February 21, 2008

ডিসেম্বর'০৭ সংখ্যার সম্পাদকীয়

সবিনয় নিবেদন

প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’ তাণ্ডবে [১৫ নভেম্বর’০৭] অসংখ্য মানুষের প্রাণহানীতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
যুগপূর্তি সংখ্যা প্রকাশ করতে পেরে আমরা আনন্দিত এই অর্থে যে আমরা প্রকাশনাটিকে সচল রাখতে পেরেছি। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যাঁরা আমাদের পাশে থেকেছেন, বিভিন্ন ভাবে সহায়তা দান করেছেন বিশেষতঃ পরামর্শক, লেখক, পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ী। মূলতঃ যা কিছু কৃতিত্ব তার সবকিছু তাঁদেরই প্রাপ্য। তাঁদেরকে আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।
একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশের লক্ষ্য অর্জনে তথা রুচিশীল বা নান্দনিক পাঠক ও নতুন লেখক সৃষ্টিতে কতটা সফল হতে পেরেছি তা নিশ্চিত করে বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর সফলতা ও ব্যর্থতার সঠিক মূল্যায়ন একমাত্র সহৃদয় পাঠকই করতে সক্ষম। শুধু এটুকু বলতে পারি, সীমিত পরিসর ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাভাষাভাষী লেখক ও পাঠকের উভয় বাংলায় সমন্বিত একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। শিল্প-সাহিত্যের রসধারায় লক্ষ শহীদের রক্তস্নাত বাংলাদেশের মাটিকে প্লাবিত করতে এবং সমাজ জীবনের আঁধার ঘুচাতে কৌশল হিশেবে সংস্কৃতির এই পল্লবিত ধারাটিকেই বেছে নিয়েছি। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, ‘নিজেই নিজের প্রদীপ হও’, এবং ‘কাজ করে যাও, নীরবে।’ আমরা মোমবাতির শিখাটিকে প্রজ্বলিত রাখার চেষ্টা করেছি,মনের আনন্দে ভালোবেসে কাজ করেছি - ‘ইহার ভবিতব্য কি হইবে তাহা জানি না।’
নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, চাল, ডাল, আটা, কাপড়, কাগজ, কালি, মুদ্রণ’র মূল্য বৃদ্ধিতে জনজীবন বিপর্যস্ত ও অসহায়। রাজনৈতিক দেউলিয়াপনার ফলে মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়, দেশপ্রেমহীনতা, ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের উত্থান বিগত দশকে এই উপমহাদেশকে করেছে চরম অস্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রণহীন। বলা বাহূল্য বাংলাদেশও তা থেকে মুক্ত তো নয়-ই বরং কোন কোন ক্ষেত্রে আলোর উৎসমুখ গাঢ় অন্ধকারে আচ্ছাদিত প্রায়।
শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীর জন্মই যেন নিজকে বিলিয়ে দেয়া, আলোর পথযাত্রী হওয়া।
রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
‘....সত্য যে কঠিন,
কঠিনেরে ভালোবাসিলাম-
সে কখনো করে না বঞ্চনা...।’
এবং তাঁর বাণীতে আমাদের পূর্ণ আস্থাঃ
‘ঐ মহামানব আসে...।’

উৎসর্গ

যে সব বরেণ্য মনীষীদের আমরা হারিয়েছি [১৯৯৬-২০০৭ খ্রিস্টাব্দ] তাঁদের স্মৃতির প্রতি -
অন্নদাশঙ্কর রায়
শামসুর রাহমান আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ
শওকত ওসমান সুভাষ মুখোপাধ্যায় বিসমিল্লাহ খাঁ
ওবায়দুল হক আনোয়ার পারভেজ চিন্তামণি কর বিকাশ ভট্টাচার্য্য
আশাপূর্ণা দেবী মঞ্জুষ দাশগুপ্ত লীলা মজুমদার শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় সুমিত্রা মুখার্জী ওয়াহিদুল হক হুমায়ুন আজাদ গোলাম মুস্তাফা মীজানুর রহমান শরদিন্দু দস্তিদার অমল সেন অনিল বিশ্বাস যমুনা দেবী শাহাদৎ চৌধুরী সুবিনয় রায় পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিভা বসু শামসুল ইসলাম সিকদার আমিনুল হক ও ত্রিদিব দস্তিদার প্রমুখ

অঞ্জলি লহ মোর যুগপূর্তি সংখ্যায় যাঁরা লিখেছেন

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, প্রফেসর, ইংরেজি বিভাগ, ঢা.বি.। ময়ুখ চৌধুরী, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, চ.বি.। মহীবুল আজিজ, গল্পকার, গবেষক, প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, চ.বি.। পুষ্পজিৎ রায়, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক-জোয়ার, অধ্যাপক [অব.] বাংলা, মালদা কলেজ, পশ্চিমবঙ্গ। ম আ ব সিদ্দিকী, কবি, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। তপন রুদ্র, কবি, প্রাবন্ধিক, প্রফেসর, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর। রাশেদ উন নবী, গল্পকার, সম্পাদক-বৈশম্পায়ন, কানাডা প্রবাসী। আজিজ হাসান, কবি, সরকারি কর্মকর্তা। মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অধ্যাপক, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ। সুশান্ত বর্মণ, প্রাবন্ধিক, প্রভাষক, উলিপুর সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম। আদিত্য দুলাল, অনুসন্ধানী লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। খসরু চৌধুরী, অনুবাদক, উপন্যাসিক, গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক। মুহম্মদ হায়দার, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, সরকারি কলেজে কর্মরত, পি.এইচ.ডি. গবেষক। রাশেদুল ইসলাম বাবু, কবি, গল্পকার, সমাজকর্মী। সম্পা রায়, গল্পকার, সহকারী শিক্ষিকা, রাজারহাট সরকারি বালিকা বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম। আশেক হোসেন, কবি, গল্পকার, চিকিৎসক। আসাদ চৌধুরী, কবি, আবৃত্তিকার। নাসির আহমেদ, কবি, সাহিত্য সম্পাদক-দৈনিক জনকণ্ঠ। সুনীল খাঁ, কবি, ছড়াকার, সাবেক জনসংযোগ আধিকারীক, বালুরঘাট, পশ্চিমবঙ্গ। আসলাম সানী, কবি, ছড়াকার। প্রভাসচন্দ্র বিদ্যাতীর্থ, কবি, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ। নাজমুল হাসান, কবি, সাংবাদিক। হারুন রশিদ, কবি, সমাজকর্মী। আমিনুর রহমান সুলতান, কবি, গবেষক, সম্পাদক-অমিত্রাক্ষর। পাবলো শাহি, কবি। ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ মুকুল, কবি, সম্পাদক-ছন্দে ঝিনাই। রহমান আতিক, কবি, সম্পাদনা সহযোগী- অঞ্জলি লহ মোর। রাজু আলীম, কবি, সাংবাদিক, একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের কর্মকর্তা। জুননু রাইন, কবি, লিটলম্যাগকমী। আব্দুল হাকিম মণ্ডল, কবি, গল্পকার, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। গুরুদাস দত্ত বাবলু, কবি। অদিতি চৌধুরী, কবি। হাবিব উল্লাহ বিশ্বাস, কবি, গল্পকার, সাংস্কৃতিক সংগঠক, মন্ট্রিল-কানাডা। লীনা তাপসী খান, নজরুলসঙ্গীত শিল্পী, সঙ্গীত শিক্ষক, শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। অন্নদাশঙ্কর রায়, প্রখ্যাত সাহিত্যিক, খ্যাতিমান আই.সি.এস। মানবেশ চৌধুরী, গল্পকার, রাজনৈতিক সংগঠক ও বিশ্লেষক, দক্ষিণ দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ। জাহিদ আনোয়ার, কথাসাহিত্যিক। হেনা সুলতানা, কথাশিল্পী, সহকারী শিক্ষিকা, ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর। গীতিময় রায়, প্রাবন্ধিক, অধ্যাপক, ঈশ্বরগঞ্জ কলেজ, নীলফামারী।

চি ঠি প ত্র



প্রিয় জাহিদ
শান্তিনিকেতনে গিয়েছি; তোমার বইটি বেশ কয়েক পাতা পড়ার পর মনে হলো আমি এখন রয়েছি শান্তিনিকেতনে।
শান্তিনিকেতনে আমি গিয়েছি একটা আবেগ নিয়ে। আবেগাক্রান্ত হয়েই দেখতে চেষ্টা করেছি একটি মানুষ জীবনের বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত, ভালোলাগা ভালোবাসা ও বাসনাগুলোকে মূর্ত করে তোলার জন্যে কী সাধনাই না করেছেন। আমি শান্তিনিকেতনে গিয়েছি, সত্যিই বলছি, মোহাচ্ছন্ন হয়ে।
তোমার লেখায় মোহ আছে, তবে যেটুকু পড়েছি, বুঝতে পেরেছি যারা কোনোদিন ওখানে যায়নি, তারা একটা চমৎকার ছবি লাভ করবে। এই ছবি লিখতে গিয়ে তুমি বাহুল্যের আশ্রয় নাওনি, কথার মারপ্যাঁচে পাঠককে ধাঁধায় ফেলনি, তথ্য এবং তথ্য দিয়ে জানিয়েছ: এটাই শান্তিনিকেতন।
রঙিন ছবিগুলো স্মৃতিকে আবার জাগিয়ে দিলো।
ভালো থেকো।
বইটি অচিরেই শেষ করবো।

রশীদ ভাই [রশীদ হায়দার]
৩০.১০. ০৭

পুন: তুমি গভীর মনোযোগ দিয়ে শান্তিনিকেতন দেখেছো এবং সে সম্পর্কে লিখেছো , সেটাই আমাকে আনন্দ দিয়েছে।
অভিনন্দন।



প্রতি
জনাব জাহিদ আনোয়র
সম্পাদক ‘অঞ্জলি লহ মোর’
বিদ্যাসুন্দর
২৯ শহীদ মামুন পৌর মার্কেট [২য় তলা]
কাছারী রোড, নওগাঁ - ৬৫০০
বাংলাদেশ।

প্রীতিভাজনেষু
জাহিদ ভাই,
প্রথমেই আপনি আর ‘অঞ্জলি লহ মোর’ পত্রিকার সকল সদস্য ও শুভাকাঙ্খীরা আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালবাসা ও নমস্কার জানবেন।
আমার জনৈক সাহিত্যসেবী বন্ধু [একদা পূর্বতন পূর্ববঙ্গ নিবাসী] শ্রীনরেন্দ্র- নাথ বিশ্বাস আমাকে আপনাদের অতীব মূল্যবান পত্রিকাটি পড়তে দিয়েছেন। আমার জন্ম অবিভক্ত ভারতের রাজশাহী শহরের রাণীবাজার মহল্লায় ১৯৩৬ সালের ৩ ডিসেম্বর তারিখে। ১৯৪৪ সালে দার্জিলিং শহরে আমার বাবার কর্র্মস্থলে চলে এলেও ১৯৪৭ সালের মার্চ মাস অবধি রাজশাহীতে যাতায়াত করেছি। রাণীবাজার মহল্লায় আমাদের পৈত্রিক ভদ্রাসন ছিলো এবং ঐখানেই আমার জন্ম। সামান্য কিছুদিন বিশ্বেশ্বর ভোলানাথ আকাডেমিতে পড়েছি। আমার বাবা রাজশাহী পৌরসভায় কর-আদায় বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী ছিলেন। রাণীবাজারে আমাদের একটি দ্বিতল বাড়ি ছিলো এবং একটি মার্বেল পাথরে ‘বৃন্দাবনধাম’ [আমার পিতামহের নাম] খোদিত ছিলো। সে সব এখন স্মৃতি। এখন আমার স্মৃতিতে সাগরপাড়া, টিকাপাড়া, বড় কুঠি, পদ্মার-পাড়, রাজশাহী কলেজ চত্বর, সিপাই পাড়া, বরেন্দ্র অনুসন্ধান যাদুঘর, সাহেব বাজারের বড় মসজিদ, লোকনাথ স্কুল, অলকা সিনেমা হল, কল্পনা সিনেমা হল, তালাইমারী শ্মশানঘাট, ঘোড়ামারা পোস্ট অফিস, ভুবন মোহন পার্ক, সাহেব বাজারে ভুজঙ্গভূষণ কুণ্ডুর বই এর দোকান সব কিছুই জ্বলজ্বল করছে।
আমার লেখা অনেক ছোটগল্পে রাজশাহীর কথা ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার। আজ প্রায় একাত্তর বছর বয়সে সব কিছুই চোখের সামনে ভাসছে। একবার ১৯৪৬ সালের শেষে নওগাঁ হয়ে নৌকোয় করে কালিগ্রাম থানার অধীনে পতিসর সংলগ্ন [?] ভারসোঁ গ্রামে গিয়েছিলাম আমার ছোট মেশোমশাই এর বাড়িতে। তিনি ভারসোঁ গ্রামের জমিদার ছিলেন [বড় তরফ]। পতিসরে ঠাকুরবাড়ির কাছারির সংলগ্ন একটি ‘ধর্ম গোলা’ দেখেছিলাম মনে পড়ে। তালন্দর জমিদাররা আর পুঁটিয়ার জমিদারদের সঙ্গে একটা আত্মীয়তার গন্ধ ছিলো। পাবনায় শিতলাইএর জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রর বাড়িতে পুজোর সময়ে যাতায়াত ছিলো।
ভাই সাহেব এক নাগাড়ে কতো কথাই লিখে ফেললাম। ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে মাফ করে দেবেন। আপনার নিজের হাতের লেখা একটা পোস্টকার্ডের চিঠি পেলেও ভালো লাগবে। বড়ো আশা করে চিঠিটা লিখলাম।
লতিফ দাদার কথা খুব মনে পড়ে। কেমন নিশ্চিন্তে আমাদের দু’ভাইকে তার কাছে ছেড়ে দিতেন বাড়ির কর্তারা। রহিম চাচাকে আমার কর্তামা [ঠাকুর মা] ‘রাম’ নামে ডাকতেন ও পুষ্যি নিয়েছিলেন এবং জলপাইগুড়িতে চলে এসেছিলেন। সেই চাচা একদিন নামকরা হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার হয়ে জলপাইগুড়ি শহরেই আমার কর্তামার কাছেই থেকে গিয়েছিলেন। তাঁকে আমরা দেখেছি যে আমার বিধবা কর্তামা নিজে হাতে ভাত খাইয়ে দিয়েছেন। সেসব দিনগুলো কোথায় যে চলে গেলো জানিনা আপনারা প্রাণভরা ভালোবাসা নেবেন।
ইতি
অরুণ মৈত্র
আমার এখন স্থায়ী নিবাস পশ্চিম বাংলার উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বারাকপুর মহকুমার নৈহাটি শহরের পৌর এলাকায়। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত W.B.C.S. আধিকারীক। এখন লেখালেখি নিয়েই আছি।



মাননীয় সম্পাদক,
‘অঞ্জলি লহ মোর’ তারিখ ২২. ৬. ০৪
কাছারী রোড,নওগাঁ সোনারপুর
বাংলাদেশ

পত্র পাঠ নমস্কার জানবেন। নমস্কার জানাচ্ছি। ‘অঞ্জলি লহ মোর’ এর সকলস্তরের কর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও বন্ধুদের।

ঠিকানাঃ আমি সুজিত হালদার। প্রযত্নে: সুনীল দত্ত, ২৩ সুকান্ত সরণি, কামরাবাদ, মন্দিরতলা, থানাঃ সোনারপুর, কলকাতা - ৭০০১৫০,পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
একথা বলাই বাহুল্য যে আপনারা আমাকে চেনেন না। ইতিমধ্যে আমার নামও শোনেন নি। আর আমাকে চেনা বা জানার তেমন কোন কারণও ঘটেনি। তো, সে সব কথা থাক। ‘অঞ্জলি লহ মোর’ এর ৮ম বর্ষ, ১২ সংখ্যা [জানুয়ারি-জুন ২০০৩] আমি পড়েছি । পত্রিকা এবং ওই সংখ্যার লেখাগুলোর বিষয়ে বিশেষ কিছু বলার আগে এই বিশেষ সংখ্যাটি কী করে আমার হাতে এলো - সে বিষয়ে দু’এক কথা বলতে চাই।
২০০৪ সালের কলকাতা বই মেলায় আমি ‘গল্পের বাড়ি’ [ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া] এর লেখক সমম্বয় ও অনুষ্ঠান চালানোর দায়িত্ব পেয়েছিলাম। যদিও আমি এন.বি.টি, [ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া] এর কর্মী নই । আমি তখন ‘কলেজ স্ট্রীট’ পত্রিকার বিশেষ দায়িত্বে ছিলাম। এন.বি.টি, - এর অরুণ দা [অরুণ চক্রবর্তী] আমাকে অস্থায়ীভাবে ওই [বই মেলার জন্য] কাজে নিয়োগ করেছিলেন।
বইমেলা [কলকাতা বইমেলা - ২০০৪] চলাকালিন ‘অঞ্জলি লহ মোর’- এর সম্পাদক জাহিদ আনোয়ারের সঙ্গে আমার আলাপ হয়, এবং জাহিদ’দা আমাকে এক কপি ‘অঞ্জলি লহ মোর’ এর ৮ম বর্ষ ১২ সংখ্যাটি উপহার দেন। সত্যিকথা বলতে কী, এতদিন ওই সংখ্যাটি পড়ার সময় বা সুযোগ হয়নি। তাছাড়া, বইমেলা চলাকালিন আমি আরও অনেক পত্রিকা উপহার পেয়েছি। কলকাতার কলেজ স্ট্রীট কফি হাউজ এর বন্ধুরাও প্রায় কোন না কোনও পত্রিকা বা বই উপহার দেন। কাজেই সব পত্রিকা বা বই সঙ্গে সঙ্গে পড়া হয়ে ওঠে না। ওই একই কারণে ‘অঞ্জলি লহ মোর’- এর এই সংখ্যাটি এতদিন অপঠিতই ছিল।
বাস্তবিক,‘অঞ্জলি লহ মোর’- এর ৮ম বর্ষ, ১২ সংখ্যা পড়ে আমি ঋদ্ধ হয়েছি। এটা যে একটা সম্পূর্ণ এবং আদর্শ ক্ষুদ্র পত্রিকার উদাহরণ -সে বিষয়ে আমার কোনও প্রকার সন্দেহ নেই। উল্লেখ্য, লিটল ম্যাগাজিন এর বাংলা-‘ক্ষুদ্র পত্রিকা’-এটা আমাদের এখানে [পশ্চিমবঙ্গ, ভারত] অনেকেই বলেন। আমিও।
বাংলাদেশ এর মহানগর ঢাকা’র বাইরে থেকে যে এমন সুন্দর এবং উন্নতমানের পত্রিকা প্রকাশিত হয়, তা আমার জানা ছিল না। সেটা নেহাত আমার অজ্ঞতাই বলতে পারেন। ১১২ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধ [৩], আত্মস্মৃতি [৪], গল্প [৫], কবিতা [১৬ জন কবি], নিবন্ধ [২], কথোপকথন [১], সমালোচনা [১] গুলি পড়লাম।
প্রতিটি লেখাকে আলাদা করে আলোচনা করলাম না। তবুও বলি, রহমান আতিক এর ‘ভেড়া উপাখ্যান’ নামের গল্পটি অনবদ্য হয়েছে। ৪১ পৃষ্ঠায় ইলাহী দাদ খান এর স্মৃতিচারণমূলক লেখাÑ‘আছ অন্তরে চিরদিন’ পড়ে আমারও বুকটা ভারী হয়ে গেল। আমার অদেখা-অজানা কর্মবীর প্রয়াত গোলাম মোস্তাফার [লেখকের ছোট বোনের স্বামী] প্রতি আমার শ্রদ্ধা জানালাম। রবু শেঠ এর সমালোচনামূলক লেখা ‘অঞ্জলি লহ মোর’ ‘চৈতন্যের একাদশ অধ্যায়’ এর থেকে কয়েকটি লাইন উদ্ধৃতি দিয়ে আমি শেষ করব- - -।।
‘অঞ্জলি লহ মোর’ এমন সময়ে বের হচ্ছে যখন পৃথিবী জুড়ে সন্ত্রাস-মৌলবাদের উত্থান ভয়াভয়। গর্বের কথা এখন পর্যন্ত কোন শিল্পী, সাহিত্যিক, কবির নাম সন্ত্রাসীর তালিকায় নেই। একজন শিল্পী সন্ত্রাসীর কাছে এখনও আতঙ্কের কারণ---।’

নমস্কারান্তে :
সুজিত হালদার
২৩ সুকান্ত সরণি, মন্দিরতলা, কামরাবাদ, সোনারপুর, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

খণ্ডিত গল্পচিত্র

রাশেদুল ইসলাম বাবু

১.
‘আমি সকাল বেলার পাখি হব, সবার আগে সবাইকে ঘুম ভাঙাবো’- কবি নজরুলের খোকার স্বাদ কবিতার এই মর্মকথা ভাবতে ভাবতে ঘুম ভাঙলো আকস্মিকভাবেই। এক অপ্রতিম আকাক্সক্ষা নিয়ে জানালাটা খুলেই দেখি একটা কালো কাক কা-কা করছে। তারপরও অবিষাদের আবেদন নিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারণ, আকাশটা কালো মেঘে ঢাকা। একটু পরেই বৃষ্টি নামবে হয়তো। আর বৃষ্টি যদি হয়, তাহলে পল্টুকে ভিজতে হবে। কেননা, আমার কাছে যে চিঠিগুলো আছে সেগুলো সকালেই ওকে নিয়ে যেতে হবে। “ওহ! চিঠিতে কী লিখা আছে তাতো পড়া হয় নি!” পড়েই বা কী লাভ। আমিতো জানিই ওতে কী লিখা আছে। কমরেড ফরহাদের বিশতম মৃত্যুবার্ষিকীর শোক সভা’র চিঠি ওগুলো। বলতে বলতে বৃষ্টি শুরু হলো। “কিন্তু পল্টু আসবে তো?” আসবে না মানে! আজকের মধ্যেই চিঠিগুলো বিলি করতে হবে ওকে। আর এজন্য ও একশ টাকা বকশিশ পাবে। ওর টাকার বেশ দরকার। বেচরা পল্টু! তুই কেন যে কমিউনিস্টদের সাথে জড়াতে এলি! তারচেয়ে বরং কোন রেস্টুরেন্টে ওয়েটারগিরি করলেও পারতিস। রোজগার খারাপ হতো না। “আহ! আমি এসব কী ভাবছি? যতসব মিডিল ক্লাস ভাবনা।”
কে যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। “ঠক ঠক ঠক।” বললাম “কে?” কোনো উত্তর নেই বরং আবারও সেই শব্দ, “ঠক ঠক ঠক!” অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানা ছেড়ে দরজা খুললাম।
“আরে পল্টু তুই! তোর কথাই ভাবছিলাম। এই বৃষ্টির মধ্যে কীভাবে এলি?”
“ছাতা আনছি। কই চিঠিগুল্যা দেন।”
“এতো তারাহুরা করছিস কেন? একটু বস।”
“না। আমার সময় নাই!” ব্যস্ততার ভঙ্গিতে পল্টু বলল। তারপর টেবিলের উপর রাখা চিঠিগুলো আর সাথে একশ টাকা নিয়ে পল্টু চলে গেল। আমাকে আর কিছুই বলল না। আমি আবার বিছানায় ঢুলে পরলাম। এবার হযতো মনা নামের সেই নারীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা সম্ভব হবে। বৃষ্টির স্পিড আরও বাড়লো। না, এতো শব্দে স্বপ্ন দেখা যায় না। মনে হচ্ছে বৃষ্টি টিনের চালে পরে কাঁদছে। অক্টোবরের বৃষ্টিতো, বিদায় বেলা না হয় একটু কাঁদালো। কী অবাক কাণ্ড! বৃষ্টিও কাঁদে। কিন্তু পল্টু কাঁদে না। যেদিন ওর বাপটা মারা গেল ও একটুও কাঁদেনি। কী দোষ ছিলো ওর বাপের? না হয় পেটের দায়ে গোপনে গাঁজার ব্যবসা করতো। তাই বলে যৌথ বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরে ফেলবে? যদিও পুলিশ রিপোর্টে দেখানো হয়েছে হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু পল্টু মানতে চায় না। তাই সেদিন ও অভিমান করেই বলে ফেলল, “খানকির বাচ্চারা আমার বাপক মারি ফ্যালায় এখুন কয় হাট অ্যাটাক! এট্যা বড়লোকের অসুখ, ঘুষখোরের অসুখ, হিরোইন দালালের অসুখ, গাঁজায় দালালের এগ্লা অসুখ হয় না।” যাকগে সে কথা। ওর বাপটা যেভাবেই মরুক, বেচারা মরে গিয়ে বেঁচেই গেছে। কিন্তু পল্টু তার বাপের মৃত্যুর শোকে এতটুকুও কাঁদেনি। গত সোমবার যখন ওর মাটাও মারা গেল সেদিনও ওর চোখে জল ছিলো না। কী যে হয়েছিলো ওর মায়ের, জানি না। হঠাৎ ও এসে আমার কাছ থেকে তিনশ টাকা নিয়েছিলো-লাশটা হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য। যখন বললাম, “কী হয়েছিলো তোর মায়ের?”
“কিছুনা, একটু অসুখ।” তারপর আর কিছুই বলেনি। টাকাটা হাতে পেয়েই চলে গিয়েছিলো। হায়রে পল্টু! এখুন তোর বাপও নাই, মাও নাই। তোর কেউ নাই। যার কেউ নাই তার পাশে আল্লাহ্ আছে। তোরতো কোন চিন্তা করার কথা না। তারপরও এত চিন্তা করিস কেন? সারাদিন টাকা টাকা করিস। সেদিন না হয় আমার কাছে থেকে তিনশ টাকা নিলি-লাশটা আনার জন্য, কাফনের কাপড়ের জন্য বাসুদেবের কাছ থেকে নিলি দেড়শ টাকা, আফসারের কাছ থেকে নিলি দুইশ টাকা-কবর খোরার জন্য। তাই বলে কোরআন খতোমের জন্যও টাকা! তাও আবার চুক্তি করেছিস হাউজপাড়া জামে মসজিদের বিশাল দাড়িওয়ালা ইমাম সাহেবের সাথে। ও বেটাতো রাক্ষস। একটা ছোট-খাটো মিলাদ-মাহ্ফলের জন্য নেয় একশ টাকা। গত মাসে কমরেড হোসেন আলীর মৃত্যুবার্ষিকীতে মিলাদ-মহ্ফিলের জন্য তার কাছে গিয়েছিলাম-আমি আর বাসু। ব্যাটা বলেছিল, “কমরেড হোসেন আলী নাস্তিক মানুষ ছিলো। নাস্তিক মানুষেরর জন্য মিলাদ পড়ানো পাপ। আমি এসবের মধ্যে নাই।” কিন্তু বাসুদেব যখন দুইটা একশটাকার নোট তার পাঞ্জাবীর পকেটে গুজে দিলো তখন সে দাড়ির ফাঁক দিয়ে একটা সুন্দর হাসি উপহার দিয়েছিলো আমাদের। কে জানে আজকের পল্টুর একশ টাকা হয়তো এই ইমাম সাহেবের পকেটেই যাবে।

২.
“শালারা কয়টা গাড়ি ভাঙছিস! কয়টা বাড়ি পুড়াইছিস। কয়টা রাস্তা অবরোধ করছিস! হামার নেত্রীক এমন করি ধরি নিয়া গেল্-কোন শালা প্রতিবাদ করে নাই। শালারা চুন্নি-বিড়ালের মতো ঘরের ভীত্রে পালে ছিল্। বালছিড়ারা ফাসকামী করার জাগা পায়না।”- উচ্চ কন্ঠে গালী দিতে দিতে করম শেখ ক্যাশ থেকে টাকা তুলে গুনতে থাকে। তারপর টাকাগুলো আবার ক্যাশবাক্সে রেখে দেয়। আমি দ্বিধাগ্রস্থ হলাম। একটু অস্বস্তিভাব নিয়েই তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বললাম, “চাচা! ভালো আছেন।” “ভাল।”- চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে উত্তর দেয় কমর শেখ। তারপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কীযেন ভাবে আর বলে, “তোমরা ফীর কোন ধান্দা ধরি আসচেন?”
“না মানে চাচা, একটু আগে কাদের যেন বকা দিচ্ছিলেন।”
“তোমাক দেই নাই বাহে! একনা আগে কিছু ছাত্র-যুবক আসচিল চান্দা নিতে। জোর করি পাঁচশ টাকা ধরি গেইল। শালারা নাকী বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগার করবার চাই।”
“ভালো কথা! খুবই ভাল কথা।”
“আরে রাকেন তোমর ভাল কথা। সব শালা মুর্খ। যখন জীজ্ঞাস কননু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কী? একটা শালাও উত্তর দিবার পাই নাই। আর তাতে ফীর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগার করবার চাই। বালছিড়ারা ফাসকামী করার জাগা পাইনা। ধান্দামী!”
“ওকে! ওকে! বুঝছি। তা চাচা, আমি কোন ধান্দায় আসছি তা কী বলতে হবে?”
“জানি জানি! তোমার হাতত বইগুল্যা দেখ্যা বুঝবার পাইছি। তোমরাতো আরেক বাটপার।”
আমি একটু বিব্রত হলাম। সবকিছু অস্বাভাবিক লাগছে। কিছুক্ষণ দুজনই চুপ। করম শেখের দোকানের কর্মচারিটা গ্যাসের সিলিন্ডারগুলো সাজাচ্ছে। টেবিলের উপর দেখতে পেলাম কমরেড ফরহাদের বিশতম মৃত্যুবার্ষিকীর শোক সভা’র চিঠি। সম্ভবত পল্টু আজ সকালেই দিয়ে গেছে। পল্টু ইদানিং ভালই কাজ করছে। সময়ের কাজ সময়েই করে ফেলে। করম শেখ আবারও ক্যাশ থেকে টাকা নিয়ে গুণতে থাকে। তারপর রেখে দেয়। আমি একটা বই তার টেবিলের উপর রেখে বললাম, “চাচা! এটা কবিতার বই। আমাদের ছাত্রছাত্রীরাই লিখেছে এতে।”
“ও তাই! খুব ভাল।” হাত দিয়ে বইটা নাড়তে থাকে, তারপর এপাশা-ওপাশ উল্টিয়ে বইটা টেবিলের উপর রেখে বলে, “এসব করি তোমার সময় নষ্ট হয় না?”
“কী যে বলেন! সময় নষ্ট হবে কেন? এসব ভাল কাজ।”
“ভল কাজ? বাটপারি কাজ! তোমার মতো স্টুডেন্ট লাইফে আমি এগ্লা করি বেড়াইছি। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্টও ছিলাম। এগুল্যা করাইতো সব গ্যাছে! এখুন রড-সিমেন্ট আর গ্যাসের সিলিন্ডার সাপ্লাই দিতেই জীবন শ্যাষ।”
“সে জন্যই তো আপনার কাছে এসছি। যতই দিন যাচ্ছে ততই গ্যাসের দাম বাড়ছে, সেই সাথে রড-সিমেন্টের দাম। এই ব্যবসায় লস নাই।”
“হে! হে! হে! তা ঠিক, লস নাই। তা তোমারা যে এতো কষ্ট করি ত্যাল-গ্যাস, জাতীয় সম্পদ রক্ষার জন্যে লং-মার্চ করলেন, তাতে কী লাভ হইল? আমেরিকা এই সরকারক যে কায়দাত ফ্যালইছে তাতে এদ্যাশের ত্যাল-গ্যাস পাচার হতে দেরী নাই।”
“তখন না হয় আরেকটা প্রগ্রাম থ্রো করা যাবে। এশিয়া এনার্জি কী ফুলবাড়ি কয়লা খনি নিতে পারছে?”
“তা পারে নাই কিন্তু আমেরিকা যেটা কয় সেটা হয়। শালার কিলিন্টন ছিলো মিনমিনা শয়তান আর বুশ হলো যুদ্ধবাজ শয়তান।”
“হা! হা! হা!” আমি একটু হাসলাম।

“হাসেন না বাহে! হাসেন না! ইরাকক যেমন করি দখল করি নেল্, সাদ্দামক যেমন
করি ফাঁসি দেল্- গোটা বিশ্ব চায়া চায়া দেখিল্। আর জাতিসংঘ ঘাস কাটিল্।”
“আল্লার কাছে দোয়া করেন যেন বাংলাদেশের অবস্থা ইরাকের মতো না হয়।”
“দূর বাহে! কোনো লাভ নাই। ইরাকত যখন হামলা হইল্ তখন গোটা বিশ্বের যত হুজুর-মওলানা এমনকি শিশু আছে সবাই আল্লার কাছত দোয়া করছে যেন ইরাকের কোন ক্ষতি না হয়, সাদ্দামের যেন কিছু না হয়। তারপরও আল্লা এই কোটি কোটি মুসলমানের মধ্যে একজনেরও দোয়া কবুল করে নাই। একটা শিশুর হাতক নিষ্পাপ ধরি কবুল করলেও তো হইল্ হয়?”
“হা হা হা!” না হেসে পারলাম না। তারপর প্রসঙ্গ চেঞ্জ করে করম শেখকে আবারও বইটির কথা বললাম-
“চাচা, বইটা রাখেন। কবিতার বই।”
করম শেখ আবারও বইটা হাতে নিয়ে এপাশ-ওপাশ উল্টালো। তারপর ক্যাশ থেকে দুইটি একশ টাকার নোট তুলে এনে আমার সামনে ধরে। আমি টাকাটা হাতে নিয়েই পকেটে রাখি এবং বলি, “ধন্যবাদ চাচা!”
“ধন্যবাদের দরকার নাই! বইটা আমি পড়বইনা।”
“কেন?” অবাক হয়ে বললাম। করম শেখ হেসে হেসে উত্তর দেয়,
“তো কবিতা পড়তে ভাল লাগেনা। বাংলাদেশে এতো কবি! কাকের চেয়েও কবির সংখ্যা বেশি। হে! হে! হে!”

