমতাচক্র গড়ে উঠেছিল একচেটিয়া ভাবে পশ্চিম খণ্ডে। পেছনে ছিল ইতিহাসের বেদিমূলে উৎসর্গ করা অসহায় এক সিদ্ধান্তের কুটিল প্ররোচনা। পূর্বাঞ্চলের মানুষ ছিল একক প্রাধান্যে কৃষি নির্ভর। প্রভাবশালী ভদ্রজনদের বৃহদংশ দেশভাগের কারণে বাস্তুত্যাগী। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায়, প্রশাসনের উচ্চপদে বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা-বাণিজ্যে তাদের প্রতিনিধিত্বে দেখা দেয় ভয়াবহ স্বল্পতা, সেনাবাহিনীতে যোগ দেবার ব্যাপারে বাঙালিদের উৎসাহ ছিল বরাবরই ক্ষীণ। আর মানুষ কৃষিকাজে ব্যস্ত থাকলেও কেউ সামন্ত প্রভু হয়ে উঠবে, এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে খুব কমই। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুফলভোগীরা বিশ্রামভোগী ভদ্রলোক যতটা হয়েছিলেন, ডাকসাইটে সামন্তরাজ ততটা হননি। তাঁদেরও বেশির ভাগ দেশ ছাড়া। পরে জমিদারি ব্যবস্থার অবসানে অবশিষ্টদের অবস্থা ঠুঁঠো জগন্নাথ। সব মিলিয়ে পাকিস্তানে ক্ষমতার নতুন কেন্দ্রীভবনে পূর্বখণ্ডের উপস্থিতি প্রায় কিছুই চোখে পড়ে না। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে উচ্চকোটির মানুষদের প্রভাব-প্রতিপত্তি শুধু যে অপরিবর্তিত থাকে, তাই নয়, নতুন রাষ্ট্রের চাহিদা পূরণে তা বহুগুণ বেড়ে যায়। সেনাবাহিনীর সম্মানিত পদ প্রায় সবই চলে যায় তাদের দখলে। তা ছাড়া পারিবারিক ঐতিহ্যে সেনাবাহিনীতে নিয়মিত যোগ দেবার রেওয়াজ গড়ে উঠেছিল সেখানে ব্রিটিশ আমলেই। পাকিস্তানে তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকার পাশাপাশি আরো জোরদার হয়। তা যেমন শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত সব ধরনের পরিবারেই তরুণদের কর্মসংস্থানের একটা সহজ পথ খোলা রাখে, তেমনি সেনাবাহিনীর কায়েমী স্বার্থের সঙ্গে গণমানুষের রুটি-রোজগারের স্বার্থেরও একটা অদৃশ্য যোগসূত্র রচিত হয়। যদিও তা সর্বাংশে অপচয়প্রবণ ও সমাজে পছন্দ-বিকৃতির নির্মম উদাহরণ। সে যাই হোক উত্তরাধিকার সূত্রে ও সুযোগসন্ধানী তৎপরতায় সেনাবাহিনীই পাকিস্তানে সবচেয়ে অক্ষত ও সবচেয়ে মজবুত প্রতিষ্ঠান হিশাবে আত্মপ্রকাশ করে একেবারে ক্ষমতার খাসমহলে ঢুকে পড়ে। অচিরেই তা মাথায় চড়ে বসে। অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তার আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত হয়। কিন্তু যেহেতু উদ্বৃত্ত শোষণে অংশীদার হবার সহজ সুযোগ তাদের সামনেও খোলা থাকে, তাই তারা সংঘাতের পথে যায় না। দলে বলে মচ্ছবে যোগ দেয়। এরা প্রায় সবই পশ্চিম খণ্ডের। প্রাথমিক শূন্যতা নিয়ে, আগেই বলেছি, পূর্বাঞ্চলের যাত্রা শুরু। সেনা-কর্তৃত্ব ঘিরে ক্ষমতার এই যে স্থূল বিন্যাস, তার যাদুচক্রের গর্ভগৃহে ঢোকার কোন পথই তার জন্যে খোলা থাকে না। যারা জাঁকিয়ে বসে থাকে, তারা কেউই এক ইঞ্চি জায়গা ছাড়ে না। উল্টো আদিম লালসায় শোষণের সব উপায় কাজে লাগায়। তার অনিবার্য শিকারে পরিণত হয় পূর্ব-বাংলার আপামর জনসাধারণ। রাষ্ট্রীয় অহংকারের ডংকা বাজাতে তাদের প্রয়োজন পড়ে ঠিকই। সে জন্য দ্বিজাতি-তত্ত্বের পৌনঃপুনিক পাঠে মগজধোলাই চলে অবিরাম। কিন্তু নতুন সৃষ্ট সম্পদের ভাগ পায় তারা সামান্যই যদিও তাদের নিজস্ব সম্পদ ক্ষমতাবানদের প্রশাসনিক আগ্রাসনে পাচার হয়ে যেতে থাকে পশ্চিম ভূখণ্ডে। পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের অবস্থার যে কোন উন্নতি হয়, তা নয়। তবে বহুদিনের সামন্ততান্ত্রিক অভ্যাসে প্রভুশক্তির সম্পদ-ছটায় তারাও আমোদিত হয়। রাষ্ট্রব্যবস্থা তখনও তাদের মনে কোন সংশয় জাগায় না। সংশয় অবশ্য জাগে আরো অনেক পরে। অভিজ্ঞতার নরকে অবিরাম দহনই তাকে জাগায় তাতে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আজকের পাকিস্তানকেও। তার সুমীমাংসিত