July 24, 2008

চুম্বন, চুমু-চুমকুড়ি ইত্যাদি প্রসঙ্গে

চুম্বন, চুমু-চুমকুড়ি ইত্যাদি প্রসঙ্গে
‘গাল’ না-গাল এবং নাগাল
অসিত দত্ত

যদি বলি চুম্বন ব্যাপারটাই বৈদিক
মানবে না যারা তারা বলবে তো বই দিক
বই ফই লাগবে না
চুম্বনও ভাগবে না
কামসূত্র-বাৎসায়ন ঘাঁটলেই পাবে ওই দিক।

নাক উচুঁ রক্ষনশীলরা ইচ্ছা-প্রবৃত্তি না হলে এই লেখা না পড়তে পারেন। তবে আমরা জোর গলায় কিসিং নিয়ে কিছু মিসিং লিংক খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো।
২০০৬ সালের সানডে টাইমস অব ইন্ডিয়ায় একটা জবর খবর এর প্রতি চুম্বনাসক্ত পাঠকদের একটু নজরায়ন করি। তার তুঙ্গ-বাক্যবন্ধে লেখা ছিলো Kama Sutra has kissing references
অরো অনেক কিছু লিখেছেন লেখক অনুভা সাহানী [T N N]
History has it that the Greeks learnt about kissing from Indians and lip – locked their way throughout Europe and Asia around 326 B.C. say Alka Pande, art curator and author of INDIAN EROTICA –
`The Vedas quote passages about the first stirrings of desire. There are instances of the concept oF desire and also abstract representations of desire in certain parts of the Rig Veda ...medieval Indian scriptures, Of course, give more conerete des criptions.
সেখানে আরো অনেক কিছু লেখা আছে-চিন্তা করতে গেলে নাকি অলকা পাণ্ডের গায়ে কল্প কাঁটা [Shudder ] দেয় যে আমাদের এই এ্যাতো উদারপন্থী দেশটা হঠাৎ করে কি করে রক্ষণশীল [puritan] হয়ে গেল। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ভোগ পরায়ণতা [Sensualityসেনসুয়ালিটি] নিয়ে আমাদের দেশের ধারণাতত্ত্ব [notion] সব সময়েই আমাদের প্রাচীন সাহিত্যের বিষয়বস্তু ছিলো। সমকালীন রুচি বা গীসা অতিশালীন বাড়াবাড়ি রকমের ভদ্র [PRUDISH] ভাবগতিক গুলো নাকি এসেছে খুব সম্ভবত পাশ্চাত্য দেশ থেকে সঞ্চারিত [implant] হয়ে। বুঝুন প্যালা বা ঠ্যালা কাকে বলে! আমরা নীতিবাগীশরা যাদের হাবভাব দেখে নাক সিঁটকোই তারাই আমাদের ভব্যতাসভ্যতার লাজলজ্জা শিখিয়েছে। ওই লেখাটাই আরো লেখা আছে অনুবাদ না করে মূল কথাগুলোনই সরাসরি জানাই -Pritish Nandy, who translated erotic Sanskrit text into English, `Bhartrihari and Amaru have such magical love poems that are both wicked as well as fun. Unfortunately, sex has become just another tool like religion in the hands of politicians.’
Cut to the KAMA SUTRA. Where leave alone kissing, even the various types of kissings have been explained in great detail by Vatsyana. Ambitious kissers could try everything from Bent kiss, Turned kiss, Pressed kiss, Straight kiss, Clasping kiss, Kiss that kindles Love, kiss that tuns away or kiss that Awakens!! There are over 250 references in KAMA SUTRA to types of kisses. When to kiss, How to kiss.