৩.
“সররে ভাই আফজাল! রাত পুয়ালেই কিস্তি” জ্যামে আটকে পরা রিকশাআলা চিৎকার করে বলছে। ভাবটা এমনযে ওর বউটা একাই ঋণ নিতে পারে। যাবতীয় ঋণে বোঝা এই রিকশাআলাকেই বইতে হয়। রিক্সাআলার কাণ্ড দেখে পল্টু পিক করে হেসে ওঠে। তারপরে বলে, “বালছিড়াটা! নেয়ার সময়তো নিছিস, এখুন পাছার ঘাম পরলেও শোধ হবার নয়, এট্যা গ্যারামিন ব্যাংক।” এরই মধ্যে জ্যাম ভেদ করে রিক্সাআলা পল্টুকে নিয়ে এগিয়ে যায় সোজা মমতা সিনিমা হলের পিছনে বস্তিগুলোর দিকে। সরকারের অবৈধ উচ্ছেদ লিস্টে নেই বলে বস্তিগুলো এখানো টিকে আছে সম্মানের সাথে। বস্তিগুলোর তৃতীয় সারির পূর্ব দিক থেকে আট নম্বর ঘরটিতেই পল্টুরা থাকে। আস্তে করে দরজা খুলে পল্টু ঘরে ঢুকতেই দেখে একটা বুড়ি উবু হয়ে শুয়ে আছে খালি চকির উপর। পল্টুকে দেখেই বুড়িটা চিৎকার করে বলে, “মাগীর বাচ্চা! গেছিলু কটায়? তখন থেকি না খাইয়্যা আচং! মোক মারি ফ্যালা। তোর বাটাক মারছিস, মাওটাকও মারছিস! মোকও মারি ফ্যালা। ভোগ লাগছে।” “নানী, বেশি চিল্লাস না!” পল্টু বলে, তারপর ও প্যান্টের পকেট থেকে পলিথিন মোড়ানো একটা পাউরুটি বেরকরে বুড়িটার সামনে ছুড়ে মারে। বুড়িটা পাউরুটি তুলে নিয়ে নাড়তে থাকে। তারপর কেঁদে ফেলে আর চিৎকার করে বলে, “মুই ভাত খাইম। তুই চাল আনি দে। মুই ভাত রান্না করি খাইম। তোকও রান্দি দেম। মুই ভাত খাইম।” পল্টু কিছুই বলল না। ও ঘর থেকে বাইরে এসে দাঁড়ালো ছোট আঙ্গিনায়। তারপর আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ নীল মেঘ নেই। হঠাৎ দুইটি কাক আকাশ থেকে উড়ে এসে পড়ল পল্টুর সামনে। কোত্থেকে যেন একটুকরা রুটি এনে কাক দুটি ভাগাভাগি করে খাচ্ছে। পল্টুর দৃষ্টি এখুন কাক দুটির দিকে। ও গভীরভাবে ভাবতে শুরু করল। ওর ভাবনাগুলো হল এরকম-
‘কাকেরা যদি ঋণ নিতে পারত তাহলে ভালই হতো। সুদখোর ইউনুস হওয়া যেত। তখন ও রোজ নানীর জন্য রুটি না এনে কাকদের জন্য রুটি আনতো। কাক সেই রুটি ঋণ হিসেবে গ্রহণ করত এবং পরে সুদে-আসলে শোধ করত। এভাবে পল্টু ধীরে ধীরে তৃতীয় মাত্রার ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করত। ময়না, টিয়া, শালিক, দোয়েল- এরা সবাই এই ব্যাংকে চাকরি করত। তারপর ধীরে ধীরে পাখিতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার চিন্তা-ভাবনা করত। এসব কমিউনিস্টদের সাথে থেকে কোনো লাভ আছে? কবে যে সাম্যবাদ আসবে, সেই আশায় জীবন মাটি।’ কিন্তু পল্টুর এই ভাবনাগুলো মনের মধ্যে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারলো না। একটা বিশ্রি চিৎকার ওর সব ভাবনাগুলো ভেঙ্গে চুরমার করে দিল-
“কটাইগেলু হারামজাদা! মোক চাউল আনি দে! মুই ভাত খাইম।”

৪.
“...এলকায় লাইন থেকে পাঁচটি বগি ছিটকে পরে ঘটনাস্থালে পাঁচ জন নিহত হয় এবং ...” এফ এম রেডিও’র দুপুরের সংবাদ থেকে পাওয়া এরকম অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা প্রতিদিনই আসছে। কিন্তু পল্টুর বাবার অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা কোনো মিডিয়ায় আসেনি। এইতো সেদিন একটা কুকুরের বাচ্চাকে অস্বাভাবিকভাবে মরে যেতে দেখলাম। বস্তির ল্যাংটা ছেলেগুলো বড় বড় ইটের ঢিল দিয়ে কুকুর-বাচ্চাটার মাথাটা থেতিয়ে ফেললো। হয়তো এমনিভাবেই পল্টুর বাবাকে মারা হয়েছে। অথচ কেউ কোনো প্রতিবাদ করে নি। কিন্তু কুকুরের বাচ্চাকে মারার সময় এক ঝাঁক কাক কা-কা করে প্রতিবাদ করেছিলো। হয়তো অনেকে বলতে পারে কাকের স্বভাব কা-কা করা। কেউ না বলুক, মনা একথা বলবেই। ও অবশ্য মাঝে মাঝে কাককে কাউয়া বলে ডাকে। শুনতে ভালই লাগে। ঠিক এই মুহূর্তে কাউয়া শব্দটা আবারও শোনা গেল। তবে মনার কণ্ঠে না-
“শালার কাউয়ার বাচ্চারা!” বলতে বলতে বাসুদেব ঘরে প্রবেশ করল। তারপর আবারও কলল, “কাউয়াগুলো ওখানে কা-কা করছে। এক ঝাঁক কাউয়া।”
“কেন কী হয়েছে?” আমি বললাম। তারপর জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম সত্যিই কাকগুলো একটা নির্দিষ্ট স্থানে উড়ছে আর কা-কা করছে।
“ঐ রাস্তার ধারে একটা মরা কাকের বাচ্চা পড়ে আছে। বস্তির শয়তান ছেলেরা ওটাকে পেয়ে খেলতে খেলতে মেরে ফেলেছে। তাই কাউয়াগুলো কা-কা করছে।” বাসু বলল।
“ কাকেরা কী সংগঠিত! একটা কাকের বাচ্চাকে মারা হয়েছে আর তাতেই কাকগুলো সংগঠিত হয়ে প্রতিবাদ করছে?”
“শুধু তাই না! ঐ রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে তাকে কাকগুলো...”
“সাংঘাতিক ব্যাপার। তুই আসলি কীভাবে?” “অনেক কষ্টে। মাথার উপর বুদ্ধদেব বাসুর এই কবিতার বইটা রেখে দৌড়ে দিয়ে...”
“খুব ভালো। দেখতো কাক সংক্রান্ত কোনো কবিতা আছে কীনা বইটাতে?”
“কাক সংক্রান্ত! কবির আর কাজ নাই?” এই বলে বাসুদেব বইটা রেখে চলে গেলো। আমি আবারও জানালা দিয়ে তাকালাম। ততক্ষণে কাকগুলো শান্ত হয়ে বৈদ্যুতিক তারের উপর বসে আছে। ‘নীল আকাশ আর বৈদ্যুতিক তারের উপর এক ঝাঁক কাক’- এই দৃশ্য হয়তো অন্যরকম হতে পারতো যদি কোন শিল্পী তাঁর গানের ভাষায় বলত। কিন্তু কাকগুলো ওখানে কতক্ষণ বসে থাকবে, কে জানে। হয়তো তারা সেখানে শোকসভা করছে, নয়তো মৃত কাকের আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করছে। আমি বইটার পাতা উল্টাতে থাকি তারপর আবারও তাকাই বৈদ্যুতিক তারের দিকে। দেখি কাকগুলো হঠাৎ করেই উড়ে চলে যাচ্ছে। একটু আগে যেখানে এক ঝাঁক কাক ছিলো এখুন সেগুলো উড়ে যাচ্ছে যে যার কাজে। মনা সেদিন কবিতার যে দুটি লাইন শুনিয়েছিল তাই মনে পড়ছে খুব,
“এক ঝাক কাক
উড়ে যায় যাক।”

চক্র

সম্পা রায়

ব্যথাটা উঠছিল কোমরের ঠিক মাঝখান হতে। তারপর সামনের অংশ হয়ে দুপায়ের উরুতে এসে তীব্র হয়ে হঠাৎ মিলিয়ে যাচ্ছে। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমে চাতালে তেমন অনুভব করেনি। চাতাল ম্যানেজারের কথার ভয়ে ব্যথার দিকে নজর দেবার সময়ই পায়নি অছিমা।

বিকেল গড়িয়ে যখন প্রায় সন্ধ্যা তখন দুটো আলু আর এক টাকার মরিচ কিনে যখন চালের খুদ নিয়ে বাড়ি ফিরল তখন থেকে ব্যথার তীব্রতা অনুভব করতে শুরু করল।

বাড়ি ফিরে আলু আর ঘরের একটা মুরগির ডিম সেদ্ধ দিয়ে মরিয়মকে খুদ এর ভাত দিতে মেয়েটা বোবা দৃষ্টিতে মায়ের দিকে তাকাল। সকালে মা বলেছিল ডিম ভাজি আর খিচুড়ি দেবে। আবার কি মনে করে থালা টেনে নিয়ে খেতে শুরু করল। ওর কিছু খাওয়া হল না। তার ওপর কেমন বমি বমি পাচ্ছিল। এক গ্লাস পানি খেয়ে অবসন্ন ব্যথাক্লিষ্ট দেহটা টং বিছানায় দিল। কিন্তু ঘুমুতে পারল না। খুব মনে পড়ছিল মজিবরের কথা। লোকটা ৭/৮ দিন হল লাপাত্তা। জুয়া আর বদনেশায় অত সুন্দর মেয়েটাকে ফেলে বাইরে থাকে সে। সবাইকে অবশ্য বলে ওদের জন্যই রংপুর সদরে রিকশা চালায় সে। শুধু অছিমা আর তার মেয়ে মরিয়ম জানে যে মজিবর ১টা টাকাও আনেনা। বলে না কারণ অহেতুক মার হজম করবার কোন ইচ্ছে ওদের নেই। ব্যথাটা সহ্যের বাইরে যাচ্ছে। ককিয়ে ককিয়ে ঘুমের মেয়েটাকে ডাকতেই মেয়েটা ধরফর করে উঠে বসে। তরবর করে ছোট পায় টং হতে নেমে মাকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলল। মা কি হইছে তোর? পানি চাইতে এগিয়ে দিল।

অতি কষ্টে সে বলল তোর ফুপুক ডাকেক তো। যদিও মনটা চাচ্ছেনা। কারণ, ভাইকে সুপথে ফেরাতে পারলনা বলে সবসময় শাপান্তের শেষ নেই মমিনার। আজ সকাল বেলাতেও বলেছে। একাঁটা যেন না খোলে। কিন্তু এ তো অভিমানের সময় নয়। তাই আবারও মেয়েকে বলল, যা মা তোর ফুপুক ডাকেক।

অন্ধকারের উঠোনটুকু পার হয়ে মমিনার ঘরে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না মরিয়ম। আবার মায়ের অবস্থাও ভাল মনে হচ্ছেনা। তাই কাঁদতে কাঁদতে ভয়ে ভয়ে সে তার ফুপুর ঘরের বেড়া ঠেলতে লাগল। মমিনা বাজখাই গলায় বলল কায় রে? মুই ফুপু। কি হইছে? ফুপু মার খুব কষ্ট হবার লাগছে। তোমাক ডাকায়? ও সকালে মনে আছিল না? ঢং দেখপার জাগা পায়না? যা রাইত পোয়াউক। কাঁদতে কাঁদতে ফিরে এসে দেখে জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে পড়ে আছে তার মা। কিন্তু ছোট মরিয়ম ভাবল বুঝিবা মা ঘুমিয়েছে। পাশে পানির পাত্রটা। পানিটাও তেমনি আছে। আস্তে করে গ্লাসটা ধরে মায়ের মাথার কাছে পিঁড়ি পেতে বসল মরিয়ম। কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে পড়ল পিঁড়ির উপরেই।

নিস্তব্ধ ঘরের এক কোণে কাঠের পিলসুজের উপর কালির দোয়াতের কোরোসিনের বাতিটাতে শুধু নিবুনিবু আলো জ্বলছিল। হঠাৎ প্রচণ্ড ককিয়ে উঠল অছিমা। তৃষ্ণায়, ব্যথায় তার ভিতরটা শুকিয়ে আসছে। অস্পষ্ট স্বরে পানি পানি। কেউ শুনছে না। প্রচণ্ড ব্যথাটা মোচড় দিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। ব্যথার চোটে পরনের শাড়িটা টেনে হিঁচড়ে কুটিকুটি করতে ইচ্ছে করছে। অনুভব করছে মৃত্যুর শীতলতা। মৃত্যুর দূত আজরাইল পয়গাম নিয়ে দাঁড়িয়ে নিবুনিবু বাতির পাশে। অবশ্য ঘরের সবই অন্ধকার লাগছে। বর্তমান ঝাপসা হয়ে ভবিষ্যৎ নয় অতীত স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার সামনে।

৬ ভাইবোনের মধ্যে বোনেদের মধ্যে ২য় আর সবার মধ্যে ৫ম ছিল অছিমা। কাল চামড়ার আর নিকষ ঘন কাল চুলের ডাগর কাল চোখের কিশোরী অছিমা কিশোরী বধু হল। বাপ অন্যের জমিতে বাড়ি করে থাকে। ভাইদের মধ্যে বড় আবুল বিয়ে করে শ্বশুর বাড়ি, আনোয়ার আর মনোয়ার রাজশাহীতে কাজ করে। স্বামী পরিত্যক্তা বড় বোন, সে ও ছোট বোনকে নিয়ে বাবা-মায়ের বড় অভাবের সংসার হতে বিদেয় করাটাই ছিল কচুর মিয়ার প্রধান উদ্দেশ্য। ভারতের আসাম থেকে ১৯৭০ সালে এসে এই জমিটুকু চেয়ে নিয়েছে জোতদার পণ্ডিতের কাছ থেকে। পেটের ব্যথার জন্য তোমন কাজও করতে পারল না কচুর উদ্দিন। নদীভাঙ্গা দোজবরের মজিবরের পরিবার যখন বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল তখনও সে আপত্তি জানায়নি। বরং ভাগ্যের ব্যাপার মনে করেছিল। পণও মাত্র ৩ হাজার টাকা। তাই বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের দিন ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভিড় করেছিল বলে তাদের হাতে গুড় দিয়েছিল অছিমার মা।

কিছুদিন মানে ৫/৬ মাস সংসার করার পর শুরু হল মজিবরের অত্যাচার। গালিগালাজ, মারপিট, খেতে পরতে না দেয়াটা নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। কষ্ট সইতে না পেরে একদিন পালিয়ে আসল সে। সন্ধ্যায়। একা।

মজিবর জোর করে ২ বার নিতে এসেছিল যায়নি। তাছাড়া জমিওয়ালা দাদা ওদের ডেকে বলেছে, ছোট মেয়ে এসেছে যখন কয়েকটা দিন থাক। তারপর এমনিই যাবে। দাদার বাড়ির কাজ অছিমা আগে থেকেই করত। পুরনো কাজে আবার যোগ দিল। পরিবর্তনটা বৌদিই বুঝতে পেরেছিলেন। অছিমাও বুঝেছিল। তারপর নিজেই মজিবরকে খবর পাঠিয়ে বলেছিল যে সে যাবে তবে বাচ্চাটা হবার পর। অবশ্য মজিবরও চাপের মুখে ছিল। না হলে ঐ তিন হাজার আর মোহরানা বাবদ ২ হাজার টাকা ফেরত দিতে হত ওকে। আগের বউটাকে তালাক দিয়েছিল সুদের ওপর টাকা ধার করে। সেটাই শুধতে পারেনি ও। মরিয়ম জন্মাবার পর ফিরে গিয়েছিল মজিবরের ঘরে। কিন্তু স্বভাব পাল্টাল না মজিবরের। অত্যাচার, ঝগড়া, ঝগড়া আর অত্যাচার। ওরা যে বাড়িতে ছিল তারা সাফ বলে দিল এখানে থাকা চলবে না। অন্য কোথাও যাও। কতবার অছিমা ভেবেছে চলে যাবে। কিন্তু কোথায়? তাই বাধ্য হয়ে ঠাকুরগাঁও মজিবরের বোনের বাড়িতে এসে বাড়ির এক কোণে একটা ঝুপড়ি ঘর তুলেছে ওরা। আর সংগে এসেছে মরিয়ম ও পেটে...।

ও! প্রচণ্ড ব্যথায় কটি আলাদা হতে চাইছে। অছিমা সবসময় গড়িয়ে পানি আর রক্তের অনুভূতি পাচ্ছে অন্ধকারে। সবাই বলেছে দুইটা বাচ্চা আছে ওর পেটে। বারবার জ্ঞান হারাচ্ছে আবার ফিরে পাচ্ছে। গোঙানোর শক্তিও হারাচ্ছে ও। মাকে খুব মনে পড়ছে। গত বছর মরেছে মা। ছোট বোনটা ভাইয়ের কাছে রাজশাহীতে। বড় বোনটা তার ছেলেকে নিয়ে ঢাকায়। বাবা যে কোথায় জানেই না সে। মা গো..! খুব করে ডাকছে সে।

অতীত বর্তমান এখন খুব কাছে তার। দুজনই কাছে ও দূরে। আসে আবার মিলায়। ঝাপসা ও স্পষ্ট। তারপর সব লাল, নীল, বেগুনী আবার গাঢ় হলুদ হতে মলিন সরষে ফুলের ক্ষেতের মত মিলাতে মিলাতে যখন দিগন্তে মিলিয়ে যায়। তখন পেটের কেউ একজন মাকে সাহায্য করবার জন্য তার নরম হাত দিয়ে শক্ত মাটি ধরবার আশায় হাত বাড়িয়ে দেয়।

আর অছিমা ভোরের আলো ফুটবার সাথে সাথে মিলাতে থাকে ঠিক চাঁদের মত। ঘরের ঝাঁপিতে মোরগটার ভোরের ডাকে যখন মরিয়ম জেগে ওঠে তখন দেখতে পায় শত ছিন্ন শাড়িতে মা টং এর নীচে আর তার কল্পিত ভাইয়েরা (তাই চেয়েছিল ও)... । আর দেখতে পারলনা মরিয়ম। পাঁচ বছরের মরিয়ম চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। চিৎকারে সবাই জড় হয়। সবাই আহা, উহু করে। কেবল মমিনা মরিয়মকে কোলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় মৃতের গোসলের জন্য ব্যবস্থা করতে।

আর বেলা দ্বিপ্রহরে সম্ভাব্য দুই সন্তান পেটে নিয়ে ননদের পতিত জঙ্গলের এক পাশে একটি কবরে ঠাঁই পায় অছিমা। তাও বছর হবে। খুব কষ্ট পেলে মরিয়ম মায়ের কবরে ফরিয়াদ জানিয়ে আসে। নয়ত কেউ তেমন আসেনা সেদিকে। বাবা এখনও ফেরেনি। সবাই বলে ঢাকায় নিকা করেছে ওর বাবা। ও কি জানে নতুন এক অছিমা মরিয়মের মধ্যে বসবাস শুরু করেছে? আমরা কি জানি?

নদীও ভেতরে ভাঙতে ভাঙতে

আমিনুর রহমান সুলতান

নদী আমাদের ভাঙে...
ব্রহ্মপুত্র ভাঙতে ভাঙতে মাটি ভাঙে মন ভাঙে
ভাঙা মন পাড়ে বসে স্বপ্নভাঙার গান গায় ভাটিয়ালি সুরে
তখন নদীও ভাঙে, নদীও ভেতরে ভাঙতে ভাঙতে
পলির বিস্তার রেখে যায়
আমাদের মন পলি হয়ে ভরে ওঠে।

সমুদ্রের থাকে না পলির ওম
জলোচ্ছ্বাসে উঠে আসে ভয়ঙ্কর
পড়ে থাকে পথে পথে নোনাজল
তোমাদের মন পলি নয়
নোনাজলে বয়ে যায়...

আর হংসকাহিনী লিখি

পাবলো শাহি

প্রকাশ্যে করুণাভ মেঘ, ভাসিল তব বিহঙ্গে
গৃহে, অঝোরে ঝরিল; কায় স্পর্শের ফুল।
কে গো তুমি দেহকাণ্ড, শিখিবার ভাষা
ফিরিবার দিনে আশ্চর্য লিপিকা।

এই লিপির প্রতœপাঠ করি; আর লিখি হংসকাহিনী
শিখি, দূরবর্তী ডানার আলিঙ্গন ....

সে যেথায় ভাসালো ভেলা; তাকে বলি
তুমি হে দেহলতা; আমের মুকুল।

বৃষ্টি নামুক

রহমান আতিক

চৌদিক পোড়ে বেয়াড়া রোদ্দুরে ফুটফাট তৃষ্ণার্ত
ঘুঘু গলা ফাটায় দগদগে দুপুরে অসহায়
দৃষ্টি সবুজিমা গাছপালাদের আকাশে নিয়ত
অগ্নুৎপাত বিন্দুমাত্র জলের সুষমা বিস্তীর্ণ
স্নিগ্ধ শ্যামল ছায়া অথবা গোলাপের অনন্তর
সতেজ সুঘ্রাণ কোথাও নেই অবশেষ, কোথাও।

হায়, প্রিয় ভূখণ্ড পোড়ে জ্যৈষ্ঠের তীব্র খরতাপে
সর্বোপরি দাঁতাল কবন্ধের দল পুড়িয়ে মারে
কল্যাণের ঘর সৌন্দর্য আর শুভ্রতার উদ্যান
তথাপি মাটির মানুষ নয় আশাহত তেমনি
আমিও জপি অনুক্ষণ অনন্য চৈতন্য সঙ্গীত
বৃষ্টি নামুক, তোমার সজল চোখের মত স্বচ্ছ
শীতল বৃষ্টি নামুক অফুরান আমরা সবাই
নেচে উঠি ধেই ধেই অকৃত্রিম সৌন্দর্যের জলে।

মেঘ ফেটে বৃষ্টি ঝরে

ধ্রুবজ্যোতি ঘোষ মুকুল

আসমানি মেঘ ডাকে... বারংবার নদীতে রোমাঞ্চের ঢেউ খেলে যায়
দিগন্তে উঁচু পাহাড়ের বুক... পাখিদের বন ভূমি... তৃষিত নয়নে চাাঁদ
চুমু খেতে খেতে নেমে আসে ঘাসের গালিচায়... মেঘ ফেটে বৃষ্টি
ঝরে পড়ে শ্রাবণী মোহনায়... একটি পাখি উড়ে গেল গহীন সাগরে।

কবি- ঘুমে মেঘ-স্বপ্ন:
কাঁকড়ার কামড়ে ঘুম ভাঙে: নিরিবিলি বোতাম লাগায় খোলা বুকে!

ধার

আমিনুর রহমান সুলতান

পালের বাতাস না পেলে বৈঠার ধার কমে যায়
লোহার ধার থাকে না মরচে ধরা লোহায় শান না পড়লে
মেঘের কন্যারা বৃষ্টির নূপুর পায়ে আষাঢ়ে শ্রাবণে
ঝমঝম হেঁটে না গেলে ময়ূরীর পায়ে ওঠে না নাচের ধার।

সাগর কন্যা, তোমার চোখের গভীরের সমুদ্রের নীল ঢেউ নেচে নেচে
যদি না আমার চোখে স্পর্শ দিয়ে যায়; যদি না তোমার
স্পর্শের ধার মুঠোভরে না কুড়াই;
ওষ্ঠ্যে ভরে না নিই অমৃতের স্বাদ
মনে হয় শুকনো পাতায় মচমচ করে শীত এসে হাঁটতে থাকে
ঋতুর ভূগোলে,
দরজা জানালা খোলা পেলে বোধের গভীরে মিশে যায় বাতাসের সঙ্গে সাঁই সাঁই

বোধ ভোঁতা হলে মানুষের দৃষ্টি, হাঁটা স্বপ্নযাত্রা
চৌষট্টিকলা ভোঁতা হয়ে যায়...

