July 24, 2008

যুগন্ধর সুরসৈনিক মোমিনুল হক ভুটি

যুগন্ধর সুরসৈনিক মোমিনুল হক ভুটি
কাপুর চান্দ

জনজীবনের সাংস্কৃতিক বিকাশে মোমিনুল হক ভুটির [১৯৩৩-২০০১] ভূমিকা অপরিসীম। মা আলেকজান মৃধা। বাবা মিয়াজান মৃধা উকিল। নওগাঁ কে.ডি স্কুল হতে ১৯৫৩ সনে মাট্রিক পাশ করেন। মাঝে ঢাকা নবকুমার ইনস্টিটিউটে তিনি পড়াশুনা করেন। পঞ্চাশের মন্বন্তরে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের অন্যতম সদস্য কলিম শরাফী নওগাঁ এসে কিশোর মোমিনুল হক ভুটির গান শুনে তাঁকে উৎসাহিত করেন। ১৯৪২ ংসনে কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতা থেকে শিশু-কিশোরদের গড়ে তোলার জন্য মুকুল ফৌজ সংগঠিত করার আহ্বান জানান। এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে কিশোর বয়সে ১৯৪৯ সনে নওগাঁর শিশুকিশোরদের তৈরি করার লক্ষে তিনি ‘মুকুল ফৌজ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন।
মোমিনুল হক ভুটি জনমানুষের দুর্গতিমোচনে তাদের আকাঙ্খার পরিপূরক সংস্কৃতি হাজির করতে পেরেছিলেন। তাঁর অনন্যতা সম্ভবত এখানে। আমরা জানি যে অবৈজ্ঞানিক দ্বি-জাতি তত্ত্বের উপকারভোগী পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী ঔপনিবেশিক কৌশলে পূর্ব-বাংলার মানুষের ওপর সব ধরনের শোষণের জাল বিস্তার করেছিল। প্রায় ঔপনিবেশিক শোষণের চরিত্র জনসমক্ষে তুলে ধরার প্রয়াসে তিনি ঢাকায় ধুমকেতু শিল্পী সংঘ গঠন করেন। পরে নাম পরিবর্তন করে পূর্ব-বাংলা শিল্পী সংঘ রাখা হয়। ঢাকায় তিনি ক্রান্তি সংগঠনের সাথেও যুক্ত হন।
প্রায় ঔপনিবেশিক শোষণ নিরবচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে শাসকশ্রেণী দেশের মানুষের সেক্যুলার জীবনধারার অন্যতম সংস্কৃতি ভাষার ওপর আক্রমণ চালায়। দেশবাসী এর বিরুদ্ধে র‌্যাডিক্যাল অবস্থান গ্রহণ করে। তখন মোমিনুল হক ভুটি ঢাকা ও নওগাঁয় যুগপৎ শক্ত ভূমিকা রাখেন। ভাষা শহীদের মহান আত্মত্যাগ স্মরণে মোশাররফ উদ্দিন রচিত ‘মৃত্যুকে যাঁরা তুচ্ছ করিল ভাষা বাঁচাবার তরে’ গানটির তিনি সুরারোপ করেন এবং ১৯৫৩ সনে এই গান গেয়ে প্রথম প্রভাত ফেরিতে অংশ গ্রহণ করেন।
ভাষা আন্দোলনের অভিঘাতে সারাদেশে সেক্যুলার সংস্কৃতির বিস্ময়কর বিকাশ সাধিত হয়। মোমিনুল হক ভুটি তখন নওগাঁয় গণসংগীতের শিল্পী তৈরির লক্ষ্যে ‘গিতালি সংঘ’ গড়ে তোলেন। তিনি এর সেক্রেটারি ছিলেন। সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক জয়নুল আবেদিন। নুরুল ইসলাম ভগলু ছিলেন এর এসিস্টেন্ট সেক্রেটারি। এ সময় তিনি মাওলানা ভাসানি, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখের জনসভায় গণসংগীত পরিবেশন করেন। তাঁর সঙ্গী ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, নিজামুল হক, মোসলেহ উদ্দিন প্রমুখ বরেণ্য সংস্কৃতিজন।
