July 24, 2008

নাট্যনির্দেশক ও সংগঠক নাসির উদ্দীন ইউসুফ

নাট্যকার সেলিম আল দীন এর মহাপ্রয়াণকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে নাট্য নির্দেশক ও নাট্যকার সেলিম আল দীন-এর সহযোদ্ধা নাসির উদ্দীন ইউসুফ এর সাক্ষাৎকারটি ‘অঞ্জলি লহ মোর’ এর পক্ষ থেকে টেপ রেকর্ডে ধারণ করা হয়, ৬ এপ্রিল ২০০৮ শিল্পকলা একাডেমীর জাতীয় নাট্যশালার লাউঞ্জে বসে এই সাক্ষাৎকার যখন গ্রহণ করা হয় তখন ঢাকা পদাতিকের নাট্য সপ্তাহ চলছিল।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ প্রচুর ব্যস্ততার মাঝেও আমাদেরকে যে কথা বলার সময় দিয়েছেন-সে জন্য অশেষ কৃতজ্ঞ।

অঞ্জলি : আপনার সাথে তাঁর প্রথম পরিচয় এবং যেভাবে নাটক ও ঢাকা থিয়েটারের
যাত্রা শুরু করলেন, সে সম্পর্কে কিছু বলুন।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আমার সাথে সেলিম আল দীনের পরিচয় ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে। সেখান আমরা আড্ডা মারতাম। আমি, সেলিম,কবি নির্মলেন্দু গুণ, কবি আবুল হাসান, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, কবি রফিক আজাদ, শিল্পী হাশেম খান, শিল্পী রফিকুন নবী রনবী আসতেন। আরো অনেক অগ্রজ শিল্পী সাহিত্যিক আসতেন, যেমন কবি শামসুর রাহমান সে আড্ডায় এসেছেন অনেকদিন। সেই সময়ই আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয়। সেলিম আমার এক বছরের সিনিয়র। সেই আড্ডাটা বন্ধুত্বে রূপ নেয়। সেখানে নানা ধরনের লেনদেন হতো। সেই সময় যে সাম্প্রতিক কবিতা, গল্প, নাটক, উপন্যাস এসব নিয়ে আলোচনা হতো। পরে একদিন আড্ডাস্থলে শুনি যে সেলিম আল দীন নাটক লিখেছে টেলিভিশনের জন্যে। এমনকী মঞ্চের জন্যও নাটক লিখছে। এর মধ্যে শুনলাম সেলিমের একটি নাটক ‘বহুবচন’ করবে। নানা ধরনের কথাবার্তা হচ্ছে। সেই আলোচনা থেকে এবং তাঁর কথাবার্তায়-পড়াশোনায়, বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে প্রগাঢ় দখল ছিল। খুব গভীরে যেতে পারতেন, যে কোন টেক্সটের। এবং ক্লাসিকগুলো একেবারে আঙুলের ডগায় ছিল। ওয়ার্ল্ড ক্লাসিকস বিশেষ করে লিটারেচর। তখনই আলোচনায় আমি বলছিলাম কী ধরনের নাটক লেখেন? তখন বললেন যে আমি এই ধরনের নাটক লিখি। তাঁর নাটকগুলোর মধ্যে একধরনের ডিপার্চার লক্ষ্য করি। অর্থাৎ প্রথাগত যে নাট্য চর্চা ছিল তা থেকে একটা ডিপার্চার একটু দূরত্ব লক্ষ্য করি। তাঁর লেখা একটি নাটক ‘লিব্রিয়াম’ অথবা ‘ঘুম নেই’। আবার একটি নাটক লিখলো ‘এক্সক্লুসিভ ও মূল সমস্যা’। তারপর আমি যে নাটকটি ডিরেকশন দিয়েছি ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ এটা আমার আর সেলিমের প্রথম যৌথ কাজ। তাঁর লেখা, আমার নির্দেশনা। এইটি মূলত ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে বিজয় দিবসকে সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে আন্ত:হল নাট্যোৎসব করছিল তার জন্য লেখা। নাট্যোৎসবটি আয়োজন করেছিল ডাকসু। তখন ডাকসুর নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন ম. হামিদ। উনি ডেকে বললেন প্রত্যেক হল থেকে একটা করে নাটক নাট্যোৎসবে অংশ নিতে পারবে। আমরা নাট্যজগতের সঙ্গে তখন জড়িত। আমি মহসিন হলের অ্যাটাচড ছিলাম। তাই মহসিন হলের দায়িত্ব নিলাম। আমি সেলিম আল দীনের ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুনের’ নির্দেশনা দিই। এই-ই আমাদের যাত্রা শুরু। এই যাত্রা শুরু দু’জনের একসাথে। এই শিল্প যাত্রা, শিল্প জীবন। তারপরতো ছত্রিশ বছর এক সাথে। তিনটি যুগ অতিক্রম করেছি আমরা। যেটি সবচেয়ে বেশি আমার কাছে তখনকার দিনে মনে হতো, সেলিম বাংলা নাটকে এমন একটি ঘটনা ঘটাবে যেটা তার আগে বাংলা নাটকে দর্শক বা পাঠকের কাছে এর আগের অভিজ্ঞতা থাকবে না। যদি জিজ্ঞেস করেন কেন? ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ নাটকটি হচ্ছে পশ্চিমা নাট্যতত্ত্ব ও ভাবাদর্শের অনুসরণে লেখা কিন্তু তখনকার দিনে খুবই নতুন কাজ। আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র যে মাধ্যমে পড়াশোনা করেছি পশ্চিমের বা উপনিবেশিক যে পড়ালেখা আছে সেগুলোই, সেলিমও তাই করেছে। কিন্তু সেলিমের মুক্তিটা ছিল এখানে, সে অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ, মধুসূদন কমপ্লিট করেছে ক্লাস এইটে ক্লাস টেনে থাকতে। তাতে করে একটা জিনিশ হয়েছে সেলিমের এক ধরনের উপনিবেশিক মানসকে, অবলেশকে অস্বীকার করার চিন্তা ভাবনা ছিল না। কিন্তু ‘জন্ডিসও বিবিধ বেলুন’ কিন্তু তা নয়। ওটা সম্পূর্ণ অন্য রকম। সেটা হচ্ছে কিছু লোক অসুস্থ, দেশের লোক অসুস্থ, জন্ডিসে আক্রান্ত সরকার সেখানে ওষুধ না দিয়ে বেলুন দিচ্ছে। এটা হলো তার বিষয়। এবং সংলাপের পরম্পরা নেই, কোন গল্প নেই, কোন কাহিনী নেই। তিনটি যুবক তারা যখনই ভাবছে এ থেকে উত্তরণের উপায় কী? তখন একটি নারী তাদের সামনে এসে উপস্থিত হয়, যার শরীর বেলুন দিয়ে তৈরি। এ ধরনের উদ্ভট, অ্যাবসার্ড ভাবনা। সেলিমের সঙ্গে আমার এভাবেই পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
অঞ্জলি : প্রসেনিয়ামের বাইরে দেশীয় ধারা গড়ে তোলার দায়িত্ব আপনারা নিয়েছেন।
সেলিম আল দীন এবং আপনার কি কি বৈশিষ্ট্য ও বিশিষ্টতা সৃষ্টি করছেন?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : একটু পিছিয়ে যাই। ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’-র কথা হচ্ছিল, একটু ডিপার্চারের কথা বললাম। সে ডিপার্চার ছিল বাংলাদেশের তার পূর্বে তৎকালীন যে পূর্ব পাকিস্তান ছিল। সেখানে যে নাটকের ধারা ছিল তার থেকে একটি নির্দিষ্ট ডিপার্চার দেখতে পাই সেলিমের লেখার মধ্য দিয়ে। আমাদের প্রযোজনা এবং আমার পরিচালনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু সেটিও সঠিক পথ ছিল না হাঁটার। সে পথে এগুলে আমাদের এই পর্যায়ে বাংলা নাটক এসে দাঁড়াত না। আজকে যে মৌলিক নাট্যচর্চা, লোকনাট্যরীতি, বাংলার নাট্যরীতি, বাংলার শিল্পরীতি, অভিনয়রীতি, প্রয়োগরীতি এগুলো আলোচিত হচ্ছে এবং বিশ্বনাট্যমঞ্চে এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে বাংলা নাটক তার নিজস্ব ধারা আঙ্গিক, যে অবয়বে দাঁড়িয়েছে। এটি করার প্রস্তুতি তখনই। কিন্তু তখন আমরা বুঝতে পারিনি যে কী করে শুরু করবো। এটিও সেলিমের একটি কাজ। সেলিম প্রথমেই, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’ করার মধ্যে দিয়ে এবং শিমুল [ শিমুল ইউসুফ] যখন সেটাকে ফোকে শুরু করল-সেলিম তখনই একটু নড়ে বসলো-দেখলো যে এটি একটি আধুনিক নাটক ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’। সেইখানে ফোকের গান এবং অভিনয় প্রবণতা। অভিনয়ের রীতিটাও আমি একটু ফোকে নিয়ে গেলাম যাত্রার একটি প্যাটার্নে। তখন সেলিম ভাবলো যে আরে এটিতো অন্য ধরনের একটি ‘ভিশন’ হয়েছে। তো কী করা যেতে পারে? সেলিম তখনো সিদ্ধান্ত নেয়নি যে, সে এরকম একটি পথে হাঁটবে। একটি অজানা পথে হাঁটবে। সে তখনও লিখলো ‘শকুন্তলা’ সেটি যদিও একটি অসাধারণ নাটক। আপনারা জানেন সেটা ১৯৭৬-৭৭ সালের কথা শকুন্তলা নাটকে আমরা প্রথমে লক্ষ্য করবো ভাষারীতির দিক থেকে এবং স্ট্রাকচারের জায়গাতেও নাটকে একটা বিরাট পরিবর্তন ঘটাতে একটা উদ্যোগী হয়েছে। সেটা হচ্ছে যে ভাষায় দেখবেন যে ক্লাসিক্যাল অর্থাৎ ধ্রুপদী ভাষা। বিশেষ করে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার দেখা যায়। এবং এগুলো একটু খটমটে লাগলো লোকের কাছে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে গাঁথুনির জায়গায় অর্থাৎ নাটকের স্ট্রাকচারের জায়গায় উনি যেটা করলেন সেটি হচ্ছে অভাবিত কাজ সেটি হচ্ছে যে বর্ণনার ব্যাপার অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে বর্ণনাত্বক নাট্যরীতির একটা আভাস উনি দিলেন। কিন্তু তারপরে করলেন, ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টরী’। সেটা সম্পূর্ণ একটি বর্ণনাত্মক ধারা। তখন সেলিম