মুক্তিযুদ্ধ ও নওগাঁর শহীদ বুদ্ধিজীবী
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তøাত এ স্বাধীনতাযুদ্ধে দেশের আপামর জনসাধারণ অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীরাও পিছিয়ে ছিলেন না। দেশের সকল জেলার মত সাবেক নওগাঁ মহকুমা [জেলা]-র সেইসব সূর্যসন্তান স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। যাঁরা ছিলেন জাতির অহঙ্কার। বাংলা একাডেমী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাই-বোন ও প্রিয়জনের স্মৃতিচারণ নিয়ে প্রকাশ করেছে ’স্মৃতি : ১৯৭১’। ’স্মৃতি : ১৯৭১’ এর এ পর্যন্ত ১৩টি খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে। সম্পাদনা করেছেন কথাসাহিত্যিক রশীদ হায়দার। ’স্মৃতি : ১৯৭১’ এর প্রথম খণ্ডের ‘প্রসঙ্গ কথায়’ বাংলা একাডেমীর তদানীন্তন মহাপরিচালক শিক্ষাবিদ, কবি আবুহেনা মোস্তফা কামাল লিখেছেন, ‘অবরুদ্ধ দেশে দখলদার পাকিস্তানী বাহিনী ও তার দোসরদের হাতে যাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন তাঁদের কথা কি সবাই ভুলে গেছে? না। জননী, জায়া, সন্তান ও সহকর্মীদের চোখ এখনো অশ্র“তে ভিজে উঠে যখন প্রতিবছর একটি বিশেষ দিন এসে দরজায় কড়া নাড়ে যেন শাদা রুমালে মুখ ঢাকা নিষ্ঠুর ঘাতক।’
প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সঠিক তালিকা আজ ৩৭ বছরেও সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। সে দায় কারো একার নয়, আমাদের প্রত্যেকেরই।
নওগাঁর শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ঃ
ওস্তাদ মানিক কিশোর নান্যাসী ঃ[শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী, নওগাঁ] :
নওগাঁ শহর থেকে ১৮ কি.মি. পশ্চিম-দক্ষিণ কোণ সদর থানার বলিহার ইউনিয়নের নিভৃত পল্লীতে জমিদার পরিবারে ১৩১৬ বঙ্গাব্দে ১৩ ভাদ্র বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ বিশারদ ওস্তাদ মানিক কিশোর নান্যাসী জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাক নাম শচীন্দ্র। পিতা জমিদার ঈশ্বর আনন্দ। কিশোর নান্যাসীর দ্বিতীয় স্ত্রী স্নেহলতা নান্যাসীর গর্ভজাত তিন পুত্রের মধ্যে শচীন্দ্র জ্যেষ্ঠ। তিনি নওগাঁর সঙ্গীত ভুবনে ছিলেন সুরের সম্রাট। তাঁর সঙ্গীত চর্চার ক্ষেত্রে নাটোরের মহারাণী হেমন্তকুমারী ও আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অবদান অসামান্য। তিনি সঙ্গীত সাধক গিরিজা চক্রবর্তীর নিকট প্রথম সঙ্গীতে তালিম নেন। তিনি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। লক্ষ্ণৌর মরিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ধ্রুপদী সঙ্গীতে দীক্ষা নেন। তিনি ইসলামী গজল, নজরুল সঙ্গীত, রবীন্দ্র সঙ্গীত, অতুল প্রসাদী, শ্যামা সঙ্গীত ও রামপ্রসাদী চর্চায় দক্ষ ছিলেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্র-ছাত্রী : মৈনম কলেজের অধ্যাপক আব্দুল জব্বার, স্বাধীনবাংলা বেতার শিল্পী রাজা চৌধুরী, নওগাঁর বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ভবেশ চ্যাটার্জী, বিশিষ্ট নজরুল সঙ্গীত শিল্পী শিফাত-ই-রাব্বান [মঞ্জুর], শিল্পী হরিদাস, শরৎকুমার সেন, মানিক সাহা প্রমুখ। তিনি প্রগতিশীল ও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ন্যাপ [মোজাফ্ফর] এর সমর্থক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা সঙ্গীতকে অস্ত্র হিশেবে ব্যবহার করেন।