গুঁড়িগুঁড়ি বেদনার গৌড়কথা

পাবলো শাহি

একদিন এরকম অধিপ্রাণে অনুস্মৃতি করি
বলি ওগো জান; প্রতি কানে কথা ...
ব্যাকুলতার বড় ছেলে আমি; চোখে শর্ষের ফুল
আর তোমার স্পর্শে বুদবুদ জেগে ওঠে প্রাবৃষ্য বকুল।
আমি তারও অধিকন্তু; দীর্ঘ প্রপাতে ভাঙি
আর তোমার একবিন্দু ফ্লুইট টিপকে ধ্যান করি
বলি ওগো চন্দনলতা; শরীরের পাঁচ ডালে
তুমি সেই গুঁড়িগুঁড়ি মেঘ; বেদনার গুহ্য; গৌড়কাল।

স্বপ্নের বানেছা পরী

মুহম্মদ হায়দার

হোমিও চিকিৎসার প্রতি সবসময় অনাগ্রহী কামাল মাস্টার। আমার চেম্বারে মাঝে মাঝে বসে গল্প করেন অথবা চা পান করেন। ওষুধের কথা বা কারও রোগের কথা কোনোদিন বলেন না। আমাকে কখনও-সখনও খোঁচা মারেন: ডাক্তার, পানির ফোঁটা বিক্রি করে ভালোই তো চালাচ্ছো! আর কতদিন! সেই কামাল মাস্টার একদিন সকালে এসে আমার চেম্বারের ভেতরের গোপন চেম্বারে ঢুকে পড়লেন এবং আমাকেও ভেতরে ডাকলেন। রোগের কথাই বলছেন তিনি। তবে নিজের বা পরিবারের কারও কথা নয়। মামাতো শ্যালকের কথা। শ্যালক ছেরার পেশাবের দ্বার দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়ে।
কামাল মাস্টারের মামাতো শ্যালক হেলালের বয়স সাড়ে চোদ্দ। আলিয়া মাদ্রাসায় আলিমের ছাত্র। বাবা তার সৌদী প্রবাসী। দেড়-দুই বছর পরপর বাড়ি আসে। মা-ই তিন ছেলেমেয়ে ও সংসারের সবকিছু। বড় সন্তান হেলালের শরীর-স্বাস্থ্য দেখে মায়ের ভালো বোধ হয় না। উঠতি বয়স। হঠাৎ বেশ লম্বা হচ্ছে। কিন্তু মাজাটা দিন দিন চিকন হয়ে যাচ্ছে। ঠাট্টার সম্পর্কের প্রতিবেশীদের কেউ কেউ হেলালের সাথে রসিকতা করে: কিরে ছেরা! রাইতে খোয়াবে সুন্দরী বুবুজান আসে বুঝি! এক্কেবারে বাদুড়চোষা হয়া গেলি! কথাগুলো হেলালের মায়ের কানেও আসে। সে ছেলের খাবারের তালিকা উন্নত করে। প্রতিসকালে দুটো ডিমসিদ্ধ আর রাতে দুধ। কিন্তু মাসদুয়েক পরেও ফলাফল নেতিবাচক। চিন্তিত মা হেলালের মাদ্রাসার এক হুজুরের সাথে গোপনে দেখা করে তার উদ্বেগের কথা জানায়। হুজুর ততোধিক উদ্বিগ্ন হয়ে এই বয়সের ছেলেদের সমস্যাটা বয়ান করেন: উঠতি বয়সের ছেলেদের কাউকে কাউকে সুন্দর-সুন্দর পরীরা হঠাৎ পছন্দ করে ফেলে। রাতে তার কাছে আসে। অতি আদরের সাথে মহব্বতের রাত কাটায়। ছেলেটা ঘোরের মধ্যে থাকে: স্বপ্ন নাকি বাস্তব! তবে নেশা লাগে। ছাড়তে পারে না। এদিকে শরীরও কুলায় না। এই রকম সমস্যা আমাদের ছাত্রদের আগেও হইছে। হেলালেরও এই সমস্যাই। তবে আপনে চিন্তা কইরেন না। আমি হেলালের সঙ্গে কথা কয়ে বড়হুজুরের কাছ থেকে তাবিজ নিয়ে দিমু। তাইলেই দুষ্টপরী ধারেকাছে আসতে পারবো না। তবে অত্যাচার করবো। আর সুযোগ পাইলেই তাবিজটা চুরি কইরে পানিতে ফেলায়া দিবো। সাবধান থাইকেন। তাবিজটা যেনো গলা থেকে খুইলে না রাখে।
দুদিন পর হেলালের গলায় তাবিজ দেখে মা খুশি। মনে মনে সাবধান হলো। তাবিজের দিকে সীমান্তচৌকির রক্ষীর মতন নজর রাখে। কিন্তু হেলালের শরীর আরও খারাপ হচ্ছে। সে মাদ্রাসায় যাওয়া বাদ দিয়ে বাড়িতেই চুপচাপ শুয়ে থাকে। মা একদিন সাহস করে লজ্জাশরমের বালাই ঝেড়ে ফেলে ছেলের মাথায় হাত রেখে বলে: বাজান, আমি তোর মা! রোগবালাই গোপন করতে নাই! তোর কী হইছে, তুই আমারে ক’! নিরুপায় হেলাল মায়ের কাছে পেশাবের দ্বার দিয়ে চার-পাঁচ ফোঁটা রক্ত পড়ার কথা প্রকাশ করে। মা ছেলেকে আশ্বস্ত করে: ডরের কিছু নাই, বাজান! আমি সব ব্যবস্থা করতাছি! সে ভাগ্নীজামাই কামাল মাস্টারকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে হেলালের অসুখের কথা জানায়।
কামাল মাস্টার আমার সাথে কথা বলে পরের দিন হেলালকে নিয়ে আসেন। বেশ লম্বা হেলাল। গোঁফের রেখা পরিষ্কার। চোখেমুখে বয়ঃসন্ধির দোলাচল। কামাল মাস্টারকে বললাম: আমি ওর সঙ্গে একা কথা বলতে চাই। কামাল মাস্টার বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। হেলালকে বললাম: তোমার রক্ত পড়া ভালো হবে। চিন্তা করো না। তবে ডাক্তারের কাছে কোনো কথা গোপন করা যাবে না। কী কারণে তোমার রক্ত পড়লো সেটা বলো। হেলাল নতমুখ তুলে আমার দিকে না তাকিয়ে ইতিউতি তাকায়। আমি বললাম: এ রকম অনেক রোগীর চিকিৎসা আমি করেছি। তাদের ইতিহাসগুলো অত্যন্ত গোপন। তোমার কথাগুলোও কেউ জানবে না। এমনকি কামাল মাস্টার বা তোমার মাকেও আমি কিছু বলবো না। আশ্বস্ত হয়ে হেলাল মুখ খুললো: একজনের সঙ্গে আমার খারাপ সম্পর্ক আছে। আমি তার কাছেই রাইতে ঘুমাই। প্রায় এক বছর যাবৎ এই কাম চলতাছে। মাসদুই আগে অসুস্থ হওয়ার পরে আমি আর সে দুইজনেই বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছি। কিন্তু আমিও থাকবার পারি না, সে-ও পারে না। সে গোপনে আমার চিকিৎসারও চেষ্টা করছে। খারাজুরা গাছের পাতা পানিতে কচলাইয়া নেলশে পানি চিনি দিয়ে রাইতে আমারে খাওয়াইছে। সাত রাইত খারাজুরা পাতার রস খায়েও কোনো উপকার হয় নাই।
আমি হেলালকে ওষুধ দিয়ে বিদেয় করলাম। আর বলে দিলাম: অল্পবয়সে বেশিবেশি ওই কাম করার জন্যেই তোমার এই মারাত্মক সমস্যা হইছে। কাজেই বাদ দিবার পারো কিনা চেষ্টা করে দ্যাখো!
পরদিন কামাল মাস্টারের মাধ্যমে খবর পাঠিয়ে হেলালের মাকে ডেকে আনলাম। নয়নতারা! আমার স্কুলজীবনের বন্ধু আলমের ছোটবোন। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছে তার। প্রায় ষোল-সতেরো বছর আগে। নয়নতারা বললো: আপনে আমাদের বাড়িতে গিয়ে ভাইজানের ঘরে বসে যখন জোরে জোরে কবিতা পড়তেন, আমি তখন আমার চাচাতো বোন কমলারে সঙ্গে নিয়ে লুকায়ে লুকায়ে শুনতাম। কমলাও আপনেরে খুব পছন্দ করতো। আলম আমাকে দুঃখ করে বলেছিল: বোনটা পড়াশুনায় ভালো ছিলো! কিন্তু আব্বার গোয়ার্তমির জন্যেই এ্যাতো অল্পবয়সে ওর বিয়ে হয়ে গেলো। নয়নতারাকে আমি হেলাল সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেললো। আমি তাকে শান্ত করে জিজ্ঞেস করলাম: হেলাল রাতে কার কাছে থাকে? সে খুব স্বাভাবিকভাবেই জানালো: আমার চাচিশাশুড়ির কাছে! নয়নতারার কাছ থেকে হেলালের লীলাসঙ্গিনীর বিস্তারিত পরিচয় জেনে আমিও কষ্টের শুকনো হাসি হাসলাম। তার বয়স এখন ছেচল্লিশ কি সাতচল্লিশ। আমার থেকে বছর চারেকের ছোট। আমি নয়নতারার কাছে জানতে চাইলাম: তোমার চাচিশাশুড়ি কি এখনও জোয়ানই আছে? ছেলের অসুখের দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েও নয়নতারা একটু লাজুক হাসলো এবং পরে তার চোখেমুখে একটা ভীতির ছায়া সে হাসি ঢেকে দিলো। অতি সংক্ষেপে সে জানালো: চাচিমার শরীরের বান্ধন শক্ত! এহনো দেখতে চ্যাংড়া-চ্যাংড়াই লাগে!
হেলালের স্বপ্নের পরী, নয়নতারার চাচিমার নাম বানেছা। এগারো-বারো বছরের বানেছার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল নটাকুড়া বিলে। প্রাণ জাগানিয়া নটাকুড়া বিলে তখন মাঘ মাস বিদায়ের আয়োজনে ব্যস্ত। হিমশীতল সময়টা চলে গেছে প্রায়। মাথার কাছে নেমে এসেছে সূর্য। প্রকৃতির অঙ্গে ফাগুন মানুষের মনে আগুন। বেলা দুপুর হবার আগেই বিলের বুক জুড়ে জীবনের কোলাহল। চোখা-চোখি, কুড়া, কালিম, ধলাবক আর কানিবকের প্রাণস্পর্শে আন্দোলিত চারপাশ। মাথাঘামা রোদেও নটাকুড়ার পানি শরীরে কাঁপন লাগায়। তবু জলদাম, পানার ভিড় ঠেলে ঘেরজাল, ছিপজাল, পলো, ঠেলাজালি নিয়ে নেমে পড়েছে মানুষ। কৈ মাছ আর মাগুরের স্বাদ পানি আনে জিহ্বায়। কিনারের দিকে কম পানির জমিতে চাষ দিচ্ছে কেউ কেউ। মই দেওয়ার সময় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা পিছন পিছন দল বেঁধে হাঁটে। মইয়ের টানে পানি সরে গেলে কাদার মধ্যে মাছ বের হয়। টাকি এবং কৈ মাছই বেশি। একটা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধরতে যায় কয়েকজন। কাড়াকাড়ি করতে করতে কোনোটা হারিয়ে যায় কাদায়, ধরা পড়ে কোনোটা। মইয়ের পিছনের ছেলেমেয়েদের চেয়ে একটু বড় যারা, তারা বিলে নেমেছে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে। শালুক তুলছে। বিভিন্ন সাইজের সিসার পাতিলের গলায় দড়ি লাগিয়ে, দড়ির অন্যমাথা কোমরে বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছে সে পাতিল। শালুক রাখে ওতে। শালুক তোলার দলে মেয়েরা সংখ্যাগুরু। এই সংখ্যাগুরুর একজন হঠাৎ চিৎকার করে নটাকুড়ার মৃদু ছন্দে সমুদ্রের ঢেউ তুললো। ঘাগরা আর বুককেস পরা বানেছা চিৎকার করতে করতে কিনারের দিকে ছুটছে। আরও তিনচারটে ছেলেমেয়ে তার সাথে গলা মেলাচ্ছে। বিলের সবাই তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে। নটাকুড়া বিলে নামলে জোঁক ধরবে এ আর এমন কী! তবে শীত মরশুমে জোঁক ধরে কালেভদ্রে। বানেছার ম্যারথন চিৎকারে অনেকের হাসি মিলিয়ে গেল। মাছ ধরা বন্ধ। সময় থেমে গেল বিলের বুকে। মাছের নেশায় স্কুল কামাই করে পলো হাতে আমিও নির্বাক। ছবের কাহা আমাদের দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো: ওরে ধর! জোঁকটা ছাড়ায়া দে! মাইয়াডা মরবো তো! আমি পলো ফেলে দৌড় দিতেই রমজান দাদা মুচকি হেসে আওয়াজ দিলেন: তাড়াতাড়ি যায়ে দ্যাখ্, ভিতরে হান্দায়া গেলো কিনা! বানেছা ডাঙ্গায় উঠে ঘাগরা তুলে ঊরুসন্ধিতে খামচাচ্ছে, লাফাচ্ছে আর ঘোড়ার মতন চিৎকার করছে। তার পাশে চারপাঁচজন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে জড়ো হয়ে তামাশা দেখছে। আমি কাছে গিয়ে জোঁক ছাড়াতে চেষ্টা করলে বানেছা আরও জোরে লাফাতে থাকে। জোঁকের আক্রমণস্থলে হাত দিতে দেয় না। চিৎকারের সাথে আহাজারির সুরে বলে: তুমি না, তুমি না, বুড়া মানুষ কেউ আহেন গো! আমি তাকে ধমক দিয়ে ডান হাতে জাপটে ধরে বাম হাত দিয়ে জোঁকটা বের করে আনলাম। বেশ বড় জোঁক। বানেছাকে ডান হাতের বাঁধন থেকে ছেড়ে দিলাম। চোখ বন্ধ করে সে মাটিতে বসে পড়লো। জোঁকটাকেও মাটিতে রাখলাম। সকল ছেলেমেয়ে জোঁকের নড়াচড়া দেখছে। একজন হুঁকা নিয়ে এসে কাত করে হুঁকার সবটুকু পানি জোঁকের গায়ে ঢেলে দিলো। জোঁকটা মোচড় দিতে দিতে থেমে গেল। আমি বানেছার দিকে তাকালাম। সেও আমার দিকেই তাকিয়ে। চকিতে চোখ নামালো। চোখের পাতা ভারি কইন্যার লাজুক লাজুক নজর! আমার গলা শুকিয়ে গেল! আমি মুহূর্তে একা হয়ে গেলাম! তার লিচুঢাকা বুককেসের উঠানামা দেখতে দেখতে কোনোমতে গলা দিয়ে স্বর বের করলাম: আরও শালুক তুলবার যাবা!
আন্ধারমানিক গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় আমাদের আর উত্তরপাড়ায় বানেছার বাবা বাজু মণ্ডলের বাড়ি। স্কুল থেকে ফিরে বিকেলে বাজু মণ্ডলের বাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করি। মন টানে মহুয়া টানে! বানেছার দেখা পাই না। ওদের প্রতিবেশী কলেজপড়–য়া আবুল ভাইয়ের ঘরে গিয়ে বসে থাকি। বানেছা স্কুলে যায় আমার বিপরীতমুখী রাস্তায়। অন্য স্কুলে। সপ্তাহখানেক ঘুরে দেখা না পেয়ে স্কুল কামাই করে তার স্কুলের রাস্তায় গিয়ে একদিন দাঁড়ালাম। সে আসছে। সাথে আরও দুজন। পরিচিত। আমার বুকের ঢিপঢিপ বাড়ছে। কাছে আসার পর তাদের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বললাম: আজ তোমাদের ইশকুলে যামু। ওরা কথা বললো না। কেবল মুচকি হাসলো তিনজনেই। কিছুদূর হেঁটে সুবিধা করতে না পেরে কেটে পড়লাম। যোগযোগ ব্যবস্থায় সহযোগী বড়ই দরকার। রমজান দাদার বুদ্ধিতে কাজ হলো অবশেষে। বানেছাদের ঠিকে ঝি খোয়াজের বউকে পানসুপারি কিনে দিয়ে একটা চিরকুট ধরিয়ে দিলাম। জবাব এলো। পজিটিভ! পরদিন বিকেলে আমি তাদের বাড়ির ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে গলির মুখে তাকে একনজর দেখলাম। সে পালিয়ে ভেতরে চলে গেল। তার পরদিন বিকেলে খোয়াজের বউ একটা চিরকুট এনে দিলো: আমি তোমারে বিলের শামুকের মধ্যে খুঁইজা পাইছি! Ñ এই কথাটার পরে লেখা: ইতি। তারপরে টুকটুকে লাল রঙের লিপস্টিক ঠোঁটের ছাপ। আমার কান গরম হয়ে উঠলো! খোয়াজের বউ বললো: কয়া দিছে, ঘোরাঘুরি, চিঠিফিটি কিছুই চইলবো না। বিপদ আছে। একবারে ঈদের দিন মাঠের নমাজের সময় আমার ঘরে দ্যাখা হইবো। ছাব্বিশ দিন অপেক্ষা করে ঈদের দিনে দেখা হলো। খোয়াজের বউ চুন আনার অছিলায় বাইরে গেলে আমি সোজা বানেছার সামনে গিয়ে তার হাত দুটো ধরলাম। সে আমার হাত দুটো একটু ওপরে তুলে বুকে চেপে ধরলো। কারও মুখে কথা নাই। আমি কাঁপছি! বাইরে আবুল ভাইয়ের গলা শোনা গেল: খোয়াজ কাহা বাড়িত্ আছো? পরীর মতন অদৃশ্য বানেছা! বাড়ির ভিতরে এসে আমাকে দেখে আবুল ভাই একটু যেন থেমে গেল। খোয়াজের বউ মৃদু হাসে। আমি আবুল ভাইয়ের সঙ্গে বেরিয়ে বাড়ি চলে এলাম। বানেছার সঙ্গে আমার আর দেখা হয় নাই। অতঃপর আবুল-বানেছা পর্ব। আরও দীর্ঘ আরও গভীর! আমি টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলাম। অভিভাবকের উপস্থিতিতে মুচলেকা দিয়ে ফরম পূরণ করে দ্বিতীয় বিভাগে এস.এস.সি. পাশ করলাম। কলেজে ভর্তি হলাম। বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। বড় সন্তান আমি সংসারের গরম কড়াইয়ে পড়ে বানেছার ছ্যাকা ভুলে গেলাম। সেদিন আবুল ভাইয়ের গলা শুনে বানেছার পলায়ন দেখে খোয়াজের বউয়ের মৃদু হাসির কারণ বুঝলাম। আমার আগেই আবুল-বানেছার মিলনদেখা হয়ে গেছে খোয়াজবউয়ের আস্তানায়। এগারো-বারো বছরের বানেছা কত প্রেম চায়!
আমি যখন কলেজে ক্লাশ শেষ করে বিকেলে বাবার বন্ধু মোহাম্মদ আলী ডাক্তারের কাছে হোমিও শিখতে শুরু করি, তখন আবুল-বানেছা কাহিনী টক অব দ্য আন্ধারমানিক প্লাস আশপাশের গ্রাম। বাজু মণ্ডল মেয়ের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করলেন। বাবা বৈরী হলেও রাতের আন্ধার বানেছার সহায়। গভীর রাতে বদনা নিয়ে বাইরে গিয়ে আবুলের সাথে গোয়ালঘরের পিছনে জড়াজড়ি করার সময় বানেছা একবার ধরা পড়ে মতি ড্রাইভারের কাছে। মতি ড্রাইভার রাতে শেলোমেশিন বন্ধ করে বাড়ি ফেরার শর্টকাট পথে গোয়ালঘরের পিছনে এসে টর্চলাইট জ্বেলে তাদেরকে এমন বেহাল অবস্থায় দেখে যে, সে শরমে কথা বলতে ভুলে যায়।
পরদিন থেকে আন্ধারমানিক গ্রামে থৈ থৈ অবস্থা। মতি ড্রাইভারের চাচা চট্কু মুন্সী বড় মৌলানা ডেকে শরিয়তের বিধান মোতাবেক সালিশী করার জন্যে প্রস্তুত হয়। গ্রামের মসজিদ থেকে তার মোয়াজ্জিনের চাকরিটা বাজু মণ্ডলই খাইছে! কিন্তু সালিশী আর হয় না। বাজু মণ্ডল চট্কু মুন্সীকে ম্যানেজ করে নেয়। সে ঘটকালি করে। বানেছার বিয়ে। বর চাকরি করে। মাঝবয়সী হলেও বরের প্রথম বিয়ে।
আবুল ভাই আই.এ. পরীক্ষা ড্রপ দিয়ে বানেছার বিয়ে ঠেকানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শরম করলে গরম ভাত পাওয়া যায় না। বরযাত্রীদের পথিমধ্যে আটকাতে ব্যর্থ হয়ে প্রেমপাগেলা আবুল ভাই চারপাঁচজন সঙ্গীসহ বিয়ের আসরে গিয়ে হাজির হয়। আমাকেও যেতে বলেছিল। কিন্তু আমি মঞ্চে না গিয়ে দর্শকসারিতে। আবুল ভাইয়ের দল চেয়ারের আঘাতে হ্যাজাকবাতি ভেঙে ফেললে বাড়ির মানুষ আর বসে থাকতে পারে নি। লাঠিসোটা নিয়ে ধাওয়া করে তাদের তাড়িয়ে দিয়ে বানেছার শুভবিবাহ সুসম্পন্ন করে।
বিয়ের চারমাস পর বানেছা বাপের বাড়ি আসে। তিনদিন পর দাদী ও ভাবী সম্পর্কের মহিলাদের কাছে জবান খোলে: আমি ওই সোয়ামীর ভাত খামু না! একটা না-মদ্দার সঙ্গে বিয়ে দিছো! জীবনে কোনোদিন পোলাপান হইবো না!
আঠারো দিন পর বানেছার শ্বশুর নিতে এলে বাজু মণ্ডল তাকে ফিরিয়ে দিলেন। বানেছা আবুলের ঘরে গিয়ে কাঁদে। আবার চট্কু মুন্সী সচল হয়। বানেছার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। তারই ইচ্ছা পূর্ণ হলেও বানেছা একরাত শব্দ করে ডুকরে ডুকরে কাঁদে। প্রথম বিয়ে ভাঙে নাকি পোড়াকপালির!
তিনমাস পর আবুল ভাইয়ের সাথে বানেছার শুভপরিণয় সম্পন্ন হয়। পরের রাতে বৌভাতে অল্পকয়েকজন দাওয়াতীর মধ্যে আমিও হাজির। খেতে খেতে আবুল ভাইয়ের মায়ের কান্না শুনলাম: হায় খোদা! ফুলপাত্র পুলার বিয়ে হইলো নিকের পাত্রীর সঙ্গে!
আর কলেজমুখো না হয়ে আবুল ভাই পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে গেল। আমি হোমিও বিদ্যার প্রতি মনোযোগী হলাম। কেবল তিন বিঘা ধানী জমির ওপর নির্ভর করে ছোট ভাইবোনদের পড়াশুনাসহ সংসারযাত্রা অগস্ত্যযাত্রার শামিল। আই.এ. থার্ড ডিভিশন পেয়ে প্রাইভেটে বি.এ. পরীক্ষার চিন্তা মাথায় নিয়ে আলাদা হোমিও চিকিৎসালয় খুললাম। সকাল দশটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত বাজারে থাকি। গ্রামের খবর বিশেষ রাখি না। আবুল ভাই এক পুত্রধনের গর্বিত পিতা। বানেছা আর দশটা গিন্নির মতোই পর্দার অন্তরালে। কিন্তু ছেলে জন্ম দেওয়ার চার বছরের মাথায় বানেছা আবার আলোড়ন তোলে। আলিম-পড়–য়া জায়গীর কাদেরের সাথে একরাতে ঘর ছাড়ে সে। পালানোর রাতে আবুল ভাই বাড়ি ছিল না। ছেলেটা জেগে কান্না শুরু করেছিল। তার গলা টিপে ধরে শব্দ বন্ধ করে চৌকির নিচে ফেলে রেখে বানেছা কাদেরের সঙ্গী হয়েছে বলে শোনা যায়।
কাদেরের সংসারে থিতু হয়েছিল বানেছা। বিয়ের দ্বিতীয় বছরে জমজ দুই মৃতকন্যার জন্ম দেয় সে। তারপর দশবছর অতিবাহিত হলেও আর মা হতে পারে নি। কিছুটা অভাবের মধ্যে দিন কাটলেও চাচিশাশুড়ি বানেছাকে যথেষ্ট সংসারী মনে হয় নয়নতারার। স্বামী সৌদী চলে যাওয়ার পর নয়নতারা কাদের-বানেছার সহায়তায়ই সংসারসাগরে সহজনাবিক। সৌদী থেকে তিন বছর পর ছুটিতে বাড়ি এসে নয়নতারার স্বামী চাচা কাদেরকেও সৌদী যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। যথারীতি ব্যবস্থাও হয়। চাচা-ভাতিজার যুগলবিদায়ের সময় নয়নতারা বড়ছেলে হেলালকে ধরে কাঁদে। ঘরের বেড়া ধরে কাঁদে বানেছা। নয়নতারার স্বামী বিদায়লগ্নের পরিবেশ হালকা করার জন্যে রসিকতা করে বলে: চাচী কাইন্দো না গো! আইজ থেকি ছোটকাহার বদলে হেলাল তোমার কাছে থাকবোনে!
বানেছার ঘরই হেলালের পড়ার ঘর। নয়নতারা ভেবেছে: এ রকম অনেক ছেলেমেয়েই একটু বড় হয়ে মায়ের কাছে থাকে না। দাদীর কাছে থাকে। তাছাড়া চাচিমা একলা ঘরে থাকবেন ক্যামন করে! কিন্তু চাচিমার এ্যাতো বয়স হলেও বুকে একটা কিছু চেপে ধরে ঘুমানোর অভ্যেস যায় নাই! এ কথা নয়নতারা অনুমানও করতে পারে না। মাথা ঘুরে নয়নতারার। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম: তুমি হেলালকে ও-ঘর থেকে নিজের ঘরে আনো!
ওইদিনই বাড়ি গিয়ে নয়নতারা হেলালকে নিজের ঘরে ঘুমাতে বলে। হেলাল সুবোধ বালকের মতো মায়ের ঘরে আলাদা বিছানায় ঘুমালো। পরদিন সকালবেলা নয়নতারা হেলালের বইপত্র, টেবিলচেয়ার বানেছার ঘর থেকে নিজের ঘরে নিয়ে আসে। বানেছা ভীত হরিণীর মতো কেবল চেয়ে চেয়ে দেখে। চাররাত পর নয়নতারা দেখে: গভীর রাতেও হেলাল না ঘুমিয়ে এপাশওপাশ করছে। একটু পরে উঠে দরজা খুলে বাইরে গিয়ে পেশাব করে আসে। পরের রাতে হেলালের দরজা খোলার শব্দে নয়নতারার ঘুম ভাঙে। পেশাব সেরে হেলাল আর ফিরে না। নয়নতারা অপেক্ষা করে। পায়খানা করতে গেলেও এতো সময় লাগে না। সন্দেহ দানা বাঁধে নয়নতারার মগজে। ফিরে আসে হেলাল।
পরদিন সকালে নয়নতারা আমার কাছে এসে সব ঘটনা বলে। আমি তাকে জোর দিয়ে বলি: যেভাবেই হোক ওর কাছে যাওয়া বন্ধ করতে হবে। তোমার শরম করার সময় নাই! এবার আরও কিছু বায়োকেমিক ওষুধ দিলাম। সাথে এলোপ্যাথিকের দোকান থেকে ঘুমের ওষুধ এনে দিলাম।
পাঁচরাত পর হেলাল আবার ঘর থেকে বের হয়। নয়নতারা সজাগ! দেরি করছে হেলাল। বাইরে আসে নয়নতারা। পানির বদনাটা দরজার বাইরে উঠানে পড়ে আছে। বানেছার ঘরের দিকে এগিয়ে যায় সে। ছেলে লজ্জা পাবে! জীবনের অধিক লজ্জা মায়ের! বুকে হাত রাখে নয়নতারা। গলা শক্ত করে ডাক দেয়: হেলাল! হেলাল! ঘরে আসো! দৌড়ে ঘরে আসে নয়নতারা। দুহাতে মুখ ঢেকে বিছানায় বসে। পায়ের শব্দে বুঝে: হেলাল এসেছে। চোয়াল শক্ত করে কাছে গিয়ে একটা চড় মারে হেলালের গালে!
সকালে ঘুম থেকে জেগে হেলালকে বিছানায় পায় না নয়নতারা। সারাদিন তার দেখা নাই। সন্ধ্যায় নাই। রাতেও নাই। পরদিন সকালে ফোলা ফোলা চোখ নিয়ে বাসিমুখে নয়নতারা বানেছার উঠানে যায়। বানেছা ভয় পায়! নয়নতারা তার সামনে গিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়ায়। মাথার কাপড় পড়ে যায় তার! বানেছা আরও কাচুমাচু! নয়নতারার বুকফাটা হাহাকার: চাচিমা গো! আমার হেলাল- - - - - -

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানঃ এক প্রাজ্ঞ প্রাবন্ধিক ও প্রজ্ঞা পরিব্রাজক

সুশান্ত বর্মণ

বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী বাঙালিদের মধ্যে সর্বপ্রথম এবং সবচাইতে বেশিদিন ধরে আন্তর্জাতিক মণ্ডলে সম্মানিত হয়ে আসছেন একমাত্র অতীশ দীপঙ্কর। মেধার কল্যাণী স্ফুরণ তাঁকে যেসময় কালে আন্তর্জাতিক খ্যাতি এনে দিয়েছিল তা অনেকের দৃষ্টিতে অন্ধকার কাল বলে নিন্দিত। বাঙালির পাণ্ডিত্যের ইতিহাস দীর্ঘ নয় এ ধরণের মনোভঙ্গির স্বপক্ষে যে ধারণাগুলি প্রকাশ করা হয় তার বিপরীত আসনে আমাদের অবস্থান।

আধুনিক বাংলাদেশের বিক্রমপুর জেলার অন্তর্গত বজ্রযোগিনী গ্রামে ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে অতীশ দীপঙ্কর জন্মগ্রহণ করেন। ভাষাতাত্ত্বিকদের কারো কারো মতে এই সময়ে ‘বাঙালি নিজের স্বাতন্ত্র্য রূপ খুঁজে ফিরছিল’, আরেক দল ভাষাতাত্ত্বিকের মতে ‘খুঁজে পেয়েছিল’। রাজনীতিপ্রবণ ইতিহাসবিদদের প্ররোচনায় আমরা সামাজিক চিত্র সম্পর্কে ততোটা সুনিশ্চিত ধারণা করতে পারিনা। এ ধরণের অব্যাখ্যাত সমাজব্যবস্থার মধ্যে জন্মগ্রহণ করেও অতীশ দীপঙ্কর বিদ্যা, জ্ঞান, সততা, সরলতা, পাণ্ডিত্যে সর্বভারতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ বিবেচিত হয়েছিলেন। আধুনিক কালের বাঙালির শত ব্যর্থতা ও মিথ্যাচারের বিপরীতে সহস্র বৎসর অতীতের একজন বাঙালির জ্ঞান-বিদ্যার জগতে শীর্ষস্থান লাভের বিষয়টি সত্যিই আলোচনার দাবী রাখে।

খ্রিস্টপূর্ব ৬২৩ অব্দে মহামুণি গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন। নেপালের লুম্বিনী গ্রামে বোধি বৃক্ষের ছায়ায়, মহামায়া মাতার কোলে। তিনি ৩১ বৎসর বয়সে সংসারে বৈরাগ্য বোধ করেন। মানুষের যাবতীয় পার্থিব দুঃখ-যন্ত্রণার সমাধান খুঁজতে গিয়ে একটি নতুন দর্শন ও সমাজ মর্মবোধের সাথে মানব জাতির পরিচয় ঘটান। আজ থেকে আড়াই হাজার বৎসর আগে যখন তিনি জন্মেছিলেন সমাজ ব্যবস্থার নৃতাত্ত্বিক ব্যাখ্যানুযায়ী ভারতীয় সমাজ তখন কৃষিজীবী জীবন যাপন করছে। বিভিন্ন ধাতুর ব্যবহার শিখেছে। গৃহপালিত প্রাণীদেরকে নির্দিষ্ট করতে পেরেছে। আধুনিক যুগের তুলনায় আদিম জীবনযাত্রায় বাস করে গৌতম বুদ্ধ যে জীবন দর্শনকে উপলব্ধি করেছিলেন, তার আবেদন আজও শেষ হয়ে যায়নি। তাঁর মৃত্যুর কিছু পরে গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ভারত জয় করে। এই গ্রীকদের দ্বারা ভারতীয় জ্ঞান বিজ্ঞান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিবাহিত হয়। গ্রীক ইতিহাসবিদ মেগাস্থিনিসের অনেক রচনায় বৌদ্ধদর্শনের কথা লেখা আছে। গৌতম বুদ্ধের পরে যে দার্শনিকেরা জন্ম গ্রহণ করেছেন তাদের মধ্যে জৈন ধর্মগুরু মহাবীর(৫৯৯ খ্রিস্টপূর্ব), পিথাগোরাস (৫৭০- ৫০০ খ্রি.পূ.), হেরাক্লিটাস (৫৩৫- ৪৭৫ খ্রি.পূ.), সক্রেটিস (৪৬৯- ৩৯৯ খ্রি.পূ.), এরিস্টটল (৩৮৪- ৩২২ খ্রি.পূ.) প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। এদের মাধ্যমে বৌদ্ধ দর্শন ইউরোপে বাহিত হয়। আধুনিক যুগের কান্ট, হেগেল, কার্ল মার্কস, জাঁ পল সার্ত, আলবেয়ার কাম্যু, প্রমুখের লেখায় বৌদ্ধদর্শনের স্পর্শ বেশ স্পষ্ট।