অলরেডি বুঝে ফেলেছেন বাংলার যে নিজস্ব নাট্যরীতি আছে সেটির মধ্যে দিয়ে একমাত্র বাংলা নাটকের মুক্তি ঘটতে পারে। রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে; জাতি মুক্ত হয়নিÑএটাই সেলিমকে খুব পীড়া দিত। না অর্থনৈতিক ভাবে, না রাজনৈতিক ভাবে, না সাংস্কৃতিক ভাবে এই বাঙালি জাতি মুক্ত হয়নি। তারা একটি উপনিবেশিক অবলেশের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে সমস্ত শিল্পরীতি পশ্চিমের শিল্পরীতি, পশ্চিমের রাজনীতি, পশ্চিমের রাষ্ট্র কাঠামো এইগুলোর একটা অনুকরণ করে চলার চেষ্টা। সেজন্য সেলিম দাঁড়ালেন এবং তিনি ‘কীত্তনখোলা’ লিখলেন। এই কদিনের অভিজ্ঞতা অর্থাৎ মুনতাসির, শুকুন্তলা, চরকাঁকড়া এই তিনটার অভিজ্ঞতায় তিনি ‘কীত্তনখোলা’ লিখলেন। ‘কীত্তনখোলা’ নাটকেই দেখবেন প্রথম সমগ্র বাংলাদেশ উঠে আসলো। একটা মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনা আমরা লক্ষ্য করলাম। কেমন করে চরিত্রের দিক থেকে শত শত চরিত্র, বর্ণনার দিক থেকে নানা বর্ণনা, গান, অর্থাৎ সেলিম আল দীন একটা মহাকাব্যিক অ্যাপ্রোচ নিয়ে দাঁড়ালেন। মহাকাব্যিক ভাবনা নিয়ে তিনটি নাটক পর পর আনলেন। একটি হচ্ছে কীত্তনখোলা, একটি হচ্ছে কেরামতমঙ্গল, একটি হচ্ছে হাতহদাই। তিনটিতেই শত শত মানুষ, এবং প্রান্তিক মানুষ, নিম্নবর্ণের মানুষ তাদের জীবন, তাদের অর্থনীতি তাদের সুখ-দুঃখ-ভালবাসা। তাদের সংস্কৃতির অভিব্যপ্তি, আমাদের লেটো গান, আমাদের আস্তর, আমাদের কবিগান-যাত্রাপালা। এই সমস্ত কিছু ডালপালা মেলে সেলিমের নাটকে আমরা দেখলাম যে বিস্তার লাভ শুরু করলো। যার মধ্য দিয়ে ‘কেরামতমঙ্গলের’ মত মহাকাব্যিক নাটকও সেলিম উপহার দিল এই জাতিকে এবং আবার যেখানে দুঃখ-বেদনা এবং কষ্টের একটি বহমান নদী যেন সমগ্র বাংলাদেশকে বুক চিরে যায় পদ্মা আর যমুনা যে খরস্রোতা সেই জিনিশটাই আপনি সেলিমের নাটকে দেখবেন। কেরামত আবার তার তীরে বসবাসকারী যে মানুষগুলো আনন্দ-বেদনার বিশেষ করে আনন্দের জায়গায় এবং হাজার বেদনার মধ্যে আনন্দের জীবন যাপন করে আমাদের সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষেরা, অথবা আমাদের প্রান্তিকজনেরা, ব্রাত্যজনেরা তাদের জীবন কাহিনীগুলো নোয়াখালী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষগুলোর চরিত্র আমাদের নাটকে আসা শুরু করলো। এই মুখগুলো আগে কখনো দেখা যায়নি। সেলিম দুটো কাজ করলেন, একটি ভাষার পরিবর্তন আনলেন। অর্থাৎ শিল্পের ভাষা কিন্তু আলাদা হতে হয়। শিল্পের ভাষা কিন্তু কখনো খবরের কাগজের ভাষা নয়। আমাদের এইটিই বুঝতে হবে। রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব ভাষারীতির কারণে রবীন্দ্র সাহিত্য, মধুসূদনের নিজস্ব ভাষারীতির জন্যে মধুসূদনের সাহিত্য। তেমনি করে সেলিম আল দীনের নিজস্ব ভাষারীতির কারণেই তাঁর নিজস্ব শিল্প ভাবনা, শিল্পদর্শন। এই জায়গায় তিনটি নাটকের মধ্যে দিয়ে আরো একটি জিনিশ আমরা অবলোকন করি। সেটি হচ্ছে আদিবাসী মানুষেরা ছিল ব্রাত্যজনের পাশাপাশি বাঙালি সমাজের আশি ভাগ নিম্ন আয়ের মানুষেরা দুঃখ কষ্ট বেদনার মধ্যদিয়ে যে মানুষগুলোর জীবন তাদের দুঃখ-বেদনার মহাকাব্য যেমন উন্মোচিত হয়েছে, হাজার হাজার চরিত্র সংঘাতময় একটি ভূমির মধ্যে। তেমনি করে আমরা দেখতে পাবো ‘হাতহদাই’তে এসে সেলিম এই বেদনার্ত মানুষগুলোর মধ্যে দিয়ে কেরামতের আর্ত চিৎকার নয় আনারভাণ্ডারের আনন্দসঙ্গীত আমরা শুনতে পাই। এটা কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার। এবং এটি হচ্ছে সেই নোনা গন্ধ মাখা মানুষগুলোর সমুদ্র উপকূলের এত বেদনা এবং কষ্টের মধ্যেও তারা নাচ-গান, অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি দিন পার করছে। এই হচ্ছে বাংলাদেশের চিত্র। এই কাহিনীগুলো আগে আমরা কখনো দেখতে পাইনি। আমরা দেখতে পেয়েছি আগে সব সময় একধরনের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি থিয়েটার নির্মাণ করা হয়। সংলাপগুলো