ওস্তাদ মানিক কিশোর নান্যাসী বাড়ির পশ্চিম দিকে তাওয়ালের বিলের গর্তে লুকিয়ে ছিলেন যেখান থেকে ধরে এনে প্রচণ্ড নির্যাতন করে পাক-বাহিনী। অত:পর বলিহার বাজারের সামনে চালাঘরে হাত-পা বেঁধে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে। দিনটি ছিল ৬ মে ১৯৭১। তাঁর স্ত্রী বাণীবালা দেবী ৭২ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন [১৯৭৬]। সাংবাদিক এবিএম রফিকুল ইসলাম তাঁর পরিবারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন ’এখন তাঁর দুইপুত্র শ্যামলেন্দ্র কিশোর নান্যাসী ও কমলেন্দ্র কিশোর নান্যাসী বলিহার পৈত্রিক ভিটেমাটিতে বড়ই মানবেতর জীবন যাপন করছেন।’
লেঃ আনোয়ারুল আজিমঃ
[প্রধান প্রশাসক, নর্থবেঙ্গল সুগারমিল, গোপালপুর, রাজশাহীঃ]
তিনি নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার খট্টেশ্বর গ্রামে ১৩ ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সাংবাদিক ও ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট খান সাহেব মোহাম্মদ আফজাল একজন লেখক ও সমাজ সেবক ছিলেন ও তাঁর ’নওগাঁ মহকুমার ইতিহাস’ পাঠকের তৃষ্ণা মিটিয়েছে। মাতা মোছাম্মৎ মতিজান নেসা। পিতা-মাতার তিন সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শহীদ আনোয়ারুল আজিম মেধাবী ছাত্র ছিলেন। তিনি সংগঠক, সংস্কৃতিসেবী, ক্রীড়ানুরাগী, ফুটবল, টেনিস খেলায় পারদর্শী, গায়ক, সৌখিন নাট্যশিল্পী এবং সুবক্তা ছিলেন। দিনাজপুর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ১৯৪৯, দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে আই.এ ১৯৫১, রাজশাহী কলেজ থেকে বি.এ ১৯৫৩। রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থাকার জন্যে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরওয়ানা জারী করা হয়েছিল। রাজশাহী কলেজে ‘নওগাঁ সমিতি’ ও দিনাজপুরে ‘শক্তি পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশন্যাল রিলেশনস্-এ এম.এ ও এল.এল.বি ডিগ্রী অর্জন করেন। চাকুরি ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ, ডেমরা লতিফ বাওয়ানী জুটমিল ও উত্তরবঙ্গ চিনিকলে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৫ সালে ফুল ব্রাইট স্কলারশিপে আমেরিকা যান। সেখান থেকে ফিরে পি.আই.ডি.সি-র নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ডে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে নর্থবেঙ্গল [গোপালপুর] সুগার মিলে প্রধান প্রশাসক পদে যোগ দেন এবং সেখানেই তিনি অমর মৃত্যু বরণ করেন। নিহত হবার সময় তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের ক্যামরো বিভাগের লেফটেনেন্ট পদে বহাল ছিলেন। তাঁকে নির্মমভাবে ৫মে পাক-হানাদার বাহিনী গোপালগঞ্জ সুগার মিলের পুকুর পাড়ে হত্যা করে। তাঁর স্ত্রী শামসুন নাহার আজিম সেইদিনের মর্মস্পর্শী বর্ণনায় বলেছেন‘ .......
