July 25, 2008

উৎসর্গ

উৎসর্গ




মাহবুব উল আলম চৌধুরী
সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক
বজলুর রহমান
সেলিম আল দীন

চিঠিপত্র

আপনজনেষু জাহিদ আনোয়ার,

অভিনন্দন-অভিনন্দন-অভিনন্দন তোমায় জাহিদ। তুমি অনুজ। খুশিকে কিভাবে প্রকাশ করবো, খুঁজে পেলাম না। উপযুক্ত কোন শব্দবন্ধ। তাই আমার এই দীনতা প্রকাশ! হয়তো তুমি এখন শহীদ মামুন পৌর মার্কেটের দ্বিতলে বিদ্যাসুন্দরের ঘরে। এই চিঠি পেতেই তুমি সহাস্যে চিৎকার করে উঠবে-সাবাস্, সাবাস্ পাঠান হৃদয়। বুকে জড়িয়ে ধ’রে আমার বুকে মুখটা কাৎ ক’রে কিছুক্ষণ ছায়ার হৃদয়ে কান দিয়ে রক্তে রক্তে ধমনীর আনন্দনৃত্য অথবা অন্য কিছু শোনার চেষ্টা করলে! ঘোর কেটে গেলে দেখলে ‘আমি কোথায়? শূন্য! তবু দু’মুঠোয় হৃদয় বন্দী!
হাতে পেয়ে পড়েছি-গুরুদেবের আশ্রম-বিশ্বভারতী। সে দিন বাড়িতে সামান্য কিছু কথায়, আলোচনা করে এমন দু’একটি সংক্ষিপ্ত কথা বলতে তোমার মুখটা পূর্র্ণিমার দীপ্ত চাঁদে যেন একখণ্ড মেঘ ঢেকে দিয়ে চলে গেল। পরক্ষণেই তোমার কলমের সহজিয়া সুরের কথা বলতেই আবার সেই হাস্যোজ্জ্বল চন্দ্রমা। এমন করে তোমায় কে কথা বলতে শেখালো? দৃশ্য ছবির পর ছবি। ছুটন্ত রেলগাড়ি স্বপ্ন সওয়ারি নিয়ে ছুটে চলেছে। জানালার খোলা হাওয়ায় দু’টো চোখ শুধু খুঁজছে আর খুঁজছে কোথায় অরূপ রতন। ছুটে চলেছে কোন বিরাম নেই - কোথাও থামা নেই -কতো ছবি চলেছে লাল কাঁকড় মাটির দেশে। ধূ ধূ প্রান্তর। দূরে দূরে প্রাচীন তালগাছ। দাঁড়িয়ে আছে কার অপেক্ষায়? বটগাছ, শাল, মহুয়া, পলাশ, রুদ্র পলাশ, ছাতিম এর দীর্ঘ ছায়া অশোকের বনে। লাল খোয়াই মাটির প্রান্তর বুক চাপা আকাঙ্খা নিয়ে অপেক্ষা করেছে কাকে আহবান করবার জন্যে? এই মাটিতেই তো প্রাচ্য প্রতীচ্যের আত্মার এক বাঙময় ছন্দিত মিলনরূপ। সব কিছুতেই সেই এক। দেশ, কাল অঞ্চলের সংকীর্ণ বেড়া ভেঙে গেলÑমহামিলনের সে কী অসীম তৃপ্তি!
এই সব অনূভূতি, তার প্রতিক্রিয়া সবই তোমার চোখ দিয়ে দেখা। গুরুদেবের আশ্রমে যখন যেখানে গেছো সবাই আপন করে নিয়েছে। নিছক চা বিক্রেতা, ছোট ঝুপড়ি হোটেলের সামান্য মালিক এমনকি দিন আনা দিন খাওয়া রিক্সাচালক কেউ উপেক্ষা করেনি। কারণ, সব সময়েই চলছে সেথায় ভালবাসার মরশুম। আবার যারা এসেছেন কবিতা উৎসবে বিভিন্ন অঞ্চল বা জেলা থেকে যে যুবক যুবতী-বা নবীন-প্রবীন তারাও কেমন যেন লতার মতো আঁকড়ে ধরেছে-একে অপরকে বিশেষ করে জাহিদ তোমাকে ভালবাসা মাখিয়ে। কবি-লেখক সবাই তোমাকে [বাংলাদেশকে] পাওয়ার জন্য কত কাছের মানুষ, আপন মানুষ ভেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল গেস্ট হাউসেও সবার প্রীতি যেমন ছিল তেমনি আবার ছন্দপতনের কথা, সামান্য হালকা তুলির টানে এঁকেছো। রাতে ঘুম হয়নি কয়েক জন অতিথির নাক ডাকার লয়কারিতে। যত গভীর হয়েছে রাত দ্রুত তালে বেজে চলেছে। সমে আর ফেরেনি কেউ। বাইরে মাঘী পূর্ণিমার রাত নিশীর মতন ডেকে নিয়ে গেছে সামনের মাঠে, দুধের মতো জ্যোৎসনা ঢালা ঘাসের কাছে। অনিবার্যভাবেই মনে হয় এও তো সেই স্বপন পারের ভালবাসার ডাক। অপূর্ব অচিন্তনীয় তোমার অনুভব। সবাইকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করেÑদেখে যাও দেখে যাও হেথা গুরুদেবের আশ্রমে সম্প্রীতির ইকোলজি! প্রসঙ্গক্রমে আর একটি বিষয়ের উল্লেখ এখানে না করলে সমস্ত বিষয়টির প্রসঙ্গ অর্থাৎ গুরুদেবের আশ্রম, শান্তিনিকেতন নিয়ে অনেক কথা না বলা থেকে যায়। প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সমরেশ বসুর ‘দেখি নাই ফিরে’-র অংশ বিশেষ লেখায় উল্লেখ করে শান্তিনিকেতন সম্পর্কে এতক্ষণ যা বললাম অর্থাৎ বিশ্ব আত্মার কথা, তা উপলব্ধিতে আসত না। এখানে ‘দেখি নাই ফিরে’ বিষয়টিই হচ্ছে বিখ্যাত ভাস্কর রামকিঙ্কর যাঁর ছোঁয়ায় শান্তিনিকেতন সত্যিকারের বিশ্বনিকেতন হয়ে উঠেছে। কদমতলার মেথর পল্লীর সেই ভাস্কর যিনি ভ্রুক্ষেপ করেননি তাঁকে নীচ অন্ত্যজ ভেবে নানা কথার কাঁটা ফোটানো সত্ত্বেও । ভাবা যায় না, এই পূণ্যভূমি, তীর্থক্ষেত্র সেই ‘ইয়ে’ বাড়ি থেকে আসা মানুষটির স্পর্শে আরো উজ্জ্বল হয়েছে সূর্যের মতন। এমন নজির বিশ্বের কোন দেশেই নেই। তাই তো, সম্প্রীতির এমন মুক্ত উঠোন কোথা আছে? কথায় আছে সবতীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার। সেই রকমই, জাহিদ, তোমার গুরুদেবের আশ্রম শান্তিনিকেতন, এই বই অনেক পড়ার পর একবার পড়লে শান্তিনিকেতনের আত্মাকে স্পর্শ করা যায়। সত্যি তোমার কথায় বিশ্বাস করে বলি রবীন্দ্রনাথের কাছে, শান্তিনিকেতনের কাছে খুঁজে পাওয়া যায়। সীমার মাঝে অসীমের সন্ধান। কবি সম্মেলনের প্রধান অতিথি সুপ্রিয় ঠাকুর যথার্থই বলেছেন যে,‘ বাংলাদেশের বন্ধুর [জাহিদ] উপস্থিতিতে কবি সম্মেলন [শ্রীনিকেতন মিলনায়তন] আন্তর্জাতিকতায় রূপ লাভ করেছে...........। আপনার জন্য বিশ্বভারতীর দুয়ার খোলা রইল।’
জাহিদ, তুমি সত্যিই আন্তর্জাতিক। অনেক অনেক ভালবাসা নিও। ভগ্নী শবনমকে স্নেহাশির্বাদ দিও।

ইতি আ: সুনীল খাঁ
৭.২.২০০৮

এ সংখ্যায় যাঁরা লিখেছেন ------------

সনৎ কুমার সাহা, অর্থনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক। যতীন সরকার, প্রাবন্ধিক, গবেষক। তপন রুদ্র, কবি, প্রাবন্ধিক, প্রফেসর [অব.], ইংরেজি বিভাগ, সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ, রংপুর। হরিশংকর জলদাস, কথাসাহিত্যিক, সহযোগী অধ্যাপক, সাতকানিয়া সরকারী কলেজ, চট্টগ্রাম। ম আ ব সিদ্দিকী, কবি, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। রাশেদ উন নবী, গল্পকার, সম্পাদক-বৈশম্পায়ন, কানাডা প্রবাসী। শুক্লা মৈত্র, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ। মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন, প্রাবন্ধিক, গবেষক, সহযোগী অধ্যাপক, ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজ। শ্যামল ভট্টাচার্য্য, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যাভিনেতা, প্রাক্তন-শিক্ষক, বগুড়া জেলা স্কুল। মাসুদ আহমেদ, ছোট গল্পকার,উপন্যাসিক ও সঙ্গীত শিল্পী। প্রণব চক্রবর্তী, গল্পকার, সরকারী কর্মকর্তা। রাশেদুল ইসলাম বাবু, কবি, গল্পকার, সমাজকর্মী। আশেক হোসেন, কবি, গল্পকার, চিকিৎসক। জাফর আলম, অনুবাদক, গল্পকার ও সাংবাদিক। খসরু চৌধুরী, অনুবাদক, উপন্যাসিক, গল্পকার ও শিশু সাহিত্যিক। অসিত দত্ত, রম্য লেখক, সম্পাদক-অভিজ্ঞান, শ্রীরামপুর, পশ্চিমবঙ্গ। নির্মল মৈত্র, প্রকৌশলী, সাবেক, পরিচালক ইন্ডিয়ান ওয়েল, রাজ্য সরকার, পশ্চিমবঙ্গ। জুলফিকার মতিন, কবি, প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। মুকুল বসু, কবি, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, বালুরঘাট, পশ্চিমবঙ্গ। সুনীল খাঁ, কবি, ছড়াকার, সাবেক জনসংযোগ আধিকারীক, বালুরঘাট, পশ্চিমবঙ্গ। মৃণাল চক্রবর্তী, সম্পাদক-দধীচি, বালুরঘাট, পশ্চিমবঙ্গ। পুষ্পজিৎ রায়, গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক-জোয়ার, অধ্যাপক [অব.] বাংলা, মালদা কলেজ, পশ্চিমবঙ্গ। দীপংকর বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি, সম্পাদক-সংবাদ দধীচি, বালুরঘাট, প.বঙ্গ। সুজন হাজারী,কবি। মুহাম্মদ হাসান ইমাম,কবি, প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। হেনা সুলতানা, কথাশিল্পী, সহকারী শিক্ষিকা, ভারতেশ্বরী হোমস, মির্জাপুর। মাহমুদ মুসা, ছড়াকার। বসন্ত পাল, কবি, পশ্চিমবঙ্গ। শিপ্রা সেনধর,কবি,অধ্যাপক, আলীপুরদুয়ার, পশ্চিমবঙ্গ। আলম আরা জুঁই, কবি, একটি বেসরকারি ইন্সুরেন্স কোম্পানির আঞ্চলিক কর্মকর্তা, কুষ্টিয়া। মাহমুদ হাসান মিলন, রাজনৈতিক কর্মী। হারুন রশিদ, কবি, সমাজকর্মী। অদিতি চৌধুরী, কবি। স্বরোচিষ সরকার, প্রফেসর, আইবিএস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সুশান্ত বর্মন, প্রাবন্ধিক, প্রভাষক, উলিপুর সরকারি কলেজ, কুড়িগ্রাম। শাহেদ জাব্বার, অনুসন্ধানী লেখক। শিবনাথ শাস্ত্রী, উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজসেবক, পণ্ডিত। কাপুর চান্দ, কবি।

সম্বর্ধনা প্রদানের জন্য আমন্ত্রণপত্র

[‘অঞ্জলি লহ মোর’-এর সম্পাদককে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির ‘কিরাত ভূমি’ সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকার পক্ষ থেকে, যে আমন্ত্রণপত্র পাঠিয়েছে সেই আমন্ত্রণপত্রটি এখানে ছেপে দেয়া হলো।-সম্পাদক]

মাননীয়
শ্রীযুক্ত জাহিদ আনোয়ার
সম্পাদক- ‘অঞ্জলি লহ মোর’
বিদ্যাসুন্দর
২৯ শহীদ মামুন মিউনিসিপ্যাল মার্কেট
কাছারী রোড, নওগাঁ-৬৫০০
বাংলাদেশ

বিষয় :- সম্বর্ধনা প্রদানের জন্য আমন্ত্রণপত্র

মহাশয়,
আগামী ২৩শে মার্চ ০৮ রবিবার বিকেল ৪ ঘটিকায় স্থানীয় ‘সুভাষ ভবন’ [বাবু পাড়া] মিলনায়তন কক্ষে আমরা উত্তরবঙ্গ ও বাংলাদেশের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে সম্বর্ধনা জানাবার জন্য একটি মহতী অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত শহর নওগাঁ থেকে সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে আপনি যে সাফল্যের নজির সৃষ্টি করেছেন তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরম প্রিয় হয়ে উঠেছে। আমরা ভারতের নাগরীকরাও আপনার সাফল্যে মুগ্ধ। উপরি উক্ত অনুষ্ঠানে আমরা আপনাকে ‘কিরাত ভূমি সাহিত্য পুরস্কার’ ২০০৮ প্রদান করে গর্ব অনুভব করব।

তাই উক্ত দিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে সম্বর্ধনা গ্রহণ করতে সনির্বন্ধ অনুরোধ রাখছি।

বিনয়াবনত

আনন্দ গোপাল ঘোষ অরবিন্দ কর
সভাপতি সম্পাদক
কিরাত ভূমি কিরাত ভূমি
সংস্কৃতিপাড়া, জলপাইগুড়ি

রবীন্দ্রনাথঃ বেঁচে থাকার মন্ত্রসাধক

রবীন্দ্রনাথঃ বেঁচে থাকার মন্ত্রসাধক
যতীন সরকার



‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ‘বেঁচে’ ছিলেন’-এই বাক্যটি পড়তে গিয়ে মনের ভেতর একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়েছিলাম। সব মানুষই তো সারা জীবন বেঁচে থাকে। আমরা জানি যে যার জীবন আছে সেই বেঁচে আছে। জীবন আছে অথচ বেঁচে নেই-এমন কোন মানুষের কথা কি আমরা ভাবতে পারি কখনো? তাহলে, ‘রবীন্দ্রনাথ সারা জীবন ‘বেঁচে’ ছিলেন’-এ-রকম কথার অর্থ কী দাঁড়ায়?
কথাটা লিখেছিলেন প্রয়াত মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় ‘রবীন্দ্রমানস বিশ্লেষণের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। পুরো প্রবন্ধটি পড়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম যে বেঁচে থাকা সম্পর্কে আমাদের চলতি ধারণাটা মোটেই সঠিক নয়। আসলে কোনো রকমে জীবন ধারণ করে থাকাটাই বেঁচে থাকা নয়। বেঁচে থাকা মানে প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠতে থাকা, নব নব সৃষ্টিশীলতার মধ্যে দিয়ে জীবনকে সার্থক করে তুলতে থাকা, পুরনো পশ্চাৎপদ ভাবনার বৃত্ত ভেঙে কেবলই সামনে এগিয়ে যেতে থাকা, প্রতি মুহূর্তে নবীন তাজা বর্ধিষ্ণু হয়ে উঠতে থাকা, সর্বদা বুকের ভিতর মাঝে বিশ্বলোকের সাড়া অনুভব করতে থাকা, ব্যক্তিক স্বার্থের ক্ষুদ্র গণ্ডি অতিক্রম করে বৈশ্বিক ও সর্বমানবিক স্বার্থের মহাসমুদ্রের দিকে জীবন প্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকা। এর বিপরীত অবস্থাতেও মানুষ জীবন ধারণ করতে পারে নিশ্চয়ই, অনেক মানুষ তেমনটি করেও, এবং এ-রকম মানুষ দীর্ঘজীবীও হয়। কিন্তু দীর্ঘজীবী হয়েও সে-মানুষ বেঁচে থাকে না, প্রাণ ধারণ করে থাকে মাত্র। শুধু দিন যাপনের, শুধু প্রাণ ধারণের গ্লানি বহন করে চলে কেবল। সে রকম মানুষ দীর্ঘজীবী হয়েও সারা জীবন কেবল মরতে থাকে। গতিশীলতাই বেঁচে থাকার লক্ষণ, গতিহীনতাই মরে যাওয়ার। শুধু গতিহীনতাই নয়, পশ্চাৎগতিরও অপর নাম মরণই। যে মানুষ চিন্তায় চেতনায় কর্মে আচরণে প্রতিনিয়ত রক্ষণশীলতাকেই আঁকড়ে ধরে থাকে, প্রগতিশীলতা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, অভ্যস্ততার গণ্ডি অতিক্রম করে যেতে ভয় পায়, সে-মানুষ জীবিত থেকেও মৃত।
এ-রকম জীবন্মৃত মানুষদের বিপরীতে ছিল রবীন্দ্রনাথের অবস্থান। জীবনের ঊষালগ্নে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ হওয়ার পর থেকে সামনের দিকে যে পথচলা শুরু করেছিলেন তিনি, জীবনমঞ্চ থেকে বিদায় নেবার পূর্ব অবধি তাঁর সেই সম্মুখ গতির বিরাম ঘটে নি, এক মুহূর্তের জন্যও পেছনে ফেরেন নি। এবং এ কারণেই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী মনোবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে ধরা পড়েছে যে অন্য অন্য মানুষের মতো রবীন্দ্রনাথ শুধু জীবনধারণ করেন নি, তিনি সারা জীবন বেঁচে ছিলেন।’
মনোবিজ্ঞানী ধীরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় পাভলভীয় মনোবিজ্ঞানের সূত্র গ্রয়োগ করে রবীন্দ্র মানসে বিচ্ছিন্নতার স্বরূপ বিশ্লেষণ করেছেন, রবীন্দ্র-চিত্রকলার স্বরূপ নির্ণয় করেছেন, ‘সোনার তরী’ কবিতাটির বিশিষ্ট তাৎপর্য উদ্ঘাটন করেছেন, রবীন্দ্র-চিত্রকলার স্বরূপ নির্ণয় করেছেন। সে-সব বিষয় আমার আলোচ্য নয়। ধীরেন্দ্রনাথ যা বলেন নি, এবং রবীন্দ্রনাথের সারা জীবন বেঁচে থাকার বিষয়টি আমার নিজের উপলব্ধিতে যে ভাবে ধরা পড়েছে, আমি কেবল তারই সংক্ষিপ্ত বয়ান এখানে উপস্থাপন করতে চাই।

দুই

‘মরণরে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান’Ñএকেবারে বালক বয়সে এমন কথা বলেন যে-কবি, কৈশোরোত্তীর্ণ সেই কবির কণ্ঠেই শোনা যায়Ñ‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে/ মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’ তবে মরতে নাÑচাইলেই যে না-মরে থাকা যায় না, সে কথা নিশ্চয়ই তাঁর অবিদিত ছিল না। কিন্তু মরবার আগে বারবার না মরে কি করে বেঁচে থাকা যায়, সে মন্ত্রও তাঁর জানা ছিল। সেই মন্ত্রের সাধনাই তিনি করেছেন সারা জীবন, সেই মন্ত্রই তাঁকে অব্যাহতভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাঁর সমস্ত সৃষ্টি জুড়েই সেই মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছে।

যে নদী হারায়ে স্রোত চলিতে না পারে
সহস্র শৈবাল দাম বাঁধে আসি তারে;
যে- জাতি জীবনহারা অচল অসাড়
পদে পদে বাঁধে তারে জীর্ণ লোকাচার।’

Ñ‘চৈতালি’র এই ‘দুই উপমা’ কবিতাতে রবীন্দ্রনাথ জাতির জীবনে যা প্রত্যক্ষ করেছেন, প্রতিটি ব্যক্তির জীবনেও তা সমভাবেই সত্য। আপন ব্যক্তি-জীবনে সেই সত্য সম্পর্কে সদা সচেতন ছিলেন বলেই তিনি কখনো ‘অচল অসাড়’ হয়ে যান নি, চিন্তায় ও আচরণে ‘জীর্ণ লোকাচারের’ বাঁধনে বাঁধা পড়েন নি।
এমন কি, তাঁর ঈশ্বর অনুধাবনা ও ঈশ্বর-সাধনা সম্পর্কেও এই একই কথা প্রযোজ্য। পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিন্তার প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকার নিয়েই তিনি ব্রাহ্ম হয়েছিলেন, এবং আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের দায়িত্বও পরম যোগ্যতার সঙ্গে পালন করেছিলেন। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজের ঈশ্বর-ভাবনাতেও যে একটি যান্ত্রিকতা বিদ্যমান, সেই যান্ত্রিকতার বন্ধনে বাঁধা পড়ে থাকলে যে জীবন অচল অসাড় হয়ে যাবে, সে বোধে উপনীত হতেও তাঁর বেশি সময় লাগে নি। ‘নৈবেদ্য’র কবিতাগুলিতে তাঁর যে ঈশ্বর-ভাবনার প্রকাশ দেখি, ‘গীতালি-গীতিমাল্য-গীতাঞ্জলি’র ঈশ্বর ভাবনা তা থেকে স্পষ্টতই পৃথক। ‘নৈবেদ্য’ কাব্যে এক অতিবর্তী ঈশ্বরের প্রতি নৈবেদ্য অর্পণ করেছেন যে-কবি, ‘গীতাঞ্জলি’তে কিন্তু সেই কবিই দেবালয়ে বা মন্দিরে বসে ঈশ্বরের ‘ভজন পূজন সাধন আরাধনা’ করাকে ধিক্কার জানিয়ে ঈশ্বর-সন্ধান করেছেন সেই স্থানে ‘যেথায় মাটি ভেঙে করছে চাষা চাষ, পাথর ভেঙে কাটছে যেথায় পথ, খাটছে বারোমাস’।
‘গীতাঞ্জলি’র মাধ্যমে অসাধারণ বিশ্বস্বীকৃতি লাভের পরও কবি এক আসনে বসে থেকে খ্যাতির চর্বিত চর্বণের মধ্যেই সুখের সন্ধান করেন নি, ‘পাগলামি তুই আয়রে দুয়ার ভেদি’ বলে ‘ঝড়ের খেয়া’য় চড়ে বসেছেন। ‘বলাকা’র কবির মধ্যে ব্রাহ্ম সমাজের সম্পাদককে খুঁজে পাওয়া তো অসম্ভবই, ‘গীতাঞ্জলি’র কবির থেকেও তখন তিনি দুস্তর ব্যবধানে চলে এসেছেন। শুধু ‘কবি’ রবীন্দ্রনাথ নন, এক অসাধারণ প্রতিবাদী ‘ব্যক্তি’ রবীন্দ্রনাথকেও আমরা এ-যুগেই প্রত্যক্ষ করি। শাসকশ্রেণীর অন্যায়ের প্রতিবাদে এ-যুগেই তিনি শাসকদের দেয়া ‘ছার’ [স্যার] উপাধি পরিত্যাগ করে একাত্ম হয়ে যান অত্যাচারিত শাসিতদের সঙ্গে। প্রতিবাদের মধ্য দিয়েই স্থাপন করেন বাঁচার মতো বাঁচার দৃষ্টান্ত।
তাঁর প্রতিবাদ অবিশ্যি কোনোদিনই একান্ত স্থূল ও উগ্র হয়ে ওঠেনি। তাই তিনি কারো কাছেই প্রতিবাদী কবি বলে প্রতিভাত হন না। কিন্তু অভিনিবেশ সহকারে তাঁর সৃষ্টিসম্ভার অনুধাবন করলে দেখা যাবে যে ‘ভাঙ্ ভাঙ্ ভাঙ্ কারা, আঘাতে আঘাত কর’-জীবন প্রভাতে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ-জাত এই আত্মপ্রেরণাই তাঁকে সারা জীবন প্রতিবাদী করে রেখেছে। এই আত্মপ্রেরণাতেই তিনি প্রতিনিয়ত প্রতিবাদের বাণী সৃজন করেছেন ও ভাঙার গান গেয়েছেন। তবে কবিসার্বভৌমের সেই বাণী ও গান অসাধারণ শিল্পিত বলেই তাঁর প্রতিবাদ আর প্রতিবাদ থাকে না, পরিণত হয় জীবনের আনন্দময় সংবাদে; ভাঙার গানে ধ্বনিত হয় সৃজনের সুর ও সার্থকভাবে বেঁচে থাকার মন্ত্র।

তিন

পৃথিবীতে একলা মানুষ কখনো বেঁচে থাকে না, অন্য মানুষের সঙ্গে যোগযুক্ত হয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়, সমষ্টির বেঁচে থাকা থেকে কোনো মতেই ব্যষ্টির বা ব্যক্তির বেঁচে থাকাকে আলাদা করে ফেলা যায় না। অথচ, সমাজ যখন থেকে শ্রেণীবিভক্ত হয়েছে তখন থেকেই সংখ্যায় লঘিষ্ট কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে যে কর্তৃত্বশীল শ্রেণী, সেই শ্রেণীর মানুষেরা নিজেদের বেঁচে থাকাকে নিশ্চিত করতে চায় অন্য সকলের বেঁচে থাকার অধিকার হরণ করে। এ-রকম একটি সমাজে জন্ম নিয়েও আমাদের কবির আকাক্সক্ষাÑ‘মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই’। কিন্তু তাঁর চারপাশে তাকিয়ে দেখেন যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানবই এখানে মানবের মতো বেঁচে নেই, তারা শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোনো মতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণ রেখে দেয় বাঁচাইয়া’। কবি খুব ভাল করেই জানেন যে এ-রকম ভাবে কিছুতেই বেঁচে থাকা যায় না, মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চাই অনেকগুলো উপকরণ। সেই উপকরণগুলোর কথাই তিনি মন্ত্রের মতো উচ্চারণ করেন,Ñ ‘অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্তবায়ু / চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ -উজ্জ্বল পরমায়ু,/ সাহস বিস্তৃত বক্ষপট।’
কিন্তু এই সব চাওয়া তো বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনেই পাওয়ায় পরিণত হয় না। তাই তারা কেউই সারা জীবন বেঁচে থাকতে পারে না। ‘সারা জীবন’ কেন, জীবনের কোনো পর্যায়েই কি তারা বেঁচে থাকে? বেঁচে থাকার প্রাথমিক উপকরণের অভাবেই তারা দৈন্যদশা গ্রস্ত, এবং এ-রকম দৈন্যদশাই সর্বদা তাদের দুর্ভাবনায় ভাবিত করে রাখে। এমন দৈন্য ও দুর্ভাবনাময় জীবন আসলে মরণেরই নামান্তর। সেই মরণকে প্রতিহত করার দায়িত্ববোধ থেকেই কবি নিজেকেই ডাক দিয়ে বলেন,Ñ‘কবি তবে উঠে এস যদি থাকে প্রাণ/ তবে তাই লহ সাথে, তাই করো আজি দান।’
সমষ্টির জীবনকে অর্থময় করে তোলার জন্যÑসমাজের দৈন্যদশাগ্রস্ত মানুষগুলোর বেঁচে থাকার পথ খুলে দেয়ার জন্য যাঁরা নিজেদের প্রাণ দান করেছেন তাঁরা হয়েছেন মৃত্যুঞ্জয়। অর্থাৎ জীবনে তো বটেই, মরণের পরও তাঁরা বেঁচে আছেন ও থাকবেন। তাই তাঁদের সম্পর্কে কবির নির্দ্বিধ উচ্চারণÑ‘নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান / ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’
এইভাবেই রবীন্দ্রনাথ নিজে যেমন থেকেছেন, তেমনই অন্য সকলকে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়েছেন, এবং মরণজয়ী মানুষদের জন্য শ্রদ্ধার ডালি বহন করে এনেছেন।

