ইয়াকুব মালিক
মাসুদ আহমেদ
মাসুদ আহমেদ
এটি একটি সেনানিবাস। এই রাষ্ট্রের অন্যান্য দপ্তরের অধিকাংশ এবং কোটি মানুষের বেশির ভাগের চেহারা আর অবস্থা যাই হোক সেনানিবাসের এই সব নথির অবস্থা যাকে বলে একেবারে জেল্লাদার। যে কালিতে এর তথ্যগুলো লেখা হয় তা পশ্চিম জার্মানি থেকে বৈদেশিক মুদ্র্রা ব্যয় করে আমদানি করা। নথিগুলোর লাল ফিতে চকচকে এবং ছাপার হরফগুলো ঝকঝকে। যে দপ্তর এই নথিগুলো হেফাজতের দায়িত্বে নিয়োজিত সেগুলোর রঙ এবং নির্মাণ শৈলী মজবুত। আর যারা এগুলোর মধ্যে কাজ করে তারা এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান জনগোষ্ঠী। এমনিতে বাকি মানুষদের অধিকাংশের অপুষ্টিতে চোয়াল ভাঙ্গা,চোখে হতাশা। বস্ত্র জীর্ণ। এই মানুষগুলো থেকে একেবারে ভিন্ন, এই দপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শুধু স্বাস্থ্যে নয়, বস্ত্র ও মানসিকতায়ও অন্যরকম। নিয়মিত শরীরচর্চা, অপরিমিত উন্নত অথচ শস্তা খাবার ও পানীয় এবং পেছনে প্রতিষ্ঠানের অব্যাহত প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা এদেরকে একান্ত সাহসী, আত্মবিশ্বাসী এবং প্রবল নিষ্ঠুর একটি শক্তিতে পরিণত করেছে। এদের সবার পরনে কড়কড়ে ইস্ত্রি করা খাকি ইউনিফরম, পায়ে এইমাত্র পালিশ করা কালো চকচকে বুট জুতো। মাথায় খাকি রঙের পশমের তৈরি বেরেট। কাঁধে পদবী অনুযায়ী বিভিন্ন আকার ও প্রকারের পিতলের ক্লিপ ও তমাঘা। ধাতু পালিশের সরঞ্জামে ঘষা মাজার ফলে সেগুলো সবসময় চকচক করে। এদের স্বাস্থ্য ভরা গলা সবুজাভ ও মসৃণ। প্রতিদিন সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষৌরকারের হাতে আগের দিনের বেড়ে ওঠা এদের দাড়ির গোড়া উৎপাদিত হয়। এদের বিনোদনও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সারা জাতি এমনিতে প্রায় নিখরচায় হাডুডু, গোল্লাছুট বা কুস্তি নিয়েই অবসর কাটায়। এদের একটি খেলার মাঠ নির্মাণ ও সংরক্ষরণে ব্যয় হয় দেশবাসীর অজানা ও কল্পনাতীত উঁচু অর্থের একটি অংক। এমনিতে এ দেশটির প্রায় সব দপ্তরের ব্যবহার করা, দেয়া এবং উৎপাদিত তথ্য প্রায়ই অনির্ভরযোগ্য। নির্ভরযোগ্য করার জন্য যে সম্পদ বরাদ্দ করা আবশ্যক তা করা হয় না বলেই মূলত অবস্থাটা ওরকম। কিন্তু এই দপ্তরের তথ্য ব্যবস্থাপনা নির্খুঁত। কারণটি প্রথমোক্ত কারণের বিপরীত। নিজেদের সম্পর্কে এবং যাদেরকে প্রতিপক্ষ বা শত্র“ মনে করে তাদের সম্পর্কে এদের হাতে রাখা তথ্যের মান অত্যন্ত উঁচু এবং তাই নির্ভরযোগ্য। এই ধর্মভীরু দেশটির শত্র“রা গত ডিসেম্বর মাস এর নির্বাচনের পর থেকে বিশেষ করে তৎপর হয়ে উঠেছে কেন যেন। তার মধ্যে মার্চ মাস থেকে এই দেশটির পূর্বাঞ্চলের অনেক মানুষ ঐ শত্র“দের সঙ্গে এই কাজে যোগ দেয়াতে অবস্থা আরো নাজুক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এই বিভাগটির ওপর প্রবল দায়িত্ব পড়েছে। এসব কথা ভাবতে ভাবতে সেনানিবাসের একজন কর্মকর্তা একটি নথি তার পাশের স্টীলের আলমিরা থেকে টেনে নিলেন। এ কাজটি তিনি কদিন ধরেই করছেন। মন মত হচ্ছিল না কাজটি। যেমনটি খুঁজছেন তেমনটি পাচ্ছেন না। এই নথিটার নামটা দেখে এই প্রথম তাঁর মনে একটা ইতিবাচক চিন্তাস্রোত বয়ে গেল। একে কোথাও দেখেছেন বলে মনে পড়ল। যার সম্পর্কে নথি তার ফটোগ্রাফ নথির ভেতরে থাকে। তিনি মোটা কভার উল্টিয়ে সেটা বের করলেন। হ্যাঁ তার ধারণা ঠিক। তিনি এবার তথ্যগুলো পড়তে থাকলেন।
নাম : পিএ নং-১৫৫২ ইয়াকুব মালিক
পিতা : বানজারান মালিকী
জন্ম তারিখ : ১. ২. ১৯৩০