সমাধান মিলেছে, এবং সেই সমাধানের সূত্র ধরে দেশটি নিরাপদে অগ্রসর হবে, এমনটি এখনও নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যদিকে নিজেদের গৌরবময়, কিন্তু নিষ্ফল অভিযানের পুঞ্জীভূত হতাশা আমাদের শেখায়, অর্জন ও বিসর্জন একে অন্যের পিছু-পিছু ছোটে। কখনো বা তাদের জড়াজড়িতে দিকচিহ্ন অস্পষ্ট। এই সব পেরিয়ে অগ্রগতি যদি ঘটেও, তবে তা সরলরেখায় কদাচিৎ। এবং অনুচ্চারিত পশ্চাৎমুখী অভ্যাসের পিছুটানে অনেক অগ্রযাত্রাই বিপর্যস্ত। বিবর্ণ বাস্তবতায় তার রেশটুকুই যা ধরা পড়ে। তার পুচ্ছরেখা যদি মিলিয়ে না যায়, তবে সেইটুকুই সান্ত্বনা। তার দিকে তাকিয়েই অগ্রগতির স্বপ্ন দেখা। জাতীয় জীবনে ওই স্বপ্ন যদি গণমানুষের মনে সংহত আকার পায়, তবে সেটাও অগ্রগতি।
পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা কাঠামোর যে ছক শাসকচক্রের চতুর কৌশলে শিলীভূত আকার পায়, তাতে পূর্ববাংলার সমূহ মানুষের প্রতিনিধিত্বের কোন সুযোগই অবশিষ্ট থাকে না। যাঁরা তার ছত্রছায়ায় জড়ো হন, তাঁরা নিতান্তই পার্শ্বচর- স্বার্থবাহী ক্ষমতার দখলদারদের অনুগত প্রসাদভিখারি দাসানুদাস। উপগ্রহের পরনির্ভরতায় জাঁক দেখান ছাড়া তাঁদের কিছুই জোটে না। যদিও সেইটিই তাঁদের অনেকের কাছে মহার্ঘ্য সম্মান। হীনম্মন্যতার আস্ফালনে তাতেই তাঁদের আত্মশ্লাঘা। এ অঞ্চলের মানুষের তা কোন উপকারে আসে না। উপকারের কোন সম্ভাবনাও তাতে থাকে না। উলটো তাদের নিঃস্বকরণেই তার সহায়ক ভুমিকা। পাকিস্তানি শাসকচক্রের আচরণ ছিল এখানে উপনিবেশিক প্রভুসুলভ। মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণায় তাদের সেইটিই অবশ্য স্বাভাবিক। স্থানীয় অনুচরদের কাজ ছিল ওই প্রভুস্বার্থের তদারকি করা, আর তারই বিনিময়ে আপন আপন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও নাম-ডাক কেনা। নিজ বাসভূমে তারা পরগাছা। তাতেই তাদের তর্জন-গর্জন। তাতেই তাদের মেদ সঞ্চয়। এদিকে সাধারণ মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি যায়। স্থানীয় সম্পদের লুণ্ঠন ও পাচার ক্রমাগত বাড়ে। বাড়ে রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধের আওতাতেই। পাকিস্তানের বৈদেশিকমুদ্রা আয়ের বৃহত্তর উৎস ছিল এই পুব বাংলা। পাট তখন সোনালি আঁশ। এই পাট ও পাট-পণ্য ছাড়া আরো রপতানি হতো চা, চামড়া, কাগজ, কারুপণ্য এই সব। সিংহভাগ রপতানি আয় অবশ্য পাট থেকে। তা ছিল একশভাগ এই বাংলার সামগ্রী। আরগুলোরও বেশির ভাগ যেত এখান থেকে। কিন্তু আমাদের উৎপাদকদের ঠকানো হতো টাকার বৈদেশিক মুদ্রামান বাড়িয়ে রেখে, যাতে তাদের হাতে এসে পৌঁছুত কম টাকা। একই সঙ্গে রপতানিকারকরা পেত বোনাস। তারা প্রায় সবাই পশ্চিম পাকিস্তানি। বৈদেশিক মুদ্রার নীট সঞ্চয় গড়ে উঠতো কেন্দ্রীয়ভাবে ওই অংশের ভাণ্ডারে। উৎপাদনে ও ব্যবসা বাণিজ্যে তার ব্যবহারও হতো প্রধানত ওখানে। কারণ উদ্যোক্তারা অধিকাংশ অবাঙালি। এবং ব্যবসায় ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান প্রায় সবই তাদের হাতে। এছাড়া পূর্ববাংলার মানুষের যা কিছু সঞ্চয়, তার বড় অংশও পাচার হতো ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে। বড় বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক গড়ে উঠেছিল পশ্চিম পাকিস্তানি মালিকানায়। পূর্ব-বাংলায় বিনিয়োগের জন্য পড়ে থাকত সামান্যই। এই লুণ্ঠন ও পাচার সবটাই চলতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্রয়ে। সেখানে পশ্চিম পাকিস্তানি সমর-নায়কদের সঙ্গে হাত মেলায় অর্থনীতির দখলদাররা। আবার এমনও হয়, সেনাপতিদের পরিবার- পরিজনের ভেতরেই গজাতে থাকে নতুন নতুন উদ্যোক্তা। লুটের ভাগ আর বাইরে যায় না। ‘চোরে-চোরে মাসতুত ভাই’ আরো বৃহৎ ব্যঞ্জনা পায়। সেনাকর্তাদের মামাত-পিসতুত-খুড়তুত-মাসতুতর দঙ্গল