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর উদ্যত বন্দুকের সামনে অকুতোভয় জামার বোতাম খুলে বুক পেতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ’আমাকে গুলি না করে আমার একটি লোককেও গুলি করা যাবে না’।
তাঁর এই ঘোষণা হিংস্র করে ঘাতকদের, তাদের মধ্যে থেকে একজন বলে, ‘কেয়া, মরনেকা বহুৎ শউক হো গিয়া?’ তারপর বৃষ্টির মতো বুলেট সবাইকে ধরাশায়ী কর ফেললো। শহীদ আজিমও ঢলে পড়লেন। পরবর্তীতে এই পুকুরের নামকরণ হয় ‘শহীদ সাগর’ এবং গোপালপুর রেলস্টেশনের নাম রাখা হয় ‘আজিম নগর’। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তাঁর স্মরণে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। তিনি স্ত্রী, এককন্যা ও দুইপুত্র রেখে গেছেন।
বাসের আলী [নাট্যশিল্পী, বক্তারপুর]:
নওগাঁ সদর থানার ৪ কি.মি উত্তরে ঐতিহ্যবাহী বক্তারপুর গ্রামে ১৩২৯ বঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ফরতুল সরদার। মাতা আফরোজা বানু। তিনি পিতা-মাতার একমাত্র সন্তান। শহীদ বাসের আলী সাংস্কৃতিক সংগঠক, নাট্যশিল্পী, প্রাণবন্ত ও বন্ধুবৎসল ছিলেন। তিনি ‘শাজাহান’, ‘সোহরাব-রোস্তম’, ‘মিশর কুমারী’, ‘রাজা হরিশচন্দ্র’ নাটকে অভিনয় নৈপুণ্যতার স্বাক্ষর রাখেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দাতা হিশেবে তাঁর সুখ্যাতি ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে তাঁর চাচাতো ভাই মুক্তিযুদ্ধের আরেক শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল জব্বার দেশের এবং পরিবারের খবরাখবর নিতেন তাঁর কাছ থেকে। আব্দুল জব্বার তখন ভারতের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থানরত। অস্ত্রহাতে যুদ্ধ না করলেও স্বাধীনতা অন্ত:প্রাণ শহীদ বাসের আলী মুক্তিযোদ্ধাদের সবরকম সহযোগিতা করেছেন নির্ভয়ে। ইতোমধ্যে খবর আসে ছোটভাই আব্দুল জব্বার দেশে প্রবেশের পথে পাক-বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। সুযোগ সন্ধানী ঘাতকেরা এ মোক্ষম সুযোগকে হাতছাড়া করতে চায়নি। একমাত্র বাসের আলীই তাদের পথের বাধা। তাঁকে সরিয়ে দিতে পারলে দুই পরিবারের জায়গা জমি আত্মসাতের কোন বাধাই থাকবে না। মুখোশআঁটা ওই ঘাতকদল ছিল খুব কাছেই ওতপেতে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের শেলটার দাতা হিশেবে তাঁর প্রতি ঘাতকদের ছিল প্রচণ্ড রোষ, ফলে তাদের টার্গেটে রূপান্তরিত হতে সময় লাগেনি। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকা হানাদার মুক্ত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে পাক-হানাদার বাহিনী মিত্রবাহিনী প্রধান লে. জে. জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে। কিন্তু নওগাঁ তখনও হানাদার কবলিত। ১৮ ডিসেম্বর ১৯৭১ মিত্র বাহিনী নওগাঁ প্রবেশ করে। ওই দিনই হানাদার পাক-বাহিনী মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। নওগাঁ হানাদার মুক্ত হয়। হানাদার বাহিনীর দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস তখনও অস্ত্র সমর্পণ করেনি। ওরা মিশে যায় - গা ঢাকা দেয় দেশের অভ্যন্তরে। যেভাবে দেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার, বুদ্ধিজীবী জহির রায়হান মুক্ত স্বদেশে ৩০ জানুয়ারি হারিয়ে যান। অবশেষে ঘাতক খুনীর দল বাসের আলীকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা কার্যকর করতে উদ্যত হয়। ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিজ গ্রাম থেকে আড়াই কি.