জন্মস্থান : হোসিয়ারপুর, পূর্বপাঞ্জাব, ভারত
উচ্চতা : ৬ফুট
চোখের রং : পিঙ্গল
গায়ের রং : ফর্সা
র্যাংক : লে. কর্ণেল।
কোর : গোলন্দাজ
এই নথি পর্যবেক্ষণকারী সামরিক বিভাগের বিভাগের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এই পেশায় তাকে শাদা পোশাক পরতে হয়। যে লক্ষ্যে তিনি এই নিয়ে সকাল থেকে পাঁচটি নথি দেখেছেন সেকম দায়িত্ব তাঁর ওপর আগে পড়েনি। তাঁর ডেস্কের ওপর রাখা পাকিস্তান সরকারের লাল রঙের ক্যালেন্ডারটায় তিনি চোখ বুলালেন। আজ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের, মার্চ এর ১২ তারিখ। মার্চ এর ২ তারিখে তাঁর কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার আলী মর্দান খান কিজিলবাশ তাঁকে ফোন করে এই অফিসের দায়িত্ব দেন। তিনি এর প্রধান এবং পদমর্যাদায় কর্নেল। এই অফিসটি দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদের অদূরে রাওয়ালপিন্ডি শহরে। অফিস থেকে অনেক দূরে দেশটির একটি প্রদেশের নাম হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তান। আলী মর্দান তাকে জানান, বিশেষ উদ্দেশ্যে ঐ প্রদেশে বেশ কিছু সামরিক কর্মকর্তাকে বদলি করতে হবে। কর্নেলের কাজ হবে ঐ লক্ষ্যের দিকে খেয়াল রেখে সেই বাছাইয়ের কাজটি করা। উদ্দেশ্যেটি ঐ ব্রিগেডিয়ার টেলিফোনেই জানিয়ে সঙ্গে সঙ্গে এ-ও বলেছিলেন যে বাছাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন লিখিত আদেশ জারি করা হবে না। ২৪ বছর অভিজ্ঞ এবং এই পেশার ঘাঘু কর্মকর্তা কর্নেল মজিদী তা থেকেই বুঝেছিলেন তার দ্বায়িত্বাট কি? নথিটা আবার ভাল করে দেখে তিনি টেলিফোন তুলে অপারেটরকে একটা ফোন কানেকশন দেবার হুকুম দিলেন। এমনিতে দেশটির টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা একান্তই জরাজীর্ণ। সাধারণ মানুষ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের এক থানা থেকে আর এক থানায় বা তহশিলে কথাবার্তা বলার জন্যও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। অনেক সময়ই শেষে অপারেটর বলে ‘লাইন পাওয়া যাচ্ছে না’ কিন্তু কর্নেলের ফোন দেড় মিনিটের মাথায় বেজে উঠলো এবং সংযোগস্থলের দূরত্ব এখান থেকে দু’শ মাইল। অপারেটর সালাম দিয়ে জানাল তার চাহিত মানুষটি ওপ্রান্তে ফোন ধরে আছে। তাঁর ডেস্কের ওপর রাখা নথিটির মধ্যে সেঁটে রাখা শাদাকালো ফটোটার দিকে তাকিয়ে কানে চেপে ধরা টেলিফোনের রিসিভারের মাউথপিসে তিনি কয়েকটি কথা বললেন। শেষে তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি এখন কোথায়?’
‘কোহাট, স্যার।’
‘বেশ, রওনা দাও।’
‘জ্বী, স্যার।’
ফোন ক্র্যাডেলের ওপর রেখে দিয়ে তিনি এবার এক প্রস্থ নথি পরীক্ষা করতে বসলেন। তাঁর অফিসটি বেলা দুটোয় বন্ধ করার কথা কিন্তু মার্চ এর এক তারিখ থেকে এইটি এবং এই জাতীয় অফিসগুলো দিনরাত খোলা থাকছে কারণ অনেক সৈন্য ও অফিসারদের একসঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে বদলি করতে হচ্ছে। দেশটির যোগাযোগ ব্যবস্থা আদিম। সাধারণ মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভ্রমণ করে সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে কিন্তু তার ফোন করা মানুষটি ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে এই অফিসের বারান্দায় তার ব্যক্তিগত সহকারীর রুমে এসে রিপোর্ট করলো। তার ইস্ত্রি করা ইউনিফরম, ঝকঝকে কাল বুট এবং স্বাস্থ্যোজ্জল মুখ দেখে মনে হলো না সে কষ্টকর কোন ভ্রমণ বা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এখানে এসেছে। গত ছ’বছর এ দেশটিতে কোন যুদ্ধবিগ্রহ হয়নি তারপরও এই পেশার মানুষদের চলাফেরার জন্য বিশেষ যানবাহনের পাকাপোক্ত ব্যবস্থা আছে। দু’জন এমনকি একজন যাত্রী হলেও সেই বাহনটিকে চলতে হয়। বলা বাহুল্য এমন একটি ব্যয়বহুল যানবাহনেই এই কেতাদুরস্ত মানুষটি এখানে এসেছে। টেলিফোনের বাজার বেজে উঠলে কর্নেল তা ধরে সাক্ষাৎপ্রার্থীকে অপেক্ষা করার কথা বললেন। তিনি ব্যস্ত ছিলেন না তবু গুরুত্ব দেখানোর জন্য এই অপেক্ষা করতে বলা। দশ মিনিট পর সেন্ট্রি তার রুমের দরজা মেলে ধরলে সাক্ষাৎপ্রার্থী প্রবেশ করলো। পা থেকে ঘাড় পর্যন্ত তার সব কিছু আগেই নিখুঁত ছিল, ঢোকার আগে সে মাথার পশমী বেরেটটা ঠিক করে নিয়েছে। ঢুকেই সে ডেস্কের ওপাশে বসা মানুষটিকে একটা বিধি অনুযায়ী এই স্যালুট বা অভিবাদন না করলেও চলে। সম্মান দেখানোর জন্য এই পদমর্যাদার কর্মকর্তা সামনে কাঁধে টান টান করে দাঁড়ানোই যথেষ্ট। কিন্তু সে এক কঠোর নিয়মনিষ্ঠ মানুষ। পেশার প্রতিটি কাজ সুনিপুণভাবে করা তার গত পনের বছরের অভ্যাস। কর্নেল স্যালুট গ্রহণ করলেন। সম্মান বা তার কৃত্রিম প্রদর্শন কে না পছন্দ করে? হ্যান্ডশেক করে তলব করা মানুষটিকে সামনের একমাত্র চেয়ারটিতে বসতে হুকুম দিলেন। বসা হয়ে গেলে জিজ্ঞাস করলেন ‘১৯৫৯ সালে তুমি কোথায় ছিলে?’
এই তথ্যটি নথিতে ঠিক ছিল না বলেই এই প্রশ্ন। ঠিক ছিল না মানে অস্পষ্টভাবে ছিল। ঐ সময় সম্পর্কে লেখা ছিল তার তলব করা মানুষটি ‘উত্তর পশ্চিমে কর্তব্যরত ছিল। এই উত্তর পশ্চিমে সেনানিবাস অনেকগুলি। সে সময়ের কর্তব্যের ধরনও নানারকম ছিল। বিষয়টা পরিষ্কার হওয়া শুধু দরকারই নয় আজকের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য জরুরি। তাই এই প্রশ্ন।
‘স্যার, আমি ওয়াজিরিস্তানে কমবিং অপারেশনে ছিলাম’।
‘বুঝলাম, তোমাকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল না কি অন্য কিছু?’
‘না, স্যার, পুরো অপারেশন সফলতার সঙ্গে শেষ হবার পর আমি আমার ইউনিট নিয়ে আগের ক্যান্টনমেন্টে ফিরে আসি।’
১৯৫৯ সালে দেশটির এই অঞ্চলে এক ভয়ানক ঘটনা ঘটেছিল। ওসব বিস্তারিতভাবে নথিতে লেখা হয় না এবং কর্নেল মজিদী তখন বিদেশে ছিলেন। তাই এই সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন।
‘বেশ। এবার বল বাংলা জবানী জান?’
‘ভালভাবে জানি কারণ যশোর এবং সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্টে দু’বছর করে পোস্টিং ছিল।’
এ পেশায় চোখে চোখ রেখে কথা বলা আইন। মজিদী সেভাবেই এতক্ষণ কথা বলছিল। তবু এখন সামনে বসা মানুষটির দিকে আরো সরাসরি তাকিয়ে বেশ কয়েকটা প্রশ্ন করলো।
প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে দিতে মানুষটি অনুমান করতে পারলো এই তলব করার উদ্দেশ্যটা কি হতে পারে। মাথায় প্রশ্নটা এসেও গিয়েছিল কিন্তু অনুমতি ছাড়া এই পেশায় অধস্তনের প্রশ্ন করবার অধিকার নেই।
মজিদীর গলায় এতক্ষণ একটা আন্তরিকতার ভাব ছিল এবার সেটা চলে গেল। একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে সে বলল-
‘পূর্ব পাকিস্তানের মালাউনের বাচ্চারা এক ভয়ংকর খেলায় মেতে উঠেছে। ওরা কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়। এর সঙ্গে অনেক বাঙালি সৈন্যও জড়িত আছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তোমাকে ওখানে বদলি করা হয়েছে। কোন প্রশ্ন থাকলে করতে পার এবার । ইসলাম আর মুসলমানদের ধ্বংস করাও ওদের লক্ষ্য।’
‘আমার মিশন কি হবে?’