ঘাড়ের ওপর চেপে বসে জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণভার হাতে নেয়। তাদের তুষ্ট রেখে উৎসাহী স্বার্থান্বেষীদের তুষ্ট থাকা। আর সব কিছু রসাতলে গেলেও তাদের ডুগডুগি বাজানো চলতে থাকে অবিরাম। আইয়ুব খান-তনয় গত্তহর আইয়ুবের শিল্পপতি হিশাবে উত্থান ঘটে এই ভাবেই। উন্নয়ন কাণ্ডে ‘ব্যাকওয়াশ এফেক্ট’ বা পেছনের সব কিছু চেটেপুটে খেয়ে নেবার তত্ত্ব একটা খাড়া করেছিলেন গানার মীরডাল। পাকিস্তান হয়ে ওঠে তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ। অবশ্য শুধু পাকিস্তান নয় সাম্প্রতিক বিশ্বের ঘটনাবলী নির্দেশ করে, যেখানেই প্রত্যক্ষ বা প্রচ্ছন্ন সমরশাসন, সেখানেই এমন ক্ষমতার ব্যভিচার। তার সর্বনাশা ছোবল সবটুকুই গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। ঘরের পাশে মিয়ানমার [বর্মা] আজ তার সবচেয়ে ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তর উপনিবেশিক অভিজ্ঞতায় এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে আরো অনেক আফ্রো-এশিয়ান ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশ। ফল কোথাও ভাল হয়নি। বিষের নিরাময় সহজ হয়না কোনখানেই। আমরাও তা হাড়ে হাড়ে টের পাই।
সহায় সম্বল নেই-যা ছিল, তাও শাসনে-শোষণে নিঃশেষ,- ক্ষমতার যাদুবৃত্তে ঢোকার পথও কোন খোলা নেই, এমন অবস্থায় এ বাংলার মানুষ তাদের গুরুত্ব বোঝাবার কথা ভাবতে পারত কেবলমাত্র অবাধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রূপায়ণে। জনসংখ্যার ওজন দিয়ে আর সব ক্ষতির বিরুদ্ধে তাহলে দাঁড়ানো যায়। এবং তা জনগণের অংশ গ্রহণে তাদের রায়ের ভিত্তিতে। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বিধি নিষেধের কড়াকড়িতে নয়, দখলদারি রাজত্বে রাজশক্তির খেয়াল-খুশিতে অথবা স্বার্থবাহী তৎপরতাতেও নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তাদের ইচ্ছার ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে তবেই তারা পারে রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে ও সামাজিক উদ্যোগে অর্থবহ ভূমিকা রাখতে। রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রভূমিতে তাদের উপস্থিতি তবে নিশ্চিত করা যায়, তাদের দাবি উপেক্ষা করাও আর সহজ হয় না। কারণ, প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে তাদের অংশ গ্রহণ ওই ব্যবস্থার আওতাতে মেনে নিতে হয়। রাষ্ট্রের ও সমাজের ক্রিয়াকলাপে এক বিপুল জনপিণ্ড না থাকে তারা তাহলে সক্ষম কর্তৃত্বে চলে আসতে পারে।
এই সচেতনতা শুরু থেকেই তাদের ছিল। কোন অবস্থাতেই তারা নতজানু হয়ে কায়েমি স্বার্থের তৎপরতায় পূর্ণ সহযোগী হয়ে ওঠেনি। বরং প্রতি পদে চক্রান্তের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সুযোগে পেলেই নিজেদের প্রকৃত শক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছে। মহান ভাষা-আন্দালনে যেমন, তেমনই চুয়ান্নর প্রাদেশিক নির্বাচনে। এবং পরে প্রতিটি সরকারি নিবর্তনমূলক জবরদস্তির বিরোধিতায়। সত্য কথা, তা সব সময় একশভাগ জনসমর্থন পায়নি। রাজশক্তির বলে বলীয়ান হয়ে যারা লেজ নাড়ে, তারা সব-সময়েই থাকে, এবং গণমানসে বহু বিভক্তির ফাটল তৈরি করে। উদ্দেশ্য ও উপায় এক বিন্দুতে মেলে না। বিভ্রান্তি বাড়ে। সুযোগসন্ধানীদের ইতর কারসাজি জনসংহতি গড়ে তোলায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবু গণতন্ত্রের আকাক্সক্ষা হাওয়ায় মিলিয়ে যায় না। গরিব দুঃখী দুর্বল মানুষের মনেও তার অনুরণন বেজে চলে। বোধ হয় সেখানেই বেশি।
