তপন রুদ্র
গ্রাম ও গ্রাম জীবনের আচার, ঐতিহ্য, জীবিকা, বিনোদন, সুখ-দুঃখ ইত্যাদি নিয়েই আমাদের সার্বিক পরিচয়ের ইতিবৃত্ত রচিত হয়েছে। ‘গ্রাম্যতা’ আপাতদৃষ্টিতে একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর নাম। আমরা অনেক সময় আক্ষেপ করে বলে থাকি আমাদের জীবনবোধ ও জীবনাচার অদ্যাবধি গ্রাম্যতায় আচ্ছন্ন। অর্থাৎ গ্রাম্যতা মানে পশ্চাৎপদতা, গ্রাম্যতা মানে সংস্কৃতিহীনতা, গ্রাম্যতা মানে নিরক্ষরতা ইত্যাদি নানা ধরনের হতাশা বা অক্ষমতা বলতে যা বুঝি তার জন্য দায়ী কেবল ঐ গ্রাম্যতা। এমনকি গ্রামের টাউট-বাটপার ও শোষক মহাজন শ্রেণী যে বর্বর কালচার ধারণ করে, তাকেও প্রকারান্তরে ঐ গ্রাম্যতা নামেই অভিহিত করি। আসলে এতে যে আমাদের অমার্জনীয় অহংকার ও অজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে তা আমরা ভেবে দেখি না।
প্রকৃত অর্থে গ্রাম্যতা একটি মহান সরলতার নাম। গ্রামীণ জীবনে আবহমান কাল ধরে যে গৌরবময় শিষ্টাচার, উদার আত্মীয়তা, ভ্রাতৃত্ব এবং সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞের নানা অকৃত্রিম উপাচার আজও অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে সেইসব আকরে ধরেই আমাদের গ্রাম্যতার ভিত্তি ও প্রকৃতি রচিত হয়ে আসছে। অতএব গ্রাম্যতাই আমাদের আদি সংস্কৃতি। আমাদের সার্বিক চেতনা, শখ, প্রবণতা এবং জীবিকার সিংহভাগ যাগযজ্ঞ সকল প্রকার গ্রাম্যতার উৎসের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। ধর্মীয় সহনশীলতা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রেক্ষিত যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে একান্তভাবে কাঙ্খিত- তাও আমাদের গ্রাম্যতারই এক মহান নির্দেশ। আমাদের সকল গ্রামীণ লোকাচারে সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সম্প্রীতির বর্নীল প্রতিফলন ঘটে থাকে। তবে এক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলক এবং কৃত্রিম স্বক্রিয়তার তুলনায় আন্তরিকতা ও স্বতস্ফূর্ততাই অনেক বেশী লক্ষ্যণীয় এবং কার্যকর।
তাই আমাদের গ্রাম্যতা আমাদের পাথেয় হয়ে থাক। তথাকথিত নগর সভ্যতা যতই বিস্তৃত হোক, প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক সভ্যতা যতই ঝলমলিয়ে উঠুক, আমাদের সরল গ্রাম্যতার মহান আবেদন ফুরিয়ে যাবার সময় আসেনি এখনও, তা আমরা হলফ করে বলতে পারি। আমাদের এই দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করার যে জোর আমাদের অন্তর থেকে পাই তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল আমাদের চিরন্তন মেলাসংস্কৃতি। আমরা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক শিল্পমেলার কথা জানি, অনেক বড় মাপের বাণিজ্যমেলার কথা শুনে থাকি বা ওসব দেখেও থাকি। কিন্তু সেগুলো আমাদের মূল সংস্কৃতির সাথে গ্রথিত নয়। আমাদের যে মেলাসংস্কৃতি অতি পুরাতন এবং অতি তাৎপর্যময় তা একান্তভাবে আমাদের চিরাচরিত গ্রাম্যতার উপর নির্ভরশীল। তাই শুধুমাত্র মেলা নয়, গ্রাম্যমেলাই হল আমাদের মেলাসংস্কৃতির প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।
বাঙালিরা মেলাপ্রিয়। মেলার প্রতি আসক্তি আমাদের এক অতি প্রাচীন প্রবৃত্তি। আমাদের আড্ডাপ্রীতি, বন্ধুপ্রীতি, রসনার বিলাসপ্রীতি এবং সমাবেশের জন্য আয়োজনপ্রীতির মত অসংখ্য সৌখিন অনুভূতি যেন স্বশরীরে বহুমুখী ও বহুবর্ণের এক মিশ্র অস্তিত্ব ঘোষণা করে মেলার আঙ্গিকে। প্রতিটি গ্রাম্যমেলায় আমরা তাই খুঁজে পেতে পারি আমাদের যত আন্তরিক ও মনস্তাত্বিক সত্যতা।
গ্রাম্যমেলা আমাদের প্রাচীন ভাবধারা, চিরায়ত বিশ্বাস এবং আমাদের সর্বকালের জীবনচর্চার নানা উপাদান বহন করে। তাই এই বিশেষ সাংস্কৃতিক ধারার বিকাশ বহুযুগের ক্রমবিবর্তিত এক মহাপরিণতি। গ্রাম্যমেলার যে প্রাণময় রূপ ও নানামুখী বৈশিষ্ট্য আমরা প্রত্যক্ষ করে আসছি তা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। ক্রমঅগ্রসরমান মানব ইতিহাসের নানা পর্যায়ে গ্রাম্যমেলার প্রকৃতি ও আদল গড়ে উঠতে সহায়তা পেয়েছে। এই সহায়তা এসেছে মূলত: শ্রমজীবী, কৃষক ও নানা শ্রেণীর মজুর সম্প্রদায়ের কাছ থেকে। তাদের সৃজনী শক্তি, তাদের চাহিদা, তাদের বিনোদন এবং তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন এক কল্যাণকর বাণিজ্যনীতিই গ্রাম্যমেলার অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছে। প্রথম সহস্রাব্দের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ খ্রিস্টিয় ৬ষ্ঠ শতাব্দী ও তার পরবর্তি পাঁচশত বছর আমাদের মেলাসংস্কৃতি বিকাশের একটা উপযুক্ত কাল বলে অনুমান করা হয়ে থাকে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. নীহাররঞ্জন রায় রচিত বাংলার ইতিহাসের বেশ কিছু অধ্যায়ে এমন ইঙ্গিত মেলে। ইতিহাসের ঐ সুবিস্তৃতকালকে বাংলার মধ্যযুগ-পূর্ব অধ্যায় বলে গণ্য করা হয়। পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ, এমনকি অষ্টাদশ শতকের অধিকাংশ বছরগুলিকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের মধ্যযুগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। তবে প্রকৃত বিচারে আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ১৮৫৭ সালে সংগঠিত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে সূচিত হয়। মধ্যযুগ বলে চিহ্নিত ইতিহাসের সেই বিস্তৃত পরিসরকে আমরা বড় বেশী প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখি না। আমাদের পূর্বসূরী বহু খ্যাতিমান ঐতিহাসিক, লেখক-বুদ্ধিজীবী কথিত মধ্যযুগের দিনগুলিকে সবচেয়ে অন্ধকার কাল বলে অভিহিত করেছেন। আমরাও সেই সুরে গলা মিলিয়ে প্রায়ই একই কথা বলে থাকি। তবে নানা ঐতিহাসিক প্রমাণ ও পুরাতাত্বিক নিদর্শনের বিপরীতে এক নীরব অথচ আলোকিত অধ্যায়ের বিশ্বস্ত আভাষ দিয়ে যায়। আমরা যদি কুমিল্লায় অবস্থিত ময়নামতির বৌদ্ধ বিহার, বগুড়ায় মহাস্থানগড় এবং জয়পুরহাটে অবস্থিত পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারের সমস্ত নিদর্শন, ধংসাবশেষ এবং পুরোনো নিদর্শনগুলো গবেষণামূলক মনোভাব নিয়ে বিচার করে দেখি, তাহলে যা আবিষ্কার করতে পারি, তা থেকে আমাদের অপরাপর সাংস্কৃতিকধারা বিকাশের সঠিক কাল ও কালীক পরিসরে সেগুলোর উল্লেখযোগ্যবৈশিষ্ট্যও সন্ধান করে দেখতে পারি। বাংলাদেশের বাইরে, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিম বাংলায় সংরক্ষিত নানা প্রতœতাত্বিক নিদর্শন ও সূত্র থেকেও আমরা বাংলার লোকাচার ও গ্রামীণ সভ্যতার বিবর্তনের অজস্র উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারি। এরমধ্যে উল্লেখ্য অনেক নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে উত্তর জনপদের অন্যতম এক পুরোনো জেলা শহর কুচবিহারের মহারাজার দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদে বর্তমানে যেটি সরকার পরিচালিত একটি মস্তবড় যাদুঘর।
স্মৃতিসংরক্ষণকারী যাদুঘর কিংবা কোন দুর্গ-প্রাসাদ অথবা হিসাব-কিতাবের ধ্বংসাবশেষ যাই আমরা ইতিহাসের আলোকে গবেষণা করে দেখি না কেন, অবশ্যই আমরা সবকিছুতেই প্রাচীন গ্রাম্য জীবনধারার কোন না কোন সূত্র খুঁজে পাব। যেসব ধংসাবশেষ, যাদুঘর অথবা, পুরাকীর্তির কথা উল্লেখ করা হল তা থেকে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশের গ্রাম্যমেলার বয়স দেড়হাজার বছরেরও অনেক বেশী। এই মতের অনুকূলে অবশ্যই বিস্তর যুক্তি আছে। তার উপর কিঞ্চিত আলোকপাত এভাবে করা যায় :
বাংলার পুরাকীর্তির নিদর্শন হিসাবে আমরা যেসব মাটির তৈরি থালাবাসন, বাদ্যযন্ত্র এবং মূর্তির নমুনা পাই, প্রমাণিত হয়েছে যে সেগুলো মোটামুটিভাবে ৭ম থেকে শুরু করে ১৮শ শতকের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। আমরা জানি যে কৃষিপণ্য ছাড়াও কারিগরি শিল্প (যে পর্যায়েরই হোক), নানা প্রকার কুটির শিল্প, পোড়ামাটির তৈরি অসংখ্য সামগ্রী এবং সৌখিন খাদ্যসামগ্রী যে কোন লোকজ মেলার প্রধান আকর্ষণ ও উপভোগের অবারিত স্থল। কারিগর, শিল্পী এবং কর্মীরা অবশ্যই তাদের উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা আকর্ষণ করার চেষ্টা করে থাকে- যা সর্বকালেই সত্য। যে কালে সুনিয়ন্ত্রিত বাজার পদ্ধতি চালু ছিল না, সেই যুগে অর্থাৎ মধ্যযুগের প্রারম্ভে একান্ত কেনাবেচা ও বিনোদনের সুবিধাজনক কেন্দ্র সৃষ্টির তাগিদ থেকেই গ্রামবাংলার মানুষ মেলা অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সঙ্গত কারণেই এসে পড়ে স্থান নির্বাচন, সুবিধাজনক সময় নির্ধারণ, উপলক্ষ্য নির্ধারণ এবং নেতৃত্ব নির্বাচন। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না মেলাসংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের সাথে আমাদের সার্বিক সমাজ কাঠামো কতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ থেকে আরও অনুধাবন করা যায় গ্রাম্যমেলার বিকাশ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অস্তিত্বের সাথে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ।