চার

গড়পড়তা প্রায় সব মানুষেরই একটা বিশেষ বয়সের পর দেহের বৃদ্ধি যেমন রুদ্ধ হয়ে যায়, তেমনি হয় মনেরও। কারো কারো মন তো একেবারে পেছনের দিকেই হাঁটতে থাকে। চিন্তায় গতিহীনতা দেখা দেয়, অথবা প্রগতির বদলে প্রতিক্রিয়াশীলতা কিংবা রক্ষণশীলতাকে আশ্রয় করে। অর্থাৎ জীবিত থেকেও বেঁচে থাকার বদলে এরা মরণ প্রক্রিয়ার অধীন হয়ে যায়। এমনটি যে শুধু নিতান্ত সাধারণ মানুষের বেলাতেই ঘটে, তা নয়। অনেক প্রথিতযশা শিল্পী চিন্তাবিদের পক্ষেও এ-রকম পরিণতি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। মনে হয় এ-রকমটিই যেন সাধারণ নিয়ম।
সেই নিয়মেরই উজ্জ্বল ব্যতিক্রম রবীন্দ্রনাথ। বয়সে যত তিনি বার্ধক্যের দিকে এগিয়েছেন ও শরীরে জরার অধিকার বিস্তৃত হয়েছে, তাঁর মন তত যৌবনদৃপ্ত ও জরামুক্ত হয়ে উঠেছে। সাতষট্টি বছর যখন তাঁর বয়স, সেই ১৯২৮ সনে, ‘মহুয়া’ কাব্যের অসাধারণ প্রেমের কবিতাগুলি তিনি রচনা করলেন। গতানুগতিক ধারায় যাঁরা চিন্তা করতে অভ্যস্ত, তাঁরা বৃদ্ধ কবির কলমে এমন ‘যৌবন বেদনারসে উচ্ছল’ প্রেমের কবিতার উৎসারণকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারলেন না। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন,Ñ‘আযৌবন কবি প্রেমের কবিতা লিখিতেছেনÑকতভাবে কত রীতিতে তাহার প্রকাশ। আজ কবির সাতষট্টি বৎসর বয়সে জরাশ্রিত দেহের মধ্যে যে-মনের বাস তাহা প্রেম-কাকলীতে আকস্মিক ভাবে মুখর হইয়া উঠিল। এই কবিতা গুচ্ছ তাঁহার পাঠকসমাজকে অত্যন্ত বিব্রত করে ; যাঁহারা রবীন্দ্রনাথকে কেবল ভক্তসাধক রূপেই কল্পনা করিতে ভালবাসেন, তাঁহারা কবির লেখনী হইতে এই বৃদ্ধ বয়সে এই শ্রেণীর কবিতা প্রত্যাশা করেন নাই।’
তাঁরা তো তা প্রত্যাশা করবেনই না। তাঁদের দৃষ্টিতে বার্ধক্য মানেই ‘শেষের সেদিন ভয়ংকরের’ কথা ভাবতে ভাবতে পরলোক স্বর্গলাভের আশায় ভগবানের শ্রীচরণে ভক্তিনিবেদন মাত্র! কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো এমন স্বর্র্গাভিলাষী ভক্তসাধক নন। অনেক পূর্বেই তিনি ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ নিয়ে এসে মর্ত্যরে মৃত্তিকায় প্রেমিক রূপে অবস্থান গ্রহণ করে নতুন ভাবদ্যোতনায় বেঁচে উঠেছেন, দেহের জরা বা বার্ধক্য তাঁর সেই চিরজীবী ও চিরযুবা প্রেমিক মনকে একটুও স্পর্শ করতে পারে না। তাই শুধু ‘মহুয়া’র প্রেমের কবিতাগুচ্ছই নয়,-এসময়েই তিনি রচনা করেন একেবারে আধুনিকতম প্রেমের উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’। এরও পরে বায়াত্তর বছর বয়সে ১৯৩৩-এ প্রকাশ করেন ‘দুইবোন’ ও ১৯৩৪-এ তেয়াত্তর বছর বয়সে ‘মালঞ্চ’। দুটোই প্রেমের উপন্যাস। নতুন কালে নরনারীর প্রেমভাবনাতেও যে যুগান্তর ঘটে গেছে, সেই বিষয়টি যে-রকম গভীরতা ও সূক্ষ্মতার সঙ্গে অনুভব করলেন সত্তরোর্ধ বয়সের রবীন্দ্রনাথ, সে-রকমটি করা কোন তরুণ বয়সী কবি বা কথাশিল্পীর পক্ষেও সম্ভব হয় নি। এখানেই তো রবীন্দ্রনাথের অনন্যতা, প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার প্রমাণ।
শুধু প্রেমভাবনাতেই নয়, সমাজচেতনা ও ইতিহাস-বীক্ষার জগতেও রবীন্দ্রনাথ প্রগতিশীলতার ধারক হয়েই বেঁচে থেকেছেন। এক্ষেত্রেও তাঁর বয়স যত বেড়েছে, ততই তিনি রক্ষণশীলতা থেকে দূরে সরে এসে নবীনতর ও অগ্রসর মতাদর্শের সমর্থক হয়ে উঠেছেন। তাই দেখি: যে-রবীন্দ্রনাথ এক সময় রুশ বলশেভিকদের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি ছিলেন একান্ত বিমুখ, ১৯২৬ সালেও যিনি ‘ফ্যাসিজম’ ও ‘বলশেভিজম্’কে একই দৃষ্টিতে দেখে এই দুয়ের মধ্যেই ‘গুণ্ডাতন্ত্রের আখড়া’র খোঁজ পেয়েছিলেন ও বলেছিলেন ‘রাশিয়ার জারতন্ত্র ও বলশেভিকতন্ত্র একই দানবের পাশমোড়া দেওয়া,’ সেই রবীন্দ্রনাথই এর মাত্র চার বছর পরে ১৯৩০ সনে সোভিয়েত রাশিয়া পরিভ্রমণ করে উপলব্ধি করলেন যে এ-দেশটি ‘অন্য কোনো দেশের মতোই নয়। একেবারে মূলে প্রভেদ। আগাগোড়া সকল মানুষকেই এরা জাগিয়ে তুলছে।’ শুধু তাই নয়। তাঁর অনুভবে এল যে রাশিয়ায় ‘না এলে এ-জন্মের তীর্থ দর্শন অত্যন্ত অসমাপ্ত থাকত।’
প্রতিনিয়ত বাঁচার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ না-থাকলে অনুভবের এ-রকম প্রগতিমুখী রূপান্তর কারো ভেতর ঘটতে পারে না। অবিরাম রূপ থেকে রূপান্তরের পথে হেঁটে হেঁটেই তো রবীন্দ্রনাথের সারা জীবন বেঁচে থাকা।
তাঁর ঈশ্বর-ভাবনাতেও ক্রমরূপান্তর ঘটতে আমরা দেখেছি। জীবনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে তিনি যে-সব সৃষ্টি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছেন, সে-সবের মধ্যে ঈশ্বর ভাবনার কোনো নিদর্শন তো প্রায় খুঁজেই পাই না। ঈশ্বর-ভাবনা থেকে তিনি পুরোপুরি সরে এসেছিলেনÑ এমন কথা বললে হয়তো বিতর্কের মুখে পড়তে হবে। তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তিনি মানুষকেই তাঁর চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছিলেন,Ñএ-কথা বললে যদি কেউ বিতর্ক জুড়ে দিতে চান, তা হলে সেটি হবে একান্তই কুতর্ক। জীবনের শেষ নববর্ষে ‘সভ্যতার সংকট’ শীর্ষক ভাষণে যে বললেন,Ñ‘মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’Ñ সেটি অনাগত কালের মানুষের জন্যও বাঁচার মন্ত্র রূপে অক্ষয় হয়ে থাকবে।

পাঁচ

সারা জীবনভর তিনি বাঁচার মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন, সকলকে সেই মন্ত্র শিখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সমস্ত সৃষ্টি কর্ম বেঁচে থাকার মন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। নিজে তিনি প্রবলভাবে গভীর ভাবে বেঁচে থেকেছেন। আমরাও তাঁর মন্ত্রদীক্ষিত হলে সে-রকম প্রবলতা ও গভীরতা নিয়েই বেঁচে থাকতে পারবো, কেউই আমরা ‘মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না।’
তবে মৃত্যুভয়ে ভীত থেকে কিংবা মৃত্যুকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে কিছুতেই বেঁচে থাকা যাবে না। কবি আমাদের স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়ে গেছেন

মৃত্যুকে যে এড়িয়ে চলে মৃত্যু তারেই টানে
মৃত্যু যারা বুক পেতে লয় বাঁচতে তারাই জানে।

জলগদ্য

জলগদ্য
হরিশংকর জলদাস

আষাঢ় মাসকে খ্যাতিমান করেছেন মহাকবি কালিদাস। সে সংস্কৃত সাহিত্যে। ‘মেঘদূত’ কাব্যে তিনি লিখেছেনÑ‘আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্ট সানুং/ বপ্রক্রীড়াপরিণতগজ প্রেক্ষণীয়ং দদর্শ’। সেই থেকে শিক্ষিতজনের কাছে আষাঢ় মাস যেন বেদনা জাগানিয়া মাসে রূপান্তরিত হয়েছে। আর শ্রাবণ তো বাঙালির কাছে বেদনার মাসই। এই মাসে রবীন্দ্রনাথের তিরোধান-২২শ্রাবণ। আষাঢ়-শ্রাবণ নিয়ে যে বর্ষাকাল, তা বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতিতে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। শিক্ষিত ভদ্রজনের কাছে এ দুটো মাস এক ভাবে মূল্যবান; কিন্তু প্রান্তজনের কাছে এ দুটো মাস অন্য অর্থ বহন করে। এরা এদের কাছে জীবনায়নের মাস। চাষার কাছে যেমন, জেলের কাছে তেমনি। হাইল্যা এবং জাইল্যা-এ দু’সম্প্রদায়ের প্রাণভোমরা লুকিয়ে আছে আষাঢ়-শ্রাবণে। ভাত এবং মাছ-এ দুটোর উৎপাদক চাষী ও জেলে। দুটোই বাঙালির প্রধান খাদ্য। কিন্তু প্রধান এই খাদ্য সররাহকারীরা ভদ্রজনের অবহেলার পাত্র। তাঁরা রেগে গেলে এই দুই সম্প্রদায়ের নাম তুলে গালি দেন। বলেনÑলোকটার ব্যবহার হাইল্যার মতন, জাইল্যার মতন ব্যবহার করছ কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি।
চাষা এবং মেছো- এরা তথাকথিত শিক্ষিত সমাজে তিরস্কৃত হলেও বাঙালি সমাজকাঠামোর প্রধানতম খুঁটি এরা। এদের নিয়ে ভাবনার প্রয়োজন আছে। জেলেরা জলপুত্র। জলের খেয়াল-খুশিতেই এদের বাঁচা-মরা। জলাশয়ে জল ফুরিয়ে গেলে এদের নিদানের শুরু, আর জলধার যৌবনবতী হয়ে উঠলেই এদের জীবনে সুদিন আসে।
জলের ঋতু বর্ষাকাল। আষাঢ়-শ্রাবণÑজলের আধার। বর্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলেদের হাসি-কান্না আর স্বাছন্দ্য। জেলেদের প্রধানতম পুজো-উৎসব আষাঢ়-শ্রাবণকে ঘিরেই আবর্তিত। মা-গঙ্গা, মা-মনসা তাদের প্রধান দেবী। মা-গঙ্গা তাদের অন্নদাত্রী আর মা-মনসা তাদের রক্ষাকর্ত্রী এটাই তারা বিশ্বাস করে মনে প্রাণে। মা-গঙ্গা মৎস্যের দেবী, জলশস্যরা তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন, তাঁরই ইচ্ছায় মাছেরা চলাফেরা করে। তিনি ইচ্ছে করলে দরিদ্র বলরাম জলদাসকে হাজারপতি করতে পারেন, আবার নিকুঞ্জবিহারীর মাছধরার নৌকা জলে ডোবাতে পারেন। তাই তিনি প্রণম্য ধীবর সম্প্রদায়ের কাছে। আর মনসা, তিনি সর্পের দেবী। তারই ইঙ্গিতে বেহুলার স্বামী মরে সর্প্রাঘাতে। সর্প জলজ প্রাণী, জেলেরা জলচারী। তাই সর্পদেবীর সঙ্গে বিরোধ নৈব নৈব চ। মনসা জেলেদের ভীতিমূলক শ্রদ্ধা পান।
এই দুই প্রবলপ্রতাপী দেবীর সন্তুষ্টির জন্যে জেলেরা দুটো মাসকে নির্ধারণ করেছে। আষাঢ় মাসে গঙ্গাপুজো আর শ্রাবণ মাসে মনসাপুঁথিপাঠ।
মূলত, জলের অনিশ্চিত জীবনে ভাসতে ভাসতে তারা নদী-সমুদ্রের বিচিত্র খেয়ালের হদিস পায় না। হদিস না পেয়ে ভীত হয় আর তখন অবিশ্বাসের কাছে মাথা নত করে। তাদের বিশ্বাসের তালিকায় উঠে আসে জিনপরী, মেছোপেত্নী, দক্ষিণরায় বা বনবিবি, পীরবাবাদের অলৌকিক শক্তি। এরই পথ ধরে তাদের জীবনে এসেছে মা-গঙ্গা, এসেছেন স্বার্থপর সর্পদেবী মনসা। গাঙজননী ও সর্পদেবীর অনুগ্রহ-নিগ্রহ সম্পর্কিত গল্পগাথাগুলোতে আছে জেলেজীবনের ভিত্তিভূমি। এছাড়া নানা প্রথাগত লোকজ সংস্কারে আবদ্ধ কৈর্বতদের জীবনবৃত্ত। নৌকা নিয়ে সমুদ্রযাত্রা করার দিনক্ষণ পাঁজি দেখে স্থির করে। নৌকা ছাড়ার সময় পাঁচ পীর বদরগাজীর ধ্বনি দেয়। যাত্রার সময় কচ্ছপ দেখাকে অলক্ষণ বলে বিশ্বাস করে তারা। দিনের প্রথমে নৌকায় ওঠেই তারা গাঙজল দিয়ে গলুই ধুয়ে দেয় এবং গাঙজননীর উদ্দেশে প্রণাম জানায়। মৎস্যশিকারী জেলেরা সর্বদা মা-গঙ্গার নাম স্মরণ করে।
আষাঢ় মাসের প্রথম দিকে জেলেরা মা-গঙ্গার পুজো দেয় ঘটা করে। এটা সর্বজনীন পুজো। নির্বিশেষে তারা এ পুজোয় চাঁদা দেয়। বামুন ঠাকুর পাঁজি খুলে তিথি-নক্ষত্র দেখে পুজোর আয়োজন করে তারা। সকাল থেকেই বামুন ঠাকুর পুজো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কয়েক জন এয়োস্থি জেলে নদী বামুনকে কাজে সাহায্য করে। সমুদ্রকূলে উত্তরমুখি করে মাটির একটি বেদি তৈরি করা হয়। সেই বেদির ওপর মাটির একটি ঘট বসানো হয়; তার ওপর রাখা হয় ডাঁটাসুদ্ধ আস্ত নারকেল ও আম্রপল্লব বেদির পেছনে পোঁতা হয় একটি বাচ্চা কলাগাছ। ঘটের সামনে কলাপাতার ওপর সাজানো হয় সাগু-চিনি কলা-আম-কাঁঠাল-কমলা,আখ প্রভৃতি সহযোগে নৈবেদ্য। পুজোর সামনে গভীর শ্রদ্ধার জ্বালানো হয়। ধূপ-মোমবাতি। জেলে পাড়ার সবাই এই পুজোয় সামিল হয়।
গঙ্গাপুজোর প্রধান আকর্ষণ পাঁঠাবলি। মা-গঙ্গার সন্তুষ্টির জন্যেই এই বলি। মা-গঙ্গা অদৃশ্যমান হলে কী হবে, তার সন্তুষ্টির আয়োজনটা হয় জবর। ইয়া বড় পাঁঠাকে স্নান করানো হয়। কপালে দেয়া হয় সিঁদুরের ফোটা, গলায় পরানো হয় ফুলের মালা। যে কেউ পাঁঠা বলি দিতে পারে না। এজন্যে দরকার সাহস ও শক্তি। প্রত্যেক জেলে পাড়ায় এরকম হিম্মতওয়ালা লোক থাকে দু’একজন। বলির আগের রাতে তারা শুদ্ধাচারী থাকে। বলি না দেয়া পর্যন্ত তারা উপবাসী থাকে। সকালে স্নান করে নতুন ধুতি পরে তারা। জোরে গাঁজা টেনে উন্মাতাল হয়ে খড়গ তুলে নেয় হাতে।
পুজোর সময় বহদ্দাররা নতুন জামা কাপড় পরে বিনীত ভাবে পুজো-মণ্ডপে অবস্থান করে। মনের কালিমা মন থেকে যথাসম্ভব ঠেলে বার করে দেয়। তারা বিশ্বাস করে হিংসাহীন মানুষের ওপর মা-গঙ্গার আশীর্বাদ বর্ষিত হবে অঝোর ধারায়। বলির পাঁঠাকে নিয়ে আসা হয় হাঁড়িকাঠের কাছে। বামুন ঠাকুর ছাগলের কপালে চন্দনের ফোঁটা দিতে দিতে উচ্চারণ করেনÑ
‘ওঁ গণেশায় নম:, ওঁ গঙ্গায় নম:. . . .।’
হাঁড়িকাঠে ছাগলের গলা ঢুকিয়ে দিলে ঘাতক ‘জয় মা-গঙ্গা’ বলে খড়গ তোলে। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আর নারীরা দু’হাত দিয়ে চোখ ঢাকে, ছাগলের মাথা দূরে গড়ায়, প্রচণ্ড খিঁচুনিতে ধরটা অস্থির থাকে বেশ কিছুক্ষণ।
পুজোর স্থান থেকে দূরে জলের ধারে সার সার একগাছি নৌকা বাঁধা থাকে। নৌকার গায়ে আলকাতরার গভীর ছোপ। আগা ও পাছায় থাকে নানা রঙের পত্র-ফুলের অঙ্কন। গভীর বিশ্বাসে জল পুত্ররা নৌকার আগায় মানুষের দুটো চোখ আঁকে। গভীর সমুদ্রে এই চোখ দুটোই নিজ মালিকের জাল খুঁজে নেয়।
গঙ্গাপুজো শেষে জেলেনারীরা বা কুলায় পঞ্চপ্রদীপ জ্বালিয়ে নৌকাগুলোর কাছে যায়। উলুধ্বনি দিতে দিতে কৌটা থেকে ডান হাতের মধ্যমা দিয়ে সিঁদুর তুলে নেয়। নৌকার আগায় আগায় টিপ দিতে দিতে বলে Ñ

‘অ মা গঙ্গা! তুঁই আঁরার মিক্কে ইক্কিনি ফিরি চাইও।
তুঁই আঁরার জীবন, তুঁই আঁরার মরণ। তুঁই দয়া গড়ি
আঁরার সোয়ামিরে বেশি মাছ নো দিলে পোয়াছা
লই উয়াস থাইক্যম। মা গঙ্গা, আঁরারে দয়া গইজ্যো।
আইয়েদ্যে বছর যে-ন আঁরা আবার তোঁয়ার এই রইস্যা
গড়ি পুজো দিত পারি।’

এর পর কয়েকটি শুভদিনে জলপুত্ররা নৌকাগুলো নিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ে। ঝড়-জলের আষাঢ়ের দিনগুলো ফুরোতে থাকে। রাতে সমুদ্র ফুঁসে ওঠে। এসবকে অবহেলা করে জীবনবাজি রেখে জলপুত্ররা জল-অভিযান অব্যাহত রাখে। তাদের জীবন থেকে ধীরে ধীরে দারিদ্র্যের লাঞ্চনার দাগ মুছতে শুরু করে। মা- গঙ্গার দয়ায় তাদের জাল ভরে যায় নানা রকম জলশস্যে। লইট্যা, ইলিশ, ফাঁইস্যা, করকইজ্যাইচা, সুন্দরী, পোপা, ফাঙ্গাস, অলুয়া, রিশ্শা, ঘোড়া, ইত্যাদি মাছে নৌকার খোল ভরে ওঠে।
আসে শ্রাবণ মাস। জেলেদের জীবনে এ মাস সুখ আনে, স্বস্তি আনে। আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র-আশ্বিনÑএই চার মাসে জলপুত্রদের হাঁড়িতে ভাত থাকে, পরনে নতুন কাপড় থাকে, মুখে থাকে তৃপ্তির হাসি। শ্রাবণ মাসেই তারা মগ্ন হয় মনসা পুজোয়। গোটা শ্রাবণ মাস ধরে মনসা পুজো চলে প্রতিটি জেলের ঘরে ঘরে। মন্দির অথবা ঘরের কোণায় মাটির বেদিতে মাটির ছোট্ট জলভর্তি কলসি বসানো হয়। সেই ঘটে থাকে বাঁশপাতা ও বাসকপাতা। প্রতিদিন নানা রকম নৈবেদ্য দিয়ে মনসার প্রতীক এই ঘটের সামনে পুজো দেয় জেলে নারীরা। মনসাকে জেলেনারীদের বড় ভয়। তাদের পুত্র-স্বামী জলে জলে ঘুরে বেড়ায়। সেখানে বাস করে বিষধর সর্প। আর সর্প মনসা আজ্ঞাবহ। তাই মনসাকে তৃপ্ত রাখতে মাসব্যাপী মনসার পুজো দেয় জেলেপতœীরা।
প্রতিরাতে মনসাপুঁথি পাঠ হয়Ñএর বাড়ি ওর বাড়ি। কোনোদিন সুবলদের উঠানে আবার! কোনোদিন অন্নচরণের দাওয়ায়। পুঁথিপাঠের সঙ্গে থাকে বিচ্ছেদ গান। হারমোনিয়াম, জোরখাই, কাঁসার আওয়াজে গোটা জেলেপাড়া জুড়ে নিবিড় মাদকতা সৃষ্টি হয়। বৈরাগী ঢুইল্যা খুব সুন্দর জোরখাই বাজায়। দীনবন্ধু যখন হারমোনিয়ামে রাধা-বিচ্ছেদের সুর তোলে,শ্রোতার চোখে জল আসে। মনসা পুঁথিপাঠের আসর বসে গোলাকার হয়ে। চারদিকে অন্নচরণ, জগবন্ধু, তারিণীচরণ, মুরালীরা বসে। নারীরা বসে একটু দূরে, পুরুষের চোখ এড়িয়ে। সন্ধ্যে নামতেই গৃহস্থালি কাজ সেরে নেয় এরা। কাইমপতি, ধনকুমারী, গোলকেশ্বরী, সরলা, চরণদাসী, শ্যামতারারা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে।
মনসা পুঁথিপাঠের প্রধান আকর্ষণ নাউট্যাপোয়া। শ্রাবণ মাসের জন্যে নাউট্যাপোয়াদেরকে ভাড়ায় আনা হয়। ভাড়া মাসে ৪০০/৫০০ টাকা। শরীর খারাপ না করলে প্রতিরাতের পুঁথিপাঠের আসরে তাকে নাচতে হয়। বয়স তাদের ১৪/১৬। বন্দর, বুরুমচরা, করল, কোলা প্রভৃতি গ্রাম থেকে নাউট্যাপোয়াদের আনা হয়। মেয়েদের পোশাক পরে, মুখে কড়া পাউডার মেখে, বুকে মেকি স্তন লাগিয়ে আসরে ঘুরে ঘুরে নাচে তারা। প্রত্যেক জেলে পল্লীতে কিছু স্মার্ট তরুণ থাকে, তাদেরকে বলে ছাণ্ডাপোটা। এরাই নাউট্যাপোয়ার দেখভাল করে।
পুঁথিপাঠের আসরে ঢুইল্যারা কাঁধে ঢোল নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। ঢোলে দু’হাতে বোল তোলে। মুখে তাক-ধিনা-ধিন-তাক। ধীরে ধীরে ঢোলোর আওয়াজ বড় হয়। সঙ্গে হারামোনিয়ামের মৃদুলয়। লাউট্যা পোয়া আসরের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়। হাত জোর করে বন্দনাগীতি শুরু করে -

‘শত নমস্কার আমার শত নমস্কার,
অধীনে গান করে সভার মাঝার।
আমার শত নমস্কার।’

বন্দনাগীতি শেষে লাউট্যাপোয়া ঝুম-ঝুমা-ঝুম আওয়াজ তুলে নাচতে শুরু করে মহিলা মহলে গা টেপাটেপি শুরু হয়। পাতনী বুড়ি বলে ওঠে Ñ‘কী সোন্দর নাচরে বাজি। নাচ দেই এই বয়সতও বুক গান খালি খালি লাআর।’
পাড়ার সর্দাররা আসরের সামনের দিকে বসে মুখে গাম্ভীর্য, চোখে অপার কৌতূহল। নাউট্যাপোয়া নাচতে নাচতে কখনও এর কোলে বসে, কখনও ওর গায়ে উদ্ধতস্তনের ধাক্কা দেয়। বয়স্ক কারো গলা জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করলেই আসরে হাসির ধুম পড়ে যায়। রসিকজনেরা টাকার নোট নাউট্যাপোয়ার উদ্দেশে আসরে ছুঁড়ে মারে। এই টাকা সে হাতে তুলে নেয় না। নাচের তালে তালে কোমর বাঁকিয়ে চিৎ হয়ে মুখ দিয়ে সে টাকা তুলে নেয়। দর্শকদের মধ্যে তারিফের ধ্বনি ওঠে। আসর গরম হয়ে ওঠে। তখন, যখন নাউট্যাপোয়া কারো মুখের কাছে গিয়ে হাঁটুর ওপর শাড়ি তুলে সামনে পিছনে দোলা খেতে খেতে নাচে।
আসর ভাঙার পর যে যার ঘরে চলে যায়। তখন নাউট্যাপোয়াকে ঘিরে ছাণ্ডাপোয়াদের হল্লা পড়ে। এসব তরুণদের দেহ শীতল করে নাউট্যাপোয়ারা। গানে-কামে-আনন্দে-রিরংসায় শ্রাবণ মাসে জেলে পল্লী সরগরম থাকে।
বর্ষা শেষে জেলেপাড়ায় নেমে আসে অভাবের জান্তব থাবা। পরবর্তী আটটি মাস পিষ্ট হতে থাকে তারা। দারিদ্র্যময় জীবন কাটাতে কাটাতে অপেক্ষা করে পরবর্তী বর্ষাকালের জন্যে।
এই জেলে সমাজে ক্ষুদ্রতার অভাব নেই। হিংসা-বিদ্বেষ এই সমাজকে কুরে কুরে খায়। দলাদলিতে কখনো কখনো রক্তারক্তিও ঘটে। এতসবের পরেও তারা একত্র হয় গঙ্গাপুজো, মনসাপুঁথিপাঠের আসরে। এই সকল পুজো-পার্বন প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠীকে এখনো একই সূত্রে গেঁথে রেখেছে।

নির্মলেন্দু গুণের কাব্যকামকুশলতা

নির্মলেন্দু গুণের কাব্যকামকুশলতা
সুশান্ত বর্মন

মানুষের সক্রিয় কামপ্রবণতাকে বিভিন্ন সমাজে, মতাদর্শে, দর্শনে, নীতিবোধে অশ্লীল এবং অসমর্থনযোগ্য বলে মনে করা হয়ে থাকে। কামজ প্রত্যাশার স্বচ্ছন্দ প্রবহমানতাকে একাধিক সামাজিক নিয়মনীতি নৈতিকতার নামে বিভিন্ন সময়কালে বিভিন্ন নিষেধের বেড়াজালে আটকে রাখার চেষ্টা করতো, এখনও করে। আধুনিক যুগেও নারী-পুরুষের এই সহজাত, সাবলীল, আনন্দময় ও ব্যাকুল সম্পর্কটিকে বিবাহ নামক কৃত্রিম প্রতিষ্ঠানের দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়। কিন্তু প্রাচীন ভারতবর্ষীয় নীতিবোধে নারী-পুরুষের এই সহজ সম্পর্ককে অস্বীকার করা হতোনা। তাই সেই যুগে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা ছিল মুক্ত ও স্বাধীন। জীবনযাত্রার অবাধ ও সানন্দ প্রবাহ প্রাচীন ভারতবর্ষে প্রচলিত ছিল। তাই সেই সময়ের সমাজ ছিল স্বচ্ছন্দ ও প্রাণোচ্ছল। নর-নারীর মৌলিক সম্পর্ক যৌনসম্বন্ধ নিয়ে সেকালের সমাজে কোনো কূপমণ্ডূকতা ছিল না। নারী যেমন নিজের শরীরের প্রয়োজনে কাক্সক্ষা করতো পুরুষশরীর, পুরুষও তেমনি নিজের প্রয়োজনেই যাঞ্চা করতো নারীশরীর। শরীর বিষয়ে কোন সংস্কার তাঁরা মনের গোপন গহীনে লালন করতো না। বাঁধা হয়ে দাঁড়াতো না কোনো সামাজিক রক্তচক্ষু। এমনি অবাধ, স্বচ্ছন্দ, উদার, চিরকাঙ্ক্ষিত ধ্রুপদী জীবনপ্রবাহের যুগেই জন্মেছিলেন ঋষি বাৎসায়ন। সমগ্র পৃথিবীতে তিনিই প্রথম নারী-পুরুষের যৌনজীবন এবং তার বিভিন্ন দিক নিয়ে রচনা করেছেন অসাধারণ গবেষণাগ্রন্থ ‘কামসূত্র’। ‘কামসূত্র’ শাস্ত্রটির যৌক্তিকতা, মৌলিকতা, তথ্যের প্রাচুর্য অর্থাৎ বিষয়ের বিচিত্র ব্যাপকতা এত শক্তিশালী ছিল যে বর্তমানে সারা পৃথিবীতে যৌনবিজ্ঞান বিষয়ক প্রথম গ্রন্থ হিশেবে ‘কামসূত্র’ সম্মানিত হয়। এই চির আধুনিক গ্রন্থ ‘কামসূত্র’ রচনা করতে গিয়ে বাৎসায়নের থাকতে হয়েছিল যৌনবিষয়ে সন্ধানী, যুক্তিবাদী, কৌতূহলী, বিশ্লেষণপ্রবণ এবং নির্মোহ একটি মন। ঋষিসুলভ প্রাজ্ঞ অন্বেষণ দিয়ে বাৎসায়ন নারীশরীর ও পুরুষশরীরের প্রতি বর্গইঞ্চির প্রতিটি সুগন্ধকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি মৈথুন বিষয়ে পোষণ করতেন উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গী। মানব শরীরের প্রতিটি ভাঁজ-বাঁকে লুকিয়ে থাকে যে আনন্দ সেই আনন্দ অন্বেষায় বাৎসায়ন ছিলেন মৌলিক, নান্দনিক ও বৈজ্ঞানিক মনোভঙ্গীর অধিকারী। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন নর-নারী সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি শরীর। প্রেম বা ভালোবাসা নামক কল্পিত বিষয়টি মূলতঃ গাছে ফোটা ফুলের মতো বড়ই বাহ্যিক। তার রং ও সৌন্দর্যটা সহজে চোখে পড়ে কিন্তু যা মূল তা থেকে যায় চোখের আড়ালে। বাৎসায়ন অন্যদের মতো শুধু ফুল দেখে মুগ্ধ হননি। বৈজ্ঞানিক সচেতনতা নিয়ে খুঁজে বের করেছেন গাছের প্রাণের উৎস শিকড়কে তথা নর-নারীর প্রাণোচ্ছলতার শুদ্ধ উৎস কামপ্রবণতাকে।

প্রাজ্ঞ কবি নির্মলেন্দু গুণ উপলব্ধি করেছেন নর-নারী সম্পর্কের আদি ও মৌলিক উৎসটি এখনও যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। মানুষের গভীর সম্পর্ক ও আকর্ষণের ভিত্তি এখনও শরীর। মানুষ হিশেবে-পুরুষ হিসেবে নির্মলেন্দু গুণ এই ধ্রুপদী ও জৈবিক প্রত্যাশাকে প্রবলভাবে নিজের জীবনে অনুভব করেছেন। ‘বাৎসায়ন’ কাব্যটি তাঁর এই মানবিক বোধের সতেজ প্রস্ফুটন। তিনি পুরুষ হিশেবে নারীর শরীরের প্রতিটি গিরিগুহাকে, প্রতিটি স্পর্শকে, প্রতিটি আলিঙ্গনকে, প্রতিটি শীৎকারকে প্রবল প্রাণপ্রবণতায় উপভোগ করেছেন। পুরুষ নির্মলেন্দু একলব্যের অধ্যবসায়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছেন নারীর শরীর ও কামসূত্রকে। তাঁর কবি মন ও ‘কাব্যকামকুশলতা’ আশ্রয় পেয়েছে শরীর মন্থনে। তিনি জানেন মানুষের সর্বোচ্চ আনন্দের অনুভূতি ও জ্ঞানের উপলব্ধি ঘটে এই শরীর বিনিময়েই। তাই তিনিই বলতে পারেন-

“আনন্দের শ্রেষ্ঠ উৎস হচ্ছে কাম।
কাম থেকে জন্ম নিয়েছে কবি।”

জীবনচেতনার সামগ্রিক উপলব্ধির শীর্ষে দাঁড়িয়ে কবি বুঝেছেন-
“যখন আমি নগ্ন হই
তখনই আমি কবি।”

নিজে পুরুষ বলেই তাঁর কাছে নারী এক অন্য জাগতিক উল্লাসের বার্তা বয়ে আনে। যে অনাস্বাদিত অনুভূতি তাঁকে জাগিয়ে তোলে মৌনতা থেকে, সেই আনন্দলোকের উচ্চারণ তিনি ‘মুখরা নারীর মুখের নীরব ভাষা’তে পড়ে পুলকিত হন। ছুটে যান বাঞ্চিত নারীর কাছে।

“আমি যাই, আমি ছুটে যাই; আমি
কামভিখিরির মত কপর্দকশূন্য করপুটে
তোমার অগ্নির টানে ছুটে যাই, হাওয়া।”

তারপরও তিনি নিশ্চিত নন, তাঁর অন্বেষণ গন্তব্যে পৌঁছাবে কি না। তিনি মনে করেন-
“কাম নিয়ে আমি যত সাধনা করেছি,
শ্রীঅমর্ত্য সেনও মনে হয় না তত।
এই কাজে আমি যত শ্রম দিয়েছি,
তত শ্রম স্টেশনের কুলিও দেবে না।
তারপরও আমার কাটে না সংশয়,
আমার কি হয়? কোনো কিছু হয়?”