এ কাজে যাদেরকে সন্দেহ করবে তাদেরকে সাইজ করা। এই সাইজ করার কাজে যা প্রয়োজন মনে করবে তা করার ব্যাপারে তোমার স্বাধীনতা থাকবে। তুমি ৪৯ বেঙ্গলের কম্যান্ডিং অফিসার হিশেবে ৪৭ ব্রিগেডের অধীনে থাকবে। আর কোন প্রশ্ন না থাকলে তুমি এখন আসতে পার।’
‘থ্যাংক ইউ লে. কর্নেল ইয়াকুব, গুড লাক।’
ইসলাম আর মুসলমানদের রক্ষার এই দুই অগ্রসৈনিকের কেউই ‘সালাম’ ‘ওয়ালাইকুলাম সালাম’ বা ‘খোদা হাফেজ’ জাতীয় কোন শব্দ ব্যবহার করলো না। কর্র্র্নেল মজিদী এই অসময়ে একগ্লাস ‘কেনিয়াক’ নিয়ে বসলেন। আর এখান থেকে বের হয়ে যেতে যেতে মালিকের মাথায় ‘বাঙালি সৈন্য’ ও ‘সন্দেহ’ শব্দ দুটো স্থায়ী হয়ে রইল।
১৯৬৯ এর মার্শাল ল’র সময়ও পূর্ব পাকিস্তানে কোন ডিউটি পায়নি। আগেও যখন ওখানে কাজ করেছে তখনকার কিছু কথা ওর মনে আছে। গত মার্শাল ল’র আগের কিছু ঘটনাও শুনেছে। পাঞ্জাবি বিরোধী শ্লোগান, আইয়ুব খানের ছবিতে আগুন দেয়া, কায়েদে আজম সম্পর্কে কিছু কথাবার্তা এবং সংবাদপত্রে এ সংক্রান্ত বেশকিছু ছবি ওর এই মুহূর্তে স্পষ্টভাবে মনে হলো। অন্যের কাছে তো বটেই, নিজের কাছেও নিজের মনোভাব প্রকাশ করে না। যখন মন খারাপ লাগে ওর মুখে তখন থাকে হাসি হাসি ভাব। কোন কিছু ভাল লাগলেও মুখ চোখ কাল করে রাখতে পারে। এখান থেকে বের হয়ে যাবার সময় ওর মুখটায় তেমনি একটা থমথমে ভাব ফুটে রইল।
লাল পাহাড়ের কোলের মধ্যে এই ক্যান্টনমেন্ট-এর সঙ্গে ইয়াকুবের পরিচয় শুধু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মানচিত্র দেখে। সৈন্যদের পঁচানব্বই ভাগ বাঙালি। শুধু সুবেদার, নায়েব সুবেদার, হাবিলদার, হাবিলদার মেজর, নায়েক, করপোরাল এবং সুবেদার মেজরের পদগুলিতে যারা নিয়োজিত তাদের সবার বাড়ি পশ্চিম পাকিস্তানে। সামাজিক এবং পেশাগত ব্যবধানের কারণে এদের কারো সঙ্গেই ওর পরিচয় নেই। কিন্তু ও যোগদান করার সন্ধ্যার মধ্যেই এদের সঙ্গে সেই কাজটা সেরে ফেলেছে। তখনই ওর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড মেজর ইশরাত কানোয়ারকে বলে রেখেছিল দু’দিন পর সকাল সাড়ে আটটায় ইউনিটের সব সৈন্যর সঙ্গে ও কথা বলবে, পরিচিত হবে। দিনটাও চমৎকার এক কারণে ও ঠিক করেছে। আজ সেই সকাল। সকালের ব্যায়াম, প্যারেড ও নাশতার কাজ শেষ। মালিক তার অফিস কক্ষে বসে আছে সকাল সাতটা থেকে। ব্যাটেলিয়নের সব সৈন্য, এনসিও ও জেসিওরা সকালের সব কাজ সেরে ছাউনিতে অপেক্ষা করছে তৈরি হয়ে। সি. ও তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। তারাও প্রশ্ন করতে পারবে। ‘দরবার’ এর নিয়মই এই। সাতটা পঁয়ত্রিশ বাজতেই ইশরাত মালিক রুমে ঢুকে স্যালুট করে জানালো সব তৈরি। মাথায় বেরেট লাগিয়ে মালিক ইশরাতকে পেছনে নিয়ে ছাউনির ফটকে গিয়ে পৌঁছলো। জলপাই রঙের উইলীজ জীপ থামতেই ব্যাটেলিয়নের একটা ছোট দল ওদেরকে গার্ড অব অনার দিল। কুমিল্লা শহরে হরিশ মিস্ত্রির হাতে সিংহাসনের আদলে তৈরি সেগুনকাঠের চেয়ারটা মঞ্চের উপর দেখা যাচ্ছে। অনার গার্ডের পর বারটা সারিতে মেঝের ওপর হাঁটু ভাঁজ করে ৩৮টি লাইনে বসা পুরো ব্যাটেলিয়নকে দেখা গেল। তারা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়েছে। সমস্বরে একটা সম্মানসূচক ধ্বনি তাদের মিলিত কণ্ঠ থেকে তাদের এই নতুন অধিনায়কের উদ্দেশে বেরিয়ে আসতেই মালিক সামনে দাঁড়ানো সুবেদার মেজর হামজা খানকে একটা ইঙ্গিত করলো। হামজা জোরে বলে উঠলো ‘আরামে দাঁড়া, অস্ত্র নামা ।’ সবাই হুকুম তামিল করলে মালিক চেয়ারটাতে বসলো। ইশরাতকেও পাশের চেয়ারটাতে বসতে বলল। দাঁড়ানো সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে এবার সে উর্দুতে বলল, সবাই বস।’ সৈন্যরা মেঝেতে হাঁটু ভাঁজ করে এবং হাতের অস্ত্র যার যার ডান দিকে কাত করে নিঃশব্দে বসে পড়লো। ইয়াকুব মালিকের চোখ অত্যন্ত ভাল। এক নজর তাকিয়ে সে এই সামনে বসা মানুষগুলোর প্রত্যেকের মুখ, চোখ, কপালের সূক্ষ্মতম কুঞ্চন দেখতে পেল। তার অর্থও বুঝতে পারলো। গত দু’রাত সে এদের সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্যও সংগ্রহ করেছে ইউনিট ইন্টেলিজেন্স অফিসারের কাছ থেকে। এদের কাছ থেকে চিন্তার কিছু নেই। ঢাকায় আসলে কি হয়েছে এরা জানে না। এরা শুধু উদ্বিগ্ন। অন্য কোন সমস্যা নেই। ইয়াকুব অবশ্য মনে মনে হাসলো এই ভেবে যে এই ইন্টেলিজেন্স অফিসারও জানে না ঢাকায় ২৫/২৬ মার্চ রাতে কি হয়েছে। মাইক্রোফোনে বলল, ‘দেশে গত মার্চ মাস থেকে যে গণ্ডগোল হয়েছে তার জন্য কে দায়ী তোমরা কি জান?’
