দীপ অন্বেষা
আশেক হোসেন
আশেক হোসেন
এখানে সবুজের সমাহার এসে মিশেছে বালুময় ধূসর প্রান্তরের সাথে। ঘটেছে কঠিন ও কোমলের অপূর্ব মিলন। বালুচর থেকে বাঁধ পেরিয়ে আপনি যদি বনানীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন তবে একটি অভিজাত পল্লীর উপস্থিতি আপনাকে অবাক করতেও পারে। বালুকাবেলায় দাঁড়িয়ে অনেক সময় সবুজ গাছের ফাঁক দিয়ে উঁচু বাড়ির লাল ছাদ দেখা যায়। গ্রামীণ ছায়ায় ঘেরা এ শহুরে বসতির চারদিকে সবুজ কুঞ্জ বীথিকার ছড়াছড়ি, তারই মাঝে ছড়ান ছিটান লাল রঙের বাড়িঘর। উচ্চ তরু শাখে ঘুঘু ডাকে যা দুপুরের আহারের পর এ বসতির অভিজাত মানুষের চোখে আমেজ ঘন। মটর গাড়ির শব্দ তাদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না। শহরে বাস করেও তারা গ্রামের নিভৃতি উপভোগ করে।
লাল সুড়কি বিছান একটি অপ্রশস্ত রাস্তা বসতিটাকে মাঝ বরাবর চিরে ফেলেছে। এ পথ ধরে কিছুটা গেলেই দীপালীদের বাসা। সময়টা এখনও ঠিক বিকেল হয়নি। সন্ধায় আমি এখানে আসিনা। এখানকার সন্ধা আমার ভাল লাগে না। তখন গাছের নিচে ঘনিভুত অন্ধকার চারদিক বিষন্ন করে তোলে। এখন সূর্য যথেষ্ট শক্তিশালী। চারদিক তার রুপালি আলোয় ঝলমল করছে। গাছের নিচের ছায়া স্বচ্ছ ও শীতল। তারই মধ্যে দিয়ে আমি পায়ে পায়ে দীপালীদের বাসার দিকে চলেছি।
সেই বকুল গাছটি। এখানেই আমরা পরস্পরকে প্রথম আবিষ্কার করেছিলাম। সেদিনের কথাই বলি। তার আগে কখনও এখানে আসিনি যদিও দীপালী বেশ কয়েক বার বলেছিল। সেদিন রওনা হলাম বটে কিন্তু যতই নিকটবর্তী হতে লাগলাম পা ততই জড়িয়ে যেতে লাগল। কেবলই মনে হতে লাগল, দীপালী এটাকে কিভাবে নেবে-কথা নেই বার্তা নেই একজন স্বল্প পরিচিতার বাড়িতে দুপুর বেলায় হুট করে হাজির-না হয় কথায় কথায় একদিন বলেই ছিল। আমার চক্ষুলজ্জার অভাব হয়ত তাকে পীড়া দেবে, অথবা এমন কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় হয়ত বিরক্ত হবে, অথবা দিশেহারা প্রেমিক ভেবে খুব একচোট হাসবে [প্রেমে পড়লে ছেলেরা নাকি এমন দিশেহারা হয়]। জানি, মেয়েরা এরকম বিব্রতকর অবস্থা ভালই সামাল দিতে পারে। তাই সমস্ত বিষয়টা চাপা দিয়ে সহজভাবেই সে হয়ত আমাকে বিদায় করবে। কিন্তু দরজায় নক্ করলাম, আর বেরিয়ে এসে যদি বলে, “ আপনি ! এ সময়ে ! ” তাহলে পালাব কোথায় ?