মি উত্তরে হিন্দু প্রধান এলাকা বালুভরা হাট থেকে ফেরার পথে হোগলবাড়ি গ্রামে মেঠোপথের পাশে অড়হর ক্ষেতের মধ্যে লুকিয়ে থাকা হানাদারের দোসররা হঠাৎ করেই তাঁর পথ আগলিয়ে দাঁড়িয়ে ফাঁকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। তাঁর সঙ্গীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে প্রাণ ভয়ে। তখন নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে তাঁর বুকে রাইফেল ঠেকিয়ে গুলি করে। হত্যা নিশ্চিত করতে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাঁর দেহ ক্ষত বিক্ষত করে দেয়। তাঁর লাশ বাড়ি নিয়ে এলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। হাজার হাজার মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠে বাতাস। তাঁর মৃত্যুশোকে কাতর বৃদ্ধা মা আফরোজা বানু ১৯৭৪ সালের এক শীতের রাতে ঘুমের মধ্যে মারা যান।
বাংলাদেশ ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে তাঁকে সম্মানিত করেছে। তিনি মা আফরোজা বানু, স্ত্রী, বিবাহিতা কন্যা সায়রা বানু ও নাবালক পুত্র এমদাদুল হক মন্টুকে রেখে যান।
মখলেছার রহমান চৌধুরী [শিক্ষক] :
বদলগাছী থানার ঐতিহ্যবাহী গয়েশপুর গ্রামে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী। মা আলিমা খাতুন। ছ’ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। গয়েশপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক ১৯৪৯ । ১৯৫১ সালে রাজশাহী কলেজে আই এস সি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন। কর্মজীবনে প্রথমে জাবারিপুরহাট পোস্ট অফিসে পোস্ট মাস্টারের দায়িত্ব পালন। অত:পর শিক্ষকতায় যোগদান। গয়েশপুর উচচ বিদ্যালয়ে আজীবন শিক্ষকতায় যুক্ত ছিলেন। তিনি একজন জাত শিক্ষক ছিলেন। বিশেষত: অংক এবং ভূগোলে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন। ভালো ছবি আঁকতেন। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহী ছিলেন। বর্তমানে গয়েশপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ৫ জন শিক্ষক-দিলীপ কুমার রায়, আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী, জগদীশ চন্দ্র বসাক, রমজান আলী এবং শ্যামল কুমার সরকার তাঁর ছাত্র। গয়েশপুর গণহত্যার দিন ১৪ অক্টোবর ১৯৭১ পাক হানাদাররা ১১ জনকে হত্যা করে। কয়েকদিন থেকে তিনি অসুস্থ ছিলেন। পাক-সেনারা তাঁকে, মা আলিমা খাতুন এবং বড় ভাই আফজাল হোসেন চৌধুরীকে টেনে হিঁচড়ে ঘর থেকে বের করে।
মা-দু’সন্তানকে জড়িয়ে ধরে রাখে। তখন তিনি পাক-বাহিনীকে আবেদন জানান, ‘তোমরা আমার বড় ভাইকে মেরো না। ওদিকে বড়ভাইও আবেদন জানান, তোমরা আমাকে মেরে ফেলো, আমার ছোট ভাইকে মেরো না। ওর খুব অসুখ।’
এক শয়তান আফজাল হোসেন চৌধুরীকে গুলি করে। মায়ের সারা শরীর ভিজে যায় তাজা রক্তে।
খসরু চৌধুরী সেই লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিয়েছেন, ‘এবার মখলেছার ভাই, পাশের বাড়ির এনামুল হক চৌধুরী ও আমিনুল হক চৌধুরী মন্টুকে নিয়ে তারা গেল একশ গজ পশ্চিমে-সেখানে মখলেছার ভাইদের কয়েকশ মণ পাটের গুদাম দাউ দাউ করে জ্বলছে। গুদামের পাশে আমার এক চাচা আব্দুল বারী চৌধুরীর গোয়ালঘর। তিনটে গরু আর দুটো মোষকে ঘরে তুলে শেকল আটকিয়ে আগুন দিয়েছে শয়তানের দল। জ্যান্ত পুড়ে ছাই হয়ে গেল নিরীহ প্রাণীগুলো নিমিষের মধ্যে। প্রথমে তিনজনকে পাট গুদামের লেলিহান আগুনের মধ্যে ছুঁড়ে দিতে চাইলো হানাদারেরা।..... কিন্তু মত বদলালো হানাদারদের একজন। দরকার নেই আগুনে ফেলার হাতের অস্ত্র ব্যবহার করলেইতো ঝামেলা চুকে যায়। পাশাপাশি বাঁধলো তারা তিনজনকে, তারপর হাসতে হাসতে খরচ করলো তিনটে বুলেট। দেশের পবিত্র ভূমিতেই শুয়ে পড়লো দেশমাতৃকার তিন সন্তান। পিশাচেরা ফিরে গেল পৈশাচিক আনন্দে।’.... তিনি স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন।