১৯৭১ সনে পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী এ দেশের মানুষের ওপর অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিলে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। জাতির এ ক্রান্তিকালে মোমিনুল হক ভুটি নিজেকে উৎসর্গ করেন। গলায় হারমোনিয়াম ঝুলিয়ে পথে প্রান্তরে তিনি গণসংগীত গেয়ে বেড়ান। মুক্তিযুদ্ধের ৬ নম্বর সেক্টরের সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে তাঁর অগ্রণী ভুমিকা ছিল। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত আগে ২ মার্চ মঙ্গলবার নওগাঁ শহরের সাবেক বি. এম. সি কলেজের মাঠে তাঁর নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় নাটক রক্ত শপথ। নাটকটি রচনা করেন অধ্যাপক খ. ম. মকবুল হোসেন। এই নাটকে স্বাধীনতা আন্দোলনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা সম্পর্কে আভাস দেওয়া হয়। নাটকটি পরে বালুরঘাট, মালদা, রায়গঞ্জ, সোপরা, শিলিগুড়ি প্রভৃতি স্থানে মঞ্চস্থ হয়। তিনি স্বাধীনতার সপক্ষে নওগাঁ বি. এম. সি কলেজ মাঠ ও এ. টি. এম মাঠে গণসংগীতালেখ্য উপস্থাপন করেন। ট্রাকে করে শিল্পীদের নিয়ে সাবেক মহকুমার বিভিন্ন অঞ্চলে গণসংগীত পরিবেশন করেন। তিনি মালদা বিদে হলে ভারতীয় শিল্পীদের নিয়ে এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পরের দিন মালদা জোনাল অফিসে নওগাঁ ও রাজশাহীর শিল্পীদের নিয়ে গণসঙ্গীত পরিবেশন করেন। এসব সংগীতানুষ্ঠানে ধারা বর্ণনা করেন নূরুল ইসলাম ভগলু। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে নওগাঁয় পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, লুট, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসলীলার ওপর ভিত্তি করে মোমিনুল হক ভুটি ১৬ মি.মি দৈর্ঘের একটি প্রামাণ্য চিত্র নির্মাণ করেন। প্রামাণ্য চিত্রটি বহুল প্রশংসিত হয়।
স্বাধীনতার পর মোমিনুল হক ভুটি মঞ্চনাটকের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আলোকে মানুষের রুচি সংস্কৃতি নির্মাণে তিনি প্রয়াসী হন। ১৯৭২ সনে তাঁর নির্দেশনায় নওগাঁ করোনেশান হল সোসাইটি মঞ্চে বাকি ইতিহাস, রাম শ্যাম যদু, পলাতক পালিয়ে গেছে নাটকগুলি মঞ্চস্থ হয়। ১৯৮৪ সনে নওগাঁ করোনেশান হল সোসাইটি মঞ্চে মুনীর চৌধুরীর কবর নাটকের তিনি নির্দেশনা দেন। নাটকগুলি নওগাঁ সমম্বয় নাট্যগোষ্ঠির উদ্যোগে পরিবেশিত হয়। এ সময়ে তাঁর নেতৃত্বে নওগাঁর সংস্কৃতি মহলে বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয়। এর ফল হিশেবে নওগাঁয় নাট্যাঙ্গন বাড়তে থাকে। অভিনয় শিল্পে তরুণরা যুক্ত হতে থাকে। স্থানীয়ভাবে নাট্যকার তৈরি হয়। তিনি নবীণ নাট্যকারদের নাটকও যতেœর সাথে তৈরি করে দেন। স্থানীয় নাট্যকার সরদার সহিদ সালাম চিকেন রচিত ‘আরেক অধ্যায়’ এবং এবি.