প্রকৃতিপ্রেমী কবি প্রকৃতির মাঝেই বারবার খুঁজে পান তাঁর কামচরিতার্থতা। প্রকৃতি ক্রমাগত কামসুলভ আনন্দ আহ্বান নিয়ে তাঁর সামনে নিজেকে উন্মোচন করেÑ
“রাত্রি হচ্ছে একটি কামার্ত কালো মেয়ে”
নিজেকে লুকিয়ে না রেখে তিনি অকপটে বর্ণনা করেন তাঁর পুনর্জন্মের কথামালা-
“বর্ষা ছিল পাকতে-শুরু ডাঁসা ভুবির স্তনে,
দিন-দুপুরে আঁধার করা যোগীশাসন বনে।
বর্ষা ছিল ধান-ডোবানো মাঠ-ভাসানো জলে,
সাঁতার কাঁটা বুনো হাঁসের কামার্ত দঙ্গলে।
তাদের কাছেই চিনেছিলাম তেপান্তরের মাঠ,
তারাই আমায় দিয়েছিল কামশাস্ত্রের পাঠ।
কামকলাতে এই যে আমার একটু বাহাদুরি,
বর্ষাবালার কাছ থেকে তা করেছিলাম চুরি।”

তিনি স্ববিরোধী নন। তাই জীবনের অন্তরস্থ গভীর বাস্তব এবং মানুষের মানসপটে যে সূর্যটি চির দীপ্যমান তা তাঁর কাছে অচেনা নয়। তিনি স্বীকার করেন-

“এই যে আকাশ ভরা তারা,
এই যে বাগান ভরা ফুল,
এই যে অরণ্য ভরা পাখি,
এই যে সমুদ্র ভরা জলÑ
এর সকলই তোমার লীলা,
তোমার মেহেরবাণী, সবই
গতরাত্রির কৃতকর্মের ফল।”

জীবনপ্রেমী কবি জানেন তাঁর কবিমনের গতিপথ। এ মানসবোধে কামজ অনুভূতির মূল্য এবং ভূমিকা অনেক বেশি। একারণে নিজেকে হাতের মুঠোয় তুলে ধরতে তাঁর কোনো দ্বিধা নেই।
“সেই আমাকে অধিক পায়,
যে আমাকে কামের চুলায়
কাঠের মতো পুড়িতে দেয়।....
সেই আমাকে অধিক পায়,
যে আমাকে নাড়ায় না।
যে আমাকে স্বাধীন রাখে
সে আমাকে হারায় না।”

শৈশবে মাকে হারিয়ে কবি বঞ্চিত হয়েছেন স্তনদুগ্ধসুধা পানে। স্তনতৃষ্ণা তাঁর মন থেকে কখনো মুছে যায়নি-

“আমার স্তনস্তবমুখরিত কবিতায়, তাই
দুগ্ধবতী নারীরা হয়েছে আমার ঈশ্বরী”

তিনি নারীর বুকের পুষ্পযুগলের অপরূপ শোভা প্রাণভরে উপভোগ করেছেন। বিকশিত পুষ্পদ্বয়ের গভীরে প্রাণরূপ মধু ও কামরূপ শক্তির যে বিরাট খনি লুকিয়ে আছে তার সৌন্দর্য দেখে মোহিত হয়েছেন। তিনি এই অপার্থিব গিরিদ্বয়ে কখনো দেখেছেন সন্তানের প্রাণোৎসের ঝর্ণাধারাকে আবার কখনো দেখেছেন তার অভ্যন্তরস্থ কামুক বিস্ফোরণ শক্তিকে। কামশাস্ত্রজ্ঞ যে কবি বিস্ময়ে তাকিয়ে তাকিয়ে-

“দেখিলেন সেই অপরূপ শোভা,
মনোলোভা, নিদ্রিতা, নিশ্চুপ।”

সেই তিনিই দেখেছেন সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো সুডৌল পুস্পকলি দুটি প্রস্ফুটনের জন্য অপেক্ষা করে পুরুষআঙ্গুলের সামান্য স্পর্শের, আর তারপরেই ঘটে যায় মহাবিস্ফোরণ-

“অসতর্ক পুরুষ-আঙুলের
সামান্য আঘাতে বিভাজিত হল
পরমাণু, বিস্ফোরিত হল বোমা।”

নির্মলেন্দু গুণের জীবনে কবিতা ও সেই সম্পর্কিত প্রতিটি অবস্থানই চিরকাক্সক্ষার। তিনি দেখেছেন তাঁর সমস্ত কাব্যসাধনা, কাব্যযশ এবং ‘কাব্যকামকুশলতা’র প্রধান উৎস কাম। সমকালীন বাস্তববিমুখ মানুষের কাছে তা অপরিচিত হলেও প্রেমিক কবি চণ্ডীদাশ ও বাৎসায়নকে অনুধাবন করে তিনি জেনে নিয়েছেন পরম সত্যটিকে-

“তাঁরই কল্যাণে নারীকে চিনেছি,
শিখেছি সঙ্গম কলা, রতিরঙ্গরস;
তা না হলে সকলি গরল ভেল,
কামসিদ্ধি বিনা ব্যর্থ কাব্যযশ।”

সভ্যতাগর্বী, ধর্মবাদী কিংবা নীতিবাগীশ ব্যক্তিরা মানুষের মন ও দেহকে নিরন্তর নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। হাজার বছর আগে থেকেই দেহকে মন থেকে বিযুক্ত করার চেষ্টা ছিল তাঁদের। কিন্তু মানবিক মানবতা এই নাগপাঁশ ছিন্ন করার চেষ্টা করেছে বারবার।

“মনকে ধারণ করে দেহ
নাকি দেহ মনেরই প্রকাশ?”

এই অমীমাংসিত প্রশ্ন বাৎসায়নের মতো নির্মলেন্দু গুণকেও বিক্ষত করেছে জীবনভর। অবশেষে উত্তীর্ণ যৌবনে কবি পেয়েছেন সত্যের সন্ধান। বুঝেছেন-

"মন বড় সত্য নয়
মানবের দেহই প্রধান।”

কারণ মন পাল্টায়। ক্রমাগত বাঁদরমন পাল্টায় জলের মতন। কালে কালে দেশে দেশে মন বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। কিন্তু দেহ স্থির। গ্যালিলিওর সত্যের প্রতি অবিচল আস্থার মতো দেহের প্রতি কবির আস্থা অবিচল, স্থির, অপরিবর্তনীয়। “মনকে প্রাধান্য দিয়ে, দেহকে দমন ক’রে ক’রে, আত্মপীড়ন রণে” মানুষ যতই পারদর্শীতা অর্জন করুক তা মোটেও মৌলিক ও প্রাকৃতিক নয়। তা কৃত্রিম; স্বমেহনের মতো, আত্মরতিসুখের মতো নিজেকে ক্রমাগত আলিঙ্গনে আলিঙ্গনে পীড়িত করতে থাকে। পুরুষ প্রকৃতির প্রধান সহায় নারীর কাছে কবি তাই জোর দাবী জানানÑ

“আমি চাই তুমি
আমাকে শ্রবণ কর,
আমাকে দ্রবণ কর
তোমার ভিতরে।”

বৈচিত্র্যপ্রবণ রমণীরা কবির সামনে উপস্থিত হয় বিভিন্ন রূপে। পুরুষ কবি নারীদের বিচিত্র উপস্থাপনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেন সময়ের আকাশে। তিনি বুঝে ফেলেন নারীর নূপুরশিকলে বাঁধা পড়ে গেছেন চিরকালের মতো। তবে এ নিয়ে তাঁর মনে কোনো খেদ নেই। বরং বারবার তিনি অনুভব করতে চান নারীর অগ্নিশরীর।

“আমার কাছে অগ্নির চেয়েও
উষ্ণ মনে হয়েছিল নারীকে।
তাই আমাকে বরফ-রাতে
নারীর তাতে পুড়িয়েছিলাম।
আমার কাছে লোহার চেয়েও
ভারী মনে হয়েছিল নারীকে,
তবুও তাকে শিবের মতোন
মাথায় তুলে ঘুরিয়েছিলাম।”

একালে মানুষ ভেঙ্গে বহুধাবিভক্ত হয়ে গেছে। ধর্মনীতি, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতি নীতির অজুহাতে মানুষ ক্রমাগত পরস্পরের কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সভ্যতার আলোয় আলোকিত মানুষ আলোর প্রাবল্যে বিপন্ন বোধ করছে; শত্রু ভাবছে সকলকে। এমন বিদঘুটে সমাজ কাঠামোতেও মানব দরদী কবি প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়ান মানুষ ও মনুষ্যত্বকে। সমাজ-রাষ্ট্র অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি খুঁজে বেড়ান প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মানুষকে। কিন্তু সমকালীন কবি লক্ষ্য করেন মানুষ এখন আর অনেকাংশে মানুষ নেই। কখনো পশুবৃত্তি কখনো কবিতাবৃত্তি কখনো স্বার্থমুখী কখনো বৃক্ষমুখী অর্থাৎ এক মহাকালিক স্ববিরোধিতা মানুষকে অনেকাংশেই মানবেতর প্রাণীতে পরিণত করেছে। কৃত্রিম জৌলুষ ও চাকচিক্যতেই মানুষ এখন আচ্ছন্ন। যা মোটেও মানুষের মানবিক বোধের সচেতন প্রকাশ ঘটায়না। মানুষের এই সামগ্রিক স্ববিরোধিতায় ক্ষুব্ধ কবি মনে করেন-

“মানুষকে কখনোই আমার
শ্রেষ্ঠ প্রাণী মনে হয়নি।
আমি মানুষের চেয়ে বেশি
ভালোবাসি হাঁসের সঙ্গম।”

তাই বলে কবি মানুষের এই কালিক সীমাবদ্ধতা দেখে হতাশায় ভেঙ্গে পড়েন না। জীবনের মূল্য খুঁজতে তিনি মানুষ থেকে দূরে চলে যাননি। বরং মানুষের মাঝেই বারবার খুঁজেছেন মানুষের মানবিক মনুষ্যত্ব।

“অনিবৃত্ত কামের অগ্নিতে
যখন ডালির জেব্রার মতো
ঝলসে গিয়েছে এই দেহ,
তখন গণিকার পদতলেই
আমি খুঁজে পেয়েছিলাম
আমার বেহেশ্ত।”

এবং তিনি অহংকারীও নন। নিজেকে বারবার প্রশ্ন করেন-

“মাঝে-মাঝে আমি ভাবি, ভাবি
আমার কাব্যকামকুশলতা নিয়ে
এই যে আমি গর্ব করে চলেছি,
আমার কি আদৌ কিছু হচ্ছে?”

‘বাৎসায়ন’ গ্রন্থের প্রথমেই তিনি নিজের ভিতরে, মানুষের ভিতরে খুঁজেছেন, খুঁজতে বলেছেন গভীর ও গোপন সেই অনুভূতিটিকে যে অনুভূতি মানুষকে জাগিয়ে রাখে জীবনভর, মানুষকে উপলব্ধি করায় জীবিত বলে। আবিষ্কার করতে চেয়েছেন পৃথিবীর প্রথম ও চিরকালীন মানবসত্যকে। বুঝতে চেয়েছেন মানুষ হিশেবে আমাদের আগ্রহ, দায়িত্ব, কর্তব্য ও উদ্দেশ্যকে। পাঠ করতে চেয়েছেন মানব মনের গোপন গ্রন্থকে। যা তিনি পেয়েছেন তাই আসলে সমগ্ররূপ ধারণ করেছে তাঁর সামগ্রিক ‘কাব্যকামকুশলতা’য়। কালব্যাপী নিরন্তর অন্বেষণে তাঁর সামনে মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি মাত্র প্রধান প্রশ্ন-

“ভিতরে তোমার ঘুমাচ্ছে না, কে?
জীবনবিচ্যুত জড়ের মৌনতা,
না কি সুখ-বুদ্ধি চতুর যৌনতা?
অনুসন্ধান কর, অনুসন্ধান কর।”

কোলরিজের কবিতা

কোলরিজের কবিতা
মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন



ভূমিকা:
স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ [১৭৭২-১৮৩৪] ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার এবং সাহিত্য সমালোচক। যদিও তাঁর মানসমৃদ্ধ রচনার সংখ্যা খুব বেশি নয়, ইংরেজি সাহিত্যে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রোমান্টিক কবি হিসেবে সমাদৃত এবং সেই সাথে বিশ্ব-সাহিত্যেও আজ অবধি অত্যন্ত সুপরিচিত। তাঁর সম্পর্কে জনৈক সমালোচক ঝঃড়ঢ়ভড়ৎফ ইৎড়ড়শব যথার্থই বলেছেন, “.. . . all that he did excellently might be bound up in twenty pages, but it should be bound up in pure gold.” নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অধিকাংশ সুবিখ্যাত কবি-লেখকের ক্ষেত্রেই এতোটা তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য খাটে না।
বাংলাদেশে ইংরেজি-শিক্ষিত সাহিত্যরসিকদের কাছে কোলরিজ প্রধানত The Rime of the Ancient Mariner, Christabel I Kubla Khan bvgK KweZvÎq Ges Biographia Literaria নামক সমালোচনামূলক গ্রন্থের জন্য বিখ্যাত। বর্তমান পর্যায়ে বাঙালি পাঠকের কাছে তাঁর অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত চারখানি রচনা থেকে অনুবাদ পেশ করা হলো। অনুবাদগুলোর মধ্যে আবার একটি পূর্ণাঙ্গ এবং বাকি তিনটি আংশিক। [১] শান্তি, [২] আকাল, অগ্নি, ঘাতিনী, [৩] স্বাধীনতা ও [৪] প্রেম শিরোনামে অনুবাদগুলো মূলত কবিতাগুলোর রচনা ও প্রকাশকালের অনুক্রমে সাজানো হয়েছে। আশা করি, অনুবাদিত অংশে পাঠক তাঁর বাঙালি রুচিতেও তৃপ্তিদায়ক হতে পারে কোলরিজের এমন কিছু রচনার সাক্ষাৎ পাবেন।

এক
‘শান্তি’ শিরোনামে অনুবাদিত কবিতাটি কোলরিজ রচিত The Fall of Robespierre নামক নাটকের প্রথমাংশ থেকে গৃহীত। নাটকটি ১৭৭৪ সনে রচিত ও প্রকাশিত। বাংলার কবি রবীন্দ্রনাথ যেমন ‘শান্তির নীড়’ বলতে ‘ছায়াসুনিবিড় ... ছোটো ছোটো গ্রামগুলি'কে বুঝেছিলেন, কোলরিজও তেমনি অনাড়ম্বর 'cottage'd vale এ শান্তির হদিস খুঁজে পেয়েছিলেন।

শান্তি

বলো আমায় সত্যি করে
ঘুচাও মনের ভ্রান্তি,
কোন পবিত্র দেশে পাবো
পারিবারিক শান্তি।
শান্তি সে তো খুবই ভালো
দূর নীলিমার কন্যা,
রাজপ্রাসাদের জাঁকজমকে
মোটেই তিনি র’ন না।
কোথাও যদি মুমূর্ষু হয়
ঘৃণা-ক্রোধের সুপ্তি,
পাখনা মেলে শান্তি ফুড়–ত-
কোন সুদূরে লুপ্তি!

পাতায় ঘেরা পর্ণকুটির
জুড়ায় তোমার মনটা?
ঐ খানেতে শান্তি বসে
শোনে কাঁসর ঘন্টা।
গেঁয়ো যদিও - তারে ঘিরে
কি অপরূপ দৃশ্য,
মহিমাময় সম্মান যে তার
বাধ্যগত শিষ্য;
আরও আছে ভালোবাসা
স্বাদুভয়ের পিতা,
অশ্র“তে তার হাসিমুখে
দুঃখ সাজায় চিতা;
চক্ষুমেলে ঘিরে আছে
অতীত দিনের স্মৃতি,
বুকভরা সব কোকিল কুহু
আনন্দময় গীতি।

দুই
‘আকাল, অগ্নি, ঘাতিনী’ শীর্ষক সংলাপ-ছড়াটি কোলরিজের ঋরৎব, ঋধসরহব, অহফ ঝষধঁমযঃবৎ নামক কবিতাটির অনুবাদ। কবিতাটির রচনাকাল ১৭৯৫-১৭৯৮ সন। প্রথম প্রকাশ গড়ৎহরহম চড়ংঃ-এ জানুয়ারি ০৮, ১৭৯৮ তারিখে। কোলরিজ একে একটি ডধৎ ঊপষড়মঁব বা যুদ্ধ-ভিত্তিক গ্রাম্য সংলাপ কবিতা বলে অভিহিত করেছেন।
এই কবিতার মধ্য দিয়ে কোলরিজ মূলত ‘উইলিয়াম পিট’কে আক্রমণ করেছেন তাঁর যুদ্ধ-নীতি এবং বিশেষ করে ফ্রান্সের লা-ভেন্দের (খধ ঠবহফল্কব) প্রতি-বিপ্লবীদের প্রতি তাঁর সমর্থনের জন্য। এখানে শেকসপিয়ারের ম্যাকবেথের অনুকরণেই ‘ডাকিনি’ চরিত্রগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে।
‘চার বর্ণে নাম লেখে’ - কথাটি দিয়ে স্বয়ং উইলিয়াম পিট (চরঃঃ)-কেই বুঝানো হয়েছে।
‘এসেছি গো জ্বালিয়ে আইরিশ দেশটা’ - অগ্নির এই উক্তিটি ১৭৯৭ সনের মার্চ মাসে জেনারেল লেইক ও তাঁর সেনাবাহিনী কর্তৃক আলস্টারে ব্যাপক অগ্নি-সংযোগ ও ধ্বংসলীলার ইতিহাস বিবৃত করছে।
মূল রচনায় প্রতিটি চরিত্রই ডাকিনি অর্থাৎ স্ত্রীবাচক। অনুবাদে অগ্নি ও আকাল ডাক তথা পুরুষরূপ লাভ করেছে। মূল রচনাটি কবিতা হলেও অনুবাদে ছড়ার আঙ্গিক ব্যবহার করা হয়েছে।
বিদেশের পটভূমিতে রচিত হলেও আমাদের দেশ-কালের প্রেক্ষাপটেও রচনাটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষকরে বিভিন্ন স্বৈর-শাসকের যাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশ স্বাধীনতা পূর্ব ও স্বাধীনতা উত্তর উভয় কালেই একই রকম অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেছে। কাকতালীয়ভাবে এটিও সত্য যে, বাংলার বিভীষিকা তিন স্বৈরশাসক আইয়ুব, ইয়াহিয়া, এরশাদ - এদের যে কারো নাম লিখতে চারটি করেই বাংলা বর্ণের দরকার পড়ে।


আকাল, অগ্নি, ঘাতিনী

(দৃশ্য: লা ভেন্দের নির্জন পথ। আকালকে ভূমিতে শায়িত দেখা যাচ্ছে। অগ্নি ও ঘাতিনীর প্রবেশ।)

আকাল : ওরে ভাই-ভগ্নী
ঘাতিনী আর অগ্নি
কে বলেছে আসতে?
ঘাতিনী : (অগ্নিকে) কানে কানে ফিশ ফিশ
বলে দেই আস্তে?

অগ্নি : না, না, মোটে না,
মুখ যেন ফোটে না!
ডাক আর ডাকিনি
শুনে ফেলে ততটা,
এক ডাক ফস করে
বলে ফেলে যতটা।
তারপর গুলজার
করে ফেলে নরকে,
বন্দ্ ডাকে, সভা করে
রাজপথ সড়কে।
না, না, মোটে না,
মুখ যেন ফোটে না!

একবার চুপচাপ
বলেছি কি নামটা,
হয়ে গেল কামটা!
পাপী-তাপী আত্মার
সে কি ভাই কাণ্ড,
হেসে যায়, নেচে যায়
ছুড়ে ফেলে ভাণ্ড!
তালে তালে করতালি
এলাহি কারবার,
দেয় নাকো পাত্তা
হুটোপাটি বারবার।
না, না মোটে না,
মুখ যেন ফোটে না! . . .

আকাল : বলে ফেলো ফিশফিশ
সন্ধ্যা-ভাষাতে,
কান পেতে পড়ে আছি
শুনবার আশাতে।

ঘাতিনী : চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের এইজন।
কে পাঠালে তোমাদের?

উভয়ে : সেইজন! সেইজন!

ঘাতিনী : চুপচাপ এসে তিনি
খুললেন বন্ধন,
আর নয় ক্রন্দন!
মুক্ত! মুক্ত!
আমি তাঁর ভক্ত
আজ তক খেয়েছি
দশ লাখ মানুষের রক্ত!

উভয়ে : কে তোমায় বললে
এমনটি করতে?

ঘাতিনী : সেইজন! সেইজন!
চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের যেইজন।
ছেড়ে দিয়ে মর্তে
বললেন, ‘কি রে!’
সবগুণ তাঁরই শুধু,
তাজ শোভে আজ তাঁর
উন্নত শিরে।

আকাল : সাব্বাস! সাব্বাস!

শোন ভাই ভগ্নী 
যারা দিল রক্ত,
বউ বাচ্চা সব তাদের
আরও কমবখ্ত।
পেটে তাদের দানা নেই
কি যে খাবে জানা নেই
হাড়ে হাড়ে বুঝে গেছে
বাঁচাটাই শক্ত!

যুদ্ধের ক্ষেত্রে
অপলক নেত্রে
দেখলাম স্রোতে বয়
রক্তের খাজনা,
কাকপাখি তাড়াতে
শিয়ালেরে হারাতে
হাড় দিয়ে বাজালাম
করোটির বাজনা।
তবু ভাই শব ছেড়ে
কেউ তারা গেল না,
একদম গেল না!

দেখ এই দৃশ্য ছেড়ে ঐ বিশ্ব
মেতেছি আর এক খেয়ালে,
করো দেখি অনুমান ওটা কার শব্দ
বাধা পেল দেয়ালে?

উভয়ে : বলে দাও কানে কানে
ও কিসের শব্দ,
কারে তুমি ঐখানে
করেছ গো জব্দ?

আকাল : শোন ভাই ভগ্নী
হোথা শিশু পান্না,
মৃত মার মাই চুষে
জুড়েছে যে কান্না।
এই হলো কারবার
বলে যাই আরবার
একজনা মেরেছি
দানা-পানি-অন্নে,
আরজনা মরছে
শুধু তার জন্যে!
উভয়ে : কে তোমায় বললে
এমনটি করতে?

আকাল : সেইজন! সেইজন!
চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের যেইজন।
ছেড়ে দিয়ে মর্তে
বললেন, ‘কি রে!’
সব গুণ তাঁরই শুধু,
তাজ শোভে আজ তাঁর
উন্নত শিরে।

অগ্নি : শোন ভাই ভগ্নী
আমি এই অগ্নি
এসেছি গো জ্বালিয়ে
আইরিশ দেশটা,
ঝোপ-ঝাড় শস্য
সব আজ ভষ্ম,
নেই হোথা কোনখানে
সবুজের রেশটা।
পা ফেলে লম্বা
(আমি কিসে কম বা!)
ধেয়ে গেছি যথাতথা
আগে পিছে ডাইনে,
বাম দিকে তাও গেছি
তুড়ি মারি আইনে!
আহা কি যে কৌতুক,
ঘর পোড়া গরু-ঘোড়া
ঘাম দিলো যৌতুক!
রাতদিন ধেই ধেই
ছুটে চলে
লকলকে জিভটা,
কেঁপে কেঁপে থত্থর
কেঁদে ওঠে
হতভাগা দ্বীপটা।
জ্বলে ওঠে চড়চড়
খাট আর চৌকি,
পুড়ে মরে দ্রোহী যত -

ঘাতিনী : মরে তার বউ কি?

অগ্নি : বউ মরে পুত মরে
মরে তার কন্যা,
ঘরে ঘরে ছুটে যাই
আগুনের বন্যা।

উভয়ে : কে তোমায় বললে
এমনটি করতে?

অগ্নি : সেইজন! সেইজন!
চার বর্ণে নাম লেখে
আমাদের যেইজন।
ছেড়ে দিয়ে মর্তে
বললেন, ‘কি রে!’
সব গুণ তাঁরই শুধু,
তাজ শোভে আজ তাঁর
উন্নত শিরে।

সকলে : হৈ, হৈ, হৈরে,
তাঁরই কথা কইরে,
ছেড়ে দিয়ে আমাদের
বললেন, ‘কি রে!’
এতো বড় দান তাঁর
কি দে’ রাখি মান তাঁর
কি যে’ দেবো ভেট তাঁর
কর-পদ-শিরে!

আকাল : ভাঁড়ারটা হয় যদি
এতোটুকু শূন্য,
মাথাগুলো লাভ করে
বুদ্ধির পুণ্য।

কুরে খাই আমি আজ
লাখ-কোটি জনতা,
ক্রোধ যেই পেকে হবে
প্রজাদের বনতা-
তক্ষুণি তারা তাঁর
টুঁটি চেপে ধরবে,

ঘাতিনী : দেহখানা ছিন্ন-
ভিন্ন করবে!

অগ্নি : হায় নিমকহারামি,
এতোকাল তাঁর বরে
ছিলি কত আরামি!
নব্বুই মাস তিনি
সবিশেষ যতেœ,
খাওয়ালেন, পরালেন,
সাজালেন রতেœ।
আজ তার প্রতিদান
বলে দিলি পষ্ট!
হায়, অষ্ট বছরের কষ্ট!
ঠিক আছে আজ থেকে
একা আমি রবো তাঁর শিষ্য,
থেকে যাবো অনুগত
যতোদিন টিকে যাই
আমি আর বিশ্ব!
যতোদিন টিকে যাই
আমি আর বিশ্ব!!

তিন
‘স্বাধীনতা’ শিরোনামে অনুবাদিত কবিতাটি কোলরিজ রচিত ঋৎধহপব: অহ ঙফব নামক কবিতার প্রথম স্তবকের অনুবাদ। কবিতাটি ১৭৯৮ সনে রচিত ও প্রকাশিত। উল্লেখ্য, একদা কোলরিজ, ওয়ার্ডসওয়ার্থ, সাদে প্রমুখ অনেক ইংরেজ কবিই ফরাসি-বিপ্লব দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে ফ্রান্স সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে কোলরিজের মোহভঙ্গ হয়। অতঃপর তিনি এই কবিতা লিখে ফ্রান্সের প্রতি তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করেন এবং সুইজারল্যান্ডের জনসাধারণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। আজীবন ঝঢ়রৎরঃ ড়ভ ফরারহবংঃ ষরনবৎঃু-তে বিশ্বাসী কবি কোলরিজ এই কবিতার শেষ স্তবকে কেবল প্রকৃতির বুকেই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত আছে বলে সিদ্ধান্তে উপনীত হন। কবিতাটির প্রথম স্তবকে কবি স্বাধীনতার প্রতি তাঁর প্রগাঢ় আগ্রহ ও অনুরাগ প্রকাশ করেছেন। স্মরণ করা যেতে পারে, মাত্র অর্ধশতাব্দীর ব্যবধানে বাঙালি কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ও (১৮২৭-১৮৮৭) চিৎকার করে বলেছিলেন-
স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,
কে বাঁচিতে চায়।

স্বাধীনতা

ঊর্ধ্বাকাশে মেঘের ভেলা
ভেসে ভেসে দিচ্ছো পাড়ি,
সাধ্য কি বা মানুষজনের
তোমার সাথে ধরবে আড়ি।

শোন তুমি সাগর দোলা,
ইচ্ছে মতো যাচ্ছো ভেসে,
চলার পথে চিরন্তেরই
আদেশ শুধু মানছো হেসে।

বন বনানী, শ্যামল শোভায়
কি অপরূপ দুলছো দেখি,
গভীর রাতেও পাখির গানে
হৃদয়টারে ভরছো এ কি!

কোথাও আবার মৃদু বাতাস
আপন মনে নাড়ছো ডাল,
মর্মরিয়ে তারই সাথে
উঠছে গানের মধুর তাল।

এমন বনেও দেখছি আবার
এলোমেলো পথের বাঁক,
কোথাও সমান, কোথাও উঁচু
কোথাও ঢালু, কোথাও পাঁক।

তবু আমি আঁধার রাতেও
এমন পথে চলছি হেঁটে,
যে পথেতে বনবাসীও
ভুলেও কভু যায়নি মোটে।

চলছি হেঁটে স্বাধীন ভাবে
আসছে ভেসে ফুলের ঘ্রাণ,
স্পর্শে তার বুক ভরেছে
জাগছে হৃদয় হাসছে প্রাণ।

শোন এবার সাগর দোলা
শোন উঁচু বনভূমি,
আকাশ সূর্য, সব শুনে যাও
মেঘের ভেলা, শোন তুমি।

তোমরা যারা বিশ্ব মাঝে
টিকে আছ স্বাধীন প্রাণ,
স্মরণ রেখো সাক্ষীরূপে
কতটুকু আমার দান।

কেমন ভালোবাসি আমি
পূজি কেমন স্বাধীনতা,
কেমন করে যাচি তারই
স্বর্গদীপ্ত অমরতা।

চার
‘প্রেম’ শিরোনামে অনুবাদিত কবিতাটি কোলরিজের কবিতা খড়াব এর আংশিক অনুবাদ। কবিতাটি ১৭৯৯ সনে রচিত ও প্রকাশিত। মোট ২৪টি স্তবকে রচিত এই কবিতার প্রথম ছয় স্তবক এবং শেষের দিক থেকে শুধু ২০তম স্তবক এখানে অনুবাদ করা হয়েছে।
কবিতাটিতে কথক একজন প্রেমিক। তিনি প্রাচীন ধ্বংসলীলার মাঝে দাঁড়িয়ে এক নাইটের শিভালরিক প্রেমের করুণ গাঁথা শুনিয়ে তাঁর প্রেমিকা জেনেভিভের মন জয় করতে সমর্থ হয়েছেন। কবিতাটির ৭ম থেকে ১৯তম স্তবক পর্যন্ত এই শিভালরিক প্রেমকাহিনী সবিস্তারে বর্ণনা করা হয়েছে এবং ২০তম স্তবকে জেনেভিভের মনের উপর এর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়েছে। বর্তমান অনুবাদখানিতে এই নাইটের প্রেমকাহিনীর বিশদ বর্ণনা বাদ রেখে শুধু তাঁর ইংগিত ও অভিঘাতকে তুলে ধরা হয়েছে।
কুয়াশার দেশ ইংল্যান্ডে চাঁদনী রাতের বিশেষ কোন জৌলুস নেই। তবু ‘প্রেম’ কবিতায় কবি জ্যোৎস্নার কথা বলেছেন। জ্যোৎস্না, করুণ সংগীত, লাজরাঙা মুখ, নির্জনে প্রণয় - একযোগে এতোগুলো বিষয়ের উল্লেখ কতটুকু ইউরোপীয়, আর কতটুকু বাংলাদেশীয় তথা ভারতীয়, তা ভেবে দেখবার মতো।
প্রেম

ভাবনা আবেগ আনন্দেরা
দোলায় সকল মানব দেহ,
ভালবাসার কর্মী ওরা
জ্বালায় পূত অগ্নি-স্নেহ।

প্রায়ই দিবাস্বপ্নে আমি
জাবর কাটি সুখের দিন,
দেখি যেন গিরিপথে
প্রাচীন ধ্বংসলীলার চিন।

চাঁদের আলো চুপিসারে
পড়ছে যেন সাঁঝের গায়,
পাশেই প্রিয়া জেনেভিভে
আনন্দে মন উছলায়!