উনিশ’শ ছেষট্টিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ছয় দফা আন্দোলনের রূপরেখা রচিত হয়। এই বস্তাবতার প্রেক্ষাপটে। বঞ্চনার তিক্তস্বাদ তাদের দাবিতে স্পষ্টতা আনে। বার বার প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের আর ক্ষমতাচক্রের নষ্টামির শিকার হবার অভিজ্ঞতা তাদের যে সর্তক, সাহসী ও মারমুখো করে, তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তাতে থাকে গণমানুষের নাড়ির স্পন্দন, থাকে তাদের অব্যক্ত যন্ত্রণা ও প্রতিবাদের মিশ্রণ। ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোন কর্তাজ্ঞা গণতন্ত্র নয়, তারা চেয়েছিল প্রকৃত যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারল শাসনব্যবস্থা, যাতে দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র বাদে অন্য সব বিষয়, প্রস্তাব করা হয়, থাকবে স্টেট, বা প্রদেশগুলোর নিজ নিজ এক্তিয়ার। সামরিক একনায়কতন্ত্রে ও বুনিয়াদি গণতন্ত্রের সোনার পাথরবাটির ধাপ্পাবাজিতে যে লুটপাট ও বৈষম্য আইনের রক্ষাকবচে অবাধ প্রশ্রয় পায়, এবং তার ফলে যে অবিশ্বাস দানা বাঁধে, তাদের শিকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলতে হলে এ ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলনা। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এভাবে ঢেলে সাজাতে পারলে তবেই এ বাংলার শোষণ ও সম্পদ পাচার বন্ধ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেবার কথা ভাবা যেত। ছয়-দফার প্রেরণাতেই ঊনসত্তরে শুরু হয় ছাত্রদের এগার দফা আন্দোলন। ওদিকে শাসকচক্র জনগণকে বিভ্রান্ত করতে মিথ্যার আশ্রয় নিতেও পিছপা হয় না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ এনে তাঁকে তারা নিষ্ক্রিয় করে ফেলতে চায়। যদিও তার ফল হয় বিপরীত। তাদের মিথ্যাচার ধরে ফেলে সকলেই। মিথ্যা মামলা ফেঁসে যায়। মহানায়কের মহিমা নিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। জনগণের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও নির্যাতনমূলক এক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি তাদের বিরাগ বুঝি পূর্ণতা পায়। ওই ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার লক্ষে একাত্মবোধ একটা তৈরি হয়। তা এ বাংলার সব স্তরে সব মানুষের ভেতরে।
আমাদের মুক্তি সংগ্রামের এই ছিল পটভূমি। পশ্চিম পাকিস্তানি সেপাই ভূস্বামী-ধনপতি আমলার যে স্বার্থচক্র রাষ্ট্রক্ষমতা কব্জা করে লুণ্ঠনে-শোষণে জনগণকে জেরবার করে চলে, তাদের হাত থেকে এই মুক্তির সংগ্রাম। যখন তা সাঁড়াশির মত টুঁটি চিপে ধরে, এবং পশ্চিম পাকিস্তানে গণমানসে তার বিরুদ্ধে কোন প্রতিক্রিয়া দানা বাঁধে না, তখন সেই শক্ত মুঠি আলগা করে বেরিয়ে আসতে ডাক দিতে হয় স্বাধীনতারও। এই অঞ্চলের স্বাধীনতার জন্যে সংগ্রাম গৌরবময় প্রাচীন জনভূমিতে বাংলাদেশ নামে নতুন এক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম। কোন উচ্চাভিলাষী দ্বিগি¦জয়ী নায়কের ইচ্ছাপূরণের উদ্যোগে নয়, আধুনিক জীবনভাবনায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সব মানুষের অধিকার ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত রাখার সামূহিক আকাক্সক্ষার প্রেরণা থেকে।
বিষয়টি ধরা পড়ে একাত্তরের সাতই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণে। তিনি বলেন,-‘তেইশ বছরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। তেইশ বছরের ইতিহাস মুমূর্ষ নরনারীর আর্তনাদের ইতিহাস।’ বলেন, ‘- অন্ত্র কিনেছি বহিঃশত্র“র আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী নিরস্ত্র মানুষের বিরুদ্ধে -তার বুকের ওপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানে সংখ্যাগুরু-আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে।’-আর তাঁর স্পষ্ট উচ্চারণ,-‘ আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমার এদেশের মানুষের অধিকার চাই। ’ এবং সব শেষে দৃপ্ত ঘোষণা, ‘-এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম!’ জোরালো ভাষায় তিনি চিনিয়ে দেন, কাদের বিরুদ্ধে জনগণের লড়াই-যারা মার্শাল ল দিয়ে মানুষের অধিকার হরণ করে, আর নিরস্ত্র মানুষের বুকে গুলি করে তাদের প্রতিবাদ স্তদ্ধ করে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে। এদেশের মানুষের পূর্ণ মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যেই তাঁর সারা জীবনের সংগ্রাম। সেপাই রাজত্বের অবসানে অবাধ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকর হলে তবেই তার ফলপ্রসূ রূপায়ণ সম্ভব। এবং সেইটিই মানুষের মুক্তির পথ। সংগ্রাম তাই সেই মুক্তির লক্ষ্যে। এবং পশ্চিম পাকিস্তান যেহেতু তার সঙ্গে একাত্ম নয়, তাই চাই, ওই মুক্তির লক্ষ্যেই তাদের থেকে বিস্থিন্নতা। চাই স্বাধীনতা।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল, অতএব, মুক্তির স্বপ্নকল্পনা সামনে রেখে এক গণঅভ্যুত্থান। তার দুঃখ-কষ্ট-মহিমা সব কিছু একত্রে মূর্ত হয়েছিল পরিপূর্ণভাবে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিকথার উন্মোচনে। কিন্তু তাতে ছিল গণমানুষের ভেতর থেকে গণচেতনার ব্যক্তিময় রূপের আত্মপ্রকাশ। কোন আলাদা সত্তা তার ছিল না। এই আলাদা সত্তা পেছনে ফেলে সমগ্রে মিশে যেতে পেরেছিলেন বলেই তিনি পেয়েছিলেন এদেশের সবমানুষের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার। যে গণজোয়ারের তিনি রূপ ও রূপকার, তার শক্তি ছিল তার শুদ্ধ মানুষী সংকল্পে। কোন কায়েমি স্বার্থের অভিসন্ধি তাতে ফাটল ধরাতে পারে না। প্রতিহত হয়ে ফিরে আসে। তার সামনে বিশ্বের সবচেয়ে সুগঠিত ও সবচেয়ে পরাক্রমশালী সেনাবাহিনীকেও হার মানতে হয়। হার মানে পাকিস্তানি সমরশাসকের নেতৃত্বে কায়েমি স্বার্থের দুষ্টচক্র। বিশ্বের মানচিত্রে আবির্ভাব ঘটে বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্রের-গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ! জনতার জয়ের এক অভূতপূর্ব ঘটনা সেটা পৃথিবীকে চমকে দেয়। আমরা বিশ্বসভায় নিজেদের জায়গা করে নিই। তা অমিত গৌরবের অশেষ মর্যাদার।
কিন্তু অচিরেই সব ছায়ায় মিলায়। আমরা সাত সমুদ্র ডিঙিয়েছিলাম। পর্বতমালার সবচেয়ে উঁচু শৃঙ্গ জয় করেছিলাম। বাঙালির ইতিহাস তার সবচেয়ে নিষ্ঠুর দুঃখের, সবচেয়ে অন্যায়ের অন্ধকার পেরিয়ে সার্থকতার সর্বোত্তম মুহূর্তে পৌঁছেছিল। এর চেয়ে মহৎ কিছু আগে কোনদিন আমরা অর্জন করিনি। মানবমুক্তির এমন বীরগাথা জীবনের প্রেরণায় আগে কখনও এমন সমূহ অভিজ্ঞতায় বাস্তবতা পায়নি। আমরা নতুন যুগের প্রবেশদ্বারে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। সে নতুন যুগ আমাদেরই স্বপ্ন সাধনার ফসল। বিপুল ত্যাগের ও পবিত্র শোকের অমিত মূল্য দিয়ে সেই দরজা আমরা খুলেছিলাম। কিন্তু তারপরেই পদস্খলন। পতন আমাদের অতল গহ্বরে। তার মাধ্যাকর্ষণের টান আমাদের নিচে ঠেলে চলেছে অবিরাম। আশার ছলনায় দু-একবার উঠে দাঁড়াতে চেয়েছি। পারিনি।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি আত্মপরিচয়ের এক মজবুত্ ভিত্ ছিল। পাকিস্তানি শোষণ আর তার সেনাতন্ত্রের নির্বিচার হত্যা ও অমানুষিক নির্যাতনের বিপরীতে এই পরিচয়ের সাধারণ মান ছিল অপ্রাপ্তির ও বঞ্চনার পরিমাপে। সব বাঙালির চেতনায় তা একইভাবে অনুরণন জাগাত। ফলে তাদের ঐক্য ছিল স্বতস্ফূর্ত ও লক্ষ্য ছিল এক। কোন সংশয়ের আঁচড় সেখানে পড়েনি। ব্যতিক্রম যে ছিল না তা নয়। ধর্মান্ধতার ও সাম্প্রদায়িকতার ঘেরাটোপ থেকে যারা বেরিয়ে আসতে পারেনি, আর শাসকচক্রের স্বার্থব্যুহে ঢুকে পড়ে নগদ পাওনার, বিশেষ করে লুটপাটে উচ্ছিষ্ট ভোগের লালসায় মেতেছিল যারা, তারা প্রত্যাখ্যান করেছিল ওই সাধারণ মান। তবে তারা ছিল সংখ্যায় নগণ্য। বাঙালি চেতনাকে তারা প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারেনি।