অত্যন্ত অনিবার্য মনে হয়েছে। সেলিম এসে প্রথমে ঘোষণা করলেন থিয়েটারে সংলাপ অনিবার্য নয়। সংলাপ ছাড়াও থিয়েটার হতে পারে। বর্ণনা করলে সেটাই তো থিয়েটার, অসুবিধা কোথায়। তাহলে আমরা যেটা দেখলাম, সেলিম বর্ণনাত্মক ধারা বেছে নিলেন। তারপর আস্তে আস্তে উনি পাঁচালীর দিকে এগুচ্ছেন। কিন্তু সেইখানে এসে সেলিমের এই যে ব্রাত্যজনের পাশাপাশি আদিবাসীদের কথা বললাম এইটা কিন্তু খুব ইমপর্টেন্ট। বাংলা সাহিত্যে বিশেষ করে বাংলা নাটকে আদিবাসীদের অবস্থান কোথাও খুঁজে পাই না। সেলিম আল দীনের ‘কেরামতমঙ্গল’ ৮৩-৮৪ সালে যখন সে লেখে তখন হাজং এবং গারোদের নিয়ে বিশাল দু’টি খণ্ড লিখলো। আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে বাংলা মঞ্চে লক্ষ্য করলাম, আমাদের ভূখণ্ডে বাঙালি ছাড়াও অন্য মানুষরাও বসবাস করে। কবে সে লিখেছে ‘করিম বাওয়ালী’ ঊনিশ’শ তিয়াত্তর সালে। যেখানে দেখবেন অবাক বিস্ময়ে, ‘সুন্দরবন’ আজ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য, বাংলা উপন্যাস বা বাংলা নাটকে নেই। সেইভাবে উপস্থিতি নেই। ওই নাটকটা সুন্দরবনের ওপর। যে সুন্দরবন নিয়ে আমরা অহংকার করছি। আসলে সেলিম এদেশের প্রকৃতি-এদেশের মানুষ-বিশেষ করে ব্রাত্যজন, প্রান্তিকজন, সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া জেলে-কামার-কুমার, মাঝি এদের জীবন। এদের সঙ্গীতময় জীবন। এদের স্ট্রাগলের মধ্যে যে রিদমটা আছে, ছন্দটা আছে, সেই ছন্দটাকে ধরে নিয়ে আসা। তাদের মুখের ভাষার সাথে আমাদের যে ধ্র“পদী ভাষারীতি আছে নাটকে সেটির সংমিশ্রণ আছে। এটাকে অনেকে সমালোচনা করেন। আমি মনে করি সেলিম একটি নতুন ভাষার জন্ম দিয়েছে। তাঁর নিজস্ব প্রয়োজনে। কারণ যে মানচিত্রটা আঁকতে চেয়েছিল যে মুখগুলোকে তুলে আনতে চেয়েছিল বাংলা মঞ্চে। সে মুখগুলো তুলতে গেলে শিল্পের ভাষা সাধারণত মুখের ভাষার চেয়ে একটু আলাদা হয়। একটা এক্সজ্যাম্পল দিচ্ছি, লালনের ভাষা লালনের যে সঙ্গীতের ভাষা সেটা কী তৎকালীন সময়ের কাঙ্খিত ভাষা? না। ভাষা নয়। এটি হলো শিল্পের ভাষা। লালন নিয়েছে বাস্তব সাধারণ মানুষ থেকে কিন্তু লালন নির্মাণ করেছে সেই ভাষাটা। সেলিমও সেই কাজটি করেছে। সেলিম আলাদা হলেন এই জায়গায়। তারপর আরেকটি পর্যায়ে আছে সেলিমের সেটি পরে আসবো। এই তিনটি গেল সেলিমের মহাকাব্যিক ব্যঞ্জনার নাটক। তারপর আপনি দেখবেন-‘চাকা’, হরগজ, প্রাচ্য,এই ধরনের নাটকগুলি, ‘যৈবতী কন্যার মন’। এই নাটকগুলিতে দেখবেন অসাধারণ ভাবে সাধারণ মানুষের জীবন বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাত্রার সম্পূর্ণ উপস্থাপনা লক্ষ্য করবেন। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যপার এটা হলো কথানাট্য। যেটা আমরা পুঁথিপাঠের মধ্যে দেখতে পাই। আমাদের পুঁথিপাঠের যে রীতি আছে সেই রীতিটাকে ভেঙে মঞ্চে নিয়ে আসলেন। ‘কথানাট্য’ নামে। তবে সেখানে সমস্ত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্য দিয়ে তাদের দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, আনন্দ বর্ণনার মধ্য দিয়ে। সেগুলো সাম্প্রতিক কিন্তু সেগুলো আধুনিক। সেলিম যে গ্রামীণ পটভূমিতে নাটক লিখেছে তার অর্থ গ্রামীণ নাটক না। সবচেয়ে আধুনিক নাটকটি লিখেছে। ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ নিয়ে যে এত গর্ব করিÑআমাদের কিন্তু বলতেই হবে সেলিমের সবচাইতে সাম্প্রতিক নাটক যেটি , ‘স্বর্ণবোয়াল’ সেটি কিন্তু ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী’ র মতনই একটি মহান কাজ কিন্তু তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে। কারণ সেলিম প্রাচ্যের দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। সেলিম এবার কথানাট্যের ‘ফেজ’ পেরিয়ে সেলিম গেল কোথায়। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং জায়গায় পা দিল। সেটা হলো পাঁচালী আঙ্গিকে। যেটি রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পাঁচালী আঙ্গিকের ওপর নাটকগুলো রচনা করেছেন। সেলিম আলদীনের ‘বনপাংশুল’ পাঁচালী আঙ্গিকে লেখা। এবং পরবর্তীতে তার যে কটি নাটক দেখবেন সবগুলিই পাঁচালী আঙ্গিকে লেখা। সেটা কিন্তু ‘প্রাচ্য’ বিশেষ করে, এখনকার দিনে যেমন ‘ধাবমান’। পাঁচালী আঙ্গিকে সেলিম বাংলার লোকনাট্যকে এখন বিশ্বনাট্য আঙ্গিকের সাথে একই সমান্তরাল পর্যায় নিয়ে আসলেন। এটি সেলিম আল দীনের একটি বিশাল অবদান বলে মনে করি। এবং বাংলা নাটক উপনিবেশিক অবলেশের যে আবরণটা আছে সেটা ছিন্ন করে স্বাধীন এবং মুক্ত ভাবে দাঁড়িয়েছে। এখন হচ্ছে নতুন নাট্যকর্মী, নাট্যকারদের দায়িত্ব, লেখকদের দায়িত্ব কী করে নিজস্ব ভাষারীতির মধ্য দিয়ে এটা ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ কেন্দ্রিক ভাষা নয় সম্পূর্ণ অন্য ভাষা যে ভাষাতে বিরাজমান পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বঙ্গোপসাগর উপকূলে মানুষের মুখে মুখে রচিত হয় যে কাব্যগাঁথা। সেগুলোকে কী করে পরিশীলিত ভাবে আপনি আপনার শিল্প বিজ্ঞান দিয়ে মঞ্চে বা পাতায় লিখবেন সেটি আপনার ব্যাপার। কিন্তু সেলিম দৃঢ়তার সঙ্গে এই পথটি দেখিয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের।

অঞ্জলি : সেলিম আলদীনের এবং আপনাদের মতাদর্শ কী ছিল, জাতীয়তাবাদী না
মার্কসবাদী?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আসলে আমরা মূলত: মার্কসবাদী ভাবনা থেকেই কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু পরে এটাও বিবেচনা করেছি জাতীয়তাবাদী বিপ্লবটা যতক্ষণ পর্যন্ত সম্পন্ন না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সমাজ কাঠামো দাঁড় করাতে না পারাটার, যে ব্যর্থতা আছে সেটি আমরা স্বীকার করে নিয়ে বলবো। একটি গণতান্ত্রিক সমাজ দাঁড় করে তার মধ্য দিয়ে মানুষের সম অধিকারের একটি সমাজ আমাদের কল্পনা, রাজনৈতিক বিশ্বাসেও ছিল, আদর্শেও ছিল এবং আমরা মনে করি আমাদের একটি শিল্পাদর্শেও এটি এখনো আছে।

অঞ্জলি : সত্তর এবং আশির দশকে মঞ্চ নাটক আমাদের সমাজে প্রভাব ফেলতে
পেরেছিল। এখন কী পারছে?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আমার কথা সত্তর এবং আশির দশকে হ্যাঁ, মঞ্চ নাটক প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু সেখানে কী রাজনীতিকে রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছিল, করেনি। সত্তর দশকে বাধার সম্মুখীন হয়েছে খুব বেশিÑনাটক করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়েছিল রাস্তায়। পথ নাটক যেটা প্রথম, ‘চরকাঁকড়ার ডকুমেন্টরি’, এটা ঠিক রাষ্ট্রকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমি মনে করি বর্তমান নাটকগুলোও সমাজ ও রাষ্ট্রকে কোন না কোন ভাবে আন্দোলিত করেছে। আজকের যে মৌলবাদ ও রাজাকার, আলবদর বিরোধী সেই আন্দোলনটা যুদ্ধাপরাধী বিরোধী যে আন্দোলন সেখানে কিন্তু নাটকের একটি বড় ভূমিকা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছে। এমন কী মৌলবাদীদের যে রাজনীতিটা আছে তথাকথিত ধমের্র নামে যে রাজনীতি তার বিপরীতে মঞ্চে এখন পর্যন্ত নাটক সক্রিয়, চলমান, বেগবান বলে বিশ্বাস করি।

অঞ্জলি : সমাজ প্রগতির আন্দোলন বিকাশে সেলিম আল দীন এর দর্শন বা
আপনাদের দর্শন কী ছিল।

নাসির উীদ্দন ইউসুফ : আমাদের পরিষ্কার দর্শন আমাদের প্রথম উচ্চারণই ছিল, ঢাকা থিয়েটার যখন আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি তখন আমরা বলেছি, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বঙ্গোপসাগর উপকূলে বসবাসকারী এদেশের মানুষের হাজার বছরের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লড়াইয়ের ঐতিহ্য আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে। আমরা এদের কাছে দায়বদ্ধ। এই মানুষগুলোর মুক্তির মধ্য দিয়ে একটি রাষ্ট্রের বিকাশ হতে পারে। না হলে যে স্বাধীন মুক্ত বাংলাদেশ আমরা একাত্তর সালে