আপনজনেষু জাহিদ আনোয়ার,
অভিনন্দন-অভিনন্দন-অভিনন্দন তোমায় জাহিদ। তুমি অনুজ। খুশিকে কিভাবে প্রকাশ করবো, খুঁজে পেলাম না। উপযুক্ত কোন শব্দবন্ধ। তাই আমার এই দীনতা প্রকাশ! হয়তো তুমি এখন শহীদ মামুন পৌর মার্কেটের দ্বিতলে বিদ্যাসুন্দরের ঘরে। এই চিঠি পেতেই তুমি সহাস্যে চিৎকার করে উঠবে-সাবাস্, সাবাস্ পাঠান হৃদয়। বুকে জড়িয়ে ধ’রে আমার বুকে মুখটা কাৎ ক’রে কিছুক্ষণ ছায়ার হৃদয়ে কান দিয়ে রক্তে রক্তে ধমনীর আনন্দনৃত্য অথবা অন্য কিছু শোনার চেষ্টা করলে! ঘোর কেটে গেলে দেখলে ‘আমি কোথায়? শূন্য! তবু দু’মুঠোয় হৃদয় বন্দী!
হাতে পেয়ে পড়েছি-গুরুদেবের আশ্রম-বিশ্বভারতী। সে দিন বাড়িতে সামান্য কিছু কথায়, আলোচনা করে এমন দু’একটি সংক্ষিপ্ত কথা বলতে তোমার মুখটা পূর্র্ণিমার দীপ্ত চাঁদে যেন একখণ্ড মেঘ ঢেকে দিয়ে চলে গেল। পরক্ষণেই তোমার কলমের সহজিয়া সুরের কথা বলতেই আবার সেই হাস্যোজ্জ্বল চন্দ্রমা। এমন করে তোমায় কে কথা বলতে শেখালো? দৃশ্য ছবির পর ছবি। ছুটন্ত রেলগাড়ি স্বপ্ন সওয়ারি নিয়ে ছুটে চলেছে। জানালার খোলা হাওয়ায় দু’টো চোখ শুধু খুঁজছে আর খুঁজছে কোথায় অরূপ রতন। ছুটে চলেছে কোন বিরাম নেই - কোথাও থামা নেই -কতো ছবি চলেছে লাল কাঁকড় মাটির দেশে। ধূ ধূ প্রান্তর। দূরে দূরে প্রাচীন তালগাছ। দাঁড়িয়ে আছে কার অপেক্ষায়? বটগাছ, শাল, মহুয়া, পলাশ, রুদ্র পলাশ, ছাতিম এর দীর্ঘ ছায়া অশোকের বনে। লাল খোয়াই মাটির প্রান্তর বুক চাপা আকাঙ্খা নিয়ে অপেক্ষা করেছে কাকে আহবান করবার জন্যে? এই মাটিতেই তো প্রাচ্য প্রতীচ্যের আত্মার এক বাঙময় ছন্দিত মিলনরূপ। সব কিছুতেই সেই এক। দেশ, কাল অঞ্চলের সংকীর্ণ বেড়া ভেঙে গেলÑমহামিলনের সে কী অসীম তৃপ্তি!