গ্রাম বাংলার মানুষ মেলায় যেতে ভালোবাসে, মেলায় অংশ নিতেও ভালোবাসে। অনেক পেশাদার শ্রেণী ও কর্মী তাদের জীবিকার জন্য অনেকাংশে মেলার ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। তাই মেলা ভেঙ্গে গেলে কিংবা মেলা কোন কারণে বন্ধ হয়ে গেলে এদেশের সাধারণ মানুষ বড় বেশী কষ্ট পায়, তাদের অর্থনৈতিক সমস্যাও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের সকল জেলায় একই ব্যাপার। মেলার ব্যাপারে কোন প্রকার ব্যতিক্রমী বা নেতিবাচক নীতি কোন জেলার গ্রাম্যমানুষ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না।
আমাদের দেশের গ্রাম্যমেলার নাম, উপলক্ষ্য, তার প্রকৃতি, তার অর্থনৈতিক পটভূমি, তার সামাজিক ও ধর্মীয় গভীরতা ইত্যাদি এতই বিচিত্র যে কোন ক্ষুদ্র বা সীমিত পরিসরে এর সার্বিক চিত্র তুলে আনা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তারপরেও সচেতন ও দেশপ্রেমিক বাঙালি মাত্রই সারা দেশের গ্রাম্যমেলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেই পারেন। আমরা মনে করি এতদ্বিষয়ে একটা সম্যক ধারণা সচেতন ও সুশিক্ষিত মহলকে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই রাখা অত্যন্ত জরুরী। কারণ দেশের প্রতিটি গ্রাম্যমেলায় আমাদের প্রকৃতি ও সার্বিক পরিচয়ের কিঞ্চিৎ প্রতিফলন অনিবার্যরূপেই ঘটে যেতে বাধ্য। গ্রাম্যমেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথা ঐতিহ্যগতবৈশিষ্ট্যগুলো মোটামুটিভাবে নিম্নরূপ :
(ক) গ্রাম বা শহরতলীর প্রচলিত হাট-বাজার থেকে কিছুটা দূরের নির্ধারিত খোলামাঠ।
(খ) নদী-খাল কিম্বা বড় বড় পুকুরের ধারে অধিকাংশ মেলার স্থান দেখতে পাওয়া যায়। সেই সাথে থাকে একটি অথবা কয়েকটি বৃত্তান্তমূলক বড়-অশ্বথ কিম্বা পাকুর গাছ।
(গ) প্রাচীন কোন মন্দির, ঐতিহাসিক কোন স্থাপনা, এককালের রাজা জমিদারদের খাজনা বা কর আদায়ের নিমিত্তে নির্মিত ভবন বা কমপ্লেক্সের অদূরে কোন সুবিধাজনক স্থান।
(ঘ) বিভিন্ন প্রকারের কৃষিজাত পণ্য ও কৃষি উপকরণ প্রাপ্তিযোগ্য স্থান।
(ঙ) কিংবদন্তি ও পৌরাণিক কাহিনীসমৃদ্ধ আকর্ষণীয় স্থান।
(চ) কামার-কুমোর-তাঁতি ও বাঁশ-শিল্পের কারিগর অধ্যুষিত গ্রাম।
(ছ) অসংখ্য ধরনের মিষ্ট-দ্রব্যের সমাহার; যেমন-মুড়কি, মোয়া, জিলাপি, নারু, খিড়, সন্দেশ, রসগোল্লা, চিনি ও গুড়ের বাতাশা, নানা প্রকারের ছাতু, ফলমূল, দই-চিড়া ইত্যাদি সেই সাথে পান-শুপারী, গুণ্ডি, তামাক ও নানা ঔষধি-সামগ্রির ব্যাপক উপস্থিতি।
(জ) অসংখ্য বিনোদনমূলক উপাচার; যেমন-ঘুড়ি ওড়ানো, সার্কাস, পুতুলনাচ, ম্যাজিক, গুটি খেলা, লাঠিখেলা, যাত্রাগান, পালাগান, পুঁথিপাঠ ইত্যাদি।
(ঝ) বাহারী নানা রঙের চুড়ি, ফিতা, আয়না, চিরুনি, পুতুল, সিঁদুর এবং রকমারি গ্রাম্য-প্রসাধনী ইত্যাদি।
(ঞ) বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বিনোদনমূলক নানা ধরনের প্রাণী; যেমনÑ বানর, হরিণ, হাতী, ভল্লুক ইত্যাদি প্রদর্শনী অথবা বিক্রির জন্য আমদানি।
(ট) মেলার সময় ও দিন নির্ধারণে ধর্মীয় তিথি অনুসরণ করা হয়। বিশেষকরে চন্দ্রের অবস্থানগত ক্ষণ বা তিথি এক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়।
(ঠ) মহরম মাসে কারবালার ঐতিহাসিক ফোরাত নদীর তীরে সংগঠিত হযরত ইমাম হোসেন (র:) ও তাঁর আত্মীয় পরিজনের বিয়োগান্ত ঘটনার দিনক্ষণ অনুসারে তাজিয়া প্রদর্শনী ও সেই সাথে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মহররমের মেলার অধিকাংশ উপাদান অপরাপর গ্রাম্যমেলায় দেখতে পাওয়া বিভিন্ন উপাদানেরই অনুরূপ।