করেছি এটি মুখ থুবড়ে পড়বে এবং সত্যি কথা বলতে কী পড়ছেও প্রায়। রাষ্ট্রটি একটি গণতান্ত্রিক ভাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারার কারণে আমরা দেখবো যে, সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার, দাবিসমূহ সম্পূর্ণ ভাবে পরিত্যাজ্য হয়েছে আমাদের রাজনীতিবিদদের দ্বারা, আমাদের শাসকদের দ্বারা। আমরা মনে করি যে এদের মুক্তির যে রাজনৈতিক আদর্শ যেটি সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। আমরা বিশ্বাস করি সেটি আমাদের মূল আদর্শ। সেই আদর্র্শে দাঁড়িয়ে সেলিম আল দীন, আমি বা ঢাকা থিয়েটার, গ্রাম থিয়েটার করেছিলাম। সেই গ্রাম থিয়েটার আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আমরা বলেছি যে, মানব মুক্তির সবচেয়ে আধুনিক সংজ্ঞাটাই আমরা মনে করি মার্কসিজমের মধ্যে আছে।
গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্য দিয়ে যদি মানুষের সম অধিকারের চেতনাকে সকল মানুষের মধ্যে প্রবাহিত করা যায়, তাহলেই একমাত্র সম্ভব। সেটা যে সেলিম আল দীনের নাটকে সেটা দেখবেন সেলিম একই সঙ্গে পুরাণ এবং আধুনিকতাকে এক করেছে। পুরাণকে এক করছেন কারণ মানুষের ভিতরে রক্তের স্রোতের মত ঢুকে যাওয়ার জন্য। মানুষের রক্তে ঢোকার একমাত্র উপায় হল পুরাণ। আপনি যখনই আধুনিক বিজ্ঞানের কথা বলবেন তখনই সেটাকে নেয়ার জন্য একধরনের রেজিস্টান্স তৈরি করে। তার ট্রাডিশনের কারণে তার ঐতিহ্য ভাবনা থেকে। সে ভাবছে যে তার সম্পদটা হয়তো হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি যদি পুরাণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে পারেন সে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় এরকম হতে পারে। সেখানে আপনার ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সবকিছুই আপনার সফল থাকবে। আফ্রিকায় এ ধরনের মুভমেন্ট আছে। ল্যাটিন আমেরিকায়ও একটি মুভমেন্ট দেখতে পাবেন, সেখানে কিন্তু অনেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে যেখানে আন্দোলন বেগবান হয়েছে। আপনি সেখানে দেখবেন, পুরাণ প্রকৃতি এবং মানুষের প্রেম ভালবাসা, দুঃখ, বেদনার কাহিনী সমান ভাবে সমাদৃত হয়েছে, দল দ্বারা। অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক পার্টি দ্বারা। যেটি আমাদের দেশে হয়নি। আমাদের দেশে একটি দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে পার্টিগুলোর সাথে। বিশ্বাসের জায়গায় কোন দ্বন্দ্ব নেই। আমরা মনে করি আমাদের উদারনৈতিক হওয়া উচিত। উদারনৈতিক অর্থ এটা না যে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’কে সরাসরি গ্রহণ করে ফেলা। আমরা মনে করি ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়ানো উচিত। মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে যদি আমাদের দ্বারাতে হয়, মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে যে ধরনের আগ্রাসন তৃতীয় বিশ্বে^ চলছে তার বিরুদ্ধে সেলিম আল দীন একমাত্র মানুষ যিনি দাঁড়িয়ে বলছেন, এই বাংলাদেশে যে তোমার সংস্কৃতির ঐতিহ্য-ইতিহাসরীতি, শিল্পরীতি এবং শিল্পভাবনা, দর্শন রয়েছে। সেটি অনেক বেশি। সরলীকরণের যে প্রবণতা রয়েছে মুক্তবাজারের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং রাজনীতির। এটিকে আমাদের প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের নাটকে এই সব কথাগুলো বারবার উঠে এসেছে। প্রাচ্যের দর্শনের কথা উঠে এসেছে। দ্বন্দ্ব নয় সহমর্মিতা, সম্প্রতি এগুলোর মধ্য দিয়ে মানব জাতির মুক্তি হতে পারে। এটিই আমাদের আদর্শ।

অঞ্জলি : প্রতিটি জাতির জাতীয় মঞ্চ আছে। এ ব্যাপারে সেলিম আল দীন এবং