সমকালীন পরিস্থিতির প্রভাবে গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তাঁর দার্শনিক মতাবলী সম্বন্ধে জানতে আগ্রহী মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। হিমালয়ের অপরপার্শ্বে অবস্থিত চীনের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের অন্তর্কলহ মেটাতে মহান লাওৎসে প্রবর্তিত তাওবাদ ও জ্ঞানী কনফুসিয়াসের কনফুসিয়াসবাদের বিপরীতে বৌদ্ধদর্শনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকেই ভারত ও চীনের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। চীন অঞ্চল থেকে যেসব শ্রমণরা ভারত ভ্রমণে আসেন তাঁদের মধ্যে ‘ফা-হিয়েন’ (মতান্তরে ‘ফা-হিয়ান’) আসেন ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে, ‘চে-মেং (মতান্তরে ‘চি-য়েন) আসেন ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে, ‘ফা-ইয়ং আসেন ৪২০ খ্রিস্টাব্দে, ‘হিউয়েন সাঙ’ ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে, ‘ই-চিং’ (মতান্তরে ‘আই-ৎ-সিঙ্গ’ বা ‘ইৎ-সিঙ’) ৬৭২ খ্রিস্টাব্দে এবং ‘উ-খোং’ আসেন ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে। এক বৎসরের দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে চীন থেকে এই পণ্ডিতেরা ভারতে এসে এদেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে তাঁর সমানুপাতিক উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। বিদেশ থেকে ভারতে ধর্মানুরাগী শ্রমণরাই শুধু এসেছেন এমন নয়। ভারত থেকেও বেশকিছু বৌদ্ধশাস্ত্রীয় পণ্ডিত মধ্য এশিয়ার প্রান্ত পর্যন্ত বুদ্ধের বাণী বহন করে নিয়ে গিয়েছেন। ‘শান্তরক্ষিত’, ‘পদ্মসম্ভব’, ‘কমলশীল’ প্রমুখ ভারতীয় পণ্ডিতদের নাম তিব্বতীয় গ্রন্থগুলিতে পাওয়া যায়। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে গিয়ে যারা বৌদ্ধদর্শনের মহত্বকে বিদেশীদের চোখে কাক্সিক্ষত করে তুলেছিলেন তাঁদের মধ্যে একমাত্র অতীশ দীপংকরই প্রখ্যাত হয়েছিলেন। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশের বিক্রমপুর অঞ্চলের বজ্রযোগিনী গ্রামে। প্রথম জীবনে তাঁর নাম ছিল আদিনাথ চন্দ্রগর্ভ। অতীশ দীপংকর প্রথম জীবনে তান্ত্রিক হতে চেয়েছিলেন। বিহারের কৃষ্ণগিরি রাহুলের কাছে বৌদ্ধ গুহ্যমন্ত্রে দীক্ষিত হলে তিনি ‘গুহ্যজ্ঞানবজ্র’ উপাধি ধারণ করেন। আচার্য অবধূতিপা ছাড়াও বিখ্যাত পন্ডিত সিদ্ধাচার্য নারোপা এবং ডোম্বিপা তাঁর গুরু ছিলেন। উনিশ বৎসর বয়সে দণ্ডপুরীর মহাসঙ্ঘিকাচার্য শীল রক্ষিত এর কাছে তিনি বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়ে ‘দীপংকর শ্রীজ্ঞান’ নাম গ্রহণ করেন। তিব্বত ও মঙ্গোলিয়ায় অতীশ দীপংকর এত বেশি সুখ্যাত যে এখনও তিনি ‘জোবো জে’ (মহাগুরু অতীশ) নামে পূজিত হন। ১০১১ খ্রিস্টাব্দে শতাধিক অনুসারী নিয়ে তিনি অদ্বিতীয় পণ্ডিত ধর্মকীর্তির কাছে জ্ঞানশিক্ষা করার ইচ্ছা নিয়ে সুবর্ণদ্বীপে (ইন্দোনেশিয়া) আসেন। বারো বৎসর ধরে সুমাত্রায় থেকে বৌদ্ধধর্মচর্চা করেন। ১০২৫ খ্রিস্টাব্দে সুমাত্রার রাজনৈতিক পরিবেশ দূষিত হয়ে যাবার কারণে তিনি ভারতে ফিরে আসেন। তখন বাংলাদেশের রাজা ছিলেন প্রথম মহীপাল। তাঁর আমন্ত্রণে অতীশ দীপঙ্কর বিক্রমশীলা মহাবিহারের অধ্যক্ষ বা মহাস্থবির পদ গ্রহণ করেন। বাংলাদেশ অঞ্চলের বিখ্যাত ‘বিক্রমশীলা বিহার’ ছাড়াও ’ওদন্তপুরী বিহার’ ও ‘সোমপুর বিহার’ তাঁকে অধ্যাপক হিসেবে গ্রহণ করে। সোমপুর মহাবিহারে কয়েক বৎসর শিক্ষকতাকালে তিনি ‘মধ্যমকরতœপ্রদীপ’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন।

তিব্বতে নতুন ধর্ম হিসেবে বৌদ্ধ ধর্ম এই সময়ের আগে থেকেই যাত্রা শুরু করেছে। কিন্তু যথাযথ ব্যাখ্যাকারের অভাবে বৌদ্ধধর্মের মূল আস্বাদ ও উপলব্ধি অনেকাংশে ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। সমাজে বেড়ে ওঠা অস্থিরতার পরিমাণও সীমিত রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। এই সময়ে তিব্বতবাসীরা অতীশ দীপংকরের মতো পণ্ডিতের প্রয়োজন বোধ করেন। তিব্বতবাসী ভিক্ষুদের জোর পীড়াপীড়িতে অতীশ দীপংকর তিন বৎসরের জন্য তিব্বতের বৌদ্ধশাস্ত্রীয় আবহাওয়াকে পূর্ববৎ নির্মল করার জন্য কাজ করবেন বলে কথা দিলেন। ১০৪০ খ্রিস্টাব্দে কয়েকজন শিষ্য, দোভাষী এবং বেশকিছু গ্রন্থ নিয়ে তিব্বতের দিকে রওনা হন। বৌদ্ধ ধর্মকে তিনি এতবেশি ভালোবাসতেন যে আটান্ন বৎসর বয়সে পনেরো-ষোল হাজার ফুট উঁচু বরফে ঢাকা পাহাড়ী পথ বেয়ে তিব্বতে যাওয়াকে তিনি কঠিন ভাবেননি। তবে শর্ত মোতাবেক তিন বৎসরের মধ্যে ভারতে ফিরে আসবেন সে দুরাশাও মনের মধ্যে বহন করতেন না। প্রায় দেড়শো বৎসর আগে তিব্বতের ‘লাংদারমা’ নামে এক রাজা বৌদ্ধধর্মের উপর প্রভূত অত্যাচার করেছিল। অসংখ্য বৌদ্ধমঠ ধ্বংস এবং অসংখ্য বৌদ্ধ ভিক্ষুকে হত্যার পর একজন বৌদ্ধ ভিক্ষুর হাতে তিনি নিহত হন। এই সম্পর্কিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনাপ্রবাহ অতীশ দীপংকরের কাল পর্যন্তও ধারাবাহিক ছিল। ফলে অতীশকে তিব্বতে অনেক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাবলীর মুখোমুখি হয়েই সামনের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছিল। তিব্বতে অতীশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ‘বোধি-পথ-প্রদীপ’ গ্রন্থটি লেখা। এর টীকা গ্রন্থটির নাম ‘বোধিমার্গ-প্রদীপ-পঞ্জিকা’। এছাড়াও তিনি ‘রতœকরণ্ডোদঘাট’, ‘অভিসময়-বিভঙ্গ’, ‘চিতা-বিধি’, নাগ-বলি-বিধি, ‘চিকিৎসা-জীব-সার, ‘দশ-অকুশল-কর্ম-পথ-দেশনা’ প্রভৃতি গ্রন্থ রচনা করেন। তেরো বৎসরের তিব্বত বাসকালে তিনি প্রায় সমস্ত তিব্বতী বৌদ্ধমঠে ভ্রমণের সঙ্গে সঙ্গে অন্তত ৭৯টি গ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন। তাঁর রচনার বিষয়াবলীর মধ্যে বৈচিত্র ছিল। বৌদ্ধশাস্ত্রীয় গ্রন্থ ছাড়াও কারিগরিবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যাতেও তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এজন্য তিনি তিব্বতীদের দ্বারা সম্মানজনক ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত হন। ‘চর্য্যাসংগ্রহ প্রদীপ’ নামক ধর্মগ্রন্থে তাঁর রচনা করা বেশ কয়েকটি সংকীর্তনের পদ পাওয়া যায়। তিব্বতী ভাষায় তেমন অধিকার না থাকার কারণে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান সবসময় সংস্কৃত ভাষায় লিখতেন এবং সাথে থাকা অনুসারীরা তা তিব্বতী ভাষায় অনুবাদ করে ফেলত। এই মহান বাঙালি পণ্ডিত ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে তিব্বতেই ইহলোক ত্যাগ করেন। প্রাচীন যুগের এই প্রাজ্ঞ বাঙালি পণ্ডিত তিব্বতের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এভাবেই চিরস্থায়ী আসন তৈরি করে নেন।

১২০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ভারতে প্রাপ্ত গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কিত বেশিরভাগ গ্রন্থ যার আনুমানিক সর্বমোট সংখ্যা ১৪ হাজার, এর সবগুলো তিব্বতী ও বিভিন্ন বিদেশী ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছিল। তিব্বতে এই বিশাল গ্রন্থরাজি দুইভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথমটির নাম ‘তাঞ্জুর’ এবং দ্বিতীয়টির নাম ‘কাঞ্জুর’। তাঞ্জুরে আছে সাড়ে তিন হাজার বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থের অনুবাদ আর কাঞ্জুরে রয়েছে বুদ্ধের বাণী সম্বলিত এগারোশো আটটি গ্রন্থ। অতীশ দীপঙ্করের লেখা গ্রন্থগুলির সবগুলো এখনও তিব্বতী ভাষায় অনূদিত হয়ে ‘তাঞ্জুর’ সংকলনে রয়েছে। ভারতবর্ষে পরবর্তী বিদেশী শাসনের কালে সংস্কৃতে লেখা এই অমূল্য গ্রন্থরাজি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। আধুনিক যুগে তিব্বতী অনুবাদ থেকে ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমেই ইতিহাসকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়েছে। অন্ধকারের শাসকদের উদ্দেশ্য বিফল হয়ে গেছে। অতীশ দীপঙ্কর রক্ষা পেয়েছেন বিলুপ্ত হওয়ার হাত থেকে।

গ্রামীণ মেলা সংস্কৃতিতে প্রবহমান সময়ের ছাপ

তপন রুদ্র

গ্রাম ও গ্রাম জীবনের আচার, ঐতিহ্য, জীবিকা, বিনোদন, সুখ-দুঃখ ইত্যাদি নিয়েই আমাদের সার্বিক পরিচয়ের ইতিবৃত্ত রচিত হয়েছে। ‘গ্রাম্যতা’ আপাতদৃষ্টিতে একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গীর নাম। আমরা অনেক সময় আক্ষেপ করে বলে থাকি আমাদের জীবনবোধ ও জীবনাচার অদ্যাবধি গ্রাম্যতায় আচ্ছন্ন। অর্থাৎ গ্রাম্যতা মানে পশ্চাৎপদতা, গ্রাম্যতা মানে সংস্কৃতিহীনতা, গ্রাম্যতা মানে নিরক্ষরতা ইত্যাদি নানা ধরনের হতাশা বা অক্ষমতা বলতে যা বুঝি তার জন্য দায়ী কেবল ঐ গ্রাম্যতা। এমনকি গ্রামের টাউট-বাটপার ও শোষক মহাজন শ্রেণী যে বর্বর কালচার ধারণ করে, তাকেও প্রকারান্তরে ঐ গ্রাম্যতা নামেই অভিহিত করি। আসলে এতে যে আমাদের অমার্জনীয় অহংকার ও অজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে তা আমরা ভেবে দেখি না।

প্রকৃত অর্থে গ্রাম্যতা একটি মহান সরলতার নাম। গ্রামীণ জীবনে আবহমান কাল ধরে যে গৌরবময় শিষ্টাচার, উদার আত্মীয়তা, ভ্রাতৃত্ব এবং সৃষ্টিশীল কর্মযজ্ঞের নানা অকৃত্রিম উপাচার আজও অস্তিত্ব বজায় রেখে চলেছে সেইসব আকরে ধরেই আমাদের গ্রাম্যতার ভিত্তি ও প্রকৃতি রচিত হয়ে আসছে। অতএব গ্রাম্যতাই আমাদের আদি সংস্কৃতি। আমাদের সার্বিক চেতনা, শখ, প্রবণতা এবং জীবিকার সিংহভাগ যাগযজ্ঞ সকল প্রকার গ্রাম্যতার উৎসের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। ধর্মীয় সহনশীলতা এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রেক্ষিত যা বর্তমান প্রজন্মের কাছে একান্তভাবে কাঙ্খিত- তাও আমাদের গ্রাম্যতারই এক মহান নির্দেশ। আমাদের সকল গ্রামীণ লোকাচারে সাম্প্রদায়িক ঐক্য ও সম্প্রীতির বর্নীল প্রতিফলন ঘটে থাকে। তবে এক্ষেত্রে উদ্দেশ্যমূলক এবং কৃত্রিম স্বক্রিয়তার তুলনায় আন্তরিকতা ও স্বতস্ফূর্ততাই অনেক বেশী লক্ষ্যণীয় এবং কার্যকর।
তাই আমাদের গ্রাম্যতা আমাদের পাথেয় হয়ে থাক। তথাকথিত নগর সভ্যতা যতই বিস্তৃত হোক, প্রযুক্তিনির্ভর যান্ত্রিক সভ্যতা যতই ঝলমলিয়ে উঠুক, আমাদের সরল গ্রাম্যতার মহান আবেদন ফুরিয়ে যাবার সময় আসেনি এখনও, তা আমরা হলফ করে বলতে পারি। আমাদের এই দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করার যে জোর আমাদের অন্তর থেকে পাই তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হল আমাদের চিরন্তন মেলাসংস্কৃতি। আমরা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক শিল্পমেলার কথা জানি, অনেক বড় মাপের বাণিজ্যমেলার কথা শুনে থাকি বা ওসব দেখেও থাকি। কিন্তু সেগুলো আমাদের মূল সংস্কৃতির সাথে গ্রথিত নয়। আমাদের যে মেলাসংস্কৃতি অতি পুরাতন এবং অতি তাৎপর্যময় তা একান্তভাবে আমাদের চিরাচরিত গ্রাম্যতার উপর নির্ভরশীল। তাই শুধুমাত্র মেলা নয়, গ্রাম্যমেলাই হল আমাদের মেলাসংস্কৃতির প্রকৃত প্রতিচ্ছবি।
বাঙালিরা মেলাপ্রিয়। মেলার প্রতি আসক্তি আমাদের এক অতি প্রাচীন প্রবৃত্তি। আমাদের আড্ডাপ্রীতি, বন্ধুপ্রীতি, রসনার বিলাসপ্রীতি এবং সমাবেশের জন্য আয়োজনপ্রীতির মত অসংখ্য সৌখিন অনুভূতি যেন স্বশরীরে বহুমুখী ও বহুবর্ণের এক মিশ্র অস্তিত্ব ঘোষণা করে মেলার আঙ্গিকে। প্রতিটি গ্রাম্যমেলায় আমরা তাই খুঁজে পেতে পারি আমাদের যত আন্তরিক ও মনস্তাত্বিক সত্যতা।

গ্রাম্যমেলা আমাদের প্রাচীন ভাবধারা, চিরায়ত বিশ্বাস এবং আমাদের সর্বকালের জীবনচর্চার নানা উপাদান বহন করে। তাই এই বিশেষ সাংস্কৃতিক ধারার বিকাশ বহুযুগের ক্রমবিবর্তিত এক মহাপরিণতি। গ্রাম্যমেলার যে প্রাণময় রূপ ও নানামুখী বৈশিষ্ট্য আমরা প্রত্যক্ষ করে আসছি তা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোন আকস্মিক ঘটনা নয়। ক্রমঅগ্রসরমান মানব ইতিহাসের নানা পর্যায়ে গ্রাম্যমেলার প্রকৃতি ও আদল গড়ে উঠতে সহায়তা পেয়েছে। এই সহায়তা এসেছে মূলত: শ্রমজীবী, কৃষক ও নানা শ্রেণীর মজুর সম্প্রদায়ের কাছ থেকে। তাদের সৃজনী শক্তি, তাদের চাহিদা, তাদের বিনোদন এবং তাদের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন এক কল্যাণকর বাণিজ্যনীতিই গ্রাম্যমেলার অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছে। প্রথম সহস্রাব্দের দ্বিতীয় ভাগ অর্থাৎ খ্রিস্টিয় ৬ষ্ঠ শতাব্দী ও তার পরবর্তি পাঁচশত বছর আমাদের মেলাসংস্কৃতি বিকাশের একটা উপযুক্ত কাল বলে অনুমান করা হয়ে থাকে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ড. নীহাররঞ্জন রায় রচিত বাংলার ইতিহাসের বেশ কিছু অধ্যায়ে এমন ইঙ্গিত মেলে। ইতিহাসের ঐ সুবিস্তৃতকালকে বাংলার মধ্যযুগ-পূর্ব অধ্যায় বলে গণ্য করা হয়। পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ, এমনকি অষ্টাদশ শতকের অধিকাংশ বছরগুলিকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসের মধ্যযুগ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। তবে প্রকৃত বিচারে আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় ভাগে ১৮৫৭ সালে সংগঠিত বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঐতিহাসিক সিপাহী বিদ্রোহের পর থেকে সূচিত হয়। মধ্যযুগ বলে চিহ্নিত ইতিহাসের সেই বিস্তৃত পরিসরকে আমরা বড় বেশী প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখি না। আমাদের পূর্বসূরী বহু খ্যাতিমান ঐতিহাসিক, লেখক-বুদ্ধিজীবী কথিত মধ্যযুগের দিনগুলিকে সবচেয়ে অন্ধকার কাল বলে অভিহিত করেছেন। আমরাও সেই সুরে গলা মিলিয়ে প্রায়ই একই কথা বলে থাকি। তবে নানা ঐতিহাসিক প্রমাণ ও পুরাতাত্বিক নিদর্শনের বিপরীতে এক নীরব অথচ আলোকিত অধ্যায়ের বিশ্বস্ত আভাষ দিয়ে যায়। আমরা যদি কুমিল্লায় অবস্থিত ময়নামতির বৌদ্ধ বিহার, বগুড়ায় মহাস্থানগড় এবং জয়পুরহাটে অবস্থিত পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহারের সমস্ত নিদর্শন, ধংসাবশেষ এবং পুরোনো নিদর্শনগুলো গবেষণামূলক মনোভাব নিয়ে বিচার করে দেখি, তাহলে যা আবিষ্কার করতে পারি, তা থেকে আমাদের অপরাপর সাংস্কৃতিকধারা বিকাশের সঠিক কাল ও কালীক পরিসরে সেগুলোর উল্লেখযোগ্যবৈশিষ্ট্যও সন্ধান করে দেখতে পারি। বাংলাদেশের বাইরে, বিশেষ করে ভারতের পশ্চিম বাংলায় সংরক্ষিত নানা প্রতœতাত্বিক নিদর্শন ও সূত্র থেকেও আমরা বাংলার লোকাচার ও গ্রামীণ সভ্যতার বিবর্তনের অজস্র উপাত্ত সংগ্রহ করতে পারি। এরমধ্যে উল্লেখ্য অনেক নমুনা সংরক্ষিত রয়েছে উত্তর জনপদের অন্যতম এক পুরোনো জেলা শহর কুচবিহারের মহারাজার দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদে বর্তমানে যেটি সরকার পরিচালিত একটি মস্তবড় যাদুঘর।

স্মৃতিসংরক্ষণকারী যাদুঘর কিংবা কোন দুর্গ-প্রাসাদ অথবা হিসাব-কিতাবের ধ্বংসাবশেষ যাই আমরা ইতিহাসের আলোকে গবেষণা করে দেখি না কেন, অবশ্যই আমরা সবকিছুতেই প্রাচীন গ্রাম্য জীবনধারার কোন না কোন সূত্র খুঁজে পাব। যেসব ধংসাবশেষ, যাদুঘর অথবা, পুরাকীর্তির কথা উল্লেখ করা হল তা থেকে প্রমাণিত হয় বাংলাদেশের গ্রাম্যমেলার বয়স দেড়হাজার বছরেরও অনেক বেশী। এই মতের অনুকূলে অবশ্যই বিস্তর যুক্তি আছে। তার উপর কিঞ্চিত আলোকপাত এভাবে করা যায় :
বাংলার পুরাকীর্তির নিদর্শন হিসাবে আমরা যেসব মাটির তৈরি থালাবাসন, বাদ্যযন্ত্র এবং মূর্তির নমুনা পাই, প্রমাণিত হয়েছে যে সেগুলো মোটামুটিভাবে ৭ম থেকে শুরু করে ১৮শ শতকের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। আমরা জানি যে কৃষিপণ্য ছাড়াও কারিগরি শিল্প (যে পর্যায়েরই হোক), নানা প্রকার কুটির শিল্প, পোড়ামাটির তৈরি অসংখ্য সামগ্রী এবং সৌখিন খাদ্যসামগ্রী যে কোন লোকজ মেলার প্রধান আকর্ষণ ও উপভোগের অবারিত স্থল। কারিগর, শিল্পী এবং কর্মীরা অবশ্যই তাদের উৎপাদিত পণ্যের ক্রেতা আকর্ষণ করার চেষ্টা করে থাকে- যা সর্বকালেই সত্য। যে কালে সুনিয়ন্ত্রিত বাজার পদ্ধতি চালু ছিল না, সেই যুগে অর্থাৎ মধ্যযুগের প্রারম্ভে একান্ত কেনাবেচা ও বিনোদনের সুবিধাজনক কেন্দ্র সৃষ্টির তাগিদ থেকেই গ্রামবাংলার মানুষ মেলা অনুষ্ঠানের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে সঙ্গত কারণেই এসে পড়ে স্থান নির্বাচন, সুবিধাজনক সময় নির্ধারণ, উপলক্ষ্য নির্ধারণ এবং নেতৃত্ব নির্বাচন। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না মেলাসংস্কৃতির উদ্ভব ও বিকাশের সাথে আমাদের সার্বিক সমাজ কাঠামো কতটা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ থেকে আরও অনুধাবন করা যায় গ্রাম্যমেলার বিকাশ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অস্তিত্বের সাথে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ।

গ্রাম বাংলার মানুষ মেলায় যেতে ভালোবাসে, মেলায় অংশ নিতেও ভালোবাসে। অনেক পেশাদার শ্রেণী ও কর্মী তাদের জীবিকার জন্য অনেকাংশে মেলার ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল। তাই মেলা ভেঙ্গে গেলে কিংবা মেলা কোন কারণে বন্ধ হয়ে গেলে এদেশের সাধারণ মানুষ বড় বেশী কষ্ট পায়, তাদের অর্থনৈতিক সমস্যাও বেড়ে যায়। বাংলাদেশের সকল জেলায় একই ব্যাপার। মেলার ব্যাপারে কোন প্রকার ব্যতিক্রমী বা নেতিবাচক নীতি কোন জেলার গ্রাম্যমানুষ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না।

আমাদের দেশের গ্রাম্যমেলার নাম, উপলক্ষ্য, তার প্রকৃতি, তার অর্থনৈতিক পটভূমি, তার সামাজিক ও ধর্মীয় গভীরতা ইত্যাদি এতই বিচিত্র যে কোন ক্ষুদ্র বা সীমিত পরিসরে এর সার্বিক চিত্র তুলে আনা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। তারপরেও সচেতন ও দেশপ্রেমিক বাঙালি মাত্রই সারা দেশের গ্রাম্যমেলা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখতেই পারেন। আমরা মনে করি এতদ্বিষয়ে একটা সম্যক ধারণা সচেতন ও সুশিক্ষিত মহলকে নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই রাখা অত্যন্ত জরুরী। কারণ দেশের প্রতিটি গ্রাম্যমেলায় আমাদের প্রকৃতি ও সার্বিক পরিচয়ের কিঞ্চিৎ প্রতিফলন অনিবার্যরূপেই ঘটে যেতে বাধ্য। গ্রাম্যমেলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথা ঐতিহ্যগতবৈশিষ্ট্যগুলো মোটামুটিভাবে নিম্নরূপ :
(ক) গ্রাম বা শহরতলীর প্রচলিত হাট-বাজার থেকে কিছুটা দূরের নির্ধারিত খোলামাঠ।
(খ) নদী-খাল কিম্বা বড় বড় পুকুরের ধারে অধিকাংশ মেলার স্থান দেখতে পাওয়া যায়। সেই সাথে থাকে একটি অথবা কয়েকটি বৃত্তান্তমূলক বড়-অশ্বথ কিম্বা পাকুর গাছ।
(গ) প্রাচীন কোন মন্দির, ঐতিহাসিক কোন স্থাপনা, এককালের রাজা জমিদারদের খাজনা বা কর আদায়ের নিমিত্তে নির্মিত ভবন বা কমপ্লেক্সের অদূরে কোন সুবিধাজনক স্থান।
(ঘ) বিভিন্ন প্রকারের কৃষিজাত পণ্য ও কৃষি উপকরণ প্রাপ্তিযোগ্য স্থান।
(ঙ) কিংবদন্তি ও পৌরাণিক কাহিনীসমৃদ্ধ আকর্ষণীয় স্থান।
(চ) কামার-কুমোর-তাঁতি ও বাঁশ-শিল্পের কারিগর অধ্যুষিত গ্রাম।
(ছ) অসংখ্য ধরনের মিষ্ট-দ্রব্যের সমাহার; যেমন-মুড়কি, মোয়া, জিলাপি, নারু, খিড়, সন্দেশ, রসগোল্লা, চিনি ও গুড়ের বাতাশা, নানা প্রকারের ছাতু, ফলমূল, দই-চিড়া ইত্যাদি সেই সাথে পান-শুপারী, গুণ্ডি, তামাক ও নানা ঔষধি-সামগ্রির ব্যাপক উপস্থিতি।
(জ) অসংখ্য বিনোদনমূলক উপাচার; যেমন-ঘুড়ি ওড়ানো, সার্কাস, পুতুলনাচ, ম্যাজিক, গুটি খেলা, লাঠিখেলা, যাত্রাগান, পালাগান, পুঁথিপাঠ ইত্যাদি।
(ঝ) বাহারী নানা রঙের চুড়ি, ফিতা, আয়না, চিরুনি, পুতুল, সিঁদুর এবং রকমারি গ্রাম্য-প্রসাধনী ইত্যাদি।
(ঞ) বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও বিনোদনমূলক নানা ধরনের প্রাণী; যেমনÑ বানর, হরিণ, হাতী, ভল্লুক ইত্যাদি প্রদর্শনী অথবা বিক্রির জন্য আমদানি।
(ট) মেলার সময় ও দিন নির্ধারণে ধর্মীয় তিথি অনুসরণ করা হয়। বিশেষকরে চন্দ্রের অবস্থানগত ক্ষণ বা তিথি এক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়।
(ঠ) মহরম মাসে কারবালার ঐতিহাসিক ফোরাত নদীর তীরে সংগঠিত হযরত ইমাম হোসেন (র:) ও তাঁর আত্মীয় পরিজনের বিয়োগান্ত ঘটনার দিনক্ষণ অনুসারে তাজিয়া প্রদর্শনী ও সেই সাথে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। মহররমের মেলার অধিকাংশ উপাদান অপরাপর গ্রাম্যমেলায় দেখতে পাওয়া বিভিন্ন উপাদানেরই অনুরূপ।
একটি কথা বলতেই হয়, রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় এবং বিভিন্ন ধনী দেশের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের যে সকল বাণিজ্যিক মেলা রাজধানী ঢাকা, বন্দর নগরী চট্টগ্রাম কিম্বা শিল্পনগরী খুলনায় জমকালো কলেবরে এবং আলো ঝলমল আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে, সেগুলো বাদে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত প্রায় সব ধরনের মেলাকেই আমরা গ্রাম্যমেলার পর্যায়ে ফেলতে পারি।বৈশিষ্ট্য্য ও ফলাফলের মাপকাঠিতে এটা জোর দিয়ে বলা যায় বলে আমরা বিশ্বাস করি।

গ্রাম্যমেলা একটি ক্রম বিকশিত বিষয় হলেও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নানামুখী নতুন প্রবণতা ও উপাদান যুক্ত হওয়ায় গ্রাম্যমেলা তার আদি অবস্থায় টিকে থাকতে পারছে না। সেই সাথে উঠতি ধনীকশ্রেণী, নতুন স্বভাবের মাতব্বর ও স্বার্থান্বেষী নিয়ন্ত্রক-গোষ্ঠীর উদ্ভব এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অল্প-বিস্তর প্রসার গ্রাম্য সমাজ কাঠামোর সনাতনী রুটি, ভাবধারা ও কর্মকাণ্ডের গতি প্রকৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে কখনো বা সংকীর্ণ কূপমণ্ডুুক দৃষ্টিভঙ্গীর উগ্র বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, মুনাফা লোভী এক ধরনের বাজারী দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন ঘটছে। সেই সঙ্গে অতি আধুনিকতার নামে অতীত বর্জনের এক খেয়ালী ও অজ্ঞ মনোভাব গ্রাম্যমেলার উদ্দেশ্য ও ঐতিহ্যকে লাঞ্ছিত করছে। এসবের প্রধান প্রধান লক্ষণ যা, তা’হল মেলাকে বিশেষ কোন সম্প্রদায়ের একান্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান বলে চিহ্নিত করার হীন চেষ্টা, মেলা অনুষ্ঠানের সুযোগে বিপুল পরিমাণে অর্থ রোজগারের আশায় হাউজি, জুয়া, ব্লু-ফ্লিম প্রদর্শনী, অবাধে মদ বিক্রী, যাত্রার নামে নগ্ন নৃত্য প্রদর্শনী, রাজনৈতিক ক্যাডারদের দ্বারা প্রভাববিস্তারকারী নানা প্রকার অপকর্ম ও সন্ত্রাস ইত্যাদি। সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার একটা সর্বগ্রাসী আশংকা গ্রামীন মেলাসংস্কৃতির চেতনাকে দ্বিধাগ্রস্থ করছে বলেও প্রতীয়মান হচ্ছে। আর সবচেয়ে হতাশার দিক হল কামার, কুমার, তাঁতী ও বাঁশের যারা কারিগর- তাদের হাতের তৈরি শখের বস্তু কিম্বা প্রাত্যহিক জীবনে অতি প্রয়োজনীয় সামগ্রীগুলোকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। তার জায়গায় ক্রমেই চলে আসছে শহর বন্দরে নির্মিত চোখ ধাঁধানো ঠুনকো সামগ্রী। এতে করে গ্রাম্যশিল্পী ও কারিগরশ্রেণী হতাশ হয়ে মেলা বিমুখ হয়ে পড়ছে। তাই মেলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও তার আদল বাঁচানোর তাগিদ সচেতন দেশপ্রেমিক সকলকে অনুভব করতেই হবে। বঙ্গীয় সমাজ-প্রেক্ষিতকে যথাযথভাবে ধারণ ও মূল্যায়ন করার স্বার্থে আমাদের চিরাচরিত ধারা মেলা কালচারকে উৎসাহিত করার বিশেষ প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে।