একটি কথা বলতেই হয়, রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিভিন্ন ধনী দেশের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের যে সকল বাণিজ্যিক মেলা রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম কিম্বা শিল্পনগরী খুলনায় জমকালো কলেবরে এবং আলো ঝলমল আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, সেগুলো বাদে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত প্রায় সব ধরনের মেলাকেই আমরা গ্রাম্যমেলার পর্যায়ে ফেলতে পারি।বৈশিষ্ট্য্য ও ফলাফলের মাপকাঠিতে এটা জোর দিয়ে বলা যায় বলে আমরা বিশ্বাস করি।
গ্রাম্যমেলা একটি ক্রম বিকশিত বিষয় হলেও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানামুখী নতুন প্রবণতা ও উপাদান যুক্ত হওয়ায় গ্রাম্যমেলা তার আদি অবস্থায় টিকে থাকতে পারছে না। সেই সাথে উঠতি ধনীকশ্রেণী, নতুন স্বভাবের মাতব্বর ও স্বার্থান্বেষী নিয়ন্ত্রক-গোষ্ঠীর উদ্ভব এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অল্প-বিস্তর প্রসার গ্রাম্য সমাজ কাঠামোর সনাতনী রুটি, ভাবধারা ও কর্মকাণ্ডের গতি প্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে কখনো বা সংকীর্ণ কূপমণ্ডুুক দৃষ্টিভঙ্গীর উগ্র বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, মুনাফা লোভী এক ধরনের বাজারী দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন ঘটছে। সেই সঙ্গে অতি আধুনিকতার নামে অতীত বর্জনের এক খেয়ালী ও অজ্ঞ মনোভাব গ্রাম্যমেলার উদ্দেশ্য ও ঐতিহ্যকে লাঞ্ছিত করছে। এসবের প্রধান প্রধান লক্ষণ যা, তা’হল মেলাকে বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের একান্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলে চিহ্নিত করার হীন চেষ্টা, মেলা অনুষ্ঠানের সুযোগে বিপুল পরিমাণে অর্থ রোজগারের আশায় হাউজি, জুয়া, ব্লু-ফ্লিম প্রদর্শনী, অবাধে মদ বিক্রী, যাত্রার নামে নগ্ন নৃত্য প্রদর্শনী, রাজনৈতিক ক্যাডারদের দ্বারা প্রভাববিস্তারকারী নানা প্রকার অপকর্ম ও সন্ত্রাস ইত্যাদি। সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার একটা সর্বগ্রাসী আশংকা গ্রামীন মেলাসংস্কৃতির চেতনাকে দ্বিধাগ্রস্থ করছে বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে। আর সবচেয়ে হতাশার দিক হল কামার, কুমার, তাঁতী ও বাঁশের যারা কারিগর- তাদের হাতের তৈরি শখের বস্তু কিম্বা প্রাত্যহিক জীবনে অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলোকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তার জায়গায় ক্রমেই চলে আসছে শহর বন্দরে নির্মিত চোখ ধাঁধানো ঠুনকো সামগ্রী। এতে করে গ্রাম্যশিল্পী ও কারিগরশ্রেণী হতাশ হয়ে মেলা বিমুখ হয়ে পড়ছে। তাই মেলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও তার আদল বাঁচানোর তাগিদ সচেতন দেশপ্রেমিক সকলকে অনুভব করতেই হবে। বঙ্গীয় সমাজ-প্রেক্ষিতকে যথাযথভাবে ধারণ ও মূল্যায়ন করার স্বার্থে আমাদের চিরাচরিত ধারা মেলা কালচারকে উৎসাহিত করার বিশেষ প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে বর্তমান প্রেক্ষিত যাইহোক, সারা দেশ জুড়ে গ্রাম বাংলার মানুষের ঐক্যবদ্ধ চেতনার মহিমা নিয়ে এখনও এরকম অসংখ্য গ্রাম্যমেলা বছরের বিভিন্ন সময়ে নির্মল আনন্দ ও বিচিত্রভাবে বাঁচার প্রত্যয়ী উদ্দীপনা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এসব মেলার প্রকৃত সংখ্যা ও তার নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস সঠিকভাবে জানাও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সেই বিশাল গবেষণামূলক কাজটি আমরা সমাপ্ত করতে পারিনি আজও। তবে আমরা বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মেলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও ইতিহাস বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি। সেই অবকাশে এই পর্যায়ে কিছু বিখ্যাত মেলার নাম উল্লেখ করতে পারছি।