যতই চিন্তা করছিলাম, আমার গতি ততই শ্লথ হতে লাগল। অবশেষে যেই ওদের বাড়িটা দেখলাম সেই আমার গতি স্তব্ধ হয়ে গেল। পলায়ন পর মনটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। মনে হল-“না যাওয়াই ভাল” বা “কেউ দেখে ফেলার আগেই পালাই” বা “না হয় আরেক দিন আসব”। পিছনে ফিরলাম। ফেরার পথে কয়েক পা হেঁটেও গেলাম। হঠাৎ নিজেকে খুব কাপুরুষ মনে হল। এতদূর এসে ফিরে যাচ্ছি সেই অনুসূচনাও পেয়ে বসল।
দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থার জন্য নিজের উপর বিরক্ত হলাম। তাই আবার ফিরলাম। একটা বাহানা ঠিক করলাম, বলবÑ“ এদিকে কাজ ছিল, মনে করলাম যাবার পথে আপনার সাথে দেখাটা করেই যাই।” দুপুর বেলা এদিকে বাইরের মানুষের কি কাজ থাকতে পারে সেটা অবশ্য বিবেচনা করলাম না।
করবীর ঝোপটা পেরুতেই বুকটা ধক্ করে উঠল। বকুল গাছের নিচে পেছন ফিরে এক এলোকেশী দাঁড়িয়ে। মৃদু বাতাসে তার শাড়ীর আঁচল অল্প উড়ছে। সাথের বালিকাটি শ্বেত করবী চয়নে ব্যস্ত। অতি ধীরে দীপালী পিছন ফিরে তাকাল। অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতে আমি বিমূঢ় হবার সময় পেলাম না। কিন্তু তার চোখের পাতা একটুও কাঁপল না। চোখের তারা দুটো উজ্জল হল মাত্র। ঠোঁট দুটো সাদর আমন্ত্রণের হাসিতে উদ্ভাসিত হল।
সে বেশ আগের কথা। তারপর বহু বার আমি বকুল গাছটার কাছ দিয়ে গেছি। যাবার পথে সেদিনের স্মৃতি রোমন্থন করে পুলক অনুভব করেছি। মুখে হাসি ফুটেছে। অনুরাগের হাসি। প্রতি বার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে সোজা করে সিঁথি করা একটা কমনীয় মুখ। ...
রাস্তাটা সম্মুখে বাঁক নিয়েছে। দীপালী এখন কি করছে? হয়ত বাসার সামনের লনটায় হেলান চেয়ারে বসে ক্রীড়ারত বোনকে লক্ষ্য করছে অন্যমনস্ক অথবা উদাস আকাশ দেখছে। ঝুঁকে পড়া সবুজের উপর দিয়ে দেখা আকাশটা এখানে বড়ই উদাস। দীপালী এমনটা প্রায় করে যখন ছোট বোনটি সবুজ ঘাসের উপর ফুলের রেণুছড়ায়। ...
নাহ্। বোকার মত এসব কি ভাবছি আমি? এখনও অনেক রোদ। ওদের লনের উপর বেশ তাপ। ঐ রোদে কি বসা যায়? তাহলে? ...
ছোট বোনটি হয়ত বারান্দায় একাকী খেলছে। আমাকে দেখে নিষ্পাপ চোখ মেলে তাকাবে। তারপর একছুটে বাড়ির ভিতরে চলে যাবে-খবরটা বড় বোনকে দেবার জন্য। ...
না, কেউ নেই। এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি, দরজা বন্ধ।
দীপালী হয়ত শীতল ঘরের আশ্রয়ে অবসরের সঙ্গী সেলাই নিয়ে বসেছে। কড়া নাড়লে, নিজেই দরজা খুলে দেবে। এক হাতে সেলাই-এর বেড়ি, অন্য হাত দরজার কপাটে। চোখে যুগপৎ বিস্ময়, আনন্দ এবং শেষে কপট রাগ। মুখের হাসি বলছে-“ আমি জানতাম, তুমি আসবে।”
রোদ এখন বেশ কমে এসেছে। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে অস্তগামী সূর্যের আলো এসে পড়ছে। দীপালীদের বারান্দায় আলো ছায়ার খেলা। আমি সামনের রোদটুকু মাড়িয়ে চললাম। একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে।


1 comments:
বাল-ছাল না লিখলে শান্তি লাগেনা????
Post a Comment