তবে বর্তমান প্রেক্ষিত যাইহোক, সারা দেশ জুড়ে গ্রাম বাংলার মানুষের ঐক্যবদ্ধ চেতনার মহিমা নিয়ে এখনও এরকম অসংখ্য গ্রাম্যমেলা বছরের বিভিন্ন সময়ে নির্মল আনন্দ ও বিচিত্রভাবে বাঁচার প্রত্যয়ী উদ্দীপনা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এসব মেলার প্রকৃত সংখ্যা ও তার নৃতাত্ত্বিক ইতিহাস সঠিকভাবে জানাও সম্ভব হচ্ছে না। কারণ সেই বিশাল গবেষণামূলক কাজটি আমরা সমাপ্ত করতে পারিনি আজও। তবে আমরা বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য মেলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও ইতিহাস বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি। সেই অবকাশে এই পর্যায়ে কিছু বিখ্যাত মেলার নাম উল্লেখ করতে পারছি।

একেবারে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বুকে দ্বীপ মহেশখালি। কক্সবাজার জেলার এই মহেশখালি দ্বীপে আদিনাথের প্রাচীন মন্দিরসংলগ্ন বিশাল এলাকা জুড়ে বিশেষ তিথিতে আদিনাথ মেলার অনুষ্ঠিত হয়। প্রচুর লোকসমাগমের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত এই মেলায় বিদেশী পূণ্যার্থীরাও ভীড় জমায়। এই মেলা উপলক্ষ্যে সরকারি উদ্যোগে বিশেষ লঞ্চ সার্ভিসের মাধ্যমে দর্শনার্থীদের সহযোগিতা দান করা হয়। ঢাকার অদূরে নারায়নগঞ্জের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে চৈত্র মাসে জগত বিখ্যাত লাঙ্গলবন্দ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সকল সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এই মেলার বহুমুখী গুরুত্ব আছে। তবে এর সূচনা ও প্রেক্ষাপট নিয়ে সর্বজনবিদিত একটি পৌরাণিক কাহিনী আছে। মহাভারতে উল্লেখিত দ্বাপর যুগে ভগবানের কথিত অবতার শ্রীকৃষ্ণের বড় ভাই শ্রীবলরাম এই মেলার সূচনাকারী বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। এই বিশ্বাস একটা ধর্মাশ্রয়ী অনুভূতি প্রসুত হলেও প্রকৃত কাহিনীটি সকলেই বেশ উপভোগ করে থাকেন। এতে বলা হয় শ্রীবলরামের আর এক নাম হলধর। হল অর্থাৎ লাঙ্গল। লাঙ্গল ছিল তার প্রধান প্রহরণ বা আত্মরক্ষাকারী অস্ত্র। এর একটা রূপক বিশ্লেষণ আছে। তবে আমরা সেদিকে যাবো না। সেই হলধর বলরাম এক সময় ভ্রমণ করতে করতে সৌতকী ঋষির আশ্রমে যান। সেখানে তিনি দেখলেন ঋষি নেই। তার প্রধান শিষ্য একজন নিচুশ্রেণীর সুতপুত্র। সেই সুতপুত্র তার অর্জিত জ্ঞানের গরিমায় তার নির্দিষ্ট আসন থেকে নেমে এসে হলধরকে সমাদর জানাতে কুন্ঠাবোধ করলেন। এতে শ্রীবলরাম ভয়ানক রুষ্ট হন এবং তার হাতের বিশাল লাঙ্গল দিয়ে টেনে নিয়ে সুতপুত্রের মুণ্ডু কেটে তাকে হত্যা করেন। এর ফলে একজন তপস্যী হত্যার মহাপাপ তার উপর বর্তায়। সেই পাপের ফলে সেই বিশালাকায় লাঙ্গল তার অঙ্গের সাথে কঠিনভাবে লেগে যায়। ফলে ঘুমে কিংবা জাগরণে সবসময় তাকে সেই লাঙ্গলের ভার বহন করতে হচ্ছিল। তিনি সেই পাপমুক্তির উপায় নিয়ে বিভিন্ন সাধু সিদ্ধপুরুষদের সাথে বাক্যালাপ করতে বাধ্য হন। তাঁদের পরামর্শে শ্রীবলরাম লাঙ্গল কাঁধে বিভিন্ন তীর্থ পরিভ্রমণ এবং বিভিন্ন নদীতে পূণ্যস্নান করেন। পরিশেষে তিনি বহু বছর পর অধুনা বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জের যে এলাকায় অষ্টমীর মেলা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে আসেন এবং সেই এলাকাসংলগ্ন নদীতে পূণ্যøান করেন। তারপর সেখানে তিনি অনেক দান করেন এবং নিজের পাপকর্মের কথা স্মরণ করে অনুশোচনা প্রকাশ করেন। এর ফলে সঙ্গে সঙ্গে তার পাপ পুরোপুরি লাঘব হয় এবং তার শরীর থেকে বিশাল সেই লাঙ্গলটি খসে পরে। এতে বলরাম খুশীতে আত্মহারা হন এবং স্বীয় উদ্যোগে সেখানে পূণ্যস্থান এবং সাধারণ মানুষের হীতার্থে সেখানে (উল্লেখিত তীর্থে) মেলা অনুষ্ঠানের প্রচলন করেন।

লাঙ্গলবন্দের প্রাচীন মেলায় দেশ বিদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতি বছর পরিদর্শন করতে ভীড় জমায়। ধর্মীয় মোড়ক এখানে যতই দৃঢ় হোক, আসলে এই বিশাল মেলায় সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে গ্রাম্য চেতনা ও গ্রামীণ উপাদান- পুতুলনাচ, ঘুড়ি ওড়ানো, সার্কাস, পালাগান ও ব্যবহার্য নানা দেশী পণ্য। বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় কুমারখালিতে মাসব্যাপী কালীর মেলার কথা সকলেই জানে। এখানকার আকর্ষণ গ্রামীণ তাঁতশিল্প। তাছাড়া মাটির তৈরি হাড়িপাতিল, বাসন-কোসনসহ শিশুতোষ নানা সামগ্রী এই মেলার প্রধান আকর্ষণ।
রাজধানী শহর ঢাকার উপকণ্ঠে ধামরাই একটি প্রসিদ্ধ এলাকা। শতাব্দীপ্রাচীন এই প্রসিদ্ধির অন্যতম কারণ এখানকার রথযাত্রার উৎসব ও তাকে ঘিরে বিশাল মেলা। এই একই উপলক্ষে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যেমন বরিশাল, ফরিদপুর ও যশোরেও জাঁকজমকের সাথে মেলা উৎসবের মস্ত আসর বসে। লোকজ নানা পসরা গ্রামীণ জনপদের মানুষ সেখানে কেনাবেচা করে।

উত্তরবঙ্গের অন্যতম শস্যাগার হল দিনাজপুর জেলা। বৈশাখ মাসে অনুষ্ঠিত কান্তজীর মেলা এখানকার এক প্রাচীন ঐতিহ্য। এই মেলাকে নিয়ে নানা জনশ্র“তি ও কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। কাটারিভোগ ধানের সুগন্ধি চিরা, ঐতিহ্যবাহী এর পোড়ামাটির কলকি, সন্দেশের সাজ ও থালা-বাসন এই মেলার লোভনীয় আকর্ষণ। তবে উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর অন্যতম কুড়িগ্রাম জেলার বিচিত্র ধারার এবং বিভিন্ন নামের আঞ্চলিক মেলাগুলো সত্যিই উল্লেখ করবার মত। জেলার দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদ-সংলগ্ন বন্দর চিলমারীর সুপ্রাচীন অষ্টমীর মেলা- যাকে বারুনির মেলাও বলে। এরপর দারুণভাবে উল্লেখ করা যায় নাগেশ্বরী উপজেলার মাদাইখালের উৎসব মুখর কালির মেলার কথা ও পাটেশ্বরী ঘাটসংলগ্ন শুয়োরডুবির মেলা।

শেষোক্ত এই নামের মধ্যেই উক্ত মেলার প্রচলন সংক্রান্ত একটি বহুল প্রচারিত জনশ্রুতি চালু আছে। ধরলা বেষ্টিত কাচির চরে শতাব্দী প্রাচীন কালির পাট (কালিপূজার জন্য নির্ধারিত উঁচু স্থান) জাতী ধর্ম নির্বিশেষে সকল গ্রামবাসীর কাছে অত্যন্ত পবিত্র স্থান বলে গণ্য হত। সেখানে কালিমুর্ত্তির পাশে রাজা ঘাটিয়াল নামে স্থানীয় ভিত্তিতে এক দেবতার অস্তিত্ব মানা হত। ঘাটিয়াল কথার অর্থ নদী নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা। রাজা ঘাটিয়াল মানে (স্থানীয়ভাবে) জলদেবতা। যাকে সন্তুষ্ট না করলে নদী ভাঙন রোধ করা যাবে না। কালি ও রাজা ঘাটিয়ালকে পূজা দেয়ার পাশাপাশি সেখানে মেলা বসত। কিন্তু একবার মস্তবড় একটা শুয়োরের পাল নদীতে জল পান করতে গিয়ে ঘন পাকে পড়ে যায় এবং একই সাথে দুই তিনশ শুয়োর ঘূর্ণীপাকের টানে পানিতে তলিয়ে যায়। সরল মানুষের মধ্যে বিশ্বাস বা ভয় জন্মে যে, সেই ঘূর্ণীপাকে কোন এক অপদেবতা বাস করে। মুণ্ডুহীন, কালো কুচকুচে এই অপদেবতার বুকে বড় বড় দাঁত, চোখ এবং রক্তলোলুপ মস্ত জিভ সবসময় লকলকিয়ে থাকে। সেই অপদেবতার নাম ‘মাষান’; তাকে বিরক্ত করায় এবং পূজা না দেয়ায় সে অতগুলো শুয়োরকে একবারে গিলে খেয়েছে ইত্যাদি। সেই ভয়ে গ্রামের মানুষ মাষানের কথিত ভয়াল ও কদাকার মূর্তি বানিয়ে তাকেও পূজা করতে শুরু করে এবং নতুন আঙ্গিকে মেলা উদযাপন শুরু করে। অবিভক্ত ভারতে এই মেলার আয়োজনে ব্যাপক জৌলুস ও বৈচিত্র্য ছিল অনেক বেশী।

অতএব আমরা গর্ব করে বলতে পারি, গ্রাম্যতা মানে কোন অর্থহীন, ভিত্তিহীন কিম্বা দর্শনহীন সামাজিক অবস্থান নয়। আমাদের গ্রামীণজীবন তার স্বকীয়বৈশিষ্ট্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে ভালোবাসে। হাজার বছরের লালিত আবেগ, বিশ্বাস ও পারস্পরিক মমত্ববোধ গ্রামবাংলার সত্যিকারের প্রাণ। অন্ততঃপক্ষে আমাদের গ্রাম্যমেলাগুলোর উৎসবি আঙ্গিক ও প্রেরণার উৎস সেই স্বাক্ষ্যই বহন করে।

এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজনের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা বিশেষ প্রয়োজন আছে। ১৯৭১ সালের গৌরবময় ও চিরকাক্সিক্ষত স্বাধীনতা লাভের পর থেকে দেশব্যাপী, কি নগর- কি গ্রাম, দুইটি বিশেষ ধারার সার্বজনীন মেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একটির নাম বৈশাখী মেলা, আর অপরটি পৌষ মেলা। এর ঐতিহ্য খুব পুরোনো না হলেও বিগত তিন-চার দশকে এর আঙ্গিকগত রূপান্তর ও ইতিবাচক বিকাশ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও তাৎপর্যময় বলে অনেকের বিশ্বাস।

বৈশাখী মেলা ও পৌষ মেলার মূল চেতনা ও সজ্জা গ্রামীণজীবন ও সংস্কৃতি নির্ভর। কিন্তু এসবের বিকশিত আঙ্গিকে নগর জীবনের হাল ফ্যাশনের বিদগ্ধ কারুকার্যের ছাপ বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। নববর্ষের উদ্দীপনায় বাঙালিপনাকে গভীরভাবে অনুভব করার মানসিকতা নিয়ে গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ পাটশাক, সজিনা চচ্চরি, কচু, ডাল ও মাছের নানাপদ রান্না করে খেতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তেমনই বিশেষ স্থানে সমবেত হয়ে দেশী মনহরা সামগ্রী কেনাবেচা করতেও ভালোবাসে। আবার পৌষ মাসে, যখন ঘরে ঘরে ফসল, বিশেষ করে নতুন ধান উঠে আসে। তখন নানারকম পিঠা-পুলি, পায়েস তৈরিকরা, খাওয়া ও প্রতিবেশীদের মধ্যে বিতরণ করার মত আনন্দদায়ক রেওয়াজ শত শত বছরের পুরোনো প্রথা। আকাক্সিক্ষত নতুন ধানের ভাত- উৎসব আমেজে সকলকে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে নিবেদন করে তা খাওয়ার যে প্রথা- সেখান থেকেই একসময় এসেছিল নবান্ন উৎসবের প্রেরণা। মধ্যযুগের বাংলা কবিতায় তথা পুঁথি-পাঁচালী ও কাব্যে অনুরূপ নবান্ন উৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই উৎসবের আয়োজন বাড়ি ও পরিবারের চৌহদ্দি ডিঙিয়ে উন্মুক্ত প্রান্তরে আপামর জনসাধারণের যৌথ উদ্যোগে ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় যখন বৃহৎ এক সার্বজনীনরূপ লাভ করেছিল- তখনই সেটা ‘পৌষমেলা’ নাম ধারণ করে ইতিহাসে গৌরবের একটি চিহ্ন হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। তবে কি বৈশাখী মেলা- কি পৌষ মেলা, দুইই উপলক্ষেই খাওয়া দাওয়া ছাড়াও ভাব বিনিময়ের নানা উপকরণ যুক্ত হয়ে পড়ে। যেমন: পুঁথিপাঠ, বারিগান, কির্তন, শ্যামা সংগীত, পল্লীগান, মুর্শিদী, ভাটিয়ালী গান এবং নানা প্রকৃতির গ্রাম্যখেলা; যেমন: হা-ডু-ডু, দাড়িয়াবান্দা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ ইত্যাদি। তবে স্বাধীনতার পর সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এই প্রকারের সার্বজনীন মেলা আধুনিক সাহিত্য বা গান নিয়ে আলোচনায় মুখর হওয়া কোন দুর্লভ দৃশ্য নয়। আদিকালের মাটির পুতুলের পাশাপাশি বিদগ্ধ ও সুনিপুণ হাতের তৈরি ভাস্কর্য কিম্বা চারুশিল্প এইসব মেলার আকর্ষণের মাত্রা ভিন্ন গুণেবৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। চিরায়ত কাঁথাশিল্পের পাশাপাশি উন্নত রুচিসম্পন্ন ও শিল্পমানে উত্তীর্ণ বিচিত্র সুচিশিল্প দেশী, এমনকি বিদেশী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকেও মোহিত করে থাকে। বর্তমান ধারার বৈশাখী মেলা ও পৌষ মেলা অন্ধলৌকিক বিশ্বাসবোধ থেকে অনেকাংশে মুক্ত। অন্যান্য বিচিত্র গ্রাম্যমেলা থেকে এদের পার্থক্যটা এভাবে চিহ্নিত করা যায়। সেকুলার বা নিরেট বাঙালি জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বৈশাখী মেলা ও পৌষ মেলা অনেক বেশী সার্বজনীন। গ্রামীণবৈশিষ্ট্য নিয়েও এর নগরায়িতরূপ ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। নাগরিক দৃষ্টিকোণ ও শহুরে উপাদান এই দুই ধারার চিরায়ত আবেদনকে তেমনভাবে ক্ষুন্ন করেনি। তবে সচেতন সাংস্কৃতিক মহল মনে করে মেলা বলতে যা বোঝায় তার প্রকৃত ঐতিহ্যকে কোন ক্ষেত্রেই বিনষ্ট করা কিম্বা তাকে বিকৃত করা কোনভাবেই সঙ্গত নয়।

এবার উপজাতিদের মেলা প্রসঙ্গ। বাংলাদেশে বহু উপজাতি বাস করে। যেমন: পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, লেপচা, ভুটিয়া, মুরং ইত্যাদি। দিনাজপুর, সুন্দরবন ও অন্যান্য স্থানে সাঁওতালদের বাস রয়েছে, তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য মোতাবেক তারাও সুপ্রাচীন মেলাসংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। তাদের জীবনও যে পুরোপুরি গ্রামনির্ভর তা সকলেরই জানা। তাই বিভিন্ন পূর্ণিমা ও অমাবশ্যা উপলক্ষে তারা যে উৎসব ও মেলা আয়োজন করে থাকে তাতে তাদের কৃষি ভিত্তিক গ্রাম্য জীবনের বহুমুখি আবেদন ও বিশ্বাস প্রতিভাত হয়ে থাকে। তাদের ভৌগলিক পরিবেশ, জীবিকার উপাদান ও ধর্মীয় চেতনা ঐসব মেলায় প্রকটিত হয়। পাহাড়ী উপজাতিরা এখনও জুমচাষে অভ্যস্ত। এই বিশেষ ধরনের আবাদ প্রক্রিয়ায় যদি তারা বছরে খোড়াকীটুকু সংগ্রহ করতে পারে তাহলে তারা দারুণ খুশী এবং তখন তারা নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী সমবেত হয়ে উৎসবে মেতে ওঠে। বিশেষ করে বুদ্ধ পূর্ণিমা বা মধু পূর্ণিমায় তারা এমন যৌথ আয়োজন সফল করার কাজে নিয়োজিত হয়। যার ফলে মেলার অনুরূপ এক ব্যাপক লোক-উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে ঐসব পাহাড়ী এলাকায়।

আমাদের আদি ইতিহাসের তথাকথিত নায়ক রাজা বাদশাহদের শাসন শোষণ ও যুদ্ধের অধ্যায়গুলো বাদ দিলে প্রকৃত গৌরবের ও কৃতিত্বের যদি কিছু থেকে থাকে তবে নিঃসন্দেহে তা হল গ্রাম্যমানুষের জীবনসংগ্রাম ও জীবনজিজ্ঞাসা থেকে উৎসারিত এক লোকজ-সংস্কৃতি গভীরতায় ও ব্যাপ্তিতে এ সংস্কৃতি অত্যন্ত বিশাল, গঠনমূলক এবং তাৎপর্যময়। দেশের প্রতিটি অঞ্চলের গ্রাম্যমেলায় সেই শাশ্বত লোকজ সংস্কৃতি বলতে গেলে সকল শাখা, নমুনা ও বৈশিষ্ট্যের বর্ণময় প্রকাশ ঘটতে দেখা যায়। সর্বসাধারণ মানুষের অবারিত ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণেই এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। মানুষের সমষ্টিগত চেতনা ও বিশ্বাস এই গ্রাম্যমেলার তথা লোকজ সংস্কৃতির ভিত্তি ও প্রাণ।
তাই কোন কৃত্রিম বা ধার করা পরিকল্পনা প্রয়োগ করতে গেলে মেলার আবেদন, আয়োজন ও উৎসাহ সংকুচিত হয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিতে পারে। আরোপিত যে কোন কৃত্রিমতা গ্রাম্যমেলার ক্ষেত্রে সংকট সৃষ্টি করতে পারে। যেমনÑ কোন কোন মেলার নির্ধারিত স্থান সংস্কারের নামে, আধুনিক স্থাপনা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়, তখন সেই মেলায় সার্বিক অবয়বে ঐতিহ্যগত সহজ সরল ও খোলামেলা পরিবেশটা টিকে থাকতে পারে না। এমনটা চলতে থাকলে আমাদের আত্মপরিচয় দানকারী গ্রাম্যমেলার ঐতিহ্য সম্প্রসারিত হওয়ার পরিবর্তে সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হওয়ার হুমকি দেখা দিতে পারে। অতএব মেলার জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোকে অত্যাধুনিক আদলে সুবিন্যস্ত করা কিম্বা পাকা স্থাপনায় ভরিয়ে তোলার কোন দরকার নেই। শহর-নগরে মানুষের সাময়িক শখ মিটানোর জন্য সেখানে পিকনিক স্পট গড়ে তোলারও দরকার নেই। সাধারণ আপামর গ্রাম্য জনসাধারণের অংশগ্রহণের সুযোগকে সংকুচিত করা আদৌ কোন মহৎ কাজ নয়, বরং হতে পারে এটা একটা গর্হিত অপরাধ। ফলে আমাদের আকাক্সক্ষা হোক, গ্রাম্যমেলা তার নিজস্ব আদলে সমুজ্জ্বল হয়ে নিজস্ব জায়গায় আমাদের ঐতিহ্যের অনির্বাণ তিলক হয়ে জাতিকে বারবার ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রেরণা দিতে থাকুক।

একটি লক্ষ্য করবার মত বৈশিষ্ট্যের উপর আলোকপাত করে এ আলোচনার যবনিকাপাত করার দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়। সেটা হল, ব্যতিক্রমী কিছু মেলা বাদে উল্লেখযোগ্য গ্রাম্যমেলার মধ্যে অধিকাংশ অনুষ্ঠিত হয় চৈত্র মাসে। এর মাধ্যমে যে বাস্তবতা ও উদ্দীপনাটুকু অনুধাবন করা যায়- সেটা হল বাৎসরিক একটা হিসাব নিকাশ, মহাজনী দেনা শোধ, বিগত একটি বছরের উৎপাদিত পণ্যের মান ও মূল্য যাচাই, সর্বোপরী নববর্ষের প্রাক্কালে নতুন করে সামাজিক জীবন শুরু করার এক জীবনমুখী উদ্দীপনা যেন মেলা আয়োজনকে দারুণভাবে প্রভাবিত করত। আমাদের শ্রদ্ধেয় পূর্বসূরীরা জীবন বিমুখ ছিলেন না। তাঁরা যেমন সৃজনশীল ছিলেন, তেমনই আয়োজন উৎসবে তাঁদের উদ্যোগ ছিল অসীম। তাঁদের যারা উত্তরসূরি অর্থাৎ আমরা কতটা উদ্যোগহীন এবং উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েছি, সেই আত্মজিজ্ঞাসার উত্তর বের করে আনতে হবে। গ্রাম্যমেলার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও তাকে বিকশিত হবার সকল উদ্যোগ নেয়ার সততা অর্জন করা বিশেষ জরুরী। এতে সাহসের দরকার হলে সাহসী হতে হবে আর হতে হবে ইতিহাস সচেতন, হতে হবে দেশ ও জনগণের প্রকৃত হিতাকাংখী। গ্রাম্যমেলা তার আপন গৌরবে বেঁচে থাক।

যে বিশেষ শব্দের উচ্চারণের মাধ্যমে প্রাসঙ্গিক এই ভাবনার একটি আপেক্ষিক সমাপ্তি টানা যেতে পারে; তা হলোÑ প্রতিটি গ্রাম্যমেলার ঐতিহ্যের সাথে পুরোনো বটবৃক্ষ বা পুরোনো অশ্বথ অথবা ঘনপল্লবে দণ্ডায়মান মস্তবড় পাকুর গাছ একান্তভাবে জড়িত। তার পাশাপাশি বড় কোন খাল-পুকুর কিংবা স্রোতস্বিনী নদীর উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। চৈত্রের তাপদগ্ধ পরিবেশে শান্ত, নিবিড় ছায়া আর ‘ঠোঁট শুকানো তৃষ্ণায়’ শীতল জল- এই দুই শাশ্বত প্রয়োজনের কথাও আমাদের গ্রাম্যপূর্বসুরিরা কত গভীরভাবে চিন্তা করতে পেরেছিল। তাই ছায়ার জন্য গাছ আর জলের জন্য খাল-বিল-নদীকে মেলার অপরিহার্য অনুসঙ্গরূপে ভাবা হয়েছিল। গ্রামবাংলার সুপ্রাচীন মানুষদের এই সুচিন্তিত পরিকল্পনাকে যথার্থ মর্যাদা দিতে হবে। বহমান গ্রাম্যমেলার লোকায়ত ধারা আমাদের এই কালের সংকটাপন্ন সমাজ প্রেক্ষিতকে নিবিড় ছায়া ও ক্লান্তিতে একটু জল আজও দিয়েই যেতে পারে।

তথ্যসূত্র :

১. বাংলার ইতিহাস: ড. নীহাররঞ্জন রায়।
২. বিভিন্ন যাদুঘরে সংরক্ষিত পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন ও সেগুলোর বিবরণ এবং
বিশেষজ্ঞের অভিমত।
৩. মোঃ আজিজুল ইসলাম চাষী, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, ভোগডাঙ্গা ইউনিয়ন,
কুড়িগ্রাম।
৪. বিভিন্ন পাঠ্য-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা।
৫. অসংখ্য খেটে খাওয়া সাধারণ গ্রাম্যমানুষ।

তপন রুদ্রের কবিতা : প্রান্তবাসীর দায় ও দ্রোহের প্রগাঢ় পঙ্ক্তি

গীতিময় রায়

বাংলাদেশের মানচিত্রে উত্তর প্রান্তে কবির জন্ম ও বেড়ে ওঠা। জন্ম শহর কুড়িগ্রামেই কবির স্থায়ী নিবাস। উত্তরের সেই জনপদটি মঙ্গাপীড়িত এলাকা হিসেবে মিডিয়ায় সুপরিচিত। কিন্তু অবহেলিত এই মফস্বলে থেকেও স্বদেশ ও সংস্কৃতির প্রতি কতটুকু নিবেদিত ও প্রগাঢ় দায়বদ্ধ থাকা যায় কবি, প্রাবন্ধিক, সংস্কৃতিকর্মী তপন রুদ্র তার উদাহরণ। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে দীর্ঘদিনের চর্চিত কবিতার সংকলন ‘কবিতায় শ্রেণীঘাত’। কাব্যগ্রন্থের প্রকাশক, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী, ঢাকা। প্রান্তবাসী একজন কবির বৈদগ্ধের প্রগাঢ় ছাপচিত্র প্রতিটি কবিতার শরীরে খোদিত।

কবি তপন রুদ্র পেশাগত জীবনে ইংরেজির অধ্যাপক। স্বভাবতই তাঁর মানস চর্যায় কীটস, শেলী, বায়রন, মিল্টন, লরেন্সের উপস্থিতি। তবে কাব্যরস আস্বাদনে তিনি কুণ্ঠাহীন হলেও কার্ব্যচর্চার বিষয় ও প্রকরণগত দিক থেকে তেমন কোনো ইউরোপীয় প্রভাব চোখে পড়ে না। নিজের পরিবারবৃত্ত থেকে প্রিয় স্বদেশভূমি, ঐতিহ্যের কাছে ফিরে আসা, রাজনৈতিক অভিঘাতগুলোর দীর্ঘ বয়ান করেছেন গদ্যছন্দের প্রবহমানতায়। তথ্যের ভারে কখনো কোথাও প্রবহমানতায় ব্যাঘাত ঘটলেও ঋদ্ধ মননের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠে সমবায়ী স্বর। খণ্ড খণ্ড অনেক কাহিনী অভিজ্ঞতার মোড়কে জড়ানো। কাহিনীগুলোতে কখনো কখনো কবির অন্তঃস্থ আমিত্ব ও বাহ্যিক আমিত্বের সহাবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরীহ আমি পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখে। প্রতিটি কাহিনীর পেছনে থাকে আশাভঙ্গের বেদনা। উপাদানগুলো সংগৃহিত হয়েছে সমাজ পরিবার বৃত্তের নানামাত্রিক ঘটনা থেকে। ‘আমি কোনটা নেব’ ‘অন্ততঃ একজন ভাগ্যবানকে চিনি’ ‘বৃষ্টি শারদীয়ার আগে’ কবিতায় ব্যক্তি কবির পরিবারবৃত্তকে চেনা যায়। ‘তবু চাই দীর্ঘজীবন’ ‘মর্ত্যবাসী অমর্ত্যকে দেখা’ ‘অ্যালারমিং হেডলাইন’ প্রভৃতি কবিতায় অনায়াস ভ্রমণ করেন ইতিহাস সভ্যতার স্তর বেয়ে সর্বাধুনিক সময় পর্যন্ত। কবির জন্ম শহর ধরলা নদীর ধারায় স্নাত কুড়িগ্রাম বাংলা ও বাঙালির নানা কীর্তি উজ্জ্বল। পাক সেনাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সম্মুখ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল সেখানে। দেশজ পরবর্তী সবকটি রাজনৈতিক অভিঘাত আছড়ে পড়েছে এই শহরে। এমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় জারিত অনেক পংক্তি পাওয়া যাবে এই কাব্যগ্রন্থে। উদ্ধৃতিযোগ্য:
১৯৫৬ সালে মাইনর ইংলিশ স্কুলে ভর্তি হওয়ার কথা
আরও মনে আছে বেশ, এই শহরে
৫৮ সালে জেনারেল আয়ূবের মার্শাল ল’র কথা
জামার হাতা না গুটিয়ে রাস্তার বাঁ দিক ঘেষে হাঁটা।
একসাথে পাঁচজন না হওয়ার কথা,
ভারতীয় মসলা মাটিতে পুঁতে ফেলার কথা,
নিরীহ বাঙ্গালীদের পরে পরে মার খাওয়ার কথা
শান্তিপ্রিয় হিন্দুদের ভারতীয় চর কিংবা দালাল বানানোর কথা।
(শহর কুড়িগ্রাম ও তিনি)

কবির স্মৃতিতে উজ্জ্বল সেইসব দিনের স্মৃতি যেমনটি, ঠিক তেমনই সাম্প্রতিককালের মফস্বল শহরটিতে যাপিত জীবনের নানা ক্লেদ-কদর্যতাও সেখানে বিধৃত। ‘জিন্নাহ-আয়ুবের প্রেতাত্মাদের’ সন্ধান মিললেও কবির প্রিয় শহরে স্বাধীনতা ও শান্তির স্বপক্ষ শক্তি অটুট। যদিও মঙ্গাপীড়িত এ অঞ্চলে ‘ভোজনে অতৃপ্ত পরিধানে অস্বচ্ছল সেই সব মানুষের বসবাস অনেক বেশি’ এবং সেখানে ‘সস্তায় গৃহবধু-মাতা-কন্যার ইজ্জতের ডালা ভণ্ড বাজারে বিক্রি হতে বাধ্য’। কবি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে উদ্ঘাটন করেন পতনের মূল উৎস ‘রাজনৈতিক লেকচারার’, ‘ভোটনীতিক ডাকাত’-যাদের হাতে সমাজ রাষ্ট্রের রিমোট কন্ট্রোল। কবির দুঃখ ইতিহাস জুড়ে ধর্ম ব্যবসায়ীদের কালোয়াতি, সমাজ জুড়ে দুর্নীতি, ফেন্সিডিল, হেরোইন, সময় জুড়ে লোডশেডিং, ছিনতাই তবুও এমন বিপর্যয়ের মুখেও কবি উপলব্ধি করেন গীতবিতানের ঘ্রাণ, ‘ভোর সূর্য লাল আভায় কামরাঙা দীপ্ত করে রাখে’, তখন ক্ষীণ আশা জাগে।
কবি নিজে একটি উদারনৈতিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। তিনি স,য়ে লক্ষ্য করেন আবাল্য চর্চিত বাঙালি সংস্কৃতির সম্মিলনের সুর বিকৃত, ধ্বংসপ্রায়। সাম্প্রদায়িকতার উত্থান পীড়াকর। হতাশ কবির স্মৃতিতে তখন ভীড় করে আসে মতিন মিঞা, জব্বার শেখ, রহমতুল্লার বাপ যারা বিড়ি খেতে খেতে বলতেন, “পাল মশাই ঠাকুর কিন্তু সুন্দর হওয়া চাই-যাকে বলে এক নম্বর।”-ভাওয়াইয়া গানের কোমল সুরের প্রান্তিক শহর কুড়িগ্রামেও এখন সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্রমপ্রসারমান। সেখানে রহমতুল্লার বাপের বড় অভাব।
ইতিহাস চেতনা কবিতা শরীরে ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে নেবার দায়িত্ব কবির। এলিয়টের কালজয়ী উক্তি: ঞযরং যরংঃড়ৎরপধষ ংবহংব ......ঃৎধফরঃরড়হধষ; - এই কষ্টসাধ্য কাজটির বহুমাত্রিক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন ত্রিশের দশকের কবিরা। আলোচ্য কবিও নাথুরাম গড্সে, গান্ধিজী, হুমায়ুন কবির, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট প্রভৃতি ইতিহাসকে স্থানীয় ঐতিহ্যের সাথে চমৎকারভাবে মিলিয়ে নিয়েছেন। ধরলা পাড়ের ছোট্ট শহর কুড়িগ্রাম ছিন্নভিন্ন হয়েছিল পাকসেনা আর রাজাকারদের হিংস্র থাবায়। একজন সংখ্যালঘুর অভিজ্ঞতায় শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনী শোনান। যেখানে অসহায় ও আর্তনাদে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছিল নারীজীবন।
‘সকলের ভয়, নারীদের ভয় আরো বেশি
তার চেয়ে ভীত শাঁখা পরা হাত সিঁদুর রাঙানো সিঁথি।
‘কবিতায় শ্রেণীঘাত’ কাব্যের অনেক পংক্তিতে ব্রাত্যজীবনের সুখ দুঃখ। নিম্নবিত্ত জীবনের অসহায়তা, অস্তিত্ব সংকটের কথা প্রথম ‘কল্লোল গোষ্ঠী’র লেখকেরাই আধুনিক মনন ও প্রকরণে তুলে আনেন। ঝঁন-অষঃবৎহ বিষয়টি এখন অনেক বেশি নিরীক্ষাধর্মীতায় চর্চিত এবং আদৃত। কবি তপন কুমার রুদ্রের নিম্নবর্গ সমীক্ষার অভিনবত্ব হলো তাঁর শ্রেণী চেতনার সাথে যুক্ত সূক্ষ্ম সাংস্কৃতিক চেতনা। যেমন, ‘সংবাদ আসে ঐ’ কবিতায়-

‘নির্বোধ কদম আলী নখ নেড়ে নেড়ে উদীচীকে বলে,
আমার দেশেতে শুধু সানকি ভর্তি ভাতের দাবীতে
বছরের সব দিনে কত যে শহীদ হ’ল।
বরাত ভাল, তার হিসাব রাখে না কেউই,
নইলে সারা বছর ধরেই যে শহীদ দিবসের কালো পতাকা
উড়াতে হতো তোমাদের।

উদীচীভক্ত এই ব্রাত্যই শুধু নয় তাঁর ‘কুড়িয়ে পাওয়া কবিতার লাইন’ কবিতায় একজন চা দোকানদার পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতার নিমগ্ন পাঠক!