[কলকাতা থেকে প্রকাশিত সানডে টাইম ১৯.২.০৭]

‘লিপলক’ কথাটা আগে লেখা আছে লক-জ-এর বাংলা হলো দাঁতকপাটি বা দাঁতে খিল যা সহজে খোলে না। তবে ঠোঁটে খিল লাগলেও দেখা যাচ্ছে তা রেকর্ড করার জন্যে দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে! এ ব্যাপারে বিশ্ব রেকর্ড আছে। সেটা এই লেখার বিষয় নয়। এক বন্ধু আমাকে বলেছিলো, চুমু না খেলে নাকি তার ঘুম আসে না। সে খুব চুমু বিশেষজ্ঞ। চুমুরও নাকি আবার রকমফের আছে। স্নেহ ও প্রতিভাজনদের জন্যে শব্দ করে চুমু খাওয়ার নাম ‘চুমকুড়্’।ি বোঝা যাচ্ছে এটা কুঁড়িদের জন্যে চুমু।
তবে চুমু শুধু উঁয়া শব্দ করে ঠোঁট দিয়েই হবে তার কোন মানে নেই। গাল-এও হয়। না এটা না-গাল নয় গাল এরই গালগল্পো। তবে গাল দিয়ে। বা গাল নিয়ে এই গপ্পাগপ্পিতে গালমন্দ, গালাগালি বা গালিগালাজ করবেন না যেন কেউ। তবে গলির মোড়ের ল্যাম্পপোস্ট-এর বাল্বটা ঢিল মেরে নিবিয়ে গলাগলি করতে পারেন। সে কথাও পরে হবে। তবে নেহাৎই রঙ্গ রম্যতার খাতিরে সঙ্গ করা এই ‘গাল’-এর। পরিশেষে এইভাবেই আবিষ্কার করা যাবে ‘না-গাল’ শব্দটার ব্যুৎপত্তি। যদি কেউ প্রশ্ন করে: অনেক সময় মনোরোগ বিশ্লেষণ কারীগণ প্রশ্ন করেন, Ñ ‘একটা শব্দ বলবো, সঙ্গে সঙ্গে তোমাকেও বলতে হবে আর একটা শব্দ। তখনই গাল-এর উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ‘চুম্বন’ শব্দটা অনেকের মনে স্বতঃস্ফুর্তভাবে আসাটা এমন কিছু বিচিত্র নয়; তবে তখন চিত্রটা বেশ পরিষ্কার হয়ে যায়। এদের বলে লাগোয়া শব্দ যা নাগালের মধ্যেই থাকে। অনেকটা কান টানলেই মাথা আসার মতো ব্যাপার। অস্বীকার করার উপায় নেই। আকর্ষণ বিকর্ষণ এর ব্যাপার একটা আছে।
আর আকর্ষণ আছে বলেই হয়তো চুম্বন ও চুম্বক শব্দদ্বয় অনুপ্রাসগতভাবে এত কাছাকাছি। অনুপ্রাসন মানে ছোট্ট করে খাওয়া হতে পারে। চুমু খাওয়া কথাটার খাওয়া মানেই টুক্ করে একটু অনুপ্রাসন। এগুলো দীর্ঘস্থায়ী নয়। চুমুক দেওয়াটা যেমন অনু-পান তেমনি চুমু খাওয়াতে পেট না ভরলেও মন ভরে। তাই গাল এর নাগাল পেতে চায় স্ত্রীপুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই। ছোট্ট সুন্দর শিশুদের ফোলা ফোলা তুলতুলে গাল দেখলেই চুমু কিংবা টিপে দেবার প্রবণতা আসবেই। কিছু করার নেই। চুম্বনের চুম্বক এমনই অপ্রতিরোধ্য এবং অপ্রতিবোধ্যও কি?
চুম্বন অনেক জায়গাতেই হয়। গালে না দিয়ে শীলতা-শালীনতা বজায় রেখে অনেকে কপালেও দেয়। কপাল আর কপোল। যার কপালে যা জোটে! সেই কপোল-কল্পনা নিয়েই এত কথা। অনেকেই চিবুক বা থুতনি স্পর্শ করে সেই আঙ্গুল নিজের ঠোঁটে ছুঁইয়ে চুম্বনের মুদ্রাভঙ্গি করে। আকাশ বা গগনকেও কেউ কেউ চুম্বনের কল্পতা দেয়। সেদিন কাগজে একটা আলংকারিক চুম্বন-শব্দ দেখলাম। গগন চুম্বী প্রত্যাশা জাগিয়েও পূরণ না করায় পতন উত্তরাঞ্চলে। ভেতরের খবরে গিয়ে কাজ নেই। অনেক উচ্চতার বেশি বেশি মাত্রা বোঝাতেই এই চুমু খাওয়া। অনেকে চরণ চুম্বন করে প্রণতি জানাতে চায়। ভূমিকেও চুম্বন করে প্রণতি জানানো হয়।