একেবারে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে দ্বীপ মহেশখালি। কক্সবাজার জেলার এই মহেশখালি দ্বীপে আদিনাথের প্রাচীন মন্দিরসংলগ্ন বিশাল এলাকা জুড়ে বিশেষ তিথিতে আদিনাথ মেলার অনুষ্ঠিত হয়। প্রচুর লোকসমাগমের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই মেলায় বিদেশী পূণ্যার্থীরাও ভীড় জমায়। এই মেলা উপলক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সহযোগিতা দান করা হয়। ঢাকার অদূরে নারায়নগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে চৈত্র মাসে জগত বিখ্যাত লাঙ্গলবন্দ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই মেলার বহুমুখী গুরুত্ব আছে। তবে এর সূচনা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে সর্বজনবিদিত একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে। মহাভারতে উল্লেখিত দ্বাপর যুগে ভগবানের কথিত অবতার শ্রীকৃষ্ণের বড় ভাই শ্রীবলরাম এই মেলার সূচনাকারী বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাস একটা ধর্মাশ্রয়ী অনুভূতি প্রসুত হলেও প্রকৃত কাহিনীটি সকলেই বেশ উপভোগ করে থাকেন। এতে বলা হয় শ্রীবলরামের আর এক নাম হলধর। হল অর্থাৎ লাঙ্গল। লাঙ্গল ছিল তার প্রধান প্রহরণ বা আত্মরক্ষাকারী অস্ত্র। এর একটা রূপক বিশ্লেষণ আছে। তবে আমরা সেদিকে যাবো না। সেই হলধর বলরাম এক সময় ভ্রমণ করতে করতে সৌতকী ঋষির আশ্রমে যান। সেখানে তিনি দেখলেন ঋষি নেই। তার প্রধান শিষ্য একজন নিচুশ্রেণীর সুতপুত্র। সেই সুতপুত্র তার অর্জিত জ্ঞানের গরিমায় তার নির্দিষ্ট আসন থেকে নেমে এসে হলধরকে সমাদর জানাতে কুন্ঠাবোধ করলেন। এতে শ্রীবলরাম ভয়ানক রুষ্ট হন এবং তার হাতের বিশাল লাঙ্গল দিয়ে টেনে নিয়ে সুতপুত্রের মুণ্ডু কেটে তাকে হত্যা করেন। এর ফলে একজন তপস্যী হত্যার মহাপাপ তার উপর বর্তায়। সেই পাপের ফলে সেই বিশালাকায় লাঙ্গল তার অঙ্গের সাথে কঠিনভাবে লেগে যায়। ফলে ঘুমে কিংবা জাগরণে সবসময় তাকে সেই লাঙ্গলের ভার বহন করতে হচ্ছিল। তিনি সেই পাপমুক্তির উপায় নিয়ে বিভিন্ন সাধু সিদ্ধপুরুষদের সাথে বাক্যালাপ করতে বাধ্য হন। তাঁদের পরামর্শে শ্রীবলরাম লাঙ্গল কাঁধে বিভিন্ন তীর্থ পরিভ্রমণ এবং বিভিন্ন নদীতে পূণ্যস্নান করেন। পরিশেষে তিনি বহু বছর পর অধুনা বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জের যে এলাকায় অষ্টমীর মেলা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে আসেন এবং সেই এলাকাসংলগ্ন নদীতে পূণ্যøান করেন। তারপর সেখানে তিনি অনেক দান করেন এবং নিজের পাপকর্মের কথা স্মরণ করে অনুশোচনা প্রকাশ করেন। এর ফলে সঙ্গে সঙ্গে তার পাপ পুরোপুরি লাঘব হয় এবং তার শরীর থেকে বিশাল সেই লাঙ্গলটি খসে পরে। এতে বলরাম খুশীতে আত্মহারা হন এবং স্বীয় উদ্যোগে সেখানে পূণ্যস্থান এবং সাধারণ মানুষের হীতার্থে সেখানে (উল্লেখিত তীর্থে) মেলা অনুষ্ঠানের প্রচলন করেন।
লাঙ্গলবন্দের প্রাচীন মেলায় দেশ বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর পরিদর্শন করতে ভীড় জমায়। ধর্মীয় মোড়ক এখানে যতই দৃঢ় হোক, আসলে এই বিশাল মেলায় সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে গ্রাম্য চেতনা ও গ্রামীণ উপাদান- পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো, সার্কাস, পালাগান ও ব্যবহার্য নানা দেশী পণ্য। বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় কুমারখালিতে মাসব্যাপী কালীর মেলার কথা সকলেই জানে। এখানকার আকর্ষণ গ্রামীণ তাঁতশিল্প। তাছাড়া মাটির তৈরি হাড়িপাতিল, বাসন-কোসনসহ শিশুতোষ নানা সামগ্রী এই মেলার প্রধান আকর্ষণ।
রাজধানী শহর ঢাকার উপকণ্ঠে ধামরাই একটি প্রসিদ্ধ এলাকা। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রসিদ্ধির অন্যতম কারণ এখানকার রথযাত্রার উৎসব ও তাকে ঘিরে বিশাল মেলা। এই একই উপলক্ষে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যেমন বরিশাল, ফরিদপুর ও যশোরেও জাঁকজমকের সাথে মেলা উৎসবের মস্ত আসর বসে। লোকজ নানা পসরা গ্রামীণ জনপদের মানুষ সেখানে কেনাবেচা করে।
উত্তরবঙ্গের অন্যতম শস্যাগার হল দিনাজপুর জেলা। বৈশাখ মাসে অনুষ্ঠিত কান্তজীর মেলা এখানকার এক প্রাচীন ঐতিহ্য। এই মেলাকে নিয়ে নানা জনশ্র“তি ও কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কাটারিভোগ ধানের সুগন্ধি চিরা, ঐতিহ্যবাহী এর পোড়ামাটির কলকি, সন্দেশের সাজ ও থালা-বাসন এই মেলার লোভনীয় আকর্ষণ। তবে উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর অন্যতম কুড়িগ্রাম জেলার বিচিত্র ধারার এবং বিভিন্ন নামের আঞ্চলিক মেলাগুলো সত্যিই উল্লেখ করবার মত। জেলার দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদ-সংলগ্ন বন্দর চিলমারীর সুপ্রাচীন অষ্টমীর মেলা- যাকে বারুনির মেলাও বলে। এরপর দারুণভাবে উল্লেখ করা যায় নাগেশ্বরী উপজেলার মাদাইখালের উৎসব মুখর কালির মেলার কথা ও পাটেশ্বরী ঘাটসংলগ্ন শুয়োরডুবির মেলা।