কাব্যগ্রন্থটিতে চিত্রকল্পের নির্মাণে কবির অনায়াস দক্ষতা লক্ষ্য করবার মত। চিত্রকল্পের পুরোটা এজরা পাউন্ডের প্রতিমাবাদ ‘ওসধমরহরংস’ কবিতার শরীর নির্মাণে আধুনিকদের বিশেষ প্রেরণা উৎস। এলিয়টের ‘ক্যাকটাস ল্যান্ডের’ পাশে বিষ্ণুদের ‘ফনিমনসার বন’ কিংবা অমিয় চক্রবর্তীর ‘হারানো অর্কিড’ এর মত জীবননিষ্ঠ অসংখ্য চিত্রকল্পের বহুমাত্রিক প্রয়োগ আমরা পাই। কবি তপন কুমার রুদ্রের ‘কালের ফোয়ারা তলে’ কবিতায় সুররিয়ালিস্টদের ধরনে সময়ধারণার চিত্রকল্পটি স্মর্তব্য। ‘অশ্বত্থের ডালে’র সাথে পাউন্ড কথিত ‘ওহংঃধহঃ ড়ভ ঃরসব’- এর কথা পাঠকের মনে উঁকি দিতে পারে। অলঙ্কার পরিচর্যায় অভিনিবেশ না ঘটলেও সরল কাব্যভাষায়ও কখনো কখনো ভাষা ও উপমার মনোহারিত্ব পাঠককে আশ্বস্ত করবে। ‘মেঘের উন্মাদ চিৎকারগুলো’ (পৃ. ১৯), ‘গোরূলির অসুখ অসুখ ভাব’ (পৃ. ৫২), ‘সন্ধ্যার আকাশ ছুঁতে বেপরোয়া বাতাসের শিং নড়ে ওঠে’ (পৃ. ১০১)- এর মতো সমাসোক্তি অলংকারের অভিনব ও সার্থক নির্মাণ প্রকৃত কবিসত্ত্বার পরিচায়ক। এরকম কয়েকটি পংক্তিতে জীবনানন্দীয় প্রভাবও স্পষ্ট অনুভব করা যায়।

সংলাপ নির্ভর কবিতা রচনায় কবির ঝোঁক লক্ষ্যণীয়। সেক্ষেত্রে সংলাপে যখন আঞ্চলিক উপভাষার গল্প প্রয়োগ ঘটে তখন তা নিঃসন্দেহে বিশেষ মাত্রার যোগ করে। লোকজ সংস্কৃতির প্রতি প্রবল আনুগত্য এসব কবিতায় স্পষ্ট। শব্দ প্রয়োগ নৈপুণ্য এসব কবিতায় পশংসনীয়। ‘আরিস’, ‘খোয়ামো’ (পৃ-৯৮) কিংবা ‘মায়ের থোয়া ন্যাপথলিন’ (পৃ. ৫৩) অংশে ‘খোয়া’ লোকজ শব্দের মতো অনেক অভিনব কথ্যরীতির প্রয়োগ এই কাব্যে পাঠক পাবেন। পাশাপাশি ‘কেতন রতন স্বর্ণ কিরণে শন শন’-এর মতো অপ্রচলিত শব্দ ও ধ্বন্যুক্তিরমতো অপ্রচলিত প্রয়োগ রয়েছে অনেক কবিতায়। রয়েছে অনেক ইংরেজি ও তৎসম শব্দ। অনেক কবিতায় উঁকি দিয়ে যায় কবির ঈশ্বর ও তাঁর ধর্মবিশ্বাস। কাব্যগ্রন্থটিতে বড় অভাব নিটোল প্রেমের কবিতার প্রচলিত প্রেমের কবিতা না থাকলেও একাধিকবার উচ্চারিত হয়েছে সংসারে স্ত্রী প্রেম ও প্রশান্তি। ‘পায়ে চলার ক্লান্তি নিয়ে ফিরে এলে/হয়ত শাঁখা পরা কোমল হাতে নিকোবে/বা নিকোতে চাইবে আমার/ না বলা কষ্টে ভরা মনের চৌহদ্দি/ ‘বালাই ষাট’ কবিতায় এরকম আন্তরিক পঙক্তি আরও আছে। কিন্তু নিশ্চয়ই স্ত্রী ও প্রেমিকা সমার্থক নয়। সেখানেই পাঠকের অতৃপ্তি থেকে যাবে। তবুও সুসংবাদ যে, অবক্ষয়ের, যন্ত্রণাকর সময়ে কোমর জড়ানো চুলের এক রূপকথা নারী বর্তমান কবির সংসারে। গাইসস্থিত কবি প্রেমের স্তব রচনা করেন এভাবে,
‘অথচ জীবন যেখানে এক কালজয়ী সম্রাট/ স্রোতস্বিনীপ্রেম আছে বলে’ (স্রোতস্বিনী)।
সুভাষণ আধুনিক কবিতার শরীর নির্মাণে তেমন দেখা যায় না। ‘কবিতায় শ্রেণীঘাতে’ আমরা অনেক সুভাষণ পাই, যা বস্তুত এই অস্থির, মূল্যবোধহীন সময়ে কবির আর্তিময় প্রার্থনা। কখনো কখনো তিনি সরল সমীকরণে অধ্যাপকীয় ভঙ্গিতে নীতি কবিতা শোনান।
যেমন-
১. উদার বুকে আকাশটাকে দখল কর
উপরে ওঠার যত সিঁড়ি তোমার জন্য হবে বড়।
(উপরে ওঠার আভাস এলো)
বুড়ো ভাব ছাড়ো
জ্ঞানে বিজ্ঞানে, প্রেমে-সজ্ঞানে
মানুষের কাজে লাগো
যুক্তির ধনেÑসাম্যের ছকে
সমাজের সাধ পূণ্য
ভোগে সম্ভোগে জীবনের ধাপে
হবেই অগ্রগণ্য।
(বুড়ো নও বয়সে প্রবীণ হও)

বাংলা কবিতার প্রবহমানতায় এসব রচনা কতটুকু সমকালীন হতে পেরেছে তা হয়তো প্রশ্নসাপেক্ষ কিন্তু মনে রাখতে হবে দুর্বিনীত কালে, নীতিহীন সমাজে এসবই একজন প্রবীণ কবির হৃদয় সংবেদী প্রার্থনা।
আধুনিক বাংলা কবিতার শরীরে নিরন্তর সযত্ন পরিচর্যায় মিথ পুরানের ভাঙ্গাগড়া। ত্রিশের দশক থেকে সমকালের কবিতায় এর প্রয়োগ বহু বর্ণিল। আমাদের কাছে ‘অসম্ভব দ্রৌপদীর শাড়ি’, ‘দময়ন্তী’, ‘জেসন’ প্রভৃতি কালজয়ী মিথ পুরানের নব নির্মাণ হীরক সমান। ফ্রয়েড তাঁর ‘The relation of the poet to the day-dreaming’ বিষয়ক আলোচনায় শিল্পীর মনোজাগতিক নানা রহস্যময়তা ও মিথের প্রয়োগ নিয়ে নানাতথ্যের সন্নিবেশ দেখান। মিথ-পুরানের সাথে আবহমানতার সংযোগ আধুনিকদের প্রিয় বিষয়। কবি রুদ্রের কাব্যেও ইতিহাস-ঐতিহ্যের বৈশ্বিক উপাদান একাধিক। উর্বশী-মেনকার পাশে সাইকি-ভেনাস; হারকিউলিস-সীজারের পাশে বাইবেলের মেজাই সেখানে উপেক্ষিত নয়। কিন্তু ইতিহাস কিংবা প্রত্ন-প্রতিমার বিনির্মাণ কলা আবেদনে কতটুকু সফল তা হয়ত প্রশ্নসাপেক্ষ। কারণ অধ্যাপক কবি তাঁর অধীত বিদ্যার এসব মিথ দিয়ে উদাহরণগত প্রয়োগের বাইরে নতুন ব্যঞ্জনা নির্মাণে অগ্রসর হন নি।
কবি রুদ্রের সুগভীর জীবন অন্বেষা প্রৃকতি পাঠের সাথে মেলানো। কবির সহজাত প্রতিভার সাবলীলতাও সেখানে। উদ্বৃতিযোগ্য পঙ্ক্তি-

ধুকধুকি পাখিটা অবিশ্রাম ঠোঁটে তুলে আনে তৃণ-
তৃণে তৃণে ফুলে ফলে নিষ্পলক উড়াল যে তার।
যখন বাতাস হয় দৃঢ়, উল্লাসে জঠর চায় খাণ্ডব দাহন,
কুণ্ডলী পাকায় যখন কিনরীর ধোঁয় ধোঁয়া মুখ
পাখি ডানা মেলে সে জেগে ওঠে দাঁতে ও নখে।
(অরণ্যতেজ বহমান)

সমাজ বীক্ষণে একজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক হিসেবে কবিকে স্পষ্ট অনুভব করা যায়। ‘সময়ের ডাক’, ‘চ্যানেলে চ্যানেলে বাড়ে চ্যানেল ঈশ্বর’, ‘ওকে ঝিনুকের বুক চিরতে দাও’, ‘ছনু মিয়ার বাজেট ভাবনা’ প্রভৃতি কবিতায় কবির প্রিয় স্বদেশের জন্য হৃদয়ের আর্তির পাশে প্রজন্ম ভাবনা জারিত। স্বদেশ অন্বেষার পাশে আন্তর্জাতিক চেতনাও সেখানে বিধৃত। ‘অ্যালারমিং হেডলাইন’- এ সাম্রাজ্যবাদী আস্ফালনের বিরুদ্ধে তিনি দারুণ সোচ্চার। ইতিহাস সচেতন দায় ও দ্রোহের সে নির্মাণ অভিনিবেশ দাবী করে:

চেতনার দুই ভাগ এশিয়ার কোরিয়ায়
রাশিয়ার গ্রোজনিতে বেসামাল ট্যাংকার
আমেরিকার শিকাগোতে প্রস্তুত বাংকার
রেড লাইট - রেড এলার্ট আরও কত লেখা জোকা
এশিয়ার ঘন শ্বাস দেখে কালো আফ্রিকা
খাটো-কালো-মানুষের যত আয়ন-ব্যয়ন
ক্যালকুলেশন করে নব বিশ্ব-আয়ন
সুদখোর আই-এম-এফ দরজায় ট্যাংক
মাথাকেনা হিসেবে বিশ্বব্যাংক
(অ্যালার্মিং হেডলাইন)

একই মলাটের ভেতরে ৯৪টি কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে যে শ্রমনিষ্ঠতায় কবি ইতিহাস ঐতিহ্যের সন্ধান করেছেন তা অভিনন্দন যোগ্য। বাকপ্রতিমা নির্মাণে তিনি নিজস্ব শৈলী সন্ধান করেছেন। ছন্দবৈচিত্র্য তাঁর আরাধ্য না হলেও কিংবা কখনো অভিজ্ঞতার লম্বা ফিরিস্তির চাপ পাঠককে ক্লান্ত করলেও তাঁর কবিতার অন্তর্লীণ নিবিড় অনুভূতির ক্রমবিস্তার নতমুখ আত্মকথনের নম্রতা, প্রজ্ঞা বিচ্ছুরিত পঙক্তিমালা পাঠককে প্রলুব্ধ করবে। গ্রন্থের নাম কবিতায় উৎকীর্ণ আছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শ্লোগান ‘পৃথিবীর ইতিহাস শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস’, ‘সংবাদ আসে ঐ’ কবিতায় বিশেষভাবে উদীচীর প্রসঙ্গ বিস্তারে কবির সাংস্কৃতিক দর্শনকে চিনতে পাঠকের কষ্ট হয় না।

প্রৌঢ়তায় পৌঁছেও তিনি ক্লান্তিহীন, এতদিনের লালিত আদর্শ ও সেইসব স্বপ্নেরই বীজ বুনেন, ‘আধা ভাঙ্গা চকিটায় শুয়ে শুয়ে স্বপ্নের মহাজনী’ করতেও ভোলেন না। কবির স্বপ্ন আবার ডানা মেলুক নতুন কোনো অনন্য পঙ্ক্তিমালায়।

স্টেনবেকের অফ মাইস অ্যান্ড মেন

রাশেদ উন নবী

অফ মাইস অ্যান্ড মেন উপন্যাসে স্টেনবেক যে সব প্রধান ও পার্শ চরিত্র সৃষ্টি করেছে, আমেরিকায় এখন আর তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিরিশের মহামন্দার দশকে প্রকাশিত এই উপন্যাসের যে প্রেক্ষিত, তা আমেরিকার মানুষ আর কখনো প্রত্যক্ষ করে নি বা করবে বলে মনে হয় না। বরং তারা প্রত্যক্ষ করেছে গণ-উৎপাদন ও গণ-ভোগের অবিরাম প্রবাহ। আমেরিকার বর্তমান প্রেক্ষিতে অফ মাইস অ্যান্ড মেন উপন্যাসের সম্বল ও শিকড়হীন জর্জ ও লেনি বাংলাদেশের ভূমিহীন অভিবাসী কৃষি শ্রমিকের সাথে তুলনীয়। সম্পদশালী আমেরিকানরা জর্জ বা লেনির সাক্ষাত পায় না সহজে, কিন্তু তারা স্টেনবেকের জর্জ ও লেনিকে পছন্দ করে। আমেরিকার বহু স্কুলে অফ মাইস অ্যান্ড মেন পাঠ্য তালিকাভুক্ত উপন্যাস। নানাবিধ কারণেই এই ক্ষুদ্র উপন্যাস বহু আমেরিকান পড়ুয়াদের কাছে জনপ্রিয়, তবে এই জনপ্রিয়তা শুধু আমেরিকান পাঠকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

জন স্টেনবেক বাঙালি পাঠকদের কাছে একটা পরিচিত নাম, কিন্তু তেমন কোনো মহান লেখকের নাম নয়। বেশির ভাগ বাঙালি পাঠক স্টেনবেককে চিনে তার আরেকটা ক্ষুদ্র উপন্যাস দি পার্ল এর মাধ্যমে। সেজন্য আসল উদ্দেশ্যে যাবার আগে স্টেনবেক সম্পর্কে সামান্য ভূমিকা এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। স্টেনবেক সম্পর্কে অবগত পাঠক অবশ্য এই ভূমিকা এড়িয়ে যেতে পারে।

স্টেনবেকের জন্ম কালিফোর্নিয়ার উর্বর স্যালিনাস উপত্যকায়। জীবিকা অর্জনের জন্য সে অনেক কাজ করে; কালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন খামারে কৃষি শ্রমিক হিসাবেও কাজ করে, যার প্রভাব রয়েছে অফ মাইস অ্যান্ড মেন ও অন্যান্য উপন্যাসে। ইংরেজি মেজর নিয়ে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার চেষ্টাও করে। কিন্তু পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে ১৯২৫ সালে নিউ ইয়র্ক পাড়ি জমায় লেখক হবার আকাঙ্খায়। সেখানে নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। উপন্যাসিক হিসাবে অসফল হয়ে আবার ফিরে আসে কালিফোর্নিয়ায়। তার প্রথম তিন উপন্যাস সাহিত্য মহলে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয় নি। এমন কি তার প্রথম উপন্যাস কাপ অফ গোল্ড এর জন্য প্রকাশক তাকে যে ২৫০ ডলার অগ্রিম দিয়েছিল, বই বিক্রি করে সেই টাকাই ওঠে নি। প্রথম সফল উপন্যাস, টর্টিলা ফ্ল্যাট (১৯৩৫) পায় কমনওয়েলথ ক্লাবস গোল্ড মেডাল পুরস্কার। এর পরের উপন্যাস দি গ্রেপস অফ র‌্যাথ পায় পুলিতজার পুরস্কার। এরপরে উত্তরোত্তর সাফল্য পেলেও সম্ভবত লেখক হবার সংগ্রামের পীড়া স্টেনবেকের মন থেকে মুছে যায় নি। যখন সে ১৯৬২ সালে নোবেল পুরস্কার পায়, পুরস্কার গ্রহণের বক্তৃতায় সে বলে: “আমি নোবেল পুরস্কার পেয়ে আনন্দিত, তবে যাদের আমি শ্রদ্ধা ও ভক্তি করি সে সব বিদগ্ধজনদের চেয়ে আমি এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য বেশি যোগ্য কিনা সে বিষয়ে আমার গভীর সন্দেহ আছে।”

দি পার্ল প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালে। স্টেনবেক প্রথমে এটা লিখে মেক্সিকোতে চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপি হিসাবে। পরে সেটাকে সে একটা গল্প হিসাবে পুনর্লিখন করে একটা সাময়িকীর জন্য, এবং শেষে উপন্যাসে।

দুই দিক থেকে দি পার্ল এবং অফ মাইস অ্যান্ড মেন এর মধ্যে মিল আছে অনেক। প্রথমত, উপন্যাস আকারে প্রকাশ করা হলেও উভয় ্উপন্যাসই লেখা হয় দর্শকদের জন্য, পাঠকের জন্য নয়। সাহিত্যের বাইরে স্টেনবেকের বিশেষ আগ্রহ ছিল নাটকে এবং কিঞ্চিত চলচ্চিত্্ের। দি পার্ল চলচ্চিত্্েরর জন্য লিখে হতাশ হলেও অফ মাইস অ্যান্ড মেন মঞ্চের জন্য লিখে সে হতাশ হয় নি। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী এই উপন্যাসের নাট্যরূপ বিপুলভাবে নন্দিত হয়, এবং পরে চলচ্চিত্্র হিসাবে। দ্বিতীয় মিল হল, উভয় উপন্যাসেই অশুভ সামাজিক অথবা মানবিক শক্তির কাছে ব্যক্তির আকাঙ্খার পরাভব। এই দ্বিতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য অফ মাইস অ্যান্ড মেন এর একটা সংক্ষিপ্ত সারমর্ম পাঠকদের জন্য সহায়ক হবে।

গল্পটা সামান্যই। জর্জ ও লেনি কৃষি শ্রমিক। জীবিকার জন্য তাদেরকে যেতে হচ্ছে এক খামার থেকে আরেক খামারে। সমস্যার উৎস হল লেনি, যে বিশালদেহী কিন্তু যার মানসিক বিকাশ ঘটে নি। তার এই মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণে সে যেখানেই যায় সেখানেই কোনো না কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়। জর্জ তাকে অভিভাবকের মত আগলে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করে, কিন্তু তার সে চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। বিশাল দেহের সাথে শিশুসুলভ মনের যে বৈপরিত্য, তার কারণে লেনি সবসময় আবেগ প্রকাশে ভুল আচরণ করে। এরকম একটা ভুলের কারণে গোবেচারা লেনি খামার মালিকের ছেলে কার্লির যুবতি বউকে মেরে ফেলে। খামার মালিকের ছেলে এর প্রতিশোধ নিতে লেনিকে তল্লাস করতে বের হয়। তার নিষ্ঠুরতা থেকে বাঁচাবার জন্য জর্জ লেনিকে গুলি করে মেরে ফেলে।

গল্পটা এখানেই শেষ। কিন্তু এই সামান্য গল্পের অভ্যন্তরে রয়েছে আরো একাধিক গল্প। সেসব গল্প জানতে হলে উপন্যাসটির চরিত্রগুলোর সাথে সামান্য অন্তরঙ্গ হতে হবে। প্রথম গল্পটা লেনি ও জর্জের যা লেনির অনুরোধে জর্জ একাধিকবার বলে। এই খামারে কাজ করে কিছু টাকা জমাতে পারলে জর্জ ও লেনি একটা ছোট খামার বাড়ি কিনবে। সেখানে এক টুকরা জমি থাকবে। সেই জমিতে তারা ফসল ফলাবে। তাদের গরু থাকবে আর সেই গরু ঘন দুধ দিবে। লেনি বারবার এই গল্পটা শুনতে চায় কারণ জর্জ তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে বাড়িটা কিনতে পারলে সে লেনিকে খরগোশ পুষতে দিবে। পার্থিব সম্পদের প্রতি লোভ জন্মাবার মত মানসিক বিকাশ লেনির ঘটেনি। তার একমাত্র আকাঙ্খা খরগোশ পোষার। আর অভিজ্ঞতা থেকে সে বুঝতে পারে যে খরগোশ পুষতে হলে নিজেদের বাড়ি দরকার। তাই সে জর্জের গল্প বিশ্বাস করে এবং বিশ্বাস করে বলেই সে বারবার সেই গল্পটা শুনতে চায়।

জর্জ ও লেনির এই গল্পকে অনেক সমালোচক আখ্যা দিয়েছে “আমেরিকান স্বপ্ন” হিসাবে। তিরিশ দশকের আমেরিকায় শুধু জর্জ ও লেনিই নয়, তাদের মত বহু অভিবাসী কৃষি শ্রমিকের কাছেই সামান্য এক টুকরা জমি বিরাট স্বপ্ন হয়ে দেখা দেয়। একদিকে বৈভব ও স্বাধীনতার দেশ হিসাবে পরিগণিত আমেরিকা আকর্ষণ করে পৃথিবীর বহু দেশের মানুষকে, অন্যদিকে আমেরিকায় বসবাসকারী বহু মানুষ সেই বৈভবের দেশে বাস করেও বাড়ির ও জমির মালিক হবার সামান্য স্বপ্ন পূরণ করতে পারে না।

জর্জ ও লেনি যখন এই স্বপ্ন ব্যক্ত করে, তখন দেখা যায় খামারে কর্মরত বা বসবাসকারী অন্যান্যরাও এরকম অপূর্ণ স্বপ্ন লালন করে যাচ্ছে গোপনে। যেমন বুড়ো হয়ে যাওয়া শ্রমিক ক্যান্ডি, যে পদে পদে লাঞ্ছিত হয়, যে প্রিয় কুকুর কাছে রাখবার সামান্য অধিকারও দাবি করতে পারে না। সেও যোগ দেয় জর্জ ও লেনির সাথে। তাদের স্বপ্নের সাথে ক্যান্ডির স্বপ্ন এত দ্রুত মিলে যায় যে সে তার জমানো সাড়ে তিনশ ডলার জর্জকে দিয়ে দিতে তৈরি হয় খামার বাড়ি কেনার জন্য। এই টাকা তার বহুদিনের সঞ্চয়, কিন্তু যে খামার বাড়ি জর্জ কিনতে চায়, এই টাকা দিয়ে তার অর্ধেক মূল্য পরিশোধ করতে পারবে।

তাদের এই স্বপ্নের অবাস্তবতা উন্মোচন করবার জন্য স্টেনবেক টেনে আনে আরেক চরিত্র, যার ভূমিকা গোটা উপন্যাসে তত তাৎপর্যপূর্ণ নয়। তার নাম ক্রুকস--ঠিক জানা যায় না এটা তার আসল নাম নাকি তার দৈহিক বিকৃতির জন্য সবাই তাকে এই নামে ডাকে। ঘোড়ার লাথিতে তার মেরুদণ্ড বেঁকে গেছে বলে খামার মালিক তাকে অনুগ্রহ করে খামারে থাকতে দিয়েছে। তিরিশ দশকের আমেরিকায় তাকে নিগ্রো বলাটা অনৈতিক ছিল না। সাদা মানুষদের মধ্যে নিঃসঙ্গ হয়ে বাস করলেও তাদের সম্পর্কে এই নিগ্রোর রয়েছে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ। জর্জ ও লেনির স্বপ্নের কথা শুনে তাই তার তাচ্ছিল্য করতে সময় লাগে না। তার ভাষা রূঢ় কিন্তু রূঢ়তা দিয়ে সে প্রকাশ করে বাস্তব সত্য। যেমন সে বলে, এক টুকরা জমির মালিক হওয়ার স্বপ্ন স্বর্গে যাবার স্বপ্নের মতই। “সবাই চায় এক টুকরা জমি--কেউ কোনোদিন স্বর্গেও যেতে পারে না, জমিও পায় না।” হয়ত ক্রুকস স্বপ্নবিলাসীদের সহ্য করতে পারে না। কারণ সে জানে স্বর্গের সীমানায় না পৌঁছালেও জর্জ বা লেনি জমির মালিক হয়েও যেতে পারে, কিন্তু তার কোনো সম্ভাবনা নাই। তাকে মৃত্যু পর্যন্ত দাসসুলভ জীবন যাপন করতে হবে।
পরাধীনতা থেকে বের হবার কোনো সম্ভাবনা নাই কার্লির বউয়েরও, যার মুখ বন্ধ করতে যেয়ে (আক্ষরিক অর্থে) লেনি যাকে মেরে ফেলে। তার নাম জানা যায় না কারণ সে কার্লির বউ হিসাবেই পরিচিত। সেও স্বপ্নচারী হবার সুযোগ খোঁজে। তবে অন্যদের মত সে স্বপ্ন ভবিষ্যতের নয়, অতীতের। তার অতীত উজ্জ্বল ছিল না, কিন্তু সম্ভাবনাময় ছিল। কার্লির বউ হয়ে এসে খামারের বন্দী জীবনে সে অতীত সম্ভাবনা নিকট ভবিষ্যতের স্বপ্নের মত হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু তার সে স্বপ্নের উজ্জ্বলতা দেখবার মানুষ কোথায়? লেনিকে একা পেয়ে তাকে সে তার সেসব অতীতের গল্প বলতে শুরু করেছিল। বোকা লেনির বোঝার ক্ষমতা থাকবে কি করে যে তার খরগোশ পোষার স্বপ্ন আর কার্লির বউ এর হলিউডে অভিনেত্রী হয়ে যাবার অতীত সম্ভাবনা এক নয়। যদি এত বুদ্ধিই তার থাকত, তাহলে সে কার্লির বউ এর গল্পে মুগ্ধ হয়ে তাকে নিয়ে ভেগে যাবার চেষ্টা করত। তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ করে দিত না।

কোন্টা সঠিক আর কোন্টা ভুল সেটা বুঝবার মত মানসিক বিকাশ বিশালদেহী লেনির হয় নি। অনেকের মতে তার দৈহিক আয়তন ও তার শিশুসুলভ আয়তনে যে ভারসাম্যহীনতা, তা স্টেনবেক সৃষ্টি করেছে পরিকল্পিতভাবে। অনেকের কাছে আবার এই ভারসাম্যহীনতা তত গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতখানি গুরুত্বপূর্ণ লেনির পরিণতি ও সেই পরিণতির পিছনের বৃহৎ কারণসমূহ।

এইসব ভিন্নমতের পর্যালোচনায় স্টেনবেকের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সামান্য আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না।

জনপ্রিয় হলেও স্টেনবেক সম্পর্কে আমেরিকানদের বড় অভিযোগ যে সে সমাজতন্ত্রী ছিল। এমন কি আমেরিকান সরকারও তাকে সে সময় কমিউনিস্ট বলে সন্দেহ করত। অভিযোগ বা সন্দেহটা সম্পূর্ণ মিথ্যা নয়।