এই সব অনূভূতি, তার প্রতিক্রিয়া সবই তোমার চোখ দিয়ে দেখা। গুরুদেবের আশ্রমে যখন যেখানে গেছো সবাই আপন করে নিয়েছে। নিছক চা বিক্রেতা, ছোট ঝুপড়ি হোটেলের সামান্য মালিক এমনকি দিন আনা দিন খাওয়া রিক্সাচালক কেউ উপেক্ষা করেনি। কারণ, সব সময়েই চলছে সেথায় ভালবাসার মরশুম। আবার যারা এসেছেন কবিতা উৎসবে বিভিন্ন অঞ্চল বা জেলা থেকে যে যুবক যুবতী-বা নবীন-প্রবীন তারাও কেমন যেন লতার মতো আঁকড়ে ধরেছে-একে অপরকে বিশেষ করে জাহিদ তোমাকে ভালবাসা মাখিয়ে। কবি-লেখক সবাই তোমাকে [বাংলাদেশকে] পাওয়ার জন্য কত কাছের মানুষ, আপন মানুষ ভেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল গেস্ট হাউসেও সবার প্রীতি যেমন ছিল তেমনি আবার ছন্দপতনের কথা, সামান্য হালকা তুলির টানে এঁকেছো। রাতে ঘুম হয়নি কয়েক জন অতিথির নাক ডাকার লয়কারিতে। যত গভীর হয়েছে রাত দ্রুত তালে বেজে চলেছে। সমে আর ফেরেনি কেউ। বাইরে মাঘী পূর্ণিমার রাত নিশীর মতন ডেকে নিয়ে গেছে সামনের মাঠে, দুধের মতো জ্যোৎসনা ঢালা ঘাসের কাছে। অনিবার্যভাবেই মনে হয় এও তো সেই স্বপন পারের ভালবাসার ডাক। অপূর্ব অচিন্তনীয় তোমার অনুভব। সবাইকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করেÑদেখে যাও দেখে যাও হেথা গুরুদেবের আশ্রমে সম্প্রীতির ইকোলজি! প্রসঙ্গক্রমে আর একটি বিষয়ের উল্লেখ এখানে না করলে সমস্ত বিষয়টির প্রসঙ্গ অর্থাৎ গুরুদেবের আশ্রম, শান্তিনিকেতন নিয়ে অনেক কথা না বলা থেকে যায়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসুর ‘দেখি নাই ফিরে’-র অংশ বিশেষ লেখায় উল্লেখ করে শান্তিনিকেতন সম্পর্কে এতক্ষণ যা বললাম অর্থাৎ বিশ্ব আত্মার কথা, তা উপলব্ধিতে আসত না। এখানে ‘দেখি নাই ফিরে’ বিষয়টিই হচ্ছে বিখ্যাত ভাস্কর রামকিঙ্কর যাঁর ছোঁয়ায় শান্তিনিকেতন সত্যিকারের বিশ্বনিকেতন হয়ে উঠেছে। কদমতলার মেথর পল্লীর সেই ভাস্কর যিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি তাঁকে নীচ অন্ত্যজ ভেবে নানা কথার কাঁটা ফোটানো সত্ত্বেও । ভাবা যায় না, এই পূণ্যভূমি, তীর্থক্ষেত্র সেই ‘ইয়ে’ বাড়ি থেকে আসা মানুষটির স্পর্শে আরো উজ্জ্বল হয়েছে সূর্যের মতন। এমন নজির বিশ্বের কোন দেশেই নেই। তাই তো, সম্প্রীতির এমন মুক্ত উঠোন কোথা আছে? কথায় আছে সবতীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার। সেই রকমই, জাহিদ, তোমার গুরুদেবের আশ্রম শান্তিনিকেতন, এই বই অনেক পড়ার পর একবার পড়লে শান্তিনিকেতনের আত্মাকে স্পর্শ করা যায়। সত্যি তোমার কথায় বিশ্বাস করে বলি রবীন্দ্রনাথের কাছে, শান্তিনিকেতনের কাছে খুঁজে পাওয়া যায়। সীমার মাঝে অসীমের সন্ধান। কবি সম্মেলনের প্রধান অতিথি সুপ্রিয় ঠাকুর যথার্থই বলেছেন যে,‘ বাংলাদেশের বন্ধুর [জাহিদ] উপস্থিতিতে কবি সম্মেলন [শ্রীনিকেতন মিলনায়তন] আন্তর্জাতিকতায় রূপ লাভ করেছে...........। আপনার জন্য বিশ্বভারতীর দুয়ার খোলা রইল।’
জাহিদ, তুমি সত্যিই আন্তর্জাতিক। অনেক অনেক ভালবাসা নিও। ভগ্নী শবনমকে স্নেহাশির্বাদ দিও।
ইতি আ: সুনীল খাঁ
৭.২.২০০৮


2 comments:
এই পত্রিকাটা সময় নিয়ে পড়তে হবে। মনে হচ্ছে বেশ ভাল কিছু লেখা আছে। সম্পাদককে ধন্যবাদ।
hahahahahahahaha
bajeeeeeeeee
sompadoker khochor khocho ar ki...
hehehehehe
Post a Comment