‘যদি পড়ে থাকি ভূমে ধুলার ধরণী চুমে
তুমি তারি লাগি দ্বারে রবে জাগি, এ কেমন তব পণ’
‘পূজা’ / গীত বিতান Ñ রবীন্দ্রনাথ

অনেকটা চায়ে চুমুক খাওয়ার মত, আলতো করে ফালতো একটা চুমু খেলে অনেক ক্ষেত্রেই তা দোষের হয় না। গরম দুধ বা চায়ে চুমুক দেওয়ার শব্দটাও নিশ্চয়ই ওই চুম্বন থেকেই এসেছে: তবে চায়ে চুমুক দিলে চা খাওয়ার সুখ আছে। কিন্তু চুমু খাওয়ার আনন্দ নেই। গালে চুমু খাওয়ার ব্যাপারে সুখ আছে যেমন দুঃখও যে নেই তাও নয়। সেখানে আকর্ষণের বদলে বিকর্ষণও হতে পারে। এই প্রসঙ্গে মনে পড়লো এ্রকালের প্রখ্যাত এক নারীবাদী কবির কবিতা। বাবার বন্ধু বন্ধুকন্যাকে চুমু খাওয়ার বিপদের কথা। বিপদ তো বটেই। নইলে কবিতার মধ্যে সেই ‘গোপন কথাটি রবে না গোপনে’ হয়ে গেল কেন? ঘটনাটা খানিকটা আঁচ করা যায়, তবে পাঁচ কান না করলেই ভালো হতো এই গাল-গল্প।
এই প্রসঙ্গে আমার একদা-পঠিত বিখ্যাত একেলে কবি এবং সরস্বতীর বরপুত্র তাঁর অগণিত লেখালেখির একজায়গায় তাঁর চুম্বনজনিত কাব্যিক একপেশে স্বযমোপভোগি কাব্যিক আত্মরতির গপ্পোটাও পাঠকদের শুনিয়ে দিই। একপেশে বললাম কারণ সরস্বতী ঠাকরুণ-এর তো করুণ অবস্থা। প্রতিচুম্বন করা বা দেওয়ার তো তাঁর ক্ষমতাও নেই উপায়ও নেই। সেই দিনটা ছিলো সরস্বতী পুজোর পূর্বকাল।
....‘নিঃশব্দ, নিবিড় রাত্রি, আমি বসে আছি, আমার সামনে একটি মাটির মূর্তি ছাড়া আর কিছুই নেই। ........ এক সময় সর্বাঙ্গে শিহরণ হল। কী অপূর্ব সুন্দর মুখ এই শ্বেতবসনা রমণীর। আয়ত চক্ষু, স্ফুরিত ওষ্ঠ, ভরাট বর্তুল দুটি স্তন। সরু কোমর, প্রশস্ত উরুদ্বয়। ...... তছনছ হয়ে যেতে লাগলো আমার কৈশোর, জেগে উঠলো পুরুষার্থ, অল্প অল্প শীতেও উষ্ণ হয়ে উঠল শরীর .... চোরের মতন সতর্কভাবে একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে আমি হাত রাখলাম দেবীমূর্তির বুকে। ‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে ..... । সেই কুচযুগে আমার আঙুল, আমার শরীর আরও রোমাঞ্চিত হল। কানদুটিতে আগুনের আঁচ। আমি প্রতিমার ওষ্ঠ চুম্বন করলাম, আমার জীবনের প্রথম চুম্বন।’
[উল্লেখ - আনন্দ বাজার পত্রিকা ০৮/৩/০৫]