দেহখানা এলিয়ে দিয়ে
যোদ্ধা বীরের মূর্তিতে,
শুনছে আমার গীতি-গাঁথা
সন্ধ্যালোকের ফুর্তিতে।

দুঃখ কিছু হয়তো আছে
কোথাও বা তার হৃদয়তলে,
বাসছে ভাল তাই সে আমায়
ভাসছে যখন চোখের জলে।

গাইছি আমি ইমন রাগে
পুরাকালের করুণ কথা,
ভগ্নস্তূপের মাঝে সে সব
ভাঙছে খানিক নীরবতা।

গানের কথায় কাঁদছে প্রিয়া
করুণা আর তৃপ্তিতে,
লাজরাঙা তার মুখ উজালা
ভালবাসার দীপ্তিতে!

উপসংহার:
নিঃসন্দেহে কোলরিজ একজন সফল শিল্পী ও অত্যুজ্জ্বল কবি। বর্তমান পরিসরে তাঁর কবিকৃতি বা শিল্পীসত্তাকে তুলে ধরার প্রয়াস নেয়া হয়নি। তাঁর কাব্যদর্শন, রোমান্টিকতার স্বরূপ কিংবা তাঁর প্রিয় অতিপ্রাকৃত ভুবনে অনায়াস বিচরণ  কোনটিই বর্তমান অনুবাদ ও আলোচনার উদ্দেশ্য নয়। কোলরিজের শ্রেষ্ঠ রচনাসমূহকেও এ পর্যায়ে অনুবাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি। কোলরিজ নিজেও বিশ্বাস করতেন খাঁটি কবিতার কখনো অনুবাদ হয় না। তাই সে চেষ্টাও এখানে করা হয়নি। এখানে শুধু সেই বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে, যেখানে কোলরিজের ভাবনার সাথে আমাদের স্বদেশবাসীর ভাবনা সমান্তরালে প্রবহমান। অর্থাৎ এ পর্যায়ে আমরা বিদেশী কোলরিজের কবিতার ভেতর দিয়ে আমাদের স্বদেশী আবেগ ও অভিঘাতকে স্পর্শ করতে পেরেছি; তাঁর কবিতায় আমাদের সুখ-শান্তি, প্রেম-প্রীতি, স্বদেশ-স্বাধীনতা-সংগ্রাম ইত্যাদি বোধ ও বিবেচনার এক বাঙ্ময়চিত্র প্রত্যক্ষ করেছি। তাই, এই বিশেষ অর্থে, কোলরিজ আমাদেরও কবি।

কিলিমানজারোর তুষার

কিলিমানজারোর তুষার
মূলঃ আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
রূপান্তরঃ খসরু চৌধুরী


[কিলিমানজারো হলো তুষারে মোড়া ১৯৭১০ ফুট উঁচু একটা পাহাড় আর এটাই নাকি আফ্রিকার সর্বোচ্চ পাহাড়। মাসাই ভাষায় এটার পশ্চিম চূড়াকে বলা হয় ‘এনগাজে এনগাই’ ঈশ্বরের বাড়ি। পশ্চিম চূড়ার কাছে পড়ে আছে একটা চিতাবাঘের শুকনো আর জমাটবাঁধা মৃতদেহ। কেউ ব্যাখ্যা করেনি অত উঁচুতে চিতাবাঘটা কী খুঁজতে উঠেছিল।]

‘আশ্চর্য ব্যাপার হলো এখানে কোনও ব্যথাই নেই,’ বলল সে। ‘শুরুতে সেরকমই মনে হয়।’
‘সত্যি?’
‘একদম সত্যি। দুর্গন্ধটা নিয়ে অবশ্য আমি দুঃখিত। ওটা নিশ্চয় তোমার খারাপ লাগবে।’
‘না! প্লিজ এ-কথা ভেবো না।’
‘ওই দেখো,’ বলল সে। ‘ওরা কি চোখে দেখে এখানে এসেছে নাকি দুর্গন্ধ পেয়ে?’
একটা মিমোসা গাছের বিস্তৃত ছায়ায় পাতা খাটিয়ায় শুয়ে আছে মানুষটা আর তার দৃষ্টি ছায়া পেরিয়ে গিয়ে পড়েছে ঝকঝকে রোদে ভরা সমভূমির ওপর যেখানে অশ্লীল ভঙ্গিতে উবু হয়ে বসে আছে বড় বড় তিনটে পাখি, আকাশে উড়ছে আরও গোটা বারো, মাটিতে দ্রুত-চলমান ছায়া ফেলে ফেলে।
‘ট্রাকটা ভেঙে পড়ার দিন থেকেই ওরা ওখানে আছে,’ বলল সে। ‘তবে আজই প্রথম মাটিতে নামল। যদি কোনও গল্পে লিখার ইচ্ছে হয় ভেবে প্রথমে আমি ওদের ওড়াটা লক্ষ করেছি তীক্ষ্ণ চোখে। এখন মনে হচ্ছে সে-প্রয়োজন আর হবে না।’
‘আমিও চাই প্রয়োজন যেন তোমার না হয়,’ বলল মহিলা।
‘বললাম একটা কথার কথা,’ বলল সে। ‘কথা বললে সময় কাটানোটা অনেক সহজ হয়। কিন্তু তোমাকে আর বিরক্ত করতে চাই না।’
‘তুমি জানো এতে আমি বিরক্ত হই না,’ বলল মহিলা। ‘আসলে কিছুই করতে না পেরে একটু ঘাবড়ে গেছি। মনে হয় প্লেন আসার আগ পর্যন্ত যথাসম্ভব হালকাভাবে আমাদের কাটাতে হবে সময়টা।’
‘কিংবা প্লেন না আসার আগ পর্যন্ত।’
প্লিজ বলো আমি কি করতে পারি। আমার করার মত কিছু কাজ নিশ্চয় আছে।’
‘তুমি পা-টা খুলে নিতে পারো আর তাতে ব্যথার যন্ত্রণাটা থামতেও পারে, যদিও এতে আমার সন্দেহ হয়। কিংবা গুলি করতে পারো আমাকে। এখন তো তোমার নিশানা বেশ ভাল। আমি তাহলে গুলি করাটা তোমাকে ভালই শিখিয়েছি, তাই না?’
‘প্লিজ ওভাবে কথা বলো না। তোমাকে কিছু পড়ে শোনাব?’
‘কী পড়বে?’
‘বইয়ের ব্যাগটাতে আর যা পড়ার বাকি আছে।’
‘আমি শুনতে পারব না,’ বলল সে। ‘কথা বলাই সবচেয়ে সোজা। আমরা ঝগড়া করতে পারি আর তাতেও সময়টা বেশ কেটে যাবে।’
‘আমি ঝগড়া করি না। কখনওই ঝগড়া করতে চাইনি আমি। আর আমরা ঝগড়া করব না। যত ঘাবড়েই আমরা যাই না কেন। তারা হয়ত আজই ফিরে আসবে আরেকটা ট্রাক নিয়ে। হয়ত প্লেনই চলে আসবে।’
‘আমি নড়তে চাই না,’ বলল মানুষটা। ‘তোমার কিছু সুবিধে করে দেয়ার প্রয়োজনে ছাড়া এখন নড়াচড়া করার আর কোনও মানে হয় না।’
‘এটা কাপুরুষের মত কথা।’
‘গালি না দিয়ে একজন মানুষকে কি শান্তিতে মরতেও দেবে না? আমার মত মানুষকে গালি দিয়ে লাভই বা কী?
‘তুমি মরবে না।’
‘বোকার মত কথা বলো না তো। আমি এখন মারা যাচ্ছি। হারামজাদাগুলোকে জিজ্ঞেস করে দেখো।’ তাকাল সে বসে থাকা বড় বড়, নোংরা পাখিগুলোর দিকে, ওদের ন্যাড়া মাথা পালকে গোঁজা। প্লেনের মত এসে নামল চতুর্থ আরেকটা, দ্রুত পায়ে খানিকটা দৌড়ে, হেলেদুলে এগোতে লাগল অন্যগুলোর দিকে।
‘ওরা প্রত্যেকটা তাঁবুর আশেপাশে থাকে। তুমি কখনও লক্ষ করোনি এই যা। ভেঙে না পড়লে তুমি কিছুতেই মরবে না।’
‘কোথায় পড়েছ ওসব কথা? তুমি একটা আস্ত বোকা।’
‘তুমি অন্য কারও কথা ভাবো।’
‘যিশুর দোহাই,’ বলল সে, ‘সেটা আমার ব্যাপার।’
আবার শুয়ে পড়ল সে আর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল সমভূমির তাপপ্রবাহের ভেতর দিয়ে ঝোপঝাড়ের দিকে। চরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা টমি, হলুদের উল্টোপাশে শাদা শাদা লাগছে তাদের আর, অনেকটা দূরে, চরে বেড়াচ্ছে একপাল জেব্রা, জঙ্গলের সবুজের উল্টোপাশে তাদেরও মনে হচ্ছে শাদা। পাহাড়ের পাদদেশে বড় বড় গাছের ছায়ায় তাদের তাঁবুটা হয়েছে চমৎকার, এখানে রয়েছে সুস্বাদু পানি, আর পাশেই, প্রায় শুকিয়ে আসা একটা অগভীর জলা যেখানে সকালবেলায় নামে বুনো হাঁসের ঝাঁক।
‘তুমি কি চাও না আমি কিছু পড়ে শোনাই?’ জানতে চাইল মহিলা। খাটিয়ার পাশে বসে আছে সে ক্যানভাসের একটা চেয়ারে। ‘বাতাস আসছে।’
‘না, ধন্যবাদ।’
‘ট্রাকটা হয়ত এসে যাবে।’
‘তাতে আমার কোনও যায় আসে না।’
‘আমার যায় আসে।’
‘আমার যায় আসে না এমন অনেক কিছুতেই তোমার যায় আসে।’
‘অনেক কিছু নয়, হ্যারি।’
‘একটা ড্রিঙ্ক করলে কেমন হয়?’
‘ড্রিঙ্ক করাটা তোমার জন্যে খারাপ। ব্ল্যাকের বইতে সব ধরনের অ্যালকোহল বাদ দিতে বলা হয়েছে। তোমার ড্রিঙ্ক করা উচিত নয়।’
‘মোলো!’ চেঁচিয়ে ডাকল সে।
‘যাচ্ছি, বাওয়ানো।’
‘হুইস্কি-সোডা আনো।’
‘নিয়ে যাচ্ছি, বাওয়ানা।’
‘না, ড্রিঙ্ক করো না তুমি। হাবভাবেই মনে হচ্ছে তুমি হাল ছেড়ে দিয়েছ। বইয়ে লিখেছে ড্রিঙ্ক করা তোমার জন্যে খারাপ। আমি জানি ড্রিঙ্ক তোমার জন্যে খারাপ।’
‘না,’ বলল সে। ‘ড্রিঙ্ক আমার জন্যে ভাল।’
এই তাহলে সবকিছুর শেষ, ভাবল সে। কাজটা শেষ করার সুযোগ তার আর হবে না। এভাবেই তাহলে শেষ হলো এটা ড্রিঙ্ক নিয়ে তুচ্ছ এক ঝগড়াঝাঁটির মাধ্যমে। ডান পায়ে গ্যাংগ্রিন শুরু হবার পর থেকে তার আর কোনও ব্যথা নেই আর ব্যথার সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে গেছে আতঙ্ক আর এভাবেই সবকিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে এখন রয়ে গেছে কেবল ভীষণ এক ক্লান্তি আর ক্রোধ। মুহূর্তটা ঘনিয়ে আসছে, প্রতিক্ষণেই এগিয়ে আসছে গুটি গুটি পায়ে, কিন্তু সেজন্যে তার কৌতূহল নেই বললেই চলে। বছরের পর বছর ব্যাপারটা তাকে ঘোরের মাঝে রেখেছিল; এখন তার কাছে ওটার আর কোনও গুরুত্বই নেই। ভাবলে অবাক হতে হয় ভীষণ ক্লান্তি কত সহজে এই নির্লিপ্ততাকে সম্ভব করতে পেরেছে।
যথেষ্ট ভালভাবে না জেনে যে-বিষয়গুলো সে লিখবে না ভেবেছিল এতদিন তা সে আর কোনওদিনই লিখবে না। তাকে আর ব্যর্থতার শিকারও হতে হবে না সেগুলো লিখতে গিয়ে। হয়ত সেগুলো কোনওদিনই লিখা যেত না আর তাই লিখাটা শুরু না করে সে ওটাকে দেরি করিয়ে দিয়েছে বারবার। যাই হোক, ব্যাপারটা স্পষ্ট করে তার পক্ষে আর জানা সম্ভব নয়, এখন।
‘আমাদের এখানে না এলেই ভাল হত,’ বলল মহিলা। তার হাতের গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে ধরল সে। ‘প্যারিসে থাকলে এমনটা কখনওই হত না। তুমি সবসময় বলেছ প্যারিস তোমার খুব ভাল লাগে। আমরা প্যারিসে থাকতে পারতাম কিংবা চলে যেতে পারতাম অন্য যে-কোনও জায়গায়। যেতে পারতাম আমি অন্য আর কোথাও। তোমাকে তো বলেইছিলাম তুমি যেখানে যেতে চাইবে সেখানেই আমি যাব। তুমি শিকার করতে চাইলে আমরা হাঙ্গেরি যেতে পারতাম আর থাকতেও পারতাম আনন্দের সঙ্গে।’
‘তোমার ওই হারামজাদা টাকা,’ বলল সে।
‘এভাবে বলা কিন্তু উচিত নয়,’ বলল মহিলা। ‘টাকাটা শুধু আমার নয়, তোমারও। সব ছেড়ে আমি চলে এসেছি তোমার সঙ্গে আর তুমি যেখানে যেতে চেয়েছ গিয়েছি আর তুমি যা করতে বলেছ তা-ই করেছি। কিন্তু এখানে না এলেই আমাদের ভাল হত।’
‘তুমি বলেছিলে জায়গাটা তোমার খুব পছন্দ হয়েছে।’
‘বলেছিলাম যখন তুমি সুস্থ ছিলে। কিন্তু এখন জায়গাটাকে আমি ঘৃণা করি। আমি বুঝতে পারি না কেন তোমার পায়ের এই অবস্থা হলো। আমরা কী এমন করেছি যে এরকম একটা দুর্ঘটনায় পড়তে হলো আমাদের?’
‘প্রথমে ওখানে চুলকাবার পর আয়োডিন লাগাইনি আমি। কখনওই আমার ইনফেকশন হয়নি বলে আঘাতটাকে গুরুত্বও দিইনি। তারপর, ওটা যখন খারাপ আকার ধারণ করল, এমনটা হলো সম্ভবত অন্য অ্যান্টিসেপটিকগুলো ফুরিয়ে যাবার পর কার্বলিকের দুর্বল সল্যুশনটা ব্যবহার করার ফলে, অসাড় হয়ে গেল ছোট ছোট রক্তনালিগুলো আর শুরু হলো গ্যাংগ্রিন।’ তাকাল সে মহিলার দিকে, ‘এছাড়া আর কী?’
‘আমি সে-কথা বলতে চাইনি।’
‘আমরা যদি গাধা ওই কিকুয়ু ড্রাইভারটাকে না নিয়ে ভাল কোনও মেকানিক সঙ্গে নিতাম, তাহলে সে হয়ত তেল পরীক্ষা করে দেখত আর ট্রাকের বিয়ারিংটাও পুড়ত না।’
‘আমি সে-কথা বলতে চাইনি।’
‘আমার জন্যে তোমার লোকজনদের যদি ছেড়ে না আসতে তুমি, ছেড়ে না আসতে তোমার জঘন্য ওই ওল্ড ওয়েস্টবারি, সারাটোগা, পাম বিচের লোকজন ’
‘এভাবে বলা তোমার উচিত নয়। আমি তোমাকে ভালোবেসেছি। আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি। চিরদিন ভালোবাসব। তুমি আমাকে ভালোবাস না?’
‘না,’ বলল মানুষটা। ‘আমার সেরকম মনে হয় না। আমি কখনও তোমাকে ভালোবাসিনি।’
‘হ্যারি, কী বলছ তুমি এসব? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে।’
‘না। আমার মাথা থাকলে তো খারাপ হবে।’
‘ওটা খেয়ো না,’ বলল মহিলা। ‘ডার্লিং, প্লিজ খেয়ো না ওটা। যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে আমাদের।’
‘চেষ্টাটা তাহলে তুমিই করো,’ বলল সে। ‘আমি ক্লান্ত।’

[এবার মনের চোখে সে দেখতে পেল কারাগাচের একটা রেলস্টেশন আর মালপত্র নিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে, অন্ধকার চিরে এগিয়ে এল সিম্পলন - ওরিয়েন্টের হেডলাইট আর পশ্চাদপসরণের পর সে থ্রেস ছেড়ে চলে যাচ্ছে। লিখার জন্যে তুলে রাখা বিষয়গুলোর মাঝে এটা অন্যতম, আর, সকালে নাস্তা করতে বসে জানালা দিয়ে দেখছে সে বুলগেরিয়ার পাহাড়গুলোর তুষাররাশি আর ন্যানসেনের সেক্রেটারি বুড়ো লোকটার কাছে জানতে চাইছে সত্যিই ওগুলো তুষার না অন্যকিছু আর সেদিকে তাকিয়ে বুড়ো বলছে, না, ওগুলো তুষার নয়। তুষারপাতের সময় আসেনি এখনও। আর সেক্রেটারি সেই একই কথা অন্য মেয়েদের বলছে, না, দেখতেই পাচ্ছ। ওগুলো তুষার নয় আর তারপর সব মেয়ে বলাবলি করছে, ওগুলো তুষার নয়, আমরা ভুল ভেবেছি। কিন্তু ওগুলো আসলে তুষারই ছিল আর মানুষ বিনিময়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সে তাদের পাঠিয়ে দিল তুষারের ওপর। এবং এগিয়ে চলল তারা তুষার মাড়িয়ে যতক্ষণ না সেই শীতে মারা গেল তাদের সবাই।
সেই বছর ক্রিসমাসের পুরো সপ্তাহ জুড়ে তুষারপাত হলো গাউর্তালে, সেই বছর রইল তারা কাঠুরের বাড়িতে যেখানে ঘরের অর্ধেক জুড়ে ছিল পোর্সেলিনের একটা চৌকো স্টোভ, আর ঘুমাল তারা বিচপাতায় ভরা তোষকে, আর তখন তুষারে রক্তাক্ত পা নিয়ে উপস্থিত হলো যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষটা। সে বলল যে গন্ধ শুঁকে শুঁকে তার পিছু পিছু এসেছে পুলিশ আর তারা তাকে পরতে দিল পশমি মোজা আর নানারকম আলাপের মাধ্যমে ঠেকিয়ে রাখল মিলিটারি পুলিশগুলোকে যতক্ষণ না তুষারের ওপর থেকে মুঝে গেল তার পদচিহ্ন।
শ্র“নজে, ক্রিসমাসের দিনে, তুষার ছিল এতই উজ্জ্বল যে ওয়েন্স্টিউব থেকে বাইরে তাকালে ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল চোখ আর দেখা যাচ্ছিল গির্জা থেকে বাড়ির ফিরতি পথ-ধরা সবাইকে। পাইনে ভরা দুর্গম খাড়া পাহাড়গুলো আর নদীর পাশ দিয়ে গেছে যে-রাস্তাটা, স্লেজ চলাচলে মসৃণ আর প্রস্রাবে হলুদ সেই রাস্তা ধরে এগিয়েছিল তারা ভারি স্কী কাঁধে, আর তারপর কী দৌড়টাই না দিয়েছিল ম্যাডলেনার-হসের ওপরের হিমবাহে, তুষার ছিল কেক ফ্রস্টিংয়ের মত মসৃণ আর পাউডারের মত হালকা আর নিঃশব্দে তীব্র বেগে ছুটে গিয়ে পাখির মত ঝুপ ঝুপ করে তারা পড়ে যাচ্ছিল নিচের তুষারে।
সেবার তুষারঝড় শুরু হবার ফলে একটা সপ্তাহ তারা আটকা পড়ে রইল ম্যাডলেনার-হসে আর তাস খেলল লণ্ঠনের ঝাপসা আলোয় আর যতই হারল হের লেন্ট ততই বাড়ল জুয়ার স্টেক। শেষমেষ সব হারল সে। সব, স্কীশুল মানি, পুরো মরসুমের লাভ, এমনকি মূলধন। সে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার লম্বা নাকটা, তাস তুলছে আর খেলছে। সবসময় ধরে চলছে কেবল জুয়া আর জুয়া। তুষারপাত থেমে গেলেও জুয়া আর ভীষণ তুষারপাত শুরু হলেও জুয়া। সারা জীবনে যত জুয়া খেলেছে সবই তার মনে পড়ল একের পর এক।
কিন্তু এ-বিষয়ে কখনও একটা লাইনও লিখেনি সে, লিখেনি ঠাণ্ডা, উজ্জ্বল সেই ক্রিসমাসের দিন নিয়েও, যখন সমভূমির ওপারে দেখা যাচ্ছিল পাহাড়ের সারি আর তার ওপর দিয়ে বার্কার উড়ে গিয়েছিল অস্ট্রিয়ান অফিসারদের লীভ ট্রেনে বোমা ফেলতে, আর ছত্রভঙ্গ হয়ে তারা যখন ছুটছিল দিশেহারা হয়ে তাদের ওপর সে বর্ষণ করেছিল মেশিনগানের গুলি। তার মনে পড়ল বার্কার পরে মেসে ফিরে শুরু করেছিল সেই বর্ণনা। আর শুনতে শুনতে কেমন নীরব হয়ে গিয়েছিল সবাই আর তারপর কে যেন বলে উঠেছিল, ‘তুই একটা খুনে হারামজাদা।’
তখন যাদের খতম করেছিল তারা সেই অস্ট্রিয়ানদের সঙ্গেই পরে স্কী খেলেছে সে। অবশ্য সেই অস্ট্রিয়ান আর আগেরগুলো এক মানুষ ছিল না। বছর জুড়ে সে স্কী করেছিল যার সঙ্গে, সেই হ্যান্স তখন ছিল কাইজার-জাগার্সে আর তারা যখন একসঙ্গে খরগোশ শিকারে গেছে স-মিলের ওপরের ছোট্ট উপত্যকাটাতে তখন অনেক আলাপ তারা করেছে পাসুবিওর যুদ্ধ আর পার্টিকারা ও আসালোন আক্রমণ সম্বন্ধে আর সেসব নিয়ে একটা শব্দও সে কখনওই লিখেনি। মন্টি করোনা নিয়েও নয়, নয় সেটি কম্যুনি, কিংবা আর্সিয়েরো নিয়েও।
কতগুলো শীত কাটিয়েছে সে ভরার্লবার্গ আর আর্লবার্গে? চারটে, আর উপহার কিনতে তারা যখন গেল ব্লুডেনজে, একটা লোক এসেছিল শিয়াল বিক্রি করতে, আর ভাল কার্শের মত স্বাদঅলা সেই চেরির বিচি, শক্ত ভূমি মুড়ে থাকা গুঁড়ো-তুষারের ওপর দিয়ে তীরবেগে ছুটে চলা, ‘হাই! হো! সেইড রলি’ গানটা গাইতে গাইতে খাড়া জায়গাটার শেষ চক্করে ঝপ করে নেমে যাওয়া, তারপর সোজা পথে তিন চক্করে ফলের বাগানটাকে বেড় দিয়ে আর ডোবাটা পেরিয়ে উঠে যাওয়া সরাইখানার পেছনের বরফমোড়া রাস্তাটায়। তারপর বাঁধনগুলো ঢিলে করে, পা ছুঁড়ে স্কি খুলে সেগুলোকে হেলান দিয়ে রাখা সরাইখানার কাঠের দেয়ালে, আর তারও পরে যখন জানালা দিয়ে ভেসে আসে বাতির আলো, তখন ভেতরে, নতুন ওয়াইনগন্ধী ধোঁয়াটে উষ্ণতায় তারা অ্যাকর্ডিয়ন বাজানোয় মশগুল।]

‘প্যারিসে আমরা কোথায় ছিলাম?’ এখন, আফ্রিকায়, জানতে চাইল সে তার পাশে ক্যানভাসের চেয়ারে বসা মহিলাটির কাছে।
‘ক্রিলোনে। তুমি তো সেটা জানই।’
‘আমি সেটা জানব কেন?’
‘আমরা যে সবসময় ওখানেই থেকেছি।’
‘না। সবসময় নয়।’
‘ওখানে আর সেন্ট জারমেঁইর প্যাভিলিয়ঁ আঁরি-কোয়ার্ত্রেতে। তুমি বলেছিলে ওখানে থাকতে তুমি ভালোবাস।’
‘ভালোবাসা হলো একটা গোবর-গাদা,’ বলল হ্যারি। ‘আর আমি গলা ছেড়ে ডাকার জন্যে সেই গাদার ওপরে ওঠা এক মোরগ।’
‘তোমার যদি যেতেই হয়,’ বলল মহিলা, ‘তাহলে কি পেছনের সবকিছু ধ্বংস করেই যেতে হবে? বলতে চাইছি সবকিছু কি সঙ্গে নিয়েই যেতে হবে তোমার? খতম করতে হবে তোমার ঘোড়া, আর স্ত্রী আর পুড়িয়ে ছাই করতে হবে তোমার জিন আর বর্ম?’
‘হ্যাঁ,’ বলল সে। তোমার ওই হারামজাদা টাকা ছিল আমার বর্ম। আমার ঘোড়া আর বর্ম।’
‘আর বলো না।’
‘বেশ। বলব না আর। তোমাকে কষ্ট দিতে চাই না।’
‘দিলে তো এতক্ষণ।’
‘তাহলে বেশ। আমি তোমাকে কষ্ট দিতেই থাকব। এই কাজটায় আরও বেশি আনন্দ পাওয়া যায়। তোমার সঙ্গে একমাত্র যে-কাজটা করতে ভাল লাগত আমার তা এখন আর করতে পারব না।’
‘না, কথাটা সত্য নয়। অনেক কাজ করতেই ভাল লাগত তোমার আর তুমি যা যা করতে চেয়েছ সেগুলোর কোনওটাতেই আমি বাধা দিইনি।’
‘আহ্, যিশুর দোহাই, তোমার ওই বড় বড় গল্পের প্যানপ্যানানি একটু থামাবে?’
মুখ তুলে তাকাতে সে দেখল মহিলা কাঁদছে।
‘শোন,’ বলল সে। ‘তোমার কি ধারণা এসব করতে মজা পাচ্ছি আমি? জানি না কেন আমি এমন করছি। এটা বোধ হয় নিজের জীবন বাঁচাতে অন্যের জীবন শেষ করার মত কিছু। আমরা যখন কথা শুরু করি তখন আমি ভালই ছিলাম। আমি এটা শুরু করতে চাইনি, আর এখন আমার মাথা বিগড়ে গেছে জলমুরগির মত আর তাই চরম নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছি তোমার সঙ্গে। আমার কথায় তুমি কোনও কান দিয়ো না, ডার্লিং। আমি তোমাকে ভালোবাসি, সত্যিই। তুমি জান আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার মত করে আমি আর কখনওই কাউকে ভালোবাসিনি।’
জীবিকার কারণে সচরাচর যে-মিথ্যে বলতে হয় তাকে তাতেই আবার ফিরে গেছে সে।
‘তুমি আমার মন ভোলাতে চাইছ।’
‘তুই হলি কুত্তি,’ বলল সে। ‘ধনী কুত্তি। আর এইমাত্র যা বললাম তা হলো কবিতা। আমার ভেতরটা এখন কবিতায় ছেয়ে গেছে। পচন আর কবিতা। পচে যাওয়া কবিতা।’
‘থামো, হ্যারি, থামো, একটা শয়তানে রূপান্তরিত না হলে কি তোমার আর এখন ভাল লাগছে না?’
‘আমি কিছুই ছেড়ে চলে যেতে চাই না,’ বলল মানুষটা। ‘কিছুই পেছনে ফেলে যেতে চাই না আমি।’