এই অভিযোগ বা সন্দেহ মূর্ত হয় তার প্রথম আলোচিত উপন্যাস দি গ্রেপস অফ র‌্যাথ এর প্রেক্ষিতে। তিরিশের দশকে স্টেনবেক কমিউনিস্ট মতাদর্শ ও তার অনুসারীদের ঘনিষ্ঠ ছিল। সে সময় তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন ছিল কমিউনিস্ট পার্টির জন রিড ক্লাবের অন্যতম ব্যক্তিত্ব ফ্রান্সিস হ্ইুটাকার। হুইটাকার এর মাধ্যমে স্টেনবেক অনেক ধর্মঘটিদের সংস্পর্শে আসে। এই ধর্মঘটিরা কমিউনিস্টদের নিয়ন্ত্রিত শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য এর্ব ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দাবি নিয়ে ধর্মঘট সংঘটিত করে। এই সময়ে জন রিড ক্লাবের অনেক তরুণ সদস্য ও ইয়ং কমিউনিস্ট লীগের অনেক সদস্যের নিয়মিত যাতায়াত ছিল স্টেনবেকের বাড়িতে। এছাড়াও কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত অনেকের সাথেই স্টেনবেকের বহুবিধ যোগাযোগ ছিল।

অনুমান করা যেতে পারে, জর্জ, লেনি ও অন্যান্যদের স্বপ্নভঙ্গের যে কাহিনী অফ মাইস অ্যান্ড মেন এ চিত্রিত করা হয়েছে, তাতে কমিউনিস্ট মতাদর্শের প্রভাব রয়েছে। পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকদের স্বপ্ন এভাবে ভঙ্গ হতে বাধ্য। প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব অন্তত তাই বলে। জর্জ ও লেনির মত শ্রমিকরা তাদের শ্রম দিয়ে সৃষ্টি করবে পুঁজিপতিদের সম্পদ, আর নিজেরা থাকবে বঞ্চিত। তিরিশের মহামন্দায় এরকম স্বপ্নভঙ্গ যেখানে নৈমিত্তিক ঘটনা, তখন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে চলছে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন। অসম্ভব নয় যে অফ মাইস অ্যান্ড মেন এর পরিণতি পরিকল্পনা করার সময় স্টেনবেক সে স্বপ্ন দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিল।

সমালোচকরা অবশ্য সম্পূর্ণ নিশ্চিত নয় যে স্টেনবেক সেই স্বপ্ন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। সমালোচকদের এই সংশয়ের পিছনে উপন্যাসের যে উপাদান বা ঘটনা উপস্থাপন করা হয় সেটা হল কার্লির বউ এর মৃত্যু। শুধু সমাজের বা অর্থনীতির কাঠামোই নয়, ব্যক্তির কর্মও তার স্বপ্ন পুরণ ও স্বপ্নভঙ্গের ক্ষেত্রে নিয়ামক। সমালোচকদের মতে, লেনিকে দিয়ে কার্লির বউকে মেরে ফেলে স্টেনবেক এই অনুসিদ্ধান্ত প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছে। জর্জ যে স্বপ্ন তৈরি করেছিল, লেনি ও ক্যান্ডি যে স্বপ্নে যোগ দিয়েছিল, লেনির অপকর্মের জন্য সে স্বপ্ন বিলীন হয়। সমাজে ব্যক্তির ভবিষ্যত তার কর্ম দ্বারা প্রভাবিত। এই অস্তিত্ববাদী দর্শন কামুর দি আউটসাইডার এর সাথে তুলনীয়, যদিও তেমন কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নাই যে স্টেনবেক অস্তিত্ববাদী দর্শন দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত ছিল। তবে স্বপ্নভঙ্গের দায় সমাজ-অর্থনীতির কাঠামোর সাথে ব্যক্তির কর্তব্যকর্মের সাথে ভাগাভাগি করাটা কমিউনিস্ট ও অন্যান্য বাস্তববাদীদের পছন্দ হয় নি।

স্টেনবেকের রাজনৈতিক মতাদর্শে অবশ্য স্থিতিশীলতা ছিল না। কমিউনিস্ট মতাদর্শ ও নতুন ধরনের সমাজ গঠনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সে ১৯৪৮ সালে ভ্রমণ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফিরে এসে লিখে এ রাশিয়ান জার্নাল। আবার সে ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট এর একজন গুণগ্রাহীও ছিল। আবার যেখানে সাধারণ আমেরিকানরাও ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধীতা করে, স্টেনবেক তার সমর্থন করে।

এই বিচ্যুতি ঘটে অফ মাইস অ্যান্ড মেন লেখার অনেক পরে। ব্যক্তি বনাম সমাজ সব দর্শনেই, এমনকি মার্কসবাদী দর্শনেও একটা ঘোলাটে বিষয়। সাম্প্রতিক প্রতিযোগিতার ও বিশ্বায়নের অর্থনীতি সব দায় ব্যক্তির যোগ্যতার উপর আরোপ করলেও তিরিশ দশকে তা খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না। আর তিরিশের মহামন্দায় যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটেছিল, স্টেনবেক তা প্রত্যক্ষ করেছিল নিকট থেকে। সে শুধু একজন লেখকই ছিল না, একজন শ্রমিক হিসাবেও কাজ করেছে কৃষি ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে। সেই অভিজ্ঞতা সে মূর্ত করেছে বিভিন্ন চরিত্রে। তার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সে নিশ্চয় এটা উপলব্ধি করে যে সমাজ বা অর্থনীতির কাঠামো ব্যক্তির জীবনকে বিপর্যস্ত বা সফল করতে ভূমিকা রাখে, কিন্তু সমাজ বা অর্থনীতির কাঠামোতে ব্যক্তির অবস্থান সরলরৈখিক নয়। লেখকের দায়িত্ব সমাজে ব্যক্তির সে বক্রপথের অভিজ্ঞতাকে বিবৃত করা। নোবেল বক্তৃতায় স্টেনবেক এই মতই ব্যক্ত করে: “লেখকের প্রাচীন দায়িত্বের বদল ঘটে নি। তার দায়িত্ব হল উৎকর্ষবিধানের লক্ষ্যে আমাদের কষ্টদায়ক ভ্রান্তি উন্মোচন করা, আমাদের অন্ধকার ও বিপজ্জনক স্বপ্ন খুঁড়ে আলোর দিকে নেয়া।” সন্দেহ নাই এই দায়িত্ববোধের প্রকাশ ঘটেছে অফ মাইস অ্যান্ড মেন এবং এমনকি দি পার্ল উপন্যাসেও। সে কারণেই লেনি বিশালদেহী হয়েও শিশু আর জর্জ ছোটখাট হলেও তুলনামূলকভাবে বুদ্ধিমান; হয়ত সে কারণেই লেনির স্বপ্ন ক্ষুদ্র আর জর্জের স্বপ্ন বড়।

এসব বিতর্ক শৌর্যবীর্যের আমেরিকায় এখন অপ্রাসঙ্গিক। আমেরিকান স্বপ্নও এখন ভিন্ন। প্রশ্ন করা যেতে পারে তাহলে কেন এখনও অফ মাইস অ্যান্ড মেন আমেরিকার পাঠকদের কাছে জনপ্রিয়। হতদরিদ্র জর্জ ও লেনি এখনও কেন বিত্তবান আমেরিকানদের আকর্ষণ করে। সম্ভবত এই প্রশ্নের জন্য আবারো ফিরে যেতে হবে ব্যক্তি বনাম সমাজ বিষয়ক বিতর্কে। বিত্ত-বৈভব ও স্বাধীনতার মধ্যে বসবাস করলেও প্রত্যেক ব্যক্তিই জীবনের কোনো কোনো পর্যায়ে বৃহত্তর কাঠামোর বিধি-নিষেধ ও প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়, যার কারণে ব্যক্তি সহযোগিতার সমাজে বসবাস করেও অসহায় বোধ করে। সন্দেহ নাই সব আমেরিকানই এই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়, সব আমেরিকানই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে স্বপ্নভঙ্গে হতাশ হয়। হয়ত সেজন্যই তারা জর্জ ও লেনির সাথে এখনও নৈকট্য বোধ করে, ভবিষ্যতেও করবে।

আমাদের লেখালেখিতে মুক্তিযুদ্ধ

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

এমন একটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, আমাদের সাহিত্য ও শিল্পকলার আলোচনায় যে, স্বাধীনতার তিন দশক পরেও মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ রূপায়ণ অথবা প্রতিফলন হয়নি শিল্প-সাহিত্যে। পৃথিবীর বিখ্যাত বিপ্লবগুলি অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে মহৎ সৃষ্টির পেছনে-ফরাসী বিপ্লব অথবা রুশ বিপ্লবের রয়েছে এক বিশাল সাহিত্য ভাণ্ডার। পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দেয়নি কিন্তু একটি সীমিত ভূগোলে ভয়ানক তোলপাড় তুলেছে তেমন জাতীয় রাজনৈতিক ঘটনাবলীও জন্ম দিয়েছে ধ্রুপদ সাহিত্যের, প্রাণস্পর্শী শিল্পের। আফ্রিকার দেশগুলির স্বাধীনতাপ্রাপ্তি, লাতিন আমেরিকার বামপন্থী বিপ্লব, অথবা ষাটের দশকে ইউরোপে দ্রুত ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক-আদর্শিক পটপরিবর্তনের উদাহরণ আমাদের জীবনকাল থেকে সংগৃহীত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে যদি সেই নিরিখে বিচার করি আমরা, তাহলে এর বিশালতাকে ওই ঘটনার বহি:স্থ একজন প্রত্যক্ষদর্শীও স্বীকার করে নেবেন। কিন্তু যুদ্ধপরবর্তী শিল্প-সাহিত্যে মুুক্তিযুদ্ধ কেন উপস্থিত নয়, যতটা থাকা উচিত ছিল, অন্তত: অনেক পাঠক সমালোচক যা মনে করেন, সেই, প্রশ্নটি অবধারিতভাবেই উচ্চারিত হয়, এবং আমাদের একটি শূন্যতা সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু করে তোলে।

এই অভিযোগের দুটি দিক আছে। প্রথমত, অভিযোগকারীর সিদ্ধান্ত হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যথেষ্ট লেখালেখি হচ্ছে না, মুক্তিযুদ্ধের প্রতিফলন ও রূপায়ন হচ্ছে না আমাদের শিল্প-সাহিত্যে। এই বিচারটিতে যে বিষয়টি প্রাধান্য পায়, তা একটি পরিমাণগত ধারণাঃ ‘যথেষ্ট’ বলতে কতটা বা কি পরিমাণ, এটি নির্ধারণের দায়িত্ব এসে পড়ে অভিযোগকারীর ওপর। যাঁরা এই মত পোষণ করেন যে, মুক্তিযুদ্ধ মোটেও অবহেলিত হয়নি সাহিত্যে ও শিল্পে, তাঁরা এই পরিমাণগত ধারণাটিকে গ্রহণ করতে রাজি হন না। তাঁরা বরং বলেন যে, আমাদের নাটক, যেমন, মুক্তিযুদ্ধের ফসল, তাঁর প্রত্যক্ষ অবদান, এবং শিল্প-সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমেও মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব সুনির্দিষ্ট, ভাস্কর্যের কথা তাঁরা উল্লেখ করেন, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত একটি শিল্প-মাধ্যম হিসেবে সংহতি অর্জন করেছে স্বাধীন বাংলাদেশে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে প্রচুর বইপত্র, প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণ ইত্যাদি লেখা হয়েছে, সেসবও, তাঁদের মতে, পরিমাণগত ধারণাটিকে দুর্বল প্রমাণিত করে। তবে অভিযোগের দ্বিতীয় যে দিকটি নিয়ে আমাদের ভাবতে হয়, তা হচ্ছে, আমাদের শিল্প-সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের উপস্থিতির গুণগত বিচারটি। মুক্তিযুদ্ধকে কিভাবে দেখা হচ্ছে, কোন্ দৃষ্টিকোণ থেকে; মুক্তিযুদ্ধের কোন বিষয়টি কোন্ পদ্ধতিতে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, অথবা চিত্রকর তাঁর কাজে প্রকাশ করেছেন  এই বিবেচনাটি যদি প্রধান হয়, তাহলে পরিমাণ-চিন্তাটি গৌণ হয়ে যায়। আমাদের দেশে এই দ্বিতীয় বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা হয়েছে কম, এবং হলেও পদ্ধতিগত কোনো শৃংখলার মধ্য দিয়ে প্রসঙ্গগুলির অবতারণা হয়নি। এজন্য, এখনও সাহিত্য ও শিল্পবিচার, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত, একটি নির্দিষ্ট বৃত্তেই আবর্তিত হচ্ছে।

পদ্ধতিগত যে শৃংখলার কথা বলা হ’ল, এটি তৈরী হয় তাত্ত্বিক একটি ভূমি থেকে। ‘তাত্ত্বিক’ কথাটি কিছুটা ভীতিপ্রদ এবং সন্দেহজনক আমাদের সময়েঃ কিন্তু তত্ত্বকে বিনির্মাণ করলে কিছু সনাক্তযোগ্য চিন্তার সমাবেশ চোখে পড়ে, যেগুলো ব্যাখ্যা অথবা ভাবনার জন্য একটি সম্ভাবনাময় জগৎ সৃষ্টি করে। যে কোনো তত্ত্বেও কিছু অভিন্ন উপাদান থাকে, যারা একাধিক চিন্তাকে একটি সংহত রূপদান করে; কিন্তু তাই বলে ওই চিন্তাগুলি যে সহজে নিষ্পত্তিযোগ্য অথবা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে, তা নয়। একটি চিন্তা ক্রমশঃ পরিব্যাপ্ত হতে হতে অতি সূক্ষ্ম, বিমূর্ত রূপ ধারণ করে; কিন্তু তত্ত্ব এই বিমূর্তায়নের অতীত একটি সংহতির সম্ভাবনাকে মূর্ত করে। মুক্তিযুদ্ধ শিল্প-সাহিত্যে কিভাবে প্রতিফলিত হয়, হতে পারে, হওয়া উচিতএবং না হলে, সকল ক্ষেত্রে, কেন নয়, এর একটি তাত্ত্বিক অনুসন্ধান আমরা করতে পারতাম। এখনো করতে পারি, কারণ যে কোনো ইতিহাসের মতো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটিও সময়ের সঙ্গে আরো সমৃদ্ধ হয়, এই ইতিহাস সম্বদ্ধে আমাদের দৃষ্টি আরো বেশী অনুসন্ধিৎসু হয়। তাছাড়া, মুক্তিযুদ্ধের পর একুশ বছর পার হওয়ার মধ্যে একটি নৈর্ব্যক্তিক দূরত্বও রচিত হয়েছে ওই ঘটনা এবং এই সময়ের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে, যা ইতিহাস-বিচারের জন্য প্রয়োজনীয়।

যদি তেমন একটি তাত্ত্বিক বিচার আমরা এই মুহূর্তে প্রয়োগ করতে চাই, তাহলে তিনটি বিষয়ের প্রতি আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত: ইতিহাস-বিচারের অন্যতম প্রধান যে শর্ত, বস্তুনিষ্ঠতা, আমাদের তা অর্জন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ একটি প্রকাণ্ড ঘটনা, তার আবেগ বিশাল, তার আবেদন বিদ্যুৎস্পর্শী। এই ঘটনাটি নিয়ে লিখতে গেলে যেমন অতি সহজেই আবেগের সঞ্চারণ ও সংক্রমণ হতে পারে, সমালোচককেও তেমনি এক ধরনের আবেগধর্মিতা আক্রমণ করতে পারে, যার পরিণতি তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির জন্য যতটা cathartic হতে পারে। বস্তুনিষ্ঠতার মাপকাঠিতে ততটা অগ্রহণযোগ্যও প্রমাণিত হতে পারে। বাস্তবকে অস্বীকার করার, অথবা বাস্তবকে পাল্টে দেয়ার, এবং নিজের আবেগের ওপর তাঁর দায়িত্ব ন্যস্ত করার মাধ্যমে একজন লেখক মুক্তিযুদ্ধকে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার আওতায় নিয়ে আসতে পারেন। আবার একজন সমালোচকও নিজস্ব একটি আবেগ থেকে অনেক বস্তুনিষ্ঠ লেখাকে অবমূল্যায়ন করতে পারেন, যদি ওই লেখায় তাঁর নিজস্ব আবেগটি প্রতিফলিত না হয়। বস্তুনিষ্ঠতা, বিষয়ের সঙ্গে বিষয়ীর দূরত্বকে অনুধাবন করার ক্ষমতা  এসব সাহিত্য ও শিল্পবিচারের দিকনির্দেশক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি আমরা অনেক সময় এড়িয়ে যাই প্রধানত: আমাদের অধৈর্য এবং অস্থিরতার জন্য তা হ’ল মুক্তিযুদ্ধ থেকে আমাদের যুগের একটি কালিক ও স্থানিক দূরত্বের বাস্তবতাটি। নব্যইতিহাসবাদীরা বিশ্বাস করেন, কোনো মানুষই আসলে ইতিহাসের বাইরে থাকতে পারে না, এজন্য ইতিহাসে বাইরের দৃষ্টি বলতে যে ধারণাটি প্রচলিত, তা আসলে একটি ভনিতামাত্র। নব্যইতিহাসবাদীরা রৈখিক ইতিহাস থেকেও ঘটনা ও প্রবণতা প্রধান ইতিহাসকে বেশী গুরুত্ব দেন, এবং তাঁরা ইতিহাসের ক্রমপরম্পরাকে একটি অর্পিত, সাজানো ডায়েরী বলে মনে করেন। নব্যইতিহাসবাদীদের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমাদের মনে হতে পারে, স্বাধীনতার এত বছর পরও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখার স্বল্পতা বা শিল্প-সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের রূপায়ণ ঈপ্সিত পর্যায়ে কেন পৌঁছেনি, সেটি নিয়ে ভাবার কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ মুক্তিযুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, এবং সময়ের ক্রমিকতা একটি বিভ্রান্ত্রিমাত্র। কাজেই, নব্যইতিহাসবিদ বলবেন আমাদের ভাবা উচিত মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রবণতা ও ঘটনাগুলি নিয়ে। গত একুশ বছরের ঘটনাপরম্পরাকেও সেক্ষেত্রে আমরা একটু নি¯পৃহ চোখে দেখব; কারণ, জীবন যেহেতু গতিশীল, ঘটনাক্রম প্রতিদিনই বিস্মৃত হচ্ছে, আরো হবে। এসব ঘটনার মুখ্য বিন্যাসটি ধরাই হবে আমাদের কাজ। কিন্তু প্রথাগত অথবা নব্যইতিহাসবাদী, যে ব্যাখ্যাতে আমরা যাই না কেন, আমাদের মানতে হবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো লেখা অপেক্ষা মুক্তিযুদ্ধের দূরবর্তী সময়ের কোনো লেখায় আমরা যে বর্ণনা বা বিশ্লেষণ পাব, তাতে প্রেক্ষাপটটি হবে অনেক বেশী অর্থবহ, কারণ এক ঐতিহাসিক দূরদৃষ্টি, যা শুধুমাত্র সময়ই আমাদের দিতে পারে, আমরা অর্জন করব। মুক্তিযুদ্ধের একুশ বছরে বহু ঘটনা ঘটেছে, বহু তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সেগুলো ঊনিশ শ’ বাহাত্তরে জানা আমাদের সম্ভব ছিল না। আমাদের জ্ঞানের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে, আমাদের অন্বেষণের ভূমি বিস্তৃত হয়েছে। এই অধিকতর সমৃদ্ধ ইতিহাস-জ্ঞান নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সন্নিকটবর্তী হলে আমাদের একটি নৈর্ব্যত্তিক ভাববোধ কিছুটা হলেও জাগ্রত হয়।

আমাদের কালের অবস্থান থেকে মুক্তিযুদ্ধকে প্রত্যক্ষ করলে এই কালিক তফাৎটুকু আমাদের আবেগকে পরিশুদ্ধ করতেই বরং সহায়তা করে। আমরা এই সময়ে ঘটে যাওয়া বহু ঘটনা অতীতের নিরিখে বিচার করি। অথচ ওই অতীত আমাদের কাছে কখনো নির্বাপিত অথবা মৃত নয়, বরং ঘটমান বর্তমানেরই একটি প্রতিরূপ। কিন্তু একটু ভিন্নভাবে ঘটনাটি দেখলে, এই নব্বুই-বিরানব্বুইয়ে এসে, স্বাধীনতার এত বছর পর কেন হঠাৎ করে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত লেখালেখি হচ্ছে, তার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যাও আমরা দিতে পারি। আমরা বলতে পারি, এই নতুন আগ্রহের জন্য কালিক একটি দূরত্বের প্রয়োজন ছিল, যে দূরত্বে প্রতিটি ঘটনাকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা বিচার করতে পারি।
তৃতীয় যে বিষয়টি আমাদের গোচরে রাখতে হবে, যদি একটি তাত্ত্বিক বিচার আমরা প্রয়োগ করতে চাই শিল্প-সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্কের ক্ষেত্রে, সেটি হলঃ মুক্তিযুদ্ধ কি শুধু বিষয় নির্মাণ করেছে সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে, নাকি প্রকাশের ক্ষেত্রেও নতুন কিছু সৃষ্টি করেছে, নতুন একটি ‘ফর্ম’ সে উপহার দিয়েছে, অথবা প্রচলিত ফর্মকে নতুন করে বিন্যস্ত করেছে, যে বিষয়ে একটি দীর্ঘ অনুসন্ধান, এবং সে-অনুসন্ধানের ফলে প্রাপ্ত তথ্যকে নতুনভাবে মূল্যায়ন। এই বিষয়টি তেমন গুরুত্ব পায়নি আমাদের সাহিত্য বা শিল্প আলোচনায়। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ যতটা না বিষয় সৃষ্টি করেছে, তার থেকে বেশী প্রভাবিত করেছে প্রকাশের মাধ্যমগুলি, তাদের টেকনিক, অন্তর্গত খুঁটিনাটি। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গৌরব অনস্বীকার্য, আরাধ্য। কিন্তু এক ধরনের সীমাবদ্ধতাও সেখানে আছে। নাইজেরীয় নাট্যকার কবি ওল সোয়িঙ্কা একবার বলেছিলেন, বায়াফ্রা যুদ্ধ নিয়ে, যে যুদ্ধে তিনি ব্যক্তিগতভাবে, আবেগগতভাবে জড়িয়ে পড়েছিলেন, যে এই যুদ্ধের আসলে একটিই গল্প। শোষণ,বঞ্চনা-প্রতিবাদ-প্রতিরোধ-হত্যা, নির্যাতন-পরাজয়, বিজয়। বায়াফ্রাবাসীরা পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের চিন্তার ও চেতনার মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত হয়নি তারা। সোয়িঙ্কা বেশী লিখেননি এই যুদ্ধ নিয়ে কিন্তু অসামান্য একটি নাটকের নাম তো আমরা জানি ম্যাডমেন অ্যান্ড স্পেশালিস্টস, যেখানে বায়াফ্রার রক্তপাত, উপনিবেশী নিষ্ঠুরতা, ভণ্ডামী এবং মানুষের প্রতিরোধের প্রসঙ্গগুলি বর্ণিত হয়েছে, একটি হৃদয়স্পর্শী ভাষায়, এবং সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোয়িঙ্কার তীক্ষ্ম বিদ্রুপ এবং শাণিত বুদ্ধির বিষয়গুলি। একটি সাক্ষাৎকারে যখন সোয়িঙ্কা বলেন, তিনি তাঁর মুক্তিযুদ্ধের বিষয় নিয়ে ততটা লেখেননি, কারণ একটি লেখাই প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে অন্যান্য লেখার, কারণ, আবারো তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের গল্প তো থাকে একটাই। তবে, ওই একটি গল্পের যে কত রূপ, কত বৈচিত্র, কত বিবিধ প্রকাশ হতে পারে, তা আমরা জানি, কাজেই বিষয়গৌরবের যে অহংকার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমরা করি, সেটি যথার্থ। কিন্তু ফর্মের বিষয়টি সহজে আমাদের চিন্তায় আসে না। অথচ, মুক্তিযুদ্ধ একজন সৃষ্টিশীল শিল্পীর প্রকাশ-চেতনাকে পরিবর্তিত করতে পারে, তাতে যোগান দিতে পারে নতুন কোনো উপাদানের। সোয়িঙ্কার কথায় ফিরে যাই আমরা। সোয়িঙ্কা বরাবরই ছিলেন মৃত্তিকাঘনিষ্ট, সাধারণ জীবন থেকে তিনি সংগ্রহ করেছেন তাঁর সৃষ্টির উপাদান, প্রকাশের অস্ত্র। কিন্তু বায়াফ্রা যুদ্ধ তাঁকে যখন বিচলিত করল, তিনি মানুষের ভিতরে পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন শক্তিকে কাছে থেকে দেখতে থাকলেন, তিনি উপলব্ধি করলেন, জনজীবনের ও জনমানুষের কল্পনার, যাকে আমরা ফোক ইমাজিনেশন বলি, একটি শক্তি থাকে এসব পরস্পরবিরোধী বিষয়কে মেলানোর। মাহাত্মর পাশে পাশবিকতা কেন সহ-অবস্থিত, এর উত্তর ওই ফোক ইমাজিনেশন থেকে পাওয়া যায়, যেখানে এ উভয় পক্ষ এমনভাবে প্রতীকায়িত যে, তাদের আলাদা করে দেখার কোনো প্রয়োজন থাকে না। সোয়িঙ্কার নাটক যখন এসব বিষয়কে প্রতীককে ধারণ করছে, তিনি বুঝতে পারলেন ওই বিষয়ের উপস্থাপনাটিও হতে হবে ভিন্ন। তাঁর নাটকে ফোক ফর্ম-এর ব্যবহার নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে, কিন্তু সোয়িঙ্কা নিজে যে আভাস দিয়েছেন এদের অনিবার্যতার বিষয়ে, সেটি খুব তলিয়ে দেখা হয়নি। বায়াফ্রা যুদ্ধের আগে এবং পরে তাঁর লেখায় জীবনকে দেখার মধ্যে ভিন্নতা আছে। বলা যায়, তাঁর মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে প্রকাশের ক্ষেত্রে জনজীবনের, ফোক ইমাজিনেশনের অনেক গভীরে নিয়ে গেছে।

মুক্তিযুদ্ধের কিছু প্রভাব প্রত্যক্ষ, সচেতন; তার অনেকটাই আবার থাকে আমাদের অবচেতনে, সমষ্টিক অচেতনে, এবং এর স্থায়িত্ব দীর্ঘমেয়াদী। বাংলাদেশের নাটকের আÍপ্রকাশ, নবপর্যায়ে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রত্যক্ষভাবে ধারণ করেছে। এবং এই প্রভাবে বিষয়ও নির্ধারিত এবং নির্বাচিত হয়েছে। কিন্তু অসচেতন প্রভাবটি এসেছে জীবনকে দূরবিস্তারী দৃষ্টি দিয়ে দেখার মধ্যে। এই যে এত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নাটকে লোকজ ফর্মকে ধরে রাখার প্রবণতা, ঐতিহ্য ফিরে যাওয়াএসবই মুক্তিযুদ্ধের পরোক্ষ অবদান। আমাদের কি মনে পড়ে না, একাত্তুরের নয় মাস আমরা প্রধানত কোথায় ছিলাম? এক কোটির মত মানুষ ছিল ভারতেউদ্বাস্তু; আর আমরা বাকীরা ছিলাম নিজদেশে পরবাসীউদ্বাস্তু। আমরা ফিরে গিয়েছিলাম গ্রামে, আমাদের আদি উৎসে। এবং সেখানে অর্জন করেছিলাম বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখার প্রেরণা। নাটক যদি উৎসে ফিরে যায়, লোকজ মনীষার অন্বেষণ করে প্রকাশের দীপ্তি, তাকে আমরা অভিহিত করব মুক্তিযুদ্ধের ওই আদিতে প্রত্যাবর্তন হিসেবে।

আমাদের সাহিত্যে-উপন্যাসে কবিতায়, গল্পে, মুক্তিযুদ্ধ এই প্রত্যক্ষ, অপ্রত্যক্ষ, উভয় প্রভাব বিস্তৃত করেছে। একটি উপন্যাসের কথা আমার এ মুহূর্তে মনে পড়েছে, সৈয়দ শামসুল হকের দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, যা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা। কিন্তু সেটি বড় কথা নয়। সৈয়দ হকের ভিতর মুক্তিযুদ্ধ একটি ভিন্ন প্রভাব ফেলেছে, তাঁর নির্মাণকালকে তিনি বিশ্বস্ত করেছেন ওই যুদ্ধের রুদ্ধশ্বাস, তীব্র এবং প্রচণ্ড আÍবিশ্বাসী শক্তির কাছে। তাঁর উপন্যাসটি সম্পূর্ণ হয়েছে একটি অনুচ্ছেদে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় কোনো অনুচ্ছেদ নেইএমনি ঠাসবুনোনী তার গঠন। পাঠক থামেন না; থামার কোনো প্রয়োজনও থাকে না। মুক্তিযুদ্ধের শ্র“তি, বিস্তৃতি, তার শক্তি ক্রিয়া করতে থাকে তার স্নায়ুতে। এই ক্রিয়ার যে প্রতিক্রিয়া, তাকে ধারণ করে উপন্যাস। ও-উপন্যাসটিকে আমি খুবই গুরুত্ব দিই। এ কারণে, যে এটির বিষয়গুণ যতটা আকর্ষণীয়, তার থেকেও এর প্রকাশবিশিষ্টতা; মুক্তিযুদ্ধ যে ফর্ম-চিন্তাকে স্পর্শ করে তাকে বদলে দিতে চায়, এ তারই প্রমাণ। আরেকটি বড় কাজ হুমায়ূন আহমেদের জ্যোৎস্না ও জননীর গল্প এক বিশাল ক্যানভাসে মুক্তিযুদ্ধের অভিঘাতটি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে এবং পাঠককে আরেকবার মুক্তিযুদ্ধের সময় ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদের গল্প এবং গল্পের ফর্ম, উভয়ই আকর্ষণীয়।