কিন্তু এই গ্রানাইট-কঠিন ঐক্যে চিড় ধরে বিজয়ের পর মুহূর্তেই। বঞ্চনার সর্বজনীন বোধ চৌচির হয়ে ফেটে পড়ে। তার জায়গায় টুকরো টুকরো হয়ে বেসামাল তাগিদে চারদিয়ে ছড়ায় চরম বিশৃংখলায় প্রত্যেকের ব্যক্তিগত বঞ্চনার বোধ। তার পিঠেপিঠে আসে যে যেমন পারে, হুড়মুড়িয়ে নিজের ভাগ বুঝে নেবার দৌড়। সবাই পারে না। অধিকাংশই, না। ইঁদুর দৌড়ে শামিল হবার মত শক্তি তাদের ছিল না। কিন্তু ইচ্ছাটা তাদেরও তাড়িয়ে মারে। এদিকে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়, তারা কেউ কেউ ফিরে এসে আপন আপন পাওনা-গণ্ডা গায়ের জোরে বুঝে নিতে চায়। তাতে মারামারি বাধে তাদের নিজেদের ভেতরেও। বিশেষ করে একই এলাকার বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বীর ভেতরে নেতৃত্বের ও খবরদারির অধিকার নিয়ে। অনেকের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। খণ্ডযুদ্ধ ফলে ছড়িয়ে পড়ে নানা দিকে। শোষণহীন সমাজ গড়ার মূল লক্ষ্য দূরে সরে। চেতনায় অনেকখানি জায়গা দখল করে নেয় ব্যক্তিগত লাভক্ষতির হিশেব। যেখানে মানুষ সাধারণভাবে ক্ষমতাহীন, সেখানে সুযোগ পেলে বা সুযোগের সম্ভাবনা দেখা দিলে কেউ দাপট দেখাতে বাড়াবাড়ি করবে, এমনটি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে সব কিছু মোটামুটি গুছিয়ে নেবার আগেই তা প্রকট হয়ে পড়াটা ছিল চরম দুর্ভাগ্যের। সংহতি যে শক্তি আমাদের মুক্তিসংগ্রামে প্রেরণা জুগিয়েছিল, বাইরের চাপ সরে গেলে তা-ই এক নিমেষে ধসে পড়ে। ‘জয়বাংলা’Ñঐকতানকেও বিতর্কিত করা হয়। আমাদের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে থাকে।
মুক্ত স্বদেশে ফিরে এসে বঙ্গবন্ধু এইসব বিভেদ জোড়া লাগিয়ে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। পুরো সফল হননি। তবে ব্যর্থ হয়েছেন, এমনটিও বলা যায় না। নতুন রাষ্ট্র নিজেকে প্রতিষ্ঠিতই করেছে। অনুরূপ অবস্থায় অনেক জায়গায় তা-ও সম্ভব হয় না। তবে খরা বন্যা দুর্ভিক্ষ, এসবের আঘাতে জনগণের মর্মান্তিক দুর্দশা ভালভাবে দূর করতে না পারার বেদনা তাঁকে বিচলিত করে। সহায়-সম্বলের সুষ্ঠু বিলি-ব্যবস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পঁচাত্তরে তিনি ‘বাকসাল’ গড়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ঢেলে সাজাবার উদ্যোগ নেন। এই উদ্যোগ সফল হতো কি না জানা গেল না। কারণ বোধনেই ঘটে বিসর্জন। পঁচাত্তরের পনেরই আগষ্ট একবারে পাকিস্ত-ানি কায়দায় সেনাসদস্যদের একাংশের অভ্যুত্থানে তাদের হাতে সপরিবারে নিহত হলেন তিনি। জনগণের যে মুক্তির স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যে স্বপ্ন জাতিকে দেখিয়ে ছিলেন, তা পুড়ে ছাই হলো। পাকিস্তানি সমরশাসনের অনুসরণেই এই বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা তার পথ খুঁজে নিতে চাইল। ‘মুক্তিযুদ্ধ, হায়, বৃথা যায়!’ সেপাইরাজের খবরদারিতে আবার মানুষের অধিকার লুণ্ঠিত হয়।
কিন্তু কেন এই পর্বতপ্রমাণ ব্যর্থতা? কেন এমন তুমুল পরাজয়? আকাশের সূর্য আমরা ছিনিয়ে নিতে চেয়েছি। একসময় তা হাতেও এসেছে। তারপরেই দগ্ধ স্বপ্নের পোড়া ছাই নাকে মুখে ঢুকে নিশ্বাস বন্ধ করে দেবার উপক্রম করেছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ জয় যেমন মুশল পর্বে তুচ্ছতায় শেষ হয়, আমাদেরও বুঝি সেই দশা। এবং তার দায় সবটাই আমাদের। আজ প্রায় ব্যর্থ রাষ্ট্রের তকমা গায়ে সেঁটে আমরা সবার নাক সিটকানো দেখি। অথচ এই গ্লানির আড়ম্বরেই কোন কোন মহলে উৎকট উল্লাস। ফ্ল্যাশ লাইটের রোশনাই জ্বেলে ধোপদুরস্ত পোশাকে নাকে মুখে রঙমাখা ভদ্রললনা ও ভদ্রজনদের ফন্দি-ফিকিরের ছোঁক-ছোঁক-করা-গন্ধে-ভরা কথার তুবড়ির অসার প্রদর্শনীও তার সঙ্গে যোগ হয়। চরম অরুচিকর, কিন্তু সবাই নির্বিকার। কেন এমন হয়?
ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের অস্তিত্বের নির্মাণ-প্রকরণের সমস্তটা থেকে এই আবর্জনার উদ্গীরণ। কম জনেরই এতে অনুশোচনা আছে। বরং দাঁও মারার লোভে কুতকুতে চোখ জুলজুল করে অনেক সব্-জান্তা মুরুব্বির। এর পূর্ণব্যাখ্যা হাজির করা আমার আয়ত্তের বাইরে। নিকট বাস্তবতায় দৃষ্টি ফেলে তার হদিস্ কিছু পাবার চেষ্টা করি।
এটা সত্য আমাদের মুক্তি সংগ্রামে গণতন্ত্রের জন্যে সাধারণ মানুষের আকাক্সক্ষায় কোন খাদ ছিল না। কিন্তু শুধুই আকাঙ্ক্ষা বা সদিচ্ছা দিয়ে লক্ষ্যে স্থির থাকা যায় না, যদিও তার প্রয়োজন প্রশ্নাতীত। এই আকাক্সক্ষাকে ধরে রাখতে পারে, এমন আধারও চাই। তার প্রাতিষ্ঠানিক ছক কল্পনায় থাকলেই চলেনা, গণমানুষের অভিজ্ঞতাতেও তার হয়ে ওঠা চাই। পাকিস্তান পর্বে গণতন্ত্রের জন্যে আন্দোলন ছিল, কিন্তু বিধি-ব্যবস্থা কিছুই ছিল না। ছিল প্রথম দিকে পর্দার আড়ালে সমরশাসনের পাঁয়তারা, পরে উনিশশ আটান্ন থেকে সরাসরি সামরিক একনায়কত্বের অধীনে বসবাস। হুজুরের সন্তুষ্টি বিধানই মোক্ষ লাভের উপায়-তষ্মিন তুষ্টে জগৎ তুষ্ট- এবং অন্য বিবেচনা অবান্তর, এই অসুস্থ মানসিকতা চেপে বসে সব মহলে। রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মকেও তা নিয়ন্ত্রণ করে। গণতান্ত্রিক পরিমণ্ডল তৈরি হয় না। কৃপা পাওয়া, আর কৃপা দেওয়া, ক্ষমতার অলিন্দে অলিন্দে কেবল তারই চর্চা। এখানে স্বাধীনচেতা বাঙালির প্রবেশাধিকার ছিল না; কিন্তু ওই ক্ষমতার দুর্গটি জয় করা ছিল তারও লক্ষ্য। আচরণের ও আচরণের প্রত্যাশার ধরন এইভাবে তৈরি হয়ে যায়। তারই উত্তরাধিকার বর্তায় বাংলাদেশের অনভিজ্ঞ ক্ষমতা কাঠামোয়। গণতন্ত্রের প্রতি তা অঙ্গীকারাবদ্ধ, কিন্তু অভ্যাসে লালন করে প্রভু-ভৃত্য সম্পর্কের মানসিকতা। স্ববিরোধ এড়ান যায় না। অচিরেই সুবিধাবাদ ফিরে আসে। রাষ্ট্রকাঠামোর প্রাতিষ্ঠানিক কর্ম সম্পাদন প্রক্রিয়া যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না ঃ কী দলীয় উদ্যোগে, কী নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগে। আর, ‘চ্যারিটি বিগিন্্স্ অ্যাট হোম,’ এই আপ্তবাক্য শিরোধার্য করে অনেক তালেবর ব্যক্তি সুযোগ পেলেই আখের গোছানকেই কর্তব্যজ্ঞান করেন। রাষ্ট্রে বা সমাজে গণতন্ত্রের নৈর্ব্যক্তিক চর্চা দানা বাঁধে না। পাকিস্তানি অভ্যাসের ভূত কাঁধ থেকে নামে না। গণমানুষের বিভ্রান্তি বাড়ে। হতাশা যৌথ কল্যাণএষণায় দাঁত বসায়।
এই পরিস্থিতিতে কেউই সন্তুষ্ট থাকে না। বাংলাদেশ চাওয়ার পেছনে মানুষের ব্যক্তিগত বাসনাসূচি তাদের আচরণে প্রকাশ পেতে থাকে। তা মদ্ত জোগায় সুযোগসন্ধানী মনোবৃত্তির ফাঁক-ফোকর গলে দাদা-মামা ধরে ছোট আমলা বড় আমলা হবে, মুন্সিফ হবে হাইকোর্টের বিচারক, সেপাই-বরকন্দাজ হবে সেনাবাহিনীর মেজর, আর মেজর-জেনারেল, এইরকম। একেবারে খাপে খাপে পুরোন পাকিস্তানি মনোভাব। বুভুক্ষু লালসায় বোধহয় আরো উগ্র। সেনাছাউনিতে চলে একই রকম ক্ষমতাদখলের চক্রান্ত। সাধারণ মানুষের কাছে এসবের কিছুই অপরিচিত ঠেকে না। বুনোহাঁসের জ্যোতির্ময় পাখার পেছনে ছোটার বদলে অভ্যাসের বদ্ধ আবহাওয়ায় মাথা -গুঁজে দিন গুজরানই তারা ললাট লিখন বলে দেখতে পায়। আক্ষেপ তাদের যায়না। কিন্তু ব্যর্থতা তাদের পথও দেখায় না। মুক্তির সংগ্রাম দিক্ভ্রষ্ট হয়।