আপনাদের ভাবনা কী ছিল?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : দুটো জিনিশ আছে। জাতীয় মঞ্চ বা ন্যাশনাল সেটি কিন্তু আছে এবং তৈরি হয়েও গেছে। কিন্তু এটি শুধু কমপ্লেক্সের মধ্যে দিয়ে তৈরি করলেও হবে না। এটার জন্য ব্যাপক আয়োজন ও কাজের প্রয়োজন ছিল। যেটি করেনি আমাদের নেতারা। এভাবে বলতে চাচ্ছি, জাতীয় মঞ্চ বা জাতীয় নাট্যশালা। যেটা আপনারা বলছেন সেটাতো একটা স্ট্রাকচার মাত্র। কিন্তু এর পেছনে একটি গূঢ় দর্শন থাকতে হবে। সেই দর্শনটা হচ্ছে জাতীয় নাট্য আঙ্গিক। সেলিম আল দীন এবং আমি বারবার বলার চেষ্টা করেছি আমাদের যে নাট্যনীতি এবং আঙ্গিকগুলো রয়ে গেছে সারাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সেই আঙ্গিকগুলো চর্চার মধ্য দিয়ে আধুনিক সমস্যা, আধুনিক ভাবনা, দর্শনগুলোকে আমাদের যে লোকনাট্যরীতি রয়েছে হাজার বছরের। তার ভেতরে যদি ঢুকিয়ে দিয়ে একটি আধুনিক নাটক করা যায়। সেটি আধুনিক নাট্যআঙ্গিক হিশেবে উন্নীত হতে পারে। আজকের পালা গান, আজকের পাঁচালী আমার মতে হাজার বছরের যে পাঁচালী রয়েছে এমনকি ‘গম্ভীরা’ এগুলো অভিনয় যেমন লেটো বা ভাসান যাত্রা। এই আঙ্গিকগুলোকে যদি বিবেচনা করি জাতীয় নাট্যআঙ্গিক হিশেবে। তাহলে একমাত্র আঙ্গিকের দিক থেকে আপনি উপনিবেশিক ধারা থেকে মুক্তি পেতে পারেন। অন্যথায় উপনিবেশিক যে ধারা আছে তা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন সম্ভাবনা আমি দেখছি না। সুতরাং আমাদের মূল লক্ষ্যটা ছিল আমরা জাতীয় নাট্যআঙ্গিক নির্মাণ করবো। আর জাতীয় নাট্যশালা বা মঞ্চের কথা যেটা বলেছেন সেটা দীর্ঘ দিনের সকল নাট্যকর্মীদের দাবি ছিল যেখানে বসে আমরা কথা বলছি শিল্পকলা একাডেমী। তার পেছনেই যদিও জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তন হয়েছে। কিন্তু এটির মধ্যে দিয়েই শেষ নয়। আজকে রাজশাহীর কথা যদি বলি, চট্টগ্রাম,খুলনা, সিলেটের কথা বলি, নোয়াখালীর কথা বলি সেখানেও এই ধরনের মঞ্চের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে এই জাতীয় নাট্যশালা যে সরকার তৈরি করেছে এই স্ট্রাকচারটা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দিতে হবে। দিলে তাহলে দেখবেন যে একসময়Ñভালো নাটক অনেক বেশি নাট্যকার, তরুণরা আগ্রহ বোধ করছে। তাদের সম্ভাবনার দুয়ারটা খুলে যাচ্ছে। কিন্তু সেটা করছি না। দুটো কাজ, একটা স্ট্র্র্রাকচার তৈরি। আরেকটা আঙ্গিক নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষাÑনিরীক্ষা করা। সেটা ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে করতে হবে।

অঞ্জলি : সেলিম আল দীনকে নিয়ে আপনাদের সামনের দিনগুলিতে পরিকল্পনা কী?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : সেলিম আল দীন চলে যাওয়াতে বলতে পারেন আমরা একেবারেই নিঃসঙ্গ হয়েছি। তবে সেলিমের লেখা এখন পর্যন্ত চারটি নাটক আছে। এই চারটি নাটক করতে আমি আমার কথা বলতে পারি আমার আয়ুসীমাও হয়তো এই চারটিই। স্বর্ণবোয়াল, ধাবমান পুত্র, ঊষাউৎসব ও স্বপ্নরমণীগণ। এই চারটি। এর মধ্যে তিনটি নাটক একটি নৃত্য নাটক বা নাটগীতনৃত্য উৎসব। এছাড়া ‘হাড়হাড্ডি’ নামক একটি নাটক অর্ধেক লেখা আছে। এতো অসময়ে চলে গেল আমি মনে করি যে বিশাল একটি ক্ষতি। রবীন্দ্রোত্তর কালে শ্রেষ্ঠ নাট্যকার যখন চলে যায়, তখন আমাদের বুঝতে হবে, যে মানুষটা দাঁড়িয়ে ছিল একেবারেই নতুন ভাবনা এবং দর্শন, শিল্পদর্শন নিয়ে। সে মানুষটা যখন চলে যায় তখন একধরনের নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এই নাটকগুলো করবো তবে পরে কী করবো সেটা বলতে পারবো না। তখন হয়তো আমার বয়সও থাকবে না। এই চারÑপাঁচটি নাটক করতেই আমার দশ বারো বছর লেগে যেতে পারে। পাশাপাশি যে কথাটি বলতে পারি সেটি হচ্ছে যে, সেলিম আল দীন যে বিশ্বসাংস্কৃতিক কেন্দ্র করার ঘোষণা দিয়েছিল এবং বেশ কিছুদূর কাজও আমি আর সেলিম এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেটি এখন আমি এবং শিমুল ও অন্যান্য বন্ধুরা মিলে বিশ্বসাংস্কৃতিক কেন্দ্র করবো। যেখানে তাবৎ বিশ্বের শিল্প সংস্কৃতি আর বাংলাদেশের শিল্প সংস্কৃতির নিয়ে গবেষণা। যেখান থেকে নতুন আগামীদিনের শিল্প সৈনিক বের হবে বলে আমরা মনে করি।