অথবা, শুরু সত্তুরের চিত্রকলার কথা আমরা বিবেচনা করি। বাংলাদেশের চিত্রকলায় যে নতুন রং এসেছে এ সময়, অন্যত্র একটি প্রবন্ধে সে নিয়ে আলোচনা করেছি আমি। এই রং হঠাৎ করে জীবন্ত প্রতিবাদী হয়ে উঠল। যে বিদ্রোহ রঙের ক্ষেত্রে অগ্রজরা করে আসছিলেন  মুর্তজা বশীরের নাম মনে পড়ে একাত্তুরের পরের শিল্পীরা তার বিস্ফোরণ ঘটালেন। ফর্ম নিয়ে যে স্বাধীন চিন্তা শুরু হয় এ সময়, তা শুধু ষাটের ক্রমাগ্রবর্তী একটি প্রকাশই নয়: বরং ষাটের শেষে যে ভয়ানক ইতিহাসটি ঘটে গেল, তার উত্তাপে তার প্রধান ব্যাপ্তি। রংকে ধারণ করে পরিপূর্ণভাবে যে ক্যানভাস, সেটিও মুক্তিযুদ্ধ বিস্তৃত করেছে। আমরা শাহাবুদ্দিনেরঅথবা মারুফের বিশাল সব ক্যানভাসের কথা জানি। এত বড় ক্যানভাসে কী প্রকাশ করেছেন তাঁরা? শাহাবুদ্দিন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের চিত্র। মারুফ প্রধানত: রং ও ফর্মের বিন্যাসে এক বিশাল জীবনের ছবি। তাঁদের অনুপ্রেরণা এসেছে একই উৎস থেকে। ওই সময়ে যাঁরা ছবি এঁকেছেন, প্রত্যেকের মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে ভাবনা ছিল। কতভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন তাঁরা, তার একটি হিসাব নেয়া হয়তো কষ্টসাধ্য। প্রত্যক্ষ প্রভাবের ক্ষেত্রে যেমন শাহাবুদ্দিন, এটি হয়তো সহজ: কিন্তু অসচেতন প্রভাবের বিষয়ে, যেখানে বিষয়বস্তু অপেক্ষা প্রকাশকে তা স্পর্শ করেছে অধিক মাত্রায়, আমাদের সমস্যা দেখা দেয়আমাদের আরো বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি ফেলতে হয় তাঁদের কাজের ওপর।

মুক্তিযুদ্ধ যখন সৃষ্টিশীলতার অঞ্চলে প্রবেশ করে, অনেক অসম্ভব তখন সম্ভব হতে পারে। সঙ্গীতের ক্ষেত্রে এটি আমরা বিশেষভাবে প্রত্যক্ষ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যে গানগুলি আমরা গাইতাম, মুখে মুখে ফিরত সারা বাংলায়, তারা যেমন কোনো অসাধারণ সৃষ্টি ছিল না সঙ্গীতের শুদ্ধ বিচারে। গানের ভাষা অনেক সময় ছিল দুর্বল; দু’ একটি গানের গীতিকার ব্যাকরণ মানতেও অনীহা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেটি বাহ্য হয়ে যায় গানের আবেগের কাছে। যে উন্মাদনা এবং প্রেরণা তারা সৃষ্টি করেছিল, তার তুল্য কিছু আমরা আর দেখি না। এখন, এতদিন পর, বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী সরকার যখন প্রায় সবগুলি গানকে কার্যত: নিষিদ্ধ করে দিয়েছে, অনেকবার অনুশোচনা করতে দেখি এ নিয়ে। কিন্তু এসব গানের একটি নির্দিষ্ট কার্যকারিতা থাকে। মুক্তিযুদ্ধকে যদি আমরা চিরকালের একটি সংগ্রাম হিসেবে দেখি, যার আদি এবং অন্ত নেই, তবুও, সেই গানগুলিকে এক সময় তারিখ সম্বলিত হতে হয়। এটি এজন্য হয় যে প্রকাশের এমন স্থিতিস্থাপকতা তাদের নেই। যে প্রতীকী মুক্তিযুদ্ধগুলির ক্ষেত্রেও তারা সমানভাবে বৈধ হবে, সমান উন্মাদনা সৃষ্টি করবে। এ হচ্ছে এসব সৃষ্টির প্রকাশগত সমস্যা। কিন্তু তারা চিরায়ত এবং চির প্রাসঙ্গিক থাকে মানুষের আবেগের কাছে। আবেগ যতদিন কাজ করবে মানুষের মধ্যে, ততদিন তারা থাকবে বৈধ প্রাসঙ্গিক।

মুক্তিযুদ্ধ ও সৃষ্টিশীলতার আলোচনায় আমাদের আবার ফিরে আসতে হয় এই দ্বিবিধ চিন্তার পরিমণ্ডলে। একদিকে আবেগ, অন্যদিকে আবেগ-উত্তীর্ণ, প্রকাশনির্ভর বিশিষ্টতা। যে শিল্প এ-দুটোকে সমানভাবে ধারণ করতে পারবে, তা-ই হবে চিরকালীন, চিরায়ত। বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যে প্রথম দিকটি যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, দ্বিতীয়টি ততটা পায়নি। প্রকাশের উৎকর্ষ, ফর্ম-এর গভীরে মুক্তিযুদ্ধের মাননিক বৌদ্ধিক দিকগুলির প্রতিফলন, আমরা করতে পারিনি। মুক্তিযুদ্ধ যে কত বৈচিত্রে প্রকাশিত হতে পারে, একজন ভারতীয় ঔপন্যাসিক তা দেখিয়েছেন। রোহিনতন মিস্ত্রী নামক এক তরুণ ঔপন্যাসিক ইংরেজীতে একটি উপন্যাস লিখেছেন, সাচ এ লং জার্নি নামে। উপন্যাস শুরুতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেরও শুরু, এবং শুরু প্রধান চরিত্রের যাত্রার। উপন্যাসের শেষে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের শেষ, এবং মিস্ত্রীর চরিত্ররও আসে একটি পরিণতি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে যদি একজন ভারতীয় ঔপন্যাসিক এরূপ প্রতীকীভাবে তার মূল ঘটনার স¤পুরক, পরিপূরক এবং রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন, আমরা কেন পারবো না? তার থেকেও নতুন উপায়ে?

কুষ্ঠরোগী কুলাউ

মূলঃ জ্যাক লন্ডন
রূপান্তরঃ খসরু চৌধুরী

যেহেতু আমরা অসুস্থ তারা কেড়ে নিয়েছে আমাদের স্বাধীনতা। আমরা আইন মেনেছি। আমরা কোনও অন্যায় করিনি। তবু তারা আমাদের বন্দি করে রেখেছে। মোলোকাই আসলে একটা কারাগার। তোমাদের সেটা ভাল করেই জানা আছে। তার বোন, নিউলিকে মোলোকাই পাঠানো হয়েছে সাত বছর আগে। তারপর থেকে বোনের সঙ্গে তার আর দেখা হয়নি। দেখা এ-জীবনে আর হবেও না। মৃত্যু এসে মুক্তি না দেয়া পর্যন্ত মেয়েটি সেখানেই বন্দি থেকে যাবে। এটা তার ইচ্ছেয় ঘটেনি। এরকম কোনও ইচ্ছে নিউলির ছিল না। এই ইচ্ছে শাদা চামড়ার মানুষের যারা শাসন করছে এই দেশ। আর, কারা এই শাদা চামড়ার মানুষ ?
‘আমরা জানি। জেনেছি আমাদের বাপদাদার কাছ থেকে। এসেছে তারা ভেড়ার মত, কথা বলেছে নরম সুরে। তখন নরম সুরেই কথা বলতে হয়েছে তাদের, কারণ, আমরা যেমন ছিলাম শক্তিশালী তেমনই সংখ্যায়ও তাদের চেয়ে অনেক বেশি, আর সবগুলো দ্বীপই ছিল আমাদের। আগেই বলেছি, কথা বলত তারা নরম সুরে। তারা ছিল দুই জাতের। একটা আমাদের অনুমতি প্রার্থনা করত, সদয় অনুমতি, যেন আমাদের মাঝে তারা প্রচার করতে পারে ঈশ্বরের বাণী। আরেকটা প্রার্থনা করেছে আমাদের অনুমতি, সদয় অনুমতি, যেন ব্যবসা করতে পারে আমাদের সঙ্গে। সে-ই ছিল শুরু। আজ সবগুলো দ্বীপ তাদের, পুরো দেশ, সমস্ত গবাদিপশু  যাবতীয় কিছু তাদের দখলে। যে-দল প্রচার করত ঈশ্বরের বাণী আর যে-দল করত ব্যবসা, কীভাবে হঠাৎ করে যেন মিলিত হলো তারা আর তারপর হলো বড় বড় সব দলপতি। অনেক কক্ষবিশিষ্ট বাড়িতে বাস করতে লাগল তারা রাজার মত, তাদের সেবা-যতেœ নিয়োজিত হলো অসংখ্য ভৃত্য। একদিন যাদের কিছুই ছিল না, আজ তারাই পেয়ে গেছে সব, আর যদি তুমি, বা আমি, কিংবা আমাদের যে-কেউ অনাহারে থাকে, তারা দাঁত ঁিখচিয়ে বলে, ‘তোমরা কোনও কাজ করো না কেন? ওই তো রয়েছে কত আবাদি জমি।”
কুলাউ একটু থামল। একটা হাত তুলল সে, তারপর গাঁটঅলা কুঁকড়ে যাওয়া আঙুলে ওপরে তুলে ধরল তার মাথার কালো চুলে প্যাঁচানো হিবিসকাসের ঝলমলে মালা। চারপাশ ভেসে যাচ্ছে জোছনার রূপালি বন্যায়। এই রাত এক শান্তির রাত, যদিও তাকে ঘিরে যারা কথা শুনছিল তাদের সবাই যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত। মুখ তাদের সিংহের মত। কারও মুখে বিরাট এক গর্ত যেখানে নাক ছিল একদা, আবার কারও কেবল বাহুটাই আছে, পচে খসে পড়েছে হাত। বসে আছে জনা তিরিশেক পুরুষ আর মহিলা, ফ্যাকাসের চেয়েও অনেক বেশি ফ্যাকাসে, তাদের মানুষসুলভ চেহারায় এখন ফুটে উঠেছে জান্তব ছাপ।
বসে রইল তারা ফুলের মালা পরে, উজ্জ্বল, সুগন্ধীভরা রাতে, ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল তাদের অদ্ভুত সব শব্দ, কুলাউয়ের বক্তব্যে সমর্থন জোগাল খসখসে গলা। একদা তারা ছিল নারী আর পুরুষ। কিন্তু এখন তারা আর নারীও নয় পুরুষও নয়। এখন তারা দানবচেহারা আর আকার মিলিয়ে মানুষের এক ভয়াবহ রসিকতা। বীভৎস ধরনের অঙ্গহানি তাদের চেহারায় এনে দিয়েছে এমন বিকৃতি যেন তারা নরকভোগ করেছে লক্ষ লক্ষ বছর ধরে। তাদের হাতগুলো হয়েছে এখন নখরের মত। মুখের দিকে তাকালে মনে হবে, জীবন যেন তাদের নিয়ে খেলেছে ভয়াবহ এক খেলা। এক মহিলার তপ্ত অশ্র“ গড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক-জাগানো দুই গর্ত দিয়ে, যেখানে একদা ছিল তার সুন্দর একজোড়া চোখ। কেউ কেউ ভোগ করছে ব্যথা, গোঙানি বেরিয়ে আসছে তাদের বুকের গভীর থেকে। কেউ কেউ কাশছে, মাংসপেশির কোষ ঁিছড়ে যাওয়ার শব্দ তুলে। দু’জন আবার এমন হয়ে গেছে যেন মানুষ নয় তারা, বিশালাকৃতির দুই বানর, সোনালি ফুলের মালা মাথায় জড়িয়ে করছে তারা দুর্বোধ্য সব শব্দ। একজনের কানের লতি কাঁধের ওপর ঝুলে পড়ে পাখার মত দুলছে একপাশ থেকে আরেক পাশে।
আর এখানে কুলাউ হলো রাজা। এটাই তার রাজ্য ফুলে-ঠাসা এক গিরিসঙ্কট, যেটাকে ঘিরে উঠে গেছে আরোহণের প্রায় অসাধ্য সটান খাড়া পাথুরে ঢাল যার আনাচ-কানাচ থেকে মাঝেসাঝেই ভেসে আসে বুনো ছাগলের ডাক। তিন পাশ ঘেরা এই পাথুরে ঢালের ফাঁকেফোঁকরে রয়েছে গুহা যার ভেতরে বাস করে কুলাউয়ের প্রজারা। চতুর্থ পাশটা যেন নেমে গেছে অতল এক গর্তে যেখানে দেখা যায় অপেক্ষাকৃত নিচু সব পাহাড়ের চূড়া আর ঢাল, যার পাদদেশে গুমগুম শব্দে আছড়ে পড়ে ফেনা সৃষ্টি করছে প্রশান্ত মহাসাগর। ভাল আবহাওয়ায় কোন নৌকা ভিড়তে পারে কালালাউ উপত্যকার প্রবেশমুখের এই পাথুরে সৈকতে, কিন্তু আবহাওয়া থাকতে হবে খুবই ভাল। ঠাণ্ডা মাথার কোন পর্বতারোহী সৈকত থেকে উঠে আসতে পারে কুলাউয়ের এই রাজ্যে ; কিন্তু সেই পর্বতারোহীর মাথা থাকতে হবে সত্যিই খুব ঠাণ্ডা, আর বুনো ছাগলদের যাতায়াতের পথ অবশ্যই থাকতে হবে তার নখদর্পণে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, কুলাউয়ের ভাঙাচোরা, বিকৃত চেহারার প্রজারা বুনো ছাগলের পথ ধরে প্রায় অনায়াসেই উঠে আসতে পারে চূড়ান্ত দুর্গম এই রাজ্যে।
‘ভাইসব,’ বলতে শুরু করল কুলাউ।
কিন্তু এই সময় বানরাকৃতি সেই মানুষদের একজন ছাড়ল উন্মাদসুলভ এক তীক্ষ্ণ চিৎকার, আর অপেক্ষা করে রইল কুলাউ যতক্ষণ না চিৎকারটা পাথুরে দেয়ালগুলোতে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে হতে মিলিয়ে যায় নিঃস্পন্দ রাতের গহ্বরে।
‘ভাইসব, ব্যাপারটা কি অদ্ভুত নয়? এই দেশ ছিল আমাদের, অথচ এখন এই দেশ আর আমাদের নেই। ঈশ্বরের বাণী প্রচারকারী আর সেই ব্যবসায়ীরা দেশের পরিবর্তে আমাদের কী দিয়েছে? তোমাদের কেউই কি এই দেশের পরিবর্তে এক ডলার, মাত্র একটা ডলারও পেয়েছ? তবু এই দেশ তাদের, আর তার পরিবর্তে তারা বলতে পারে যে আমরা চাইলে খেতে কাজ করতে পারি, তাদের খেতে, এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও আমরা সেখানে যা-ই ফলাই না কেন সেই ফসল হবে তাদের। ভেবে দেখ সেই পুরনো দিনগুলোর কথা, তখন আমাদের কোনও কাজ করতে হত না। আমরা যখন রুগ্ন হয়ে পড়লাম, তারা কেড়ে নিল আমাদের স্বাধীনতা।’
‘এই রোগ এখানে কে আনল, কুলাউ?’ জানতে চাইল কিলোলিয়ানা, হালকা-পাতলা একজন মানুষ যার মুখে এমনই এক হরিণশাবকের মত হাসি যে কেউ এটাও আশা করতে পারে, তার পায়ের দিকে তাকালে দেখা যাবে চেরা খুর। হ্যাঁ, পা চেরা তার ঠিকই, কিন্তু তা খুরের কারণে নয়, সে-চেরার সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত পচে গিয়ে। তবু এটাই কিলোলিয়ানা, দলের সবচেয়ে দুঃসাহসী পর্বতারোহী, বুনো ছাগলের যাতায়াতের প্রত্যেকটা পথ যার নখদর্পণে, কুলাউ আর তার বিকৃত চেহারার অনুসারীদের পথ দেখিয়ে যে অনায়াসে নিয়ে যেতে পারে কালালাউয়ের যে-কোনও খাঁজে।
‘ভাল প্রশ্ন করেছ,’ জবাব দিল কুলাউ। ‘কারণ, আমরা কাজ করব না মাইল মাইল ব্যাপী আখ খেতগুলোতে যেখানে একদা শান্তিতে চরে বেড়িয়েছে আমাদের ঘোড়া, আর তা টের পেয়েই সাগরপাড় থেকে এনেছে তারা চীনা ক্রীতদাস। এবং চীনা সেই ক্রীতদাসদের সঙ্গেই এখানে এসেছে বিশ্রী এই চীনা রোগযে-রোগে ভুগছি আমরা আর যে-রোগের কারণে তারা আমাদের বন্দি করতে চায় মোলোকাইয়ে। জন্মেছি আমরা কাউয়াইয়ে। অন্য দ্বীপগুলোতেও ছিলাম আমরা, কেউ এখানে কেউ সেখানে, ওয়াহুতে, মাউইয়ে, হাওয়াইয়ে, হনলুলুতে। কিন্তু যেখানেই থাকি না কেন বারবার আমরা ফিরে এসেছি কাউয়াইয়ে। কেন ফিরে এসেছি আমরা? নিশ্চয় তার পেছনে একটা কারণ রয়েছে। কারণটা হলো, কাউয়াইকে আমরা ভালোবাসি। এখানেই জন্মেছি আমরা। বাস করেছি এখানে। গায়ে মেখেছি এখানকার আলো-বাতাস। আর তাই, এখানেই আমরা মরব যদি না যদি না আমাদের মাঝে থাকে দুর্বল মনের কেউ। এসব ভীতুদের আমরা চাই না। তারা মোলোকাই কারাগারেরই উপযুক্ত। আর আমাদের মাঝে যদি সত্যিই ভীতু থাকে, আমাদের সঙ্গে তাদের না থাকাই ভাল। আগামীকাল সেনারা নামবে সৈকতে। ভীতুরা পাহাড় থেকে নেমে চলে যাক তাদের কাছে। সেনারা দ্রুত তাদের পাঠিয়ে দেবে মোলোকাইয়ে। আমরা এখানে থাকব, এবং লড়াই করব। কিন্তু আমরা মরব না, জানি। আমাদের আছে রাইফেল। তোমরা জান, দুর্গম পথ এখানকার এতই সরু যে সেখানে পাশাপাশি দু’জন মানুষ আসার কোনও উপায় নেই, আসতে হবে একজনের পেছনে আরেকজন, হামাগুড়ি দিয়ে, আর আমি, কুলাউ, একদা যে ছিল নিহাউয়ের এক রাখাল, সরু সেই পথে একাই মোকাবিলা করতে পারি একহাজার সেনাকে। আর এই যে কাপাহেই, একদা যে ছিল বিচারক, আজ তাকে খোঁজা হচ্ছে ইঁদুরের মত, ঠিক যেমন খোঁজা হচ্ছে আমাকে আর তোমাদের। সবাই শোনো তার কথা। সে জ্ঞানী মানুষ।’
কাপাহেই উঠে দাঁড়াল। একদা সে ছিল বিচারক। পড়াশোনা করেছে পুনাহুর কলেজে। পাশাপাশি বসে পানাহার করেছে ধর্মপ্রচারক আর ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষাকারী জমিদার, দলপতি আর বিদেশী শক্তির উচ্চ ক্ষমতাসীন প্রতিনিধিদের সঙ্গে। হ্যাঁ, এমনই ছিল কাপাহেই। কিন্তু আজ সে যেন সত্যিই শিকারীর তাড়া খাওয়া এক ইঁদুর, মানবিক আতঙ্কের পঙ্কিল গর্তে এতটাই নিমজ্জিত যে একইসঙ্গে সে এখন উঠে গেছে আইনের উর্ধে এবং তলিয়ে গেছে আইনের নিম্নে। মুখ জুড়ে পচনে সৃষ্ট ছোট ছোট গর্ত ও ভ্রƒ আর পাতাবিহীন চোখের গনগনে দৃষ্টি ছাড়া তার চেহারা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
‘আমাদের ঝামেলা না করাই ভাল,’ শুরু করল সে। ‘আমরা একা একা থাকতে চেয়েছি। কিন্তু যদি তারা আমাদের একা থাকতে না দেয়, তাহলে ঝামেলা সৃষ্টির দায় নিয়ে তাদের ভোগ করতে হবে শাস্তি। তোমরা দেখেছ, আঙুল আর নেই আমার।’ সবাইকে দেখাবার জন্যে ওপরে তুলল সে তার আঙুলবিহীন হাতটা। ‘তবু এখনও রয়ে গেছে আমার বুড়ো আঙুলের একটা গাঁট যা পুরনো দিনের মত আজও টানতে পারে রাইফেলের ট্রিগার। আমরা কাউয়াইকে ভালোবাসি। এখানেই আমরা বরং বাস করব, আর এখানেই মরব, কিন্তু আমাদের বন্দি হতে দেব না মোলোকাইয়ে। এই রোগ আমাদের নয়। আমরা কোনও পাপ করিনি। ঈশ্বরের বাণী প্রচারক আর ব্যবসায়ীরা এনেছে এই রোগ, তাদের কুলি ক্রীতদাসগুলোর মাধ্যমে। আমি বিচারক ছিলাম। আইন আর বিচার আমার বেশ ভালভাবেই জানা আছে, আর তাই তোমাদের বলতে চাই যে একজন মানুষের দেশ চুরি করা, তাকে চীনা রোগে রোগগ্রস্ত করা, আর তারপর তাকে যাবজ্জীবন কারাগারে বন্দি করা অন্যায়।’
‘ছোট্ট এই জীবন, আর দিনগুলো যন্ত্রণায় ভরা,’ বলল কুলাউ। ‘এস সবাই, পান করে আর নেচে আমরা যথাসাধ্য সুখী হবার চেষ্টা করি।’
পাথুরে একটা গুহা থেকে লাউয়ের খোলা বের করে দেয়া হলো সবাইকে। লাউয়ের খোলাগুলো ভরা টাই লতা (ঞর) থেকে চোলাই করা তীব্র মদে। খানিক পর তরল সেই আগুন যখন তাদের স্নায়ু বেয়ে পৌঁছে গেল মগজে, এখন যে তারা আর পুরুষও নয় নারীও নয় সে-কথা ভুলে আবার যেন তারা হয়ে গেল স্বাভাবিক পুরুষ আর নারী। যে-মহিলাটির শূন্য কোটর বেয়ে নামছিল তপ্ত অশ্র“, আবার তার ধমনিতে ধমনিতে সঞ্চারিত হলো উত্তেজক জীবন, একটা হাওয়াইয়ান গিটারের তারে ঝঙ্কার তুলে কণ্ঠ চিরে বের করল সে এমন এক বর্বর ভালোবাসার সুর যেমনটা হয়ত একমাত্র শোনা যেত আদিম পৃথিবীর অরণ্য-গহীনে। সুর তার ভেসে বেড়াল বাতাসে ভর করে, মৃদু উদ্ধত সেই সুরে বিপথে যাবার প্রলোভন। একটা মাদুরের ওপর, মহিলার গানের তালে তালে নাচতে লাগল কিলোলিয়ানা। নাচে তার মনোভাবের সন্দেহাতীত প্রকাশ। তার নাচের প্রত্যেকটা ছন্দে ছন্দ তুলেছে ভালোবাসা, আর তার পাশেই মাদুরের ওপর নেচে চলেছে এক মহিলা যার ভারী নিতম্ব আর উদার স্তনে ফুটেছে রোগ-ক্ষয়িষ্ণু মুখের বিপরীত এক কাহিনী। এই নাচ জীবন্মৃতদের নাচ, কারণ, তাদের বিকৃত শরীরের গভীরে এখনও লালিত হচ্ছে জীবন আর আকুলতা। শূন্য কোটর থেকে তপ্ত অশ্র“ ঝরানো মহিলা গেয়েই চলল তার ভালোবাসার গান, উষ্ণ রাতে নর্তক-নর্তকীরা নেচেই চলল তাদের ভালোবাসার নাচ, যতক্ষণ না লাউয়ের খোলা হাতবদল হতে হতে তাদের সবার মগজে হামাগুড়ি দিতে লাগল স্মৃতি আর কামনা। মাদুরের ওপর নাচতে থাকা মহিলার পাশাপাশি নাচল হালকা-পাতলা এক কুমারী, সুন্দর মুখ তার সম্পূর্ণ অবিকৃত, কিন্তু ওঠানামা করা বাহুতে রোগের ধ্বংসলীলা। আর দুর্বোধ্য শব্দ তোলা বানরাকৃতির দু’জন নাচল আলাদা আলাদা ; অদ্ভুত, উদ্ভট সে-নাচে ভালোবাসার হাস্যকর অনুকরণ।
কিন্তু মহিলার ভালোবাসার গান থেমে গেল মাঝপথে, লাউয়ের খোলা নামাল পানকারীরা, বন্ধ হলো নাচ, সবার চোখ এখন নিচের সাগরের দিকে যেখানে এইমাত্র চন্দ্রালোকে গা ভাসিয়ে ওপরে উঠে গেছে একটা রকেটের নিস্তেজ আলো।
‘সেনারা এসে গেছে,’ বলল কুলাউ। ‘আগামীকাল লড়াই হবে। আমাদের এখন ভালভাবে ঘুমিয়ে প্রস্তুতি নেয়া উচিত।’
কুষ্ঠরোগীরা তার আদেশ মেনে হামাগুড়ি দিয়ে চলে গেল তাদের নিজ নিজ আশ্রয়ে। জোছনায় বসে রইল কেবল নিশ্চল কুলাউ, হাঁটুর ওপরে তার আড়াআড়িভাবে রাখা রাইফেল, দৃষ্টি অনেক নিচের সৈকতে নোঙর করা নৌকাগুলোর ওপর।
আশ্রয় হিসেবে কালালাউ উপত্যকার শেষ প্রান্ত নির্বাচন করাটা বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে। খাড়া পাথুরে দেয়ালের ওপর দিয়ে পেছনে যাবার পথটা একমাত্র কিলোলিয়ানার চেনা থাকার ফলে সে ছাড়া যে-কোনও মানুষ কুষ্ঠরোগীদের গিরিসঙ্কটে পৌঁছুতে চাইলে তার প্রায় খুরধার একটা শৈলশিরা ধরে আসা ছাড়া উপায় নেই। পথটা বড়জোর বারো ইঞ্চি চওড়া। দু’পাশেই মুখ ব্যাদান করে আছে অতল খাদ। একবার পা হড়কালেই, সোজা সে-মানুষ নেমে যাবে ডান বা বামপাশের মৃত্যুগহ্বরে। কিন্তু কোনওমতে পথটা পেরোলেই নিজেকে সে দেখতে পাবে পার্থিব এক স্বর্গে। পুরো জায়গাটা জুড়ে যেন এক গাছপালার সাগর; সবুজে মোড়া পাথুরে দেয়ালগুলো, ঝুলে আছে রাশি রাশি আঙুরলতা, খাঁজে খাঁজে উঁকি মারছে অজস্র জাতের ফার্ন। কুলাউয়ের শাসনকাল শুরু হবার পর মাসের পর মাস অনুসারীদের নিয়ে তাকে লড়াই করতে হয়েছে সবুজ এই সাগরের সঙ্গে। শ্বাসরোধী জঙ্গলকে বারবার পিছু হটিয়ে দিতে হয়েছে সেগুলোর কবল থেকে বুনো কলা, কমলা আর আমকে রক্ষা করার খাতিরে। কিছু কিছু ফাঁকা জায়গায় জন্মেছে বুনো অ্যারারুট, টারো আর তরমুজ; এসব ছাড়া যেখানেই প্রবেশ করতে পেরেছে সূর্যালোক সেখানেই সোনালি ফলভারে নুয়ে পড়ছে বুনো পেঁপের অসংখ্য গাছ।
কুলাউকে এই আশ্রয়ে তাড়িয়ে নিয়ে আসা হয়েছে সৈকতের পাশের নিচু উপত্যকা থেকে। এখান থেকেও যদি বারবার তাড়া খায় তাহলেও কোনও অসুবিধে নেই, জড়াজড়ি করে থাকা অসংখ্য পর্বতচুড়োর ফাঁকফোঁকরের গিরিসঙ্কটগুলো চেনা আছে তার, প্রজাদের সেখানে নিয়ে গিয়ে শুরু করতে পারবে সে নতুন করে বসবাস। এখন রাইফেল পাশে নিয়ে বসে আছে সে, লতাপাতার ফাঁক দিয়ে লক্ষ করছে সৈকতের ওপর সেনাদের গতিবিধি। সঙ্গে করে কামান এনেছে তারা, আয়নার মত সেগুলোর গা থেকে প্রতিফলিত হচ্ছে সূর্যালোক। খুরধার শৈলশিরাটা ঠিক তার সামনে। সেখানে পৌঁছাবার পথ ধরে এগিয়ে আসছে খুদে ক’জন মানুষ। সে জানে, ওই যে অনেক দূর থেকে এগিয়ে আসছে, তারা সেনা নয়, পুলিশ। তারা ব্যর্থ হলেই কেবল মাঠে নামবে সেনারা।
বাঁকা একটা হাত রাইফেলের নলের ওপর বোলাল সে আদরের ভঙ্গিতে, নিশ্চিত হয়ে নিল যে সাইট একদম পরিষ্কার আছে। নিহাউ থাকতেই গুলি করা শিখেছে সে, দ্বীপটার কেউই তার অব্যর্থ নিশানার কথা ভোলেনি। যতই এগোল, খুদে থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল মানুষগুলো। সে পাল্লা মাপল মনে মনে, বিবেচনা করল বয়ে যাওয়া তীব্র বাতাসের কথা, ভাবল লক্ষবস্তু অনেকখানি নিচে থাকায় ওপর দিয়ে গুলি করার সম্ভাবনা নিয়ে। কিন্তু সে গুলি করল না। তারা পথটার মুখে না আসা পর্যন্ত সে জানতে দিল না তার উপস্থিতি, তারপর নিজেকে প্রকাশ না করেই কথা বলল ঝোপের ভেতর থেকে।
‘তোমরা কি চাও?’ জানতে চাইল সে।
‘আমরা কুষ্ঠরোগী কুলাউকে চাই,’ জবাব দিল স্থানীয় পুলিশদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসা নীলচোখো এক আমেরিকান।
‘এক্ষুনি ফিরে যাও,’ বলল কুলাউ।
লোকটাকে সে চেনে, ডেপুটি শেরিফ, তার তাড়া খেয়েই নিহাউ থেকে এসেছে সে কালালাউ উপত্যকায়, তারপর উপত্যকা থেকে এই গিরিসঙ্কটে।
‘তুমি কে?’ জানতে চাইল শেরিফ।
‘আমিই কুষ্ঠরোগী কুলাউ,’ জবাব ভেসে এল।
‘তাহলে আড়াল ছেড়ে বেরিয়ে এস। আমরা তোমার সন্ধানেই এসেছি। জীবিত বা মৃত, তোমার মাথার মূল্য ধরা হয়েছে একহাজার ডলার। তুমি পালাতে পারবে না।’
ঝোপের ভেতর থেকে জোরে হেসে উঠল কুলাউ।
‘বেরিয়ে এস!’ আদেশ দিল শেরিফ, কিন্তু সে আদেশের জবাব দিল না কেউ।
শেরিফকে পুলিশদের সঙ্গে পর&