এম রফিকুল ইসলামের রচিত বর্শা নাটকের তিনি নির্দেশনা দেন। পরে তিনি তাঁর কাজের ক্ষেত্র ইলেকট্রনিক মিডিয়া পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন। ১৯৮৬ সনে তাঁর তত্ত্বাবধানে বিটিভিতে নওগাঁর আঞ্চলিক ভাষায় একটি উপভোগ্য ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান উপস্থাপিত হয়। এছাড়া তিনি নওগাঁর শিল্পীদের নিয়ে বিটিভিতে লালন ফকির নাটক দেখান। তিনি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার সুরারোপ করেন। যে কাজটি এখনো কেউ করেননি । গানটি তিনি কে. ডি. স্কুলের শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠানে গেয়ে শোনান। নওগাঁর অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও তাঁকে গানটি গাইতে দেখা গেছে। দেখা গেছে শিল্পকর্মে তিনি খুব সিরিয়াস ছিলেন। কোন কাজ সঠিক না হওয়া পর্যন্ত তিনি তা চূড়ান্ত করতেন না। স্বীকার্য যে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষ শুধুমাত্র পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিপীড়ন হতে মুক্তি চায়নি, বরং সব ধরনের শোষণ বঞ্চনা হতে চিরদিনের জন্য মুক্তি চেয়েছিল। বাস্তবতা হচ্ছে তাদের সে স্বপ্ন আজো অপূরিত। আজকের দিনে জন আকাক্সক্ষার পরিপূরক সংস্কৃতি হাজির করা ইতিহাসের দাবি। সমাজের উচ্চবিত্তদের প্রগতিশীল চরিত্র আর নাই। তারা এখন একচেটে ধনবাদী অপসংস্কৃতির খড়গে জনজীবনের দুর্ভোগ বাড়িয়েই চলেছে। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমঘনিষ্ঠ জনমানুষ তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম খোরাক সংগ্রহে দিশেহারা। অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিচ্ছিন্নভাবে বিরাজমান জ্বালা যন্ত্রণা হতে পরিত্রাণের বৃথা চেষ্টায় অস্থির। বস্তুত এককভাবে এখন আর কোন সঙ্কট মীমাংসার সুযোগ নাই। তাই সময়ের দাবি এখন একমাত্র মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অগ্রসর চিন্তার যৌথ উদ্যোগে পূরণ হওয়া সম্ভব। তারা যদি এ কতর্ব্য সাধনে এগিয়ে আসে তবে মোমিনুল হক ভুটি প্রমুখ মনীষীর প্রতি যথার্থ সম্মান দেখানো হবে।

সহায়ক পুস্তিকাঃ

১. প্যারিমোহন লাইব্রেরি পত্রিকাঃ স্বাধীনতার রজত জয়ন্তী সংখ্যা।
২. গুণীজন সম্মাননা ও স্মরণ পরিষদ, নওগাঁ কর্তৃক প্রকাশিত
মোমিনুল হক ভুটির প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীর স্মরণিকা।
প্রথম মৃত্যু বার্ষিকীর স্মরণিকা

যাঁরা সাক্ষাৎকার দিয়ে সহযোগিতা করেছেনঃ

১. জনাব সলিমুল্লাহ খান, ভাষা সৈনিক।
২. জনাব নূরুল ইসলাম, ভাষা সৈনিক।
৩. জনাব রফিকুল ইসলাম খান, সংস্কৃতিজন।
৪. জনাব সহিদ সালাম চিকেন, সংস্কৃতিজন।
৫. জনাব প্রাণতোষ সাহা, সংস্কৃতিজন।
৬. জনাব খাদেমুল ইসলাম, সংস্কৃতিজন।
৭. জনাব মিনহাজুল হক মিন্টু, মোমিনুল হক ভুটির সহোদর।

0 comments:

Post a Comment