অঞ্জলি : আপনার কাছে একটি জিনিশ জানতে চাইবো নাটক একটি আন্দোলন
যেহেতু নাটকের সঙ্গে শিক্ষিত মানুষ জড়িত থাকে এবং নাটককে কেন আপনারা জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছেন না?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : উপজেলা পর্যায়ে নাটক করছে অনেক দলই। তারা স্বাধীন ভাবে নাটক করছে। এবং তাদের গ্রোথ হচ্ছে। গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশনের একটা দায়িত্ব। তারা বিভিন্ন জেলা পর্যায়ে গেয়ে ওয়ার্কশপ করে নাট্যকর্মীদের তৈরি করতে হবে। তাদেরকে আহবান জানাতে হবে, তাদেরকে উৎসাহিত করতে হবে। একধরনের প্রণোদনা দিতে হবে যা আমরা পারিনি কিন্তু ঢাকা থিয়েটার এবং সেলিম আল দীন ‘বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার’ তৈরি করেছে। ২৬০টির মতো সংগঠন আছে। তার মধ্যে ২০০টি সক্রিয় আছে। এই ২০০টি সংগঠন গ্রাম পর্যায়ে আছে। আমরা যেটা চেষ্টা করেছি গ্রামের যে নাট্যকর্মী এবং শিল্পপিপাসু মানুষ আছে তাদের তৃষ্ণা মেটাতে। যাদের সৃষ্টিশীলতা আছে সে সকল কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, ছাত্রদেরকে উৎসাহিত করা যে, তোমরা আসো। তোমাদের এলাকায় যে নাট্যআঙ্গিক আছে, সঙ্গীতরীতি, তোমাদের এলাকায় যদি কোন নৃত্যরীতি থেকে থাকে বা সাহিত্যের পুঁথি থেকে থাকে তা উদ্ধার করে সেই সব নিয়ে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, কৃষক বিদ্রোহ নিয়ে। তোমাদের এলাকায় যদি কোন কাহিনী থাকে তবে তোমাদের এলাকার আঙ্গিক দিয়ে তা তৈরি করি। এরকম বেশ কিছু আমরা পরীক্ষাÑনিরীক্ষামূলক কাজ ২৫ বছর ধরে করছি। তাতে কিছু সফলতা পেয়েছি। তবে ব্যাপক সফলতা পেয়েছি কিনা তা বলতে পারবো না। যে কর্মীটি তৈরি হচ্ছে আজকে অথনৈতিক কারণে, পেশা-জীবিকার প্রয়োজনে নাটক ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যাচ্ছে। এইটে আমাদের জন্য বিরাট ধাক্কা। তবুও আমাদের পক্ষে সম্ভব আমি মনে করি যে আগামী দিনে একটি স্বপ্ন দেখতে পারি বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, অধিকাংশ গ্রামে একটি করে নাটকের দল তৈরি হয়ে যাবে। কারণ, আমরা ‘সেলিম আল দীন স্টাডি সার্কেল’ করেছি। আগামী ১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হবে। সেলিম আল দীনের লেখা শুধু নয় ‘প্রাচ্য’ নাটক দিয়ে সারা দেশে ‘পাঠচক্রটা’ বিস্তৃত হচ্ছে। আমরা এখানে শুধু সেলিম আল দীন নয় গত শতকের কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশ। হাল আমলের কবি, সাহিত্যিকÑইউরোপ, আমেরিকা, ল্যাটিন আমেরিকার কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকারদের অর্থাৎ তাবৎ পৃথিবীর শিল্পীদের পাঠের মধ্য দিয়ে পর্যালোচনা, পরীক্ষাÑনিরীক্ষার মধ্য দিয়ে সারাদেশে একটি আন্দোলন গড়ে তোলার ইচ্ছা আমাদের আছে।

অঞ্জলি: নাট্যজন সেলিম আল দীনের ওপর যে সাক্ষাৎকার দিলেন নাট্যনির্দেশক ও
ঢাকা থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য নাসির উদ্দীন ইউসুফ ‘অঞ্জলি লহ মোর’Ñএর পক্ষ থেকে আমি অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানাই এজন্য যে অনেক ব্যস্ততার মধ্যে বিশেষত উনি কদিন আগে মৌলভীবাজার ছিলেন আমি কয়েকবার মোবাইল করে আজকে তাঁকে শিল্পকলা একাডেমীর নাট্যশালার লাউঞ্জে ৬ এপ্রিল ২০০৮-এর এই সাক্ষাৎকার হয়তো স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি তাঁকে আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ : আমি ‘অঞ্জলি লহ মোর’ এর সকল কর্মী বন্ধু এবং শিল্পী বন্ধুদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে আমার মত একজন ক্ষুদ্র ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এ জন্য আমি খুবই গর্বিত। তবে সেলিম সম্পর্কে আরো অনেক কথা বলার আছে হয়তো আগামীতে কখনো লিখবো।

0 comments:

Post a Comment