এস এম ফজলুল হক [শিক্ষক] :
১৯৩৩ সালে নওগাঁ সদর থানার হাঁপানিয়া ইউনিয়নের মোহনপুর গ্রামে ফজলুল হক জন্মগ্রহণ করেন। পিতা এস এম গুল মোহাম্মদ। তিনি মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ১৯৫২ সালে চক আতিথা হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ১৯৫৪ ও ১৯৫৬ সালে রাজশাহী কলেজ থেকে যথাক্রমে আই.এস.সি ও বি.এস.সি এবং ১৯৫৯ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অঙ্কে এম.এস.সি পাশ করেন। ১৯৫৯ সালে নওগাঁ বি.এম.সি কলেজে অধ্যাপনা শুরু। পরে সরকারি আনন্দমোহন কলেজ ও রাজশাহী সরকারি কলেজে অধ্যাপনা। তিনি সৌখিন নাট্যাভিনেতা এবং একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী ছিলেন। তিনি হাপানিয়া ক্লাব ও হাপানিয়া হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল পাক-হানাদার অতর্কিতে মোহনপুর গ্রাম আক্রমণ করে। পালানো সম্ভব না হওয়ায় তিনি নিজের ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। পাক-বাহিনী দরজা ভেঙ্গে জোর করে ঘর থেকে বের করে এনে তাঁর দশজন পরিবার পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনসহ তাঁকে লাইন করে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন।
আবু ফারুক চৌধুরী( আইনজীবী) :
সাবেক নওগাঁ মহকুমার বদলগাছী থানার ঐতিহ্যবাহী গয়েশপুর গ্রামে ১৯৪২ সালের ২৭ ফেব্র“য়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ওয়ারেছ আলী চৌধুরী। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। বগুড়া মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ১৯৫৬, বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে আই.এ ১৯৬০ এবং ১৯৬৬ সালে ব্যাচেলর অব ল রাজশাহী কলেজ থেকে। ১৯৬৭ নওগাঁ কোর্টে যোগ দেন। পারিবারিক কলহের শিকার হয়ে শৈশবে গৃহচ্যুত হয়ে পুরো পরিবারকে নিয়ে আমৃত্যু মামা আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরীর গৃহে সন্তান স্নেহে লালিত পালিত। তাঁর মামাতো ভাই বিশিষ্ট অনুবাদক খসরু চৌধুরী বলেছেন,‘ তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। দেশকে সত্যিকারের ভালোবাসতে চাইলে দলীয় মাধ্যম অপরিহার্য নয়। মস্কোপন্থী সমাজতন্ত্রের প্রতি টান ছিল তাঁর। উন্নয়নশীল যে-কোন চিন্তার তিনি ছিলেন ধারক এবং বাহক। মাতৃভূমির প্রতি ফারুক ভাইয়ের ছিল সুগভীর ভালোবাসা। প্রচুর পড়াশোনা করতেন তিনি । পুরো এক ট্রাংক গল্প উপন্যাস প্রবন্ধের বই ছিল তাঁর।
১৪ অক্টোবর ১৯৭১, ২৭ আশ্বিন ১৩৭৮, বৃহস্পতিবার। গয়েশপুর গণহত্যা দিবস। ওই দিন জয়পুরহাট থেকে এসে পাক-হানাদাররা খুব ভোরে গয়েশপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে। তখন সবাই ঘুমিয়ে। গোলাগুলির শব্দে আর্তচিৎকারে ঘুমন্ত গ্রামবাসী জেগে উঠে। বলাবাহুল্য এই গ্রামটি ট্রানজিট ক্যাম্প হিশেবে মুক্তিযোদ্ধারা ব্যবহার করতো। ওইদিন পাক-হানাদার বাহিনীর গুলিতে ১১ জন শহীদ হন। গ্রামের পাশে নদী এবং ঘুকসী বিল গ্রামটিকে অরক্ষিত এবং জনসাধারণের অভয়াশ্রমে পরিণত করে।’