দর্শক শ্রোতাদের প্রায় সবাই ক্লাশ এইট পাশ হলেও তারা জানে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া নিষেধ। তাই তারা চুপ করে রইল। ইয়াকুবের গরিলামার্কা চেহারা, ঘন মোছ, পশমে ভরা বিশাল বাহু ও কব্জী, লাল চোখ, গলার শব্দে এবং প্রশ্নে বাঙালি সৈন্যরা ভয় পেয়ে গেল। ইয়াকুবের কপাল চওড়া, মাথার চুল ক্রুকাট চোখের সুরমা মায়া না এনে চেহারায় নিষ্ঠুরতা যোগ করেছে। সিপাইরা জানে এ প্রশ্নের উত্তর পাবার জন্য প্রশ্ন করা হয়নি। ট্রেনিং এর সময় পরিষ্কার বলা ছিল রাজনীতি নিয়ে কথা বলা এই পেশায় শাস্তিযোগ্য। তাই সবাই চুপ করে রইল। এই সৈন্যরা ১লা মার্চ থেকে ঢাকায় কি হয়েছে তার সামান্যাংশ শুনেছে। এ-ও শুনেছে ২৫ তারিখ থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। প্রশ্ন, চেহারা ও কণ্ঠের ধরন শুনে সবাই ভাবলো তাদের এই নতুন অধিনায়ক প্রশ্নের উত্তরটা নিজেই দেবে এবং তাতে বলবে বাঙালি বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এর জন্য দায়ী।
মালিক তীব্র দৃষ্টিতে সামনে বসা মানুষগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। পাঁচ সেকেন্ড পার হলো।
‘আমি উত্তর দিচ্ছি।’
মালিকের নরম সুরে অল্পশিক্ষিত মানুষগুলো একটু আশ্চর্য হয়ে গেল।
‘হাতে গোনা কয়েকজন পশ্চিম পাকিস্তানী মানুষ এর জন্য দায়ী’-মালিকের বলার ভঙ্গীটা একান্ত আন্তরিক। এখন তার চোখ একেবারে নরম আলোয় ভরা। সেই আগুন কোথায় যেন চলে গেছে। ‘ভুট্টো এবং তার দল আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী।’ মালিক এখন প্রায় হাসছে। তার আন্তরিক কণ্ঠ আবার মাক্রোফোনে শোনা গেল।
‘জানি তোমরা ভাবছ সেনাবাহিনীর লোক হয়ে রাজনীতির কথা বলছি এটা ঠিক না, তাই না?,এটা ঠিক না। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে সব আইনের পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন করতে হয়।’ ‘সেনাবাহিনীর অফিসার’ এই কথাটা তার মাথায় এসে গিয়েছিল কিন্তু সাবধানে সে ‘লোক’ কথাটা ব্যবহার করলো যাতে এই সৈন্যরা ওর সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে। তার কথার ফলাফল বুঝতে শ্রোতাদের দিকে মালিক তাকালো। ওরা এগুলো আশা করেনি। সবার মধ্যে এতক্ষণ যে টানটান ভাব ছিল তা চলে গেছে। ইয়াকুব মালিক এবার ওর মাথা থেকে বেরেটটা খুলে টেবিলের ওপর নামিয়ে রাখলো।
‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তো নিজেই বলেছেন যে বাঙালিদের ঠকানো হয়েছে। কাজেই তারা মার্চ মাসে যদি দু’একটা আপত্তিকর শ্লোগান দিয়েও থাকে তার জন্য তাদের দোষারোপ করা ঠিক না। রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। অবশ্যই সামরিক শক্তি দিয়ে নয়।’ এই পর্যন্ত বলে মালিক একটু থামলো। সৈন্যদের চমকে ওঠাটাও পরিষ্কার দেখতে পেল। চমকানোর কারণ মালিক তার শেষ কথাগুলি পরিষ্কার বাংলায় বলেছে। রাজশাহীর সিপাই আব্দুল আলী মনে মনে বলল ‘এক দেখছিলাম গভর্নর আজম খানকে। আর আজ এগার বছর পর এই আর একজনকে।’ ১৯৬০ সনে আজম খান এখানে গভর্নর ছিলেন। আলী তখনই সেনাবাহিনীতে ভর্তি হয়।