এখন ধীরে ধীরে নেমে আসছে সন্ধে আর সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সূর্য ঢলে পড়েছে পেছনে আর সমভূমি জুড়ে নেমেছে লম্বা একটা ছায়া আর ছোট ছোট প্রাণী খেয়ে বেড়াচ্ছে তাঁবুর পাশেপাশে; দ্রুত মাথা নামাচ্ছে আর লেজ নাড়াচ্ছে তারা, ঝোপ ছেড়ে চলে এসেছে অনেকটা বাইরে। একটা পাখিও আর মাটির ওপরে নেই। সবগুলো উড়ে গিয়ে বসে পড়েছে গাছের ডালে। অনেকগুলো পাখি। তার ব্যক্তিগত ফাইফরমাশ খাটা ছেলেটা বসে আছে বিছানার পাশে।
‘মেমসাহেব শিকারে গেছেন,’ বলল ছেলেটা। ‘বাওয়ানার কিছু লাগবে?’
‘কিচ্ছু না।’
শিকারে বেরিয়েছে মহিলা মাংস জোগাড়ের উদ্দেশ্যে, জানে শিকার দেখতে কতটা আনন্দ পায় হ্যারি, আর তাই সরে গেছে সে বেশ খানিকটা দূরে, যেন সমভূমির ছোট্ট যে-অংশটুকু রয়েছে তার দৃষ্টিসীমার মাঝে তা কিছুতেই বাধাপ্রাপ্ত না হয়। সে তো আবার খুব বিবেচক, ভাবল হ্যারি। যা কিছু সে জানে, বা কোথাও পড়েছে, কিংবা কখনও কারও কাছে শুনেছে, সব নিয়েই তার ভাবনা।
মহিলার কাছে যাবার আগেই যে তার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে সেজন্যে মহিলাকে দোষী করা চলে না। কোনও মহিলা কীভাবে জানবে যে সে কেবলই বলে চলেছে অর্থহীন কথা; তার পক্ষে কীভাবে বোঝা সম্ভব যে সে কথা বলছে স্রেফ পুরনো অভ্যেসের বশে আর আরাম পাবার মতলবে? যখন থেকে সে ভাবতে লাগল এক কথা আর মুখে বলতে লাগল আরেক, ততই তার মিথ্যে তাকে সফল করে তুলল মেয়েদের মাঝে, সত্য কথা তাকে এতটা সফলতা এনে দিতে পারেনি।
অবশ্য এমনও নয় যে সে এত মিথ্যে বলেছে যে সত্য সম্বন্ধে বলার মত কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। সে যাপন করে ফেলেছে তার জীবন আর তারপর আবার শুরু হয়েছে নতুন জীবনের পালা যেখানে রয়েছে নতুন নতুন মানুষ আর টাকার ছড়াছড়ি, এই জীবন সে যাপন করতে শুরু করেছে সেই একই সুন্দর সুন্দর জায়গা আর সেগুলোর পাশাপাশি নতুন কয়েকটাতেও।
ভাবনা-চিন্তা-বিবেচনা থেকে এসেছে সে আর কী চমৎকারই না হয়ে উঠেছে জীবনটা। ভেতরটা ভরে গেছে এমন ফলে-ফুলে যেন কখনওই তার আর ছিন্নভিন্ন হতে না হয়, যেভাবে হয়েছে বেশির ভাগ মানুষ, আর সে ধরেছে এমন এক ভড়ং যেন আগের অভ্যস্ত কাজগুলোর কোনওটা নিয়েই তার আর মাথাব্যথা নেই, তারপর এখন সেগুলো সে আর করেই না। কিন্তু, ফিসফিস করে সে বলে নিজেরই কানে কানে যে এই মানুষদের নিয়ে সে লিখবে; মাত্রাতিরিক্ত এই ধনীদের নিয়ে; যদিও সে তাদের কেউ নয় বরং তাদের দেশে এসেছে গুপ্তচরের মত; এই দেশ ত্যাগ করার পর সে লিখবে এটা নিয়ে আর পৃথিবীতে অন্তত একবার এটা লিখিত হবে এমন কারও হাতে যে পরিষ্কারভাবে জানে কী সে লিখছে। কিন্তু এই লিখাটা আর কখনওই হবে না, কারণ, লিখাহীন প্রতিটা দিন, আরাম, যা সে ঘৃণা করে তা-ই হয়ে থাকতে থাকতে ক্ষয়ে গেছে তার সামর্থ্য আর ক্রমে ক্রমে এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে তার কাজ করার ইচ্ছে যে, শেষমেষ, সে এখন আর কোনও কাজই করে না। এখন যে-মানুষদের মাঝে সে আছে তাকে কাজ করতে না দেখলেই তারা সবাই শান্তি পায় আরও বেশি। জীবনের ভাল সময়ে সে সবচেয়ে সুখ পেয়েছিল আফ্রিকায়, তাই নতুন জীবন শুরু করার তাগিদে সে ফিরে এসেছে এখানে। তাদের এই সাফারিতে রয়েছে আরামের ন্যূনতম ব্যবস্থা। কষ্ট এখানে নেই; কিন্তু নেই বিলাসও আর সে ভেবেছিল এভাবেই তার পক্ষে সম্ভব হবে অনুশীলনে ফিরে যাওয়া। কোনও উপায়ে সে ঝরিয়ে ফেলতে পারবে তার আত্মার চর্বি ঠিক যেভাবে কোনও যোদ্ধা তার শরীরে জমা চর্বি ঝরিয়ে ফেলতে অনুশীলন করতে যায় পাহাড়ে।
মহিলারও এই উপায় পছন্দ হয়েছিল। বলেছিল এটাকে সে ভালোবাসে। ভালোবাসে সে যাবতীয় রোমাঞ্চ, নতুন নতুন পরিবেশ, যেখানে রয়েছে নতুন নতুন সব মানুষ আর হাসি-আনন্দে ভরা জীবন। আর অনুভব করেছে সে কাজে ফেরার ইচ্ছেশক্তির মরীচিকা। এখন এভাবেই যদি হয়ে যায় সবকিছুর শেষ, আর সে জানে তা-ই হতে চলেছে, তাহলে অন্তত মেরুদণ্ড-ভাঙা সাপের মত ঘুরে কিছুতেই তার নিজেকে ছোবল মারা চলবে না। এটা ওই মহিলার দোষ নয়। সে না থাকলে তার জায়গায় থাকতে পারত অন্য কোনও মহিলা। সে যদি মিথ্যের সাহায্যে বেঁচে থাকে তাহলে ওটার হাত ধরে মরার চেষ্টা করতেই বা অসুবিধে কোথায়! পাহাড়ের ওপাশ থেকে তার কানে ভেসে এল একটা গুলির শব্দ।
শিকার বেশ ভাল করতে পারে এই ভাল মহিলা, ধনী এই কুত্তি, তার প্রতিভার দয়াময়ী তত্ত্বাবধানকারিণী এবং ধ্বংসকারিণী। বাজে কথা। তার প্রতিভা সে নিজেই ধ্বংস করেছে। তাকে আরামে রেখেছিল বলে কেন সে দোষারোপ করবে এই মহিলাকে? তার প্রতিভা সে নিজহাতে ধ্বংস করেছে সেটাকে ব্যবহার না করে করে, নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে আর তার বিশ্বাস, অতিরিক্ত মদ্যপানে তার উপলব্ধির ধার ভোঁতা করে ফেলে, আলসেমিতে, ঢিলেমিতে, দরিদ্র স্বজনকে অবহেলা করে ধনীদের পা চাটাতে, গর্ব আর সংস্কারে, ছলে বা কৌশলে। এটা কী? পুরনো বইয়ের কোনও তালিকা? কী-ই বা এমন প্রতিভা ছিল তার? অবশ্য প্রতিভা তার ছিল কিন্তু সেটাকে ভালভাবে ব্যবহার না করে সে করেছে ব্যবসা। কী করেছে নয়, কী সে করতে পারত, সবসময় তা-ই ছিল তার প্রতিভার মূল কথা। আর জীবিকার জন্যে হাতে কলম বা পেন্সিলও তুলে নেয়নি সে, নিয়েছে অন্য কিছু। বড়ই অদ্ভুত ছিল এই ব্যাপারটাও, যে, যখনই সে অন্য মহিলার প্রেমে পড়েছে, সেই মহিলা ছিল তার সর্বশেষ প্রেমিকার চেয়ে বেশি ধনী। অদ্ভুত নয়? কিন্তু যখন থেকে সে আর প্রেমে পড়েনি, কেবল মিথ্যেই বলে গেছে, যেমন বলছে এই মহিলার সঙ্গে, এখন, যার টাকা আগের সব মহিলার চেয়ে বেশি, যার টাকার কোনও শেষ নেই, যার ছিল একটা স্বামী আর সন্তান, যার ছিল কয়েকজন প্রেমিক যাদের কেউই তাকে সুখী করতে পারেনি, আর যে তাকে গভীরভাবে ভালোবেসেছে একজন লেখক হিসেবে, মানুষ হিসেবে, সঙ্গী হিসেবে আর গর্ব করার উপযুক্ত এক সম্পত্তি হিসেবে; এটাও কম অদ্ভুত নয় যে যখন সে তাকে সত্যিই ভালোবাসত তার চেয়ে এখন তাকে মোটেই ভালো না বেসে আর মিথ্যে বলে মহিলার টাকা উসুল করে দিতে পারছে আরও বেশি।
আমাদের সবাইকে অবশ্যই চেনা উচিত আমাদের কাজের ভেতর দিয়ে, ভাবল সে। যাই হোক, মানুষকে তার জীবিকার সন্ধান করা উচিত নিজ নিজ প্রতিভার রাজ্যে। সারা জীবন ধরে, কোনও না কোনওভাবে, সে বিক্রি করেছে তার প্রাণশক্তি আর যখন আবেগ আর তেমন সবল থাকে না তখনই আরও বেশি উসুল করে দেয়া যায় টাকা। কথাটা সে বুঝতে পেরেছে এতদিনে কিন্তু এটা নিয়েও সে লিখবে না কখনওই, এমনকি এখনও নয়। না, এটা নিয়ে সে লিখবে না, যদিও লিখার পক্ষে এটা বেশ উপযুক্ত।
এবার মহিলা এসে গেল তার দৃষ্টিসীমার ভেতরে, খোলা জায়গাটা পেরিয়ে এগোতে লাগল তাঁবুর দিকে। পরনে তার আঁটো পাজামা আর হাতে রাইফেল। একটা টমি কাঁধে ঝুলিয়ে দুই ছেলে আসছে তার পেছনে পেছনে। এখনও মহিলা বেশ দেখতে, ভাবল সে, আর শরীরটাও চমৎকার। বিছানার ব্যাপারটাতে তার রয়েছে বিশাল এক প্রতিভা আর উপলব্ধি, সুন্দরী সে নয়, কিন্তু চেহারাটা তার পছন্দ, প্রচুর পড়াশোনা করে মহিলা, পছন্দ করে ঘোড়ায় চড়তে আর শিকার করতে আর, অবশ্যই সে মদ্যপান করে মাত্রাতিরিক্ত। একরকম যুবতী থাকতেই মারা যায় তার স্বামী আর কিছুদিনের জন্যে নিজেকে সে নিবেদিত করে তার সদ্য-বেড়ে-ওঠা দুই সন্তানের দেখাশোনায়, সন্তানদের অবশ্য তখন তাকে আর প্রয়োজন ছিল না বরং মায়ের উপস্থিতিতে তারা বিব্রতই বোধ করত, ফলে নিবেদন গেল এবার ঘোড়ার আস্তাবলে, বইয়ে, আর বোতলে। সন্ধের পর ডিনারের আগ পর্যন্ত পড়তে পছন্দ করত সে আর পড়তে পড়তে পান করত স্কচ আর সোডা। ডিনারের সময় আসতে আসতে মোটামুটি মাতাল হয়ে পড়ত মহিলা আর ডিনারে এক বোতল ওয়াইন সাবাড় করার পর সচরাচর ঘুমিয়ে যেত নেশার ঘোরেই।
এটা তার জীবনে প্রেমিক আসার আগের গল্প। প্রেমিকেরা আসার পর মদ্যপান কমিয়ে দিল সে, কারণ, ঘুমাবার জন্যে তখন তাকে আর মাতাল হতে হত না। কিন্তু প্রেমিকেরা তাকে বিরক্ত করে তুলল। বিয়ে করল সে এমন এক মানুষকে যে কখনওই তাকে বিরক্ত করেনি, কিন্তু প্রেমিকেরা তাকে ঠিক তাই-ই করত, পৌঁছে দিত বিরক্তির চূড়ায়।
তারপর এক প্লেন ক্র্যাশে মারা গেল তার দুই সন্তানের একজন এবং এই দুর্ঘটনার পর সে আর কোনও প্রেমিক চায়নি, আর মদও যেহেতু অনুভূতিনাশক নয়, বেরতে হলো তাকে নতুন এক জীবনের সন্ধানে। হঠাৎ সে ভীষণ আতঙ্কিত হয়ে পড়ল একাকিত্বের ভাবনায়। কিন্তু এবার সে চাইল এমন কাউকে যাকে সে শ্রদ্ধা করে।
ঘটনাটা শুরু হয়েছিল খুবই সাধারণভাবে। হ্যারির লিখার ভক্ত ছিল সে আর সবসময়েই তার জীবনযাত্রাকে দেখত ঈর্ষার চোখে। সে ভাবত মন যা যা করতে চায় ঠিক তা-ই করে হ্যারি। যেমন ধাপে ধাপে তাকে পেয়েছে সে একটু একটু করে আর যেভাবে তার প্রেমে পড়েছে শেষমেষ, সেগুলোর সবই ছিল নিজের জন্যে এক নতুন জীবন নির্মাণের পথে ক্রমশ উত্থান আর ওদিকে হ্যারি তার পুরনো জীবনের অবশিষ্ট টুকরোগুলো নিয়ে ফেঁদে বসেছিল দারুণ এক ব্যবসা।
এই ব্যবসা ফেঁদেছিল সে তার নিরাপত্তার জন্যে, আরামের জন্যেও বটে, এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, এছাড়া আর কোন্ কারণে? সে জানে না। সে যে-জিনিস চাইবে সেটাই তাকে কিনে দেবে মহিলা। এটা সে জানত। মহিলা ছিলও তখন বেশ চমৎকার। আগের মহিলাদের মত তার সঙ্গেও শিগগিরই বিছানায় গিয়েছিল সে; বরং তার সঙ্গেই বেশি, কারণ, এই মহিলা ছিল ধনী, যথেষ্ট আনন্দদায়ক, প্রশংসা করতে প্রস্তুত আর কখনওই নাটক করত না। আর এই যে-নতুন জীবন নির্মাণ করেছিল মহিলা সেটাও এখন ধসে পড়ার মুখে, কারণ, দুই সপ্তাহ আগে হাঁটুতে একটা কাঁটার খোঁচা খেয়েও হ্যারি তাতে আয়োডিন লাগায়নি; তখন সন্তর্পণে এগোচ্ছিল তারা একপাল ওয়াটারবাকের ফোটো তুলতে, কান খাড়া করে দাঁড়িয়েছিল প্রাণীগুলো, প্রথম শব্দ শুনতে পাওয়ামাত্র ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়বে জঙ্গলে। তা-ই গিয়েছিল ওয়াটারবাকের পাল, ফোটো তোলার অনেক আগেই।
এসে পড়ল মহিলা।
খাটিয়ার ওপর থেকে তার দিকে ফিরল হ্যারি। ‘হ্যালো,’ বলল সে।
‘একটা মদ্দা টমি শিকার করেছি,’ বলল মহিলা তাকে। ‘ওটা দিয়ে ভাল শুরুয়া তৈরি করে দেব তোমাকে, সঙ্গে ক্লিমসহ আলু ভর্তা। এখন কেমন লাগছে?’
‘অনেকটা ভাল।’
‘টমিটা সুন্দর না? আমি জানতাম তুমি পছন্দ করবে। যখন শিকারে যাই তুমি তখন ঘুমাচ্ছিলে।’
‘ভাল একটা ঘুম হয়েছে আমার। অনেক দূরে গিয়েছিলে?’
‘না। পাহাড়টার ঠিক ওপাশে। বেশ ভালভাবেই গুলি করেছি টমিটাকে।’
‘তোমার শিকারের হাত চমৎকার।’
‘শিকার করতে আমি ভালোবাসি। আফ্রিকাকেও ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি যদি সুস্থ থাকতে কী মজাই না হত, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মজা। তুমি সঙ্গে থাকলে শিকারে যে আরও কত আনন্দ পেতাম ভাবতেও পারবে না। দেশটাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি।’
‘আফ্রিকাকে আমিও ভালোবাসি।’
‘ডার্লি, তুমি বুঝবে না তোমার ভাল লাগছে দেখে আমার যে কতটা ভাল লাগছে। তোমার ওরকম হয়ে যাওয়াটা আমার ভাল লাগে না। ওভাবে আমার সঙ্গে কখনওই আর কথা বলবে না, বলো?’
‘না,’ বলল সে। ‘কী বলেছি আমার মনে নেই।’
‘আমাকে ধ্বংস করার কোনও প্রয়োজন নেই তোমার, তাই না? আমি এক মাঝবয়েসী মহিলা, তোমাকে ভালোবাসি আর তুমি যা চাও তা-ই করতে চাই। ইতিমধ্যেই দু’তিন বার ধ্বংস হয়েছি আমি। তুমিও আমাকে আর ধ্বংস করতে চাইবে না, বলো?’
‘বিছানায় আমি তোমাকে কয়েক বার ধ্বংস করতে চাই,’ বলল সে।
‘হ্যাঁ। এই ধ্বংস আনন্দের। আমাদের তৈরিই করা হয়েছে এভাবে ধ্বংস হবার জন্যে। আগামীকাল প্লেন এসে যাবে।’
‘তুমি কীভাবে জানলে?’
‘আমি নিশ্চিত। প্লেন আসবেই। ছেলেরা ঘাস আর কাঠ জোগাড় করে ফেলেছে আগুন জ্বেলে চিহ্ন দেয়ার জন্যে। আমি আজও গিয়ে দেখে এসেছি। প্লেন ল্যান্ড করার মত প্রচুর জায়গা আছে এখানে আর চিহ্ন দেয়ার জন্যে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলোও জড়ো করা হয়েছে দুই প্রান্তেই।’
‘কিন্তু আগামীকালই যে আসবে বুঝলে কীভাবে?’
‘আমি নিশ্চিত ওটা আসবেই। আরও আগেই আসা উচিত ছিল। তারপর, শহরে গিয়ে, সারিয়ে তুলব তোমার পা আর তারপর দু’জনে শুরু করব আনন্দময় কিছু ধ্বংস। ওই জাতের ভয়ঙ্কর কথাবার্তা কিন্তু আর নয়।’
‘একটা ড্রিঙ্ক চলবে? সূর্য তো ঢলে পড়েছে।’
‘তুমি নিতে চাও?’
‘আমি তো ইতিমধ্যেই নিয়েছি।’
‘আমরা দু’জনে একসঙ্গে নিই। মোলো, দু’টো হুইস্কি-সোডা আনো!’ হাঁকল মহিলা।
‘তোমার বোধ হয় মসকুইটো বুট পরে নেয়া উচিত,’ বলল সে মহিলাকে।
‘না, আগে গোসল সেরে নিই ....’
পান করতে লাগল তারা আর চারপাশে ধীরে ধীরে নামতে লাগল অন্ধকার আর অন্ধকার পুরো গাঢ় হবার ঠিক আগে যখন লক্ষভেদ করার মত আলোটুকুও মুছে গেল, সামনের খোলা জায়গাটা পেরিয়ে পাহাড়ের দিকে এগোতে লাগল একটা হায়েনা।
‘হারামজাদাটা প্রত্যেক রাতে এদিক দিয়ে যায়,’ বলল মানুষটা। ‘প্রত্যেক রাতে যেতে দেখেছি দুই সপ্তাহ ধরে।’
‘এটাই রাতের বেলা ডাকে। তা ডাকুক। যদিও নোংরা একটা জানোয়ার এই হায়েনা।’
দু’জনে পান করে চলল একত্রে, অনেকক্ষণ একইভাবে শুয়ে থাকার অস্বস্তিটুকু ছাড়া ব্যথার কোনও বোধ আর নেই তার, আলো জ্বালছে ছেলেরা, আর তাদের ছায়া লাফিয়ে বেড়াচ্ছে তাঁবুর ওপর, বশ্যতার এই জীবন তার ঢলে পড়তে চাইছে অসহায় এক আত্মসমর্পণে। তার সঙ্গে খুবই ভাল আচরণ করেছে মহিলা। অথচ আজ বিকেলে সে-ই তার সঙ্গে করেছে নিষ্ঠুর আর অনুচিত আচরণ। মানুষ হিসেবে মহিলা চমৎকার, সত্যি বলতে কি অপূর্ব। আর তারপরেই হঠাৎ তার মনে হলো যে সে মরতে যাচ্ছে, মৃত্যুর তার আর দেরি নেই।
অনুভূতিটা হঠাৎ যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর; পানির তোড় কিংবা দমকা হাওয়ার মত নয়; অতর্কিত অশুভ-গন্ধী এক শূন্যতার মত আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অশুভ সেই দুর্গন্ধের প্রান্ত ছুঁয়েই যেন আবার ভেসে ভেসে চলে গেল হায়েনাটা।
‘কী ব্যাপার, হ্যারি?’ জানতে চাইল মহিলা।
‘কিছু না,’ বলল সে। ‘তুমি বরং ওপাশে সরে বসো। বাতাসের দিকে।’
‘মোলো ব্যান্ডেজ পাল্টে দিয়েছে?’
‘হ্যাঁ। এখন তো কেবল বোরিক লাগাচ্ছি।’
‘কেমন লাগছে?’
‘একটু অস্থির অস্থির।’
‘গোসল করতে ভেতরে যাচ্ছি,’ বলল মহিলা। ‘যাব আর আসব। তোমার সঙ্গে খাবার পর খাটিয়া নিয়ে যাব ভেতরে।’
তাহলে, বলল হ্যারি মনে মনে, ঝগড়া থামিয়ে ভালই করেছি আমরা। অবশ্য এই মহিলার সঙ্গে বেশি ঝগড়া সে কখনওই করেনি, বরং অন্যান্য প্রেমিকাদের সঙ্গে সে এত ঝগড়া করেছে যে তারা সবাই, শেষমেষ, ঝগড়ার তিক্ততা গায়ে মেখে দু’জনের যাবতীয় প্রেম লণ্ডভণ্ড করে চলে গেছে। সে ভালোবেসেছে যেমন খুব বেশি, তেমনি ভালোবাসা দাবিও করেছে খুব বেশি, আর শেষমেষ শেষ করে ফেলেছে সবকিছু।

[এবার তার মনে পড়ল ঝগড়া করে প্যারিস থেকে কনস্টান্টিনোপল চলে যাওয়া আর সেখানকার একাকিত্বের কথা। দিনের পর দিন কাটাল সে এক বেশ্যাপাড়া থেকে আরেক বেশ্যাপাড়ায়, কিন্তু তাতেও তার একাকিত্ব না কেটে যখন প্রকট হলো আরও, সে চিঠি লিখল তাকে, প্রথম সেই মেয়েটিকে, যে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, লিখল যে অনেক চেষ্টা করার পরেও সে তার একাকিত্ব দূর করতে পারেনি .... লিখল কীভাবে তার একবার মনে হয়েছিল যে মেয়েটিকে সে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে রিজেন্সের বাইরে আর দেখামাত্র মাথা ঘুরে মোচড় দিয়ে উঠেছে তার ভেতরটা, চেহারায় মিল থাকা সেই মেয়েটিকে অনুসরণ করেছে সে বুলভারের পাশ দিয়ে, অবশেষে একসময় টের পেয়েছে এই মেয়ে সেই মেয়ে নয় আর তখন তাকে নিশ্চল করে দিয়ে বিদায় নিয়েছে অপূর্ব এক অনুভব। লিখেছে তাকে ভোলার জন্যে কীভাবে শুয়েছে সে একের পর এক মেয়ের সঙ্গে কিন্তু সেই স্মৃতি তাকে ছেড়ে তো যায়ইনি বরং আরও মেতে উঠেছে বেদনাময় নৃত্যে। লিখেছে তার সঙ্গে যেটাই করুক সেই মেয়ে তাতে এখন তার আর কোনও আসে যায় না, ভালোবাসার যে-অসুখ সে বরণ করেছে স্বেচ্ছায় তা থেকে নিজেকে সারিয়ে তোলা এখন তার পক্ষে অসম্ভব। চিঠিটা লিখল সে ক্লাবে বসে, ধীর-স্থির-ঠাণ্ডা মাথায়, তারপর পোস্ট করল তা নিউ ইয়র্কের উদ্দেশে আর মেয়েটিকে অনুরোধ করল সে যেন জবাব দেয় তার অফিসের ঠিকানায়। এটাই তার কাছে মনে হলো নিরাপদ। রাত নামার পর মেয়েটির স্মৃতি তার ভেতরটা ভরিয়ে তুলল এমন এক শূন্যতায় যে অসহ্য যন্ত্রণায় সে নেমে এল পথে আর উদ্দেশ্যহীন ঘুরতে ঘুরতে একসময় পেরিয়ে গেল ট্যাক্সিম, তারপর একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে পা বাড়াল রাতের খাবার খেতে। খাবার পর মেয়েটিকে সে নিয়ে গেল এক নাচের জায়গায়, জঘন্য নাচল মেয়ে, আর তখন তাকে ছেড়ে তুলে নিল সে উত্তেজক এক আর্মেনিয়ান ছুকরিকে যে নাচের তালে তালে এত জোরে তার পেটে পেট ঘষতে লাগল যে প্রায় ছ্যাঁকা লাগার জোগাড়। মেয়েটিকে তুলে নেয়ার সময় হাতাহাতিও হয়ে গেল ব্রিটিশ এক গানার সাবালটার্নের সঙ্গে। গানার তাকে যেতে বলল বাইরে আর তারপর অন্ধকারে লড়ল তারা রাস্তার খোয়ার ওপরে। দু’বার চোয়ালের পাশে শক্ত ঘুসি খাবার পরেও লুটিয়ে না পড়ায় সে বুঝতে পারল যে গানার লড়তেই এসেছে। তার শরীরে ঘুসি চালাল গানার, তারপর চোখের পাশে। এবার সে ঝাড়ল একটা জোর লেফট হুক আর রেগে আগুন-হয়ে-যাওয়া গানার ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে জড়িয়ে ধরে একটানে ছিঁড়ে ফেলল তার কোটের হাতা আর সে তখন দু’বার ঘুসি মারল তার কানের পেছনে আর তারপর ডানহাতি প্রচণ্ড এক ঘুসি চালিয়ে ধাক্কা মেরে তাকে সরিয়ে দিল পেছনে। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল গানার আর সে কেটে পড়ল মেয়েটিকে নিয়ে, কারণ, ততক্ষণে ছুটে আসতে শুরু করেছে মিলিটারি পুলিশ। ঝটপট তারা উঠে পড়ল এক ট্যাক্সিতে আর বসফরাসের পাশ দিয়ে এসে পৌঁছুল রিমিলি হিসায়, আর একটা চক্কর দিয়ে, ফিরে এল রাতের ঠাণ্ডা কোলে আর তারপর বিছানায় গিয়ে দেখল যে বাইরে থেকে ছুকরি মনে হলেও মেয়ে পেকে গেছে অনেক আগেই তবে ঠোঁট তার যেন গোলাপের পাপড়ি, সিরাপের মত মিষ্টি, মসৃণ তলপেট, বড় বড় দুই স্তন আর পাছার নিচে বালিশ দেয়ার কোনও দরকারই হলো না আর দিনের প্রথম আলো ফুটতেই জাগার অপেক্ষায় না থেকে সে ত্যাগ করল মেয়েটিকে আর পেরা প্যালেসে এসে পৌঁছুল কালশিটে পড়া এক চোখ নিয়ে, কোটটাকে কাঁধেই ফেলে রাখতে হলো একটা হাতা ছিঁড়ে যাওয়ায়।
সেই রাতেই বেরিয়ে পড়ল সে আনাতোলিয়ার উদ্দেশে আর তার মনে পড়ল, যাত্রার শেষের দিকে, সারাদিন এগিয়ে চলল আফিমের জন্যে লাগানো পপি খেতের মাঝ দিয়ে আর তাকিয়ে থাকতে থাকতে কেমন ঘোর লেগে যায়, শেষমেষ, গোলমাল হয়ে যায় দূরত্বের হিসেব, আর যেখানটায় তারা আক্রমণ করেছিল নতুন আসা কনস্টানটাইন অফিসারদের সঙ্গে নিয়ে, যাদের কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না, সেনাদের মাঝে কামানের গোলাবর্ষণ করছিল আর্টিলারি আর ব্রিটিশ পর্যবেক্ষক কাঁদতে শুরু করেছিল ঠিক একজন শিশুর মত।
সেদিনই সে প্রথম দেখতে পেল এমন সব মৃত মানুষ যাদের পরনে শাদা ব্যালে স্কার্ট আর পায়ে পশমের ফুলতোলা নাগরা। অটল তুর্কিরা এগিয়ে এল দলে দলে আর পালাতে লাগল স্কার্ট পরা মানুষেরা আর অফিসারেরা গুলি চালাল তাদের ওপর আর তারপর পালাতে লাগল নিজেরাই, পালাল সে আর ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকও আর ছুটতে ছুটতে ফুসফুস ফাটার জোগাড় হলো আর মুখ ভরে গেল পেনির বিস্বাদে আর থামল তারা বড় বড় কয়েকটা পাথরের আড়ালে আর তখনও ঠিক আগের মতই অটল তুর্কিরা এগিয়ে আসছে দলে দলে। তারপর সে দেখেছে এমন সব দৃশ্য যেগুলোর কথা জীবনে সে কখনও কল্পনাও করেনি আর তারপরে সে দেখেছে সেগুলোর চেয়েও ভয়াবহ দৃশ্য। তাই প্যারিসে ফিরে ওই বিষয়ে মুখ খোলেনি সে, এমনকি সেসবের উল্লেখও তার সহ্য হত না। আর কাফেটার সামনে দিয়ে আসতে চোখে পড়ল তার আমেরিকান সেই কবি যে সামনে পিরিচের একটা স্তূপ নিয়ে বসে আর আলুর মত গোল মুখটায় বোকা বোকা চেহারা নিয়ে দাদা আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করছে রুমানিয়ার এক লোকের সঙ্গে যার নাম সে বলল ত্রিস্তান জারা, সবসময় যে পরে থাকে একটা মনোকল আর সবসময় ভোগে মাথাব্যথায় আর, ফিরেছিল সে অ্যাপার্টমেন্টে তার স্ত্রীর কাছে যাকে সে ভালোবাসতে শুরু করেছে আবার, ঝগড়াঝাঁটি শেষ, উন্মাদনা শেষ, বাড়ি ফিরেই এখন খুশি, আর অফিসে আসা চিঠিটা এখন চলে এসেছে তার অ্যাপার্টমেন্টে। এই চিঠি তার লিখা সেই চিঠিটার জবাব আর এক সকালে এল ওটা বড় একটা থালায় শুয়ে আর খামের ওপরের হাতের লিখাটা দেখামাত্র ঠাণ্ডা হয়ে গেল তার পুরো শরীর আর চিঠিটাকে সে লুকাতে গেল আরেক চিঠির তলায়। কিন্তু তার স্ত্রী জানতে চাইল, ‘চিঠিটা কার, ডিয়ার?’ আর ওটাই ছিল সেই সম্পর্ক শুরু হবার শেষ।
তাদের সবার সঙ্গে কাটানো সুসময়গুলোর কথা মনে পড়ল তার, আর ঝগড়াগুলোও। কেন যেন সবসময় সুন্দর জায়গাগুলোকেই তারা বেছে নিত ঝগড়া করার জন্যে। আর যখন সে সবচেয়ে ভাল বোধ করত সবসময় তখনই কেন বা ঝগড়া লাগত তারা? সে কখনওই সেই ঝগড়াগুলোর কোনও একটা নিয়ে লিখেনি, কারণ, প্রথমত, সে কখনওই কারও মনে আঘাত দিতে চায়নি আর এটাও মনে হয়েছে যে লিখার জন্যে ওটা ছাড়াও রয়েছে আরও অনেক বিষয়। কিন্তু সে সবসময় ভেবেছে যে ওসব নিয়ে লিখবে একদিন শেষমেষ। কত কী যে লিখার আছে চারপাশে ছড়িয়ে। সে দেখেছে পৃথিবীর পরিবর্তন; কেবল ঘটনাবলীর নয়; যদিও দেখেছে সে অনেক ঘটনার পরিবর্তন আর পর্যবেক্ষণ করেছে মানুষকেও, দেখেছে সে সূক্ষ্মতর পরিবর্তন আর মনে রেখেছে বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন ধরনের মানুষের কথা, সময়ভেদে তাদের পরিবর্তনের কথা। সে ছিল এই পরিবর্তন প্রক্রিয়ারই অন্তর্গত আর পরিবর্তন সে পর্যবেক্ষণ করেছে আর পরিবর্তন নিয়ে লিখাটা ছিল তার কর্তব্য; কিন্তু ওটা নিয়ে সে আর কখনওই লিখবে না।]