খসরু চৌধুরী আরো লিখেছেন, ‘ছয়ফুল ভাই পালিয়ে গেছেন। শামসুল ভাইও হয়তো পালাতে পারতেন, কিন্তু মুমূর্ষু মেয়েকে ফেলে যাওয়া হলো না তাঁর। বড় ভাইয়ের অবস্থা দেখে আটকে গেলেন ফারুক ভাই। আমাদের বাড়ির সামনেই একটা বড় নারকেল গাছ। সেই গাছের সঙ্গে দুভাইকে বেঁধে হানাদারেরা প্রথমে গুলি চালালো শামসুল ভাইয়ের ওপর, ঢলে পড়ে সামনে হাত বাড়িয়ে দিলেন শামসুল ভাই, হয়তো শেষবারের মতো স্পর্শ করতে চাইলেন জন্মভূমির মাটি। তাকালেন ফারুক ভাই। দেখলেন, দুপেয়ে কয়েকটা জানোয়ার দাঁড়িয়ে আছে। রক্তলোলুপ, নৃশংস। পরে শুনেছি, গালি দিলেন তিনি, ‘বেজন্মার দল’। কখনোই মিথ্যে বলা পছন্দ করতেন না অকুতোভয় মানুষটি, একেবারে শেষ মুহূর্তেও সত্য কথাই বললেন। ছুটে এলো রাশি রাশি আগুন, কটুগন্ধী বারুদ। অন্ধকারে নিভে গেল আইনজীবীর পৃথিবী।’ তিনি অবিবাহিত ছিলেন। নওগাঁ উকিলবার ‘শহীদ আবু ফারুক চৌধুরী হল’ উৎসর্গ করেছে তাঁর স্মরণে।
আব্দুল জব্বার [রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী]:
নওগাঁ সদর থানার ৪ কি.মি. উত্তরে ঐতিহ্যবাহী বক্তারপুর গ্রামে জন্ম ৪ জানুয়ারী ১৯৪১ সাল। বাবা আহমদ আলী সরদার। মাতা শরিফা বেগম [ছতুন]। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।
শহীদ জব্বার সুদর্শন, মেধাবী ও ব্যক্তিত্ববান ছিলেন ১৯৫৬-তে চাকলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক, ওই বছরই বিয়ে- বৈবাহিক কারণে পারিবারিক অসন্তোষে একবছর লেখাপড়া বন্ধ। ১৯৫৯ সালে নওগাঁ বি এম সি কলেজ থেকে আই.এ এবং বগুড়া আযিযুল হক কলেজ থেকে বি.এ ১৯৬১। নওগাঁ ইউনাইটেড হাই স্কুল [জিলা স্কুল] ও নওগাঁ সেন্ট্রাল গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতা। সফল শিক্ষকের সুনাম অর্জন। ছাত্র জীবনে সক্রিয় ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী। ভালো ফুটবল ও ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড়, নাট্যশিল্পী, নাট্যনির্দেশক। ‘নকল পৃথিবী’, ‘পাকা রাস্তা’, ‘মিশর কুমারী’, ‘সিরাজদ্দৌলাহ’ নাটকে সিরাজের ভূমিকায় অভিনয় নৈপুণ্যতাগুণে সিরাজ নামে খ্যাতি অর্জন। নজরুল সঙ্গীত ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া আধুনিক গানে ভীষণ দুর্বলতা ছিল তাঁর। তাঁর কণ্ঠে বিশেষত: ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাইকেন মনে রাখ তারে’, ’অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে সঙ্গীতে’, আধুনিক‘মুছে যাওয়া দিনগুলো আমায় যে পিছু ডাকে’, ‘বসে আছি পথ চেয়ে ফাগুনের গান গেয়ে’, ‘শোন বন্ধু শোন-প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা’, ‘ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস, আজকে হ’ল সাথী’এক আলাদা বিরহগাঁথার সুর ছড়িয়ে দিত। অংক, ইংরেজি, ফার্সী, উর্দু ও আরবিতে পারদর্শী ছিলেন। ১৬৬৬ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এল.এল.বি ডিগ্রি অর্জন। একই বছর নওগাঁ কোর্টে যোগদান। ওই সময় প্রগতিশীল মস্কোপন্থী ন্যাপের রাজনীতিতে সক্রিয় এবং সাবেক নওগাঁ মহকুমা ন্যাপ [মোজাফ্ফর]- এর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। রেডক্রস সোসাইটির সদস্য। মুক্তিযুদ্ধে নওগাঁর অদূরে সান্তাহারে বন্দী অবাঙালি নারী ও শিশুদের মধ্যে রেডক্রসের পক্ষে খাদ্য বিতরণ। উত্তেজিত স্থানীয় বাঙালির রোষের শিকার। নওগাঁর নেতৃবৃন্দ ও তৎকালীন ইপিআর এর সেকেন্ড ইন কম্যান্ড ক্যাপ্টেন গিয়াস উদ্দীন আহমেদচৌধুরী বীর বিক্রম [ব্রিগেডিয়ার ,অব:] এর হস্তক্ষেপে উচ্ছৃঙ্খল জনতার কবল থেকে মুক্ত হন। নওগাঁ সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সদস্য। সাবেক ইপিআর ক্যাম্প মাঠে মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ। এপ্রিলের শুরুতে ভারত গমন। পশ্চিমবঙ্গ, বালুরঘাট শহরের ৬ কি.মি. দূরে ‘বোয়ালদাড় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে’ ন্যাপ-কমিউনিস্ট-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণেচ্ছু ছাত্র-যুবকদের ‘মটিভেটেড’ করার দায়িত্বে নিয়োজিত। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে আগস্ট [১৯৭১] সালে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ। পথিমধ্যে ধামইরহাট কলেজের সামনে ব্রীজের নিচে ওৎ পেতে থাকা পাকসেনা ও রাজাকাররা তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গী নওগাঁ সদর থানার হোগলবাড়ি গ্রামের যুবক ইউনুস আলী [স্বাধীনতার আর এক শহীদ] কে ধরে ফেলে। পাশেই ফার্সিপাড়া চৌধুরীদের বাড়ি পাক-সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এরকম একটি শিকার নাগালের মধ্যে পেয়ে নরপিশাচেরা উল্লাসে মেতে উঠে। পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন কাদরীর নেতৃত্বে শুরু হয় নির্যাতন। গাছে টাঙিয়ে. দ’ুহাতে লোহার পেরেক মেরে নির্যাতনের যত কৌশল জানা আছে সবই প্রয়োগ করে। শহীদ আব্দুল জব্বার নিশ্চুপ ও নিরুত্তর। তিনি জানতেন শয়তানের কাছে আবেদন বৃথা-মৃত্যু অবধারিত। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন তথ্য আদায়ের সকল নির্যাতন নীরবে সহ্য করেছেন তিনিহানাদারদের কাছে কোন তথ্যই প্রকাশ করেননি। নরঘাতক পশুদের সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। তিনদিন একটানা নির্যাতনের ফলে ধীরে ধীরে তাঁর প্রাণবায়ু বেরিয়ে যায়। চৌধুরীবাড়ির পাশে পুকুরপাড়ের একটি বাড়ির পাশে তাঁকে মাটি চাপা দেয়া হয়। চাপা থাকে না তাঁর পরিচয়-ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিকামী জনতার মুখে মুখে। স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শহীদ আব্দুল জব্বারের ভয়াবহ মৃত্যুসংবাদ প্রচার করা হয়। দুর্ভাগ্য এই যে, তাঁর মৃত্যুর সঠিক দিন তারিখ উদ্ধার করা এখনো সম্ভব হয়নি। তবে মধ্য আগস্টের ১১ থেকে ২১ তারিখের মধ্যে সম্ভবত তিনি শাহাদৎ বরণ করেন। ১৯৮৯ সালে প্রথম তাঁর কবরটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ৯মে ১৯৯৭ শিক্ষাবিদ আলতাফ হোসেনকে সভাপতি, রুবেল চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে সুধীজন সমন্বয়ে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট শহীদ অ্যাডভোকেট আব্দুল জব্বার স্মৃতি পরিষদ গঠিত হয়। ওই পরিষদের উদ্যোগে ফার্সিপাড়ায় শহীদ অ্যাডভোকেট আব্দুল জব্বার স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ ১৯৯৭। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা প্রশাসন ও নওগাঁ উকিলবারের সহযোগিতা স্মরণযোগ্য। স্বাধীনতা দিবস ১৯৮৩ শহীদ আব্দুল জব্বার স্মরণে ‘উত্তর মেঘ’ নামে স্মারক ম্যাগাজিন প্রকাশিত। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ তাঁর স্মরণে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ১৯৯৭্। নওগাঁ উকিলবারের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ আব্দুল জব্বার হল’। ২০০০ সালে স্মৃতি পরিষদ প্রকাশ করে একটি দুর্লভ গ্রন্থ ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী আব্দুল জব্বার স্মারকগ্রন্থ’। তাঁর প্রিয নজরুল সঙ্গীত‘অঞ্জলি লহ মোর’-এর নামে ষান্মাসিক সাহিত্য পত্রিকা তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্রের সম্পাদনায় [১৯৯৬-] নওগাঁ থেকে প্রকাশিত হচ্ছে।
তাঁর বিধবা মা শরিফা বেগম [ছতুন] [ জন্ম ১৩১২-মৃত্যু ১৪০৭ বঙ্গাব্দ] গত ১৩ আগস্ট ২০০০, ৯৫ বছর বয়সে দীর্ঘ রোগ-শোকের পর মৃত্যুবরণ করেন। বাবা আহমদ আলী সরদার রাজশাহী মেডিক্যালে দীর্ঘ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে গ্রামের বাড়ি বক্তিয়ারপুর নিয়ে আসার মাত্র দু’তিন পর মৃত্যু বরণ করেন [অক্টোবর, ১৯৭০]।