‘তোমরা সৈন্য বলে ট্রেনিং এ এসব কথা শেখানো হয় না। কিন্তু এখন তোমাদের সেসব জানার সময় এসেছে। এই দেশটাএই পূর্ব বাংলার মানুষদের ভোটেই এসেছিল।এখন নির্বাচনে জিতে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার অধিকার তো স্বয়ং প্রেসিডেন্টই স্বীকৃতি দিয়েছেন। কাজেই এনিয়ে তোমাদের মনে কোন দ্বিধা থাকলে চলবে না।’
ফরিদপুরের ভাঙা থানার ধোনাই ফকিরের বয়স ৪০। কথাগুলি বিশ্বাস করতে চাইলেও সে বিশ্বাস করতে পারলো না। সে এই ইউনিটের অন্যতম বয়ষ্ক সৈন্য। মেস হাবিলদার বাহরাম তালপুরের ব্যবহার ওর কখনোই ভাল লাগেনি। তাই এই অধিনায়কের ব্যবহার ওর কাছে প্রশ্নযোগ্য মনে হলো। ও ভাবলো ব্যাপারটা কি হতে পারে? কিন্তু এমন সাহেবের মুখে পরিষ্কার বাংলা শুনে ওর ভালও লাগলো। মনে পড়লো পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আহসান এবং ডেপুটি চিফ মার্শাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটরও রেডিওতে বাংলায় ভাষণ দিতেন এবং তারা ভাল লোক হিশেবেই পরিচিত। মালিক আবার কথা বলা শুরু করেছে। ‘অথচ বাঙালিদের দোষ দেয়া হয়েছে। দু একজনের জন্য এরকম ঢালাওভাবে অনেককে খারাপ চোখে দেখা ঠিক না। যারা পিন্ডিতে বসে এসব কথা বলে তারা নিজেরাই অনেক কথা জানে না। তোমরা কেউ কি জান জাতীয় সঙ্গীত, ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ-পাকিস্তান জিন্দাবাদ’-কে লিখেছে? তিনি এখানকার সন্তান নজীর আহমদ। এর সুরও আমাদের একজন দেশপ্রেমিক পূর্ব পাকিস্তানী সুরকার আ. আহাদের। দেশের প্রতি কতখানি ভালবাসা থাকলে এমন গান লেখা ও সুর দেয়া সম্ভব? ৬৫’র যুদ্ধে লাহোরকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করে ছিল তোমাদের মতই বীর ৮নং বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা। কথাটা সত্যি এবং সৈন্যরা তা জানে, তাই তারা খুশি হলো। জাতীয় সঙ্গীতের বিষয়টা সত্যি হলেও তারা তা জানে না। তবে ঐ কথাটায় তারা খুশি হলো।
হাফিজ জলন্ধরী আর নাজির আহমদ তো একই দেশের মানুষ। সারা জাতির জন্যই তাঁরা পরিশ্রম করেছেন। ৮ বেঙ্গলের মত তোমরাও সিন্ধুতে ছিলে। আর এইযে আমি, সাত বছর চিটাগাং আর যশোর কাটিয়েছি আমার চাকরির ষোল বছরের মধ্যে। আমার বাবা ঢাকার পোগোজ স্কুলে আরবীর শিক্ষক ছিলেন। স্কুলে তোমরা যা পড়েছ সেই রবীন্দ্রনাথ, আর নজরুল আমিও পড়েছি। জাতির পিতা বলেছিলেন পাকিস্তানে হিন্দু, মুসলমান, বাঙালি, পাঞ্জাবি বলে কেউ নেই। আছে শুধু পাকিস্তানী। এখন আমাদের সবার সেটা মনে রাখতে হবে। জানি আমরা সবাই সেটা মনে রেখেছি নইলে লাহোরে আমাদের এখানকার ভাইরা প্রাণ দিতো না। তেমনি কুমিল্লা সীমান্ত রক্ষার জন্য মেজর তোফায়েলও প্রাণ দিত না। বল ঠিক কি না? তার বাড়ি ছিল ঝিলাম জেলায়।’
সৈন্যরা উত্তর দিতে না পারলেও মনে মনে একমত হলো। কিন্তু একটা খটকা তাদের মনে রয়ে গেল। অথচ সেটা জিজ্ঞেস করা যায় না। তাহলো সংখ্যাগরিষ্ট নেতা শেখ মুজিব এখন কেমন আছেন এবং কোথায় আছেন?’