‘কেমন লাগছে এখন?’ বলল মহিলা। গোসল সেরে সে বেরিয়ে এসেছে তাঁবু থেকে।
‘ভাল।’
‘এখন খাবে?’ মহিলার পেছনে ফোল্ডিং টেবিল হাতে সে দেখতে পেল মোলোকে আর খাবার-দাবার নিয়ে এসেছে আরেকটা ছেলে।
‘আমি লিখতে চাই,’ বলল সে।
‘শক্তি বাড়াবার জন্যে তোমার খানিকটা শুরুয়া খাওয়া উচিত।’
‘আমি আজরাতেই মারা যাচ্ছি,’ বলল সে। ‘শক্তি বাড়াবার আর প্রয়োজন হবে না।’
‘হ্যারি, প্লিজ, নাটক করো না,’ বলল মহিলা।
‘শুঁকে বুঝতে পারছ না? উরু পর্যন্ত আমার অর্ধেক শরীর পচে গেছে। তোমার ওই শুরুয়া আমার কোন্ কাজে লাগবে? মোলো, হুইস্কি-সোডা আনো।’
‘প্লিজ শুরুয়াটা নাও,’ বলল মহিলা নরম সুরে।
‘বেশ।’
শুরুয়াটা খুবই গরম। যথেষ্ট ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত ধরে রইল সে কাপটা আর তারপর পুরোটা খেয়ে ফেলল একবারে।
‘তুমি সত্যিই খুব ভাল মেয়ে,’ বলল সে। ‘আমার ওপর একদম নজর রেখো না।’
স্পার আর টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি পত্রিকায় বহু বার ছাপানো সুপরিচিত, সুপ্রিয় মুখ নিয়ে তাকাল মহিলা তার দিকে, কেবল মদ্যপানের ফলে কিছুটা ম্লান, কেবল বিছানায় যাবার পক্ষে কিছুটা বেমানান, কিন্তু টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি কখনওই ছাপেনি ওই সুন্দর দু’টো বুক আর ওই কার্যকর দু’টো উরু আর ওই হালকাভাবে পিঠে-আদর-বুলানো দু’টো হাত, আর তাকিয়ে তাকিয়ে তার সুপরিচিত মধুর হাসি দেখতে দেখতেই আবার সে অনুভব করল মৃত্যুর ক্রমঅগ্রসরমান পদধ্বনি। এবার যেন ওটা আর ঝাঁপিয়ে এল না। এল মৃদু এক বাতাস হয়ে যা মোমবাতির শিখাকে সামান্য কাঁপালেও দীর্ঘতরই করে তোলে।
‘তারা আরও খানিকটা পরে আমার মশারিটা এনে টানিয়ে দিক গাছের সঙ্গে আর জ্বালিয়ে দিক আগুনটা। আজরাতে আর তাঁবুতে যাব না। নড়াচড়া করা ঠিক হবে না। পরিষ্কার রাত আজ। বৃষ্টি হবার সম্ভাবনা নেই।’
তাহলে এভাবেই মারা যাবে সে, তলিয়ে যাবে এক নীরব ফিসফিসানিতে। আর ঝগড়া নয়। এ-বিষয়ে সে এবার কথা দিতে পারে। যে-অভিজ্ঞতাটা তার কখনওই হয়নি তা থেকে নিজেকে সে বঞ্চিত করতে চায় না। তবু সম্ভবত করবে। সবকিছুই তো নষ্ট করে দিয়েছে সে। কিন্তু এটা বোধ হয় আর করবে না।
‘তুমি তো ডিকটেশন নিতে পারো না, তাই না?’
‘কখনও শিখিনি,’ বলল মহিলা তাকে।
‘ঠিক আছে।’
সেই সময়ও আর নেই, অবশ্যই, যদিও তার মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা সে দেখতে পাচ্ছে দূরবীনে আর ঠিকঠাক লিখতে পারলে সবটাই সে লিখে ফেলতে পারবে একটামাত্র প্যারায়।

[লেকের ওপরের পাহাড়ে কাঠের গুঁড়ির একটা বাড়ি, চুন-সুরকিতে শাদা। খাবার সময় সবাইকে ডাকার জন্যে দরজার কাছের এক খুঁটিতে ঝুলছে একটা ঘণ্টা। বাড়ির পেছনে মাঠ আর মাঠের পেছনে বন। লম্বারডি পপলারের একটা সারি চলে গেছে বাড়ি থেকে ডক পর্যন্ত। অন্যান্য জাতের পপলারও ছড়িয়ে আছে আশেপাশে। বনের প্রান্ত বরাবর একটা রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ে আর এই রাস্তাতেই সে কুড়ায় কালো জাম। একদিন পুড়ে গেল কাঠের গুঁড়ির বাড়িটা আর তার সঙ্গে পুড়ে গেল খোলা ফায়ারপ্লেসের ওপরের হরিণের পাঅলা র‌্যাকে রাখা সবগুলো বন্দুক আর তারপর পুড়ল সেগুলোর নল, গলে গেল ম্যাগাজিনের সীসে, বাটগুলো ছাই হয়ে পড়ে রইল ছাইয়ের ওপর আর সেই ছাই ব্যবহৃত হলো সাবান তৈরির বিরাট কেতলিতে, পোড়া জিনিসগুলো নিয়ে কেউ যদি খেলার অনুমতি চায় দাদার কাছে, তাহলে বুড়ো বলবে, না। বুঝতেই পারছেন বন্দুকগুলো এখনও তার এবং সে আর নতুন কোনও বন্দুক কিনেনি। শিকারও আর করেনি সে। একই জায়গায় আবার উঠল নতুন বাড়ি আর তাতে দেয়া হলো শাদা রঙ আর সেই বাড়িটার গাড়িবারান্দা থেকে দেখা যায় পপলার গাছ আর তার ওপারের লেক; কিন্তু নতুন সেই বাড়িতে নতুন কোনও বন্দুক আর এল না। বন্দুকের পোড়া নলগুলো তেমনই পড়ে রইল ছাইয়ের ওপর, সেগুলোকে আর স্পর্শও করল না কেউ।
ব্ল্যাক ফরেস্টে, যুদ্ধের পর, ট্রাউটের একটা স্রোতস্বিনী ইজারা নিয়েছিলাম আমরা আর দু’টো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া যেত সেখানে। একটা ছিল ট্রাইবার্গ থেকে উপত্যকা ধরে নেমে আর আর উপত্যকা বেড় দিয়ে গাছের ছায়ায় প্রান্ত ঘেরা শাদা রাস্তা যেটা আরেকটা পাহাড়ে উঠে ছোট ছোট কয়েকটা খামার আর শোয়ার্জবাল্ডদের বড় বড় বাড়িগুলোর পাশ কাটিয়ে, শেষমেষ স্রোতস্বিনী পেরিয়ে। ওখানেই আমাদের মৎস্য শিকারের শুরু।
আরেকটা রাস্তা খাড়া উঠে গেছে বনের প্রান্তে, তারপর পাইনবনের ভেতর দিয়ে পাহাড়ের চূড়া বরাবর এগিয়ে চলে গেছে একটা তৃণভূমির প্রান্তে আর তারপর তৃণভূমি পেরিয়ে নেমে এসেছে সেতুর কাছে। স্রোতস্বিনীর পাশে বার্চগাছের সারি; স্রোতস্বিনীটা সরু তবে পানি স্বচ্ছ আর খরস্রোতা যা কোথাও কোথাও বার্চের তলার মাটি সরিয়ে সেখানে সৃষ্টি করেছে ছোট ছোট ডোবা। ট্রাইবার্গের হোটেল-মালিক কাটাল বেশ ভাল একটা মরশুম। সময়টা ছিল চমৎকার আর আমাদের সবার মাঝে বেশ একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কিন্তু পরবর্তী বছরে এল মুদ্রাস্ফীতি, ফলে গত বছরের আয় দিয়ে হোটেল চালাতে পারল না সে আর শেষমেষ আত্মহত্যা করল গলায় দড়ি দিয়ে।
এটা অবশ্য ডিকটেশন দিয়ে লিখানো সম্ভব, কিন্তু ডিকটেশনের মাধ্যমে প্লেস কন্ট্রেসকার্পের পুরো চিত্র প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেখানে ফুলঅলারা ফুলে রঙ মাখায় রাস্তায় বসে বসে আর সেই রঙ গড়িয়ে গড়িয়ে চলে যায় অটোবাস ছাড়ার জায়গায় আর ওয়াইন ও রদ্দি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে যায় বুড়ো-বুড়িরা; ঠাণ্ডায় সর্দি ঝরে বাচ্চাদের নাক বেয়ে; নোংরা ঘাম, দারিদ্র আর মাতলামির দুর্গন্ধ ভেসে বেড়ায় কাফে দ্য অ্যামেচারে আর বল মুসেতের ওপরতলায় বাস করে বেশ্যার দল। রিপাবলিকান গার্ডের অশ্বারোহীটাকে নিজের বাড়িতে আমোদ-প্রমোদ করতে দেয় যে-দ্বাররক্ষিণী, তার চেয়ারে পড়ে থাকে অশ্বারোহীর অশ্বকেশরের ঝুঁটিঅলা হেলমেট। আর সেই সকালবেলা লোকেতেয়ারের আনন্দ আর ধরে না, কারণ, ক্রিমেরিতে ‘লাউতো’ পত্রিকা খুলতেই তার চোখে পড়েছে যে তার বাইসাইকেল রেসার স্বামী জীবনের সর্বপ্রথম বড় রেস  প্যারিস-ট্যুরসেই তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল তার আর হাসতে হাসতে কেঁদে ফেলে হলুদ খেলার পত্রিকাটা হাতেই সে চলে গেল ওপরতলায়। বল মুসেত চালাত যে-মহিলা তার স্বামী ছিল একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার আর যখনই ভোরের কোনও প্লেন ধরতে হত হ্যারিকে, ট্যাক্সি নিয়ে এসে তাকে জাগাত সে দরজায় টোকা মেরে আর রওনা দেয়ার আগে বারের জিঙ্কে দু’জনে পান করত একগ্লাস করে হোয়াইট ওয়াইন। সেখানকার প্রত্যেক প্রতিবেশীকেই চিনত সে তখন, কারণ, তাদের প্রত্যেকেই ছিল গরিব।
প্লেস ঘিরে ছিল দুই ধরনের মানুষ; মাতাল আর আমুদে খেলোয়াড়। মাতালেরা মদ খেয়েই ভুলে থাকত তাদের দারিদ্র; খেলোয়াড়েরা সেই দারিদ্রকে ব্যবহার করত নিজেদের স্বার্থে। তারা ছিল কম্যুনার্ডদের বংশধর আর নিজেদের রাজনীতির খোঁজখবর বেশ ভালই রাখত। তারা জানত কমিউনের পর ভার্সেই ট্রুপ এসে শহর দখল করলে কারা হত্যা করেছে তাদের বাবা, আত্মীয়স্বজন, ভাই, আর বন্ধুকে, এবং হাতের চামড়ায় কড়া পরা, টুপি মাথার কিংবা শ্রমিক শ্রেণীর চিহ্ন বহনকারী কাউকে দেখলেই তারা সঙ্গে সঙ্গে তাকে খতম করে দিয়ে নিয়েছে হত্যার প্রতিশোধ। আর ওই দারিদ্রের মাঝেই, একটা ওয়াইনের কো-অপারেটিভ আর বুচেরি শেভালিনের ওপাশের এক অঞ্চলে বসে সে সর্বপ্রথম লিখেছিল কীসব কাজ তার করতে হবে। প্যারিসের আর কোনও অঞ্চলকেই সে ওটার মত ভালোবাসেনি, সেই ডালপালা ছড়ানো গাছ, নিচের দিকে বাদামি-রঙ-করা শাদা পলস্তারার পুরনো পুরনো বাড়ি, গোল চত্বরে অটোবাসের দীর্ঘ সবুজ, বাঁধানো রাস্তার ওপর দিয়ে গড়িয়ে যাওয়া রক্তলাল ফুলের রঙ, রু কার্ডিনাল লেমোয়াঁ পাহাড় থেকে হঠাৎ সোজা নদীতে নেমে আসা, আরেক পাশে রু মুখেতারের জনাকীর্ণ সঙ্কীর্ণ জগত। প্যাঁথিয়ঁর দিকে চলে যাওয়া নানা রাস্তা আর বড় সেই রাজপথ যেটা ধরে সাইকেল চালাত সে, ওই অঞ্চলের একমাত্র বাঁধানো পথ, সাইকেল লাফাত না টায়ারের তলার মসৃণতার ফলে, পথটার দু’পাশে সরু সরু বাড়ি আর লম্বা সেই সস্তা হোটেল যেখানে মারা গিয়েছিল পল ভার্লেন। যে-অ্যাপার্টমেন্টে তারা থাকত সেখানে ছিল দু’টো মাত্র রুম আর হোটেলটার সর্বোচ্চ তলায় একটা রুম ভাড়া নিয়েছিল সে মাসিক ষাট ফ্রাঁয় যেখানে বসে সে করত লিখালিখির কাজ আর সেখান থেকে দেখতে পেত বাড়িঘরের ছাদ আর চিমনির নল আর প্যারিসের সবগুলো পাহাড়।
অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দেখা যেত কেবল খড়ি আর কয়লাঅলার ঘরটা। ওয়াইনও বিক্রি করত লোকটা, বাজে ওয়াইন। বুচেরি শেভালিনের বাইরে সোনালি ঘোড়ার মাথা আর খোলা জানালায় ঝুলত সোনা-রঙা হলুদ আর লাল ঘোড়ার মৃতদেহ, আর সবুজ-রঙ-করা কো-অপারেটিভে তারা যেত ওয়াইন কিনতে; ভাল ওয়াইন আর সস্তা। বাদবাকিটা জুড়ে পলস্তারার দেয়াল আর প্রতিবেশীদের জানালা। সেই প্রতিবেশীরা যারা, রাতে, রাস্তায় যখন পড়ে থাকত কেউ মাতাল হয়ে, গোঙাত আর বিলাপ করত টিপিক্যাল ফরাসি ইভরেসে  প্রচারণার ফলে যে-ইভরেসের কোনও অস্তিত্ব নেই বলেই সবার বিশ্বাস  তখন জানালা খুলত ধীরে ধীরে আর তারপর শুরু করত নানারকম ফিসফিসানি।
‘পুলিশ কোথায়? যখন কোনও প্রয়োজন নেই তখন ঠিক এসে হাজির হবে বাগারের দল। হয়ত ঘুমাচ্ছে কোনও বেশ্যার সঙ্গে। এজেন্টের খোঁজ নাও।’ যখন জানালা দিয়ে এক বালতি পানি ঢেলে দিত কেউ ততক্ষণে থামত গোঙানি। ‘কী ওগুলো? পানি। এই তো বুদ্ধিমানের মত কাজ।’ একে একে তারপর বন্ধ হয়ে যেত জানালা। তার স্ত্রী, মেরি, দিনে আট ঘণ্টা কাজের প্রতিবাদ জানিয়ে বলছিল, ‘যদি কোনও স্বামী ছ’টা পর্যন্ত কাজ করে তাহলে বাড়ি ফেরার পথে সামান্য মাতাল হয় আর টাকা-পয়সা তেমন ওড়ায় না। কিন্তু সে যদি কাজ করে মাত্র পাঁচটা পর্যন্ত তাহলে প্রত্যেক রাতে হয় পাঁড় মাতাল আর বাড়িতে ফেরে পকেট খালি করে। কাজের সময় কমিয়ে দিলে ভোগে কেবল শ্রমিকের বৌ।’]

‘আরেকটু শুরুয়া নাও না,’ তাকে অনুরোধ করল মহিলা।
‘না, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ। শুরুয়াটা খুবই ভাল হয়েছে।’
‘একটু অন্তত নাও তাহলে।’
‘হুইস্কি-সোডা পেলে নিতাম।’
‘তোমার জন্যে এটা ভাল নয়।’
‘না। আমার জন্যে এটা খারাপ। কোল পোর্টারের কথা ও সুর। এই জ্ঞানলাভ করা যে আমার জন্যে তুমি পাগল হয়ে যাচ্ছ।’
‘তুমি তো জান তোমাকে ড্রিঙ্ক করতে দেখলে ভালই লাগে আমার।’
‘ও হ্যাঁ। কেবল আমার জন্যে এটা খারাপ।’
সে যখন চলে যাবে, ভাবল সে। আমার যা যা খুশি সব আমি নেব। যা যা খুশি কেবল তা-ই নয় যা যা আছে সব। হ্যাঁ, সে ক্লান্ত। ভীষণ ক্লান্ত। এবার একটু ঘুমাবে। স্থির হয়ে শুয়ে রইল সে কিন্তু মৃত্যু এল না। এখন নিশ্চয় ওটা গেছে অন্য কোনও রাস্তায়। গেছে ওটা একজোড় হয়ে, বাইসাইকেলে চড়ে, আর পাকা রাস্তায় ঘুরছে সম্পূর্ণ নিঃশব্দে।

[না, প্যারিসকে নিয়ে সে কখনওই লিখেনি। তার ভালোবাসার প্যারিসকে নিয়ে নয়। কিন্তু আরও অনেককিছু নিয়েও যে সে কখনওই লিখেনি সে-বিষয়ে কী বলা যায়?
কেন লিখেনি সেই র‌্যান্শ্ আর সেজ ঝোপের রূপালি-ধূসর, সেচের নালার দ্রুতগামী, স্বচ্ছ পানি, আর আলফালফার গাঢ় সবুজ নিয়ে? সরু পথটা উঠতে উঠতে চলে গেছে পাহাড়ে আর গ্রীষ্মে গবাদিপশু হয়ে যেত হরিণের মত লাজুক। হেমন্তে নিচে নিয়ে আসার সময় ডাকত তারা গলা ছেড়ে আর ধীরে ধীরে এগোবার সময় পালটার পায়ের নিচে উড়ত ধুলোর মেঘ। আর পাহাড়শ্রেণীর পেছনে, সন্ধের আলোয় স্পষ্ট ফুটে উঠত চূড়াগুলো আর, চাঁদের আলোয় সরু সেই পথ ধরে ঘোড়ার পিঠে নেমে আসা আলো-ঝলমল উপত্যকায়। মনে পড়ল তার অন্ধকারে কিছুই দেখতে না পেয়ে বনপথে ঘোড়ার লেজ ধরে নেমে আসা আর লিখার জন্যে ভেবে রাখা কত শত গল্পের কথা।
ফাইফরমাশ খাটা হাবা গোছের সেই ছেলেটার কথা যাকে সেবার রেখে আসা হলো র‌্যান্শে আর বলা হলো কাউকেই যেন সে কোনও খড় নিতে না দেয়, আর ফর্কসের সেই বুড়ো হারামজাদার কথা যার অধীনে কাজ করার সময় তার হাতে ভীষণ মার খেয়েছিল ছেলেটা, গরুর খাবার নিয়ে চলে যাবার সময় তাকে বাধা দেয়ার জন্যে। প্রতিবাদ করছিল ছেলেটা আর বুড়ো বলছিল সে তাকে আবার মারবে। তখন রান্নাঘর থেকে রাইফেল নিয়ে এসেছিল ছেলেটা আর গোলাবাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করতেই গুলি করেছিল বুড়োকে আর তারা র‌্যান্শে ফিরতে দেখল একসপ্তাহ পেরিয়ে যাওয়ায় খোঁয়াড়ে জমে পাথর হয়ে গেছে বুড়োর লাশ, আর কুকুরেরা খেয়ে ফেলেছে তার শরীরের বেশ কিছু অংশ। কিন্তু যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেটুকুই একটা কম্বলে মুড়ে আর দড়ি দিয়ে বেঁধে চাপানো হলো একটা স্লেজে আর ছেলেটাকে সঙ্গে নেয়া হলো স্লেজ টানায় সহায়তা করার জন্যে, আর দু’জনে মিলে লাশটাকে নিয়ে গেল স্কী খেলার রাস্তায়, আর ষাট মাইল পেরিয়ে শহরে গিয়ে তুলে দিল তাকে শেরিফের হাতে। বেচারি ভাবতেই পারেনি যে তাকে গ্রেফতার করা হবে। ভেবেছে সে তার কর্তব্যপালন করেছে আর সেজন্যে পুরস্কৃত করা হবে তাকে। বুড়োটাকে টেনে আনার ব্যাপারে সহায়তা করেছে সে যেন সবাই জানতে পারে কতটা খারাপ ছিল বুড়ো আর কীভাবে গরুর খাবার চুরি করতে গিয়েছিল অন্যের গোলাবাড়িতে, আর তাই শেরিফ যখন হাতকড়া পরাল তার হাতে ব্যাপারটা যেন সে বিশ্বাসই করতে পারল না। তারপর কাঁদতে লাগল ছেলেটা। এই একটা গল্প সে লিখবে বলে ভেবেছিল। সেখানকার অন্তত বিশটা ভাল গল্প তার জানা আছে অথচ একটা গল্পও সে কখনওই লিখেনি। কেন?]

‘তুমি বলো কেন,’ বলল সে।
‘কী কেন, ডিয়ার?’
‘কেন কিছুই নয়।’
মহিলা আর অত পান করে না, এখন, তাকে পাবার পর থেকে। কিন্তু সে যদি বেঁচেও যায় মহিলাকে নিয়ে লিখবে না কখনওই, কথাটা জানে সে এখন। তাদের কাউকে নিয়েও নয়। ধনীরা একেবারেই নীরস আর তারা ভীষণ মদ খায়, কিংবা অতিরিক্ত ব্যাকগ্যামন খেলে। তারা নীরস আর একঘেয়ে। মনে আছে তার বেচারি জুলিয়েন আর ধনীদের প্রতি তার রোমান্টিক শ্রদ্ধার কথা আর কেমন করে একদিন সে একটা গল্প লিখতে শুরু করেছিল এভাবে, ‘অত্যন্ত ধনীরা তোমার আমার থেকে আলাদা।’ আর কে যেন জুলিয়েনকে বলেছিল, হ্যাঁ, তাদের টাকা আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু জুলিয়েনের কাছে কথাটা তত মজার ছিল না। সে ভাবত তারা একটা বিশেষ গ্ল্যামারাস জাত আর যখন সে দেখল যে আসলে তারা সেরকম নয় তখন সে খুবই ভেঙে পড়ল ঠিক যেমন ধারণা ভুল প্রমাণিত হওয়ায় সে ভেঙে পড়েছে আগেও।
যাদের কারণে এভাবে ভেঙে পড়তে হয় তাদের সে ঘৃণা করত। বিষয় বুঝলেই যে সেটাকে পছন্দ করতে হবে এমন কোনও কথা নেই। সবকিছুকেই সে পরাজিত করতে পারবে, ভাবল সে, কারণ, গুরুত্ব না দিলে কিছুই তাকে কষ্ট দিতে পারবে না।
বেশ। তাহলে এখন মৃত্যুকেও আর গুরুত্ব দেবে না সে। একটা জিনিসকে সে বরাবরই ভয় পেয়েছে  ব্যথার যন্ত্রণা। যে-কোনও মানুষের মতই তার রয়েছে যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা, যদি না সেটা অতি দীর্ঘায়িত হয়, আর কুরে কুরে খেয়ে ফেলে, কিন্তু এখন একটা জিনিস তাকে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা আর ঠিক যখন তার মনে হলো যে এটা সে আর সহ্য করতে পারবে না, তখনই হঠাৎ থেমে গেল ব্যথাটা।

[অনেক দিন আগের একটা কথা মনে পড়ে গেল তার যখন বম্বিং অফিসার উইলিয়ামসন একরাতে কাঁটাতারের বেড়া পেরোতে গিয়ে জার্মান টহলদার সেনার ছুঁড়ে দেয়া স্টিক বোমায় আহত হলো মারাত্মকভাবে আর, সারা রাত ধরে চেঁচাল, সবার হাতে-পায়ে ধরতে লাগল যেন তাকে মেরে ফেলা হয়। মানুষটা মোটাসোটা, অত্যন্ত সাহসী, আর ভাল একজন অফিসার, যদিও উদ্ভট সব কর্মকাণ্ড দেখানোর নেশা ছিল তার। কিন্তু সেই রাতে সে আটকে গেল কাঁটাতারে, ফ্লেয়ারের আলোয় ধরা পড়ে গেল তার উপস্থিতি আর তার নাড়িভুঁড়ি জড়িয়ে গেল কাঁটাতারের সঙ্গে, তাই যখন তাকে নিয়ে এল তারা, জীবিত, ছাড়াতে হলো কাটাকুটি করে। আমাকে গুলি করো, হ্যারি। যিশুর দোহাই, গুলি করো আমাকে। তাদের মাঝে তর্কবিতর্ক শুরু হয়ে গেল যে প্রভু মানুষের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দেন না যা বহন করার সাধ্য তার নেই এবং কে যেন এমন একটা তত্ত্ব দিল যার অর্থ হলো, একসময় যন্ত্রণার প্রকোপ তাকে আপনাআপনি অজ্ঞান করে ফেলবে। কিন্তু সেই রাতের উইলিয়ামসনের কথা তার স্পষ্ট মনে আছে আজও। কিছুতেই অজ্ঞান হয়নি উইলিয়ামসন যতক্ষণ না সে নিজের ব্যবহারের জন্যে তুলে রাখা সমস্ত মরফিন ট্যাবলেট খেতে দিয়েছিল তাকে আর তারপরেও সেই ট্যাবলেট তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করতে পারেনি।]

এখন পর্যন্ত তেমন যন্ত্রণা হয়নি তার; যদি আরও খারাপ কিছু না হয়ে এরকমই চলে তাহলে দুঃশ্চিন্তার কিছুই নেই। যদি পাশে কেবল পাওয়া যেত ভাল একজন সঙ্গী।
কেমন ধরনের সঙ্গী পেলে ভাল লাগত তা নিয়েও খানিকটা ভাবল সে।
না, ভাবল সে, কিছু যখন তুমি করবে, আর তা শুরু করবে অনেক দেরিতে, আর শেষ করতেও নেবে সুদীর্ঘ সময়, তখন পাশে কাউকে পাবার আশা তুমি করতে পারো না। অনুষ্ঠান ততক্ষণে শেষ আর সবাই বিদায় নেয়ার পর তোমার পাশে রয়েছে কেবল নিমন্ত্রণকর্ত্রী।
আর সবকিছুর মত বিরক্ত হয়ে পড়ছি আমি মৃত্যুর ব্যাপারেও, ভাবল সে।
‘বিরক্তিকর,’ বলল সে গলা চড়িয়ে।
‘কি বিরক্তিকর, ডিয়ার?’
‘যে-কোনও কাজ করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় নেয়া।’
তাকাল সে আগুনের ওপাশে বসা মহিলার মুখের দিকে। বসে আছে সে চেয়ারে হেলান দিয়ে, আগুনের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে সুশ্রী একটি মুখ আর চোখে তার ঘুমজড়ানো ভাব। আগুনের সীমানার ঠিক বাইরে হায়েনাটার করা একটা শব্দ পেল হ্যারি।
‘আমি লিখছিলাম,’ বলল সে। ‘কিন্তু ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।’
‘ঘুমাতে পারবে মনে হচ্ছে?’
‘একদম নিশ্চিত। তুমি চলে যাচ্ছ না কেন?’
‘তোমার সঙ্গে বসে থাকতেই ভাল লাগছে।’
‘অদ্ভুত কিছু কি মনে হচ্ছে তোমার?’ জানতে চাইল সে মহিলার কাছে।
‘না। কেবল একটু ঘুম-ঘুম লাগছে।’
‘আমার মনে হচ্ছে,’ বলল সে।
এইমাত্র আবার সে টের পেয়েছে মৃত্যুর উপস্থিতি।
‘একটামাত্র জিনিস আমি কখনওই হারাইনি আর তা হলো কৌতূহল,’ বলল সে মহিলাকে।
‘তুমি কখনওই কিছু হারাওনি। তুমিই আমার দেখা সবচেয়ে পরিপূর্ণ মানুষ।’
‘হায় যিশু,’ বলল সে। ‘মেয়েরা যে কত কম জানে! কীভাবে বুঝলে? ইনটুইশন?’
ঠিক তখনই, মৃত্যু এসে মাথা রাখল খাটিয়ার পায়ায় আর সে টের পেল ওটার শ্বাস নেয়ার শব্দ।
‘কখনওই বিশ্বাস করো না ওসব কাস্তে আর খুলির গল্পে,’ বলল সে মহিলাকে। ‘ওটা সহজেই বাইসাইকেলে চড়া দুই পুলিশও হতে পারে, বা হতে পারে একটা পাখি। কিংবা ওটার পক্ষে হায়েনার মত চ্যাপটা নাকঅলা কিছু হওয়াও বিচিত্র নয়।’
এবার ওটা চেপে বসেছে তার ওপরে, কিন্তু এখন আর ওটার কোনও আকার নেই। ওটা স্রেফ খানিকটা জায়গা দখল করে রেখেছে।
‘ওটাকে চলে যেতে বলো।’
চলে তো গেলই না বরং ওটা চেপে বসল আরও।
‘কী দুর্গন্ধ তোমার শ্বাসের,’ বলল সে ওটাকে। ‘একেবারে জঘন্য।’
ওটা আরও চেপে বসল তার ওপর আর এখন সে আর ওটার সঙ্গে কথা বলতে পারল না, আর যখন ওটা দেখল সে কথা বলতে পারছে না তখন চেপে বসল আরও, আর তখন সে চেষ্টা করল কথা না বলেই ওটাকে দূরে সরিয়ে দিতে, কিন্তু আরও চেপে বসায় এবার ওটার পুরো ভার পড়ল তার বুকের ওপর, আর ওটা যখন গুটিসুটি মেরে বসে রইল বুকে আর সে নড়াচড়া করতে পারল না, কিংবা কথা বলতে পারল না, তখন শুনতে পেল মহিলা বলছে, ‘বাওয়ানা ঘুমিয়ে পড়েছে। আস্তে করে খাটিয়াটা তুলে তাঁবুর ভেতরে নিয়ে যাও।’
বুকের ওপর চেপে বসা জিনিসটাকে তাড়িয়ে দেয়ার কথা বলতে চাইল সে মহিলাকে কিন্তু পারল না আর ওটা গুটিসুটি মেরে এমনভাবে বসেছে এখন যেন সে শ্বাস নিতে না পারে। আর তারপর, তারা যখন তুলে নিল খাটিয়াটা, হঠাৎই ঠিক হয়ে গেল সবকিছু আর বুকের ওপর থেকে যেন নেমে গেল অসহনীয় ভারটা।