শহীদ অব্দুল জব্বার স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে যান।
যদি কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হয় তবে সেই জাতির সংস্কৃতিকে আগে ধ্বংস করে দাও। একটি জাতির সংস্কৃতির ধারক-বাহক এবং বিবেক ওই দেশের বুদ্ধিজীবী। তাই তাঁদের ওপরই হামলা করা হয় পরিকল্পিতভাবে-যাতে জাতি কখনো মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থের [প্রথম প্রকাশ : ১৯৮৫] ‘প্রসঙ্গ কথা’য় তদানীন্তন বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালক বিশিষ্ট লেখক, সাবেক সচিব বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, কবি মনজুরে মওলা লিখেছেন, ‘১৪ ডিসেম্বর ’শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস’ হিশেবে পালিত হলেও আজ এ সত্য সবার কাছে স্পষ্ট যে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল প্রথম থেকেই। আমরা দেখেছি ২৫ মার্চের কালোরাতেই হামলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায়, প্রথম আক্রমণেই শহীদ হয়েছেন অনেক শিক্ষাবিদ। প্রশ্ন জাগে, এইসব নিরস্ত্র বুদ্ধিজীবীদের প্রতি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাঁদের দোসরদের আক্রোশ জাগলো কেন? এটা অবধারিত যে, বুদ্ধিজীবীরাই জাগিয়ে রাখেন জাতির বিবেক, ....। একটি জাতিকে নির্জীব করে দেবার প্রথম উপায় বুদ্ধিজীবীশূন্য করে দেয়া। ২৫ মার্চ রাতে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অতর্কিতে, তারপরে ধীরে ধীরে, শেষে পরাজয় অনিবার্য জেনে ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে দ্রুত গতিতে’।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ, গীতিকার ও কবি আবু হেনা মোস্তফা কামাল লিখেছেন, বেদনাদায়ক হলেও সত্য, শহীদ বুদ্ধিজীবীর সঠিক সংখ্যা কত আমরা আজ পর্যন্ত তা নিরুপণ করতে পারিনি। আমাদের সামগ্রিক অবহেলাই এই ব্যর্থতার কারণ।
বাংলাদেশের শহরে-বন্দরে, গ্রামে-গঞ্জে এরকম কত রক্তাক্ত মা-বোন, ভাই-বন্ধু, পতœী-প্রিয়জন শোকের দুর্বহভার আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন, তার নির্ভুল হিসাব আমরা কেউ জানি না’।
বলা বাহুল্য নওগাঁ জেলাও এ থেকে মুক্ত নয়। নওগাঁর প্রকৃত শহীদ বুদ্ধিজীবীর সঠিক সংখ্যা নিরুপণ করা আজো সম্ভব হয়নি। এ দায়ভার থেকে বর্তমান প্রবন্ধের লেখকও মুক্ত নন। সারস্বতসমাজ এবং সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় [৩৭ বছর দীর্ঘকাল পরেও] এ অন্ধকার যে ঘুচে যাবে তাতে কোন সংশয় নেই।
গ্রন্থনা: শাহেদ জাব্বার
কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
১. শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ । সম্পাদনা : রশীদ হায়দার। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। প্রথম প্রকাশ অগ্রহায়ণ ১৩৯২, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৮৫।
২. ‘স্মৃতি : ১৯৭১’ সম্পাদক : রশীদ হায়দার। ঐ [১ম খণ্ড]প্রথম প্রকাশ : অগ্রহায়ণ ১৩৯৫, ডিসেম্বর ১৯৮৮।
৩. ‘স্মৃতি : ১৯৭১’ সম্পাদক : রশীদ হায়দার। ঐ [২য় খণ্ড] প্রথম প্রকাশ : ৩০ অগ্রহায়ণ ১৩৯৬, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৮৯।
৪. ‘স্মৃতি : ১৯৭১’ সম্পাদক : রশীদ হায়দার। ঐ [দ্বাদশ খণ্ড] প্রথম প্রকাশ : ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪০৬, ১৪ ডিসেম্বর ১৯৯৯।
July 24, 2008
Subscribe to:
Post Comments (Atom)


0 comments:
Post a Comment