ঠিক যেন এদের মনের কথা পড়তে পেরেই লেঃ কর্নেল ইয়াকুব মালিক একেবারে হেসে আন্তরিক কণ্ঠে বলল‘আমাদের সবার প্রিয় নেতা। যাকে প্রেসিডেন্ট নিজেই পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিশেবে ঘোষণা করেছেন, মুজিব ভাল আছেন। নিরাপত্তার কারণে তাঁকে সরকারী হেফাজতে নেয়া হয়েছে। জানি তাঁকে নিয়ে সবারই জানার আগ্রহ আছে। তবে এ নিয়ে চিন্তার কারণ নেই।
অধিনায়কের পরিষ্কার বাংলা এবং আন্তরিকতায় সাড়ে চারশ সৈন্যের মনে এক প্রবল আনন্দ বয়ে চলল। তারা ভাবল পাঞ্জাবি মাত্রই খারাপ ভাবাটা ভুল হয়েছে। ওদের মধ্যেও ভাল মন্দ আছে। তাদের ইচ্ছে হল কিছু বলে কিন্তু এ পেশায় তাকল্পনা করা যায় না। গত চব্বিস বছরে এর একটি ব্যতিক্রমও ঘটেনি। ইয়াকুব এবার বলল, ‘দেশের এই জরুরি অবস্থায় কথাগুলো তোমাদের বলার প্রয়োজন ছিল। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি ৪৯ বেঙ্গল জাতির সঙ্গে বরাবরের মতই সহায়তা করবে। তোমরা জান কেন তোমাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য এই দিনটিই আমি বেছে নিয়েছি?’ কেউ কথা বলল না। ইয়াকুব বলল, ‘ কারণ আজ এই ব্যাটেলিয়নের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং এর প্রতিষ্ঠাতা এই কুমিল্লা জেলারই সন্তান মেজর গণি। তাই আমি দেরি করতে চাইনি। আমি নিশ্চিত জাতির এই সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার কাজে ৪৯ বেঙ্গলের পুরো সহযোগিতা পাব। পাকিস্তান জিন্দাবাদ।
ইয়াকুব বেরেট মাথায় দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। লাইনের সৈন্যরাও উঠে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেক সৈন্যের সঙ্গে সে হাত মিলাতে মিলাতে তাদের স্ত্রী, পুত্র-কন্যাদের কথা জিজ্ঞেস করলো। তারপর ‘টু আই সি’ -কে সঙ্গে নিয়ে ছাউনি থেকে বের হয়ে গেল। কোন বাঙালি অফিসারের কাছ থেকেও সৈন্যরা এরকম ব্যবহার আশা করেনি। পায়ওনি। তাই অনেকের চোখ দিয়ে রীতিমত পানি গড়িয়ে পড়ছে। মনে মনে অনেকেই বলল, ‘ফেরেশতা’র মত মানুষ। যেমনি দেখতে। মনটাও তেমনি। যারা পাঠান আযম খানকে দেখেন নি তারা বলল ইনি নিশ্চয় আযম খানের ভাই বা আত্মীয় হবেন। পাঞ্জাবি হয়ে এরকম ভাল বাংলা শেখা। বাঙালির জন্য দরদ না থাকলে এটা কোনভাবেই সম্ভব না।’
একথা ভাবতে ভাবতে সৈন্যরা ব্যারাকে ফিরে গেল। মেস এ দুপুরের খাবার খেল। পাঞ্জাবি সুবেদার, হাবিলদার এবং কোন কোন অফিসার ও অস্ত্রের ‘কোতে’ নিয়েওরা যে নানা উচ্চাভিলাষী চিন্তা ভাবনা ফিস্ ফিস্ সারা মার্চ এবং এপ্রিলের এই প্রথম সপ্তাহ ধরে করেছিল তা এখন অনেকটা উবে গেল। বিকেলটা খেলাধুলায় কাটলো। ইয়াকুব মালিক ভলিবল বেশ ভাল খেলে। সে পাঞ্জাব কোম্পানির পক্ষে যমুনা কোম্পানির বিরুদ্ধে খেলল। যমুনা খেলায় জিতলো। শাদা হাতাঅলা গেঞ্জি, হাফপ্যান্ট আর কেডস পরনে ইয়াকুবকেও বেশ প্রফুল্ল দেখাচ্ছে। খেলা শেষে সংক্ষেপে সে বল্ল, ‘খেলায় হারজিত আছে। এটা স্বাভাবিকভাবেই নিতে হবে।’
৩.
কৃষ্ণচূড়ার গাছের ভেতর দিয়ে বসন্তের বাতাস শর শর করে বয়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হলে খাবার শেষে সবাই ঘুমে মগ্ন। শুধু সেন্ট্রিরা ডিউটিতে। অফিসারস মেসে ইয়াকুবের রুমটিতেও এক সময় অন্ধকার দেখা দিল।