শেষোক্ত এই নামের মধ্যেই উক্ত মেলার প্রচলন সংক্রান্ত একটি বহুল প্রচারিত জনশ্রুতি চালু আছে। ধরলা বেষ্টিত কাচির চরে শতাব্দী প্রাচীন কালির পাট (কালিপূজার জন্য নির্ধারিত উঁচু স্থান) জাতী ধর্ম নির্বিশেষে সকল গ্রামবাসীর কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান বলে গণ্য হত। সেখানে কালিমুর্ত্তির পাশে রাজা ঘাটিয়াল নামে স্থানীয় ভিত্তিতে এক দেবতার অস্তিত্ব মানা হত। ঘাটিয়াল কথার অর্থ নদী নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা। রাজা ঘাটিয়াল মানে (স্থানীয়ভাবে) জলদেবতা। যাকে সন্তুষ্ট না করলে নদী ভাঙন রোধ করা যাবে না। কালি ও রাজা ঘাটিয়ালকে পূজা দেয়ার পাশাপাশি সেখানে মেলা বসত। কিন্তু একবার মস্তবড় একটা শুয়োরের পাল নদীতে জল পান করতে গিয়ে ঘন পাকে পড়ে যায় এবং একই সাথে দুই তিনশ শুয়োর ঘূর্ণীপাকের টানে পানিতে তলিয়ে যায়। সরল মানুষের মধ্যে বিশ্বাস বা ভয় জন্মে যে, সেই ঘূর্ণীপাকে কোন এক অপদেবতা বাস করে। মুণ্ডুহীন, কালো কুচকুচে এই অপদেবতার বুকে বড় বড় দাঁত, চোখ এবং রক্তলোলুপ মস্ত জিভ সবসময় লকলকিয়ে থাকে। সেই অপদেবতার নাম ‘মাষান’; তাকে বিরক্ত করায় এবং পূজা না দেয়ায় সে অতগুলো শুয়োরকে একবারে গিলে খেয়েছে ইত্যাদি। সেই ভয়ে গ্রামের মানুষ মাষানের কথিত ভয়াল ও কদাকার মূর্তি বানিয়ে তাকেও পূজা করতে শুরু করে এবং নতুন আঙ্গিকে মেলা উদযাপন শুরু করে। অবিভক্ত ভারতে এই মেলার আয়োজনে ব্যাপক জৌলুস ও বৈচিত্র্য ছিল অনেক বেশী।
অতএব আমরা গর্ব করে বলতে পারি, গ্রাম্যতা মানে কোন অর্থহীন, ভিত্তিহীন কিম্বা দর্শনহীন সামাজিক অবস্থান নয়। আমাদের গ্রামীণজীবন তার স্বকীয়বৈশিষ্ট্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে ভালোবাসে। হাজার বছরের লালিত আবেগ, বিশ্বাস ও পারস্পরিক মমত্ববোধ গ্রামবাংলার সত্যিকারের প্রাণ। অন্ততঃপক্ষে আমাদের গ্রাম্যমেলাগুলোর উৎসবি আঙ্গিক ও প্রেরণার উৎস সেই স্বাক্ষ্যই বহন করে।
এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা বিশেষ প্রয়োজন আছে। ১৯৭১ সালের গৌরবময় ও চিরকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশব্যাপী, কি নগর- কি গ্রাম, দুইটি বিশেষ ধারার সার্বজনীন মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একটির নাম বৈশাখী মেলা, আর অপরটি পৌষ মেলা। এর ঐতিহ্য খুব পুরোনো না হলেও বিগত তিন-চার দশকে এর আঙ্গিকগত রূপান্তর ও ইতিবাচক বিকাশ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও তাৎপর্যময় বলে অনেকের বিশ্বাস।
বৈশাখী মেলা ও পৌষ মেলার মূল চেতনা ও সজ্জা গ্রামীণজীবন ও সংস্কৃতি নির্ভর। কিন্তু এসবের বিকশিত আঙ্গিকে নগর জীবনের হাল ফ্যাশনের বিদগ্ধ কারুকার্যের ছাপ বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নববর্ষের উদ্দীপনায় বাঙালিপনাকে গভীরভাবে অনুভব করার মানসিকতা নিয়ে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ পাটশাক, সজিনা চচ্চরি, কচু, ডাল ও মাছের নানাপদ রান্না করে খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তেমনই বিশেষ স্থানে সমবেত হয়ে দেশী মনহরা সামগ্রী কেনাবেচা করতেও ভালোবাসে। আবার পৌষ মাসে, যখন ঘরে ঘরে ফসল, বিশেষ করে নতুন ধান উঠে আসে। তখন নানারকম পিঠা-পুলি, পায়েস তৈরিকরা, খাওয়া ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করার মত আনন্দদায়ক রেওয়াজ শত শত বছরের পুরোনো প্রথা। আকাক্সিক্ষত নতুন ধানের ভাত- উৎসব আমেজে সকলকে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে নিবেদন করে তা খাওয়ার যে প্রথা- সেখান থেকেই একসময় এসেছিল নবান্ন উৎসবের প্রেরণা। মধ্যযুগের বাংলা কবিতায় তথা পুঁথি-পাঁচালী ও কাব্যে অনুরূপ নবান্ন উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই উৎসবের আয়োজন বাড়ি ও পরিবারের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে উন্মুক্ত প্রান্তরে আপামর জনসাধারণের যৌথ উদ্যোগে ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় যখন বৃহৎ এক সার্বজনীনরূপ লাভ করেছিল- তখনই সেটা ‘পৌষমেলা’ নাম ধারণ করে ইতিহাসে গৌরবের একটি চিহ্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। তবে কি বৈশাখী মেলা- কি পৌষ মেলা, দুইই উপলক্ষেই খাওয়া দাওয়া ছাড়াও ভাব বিনিময়ের নানা উপকরণ যুক্ত হয়ে পড়ে। যেমন: পুঁথিপাঠ, বারিগান, কির্তন, শ্যামা সংগীত, পল্লীগান, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী গান এবং নানা প্রকৃতির গ্রাম্যখেলা; যেমন: হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ ইত্যাদি। তবে স্বাধীনতার পর সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই প্রকারের সার্বজনীন মেলা আধুনিক সাহিত্য বা গান নিয়ে আলোচনায় মুখর হওয়া কোন দুর্লভ দৃশ্য নয়। আদিকালের মাটির পুতুলের পাশাপাশি বিদগ্ধ ও সুনিপুণ হাতের তৈরি ভাস্কর্য কিম্বা চারুশিল্প এইসব মেলার আকর্ষণের মাত্রা ভিন্ন গুণেবৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। চিরায়ত কাঁথাশিল্পের পাশাপাশি উন্নত রুচিসম্পন্ন ও শিল্পমানে উত্তীর্ণ বিচিত্র সুচিশিল্প দেশী, এমনকি বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকেও মোহিত করে থাকে। বর্তমান ধারার বৈশাখী মেলা ও পৌষ মেলা অন্ধলৌকিক বিশ্বাসবোধ থেকে অনেকাংশে মুক্ত। অন্যান্য বিচিত্র গ্রাম্যমেলা থেকে এদের পার্থক্যটা এভাবে চিহ্নিত করা যায়। সেকুলার বা নিরেট বাঙালি জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশাখী মেলা ও পৌষ মেলা অনেক বেশী সার্বজনীন। গ্রামীণবৈশিষ্ট্য নিয়েও এর নগরায়িতরূপ ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। নাগরিক দৃষ্টিকোণ ও শহুরে উপাদান এই দুই ধারার চিরায়ত আবেদনকে তেমনভাবে ক্ষুন্ন করেনি। তবে সচেতন সাংস্কৃতিক মহল মনে করে মেলা বলতে যা বোঝায় তার প্রকৃত ঐতিহ্যকে কোন ক্ষেত্রেই বিনষ্ট করা কিম্বা তাকে বিকৃত করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়।
এবার উপজাতিদের মেলা প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে বহু উপজাতি বাস করে। যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, লেপচা, ভুটিয়া, মুরং ইত্যাদি। দিনাজপুর, সুন্দরবন ও অন্যান্য স্থানে সাঁওতালদের বাস রয়েছে, তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য মোতাবেক তারাও সুপ্রাচীন মেলাসংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। তাদের জীবনও যে পুরোপুরি গ্রামনির্ভর তা সকলেরই জানা। তাই বিভিন্ন পূর্ণিমা ও অমাবশ্যা উপলক্ষে তারা যে উৎসব ও মেলা আয়োজন করে থাকে তাতে তাদের কৃষি ভিত্তিক গ্রাম্য জীবনের বহুমুখি আবেদন ও বিশ্বাস প্রতিভাত হয়ে থাকে। তাদের ভৌগলিক পরিবেশ, জীবিকার উপাদান ও ধর্মীয় চেতনা ঐসব মেলায় প্রকটিত হয়। পাহাড়ী উপজাতিরা এখনও জুমচাষে অভ্যস্ত। এই বিশেষ ধরনের আবাদ প্রক্রিয়ায় যদি তারা বছরে খোড়াকীটুকু সংগ্রহ করতে পারে তাহলে তারা দারুণ খুশী এবং তখন তারা নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী সমবেত হয়ে উৎসবে মেতে ওঠে। বিশেষ করে বুদ্ধ পূর্ণিমা বা মধু পূর্ণিমায় তারা এমন যৌথ আয়োজন সফল করার কাজে নিয়োজিত হয়। যার ফলে মেলার অনুরূপ এক ব্যাপক লোক-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ঐসব পাহাড়ী এলাকায়।
আমাদের আদি ইতিহাসের তথাকথিত নায়ক রাজা বাদশাহদের শাসন শোষণ ও যুদ্ধের অধ্যায়গুলো বাদ দিলে প্রকৃত গৌরবের ও কৃতিত্বের যদি কিছু থেকে থাকে তবে নিঃসন্দেহে তা হল গ্রাম্যমানুষের জীবনসংগ্রাম ও জীবনজিজ্ঞাসা থেকে উৎসারিত এক লোকজ-সংস্কৃতি গভীরতায় ও ব্যাপ্তিতে এ সংস্কৃতি অত্যন্ত বিশাল, গঠনমূলক এবং তাৎপর্যময়। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের গ্রাম্যমেলায় সেই শাশ্বত লোকজ সংস্কৃতি বলতে গেলে সকল শাখা, নমুনা ও বৈশিষ্ট্যের বর্ণময় প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। সর্বসাধারণ মানুষের অবারিত ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। মানুষের সমষ্টিগত চেতনা ও বিশ্বাস এই গ্রাম্যমেলার তথা লোকজ সংস্কৃতির ভিত্তি ও প্রাণ।