এরই অনিবার্য পরিণতি জনসমুদয়ে কায়েমি স্বার্থের নতুন নতুন খোপের সৃষ্টি। ক্ষমতাচক্রে তারাও ভিড়ে যেতে থাকে, অথবা ক্ষমতাচক্র থেকেই তাদের উদ্ভব। যেমন, পোশাক শিল্পের মালিকানা বা চিংড়ি-ঘেরের দখলদারি অথবা বাস্তু-নির্মাণ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ। প্রায় সমজাতীয় একটা সমাজ খণ্ড খণ্ড বলয়ে ছিন্ন হয়ে যায়। প্রত্যেকটিতেই সাফল্যের নিদর্শন আদিম সঞ্চয়ে ধনসম্পদের মালিকানা। মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ে। মেরুকরণ প্রক্রিয়া অবাধ প্রশ্রয়ে তীব্রতর হয়। সংহতির অনুভব চেতনায় আর কাজ করে না।
সবটাই আগের পাকিস্তানি ঐতিহ্যের অনুসরণ; পাকিস্তানি অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি। পঁচাত্তরের অভ্যুত্থান দেশকে ঠেলে দেয় সেনাশাসনের খপ্পরে। তারপর থেকে বেশিরভাগ সময় কেটেছে সমরকর্তাদের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্বে অথবা তাদের ছদ্ম নির্দেশনায়। সেনাছাউনিতে জন্ম নেয় রাজনৈতিক দল। ক্ষমতার ভাগ বাঁটোয়ারার ছকও কষা হয় সেখানে। দাতাসমর্থনপুষ্ট সুশীল সমাজের লেজগোটানো কর্তাদের অনেকের কাছে তা দুর্ভাবনার নয়। এটাই তাঁদের কাছে জাতীয় সংহতির, ও তারই প্রতিফলনে জাতীয় সরকারের নীল নক্শা। সামাজিক বিশৃংখলায় হঠাৎ নবাবদের অর্জিত বিষয় সম্পত্তির যাতে ক্ষতি না হয়, সেদিকেও তাঁদের নজর। তাই গণতান্ত্রিক সমাজে মানবাধিকারের প্রাথমিক ধারণাকে বনবাসে পাঠিয়ে তাঁরাও নসিহৎ করেন, প্রতিবাদ সভা, মিছিল, হরতাল চলবেনা। পোশাক শিল্পের কর্মীরা যতই শোষিত হোক, তারা মুখবুজে কাজ করবে; অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির স্বার্থে কোন বিশৃংখলা বরদাশ্ত্ করা যায় না। অতীতের পাকিস্তানি শাসনের ভূত-প্রেতরাই যেন জীবন্ত হয়ে কথা বলে। প্রচার মাধ্যমেও তারা ঘাঁটি গাড়ে। গণঅভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর একবার আশা জেগেছিল, গণতন্ত্র বুঝি মুক্তি পেল। কিন্তু সে আশা অংকুরেই বিনষ্ঠ হয়। ছিয়ানব্বই-এর নির্বাচনের সুফলও ধরে রাখা যায়নি। ক্ষমতাচক্রের নানা অবতার নানা ছলে নানা বেশে মাথার ওপর বসেই থাকছে। কখনো তারা বিপাকে পড়লে শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখার নামে আরোপিত হয়। বিশেষ বিশেষ আইন। মানুষের অধিকার বার বার ভূ-লুণ্ঠিত হয়। জনগণের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষেধের জালে আটকে থাকে। নড়াচড়া যেটুকু করতে পারে, তা-ও শর্ত মেনে। স্বয়ং পাকিস্তান এখন এমন শ্বাসরোধকারী অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজায় ব্যস্ত। আমরা কিন্তু তার জাল থেকে একসময় বেরিয়ে এসে সেই জালকেই গলা বাড়িয়ে বরণ করে নিচ্ছি। কায়েমি স্বার্থের দেশি-বিদেশি মুরুব্বিরা তেমনটিই চায়। আমরা পুতুল নাচ নেচে তাদের মনোরঞ্জন করে চলেছি।
একাত্তরে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ছিল এক অসাধ্য-সাধন। সেই কীর্তির অবশেষ কি কিছু পড়ে আছে? শেষ পর্যন্ত পরাজয়কেই জয় ভেবে উল্লসিত হয়ে দু’হাত তুলে নৃত্য করা কি আমাদের ভাগ্যলিপি হয়ে দাঁড়ায়নি?

0 comments:

Post a Comment