সৈনিকের ঘুম পাতলা হয়ে থাকে। কিন্তু ৪৯ বেঙ্গল ৬৫ বা অন্য কোন সময় কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। মার্চ মাসের খবরের যে পরিশোধিত অংশ এই ইউনিটের সৈন্যদের কানে এসেছিল তার উদ্বেগটুকু আজকের ইয়াকুবের ব্যবহার ও ভাষণে কেটে গেছিল। তাই সবাই গভীর ঘুমে ছিল। আলফা কোম্পানির জোনাব আলী প্রথম শব্দটা শুনতে পেল। পায়ে দাদ্ এর চুলকানি থাকায় ওর ঘুম একটু পাতলা। অনিভজ্ঞ হলেও শব্দটা চিনতে ভুল করলো না। খাটিয়ায় শুয়েই ও চোখ মেলে তাকালো। ব্যারাকের স্কাইলাইটে বসে সুবেদার জিকরুল্লাহ কিয়ানী একটা সাব মেশিনগান থেকে ঘুমন্ত বাঙালি সৈন্যদের ওপর গুলি চালাচ্ছে। জোনাব আলী বিছানা থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে একটা হোল্ডঅলের নিচে লুকোলো। এরপর গুলির আওয়াজ বেড়ে গেল। একই অবস্থা চলল সবগুলি ব্যারাকে। যাদের বয়স কম তারা অস্ত্রাগারে যাবার চেষ্টা করতেই কোয়াটার গার্ড অতিক্রম করতে পারলো না। চিটাগাং থেকে কখন যে ৮ পাঞ্জাব এসে সারা ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে রেখেছে তা এই সরল মানুষেরা বুঝতে পারেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই সোয়া চার’শ সৈন্য লাশ-এ পরিণত হলো। পালাতে পারলো শুধু এমটি ড্রাইভার আতশ আলী, ব্যাটম্যান কলম গাজী, উমর আলী মাদবর, কৈলাশ চন্দ্র, মিলিটারি পুলিশের আলোক, নূরুল ইসলাম, মিলন আর শামছেল। ভদ্রজনেরা যেমন দুর্বৃত্তের সঙ্গে পেরে ওঠে না, নিরস্ত্ররাও সশস্ত্রদের সঙ্গে বেশিক্ষণ টিকলো না। প্রতিটি ব্যারাকে একই সময়ে এই সুষ্ঠু এবং নিরঙ্কুশ আয়োজন হয়েছিল নিপুণ পেশাগত দক্ষতায়।
রাত চারটায় ‘টুআইসি’ ইশরাত তার পরিদর্শন শেষ করলো। একান্ত পরিচিত সৈন্য আফসের মোল্লা, এসহাক, কদম আলী, সাইজউদ্দীন ও আলেফউদ্দীন এর মৃত দেহ দেখে তার মনে কোন ভাবের উদয় হলো না। এমনকি এক সময়ে তার নিজের ব্যাটম্রান ধনু মিঞার গুলিতে থেতলানো মাথার দিকে তাকিয়ে সে মাত্র এক সেকেন্ড ব্যয় করলো। তার পর ফোন তুলে সে তার অধিনায়ককে ঘটনা রিপোর্ট করল। শুনে ইয়াকুবের মুখটা কালো হয়ে রইলো।
৪.
সেনানিবাসের মসজিদ থেকে আযানের শব্দ শোনা যাচ্ছে। এই বাঙালি বেসামরিক নাবিককে বাঁচিয়ে রাখতে নির্দেশ ছিল। ইয়াকুব মালিক অযু করে নামাজে দাঁড়াবে। ইস্ত্রি করা ধবধবে শাদা শেলোয়ার কুর্তা তার পরনে। উৎসবের পোশাকে নামাজ পড়লে সওয়াব বেশি হয়। ইয়াকুব এ বিষয়ে উদাসীন নয়। তার জায়নামাজটিতে পবিত্র মক্কা মোয়াজ্জেমার প্রতিকৃতি। বাবার পেশা, বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এবং বাঙালিদের সম্পর্কে নিজের মনোভাবের বিষয়ে আজ সকালে মিথ্যে বক্তব্য প্রদানকারী লে. কর্নেল ইয়াকুব মালিক হাসতে হাসতে মাথায় একটা টুপি পড়লো। দেশটির সরকারী ইতিহাস বই এ প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানকে এই রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা হিশেবে দেখানো আছে। সে কতা ইয়াকুবের ভালো করে জানা আছে। রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠার দিন ও অন্য মাসে ইয়াকুব পাশের টেবিলের ওপর রাখা একটা ফটোগ্রাফের দিকে তাকালো। এতে ওর স্ত্রী জোবায়েরা এবং কন্যা নজফী হাসছে। জায়নামাজে দাঁড়ালে সংসারের কথা মনে করতে নেই তবু মাত্র কদিন আগে তাকে কর্নেল মজিদীর করা প্রশ্নগুলি মনে হতে থাকলো: ‘অনর্গল মিথ্যে বলতে পারবে?’
‘একদিকে সিগন্যাল দিয়ে আর একদিকে যেতে পারবে?’
‘শত্র“র সঙ্গে একবারে মিশে যেতে পারবে?’
‘হাসি না আসলেও হাসতে পারবে?’
‘অঙ্কুরে কোন কিছুকে নষ্ট করতে পারবে?’
এই প্রশ্নে ‘ওর’ নিজের দেয়া উত্তরগুলো মনে হওয়ায় ইয়াকুবের হাসি পেল। ১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্টের বাড়ির খুব কাছে পঞ্চাশ জন উপজাতি বিদ্রোহীকে গুলি করে মারার সেই দু’হাত ওর দু’কানের ওপর তুলে ইয়াকুব মালিক এবার নামাজ পড়া আরম্ভ করে। মাথায় জিন্নাহ টুপি, পরনে মর্দানের চমৎকার তশর কাপড়ের তৈরি কড়া ইস্ত্রি করা শাদা শালোয়ার কুর্তা পরা প্রার্থনারত ফর্সা মানুষটিকে এই উষালগ্নে পুতপবিত্র একজন দেবদূতের মত মনে হয়। লাহোরের শ্রেষ্ঠ আরবী শিক্ষকের কাছে আরবী শেখা ইয়াকুব মালিক চমৎকার উচ্চারণে যে কথাটি এখন শব্দ করে পড়তে থাকে তার অর্থ ‘আর এটাই হচ্ছে সহজ সরল লোকদের পথ।’


0 comments:
Post a Comment