ওইসব চোরাগোপ্তা মৃত-চুম্বনে কোনো মার নেই। তবে জ্যান্তজ্বলজান্তব চুমু মারামারিতে প্রহৃত হবার খবর কাগজে দেখেছি। সম্প্রতি কবিমান্য অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের গুপ্ত নয় ব্যক্ত চুম্বনিক গ্রন্থের নাম দেখলাম ‘ওষ্ঠে ভাসে প্রহত চুম্বন [প্রহৃত পড়বেন না]। তা তো ঠিক বটে! চাইলেই কি চুম্বন করা যায়? না পাওয়া যায় না! প্রহত মানে আঘাতপ্রাপ্ত বা আহত। অনীহদের কাছ থেকে প্রহত হবার সম্ভাবনা-ডরভয় তো থাকেই। মনে হয় চুম্বন-ডোর সেখানে রুদ্ধ। বলা যায় ব্রাত্যজনের নিরুদ্ধ চুম্বন।
আমি ভেবেছিলাম এই চুম্বনের বনে অধরকে অধরাই রাখবো, কারণ ‘গাল’-এর নাগালে থাকতে চেয়েছিলাম। কিন্তু চিন্তার সূত্র এমনই দ্রব্য যে টেনে টেনে আনছে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তর। ঠাকুরবাড়ির নোটবই-এ দেখা যায় চুম্বন নিয়ে তাঁরাও কিছু কিছু চিন্তন-ভাবন লিখিতভাবে প্রকাশ করে গেছেন। রাখঢাক করে লুকোচুরির আড়াল আবডাল রেখেই অনেকে চুম্বনের কথা লিখেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে উদাহৃতÑ
Ñ‘চুম্বন রহস্য কে বলিবে? অধরে অধর মিশাইয়া একটি নি:শব্দ শব্দ উচ্চারণ, ইহার অর্থ কি?
আমি বলি, ইহার অর্থ সুদূরপ্রসারী। দেহাতীত প্রেম বলে কিছু হয় নাকি? মনের মধ্যেকার প্রেম কখনও কখনো অবস্থাগতিকে দেহ স্পর্শ করলে হয় দেহজ প্রেম। দেহমন দুটোই তা চায়। সেই দেহস্পর্শের প্রাথমিক অন্যতম ঘটনা হলো চুম্বন। এরই নাম শরীরী ভাষা। কোনো কিছু কথা না বলেও অকস্মাৎ কেউ যদি বদাম করে কেবল মাত্র চুম্বন প্রদান করে বা এঁকে দেয়, তাহলে সেই দেহভাষা দিয়েও ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়। সেই প্রকাশমানতা বুঝি অঙ্কন-শিল্প দিয়েই করা হয়। অধর-এর কথা যখন ধরাই হলো, তখন হোক একটু অধর এর কথা। অধর ছুঁলেই কিন্তু আর অধরা থাকে না মনের কথা। ঠোঁট ফুটে কিছু বলুন আর না বলুন অধরই বলে দেবে অধরা মনের কথা। বলছিলাম না সুদূর প্রসারী? সেই দ্বাপর যুগে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণও চুম্বন প্রিয় ছিলেন। মনে আছে চণ্ডীদাস-এর সেই পদাবলী এবং আর এক কৃষ্ণচন্দ্র দে সেই গান গেয়ে জনপ্রিয় হয়েছিলেন। এখনো তার অনেকগুলো পদই আমার মনে আছে। স্বকীয়া এবং পরকীয়া উভপ্রেমেই চুম্বন একটি অপরিহার্য অবশ্যকর্তব্য ব্যাপার দ্রব্য। এই কর্তব্যকে ধর্তব্যের মধ্যে আনতেন পদাবলী-নায়ক শ্রীকৃষ্ণ। তিনি দুটোই করতেন। ভাগবতে তার উল্লেখ নেই। সেটা অন্য কথা। আমাদের স্মর্তব্য এবং বক্তব্য হলো লোকায়ত পদাবলীর সেই কেষ্ট ঠাকুর যিনি মাঝে মাঝে চন্দ্রাবলীর কুঞ্জবিতানে যেতেন এবং তাই নিয়ে একদিনের ঘটনা বা রটনা যাই হোক। আনবাড়ি থেকে শ্রীরাধিকার অঙ্গনে প্রকাশ করা মাত্রই কৃষ্ণপ্রিয়ার ধমক-ভাষ্য এই গানটি’তে। অধরের তামুল বয়ানে লেগেছে’ পদ্যাংশটি ব্যাখান-এর অপেক্ষা রাখে না
......‘ছুঁয়োনা ছুঁয়োনা বধুঁ ওই খানে থাকো
মুকুর লইয়া চাঁদ-মুখপানে দেখÑ। ’

অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণের গালে এবং বদনে তখন আমি-চুম্বন চিহ্ন-যা একালের ওষ্ঠরঞ্জনীকেও হার মানায়। তারপরেÑ
Ñ‘নয়নের কাজল বয়ানে লেগেছে, কালোর উপরে কালোÑ’ চন্দ্রাবলীর চোখের কাজলকালি অর্থাৎ একালের আই-লাইনার, শ্রীকৃষ্ণের কালোবরণ মুখের ওপরে কাজলের অসিতবরণ। তারপরে আছেÑ

‘প্রভাতে উঠিয়া ও মুখ দেখিনু, বুঝি দিন যাবে আজ ভালো
অধরে তাম্বুল বয়ানে লেগেছে, ঘুমে ঢুলু ঢুলু আঁখি
আমা পানে চাও, ফিরিয়া দাঁড়াও, বধুঁ নয়ান ভরিয়া দেখি’
চাঁচর কেশের চিকনচুড়া, ও কেন বুকের মাঝে
কোন রসবতী পাইয়া সুধানিধি নিঙরে লয়েছে সেহ
কুটিল নয়নে কহিছে সুন্দরী আধেক করিয়া তোড়া
কহে চণ্ডীদাস, আপন স্বভাব ছাড়িতে না পারে চোরা’

অর্থাৎ ননীচোরা এখানে চুমুচোরাও ছিলেন। স্মৃতি থেকে উদাহৃত এই গানটির সঙ্গে মূল পদাবলীর ফারাক থাকতে পারে, তবে তাতে রসভঙ্গ হবে না। এবার সেকালের ঠাকুর ছেড়ে একালের রবীন্দ্রঠাকুর প্রসঙ্গে নামি।

Ñ‘অধরের কানে যেন অধরের ভাষা
দোঁহার হৃদয় যেন দোঁহে পান করে
গৃহ ছেড়ে নিরুদ্দেশ দুটি ভালোবাসা
তীর্থযাত্রা করিয়াছে অধর সংগমে।
দুটি তরঙ্গ উঠি প্রেমের নিয়মে
ভাঙিয়া ভাঙিয়া মিলিয়া যায় দুটি অধরে।
ব্যাকুল বাসনা দুটি চাহে পরস্পরে
দেহের সীমায় আসি দু’জনের দেখা
প্রেম লিখিতেছে গান কোমল আখরে
অধরেতে থরে থরে চুম্বনের লেখা........
Ñ‘চুম্বন’/‘কড়ি ও কোমল’ রবীন্দ্রনাথ
এবারের একটি নির্মল চুম্বনের ঘটনাÑ
.....‘Ñ বলিয়া আমার মুখ তুলিয়া ধরিয়া আমার ললাটে একটি নির্মল চুম্বন করিলেন; সেই চুম্বনের দ্বারা আমার যেন তৃতীয় নেত্র উন্মীলিত হইল’ ‘গল্প গুচ্ছ’ Ñ ‘দৃষ্টিদান’।
‘..... বান্ধবীদের সঙ্গে গলাগলির গদ্গদ্ দৃশ্য মাঝেমাঝে দেখেছি, সেই বিহ্বল স্ত্রৈণতায় আমার গা কেমন করে’।....
‘গল্প গুচ্ছ’ ‘রবিবার’
ঠাকুর বাড়ির অন্দরমহলে যে সব চিঠিপত্রের চালাচলি হতো, তাতেও নাগাল পাওয়া যায় ‘গাল’-এর যেখানে চুম্বনের স্পর্শ-অভিলাষ আছে। রবীন্দ্রাগ্রজ সিভিলিয়ান সত্যেন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষিতা স্ত্রী জ্ঞানদানন্দিনীকে পত্রপাত শেষে অসংকোচে লিখতেন ‘হাসি নিবে’। কিম্বা আমার অসংখ্য ‘কিস্’।
অর্থাৎ ‘কিস’ কে মিস করতে কেউ চাইবেন না এবং মিস্রা যেন তাতে করে মিসআন্ডারস্ট্যান্ড না করেন। এবারে নায়িকা-প্রসঙ্গে আর এক সত্যেন্দ্রনাথের সত্য কথা বলি। তিনি ছান্দসিক সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ কবিতাটিতে আশা করি পাঠকগণ পছান্দসিকতা দেখবেন। এই কবিতাটির মধ্যে মিস্ অর্থাৎ নায়িকার গোপন চিঠির নাগাল পাই। সেখানে নায়িকার গোপন প্রার্থনা Ñ