তাই কোন কৃত্রিম বা ধার করা পরিকল্পনা প্রয়োগ করতে গেলে মেলার আবেদন, আয়োজন ও উৎসাহ সংকুচিত হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিতে পারে। আরোপিত যে কোন কৃত্রিমতা গ্রাম্যমেলার ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করতে পারে। যেমনÑ কোন কোন মেলার নির্ধারিত স্থান সংস্কারের নামে, আধুনিক স্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন সেই মেলায় সার্বিক অবয়বে ঐতিহ্যগত সহজ সরল ও খোলামেলা পরিবেশটা টিকে থাকতে পারে না। এমনটা চলতে থাকলে আমাদের আত্মপরিচয় দানকারী গ্রাম্যমেলার ঐতিহ্য সম্প্রসারিত হওয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হওয়ার হুমকি দেখা দিতে পারে। অতএব মেলার জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোকে অত্যাধুনিক আদলে সুবিন্যস্ত করা কিম্বা পাকা স্থাপনায় ভরিয়ে তোলার কোন দরকার নেই। শহর-নগরে মানুষের সাময়িক শখ মিটানোর জন্য সেখানে পিকনিক স্পট গড়ে তোলারও দরকার নেই। সাধারণ আপামর গ্রাম্য জনসাধারণের অংশগ্রহণের সুযোগকে সংকুচিত করা আদৌ কোন মহৎ কাজ নয়, বরং হতে পারে এটা একটা গর্হিত অপরাধ। ফলে আমাদের আকাক্সক্ষা হোক, গ্রাম্যমেলা তার নিজস্ব আদলে সমুজ্জ্বল হয়ে নিজস্ব জায়গায় আমাদের ঐতিহ্যের অনির্বাণ তিলক হয়ে জাতিকে বারবার ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রেরণা দিতে থাকুক।
একটি লক্ষ্য করবার মত বৈশিষ্ট্যের উপর আলোকপাত করে এ আলোচনার যবনিকাপাত করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। সেটা হল, ব্যতিক্রমী কিছু মেলা বাদে উল্লেখযোগ্য গ্রাম্যমেলার মধ্যে অধিকাংশ অনুষ্ঠিত হয় চৈত্র মাসে। এর মাধ্যমে যে বাস্তবতা ও উদ্দীপনাটুকু অনুধাবন করা যায়- সেটা হল বাৎসরিক একটা হিসাব নিকাশ, মহাজনী দেনা শোধ, বিগত একটি বছরের উৎপাদিত পণ্যের মান ও মূল্য যাচাই, সর্বোপরী নববর্ষের প্রাক্কালে নতুন করে সামাজিক জীবন শুরু করার এক জীবনমুখী উদ্দীপনা যেন মেলা আয়োজনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করত। আমাদের শ্রদ্ধেয় পূর্বসূরীরা জীবন বিমুখ ছিলেন না। তাঁরা যেমন সৃজনশীল ছিলেন, তেমনই আয়োজন উৎসবে তাঁদের উদ্যোগ ছিল অসীম। তাঁদের যারা উত্তরসূরি অর্থাৎ আমরা কতটা উদ্যোগহীন এবং উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েছি, সেই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর বের করে আনতে হবে। গ্রাম্যমেলার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও তাকে বিকশিত হবার সকল উদ্যোগ নেয়ার সততা অর্জন করা বিশেষ জরুরী। এতে সাহসের দরকার হলে সাহসী হতে হবে আর হতে হবে ইতিহাস সচেতন, হতে হবে দেশ ও জনগণের প্রকৃত হিতাকাংখী। গ্রাম্যমেলা তার আপন গৌরবে বেঁচে থাক।
যে বিশেষ শব্দের উচ্চারণের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক এই ভাবনার একটি আপেক্ষিক সমাপ্তি টানা যেতে পারে; তা হলোÑ প্রতিটি গ্রাম্যমেলার ঐতিহ্যের সাথে পুরোনো বটবৃক্ষ বা পুরোনো অশ্বথ অথবা ঘনপল্লবে দণ্ডায়মান মস্তবড় পাকুর গাছ একান্তভাবে জড়িত। তার পাশাপাশি বড় কোন খাল-পুকুর কিংবা স্রোতস্বিনী নদীর উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। চৈত্রের তাপদগ্ধ পরিবেশে শান্ত, নিবিড় ছায়া আর ‘ঠোঁট শুকানো তৃষ্ণায়’ শীতল জল- এই দুই শাশ্বত প্রয়োজনের কথাও আমাদের গ্রাম্যপূর্বসুরিরা কত গভীরভাবে চিন্তা করতে পেরেছিল। তাই ছায়ার জন্য গাছ আর জলের জন্য খাল-বিল-নদীকে মেলার অপরিহার্য অনুসঙ্গরূপে ভাবা হয়েছিল। গ্রামবাংলার সুপ্রাচীন মানুষদের এই সুচিন্তিত পরিকল্পনাকে যথার্থ মর্যাদা দিতে হবে। বহমান গ্রাম্যমেলার লোকায়ত ধারা আমাদের এই কালের সংকটাপন্ন সমাজ প্রেক্ষিতকে নিবিড় ছায়া ও ক্লান্তিতে একটু জল আজও দিয়েই যেতে পারে।
তথ্যসূত্র :
১. বাংলার ইতিহাস: ড. নীহাররঞ্জন রায়।
২. বিভিন্ন যাদুঘরে সংরক্ষিত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সেগুলোর বিবরণ এবং
বিশেষজ্ঞের অভিমত।
৩. মোঃ আজিজুল ইসলাম চাষী, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, ভোগডাঙ্গা ইউনিয়ন,
কুড়িগ্রাম।
৪. বিভিন্ন পাঠ্য-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা।
৫. অসংখ্য খেটে খাওয়া সাধারণ গ্রাম্যমানুষ।