এখন সকাল আর সকাল হয়েছে অনেক আগেই আর শুনতে পেল সে প্লেনের শব্দ। প্রথমে খুদে আকারে দেখা দিয়ে বড় একটা চক্কর দিল প্লেনটা আর ছেলেরা ছুটে গিয়ে, কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালল স্তূপ-করা-ঘাসে আর সমতল জায়গাটার দু’প্রান্তেই সৃষ্ট হলো বড় বড় দু’টো আগুনের চিহ্ন, সকালের বাতাস কেবলই সেই আগুনকে ধেয়ে আনতে চাইল তাঁবুর দিকে আর প্লেনটা চক্কর দিল আরও দু’বার, এবার বেশ নিচু দিয়ে, আর তারপর আরও নিচু হয়ে ল্যান্ড করল নিখুঁতভাবে, আর স্ল্যাকস আর টুইডের জ্যাকেট পরা আর বাদামি ফেল্ট হ্যাট মাথায় দেয়া বুড়ো কম্পটন এগিয়ে এল তার দিকে।
‘কী ব্যাপার, বুড়ো ভাম?’ বলল কম্পটন।
‘পা-টা গেছে,’ বলল সে তাকে। ‘নাস্তা খাবে?’
‘ধন্যবাদ। শুধু চা দিলেই চলবে। দেখতেই পাচ্ছ, পুশ মথটা নিয়ে এসেছি। মেমসাহেবকে নিতে পারব না। মাত্র একজনের জায়গা আছে। তোমার লরিও রওনা হয়ে গেছে।’
হেলেন কম্পটনকে একপাশে নিয়ে গিয়ে কী যেন বলল। কম্পটন ফিরে এল ভীষণ উৎফুল্ল এক চেহারা নিয়ে।
‘তোমাকে নিয়ে রওনা দেব এক্ষুনি,’ বলল সে। ‘ফিরে এসে মেমসাহেবকে নিয়ে যাব। আবার তেল নিতে আরুশায় নামতে হবে মনে হচ্ছে। আমাদের আর দেরি না করাই ভাল।’
‘চা খাবে না?’
‘ওটা আমার জন্যে মোটেই জরুরী নয়।’
ছেলেরা খাটিয়াটা তুলে নিয়ে আর সবুজ তাঁবুটাকে বেড় দিয়ে পাথুরে জায়গাটা বরাবর এগিয়ে তাকে নিয়ে এল সমভূমিতে আর তারপর পাশ কাটাল এখনও দাউদাউ করে জ্বলা আগুনের চিহ্নটাকে, ঘাস সব পুড়ে গেছে, আর বাতাসের ঝাপটায় আগুন এগিয়ে আসতে চাইছে ছ্ট্টো প্লেনটার কাছে। তাকে ভেতরে ঢোকাতে বেশ ঝামেলা হলো, কিন্তু ঢোকানোর পর বসে পড়ল সে চামড়ার সিটে হেলান দিয়ে, আর তার পা-টা সোজা বেরিয়ে পড়ে রইল কম্পটনের সিটের একপাশে। এঞ্জিন চালু করে ভেতরে ঢুকল কম্পটন। হাত নাড়ল সে হেলেন আর ছেলেদের উদ্দেশে আর, গুঞ্জনটা সেই পরিচিত গর্জনে রূপান্তরিত হতেই, একপাক ঘুরে এগোতে লাগল তারা বুনো শুয়োরের গর্তগুলো এড়িয়ে, আগুন দু’টোর মাঝ বরাবর সবেগে ছুটে, শেষ একটা লাফ দিয়ে গা ভাসাল শূন্যে আর সবাইকে সে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল নিচে, হাত নাড়ছে, আর পাহাড়ের পাশের তাঁবুটা, চ্যাপটা হয়ে যাচ্ছে এখন, আর প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে সমভূমি, গাছের ঝাড়, চ্যাপটা হয়ে যাচ্ছে ঝোপ, আর জীবজানোয়ার চলাচলের পথগুলো চলে গেছে শুকনো ডোবাগুলোর কাছে, আর সম্পূর্ণ অজানা এক জলাশয়ের সন্ধান পেল সে। জেব্রা, পিঠগুলো ছোট্ট আর গোল মনে হচ্ছে এখন, আর মাথামোটা বিন্দুর মত ন্যুর পাল যেন ওপরদিকে উঠতে চাইছে লম্বা একটা আঙুলের রূপ নিয়ে, আবার প্লেনের ছায়া তাদের দিকে ছুটে আসতে দেখে ছড়িয়ে পড়ছে সমভূমি জুড়ে, একেবারেই খুদে এখন তারা, আর সমভূমিটার যতখানি চোখে পড়ছে তার পুরোটাই এখন ধূসর-হলুদ আর চোখের সামনে কম্পির টুইডে ঢাকা পিঠ আর বাদামি ফেল্ট হ্যাট। তারপর উঠে এল তারা প্রথম পাহাড়গুলোর ওপরে আর ন্যুগুলো যেন ওপরদিকে উঠে আসতে চাইছে তাদের অনুসরণ করে, আর তারপর পাহাড় পেরিয়ে যেতে দেখা গেল গভীর সবুজ বন আর বাঁশে ছাওয়া ঢাল, আর তারপর আবার গভীর বন, বনের ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ের চূড়া আর খাদগুলো যেন এক ভাস্কর্য, আর পাহাড় নেমে এসেছে আরেক সমভূমিতে, গরম, আর রক্ত-বাদামি, তাপপ্রবাহে এবড়োখেবড়ো, তার অবস্থা দেখার জন্যে পেছন ফিরল কম্পি। তারপর সামনে আরেক গাঢ় পাহাড়শ্রেণী।
আরুশা যাবার পরিবর্তে তাদের প্লেন বাঁক নিল বামে, কম্পি নিশ্চয় দেখে নিয়েছে যে পর্যাপ্ত গ্যাস আছে এখনও, আর নিচে তাকাতে সে দেখল ভেসে চলেছে গোলাপি এক মেঘ, আর তুষারঝড়ের প্রথম ঝাঁপিয়ে পড়া তুষারের মত সেই মেঘ তাকে বুঝিয়ে দিল, দক্ষিণ থেকে আসছে পঙ্গপালের ঝাঁক। তারপর উঠতে লাগল তারা ওপরে আর মনে হলো এবার তারা পুবে যাচ্ছে, আর তারপরেই অন্ধকার হয়ে এল চারপাশ আর তারা পড়ে গেল একটা ঝড়ের ভেতরে, বৃষ্টি পড়তে লাগল এত ঘন হয়ে যেন উড়ে চলেছে তারা একটা জলপ্রপাতের মাঝ দিয়ে, আর তারপরেই বেরিয়ে এল তারা জলপ্রপাতের বাইরে আর মাথা পেছনে ঘুরিয়ে, হেসে কম্পি হাত তুলে দেখাল সামনে, আর ঠিক তার সামনেই, যতটা দেখতে পেল সে, পুরো পৃথিবীর মত বিস্তৃত, বিশাল, সমুচ্চ, আর সূর্যালোকে অবিশ্বাস্য ধরনের শাদা, কিলিমানজারোর চৌকো চূড়া। এবং তখন সে বুঝতে পারল যে ওটাই তার গন্তব্য আর তাই ওখানেই সে যাচ্ছে।

ঠিক তখনই রাতের গাঢ় অন্ধকারে গোঙানি থামিয়ে অদ্ভুত, প্রায় মানুষের মত এক কান্না শুরু করল হায়েনাটা। শুনতে পেয়ে নড়ে উঠল মহিলা অস্বস্তিতে। তবে জাগল না। স্বপ্নে সে তখন তার মেয়ের আত্মপ্রকাশের আগের রাতে লং আইল্যান্ডের আপন বাড়িতে। কীভাবে যেন সেরাতে তার বাবাও এসে উপস্থিত হয়েছে ভীষণ এক বদমেজাজ নিয়ে। তারপর হায়েনাটা এত জোরে চেঁচাতে লাগল যে তার ঘুম গেল ভেঙে আর একমুহূর্তের জন্যে কোথায় আছে বুঝতে না পেরে ভয় পেল সে। তারপর টর্চলাইট নিয়ে সে আলো ফেলল পাশের খাটিয়ায় যেটা তারা তাঁবুর ভেতরে নিয়ে এসেছিল হ্যারি ঘুমিয়ে যাবার পর। মশারির নিচে হ্যারির দেহটাকে দেখতে পেল সে কিন্তু কীভাবে যেন তার পা-টা বাইরে বেরিয়ে এসে খাটিয়ার পাশে ঝুলছে। ব্যান্ডেজের পুরোটাই খুলে নেমে এসেছে নিচে আর সেদিকে সে আর তাকিয়ে থাকতে পারল না।
‘মোলো,’ ডাকল সে, ‘মোলো! মোলো!’
তারপর ডাকল সে, ‘হ্যারি, হ্যারি!’ তারপর আরও চড়ে গেল তার স্বর, ‘হ্যারি! প্লিজ, এই হ্যারি!’
কোনও জবাব নেই আর তার শ্বাস নেয়ারও কোনও শব্দ পেল না সে।
তাঁবুর বাইরে হায়েনাটা আবার চেঁচাল সেই অদ্ভুতভাবে যা শুনে ভেঙে গিয়েছিল তার ঘুম। কিন্তু এখন এত জোরে হাতুড়ি পিটছে তার হৃৎপিণ্ড যে হায়েনার চেঁচানিটা সে শুনতেই পেল না।

জুলফিকার মতিন

কতদূর

নীলকণ্ঠ সারাদেশ বোমার আঘাতে,
বিষাক্ত ধোঁয়ায় তার আকাশ ও ভূমণ্ডল ভারী হয়ে যায়,
দগ্ধ মাটি জ্বলে-পুড়ে তামাটে ধূসর,
ধর্মের নামে এই রক্ত গঙ্গা মৃতের ভেলায়।

কারো ঠ্যাং উড়ে গেছে....কারো মাথা দেহচ্যূত
নির্বিকার পড়ে আছে পথের ধূলিতে,
ঝলসানো কটু গন্ধ চামড়া থেকে নি:শ্বাস বন্ধ হয়ে আসে,
ঠিকরে বেরিয়ে থাকা চোখের মণিতে
কাদের বেহেস্ত কেনা সাঙ্গ হল এই সর্বনাসে!

প্রলয়-যজ্ঞে তারা বাটখারা দিয়ে মাপে আল্লার নাম,
তারই সাথে জমা হয় কত ভণ্ড বাক্য রাশি,
ভয়াল ত্রাসের এই কূট সন্ধ্যায়,
অন্তিম দৃষ্টি দিয়ে শুধু আমি চেয়ে দেখি
সুন্দরীর হাসি।

মানবতা ব্যর্থ হয়-ব্যর্থ হয় মানুষের সুশীল বিবেক,
সন্ত্রাসের জনপদে প্রাণের আকুতি
গুমরি গুমরি কাঁদে,
বোবা মুখে ফোটে না তো ভাষা,
আর কতদূর?....কতদূর শান্তির উপত্যকা...
বর্তনের দ্যুতি?

July 24, 2008

মুকুল বসুর দুটি কবিতা

শামসুর রাহমান

শামসুর রাহমান চলে গেলে
নদীর জল মোহনার মোড়ে থেমে থাকে।
শহরে গ্রামে দফায় দফায় লোডশেডিং হয়,
কবিতার জীবন রেখায় বর্ধমান ফাটল জাগে।

শাসসুর রাহমান চলে গেলে
রবি শংকরের সেতারে তাল কাটে,
পূর্ণিমার চাঁদে আচমকা গ্রহণ লাগে।
মৌমাছি আর মধু ভাণ্ড খোঁজে না।

শামসুর রাহমান চলে গেলে
মুখ ভার করে দুই বাংলা সীমান্তে জড়ো হয়।
কাঁটাতারের বেড়ায় হাত বুলিয়ে
ভালবাসার পরশ-পাথর খোঁজে।

শামসুর রাহমান থেকে গেলে
একুশ ফেব্রুয়ারীর অপার্থিব ভোর নামে।
কলকাতার ময়দান আর রমনার মাঠে
প্রথম প্রেমের রোমাঞ্চ লাগে

শামসুর রাহমান থেকে গেলে,
শিশুদের রঙিন হাততালি
ছুঁয়ে যায় উড়ন্ত পাখির ডানা।
ঘাসফুল আকাশ খোঁজে।

তারায় তারায় দেখা হলে
মাটিতে চলো মন্ত্র বাজে,
দুই বাংলায় চরণ রেখে
শামসুর রাহমান কবিতা পড়ে।

স্বপ্নের সাথে

মালঞ্চ মালা, ভোরের স্বপ্ন কই,
দিগন্তজুড়ে ঘনায় কাজল ছায়া
এলোমেলো মন কোথাও পায় না থই,
সারারাত জাগে কান্নাজড়ালো কারা।

আগুনের পথ আমাদের রথ, সখা
কুঞ্জে বাজে না বৃন্দাবনের বাঁশি;
এখানে রাতের তারাদের মুখ ঢাকা
ঠোঁটের দুপাশে রক্ত জড়ানো হাসি।

ঝড়ের মাতন আমাদের বুকে জমে,
আমরা বনেছি স্বপ্নের ফেরিঅলা,
আমাদের দেখে সাগরের ঢেউ কমে,
স্বপ্নের সাথে রাখী-বাঁধি ভোরবেলা।

সুনীল খাঁ

অসমাপ্ত কবিতাংশ

১. হয়তো ফুল ফুটবেনা আকালে
মুখ মুছে আসবে সকাল
আলোর নদী ছুটবে কোথায় অজান্তে

২. সন্ধামণি নয়তো ঐ পারুল লতা
বুকের ঢাকনা খুলে দিলে
ভিড় জমাবে চারপাশে
ঐ সবুজ মাঠের পারে
এ সব দেখেও স্বপ্ন কাঁদে
স্বপ্ন ভোগে জ্বরে


৩. একটুখানি ঘর, একটুখানি ভালবাসা
অমন করে মাপতে গিয়ে
উদোম শরীর ক’রনা ব্যবচ্ছেদ

৪. সন্ধা হাওয়ায় মন ফুরফুর
নিবিড় স্নানে যতই চাটো ঠোঁটে
বুকের পকেট খুলে দ্যাখো নেই
প্রেম নেই প্রেম নেই প্রেম নেই
কবর চাপা শূন্যতায়

৫. কার আঙিনায় শুয়ে থাকে ভালবাসা
যখন হিজল ডালে কৃষ্ণ বাঁশি বাজায়
বনপলাশের শরীর বেয়ে নামে অন্ধকার স্রোত
পিছন ফিরে ডাকতে গেলে নিতম্ব নাচে
অহংকারে, ঝুমুর পায়ে কে লুকায়
রাতের স্নান ঘরে
কার আঙিনায় ভালবাসা
শুয়ে থাকে অভিমানে

৬. সময় হ’লেই একবার খোঁজ নিও
যদি যাও আমার বাড়ির পাশ দিয়ে
অনেক দিন ফুল ফোটে না বাগানে
হাওয়ায় ছড়ায় না ফুলের গন্ধ
হিম-শীতলতায় বসে আছি একা
একদিন তো দেখা করে যেতে
ভোরের আলো ফুটতে অথবা
আকাশে সন্ধাতারা দেখা দিলে
সময় হ’লেই একবার খোঁজ নিও
বড় একা আছি......

মৃণাল চক্রবর্তী

দৌড়

তিনি বললেন,দৌড়-
ছুঁতে পারলেই পেয়ে যাবি
রূপমতী রাজকন্যা
আর রাজত্ব।

আমি ছুটছি, ছুটছি, ছুটছি -
আমার দু’চোখ ভরা লোভ
আমার সম্মুখে অন্ধকার
পায়ে অনন্ত ক্লান্তি

তবু আমি দৌড়াচ্ছি......

তিনি বলেই চলেছেন, দৌড়-দৌড়
ঠিক পারবি একদিন

আমি সেই গর্দভ
সে নুনের ছালা আর তুলোর বস্তার
ফারাক জানে না

তিনি বলেছেন দৌড়
আমি দৌড়াচ্ছি
কিন্তু আমার সামনে কোন ঠিকানা দেন নি।

পুষ্পজিৎ রায়

‘অঞ্জলি লহ মোর’-কে

দীঘল ডানার ছায়া কাঁপছে না
স্বরলিপি বাজছে না
সমাজুপাতিক

কাল্দিঘি ধলদিঘি পাড়ে
নতুন পড়শি আসে
ওভেনের ঝিক্
বিকেল নিভন্ত হলে
ফিরে যায় কিছু কিছু পাখি

সব পাখি শেষ এক ঘরে ফেরে নাকো
অন্ধকারে কুয়াশায়
ওড়াউড়ি করে
কিম্বা ভাসে দিগি¦দিক।

দীপংকর বন্দ্যোপাধ্যায়

ইদানিং

ইদানিং প্রায়শই উন্মনা হয়ে যাই
উদাসীন দুপুর গহীন সন্ধ্যায়
কোথায় হারিয়ে যাই জানি না,
মস্তিষ্কের কোষে ভীড় করে পাপ পূণ্য
স্বপ্ন, আবেগ, ইচ্ছা ইচ্ছাহীনতা।
অভিমান ক্রোধ আনন্দ উচ্ছ্বাস
ফিরে ফিরে আসে যন্ত্রণার ভাঙচুরে।

প্রতিচ্ছবি জমা হয় কাছের দূরের
হোঁচট খাওয়া ভুল বোঝা, ভাললাগা
পোষ না মানা কোনো চোখের ভাষায়
ভেসে যাওয়া।

নষ্ট হতে ভাল লাগা
উত্তাপের খোঁজে আগুনের কাছে যাওয়া।

ফিরে ফিরে আসে রবীন্দ্রনাথ, লেনিন, গুয়েভারা
সাচ্চা সাথীর দিশারী লিউশাও চি’র কথামালা
বিকৃত প্রলাপে শুনি মহান স্খলনের গাঁথামালা।

তবু ভাললাগা মুহূর্তগুলো
ঝালিয়ে নিই স্মৃতির মণিকোঠায়
রক্তক্ষরণ শুধুই নিজের গভীরে

পরিচিত প্রতিচ্ছবিগুলি দূর থেকে
মাপি-আবেগহীন।

সুজন হাজারী

সরি মাডাম

সরি মাডাম!
আপনি কি জানেন-
হাসি সব বাসি ফুল
ঝরা পাঁপড়ি মাটিতে লুটায়
ফুলের হাসি।
ফুলের হাসি নেই
সূর্যের হাসি নেই
সূর্যের হাসি লুটে নিয়ে
মডেল কন্যারা হাসে
সূর্যের হাসি।
শহর পাড়ায় ব্যস্ত স্বাস্থ্য কর্মীরা
হাসি মুখ পোস্টার হাতে হাতে
সেঁটে বেড়ায় রাস্তার পাশে ইটের দেয়ালে
দেয়ালে দেয়ালে হাসির প্রদর্শনী
নাবালক প্রসূতি আমেনা’র
বিষণœ মুখে হাসি নেই
মালিন কালো মুখে রাতের অন্ধকার
র‌্যাবের পোষাকে নেমে আসে চাঁদ
নি®প্রভ চাঁদের হাসি নেই
হাসি র্দুলভÑ
আপনার শুকনো অধরে দেখেছি
ঝাঁঝালো চুম্বনের দাগ
ব্যর্থ অভিমানে নাচে ভ্রুপল্লব
ছলনায় লুকানো হাসি
নিদারুণ অনুতাপে জ্বলে অনুরাগ
হাসি নেই।
হাসিতে বাজে না বাঁশি মনের বীণায়
অধরের চুম্বনে বাঁশি বাজে সুমধুর
সুরে সুরে পোড়া মন পোড়ে।
কে বাজায় বাঁশি
কে নেয় হাসি
কে দেয় চুম্বন।
কি বেশি প্রিয় কুমারীর
হাসি না বাঁশি
না কি চুম্বন।
সে দিন আমার মুখেও ছিল না হাসি
হাসি না দেখেই-
মনকষ্টে ফিরে গেছে
নওগাঁর ফাতেমা আকতার।

গুচ্ছ কবিতা

অদিতি চৌধুরী

হাঁটবো না ওই পথে, বলবো না কথা
চাইবো না আর কিছু শুধু চেয়ে থাকা।


শূন্য ছিলে তুমি; পূর্ণ ছিলাম আমি
শূন্য হলাম আবার পূণর্ হলে তুমি

মুহাম্মদ হাসান ইমাম

পতাকা পরিবেষ্টিত নগ্নতায় ছিল

শুধু সেই কটি মাস আমাদের কোন ব্যক্তিগত সাধ-আহলাদ ছিল না
সুদূরপ্রসারী প্রত্যাশা ছিল না
ফ্যাশান ক্রেজ কিংবা স্টাইল ছিল না
শুধু একসাথে বাঁচা অথবা মরার কথা ছিল;
বাস্তবের গা-ঘেঁষে বসতে পারতাম আমরা
কল্পনার অহেতুক বাড়াবাড়ি ছিল না
বিদ্বেষ অথবা ক্ষোভ ছিল না
যদিনা কেউ সম্মিলিত আকাক্সক্ষার
পথরোধ করে বসতো।

কি নরম ঘাস আর কাদা-জলে বিস্তারিত বর্ষাকাল
নিজের সাহস দেখে নিজেই অবাক চেয়ে থাকা
কখনোবা একগলা জলে
কখনোবা একা একা রাতের কবরে;
তখন কোন ভয় ছিল না কারো জন্য
কারণ বিভীষিকার বিরুদ্ধে লড়ছিল সবাই
তখন এতো বিচিত্র রোগ-ব্যথ্যা-উপশম ছিল না
মাটির আদরে সেরে উঠতো সকলে
শিশুরা ভূমিষ্ঠ হতো ভূমির উপরে ধাত্রীহীন
মৃতেরা ভেসে যেত জলের সোহাগে।

অস্ত্রের ব্যবহার কি দ্রুত ইতিহাস-স্বীকৃত বৈধতা পেয়েছিল
আক্রান্ত হবার আশংকা আত্মরক্ষার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল
যৌথ সচেতনতার আদালত স্থগিত করেছিল বিচারের দীর্ঘসূত্রতা
তখন রাজনীতি ছিল না, কারণ অস্তিত্বের জন্য
নেতাকেও হত্যা করা যেতো ডাকাতের সাথে;
মতবাদকে জীবন্তদগ্ধ করা যেতো জীবনবাদের জন্য,
আমরা মোটামুটি একমত ছিলাম
আমাদের বেড়ে ওঠার ইতিহাস ও
সম্ভাব্য ভবিষত্যের প্রশ্নে।

প্রতিটি ঘরেই আতিথ্য ছিল বলে দুর্ভিক্ষ ছুঁতে পারেনি
অগণিত হাত অগণিত মানুষের জন্য দিয়েছে
গরম ভাত মুড়ি-মুড়কি বাতাসা ও পানি;
মা বোন ও প্রেমিকারা আবেগময় ছিল
একান্ত যুদ্ধের জন্য মায়ের স্নেহ
বোনের অপলক দৃষ্টি প্রেমিকার অন্ধত্ব প্রয়োজনীয় ছিল।

সারা সময় উলঙ্গ থেকেছে বলে কাপুরুষতা ছুঁতে পারেনি,
যোদ্ধারা জঙ্গলে রেখেছে বস্ত্রহীন শরীর
মাছের মতো ডুবে গেছে গ্রেনেড মুখে;
নিজের শরীর দিয়ে বাঁচিয়েছে সহযোদ্ধার শরীর
পুত্রহীন মায়ের কোলে আছড়ে পড়েছে একাধিক খোকা
বোনেরা পেয়েছে ভাইয়ের শার্ট-পরা অন্যকোন ভাই
ভাইয়েরা জেনেছে বোনেদের যুদ্ধ কতটা রক্তক্ষয়ী
পিতার শীর্ণ বুক ফুলে ওঠে পুত্রহীনতার গর্বে।

আসলে তখন কথা ও কাজে তেমন আবরণ ছিল না
সবাই স্বল্পবাক ছিল বাক্যহীন উৎকর্ণ ছিল
অনুপ্রবেশকারীদের দিকে-
মূলত অস্ত্র ছাড়া আর কোন ভাষা ছিল না।

শত্র“ ছাড়া আর কোন উৎকণ্ঠা ছিল না
শত্র“দের দূরত্ব সুনির্ধারিত ছিল
ওদের সহযোগীরাও শনাক্ত ছিল
লক্ষভেদী যোদ্ধাদের কাছে;
চরিত্রবান সংবাদপত্রের মতো প্রত্যেকের জানা ছিল
দিন তারিখ সময় ও ঘটনার মূলস্রোত।

ইতিহাসের ঐ সময়টি সত্যই আগাছামুক্ত ছিল
বিভ্রান্তিকর নেতৃত্ব ছিল না
সবাই বাস্তবায়নের লক্ষে স্বপ্নময় ছিল
পতাকা পরিবেষ্টিত নগ্নতায় ছিল।

হেনা সুলতানার কবিতা

আশ্চর্য

স্তব্ধ রাত্রি কেঁপে ওঠে ধর্ষিতার চিৎকারে।
খুন খারাবির শোকে ঝাঁঝরা হচ্ছে রাজপথ
জল শুকিয়ে যাচ্ছে জলবতীর চোখে
নালা গড়িয়ে রক্তের নহর, ব্লাড ব্যাংক শূন্য।
কেঁপে কেঁপে উঠছে স্তব্ধ রাত্রি ধর্ষিতার চিৎকারে।
আশ্চর্য! এসব দেখে এখনও সূর্য উঠে, সূর্য ডোবে।

কবি

জানো তো কবি দেখা খুব সহজ কাজ নয়।
কবি হচ্ছে খুব সাদা চোখে জল পাত্রে হেমলক,
ক্রমাগত জীবনে জীবন ঘষা স্ফটিকের আলোক,
চুম্বনে চুম্বনে কালো করে তোলা এক খণ্ড হিরক।
তাহলেই বোঝা যাচ্ছে
কবি দেখা সে নিশ্চয় সোজা কাজ নয়।
কবি দেখতে হলে জীবন পোড়াও স্বেচ্ছা যন্ত্রণায়।
সংলাপ
- কেমন?
- চলছে একরকম!
- আপনার?
- এই তো আছি একরকম!
- ঠিক বলেছেন। দুরকম করে তো আর
থাকা যায় না।
তাই থাকতে হয় একরকম।
কয়েকটি মুহূর্ত উদ্বেগে টান টান
দুজনার পথ পারাপারের কথোপকথন।
নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে -

ব্যাটা চশমখোর
ফাইল চেপে পয়সা ইনকাম
বলে কিনা চলছে কোনরকম।
শালা ঘুষখোর বলে কিনা আছি একরকম।।

মাহমুদ মুসা

শীতনিদ্রা

মাঘের বর্ষণে বয়ে যায়
জলের নহর,
শীতের নিদ্রায়
মগ্ন গ্রাম মগ্ন শহর।
ঘুমায় পাখি
বৃক্ষলতা -
ঘুমায় মানুষ
যথাতথা।
ঘুমায় সকাল ঘুমায় দুপুর
ঘুমায় সন্ধ্যা,
ঘুমকাতুরে মানুষগুলো
ইচ্ছে কেমন বন্ধ্যা।
মায়ের কোলে
ঘুমায় শিশু জুজুর ভয়ে
ঘুমায় দেশ কালো বুটের
আঘাত সয়ে।
চলছে দেশে সংস্কারের লগ্ন,
আমরা সবাই শীতনিদ্রায় মগ্ন।

বসন্ত পাল

ভাষা আন্দোলন স্মরণে

ক্ষুধার্ত মানুষ ভাষার ক্ষুধায় কাতর ছিল সেদিন
ভাষার ভিতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে
আন্দোলন বিরোধী অগ্নিশিখায় জ্বলতে জ্বলতে
ভাষা মুক্তির পথ খুঁজছিল।

হৃদয় বিদীর্ণ হলেও চোখে জল ছিল না
ছিল শুধু অগ্নিবীণায় সংগ্রামী সুর
বিশ্বব্যাপী সেই সুরের আগুনের তেজ ছড়িয়েছে অনেক দূর....
বিশ্বব্যাপী কত পথে রক্ত ঝরেছে
আকাশ কেঁপেছে, বাতাস কেঁপেছে।

সেই রক্ত ঝরা পথে হাতে হাত ধরে চলতে চলতে
হয়ত কোন একদিন প্রভাতী আলোয় আলোকিত হবে
পথও জানে

বাংলাভাষী মানুষকে উত্তাল করে এমনিভাবে একদিন
মাতিয়ে তুলেছিলÑমাতৃভাষার সংগ্রামে কিংবা
ভাষামুক্তির কঠিন সাধনায়।

সেই উন্মাদনায়, জাগরণ দীপ্তিতে, বৈপ্লবিক অগ্নিপরীক্ষার
রক্তাক্ত আঙ্গিনায় -
রাষ্ট্রসংঘের উদ্দীপিত ঘোষণায়
প্রভাতী সূর্য এনে দেয়
ভাষা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

শত শত শহীদের স্মৃতিস্তম্ভ
দিগদিগন্তে ফুলে ফুলে সাজে
ভাষা আন্দোলন স্মরণে
বিশ্বব্যাপী জয়ধ্বনিতে মিছিল সারি সারি
সবে মিলে সেলাম জানায় - সেই রক্তমাখা ‘একুশে ফেব্র“য়ারী’।

শিপ্রা সেনধর

শখ

সকাল সাতটা বাজবার আগেই
ঠেলাগাড়ি থেকে
যুবক ছেলেটি
ফুলের টবগুলো নামায়
কোর্টের রাস্তার ধারে

ছেলেটির গায়ে
নোংরা ছেঁড়া শার্ট
বগল ছেঁড়া
ঘাড়ের সেলাই অনেকটাই খোলা
প্যান্ট?
সে-ও তথৈবচ।

নিষ্ঠার অভাব নেই তার।
চারাগাছ বিক্রি হোক্ বা
না হোক্
সময়মতো এসে
দোকান সাজিয়ে বসে
হাড়-সার ছেলেটি।

হঠাৎ ওর মাথার দিকে
তাকাই।
দেখি আরে
ওর কপালের সামনে
চুলগুলো যে কালার করা -
লাল

ঝাঁকি লাগল মনে।
পরে ভাবলাম
শখ তো মানুষেরাই করে।

আলম আরা জুঁই

শ্রাবণ বেদনা

আজ সব চরাচর ডুবে যাক
আজ সব নদী ভরে যাক
চারিদিক শ্যামল সবুজ
মন প্রাণ জুড়ে যাক।
আজ সব ভুল
ভুল হয়ে ঝরে যাক।
শ্রাবণ নেমেছে আজ রিমঝিম বরিষণ
শ্রাবণ নেমেছে আজ তুমুল শ্রাবণ।


মাহমুদ হাসান মিলন
তালিমারা ও ফাটলধরা দেশ

আমি স্বাধীনতা বুঝিনা,
দেশে দেশে বিপ্লব হয়েছে
জেগেছে কত নতুন রাষ্ট্্র
অথচ বিপ্লবও বুঝি না।
জাতির ত্রাণকর্তা, উদ্ধার কর্তার
আবির্ভাব ঘটেছে বার বার,
গণতন্ত্র রক্ষীরাও এসেছে
কিন্তু দেশ কি মুক্তি পেয়েছে?
মানুষের হাহাকার বাতাসে
ক্ষুধার্ত, বন্যার্ত, দুর্গত সকালের।
অথচ টেলিভিশন থেকে
গলগল করে পড়েছে গণতন্ত্র,
ঝরঝর করে ঝরছে শান্তি-শৃঙ্খলা
তরতর করে চড়েছে অর্থনীতি ------
তবুও হাজারো মানুষের দাপাদাপি, আজাহারীতে
পদদলিত আজ রাষ্ট্রযন্ত্র।
এরই নাম কি যুক্তি?
এটাই কি স্বাধীনতা?