‘তোমার একটি চুমার লাগি পরান কাঁদে হায়
দিয়ো দিয়ো একটি চুমা আমার চিঠির গায়।’

‘ঠিকইতো-প্রেমপত্তর হস্তগত হলেই প্রথমেই পত্র চুমা হয় এবং পত্র পাঠান্তেও চুম্বন প্রদান হয়। উড়ন্ত চাকির মতন ফ্লাইং কিস ও হতে পারে। উঁয়া শব্দে। Ñ
এবারে অন্য একটি গল্প মনে আছে, নামটা মনে নেই। বিবাহ বন্ধন বহির্ভূত প্রেমঘটিত চুম্বনের মাদকতার রোমাঞ্চকতা যে আলাদা এবং সশব্দ চুম্বন যে তার একটি অবশ্যম্ভাবি পরিণাম-কর্তব্য, সে কথা সেই মুনসেফবাবু বোঝেন নি বুঝলে বুঝতেন না এবং তিনি ‘মুন’ অর্থাৎ চাঁদকে ‘সেফ’ অর্থাৎ রক্ষা করতেন। পর্দার আড়ালে তাঁর স্ত্রী এবং তাঁর মাতুলের তুলতুলে চুম্বন শব্দে তিনি পরদার-গমনের মামলা করে হামলা করেছিলেন। একেই বলে পর্দার আড়ালে পরদার-চুম্বন।
যদিদ্বার বাসিনীর মন মেজাজ এবং সরিফ-শরীর থাকে তবে নিজদার-চুম্বন তো চাইলেই পাওয়া যায়। কিন্তু কালেভদ্রে ভদ্রমহিলার গাল-এর নাগাল পেয়ে শুধুমাত্র পরদার চুম্বনের তঞ্চকতাহীন রোমাঞ্চকতা যে কি, তা কেবলমাত্র ভুক্ত ভোগীরই অপরিণামদর্শী হয়ে ভোগ, ভোগান্তি এবং উপভোগ করে।
এবার চুম-এর সঙ্গে ঘুম-এর কি সম্পর্ক তাই দেখার আগে একটা ঘুম-পাড়ানী ছড়া গাল এর নাগাল নিয়ে। আমার একটি ছড়ার নাম ‘লকারান্ত।

গাল না দিয়ে গালটা দেবো
দেবো একটা চুমো
চাল না দিয়ে চালটা দিস
বাছা এখন ঘুমো।

ছড়া আংশিক ছড়ালাম এখানে। পরে লকারান্ত ব্যাপার আরো আছে। সেগুলো এখানে অপ্রাসঙ্গিক। এবারে সেই ঘুম-চুমের গপ্পোটা বলি। কোনো এক বিদগ্ধ জীবনাভিজ্ঞ মনীষীকে কোনো এক নারীবাদীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি করে আনা হয়েছিলো। এই অতিথিটিও নারীবাদী ছিলেন না মানে নারীদের বাদ দিয়ে চলতেনই না। তাই নারীবাদিনীদের সম্মেলনে যোগ দিতে সম্মত হয়েছিলেন। সভাশেষে একদল স্বাক্ষর শিকারিনীদের মধ্যেকার একজনের প্রশ্ন ছিলো, স্যার এই পৃথিবীতে আপনার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস কি?
মনীষী প্রবর উত্তর দিলেন আমার কাছে সবচেয়ে পছন্দের জিনিস হলো ঘুম।
মহিলারা রে রে করে আপত্তি করে উঠলেন, না-না-না তা হতে পারে না, এই নারী সম্মেলনে এসে আপনাকে বলতেই হবে আপনার সবচেয়ে বেশি পছন্দের জিনিস হলো নারী। বাদানুবাদ বাদ দিয়ে তিনি বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিকই আছে। পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে পছন্দের জিনিস হলো নারী-এবং তার পরের পছন্দই কিন্তু ঘুম।
জানি না ‘চুম’ ও বলেছিলেন কি না। ঘটনাটার পুরো ব্যাখ্যা না করেই বলি, ভদ্রলোক নিশ্চয়ই নারীদের গাল পছন্দ করতেন এবং নাগালে পেয়ে চুম-ইত্যাদি দেবার পরেই ‘আয় ঘুম যায় ঘুম’ করতেন।
গাল মানে গণ্ড। এই গণ্ডতেই যত্তো গণ্ডগোল। গণ্ডে চুম্বন প্রদানের ফলে যে গণ্ডগোল গোলমাল আরম্ভ করতেই হবে। সেটা না-ও হতে পার্ েঅনেক সিনেমা-সিরিয়ালে-বিজ্ঞাপনের অনুঘটনায় ছেলেদের গালে এবং সর্বাঙ্গে চুম্বন-চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায়। এঁকে দিতেও দেখা যায় এবং তার পরে রিপস্টিক-এর রঙ স্টিক করে থাকে মদনদের বদনে। বিজ্ঞাপনের কথায় মনে পড়লো। লরীর পেছনের চেতাবণি। উড়হ’ঃ করংং গব. ঠিক কথা। এই চুম্বনের ধাক্কায় বেমক্কা না যাওয়াই ভালো।
তবে করংং যারা গরংং করে তারা গালের নাগাল না পেয়ে কিসমিসের মতন কোনো এক দ্রব্যগুণের মিষ্টি মধুর রসাস্বাদন থেকে বঞ্চিত হয়। ‘গাল’-এর নাগাল তাই তীব্রভাবে পেতে চায় সবাই, কিন্তু সভ্যতা ভব্যতা রুচিবোধ, সঙ্কোচ ইত্যাদির কারণে সেই গাল অবধি অনেকেরই পৌঁছনো হয় না।
এবারের মাধুকরীতে যে রবীন্দ্র-রচনাংশ রাখবো, কিন্তু না জেনে আমার মতো অনেকের শুধুমাত্র এটা পড়ে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে বুঝিÑ


‘প্রিয়ে তোলো মুখানি, আছে গো আমার প্রাণের কথা কত
আমি এমন সুধীর স্বরে, সখী, কহিব তোমার কানে
প্রিয়ে, স্বপনের মতো সে কথা আসিয়ে পশিবে তোমার প্রাণে।
তবে মুখানি তুলিয়ে চাও, সুধীরে মুখানি তুলিয়ে চাও।
সখী একটি চুম্বন দাওÑ গোপনে একটি চুম্বন চাও।’
এই গোপনিক চুম্বন দেওয়া, চাওয়া, ও পাওয়া নিয়ে কবির এই সুধীরবচনে কেউ যেন আমার মত ভুল বুঝবেন না। ‘রবিচ্ছায়া’ গ্রন্থে কুসুমকুঞ্জ আলা-করা এক গোলাপ বালাকে গানের ছলে কবিরবি এই সংলাপন করেছিলেন। অবশ্যই এটি একটি নির্মল চুম্বনের উদাহরণ।

কুম্ভীলক বৃত্তির উৎস সন্ধান

১. বিভিন্ন পত্র পত্রিকাসহ আনন্দবাজার পত্রিকা
২. রবীন্দ্র রচনাবলী
৩. ঠাকুরবাড়ির অন্দর মহল, চিত্রাদেব
৪. ঝঁহফধু ঞরসবং কড়ষশধঃধ
৫. ‘শ্রীপর্ণ পত্রিকায় অসিত দত্তের লেখা ‘গাল’, না-গাল’ এবং ‘নাগাল’।
৬. বাংলাভাষায় শব্দছিরি ছাঁদ এর মার-অসিত দত্ত।

1 comments:

Nameless said...

Great Article.

Post a Comment