হারুন রশীদ এর তিনটি কবিতা

পর্যটক

তুমি তো তিতির নও
তিতিরতাময় পথ,
সেই পথে আমি এক
চির পর্যটক।

পাথর

পাথর ছিলে
পাথরে তবু ভয়,
পাথর দেবো
পাথর থু থু নয়।

পাড়

দ’পাড় দু’টো
নালি ঘাস
বাতাসে ওড়ে,
কখনো কি তার
উদাস চোখে
পড়ে?

যুগল কবিতা

নাজমুল হাসান

এক ॥ খোলা চিঠি

মুখ খোলা খাম তার ভিতরে চিঠিটা আছে পড়ে
অনাদরে বহুদিন। ধুলো পড়া চিঠি তার কথা
তুমি জেনে নিও!

এখন বিস্রস্ত মন, অবিশ্রান্ত ঝোড়ো বাতাসের খেদ
নাড়িয়ে দিচ্ছে গাছ-তার মূল, লতাপাতাকুটো
প্রকৃতির প্রলয়ের মুখে বসে আছে, দেখে গেছো
একাকী অশান্ত এই নির্জনেই .....
বদ্ধ মনের গহ্বরে তার তোলপাড় ভিষণ গর্জন এখনও শুনি

তোমরা আছো সবাই কাছাকাছি স্বপ্ন ও ক্লান্তিতে এই দেশে
অথচ কোথাও নেই তার ছায়া, না নিভৃতে না প্রকাশ্যে!

দুই ॥ সাদা পালক ও পাথর

সাদা পালক পড়ছে খসে বাতাসের গায়ে
গাছের পাতায় শিরশিরে কাঁপন নিশ্চুপ চারিদিক, কেউ
-নেই, তরঙ্গমালার ওপ্রান্তে, দূরে বা কাছে
পড়েছে সাদা পালক বাতাসে স্পর্শ নিয়ে
যদি কেউ না আসে এ তল্লাটে আজ-শব্দের
উৎসমুখে পাথরের মত স্মৃতির বোঝাগুলো
স্পর্শ করে মাটি ও পালক
মহাকর্ষ উপেক্ষা করে একই সময় বসল কাছাকাছি
অতীত ও তোমার স্মৃতি!

যাঁদের হারিয়েছি

বিগত ২০০৭ সালে আমরা অত্যন্ত কাছের মানুষ এবং নওগাঁ অন্ত-প্রাণ দুজনকে হারিয়েছি। দুজনেই যেমন নিজের নিজের জগতে কৃতী ছিলেন - তেমনি নওগাঁর মুখ উজ্জ্বল করেছেন। সম্মিলনীর অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল এদের প্রয়াণে।

একজন শ্রী অমিয় তরফদার [৭৮] অন্যজন শ্রী প্রবোধ মৈত্র [৭৪]

শ্রী অমিয় তরফদার একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্র শিল্পী। নওগাঁর কে. ডি. স্কুলের ছাত্র। এবং স্কুলের পাশেই তাঁর বাড়ি। যদিও গ্রামের বাড়ি ছিল নওগাঁর কাছেই রসুলপুর গ্রামে। তাঁর কোলকাতার পার্কসার্কাসে ক্যামেলিয়া স্টুডিও একদা খুবই নামকরা ফটোগ্রাফিক দোকান ছিল। আর কোলকাতার নওগাঁ সম্মিলনীর অফিস ছিল। অনেক মিটিং কার্যপন্থা এখান থেকে শুরু ও নিয়ন্ত্রিত হোত। তাঁর নিজস্ব উৎসাহ ও উদ্দীপনায়।
আলোকচিত্র শিল্পী হিশেবে তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন-বিশেষ করে খেলাধুলা প্রতিযোগিতায়। একই সঙ্গে বহু প্রতিযোগিতায় পুরস্কৃত হয়েছেন অসামান্য সব ফটোগ্রাফির জন্য।

শ্রীপ্রবোধ কুমার মৈত্রর জন্মস্থান নওগাঁ এবং দেশবিভাগ পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন নওগাঁর কে.ডি. স্কুলে। পরে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ [স্কটিশচার্চ] ও এম. এ পাশ করেন। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে। এই সময়ে তাঁর অন্যতম কাজ ‘নন্দন’ নামের সিনেমা কেন্দ্রটির স্থাপন ও পরবর্তী সময়ে পরিচালনা করা। মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁর স্মরণ সভায় এ বিষয়ে সপ্রশংস উল্লেখ করেন ও তাঁর স্মরণে উপযুক্ত পদক্ষেপের প্রস্তাব করেন।
এ ছাড়া তিনি দীর্ঘদিন কোলকাতা ফিল্ম সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এবিষয়ে তিনি খুবই অগ্রণী ব্যক্তি ছিলেন ও ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। সত্যজিৎ রায়ের সত্তর বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘নন্দন’ এর পক্ষ থেকে একটি মনোগ্রাহী গ্রন্থ সম্পাদনা ও প্রকাশনা করেন। ভারতে ‘সিনেমার শতবর্ষ’ উপলক্ষেও একটি বিশাল গ্রন্থ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছিলেন। শ্রদ্ধেয় সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর সখ্যতা বহুজন বিদিত; সত্যজিৎ এর উপর একটি কোষ প্রকাশের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ প্রয়াণে ও তাঁর আগের অসুস্থতায় সেটি সম্পন্ন করে যেতে পারেন নি। তিনি সিনেমা সংক্রান্ত পঠন-পাঠন নিয়ে যুক্ত ছিলেনÑকোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং নন্দনে।
নির্মল মৈত্র, কলকাতা-৭০০-০৭৫

সেলিম আল দীনঃ তাঁর নাটকের পথ ধরে

সেলিম আল দীনঃ তাঁর নাটকের পথ ধরে
ম আ ব সিদ্দিকী

হিমালয় থেকে যে নদীগুলো বয়ে আসে, তার গন্তব্য বঙ্গোপসাগর। স্বাধীনতার পর আমাদেরও গন্তব্য ছিল শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশ। জাতীয়তাবাদী সেক্যুলার গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী এসব পরস্পর নির্ভরশীল সমম্বিত মতাদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ। ইতিহাসের এই বিষয়টি মৌলিক। আর সব আবর্জনা। অথচ আমরা নিরন্তর আবর্জনা ঘেঁটে চলেছি। এবং সাংস্কৃতিক বর্জ্যে হাত পা ছোঁড়ার নাম দিয়েছি সংস্কৃতি চর্চা। সেলিম আল দীন বাংলাদেশ-বাংলাদেশের জনগণ। এই দেশের ইতিহাস খুঁজেছেন নাটকে। নতুন নাট্যধারা গড়ে তোলা। মঞ্চের নানা ধরনের নিরীক্ষা করে বাংলাদেশের নাটককে উন্নত করতে চেয়েছেন। সেই সংগে মানুষদেরও। চেষ্টা করেছেন দেশীয় নাট্যমঞ্চ নির্মাণের। রবীন্দ্রনাথই উপনিবেশিক মঞ্চের বাইরে দেশীয় নাট্যমঞ্চ নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। শম্ভূ মিত্র রবীন্দ্রনাথের রক্ত করবী, মুক্তধারা এবং নিজের লেখা চাঁদ বণিকের পালা মঞ্চায়ন করে দেশীয় আঙ্গিকে নাট্যমঞ্চ নির্মাণের চেষ্টা করেন। সেলিম আল দীনও লেবডেফ থেকে নাটকের শুরু তা মানেন নি। নাট্যচেতনায় উপনিবেশিক প্রাধান্য অস্বীকার করতে চেয়েছেন। এবং দেশের মাটিতে নাটককে প্রথিত করে ইতিহাসের মধ্য দিয়ে পল্লবিত করতে চেয়েছেন। তিনি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী সাহিত্য দর্শনে বিশ্বাসী। প্রাচীন গ্রীসে ডায়ানোসিয় রিচুয়াল থেকে নাটকের যাত্রা। উদ্দেশ্য ছিল দেবতার তুষ্টি এবং পার্থিব জীবনে শস্যের বৃদ্ধি। ভারতে নাটককে বলা হয়েছে পঞ্চম বেদ। বেদ মানে জ্ঞান। অর্থাৎ নাটক হল জ্ঞান। নীহারঞ্জন রায় দেখিয়েছেন প্রাচীন বাংলায় সপ্তম শতকে নাটক ছিল। তিনি বৌদ্ধ নাটকের কথা উল্লেখ করেছেন। দীনেশচন্দ্র সেন পূর্ববঙ্গের গীতিকা সংগ্রহ করে লোক মানসের সৃষ্টিকে সাহিত্যের মর্যাদায় তুলে এনেছেন। এসবও নাটকের বিষয় হয়েছে। আমাদের নাট্য সাহিত্যেরও বিশিষ্টতা হচ্ছে যা একই সঙ্গে সংগীত, নৃত্য এবং নাটক। আবহমান কাল থেকে যা চলে এসেছে। প্রাচীন শাস্ত্রকাররা মনে করতেন নাটক হল দৃশ্যকাব্য। আধুনিক যুগে নাটক গণঅধিকার-গণমুক্তির ভাবাদর্শগত জমিন তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। ইউরোপে ডিউক অফ সাক্সেমাইনেনজিন থেকে ধরা হয় ডিরেক্টর’স থিয়েটারের উদ্ভব। আদ্রেঁ আতোয়া, এমিল জোলা, মায়ারহল্ড, স্তানি¯া­াভস্কি তা এগিয়ে নিয়ে যায়। এ দেশে মাইকেল থেকে শুরু করে রবীন্দ্রনাথ আই, পি, টি, এ হয়ে গণনাট্যের একটি ধারা তৈরি হয়। বাংলানাটকের তাই আছে সুপ্রশস্ত ঐশ্বর্যময়ী ধারা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাই বলেছেন, ‘বাংলা নাট্যসাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ নাট্যকারদের মধ্যে একজন সেলিম’। সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন, ‘বিশ্বনাট্য মঞ্চের এক নক্ষত্র’। আতিকুল হক চৌধুরী বলেছেন,‘তাঁর নাটক বিশ্বনাট্য সাহিত্যে স্থান পাবে’। সাহিত্য শিল্পের উদ্দেশ্যই হল মানুষের মুক্তির পথকে এগিয়ে নেয়া নিকোলাই অস্ত্রোভস্কি বলেছেন, ‘আমার সারা জীবন আমার সমস্ত শক্তি আমি এ বিশ্বের সব চাইতে সুন্দর উদ্দেশ্যের জন্য কাজ করেছি-মানব জাতির মুক্তি সংগ্রাম।’ সেলিম আল দীনের নাট্য চরিত্র এক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়। এবং একটি দর্শন তুলে ধরে যেমন ‘কেরামতমঙ্গল’। গ্যেটের আগমঁত এবং জন মিলটনের স্যামসন আগনস্টিন, রবীন্দ্রনাথের সুদর্শনা, গোর্কির সাতিন, যেমন অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গিয়ে একটি সত্যতে পৌঁছায়। নাটক সামাজিক সংগ্রাম এবং শ্রম বিভাজনের ফল। এদেশের নাটক, এদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সেক্যুলার সংগ্রামের ফসল। বলা যায় সেক্যুলার গণতান্ত্রিক সংগ্রাম এবং নাটকের সংগ্রাম, একইসূত্রে গাঁথা। সেলিম আল দীনের নাটক এবং সর্বতোভাবে নাটকের জন্য এমনকি শিক্ষা সংস্কৃতির জন্য উপযুক্ত পরিবেশের পূর্ব শর্ত হল সেক্যুলার মানবতাবাদী গণতান্ত্রিক সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ।
রবীন্দ্রনাথের নন্দিনী মনুষ্যত্বের পক্ষে গণমুক্তির কথা গণঅধিকার গণশাসনের কথা বলেছে। সেলিমের করিম বাওয়ালী বলে,‘কে ? মহাজন? কি চাও-সব চাও?- ক্যান? তোমার দরকার আমার দরকার নাই? আমি খামু না? আমি বাঁচুম না? স্বাধীনতার পর এই না খাওয়া মানুষ। কারণ,একাত্তরে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্তভাবে সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী ক্ষমতায় গেছে কিন্তু গণঅধিকার পদদলিত করে সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে শোষণ লুণ্ঠন চাপিয়ে দিয়েছে জনগণের বুকে। তাই করিম বাওয়ালী না খেয়ে থাকে। ‘কিত্তনখোলা’র সংলাপÑছায়াÑবনমালী, বনমালী তুমি আমাকে ভালবাস। বনমালী হাঁ, রবিদাকে, হাঁ তাকেও ভালবাসি।’ সহজ সরল যাত্রাভিনেত্রীদের তিনি এনেছেন। যারা নিষ্পেষিত। তাঁর নাটক মহাকাব্যিক। মহাকাব্যে দোষগুণ নিয়ে মানুষ। হেক্টরকে বধ করল আকিলিস। হত্যা করে রথে চুল বেঁধে ট্রয় ঘোরান হল। আবার হেক্টরের পিতা প্রায়াম যখন ছেলের লাশ চায়, তখন শ্রদ্ধাবনত হয়ে তাকে দিয়ে দেন আকিলিস। আবার আকিলিস যখন সবকিছু ধ্বংস করছে, তখন আফ্রোদিতি রূপালি তীর ছুঁড়ে মারে প্যারিস এবং নিহত হয়। অর্থ্যাৎ একটি দর্শন। সবকিছুর সীমা আছে। মহাকাব্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি। ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ মুনতাসির উপরিস্তরের মানুষ গোয়ের্নিকা থেকে সাবান এমনকি ব্রেসিয়ার পর্যন্ত খেতে চায়। আবার আছে উপকুলবর্তী মানুষ, রূপোপজীবী চুক্কীনী। পুঁজিবাদ শুধু মানুষের ভাত কেড়ে নেয়, তা নয় মুনষত্বও কেড়ে নেয়। তাই সমাজতন্ত্র প্রয়োজন। নাটক তাই মনুষ্যত্বের, অধিকারের ভাষা তুলে ধরে। নাটক মানুষের সাহসের কণ্ঠ। সেলিম আল দীনের নাটকে এ সব আছে। সেলিম আল দীনের প্রকৃত নাম মঈনুদ্দীন। ১৯৪৯ সালের ১৮ আগষ্ট ফেনী জেলার সোনাগাজি উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পড়াশুনা নিজ গ্রামের স্কুলে শুরু করেন। খাদ্য কর্মকর্তা বাবার চাকরির কারণে কুড়িগ্রামে আসেন। কুড়িগ্রামের উলিপুর মহারানী স্বর্ণময়ী স্কুলে আবার ভর্তি হন। তারপর ফেনী কলেজে। ১৯৬৭ সালে বাংলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের সাথে যুক্ত ছিলেন। পড়ায় আকস্মিক ছেদ করোটিয়া সাদাত কলেজ থেকে স্নাতক হন। আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। এম, এ পাশের পর বিটপিতে [বিজ্ঞাপনি সংস্থা] কপি রাইটার পদে চাকুরি নেন। ১৯৭৪ সালে মুস্তাফা নূরউল ইসলামের হাত ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেন এবং এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৮৭ সালে নাটক ও নাট্যতত্ব বিভাগ নিজ চেষ্টায় খোলেন এবং বিভাগের দায়িত্ব নেন। নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বলেছেন, সেলিম এই বাংলায় জন্ম নেয়া এক বিশ্বপ্রতিভা। এক’শ বছরে একজন সেলিম আসে’। সেলিম প্রথমে শুরু করেন কবিতা। কবি রফিক আজাদের পরামর্শে শুরু করেন নাটক লেখা। ডাকসু’র নাট্য বিভাগ নাটক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে ১৯৭২ সালে। এই প্রতিযোগিতার জন্য সেলিম আল দীন লেখেন ‘এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা’। তাঁর দ্বিতীয় নাটক করিম বাওয়ালীর শত্র“ অথবা মূল মুখ দেখা। তারপর জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন।’ ১৯৭৩ সালের ২৯ জুলাই ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয়। যাত্রা শুরু হয় সেলিম আল দীনের নাটক ‘সংবাদ কার্টুন’ এর মধ্য দিয়ে। নির্দেশনা নাসিরউদ্দীন ইউসুফ। এসব নাটকের নামে ও বিষয়ে অ্যাবসার্ড নাটকের প্রভাব পড়েছিল। সহজে অনেকেই এসব গ্রহণ করেনি। বলেছেন নাট্যাঙ্গনে ইয়ার্কি ফাজলামী। কালো হাতের কারসাজি। কিন্তু সেলিম থামেননি তিনি মনে করতেন আমাদের নাটকের দর্শক আমাদের সৃষ্টি করতে হবে। সংবাদ কার্টুন নাটকে দেখা যায় সিগারেটের দাম বাড়ছে। বাজার মূল্যের অনিশ্চয়তা। মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গ অবক্ষয় সেলিম অনেক পরে সাধারণ মানুষের কুসংস্কার সাপ কাটলে ওঝা দিয়ে বিষনাশের ধারণা বাতিল করে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি আনার চেষ্টা করেছেন ‘প্রাচ্য’নাটকে। ‘শকুন্তলা’ নাটকে ধ্র“পদী ধারা এনেছেন। বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘ভীরুতা পাপ’। তিনি এ-ও বলেছেন ভালত্বের শক্তির প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখার কথা। বড় কাজে লাগে সাহস এবং দৃঢ়তা। ১৯৮১তে লেখেন ‘কিত্তনখোলা’। তাঁর নাটক মাটিতে হাত রাখে। পীরের মাজারকে কেন্দ্র করে মেলা। মঞ্চে এই মেলাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এই নাটক। তিনি চার হাজার পৃষ্ঠা লিখেছিলেন। পরে তা কাটছাঁট করে তিনশত পৃষ্ঠায় দাঁড়ায়। এই নাটকে নানা চরিত্র। যাত্রা দল আসে। যাত্রার অভিনেতা, অভিনেত্রী। বনমালী, রবি, ছায়া। তাদের ভালবাসা, আত্মহনন। এক মহাকাব্য। তিনি সেক্যুলার একটি দৃষ্টিভঙ্গী এই নাটকে এনেছেন। মাজারকে মেলায় রূপান্তর একটি সেক্যুলার পদক্ষেপ। পাশাপাশি মঞ্চের নতুন মাত্রা। ‘শকুন্তলা’ নাটকে বনের মধ্যে শকুন্তলার রক্তস্রাব হচ্ছে, তার শরীর থেকে বের হচ্ছে কাঁঠালীচাপার গন্ধ। এভাবে প্রকৃতি ও মানবীর যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন। সেলিম আল দীনের গুরুত্বপূর্ণ রচনাগুলো হল-কীত্তনখোলা, হাতহদাই, চাকা, কেরামতমঙ্গল, হরগজ, যৈবতী কন্যার মন, বনপাংশুল, প্রাচ্য- সর্বশেষ নিমজ্জন। উল্লেখযোগ্য টি,ভি নাটক, আতিকুল হক চৌধুরী প্রযোজিত ঘুম নেই, অশ্র“ত গান্ধার, হলুদ পাতার গান, মশারি তেহাত্তর ,শ্যামলছায়া, নীল নীল যন্ত্রণা। ‘রক্তের আঙ্গুর লতা’ টিভি নাটকটি মাইলস্টোন।
সেলিম তাঁর মঞ্চ নাটকে বাংলাদেশকে ধরতে চেয়েছেন। বাংলার খাল, বিল, ঝিল, পুকুর, মাছ, বটের গাছ, মাঝি, পোকামাকড়, নৌকা, পীর, মুরিদ, কৃষক, নদী, পাখি সবকিছু। নাটককে কলা হিশেবে দেখেছেন। তাই তাঁর নাটকে কবিতা, ভাস্কর্য, সঙ্গীত, মেলা, গল্প সব কিছুর সংমিশ্রণ। ‘চাকা’ নাটকে দেখা যায় একটি লাশ গরুর গাড়িতে ঘুরছে। গ্রামের পর গ্রাম। কিন্তু কেউই শনাক্ত করতে পারছে না। অর্থাৎ নৈব্যর্ক্তিক লাশ। যে কেঊ হতে পারে। মানবিক আবেদনময় নাটক। পুঁজিবাদী সমাজে যে নৈরাজ্য থাকে। সন্ত্রাস, হত্যা, খুন, উন্মাদনা, অজ্ঞতা, পাশবিকতাÑএসব বিশিষ্টতা নিয়ে অবস্থান করে মানুষকে আতঙ্কিত করে রাখে, অনিশ্চয়তা, নিরাপত্তাহীনতা স্থায়ী করে রাখে যা তিনি দৃশ্যমান করেছেন, তাঁর নাটকে। ‘প্রাচ্য’ নাটকে সাপকে এনেছেন, সাপে বিষ আছে, ছোবল হানে কিন্তু তিনি সাপকে ক্ষমা করার এক মহান দৃষ্টিভঙ্গী এনেছেন এই নাটকে। ভলতেয়ারের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছেন ‘যাদের দৃষ্টি আচ্ছন্ন তাদের যেন সহ্য করি।’ ক্ষমাশীলতা মানবিকতারই অংশ। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গীতে এই নাটকটি রচিত। ‘বনপাংশুল’ মান্দাইদের নিয়ে রচিত। ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা এই মান্দাই সংস্কৃতির বিশিষ্টতা এখানে এসেছে। সেলিমের উল্লেখযোগ্য একটি নাটক ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’। এই নাটকে, মুনতাসির আসলে একজন বুর্জোয়া মানসিকতার প্রতিনিধি। সে সবকিছু কুক্ষিগত করতে ইচ্ছুক। পুঁজিবাদি সমাজে ব্যক্তি সম্পত্তির প্রকাশ হিশেবে লোভ লালসা, সব কিছুকে গ্রাস করবার লোভ কোন্ মাত্রায় হতে পারে তাই তিনি তুলে এনেছেন। এর মধ্যে দিয়ে ব্যক্ত করেছেন এসব লোভী মানুষদের। রামনারায়ণের ‘কুলীন কুল সর্বস্ব’ থেকে যে আধুনিক নাটকের যাত্রা ধরা হয়। তারপর মাইকেল, দীনবন্ধু মিত্র। মাইকেলের ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ। দীনবন্ধুর ‘সধবার একাদশী’, নীল দর্পণ। এসব নাটক সমকালীন সমাজের উচ্চ শ্রেণীর গণবিরোধী মানুষদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ তুলসি লাহিড়ীর ‘ছেড়াঁ তার’। সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের জীবন এবং সমস্যার স্বরূপ তুলে ধরেছে। বাদল সরকারের ‘ভোমা’, উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’-এ এসব মানুষের কথা আছে। সেলিম আল দীন এর ‘হরগজ’ নাটকে টর্নেডো আক্রান্ত একটি গ্রামের জীবন ছবি তুলে ধরা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, জীবনের যা অভাব তাই পূরণ করে সাহিত্য।’ তিনি এ-ও বলেছেন, ‘ভুল করবার অধিকার যার নাই। সত্য আবিষ্কারের অধিকার সে পায় নাই।’ সেলিম আল দীন বলতেন, ‘শিল্পীর হাজার চোখ।’ মনে করতেন রবীন্দ্রনাথ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবি। কপোতাক্ষ পারের মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা সাহিত্যের পথিকৃৎ। মনে করতেন ‘মহাভারত’ ‘রামায়ণ’ ট্রাজেডি। যথার্থই, কারণ, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবরা জিতলেও রাজ্য শাসন তারা করতে পারেনি। রামায়ণের শেষে সীতা মাটি বিদীর্ণ হলে নিচে চলে যান। পরে স্বর্ণরথে তিনি উপরে উঠে যান। প্রাচীন গ্রীক নাটকের প্রতি টান ছিল তাঁর।
সোফোক্লিস ‘ওডিপাস’-এ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ালেন, তাঁর আত্মদহন অনুশোচনা। তাঁর ‘আন্টিগোনি’ নাটকে আন্টিগোনি ভাইয়ের সৎকার করতে চায়। ক্রিয়ন তাকে ভয় দেখায় কিন্তু তাঁর আদর্শ থেকে সরে আসে না। ন্যায়ের পক্ষে আন্টিগোনি। ঈসকাইলাসের প্রমিথিউস, অরেস্টিস ও সত্যের পক্ষে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ায়, শত ভীতি, নিযার্তন সহ্য করেও। প্রাচীন ধ্রুপদী নাটক আবার বাংলার লোকমানস সব কিছুই বিমুগ্ধভাবে জেনেছেন। তাই তিনি নাটককে মহাকাব্যিকভাবে ভাবতে পেরেছেন। শম্ভু মিত্রের ‘চাঁদ বণিকের পালা, ‘উলুখাগড়া’ কিংবা উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’‘কল্লোল’ ‘দিল্লী চলো’। এসব নাটকে নির্যাতিত মানুষের কাহিনী রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে উপস্থিত। সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতিফলন আছে। বাদল সরকারের ‘ভোমা’ নাটকে দেখা যায় ভোমার খিদে পায়। শাদা ভাত তার কাছে জুঁই ফুলের মত মনে হয়। সেলিম আল দীন তাঁর ‘বাসন’ নাটকে রাজনৈতিক বিষয় এনেছেন। রুশো বলেছেন, ‘প্রকৃতির ভূমিতে রাজা এবং ভিখারী সমান’। আসলে গণতন্ত্রের মূল কথা সাম্য। সকল মানুষের সমান অধিকার। আবার মানুষ সার্বভৌম। পৃথিবীর সবকিছুই মানুষের প্রয়োজনে, মনুষ্যত্বের স্বার্থে নিয়োজিত থাকবে অর্থাৎ সেক্যুলার। গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম পরস্পর নির্ভরশীল মতাদর্শ। অথচ আমাদের রাষ্ট্র নির্বিকার গণবিরোধী এবং মনুষ্যত্ববিরোধী। সেলিম আল দীনের নামটির সাথে নাসিরউদ্দীন ইউসুফের নামটি যুক্ত। যেমন আধুনিক বিশ্বনাট্য ইতিহাসে ব্রেশটের সাথে পিসকাটরের নাম যুক্ত। তাঁদের সর্বোচ্চ সমঝোতার ভিত্তিতে ঢাকা থিয়েটারের প্রযোজনায় নাট্য ফসলের মোহনা সৃষ্টি হয়েছে। সেলিম আল দিনের নাটক যৌথ সৃষ্টি। সর্বোচ্চ সত্যের ভিত্তিতে ক্রিয়া এবং পুঁজিবাদী বাস্তবতার মধ্যে অদৃশ্যভাবে সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতা আছে। এটা আমাদের উপলব্ধির সময় এসেছে। সেলিমের আরেকটি নাটকের নাম ‘হরগজ’। হরগজ একটি গ্রাম, টর্নেডো বিধ্বস্ত। একজন আধা পাগল মানুষ, সংগে আধা ভরা বস্তা। এই লোকটি গরু মহিষের হাড় কুড়ায়। দুই জন ত্রাণকর্মী তার দিকে ছুটে আসে চোর ধরার আনন্দে উত্তেজিত। লোকটি দীর্ঘ শাদা একটি হাড় উপড়ে তুলে ধরে। ত্রাণকর্মীরা তার হাত ধরে। কিন্তু লোকটি তাদের উদ্দেশ্যে লুঙ্গি তুলে শিশ্ন দেখায়। এবং সে বলে ‘শালার পুতরা এইটা লইয়া যা’। তাঁর ‘কেরামতমঙ্গল’ নাটকের সংলাপ কেরামত-কিয়ের পাপ। এই জামা হিঁড়লাম। এই লুঙ্গি খুলি, বাতাসে উড়াই-আমার লিঙ্গ দেখুক মানষের-পাপ নাই। বায়েজিদ বোস্তামী হুজুর হাজার মানুষের সামনে নাংটা অয় নাই?
আজমত- চুপ কর কেরামত
কেরামত- পাপ মানি না আমি লুঙ্গি খুলুম।

এর সাথে তিনি যিশুকে অত্যাচার করে যে তার কাপড় খুলে নেয়া হয়ে ছিল, তার প্রসঙ্গে আনেন নাটকে। তিনি অ্যাবসার্ড নাটক দিয়ে শুরু করেছিলেন, সেখানে সীমাবদ্ধ থাকলে, তিনি হয়ত হারিয়ে যেতেন কিন্তু তিনি গণমানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গণতান্ত্রিক-সেক্যুলার-দেশাত্মবোধের আদর্শে। তিনি সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হান, আহম্দ শরীফ, হাসান হাফিজুর রহমান,আলমগির কবীর- এর উত্তরসূরি। এঁরা সবাই এদেশের গণসংগ্রামের ফল। তাঁর ‘বাসন’ নাটকে একটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, যা ঐতিহাসিক। হাজি শরিয়তুল্লাহর এক দরিদ্র বর্র্গাচাষী উত্তরাধিকারের বাড়িতে একটি বাসন ছিল। এই বাসন সংগ্রামের অহংকারের এমনকি মর্যাদারও প্রতিক। দরিদ্র পরিবারটি তা রক্ষার চেষ্টা করে আসছে। শত দারিদ্রের মধ্যেও তা নষ্ট করেনি। হঠাৎ একদিন এক ক্ষমতাধর ধন লিপ্সু গণপ্রতিনিধি এই বাসনের কথা জানতে পারে। এবং তা হস্তগত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়। গ্রামবাসী দরিদ্র পরিবারটির পক্ষে দাঁড়ায়। একটি গণ সংগ্রামের ছবি আছে এই নাটকে। তাঁর সর্বশেষ নাটক ‘নিমজ্জন’। যখন এই নাটক চলছিল তখন তিনি প্রয়াত[১৪ জানুয়ারি ২০০৮] হন। এই নাটকের মূলকথা হল গণহত্যা। সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী রাষ্ট্র তাদের স্বার্থে যে গণহত্যা চালিয়ে সভ্যতা ধ্বংস করে। তাই এসেছে এই নাটকে। সেলিমের প্রয়াণ কি একটি হত্যা নয়! পুঁজিবাদের অদৃশ্য হাতের হত্যা। হাজার হাজার বছর ধরে যে গণহত্যা চলছে তার বিবরণ এই নাটকে তুলে এনেছেন। এখনও যে বসনিয়া, কান্দাহার, আহমেদাবাদ,যে গণহত্যা মানুষ হত্যা, মানুষ হত্যা, এ সব বিষয়ই এই ‘নিমজ্জন’ নাটকের বিষয়। এই হত্যার বিরুদ্ধে মানবিকতা ও শান্তির বাণী তুলে ধরেছেন। তাঁর নাটকে দেশাত্মবোধ, মানবিকতা, সেক্যুলার মতাদর্শের জয়গান গেয়েছú